• পার্থ সেন

গল্প - এডমন্ড হার্ডিঞ্জ


বেশ মিনিট কুড়ি হাঁটার পর আমি হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলো টা দেখতে পেলাম, চারদিকে রডোডেনড্রন আর দেবদারুর ঘন জঙ্গল, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বিরামহীন জলঢাকা। জুলাই-এর এই ভরা বর্ষার সময় পাহাড়ি নদী গুলোর রূপ কেমন বদলে যায়! এই সন্ধ্যের মুখে অজস্র পাখির ডাক, রাস্তা দিয়ে হারিয়ে যাওয়া গাড়ির আওয়াজের মধ্যেও জলঢাকার অবিশ্রান্ত জলোচ্ছ্বাস ছাপিয়ে যায় সব আওয়াজকে – ভালো করে পাশের লোকের গলার শব্দ শোনা যায় না। এই চাপরামারিতে আমি আগে এসেছি, কিন্তু এই জায়গাটায় কখনো আসা হয়নি। তবে এবারে আসাটা হঠাৎ করে!

আমার নাম সুশোভন মুখার্জি, কলকাতায় একটা সরকারী অফিসে চাকরি করি, খুব উচ্চপদস্থ না হলেও অফিসে আমার পজিশন টা খারাপ নয়, বাগবাজারে বাড়ি, বই পড়া আর ফুটবল খেলা দেখা আমার অবসর, আর বিয়ে এখনো করা হয়ে ওঠেনি! বাবার ইচ্ছে ছিল আমি আইএএস হই, কিন্তু আমার অত ট্যালেন্ট ছিল না। তবে পড়াশোনার আগ্রহ আর অভ্যাস দুটোই ছোটবেলা থেকেই খুব ছিল! আর যে কারণেই হোক ইতিহাস ব্যাপার টা আমাকে ছোট থেকেই খুব বেশি আকর্ষণ করত। বাবা নিজে হিসটোরিয়ান ছিলেন আর আমাদের বাড়িতে পুরনো বই ও ছিল অনেক! স্কুলের সিলেবাসের অশোক, সমুদ্রগুপ্ত পরীক্ষার সময় হয়ত খুব একটা মাথায় থাকতো না, কিন্তু সাবজেক্ট টা ভালো লাগতো! তাই আজ ও এই সরকারী চাকরি করতে করতে ও আমার পুরনো ইতিহাসের বই গুলো পড়তে খুব ভালো লাগে! দু-তিন মাস ছাড়া ছাড়া কলেজ স্ট্রীটে যাই, নতুন, পুরনো সব রকমের বই কিনি! আমার মাসের বেশ বড় একটা খরচা বইয়ের পেছনে চলে যায়! অবশ্য আমি একা মানুষ হওয়ার একটা সুবিধা আছে, খরচা কম আবার আমার সে রকম সঞ্চয়ের ও প্রয়োজন নেই।

যাই হোক, বারো দিন আগে সেদিন টা বুধবার ছিল, এক ভদ্রলোক আমার খোঁজে আমার অফিস সল্টলেকের পূর্ত ভবনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমার পুরনো অফিসের কে বন্ধু নাকি ওনার কে মাসতুতো না পিসতুতো ভাই হয়! তা সেই সূত্রে খবর পেয়ে আমার সন্ধানে কলকাতা পৌঁছলেন! নাম জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী – এত বড় নাম এখন আর বেশি শোনা যায় না! ভদ্রলোক কলকাতা মিউজিয়ামে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন, তারপর রিটায়ার্ড জীবনে ফিরে গেছেন নিজের আদি বাড়িতে – মুর্শিদাবাদে। উনি কাজ করতেন এক ব্রিটিশ অধ্যাপকের সাথে – নাম এডমন্ড হার্ডিঞ্জ। অক্সফোর্ড থেকে পাশ করা স্বনামধন্য প্রফেসর এদেশে এসেছিলেন ছেড়ে যাওয়া ব্রিটিশদের ইতিহাস ঘাঁটতে। জ্যোতিরিন্দ্রবাবু এবং হার্ডিঞ্জ সাহেব একসাথে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন, কিন্তু হার্ডিঞ্জ সাহেবের আর নিজের দেশে ফেরা হয়নি। এক মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টে জখম হয়ে দুটো পা হাঁটুর নীচ থেকে চিরকালের মতো বাদ হয়ে যায়, আর সেই থেকে তিনি আমাদের দেশের পার্মানেন্ট গেস্ট! নিজের জমানো টাকা দিয়ে তিনি একটা বাংলো করেছিলেন, উত্তর জলপাইগুড়িতে জলঢাকা নদীর উৎস রকি আইল্যান্ডের খুব কাছে, আসলে জায়গা টা সামসিং। আর আছে সব সময়ের সঙ্গী রিজওয়ান – হার্ডিঞ্জ সাহেব কে সব কাজে হেল্প করার জন্য! জ্যোতিরিন্দ্রবাবু সময় পেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসেন।

যাই হোক, এই হার্ডিঞ্জ সাহেব ছিলেন আমার বাবার বিশেষ বন্ধু, আমার মায়ের সঙ্গেও নাকি ওনার পরিচয় ছিল, এমনকি আমাকেও নাকি ছোটবেলাতে দেখেছেন। আমার অবশ্য সেসব কথা মনে নেই। তবে বাবার পুরনো বন্ধুদের মধ্যে কিছু সাহেব মানুষ যে ছিলেন সেটা মায়ের কাছে শুনেছি। যদিও সে অনেক দিনের কথা! যাই হোক, এই হার্ডিঞ্জ সাহেব এখন প্রায় পঁচানব্বই ছুঁই ছুঁই। তিনি আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চেয়েছেন। অনেক খুঁজেছেন আমাকে, তারপর কোন ভাবে সন্ধান পেয়ে পাঠিয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথবাবু কে, আমাকে নিমন্ত্রণ টা পৌঁছে দিতে। আমাকে একরাত থাকতে অনুরোধ করেছেন। থাকা এবং খাবার সব ব্যবস্থা থাকবে। বাবার বন্ধু তার ওপর বিখ্যাত হিসটোরিয়ান, আমি অনুরোধ টা ঠিক ফেরাতে পারলাম না! অফিসে ছুটি পেতে আমার খুব সমস্যা হয় না, আর তাছাড়া এত দিন বাদে নর্থ বেঙ্গল যাওয়ার সুযোগ টাও ছাড়তে চাইছিলাম না! আমার কলেজের বন্ধু কল্লোল শিলিগুড়িতে থাকে, নিজস্ব ট্র্যাভেল কোম্পানি আছে, আমাকে অনেক বার যেতে বলেছে গ্যাংটক, পেলিং ঘুরিয়ে দেবে। তা হার্ডিঞ্জ সাহেবের সাথে একদিন দেখা করে সিকিম ঘুরে আসা যাবে! সেই রকম -ই প্ল্যান করলাম। দুসপ্তাহ বাদে একটা শুক্রবার - জ্যোতিরিন্দ্রনাথবাবু কে দিনটাও কনফার্ম করে দিলাম।

যাইহোক, সব কিছুই ঠিক ছিল। কাঞ্চনকন্যা এক ঘণ্টা লেট ছিল। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে একটা বাসে করে মাল বাজার, তার পর আর একটা বাস ধরে সামসিং। চালসা থেকে সামসিং এর রাস্তা টা বন্ধ থাকায় আমাদের বাস টা চাপরামারির রাস্তা ধরল। তাতে একটা সুবিধা হল, কারণ হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোটা চাপরামারির রাস্তায়। নয়ত আমাকে হয়ত আরো এক কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হতো! হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ও শুরু হয়ে গেছে! পৌঁছতে প্রায় বিকেল সাড়ে পাঁচটা হয়ে গেল।

ছোট একটা গেট, সেটা পেরোলে একটা ছোট ঘাসের লন তারপর কাঠের বাড়ী। এই বাড়ি টার সংলগ্ন আর কোন বাড়ি নেই। চারপাশে উঁচু করে কাঠের পরিখা কাটা। ল্যান্ডমার্ক হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্রবাবু একটা ইলেক্ট্রিসিটি অফিসের কথা বলেছিলেন, সেটা দেখতে পেলাম। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলো অনেক দিন সে ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি, প্রচুর আগাছায় ভর্তি লন। ঢুকতেই একটা জিনিস নজরে পড়ল, হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোর একটা ভালো নাম আছে, ক্যান্টারবেরি হরফে লেখা – ‘মেরিওনেট’। মনে পড়ে গেল ওয়াল্টার ডেলা মেয়ারের সেই বিখ্যাত কবিতার কথা। জানিনা, ব্রিটিশ মানুষ তো! হয়ত সেই কবিতার নামেই বাড়ি টার নাম রাখা। বেশি দূর যেতে হল না, এক বয়স্ক মানুষ ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। বুঝতে অসুবিধা হলনা, এই রিজওয়ান, হার্ডিঞ্জ সাহেবের সর্ব সঙ্গী।

প্রথম যে ঘরটায় ঢুকলাম সেটা ড্রয়িংরুম কাম স্টাডি। হার্ডিঞ্জ সাহেব কতটা লম্বা সেটা বোঝার উপায় নেই, কারণ তিনি চেয়ারে আটকে রয়েছেন। কাঠের হাতল ওয়ালা হুইল চেয়ার। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় মুখ টা ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবে এটা বেশ বুঝতে পারলাম - খুব সুন্দর সুপুরুষ চেহারা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, মাথার বেশির ভাগ চুল আর নেই, এক মুখ দাড়ি গোঁফ, তবে খুব সুদর্শন, পরনে গাউন, আর গাউনে পা দুটো ঢাকা। আমাকে দেখে শুদ্ধ ভারতীয় পদ্ধতিতে নমস্কার করলেন। পঁচানব্বই বছর বয়সে যতটা অসুস্থ আমি ভেবেছিলাম তার থেকে হার্ডিঞ্জ সাহেবকে অনেক টা সুস্থ লাগল। দেখলাম, বেশ সুন্দর বাংলা ও বলেন, একটু ইংরাজি কথা ব্যবহার করেন, সেটা খুবই স্বাভাবিক,

“তুমি তখন সাত বছর হবে তোমাকে আমি লাস্ট দেখেছিলাম। তোমাকে কিন্তু আমি আপনি আপনি করে বলতে পারবো না”

আমার সাত বছর মানে আজ প্রায় তেত্রিশ বছর আগে , একটু হেসে বললাম “তা বেশ, তুমি ই বলবেন”

“তোমার বাবা আর আমি এক সাথে অনেক কাজ করেছি, বিশ্বনাথ আমার চেয়ে অনেক জুনিয়ার ছিল, তার পর হঠাৎ করে কি যে হল?”

কিছু বললাম না, বিশ্বনাথ মুখার্জি আমার বাবা। আসলে বাবাকে আমার সে ভাবে মনে নেই, প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা, সেটা হয়ত বুঝতে পেরে হার্ডিঞ্জ সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার মা?”

“মা ও আর নেই, বছর দুয়েক হল”

“তুমি এতটা জার্নি করে এলে, তুমি একটু রেস্ট করে নাও”

ইতিমধ্যে রিজওয়ান খাবারের ট্রে সাজিয়ে এনে আমার সামনের টেবিলে রেখে গেল। খাবারের সজ্জা আর পরিবেশনের কায়দা গুলো কিন্তু খাঁটি বিদেশী, ওভেন বেকড কেক আর দার্জিলিং চায়ের গন্ধটা বেশ পেলাম।

“না ঠিক আছে, খুব টায়ারিং কিছু নয়”

“তোমার নেক্সট প্ল্যান কি?”

“আমি কাল শিলিগুড়ি ফিরে যাব, সেখানে এক বন্ধুর সাথে দেখা করার আছে।“

“তুমি একটু ফ্রেস হয়ে নাও, তারপর কথা হবে”

একটা প্রশ্ন তখন থেকে মাথায় আসছিল, না করে পারলাম না, “আচ্ছা, আপনার বাড়ির নাম দেখলাম মেরিওনেট, এটা কি সেই ওয়াল্টার ডেলা মেয়ারের কবিতার নামে?”

হাসলেন হার্ডিঞ্জ সাহেব, তারপর বললেন, “তোমরা বলো ওয়াল্টার আর আমরা যারা কেন্ট কাউন্টি তে বড় হয়েছি তারা বলি জন। ওনার মা ছিলেন লুসি সোফিয়া ব্রাউনিং, বিখ্যাত কবি রবার্ট ব্রাউনিং এর রিলেটিভ, উনিও কেন্ট কাউন্টির লোক, ছেলের নাম রেখেছিলেন জন। আমি যখন এই বাংলো টা কিনলাম দ্যাট ওয়াস সেভেন্টি নাইন! এই জায়গা টা একদম খালি ছিল, কিছু ছিল না! খালি পেছনের পাহাড়, জলঢাকার গর্জন, আর চারদিকে ঘন জঙ্গল! কিছু ওয়াইল্ড লাইফ ছিল, তবে সে রকম হিংস্র কিছু নয়। খুব সুন্দর সে সব দিন গুলো ছিল। দেখে মনে পড়ে গেছিল জনের সেই রোম্যান্টিক ইমাজিনেশন – নাম রেখে ফেললাম সেই মত। বেশীর ভাগ সময় কাজের সূত্রে আমি বম্বে, দিল্লী, কলকাতায় থেকেছি, কিন্তু এই বাড়ি টা ছিল আমার সেকেন্ড হোম! তখন মাঝে মাঝে আসতাম! বছরে একবার! কখনো দু বছরে একবার! তবে এখন এখানেই থাকি। বাট তুমি খুব ইম্প্রেসিভ! ভেরি গুড! ওয়াল্টার জন ডেলা মেয়ার কে আর কত জন মনে রেখেছে?”

আমার মনের মধ্যে আরো কিছু কৌতূহল আরো কিছু প্রশ্ন ছিল, সেটা হয়ত হার্ডিঞ্জ সাহেব বুঝতে পারলেন, তাই আবার বললেন – “জানি তোমার কিছু জানার আছে, আমার কিছু বলার আছে, তুমি ফ্রেস হয়ে নাও”।

রিজওয়ান হার্ডিঞ্জ সাহেবকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল। ঘরের যেদিকে চোখ যাচ্ছে সেখানে খালি বই আর পুরনো জার্নাল, আগে জানলে একদিন বেশি কাটিয়ে যেতাম। চারপাশ বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে আর বৃষ্টির তেজ ক্রমশ বাড়ছে। মেঘ ডাকা বা বাজ পড়া নয়, এক টানা অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। রিজওয়ান দুটো ক্যান্ডেল আর একটা কেরোসিন লন্ঠন জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। আসলে ছাতটা কাঠের, তাই জলের শব্দটা বেশ জোরে হয়। আর অবিশ্রান্ত জলঢাকার জলোচ্ছ্বাস সেই বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে! রিজওয়ানের মুখে শুনলাম হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোতে শেষ তিন দিন ধরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই, জুলাই – এর এই সময়টায় বর্ষার কারণে এই রকম হয়েই থাকে।

খাওয়া দাওয়া সেরে, জামা কাপড় চেঞ্জ করে রেডি হতে আমার খুব দেরী হল না, সন্ধ্যে সাতটায় আমি আবার স্টাডি তে পৌঁছলাম। তিন মিনিট দেরী হয়েছিল, হার্ডিঞ্জ সাহেব ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন – কিছু বলার আগেই হার্ডিঞ্জ সাহেব বললেন, “ঘড়ি টা বন্ধ হয়ে গেছে, সারানো হচ্ছে না! আগে এসে গেছি বোধ হয় না?”

কিছু বললাম না, একটু হাসলাম, ব্রিটিশদের সময়ানুবর্তীতা এবারে চোখের সামনে দেখলাম। বেশি ভণিতা না করে হার্ডিঞ্জ সাহেব গল্পটা শুরু করে দিলেন,

“তাহলে এবারে তোমাকে বলি এখানে তোমাকে কেন ডাকলাম। আসলে এই ব্যাপার টা জানতে হলে তোমাকে একটা ইতিহাসের ঘটনা জানতে হবে। কারণ এই ঘটনার শুরু আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে। তেইশে জুন, ১৭৫৭ – পলাশীর যুদ্ধ! প্রায় নয় মাস ধরে নানা কথা বার্তার পর যখন সিরাজ আর ক্লাইভ এক মতে পৌঁছতে পারলেন না, বারো জুন চন্দননগর থেকে ক্লাইভ তিন হাজার সেনার বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। ইউরোপিয়ান সেনাবাহিনী গেল জলপথে আর ভারতীয় সেনাবাহিনী গেল স্থলপথে, তারপর তেইশে জুনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রথমটায় ব্রিটিশ রা সেরকম সুবিধা করতে পারছিল না! বরং মীরমদন আর মোহনলালের নেতৃত্বে সিরাজের বাহিনী ব্রিটিশদের কোণঠাসা করে দেয়। ইতিহাস বলে, সেদিন যদি এক ঘণ্টার বৃষ্টি না হতো হয়তো সিরাজ-ই জিতে জেতেন। আর পলাশীতে হেরে গেলে ক্লাইভ কে হয়তো ভারতবর্ষ থেকে গোল্ডেন রিট্রিট করতে হত। কিন্ত বৃষ্টিতে সিরাজের গোলা, বারুদ সব ভিজে গেল, অন্য দিকে ব্রিটিশরা তৈরি হয়ে এসেছিল, জানত মনসুন এসে গেছে! বৃষ্টি থামতে প্রধান সেনাপতি মীরমদন খান পদাতিক এবং ঘোড়সওয়ার দের এগোনোর আদেশ দিলেন আর ব্যস! ব্রিটিশ দের কামানের সামনে উড়ে গেল – সিরাজের চল্লিশ হাজারের বাহিনী! তারপরটা আমাদের সবার জানা – মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, সিরাজের ভুল সিদ্ধান্ত, তারপর সিরাজের সেনাবাহিনীর রিট্রিট আর ক্লাইভের ঐতিহাসিক জয়।

আমাদের ঘটনার শুরু এর ঠিক পরে। সিরাজ কিন্ত সেনাক্যাম্পে ছিলেন, বিকেল চারটের মধ্যে বোঝা যাচ্ছিল তিনি হেরে যাবেন, কিন্ত সিরাজ ক্যাম্প ছাড়েননি! সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় দুজন শুভানুধ্যায়ী আর দুই মন্ত্রীর পরামর্শে তিনি পলাশি ছেড়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আজ যেখানে হাজারিদুয়ারী সেখান থেকে আরো এগারো কিলোমিটার এগিয়ে সোনারগাঁও বলে একটা জায়গা তে বিশেষ বন্ধু জয়দেব শাহ – তাঁর বাগান বাড়িতে তিনি এলেন। নিজের বাড়িতে ফিরলেন না, আরো মীরজাফর –ও থাকতে পারে! বারো জন মন্ত্রী, কিছু উপদেষ্টা আর তিন অভিন্নহৃদয় বন্ধু কে নিয়ে সেই রাতে সেই বাড়িতে একটা মিটিং হল। ইতিমধ্যে তাঁরা খবর পেয়েছেন যে, মীরজাফর ব্রিটিশ দের সাথে মিলে গেছে। কাজেই সিরাজকে বন্দী করা তাঁর পরবর্তী চাল। আর শুধু বন্দী তো নয়! ব্রিটিশরা বলত এক্সিকিউশন! মীরজাফর-ও রাতারাতি সিরাজের মাথার দাম ঘোষণা করেছে! কি করা যায়? সুতরাং বন্ধু এবং উপদেষ্টাদের দের পরামর্শে সিরাজ মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। সব দেখে শুনে ঠিক হল আজিমগঞ্জের দক্ষিণে যেখানটাকে এখন লালকুঠি বলে, সেখান থেকে নৌকা করে সিরাজ পাড়ি দেবেন সাহেবগঞ্জের উদ্দেশ্যে পরদিন মানে চব্বিশ তারিখ রাতে! মধ্যরাতে চোখের জলে নিজের জন্মস্থান মুর্শিদাবাদকে বিদায় জানিয়ে, জেলের ছদ্মবেশে একটি মাছ ধরার নৌকায় সিরাজ উঠলেন, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী। আর পেছনে আর একটি নৌকায় রইলেন সিরাজের সব সময়ের সঙ্গী কাসিম, আর দুই বন্ধু। সিরাজের সঙ্গে রইল বেশ কিছু গয়না, অল্প কিছু অস্ত্র, কিছু দরকারি কাগজ আর একটি ক্লারিওনেট”!”

অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে কথা বলে এবারে থামলেন হার্ডিঞ্জ সাহেব! রিজওয়ান আর এক বার চা নিয়ে এসেছে। আগের বারের মতো এবারেও টী-ব্যাগ! শুনেছি সাহেবরা টী-ব্যাগ বেশি পছন্দ করে। বৃষ্টির তেজ কিন্তু কমেনি, তবে দমকা হাওয়া আসছে থেকে থেকে। তাতে বাতি টা থেকে থেকে কেঁপে যাচ্ছে, তবে একবার-ও নেভেনি। ছোট দুই-তিন মিনিটের বিরতি নিয়ে হার্ডিঞ্জ সাহেব আবার শুরু করলেন – “কিন্তু প্রশ্ন হল – ক্লারিওনেট কেন? ইতিহাসে তো আমরা শুনিনি কোথাও যে সিরাজ মিউজিসিয়ান ছিলেন, বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন! হ্যাঁ সঙ্গীত ভালো বাসতেন! সে তো সব রাজা-নবাব রাই বাসেন, কিন্ত এই বিপদের মধ্যেও সিরাজ যে জিনিস নিয়ে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছেন – তার গুরুত্ব কতটা? তার চেয়ে ও একটা আশ্চর্য ব্যাপার আছে। দোসরা জুলাই সিরাজ পৌঁছলেন – গঙ্গার ধারে রাজমহল বলে একটি জায়গায়, এখন সেটা ঝাড়খণ্ডে পড়ে! এক দিন বাদে সেখানে তিনি ধরা পড়লেন মীরজাফরের ভাই-এর কাছে – কিন্তু ক্লারিওনেট টা পাওয়া গেল না! সেটার উল্লেখ কিন্তু কোথাও নেই। ইতিহাসের পাতা থেকে ক্লারিওনেট টা যেন কেমন করে হারিয়ে গেল”।

শুনতে বেশ লাগছে, পুরনো ইতিহাসের পাতা থেকে সামনে বসে ধারাবিবরণী – বাইরে এখন মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, বৃষ্টির দাপটে থেকে থেকে ঘরের মধ্যেও হালকা জলের ছাট আসছে, অনেক দূর থেকে একটা হুইসিলের শব্দ আসছে। অনেকক্ষণ বাদে একটা বাস যাওয়ার শব্দ পেলাম। হার্ডিঞ্জ সাহেব আমার দিকে একবার তাকালেন, তারপর আবার বললেন – “এটা কিন্তু কাল্পনিক গল্প নয়, একেবারে বাস্তব। অবশ্য আমরা হিসটোরিয়ান রা একটু গল্পের মতো করে বলি”।

“না! ইতিহাসের গল্প পড়তে বা শুনতে দুটোই আমার খুব ভালো লাগে!”

“গুড! যাই হোক এই হারিয়ে যাওয়া ক্লারিওনেটের সূত্র আবার পাওয়া গেল ১৯৮১ সালে। অ্যান্ড ফুল ক্রেডিট টু বিশ্বনাথ মানে তোমার বাবা। ১৭৬৪ থেকে ১৭৬৯ এর মধ্যে বাংলার ইতিহাস নিয়ে ও রিসার্চ করছিল। সেই সময় টা, যখন রবার্ট ক্লাইভ তৃতীয় বার ভারতে এসেছেন। দিল্লীর নবাব তখন শাহ আলম, মীরজাফর মারা গেছেন, তাঁর জামাতা কাশিম আলি নবাব হয়েছেন, শোষিত বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে মন্বন্তরের দিকে এগোচ্ছে। সেই সন্ধানের ইতিহাস বলতে গেলে আমার এক দিন লাগবে – দুর্ভাগ্য, বিশ্বনাথ ও হঠাৎ করে চলে গেল। কিন্তু ম্যানুস্ক্রিপ্ট রীড করে আর অন্য জার্নাল কন্সাল্ট করে ও বলে গেছিল ওটা এই দেশেই কোথাও আছে। না ক্লাইভ সেটার সন্ধান পেয়েছেন, না অন্য কেউ সেটাকে ইংল্যান্ড নিয়ে গেছেন। জিনিস টা সিরাজের দাদু আলিবর্দির মামাত ভাই সিরাজ কে দিয়েছিলেন, আর সিরাজ কিন্তু ওটাকে বাদ্য যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন না! নিজে খুব ধর্ম ভীরু ছিলেন তো, তাই কোরানের জিস্ট টা সব সময়ে নিজের কাছে রাখতেন, আর সেটাই খোদাই করে লেখা ছিল সেই ক্লারিওনেটে। ধরা পড়া যখন অবশ্যম্ভাবী, সিরাজ সেটা বন্ধু কাশিম কে দিয়ে দেন। কাশিম ধরা দেন নি, প্রথমটায় পালিয়ে ঢাকা চলে যান, তারপর প্রায় ছয়-সাত বছর বাদে মুর্শিদাবাদে আসেন। ততদিনে অবশ্য সিরাজের স্ত্রী মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন এবং খুশবাগে পাকাপাকি ভাবে থাকা শুরু করেছেন। যাই হোক, মুর্শিদাবাদে ফিরে কোন এক অজ্ঞাত জায়গায় সেই ক্লারিওনেট টিকেও তিনি সমাধিস্থ করেন। বারো ভুঁইয়ার এক বংশধর ছিলেন রাজা কৃষ্ণ রায়, তিনি ছিলেন আবার সিরাজের ছোটবেলার বন্ধু, তাঁর রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ ঘেঁটে আমরা আর একটি সূত্র পাই। সেটিকে ধরে তারপর এগারো বছর আমি তন্নতন্ন করে সারা মুর্শিদাবাদ খুঁজে বেরিয়েছি, শেষে ২০১৩ সালে জুলাই মাসে সাগরদীঘিতে এক পুরনো সমাধি ক্ষেত্রে এটি কে আমরা খুঁজে পাই। আর তারপর থেকে আমি তোমাকে খুঁজছি।”

একটা ছোট চামড়ার ব্যাগ টেবিলের ওপর রাখা, সেটিকে ইঙ্গিত করে আমাকে খুলতে বললেন। খাঁটি নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি আড়াইশো – তিনশ বছরের পুরনো ঝকঝকে একটা ক্লারিওনেট। যার গায়ের খোদাই করা আরবিয় হরফ গুলো এক অপূর্ব কারুকার্যের নিদর্শন! সোনার কত ওজন আমি জানি না, তবে শুধু হিসটোরিক ভ্যালুতেই এটা হয়তো কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

“আমি চাই, তুমি এটিকে নিয়ে যাও, কিন্তু আমি এটাও চাইব তুমি এটাকে মিউজিয়ামে দাও। এটা একটা ন্যাশানাল প্রপার্টি, এটার মিউজিয়ামে থাকা উচিত”।

“কিন্তু এটা তো আপনি ও দিয়ে আসতে পারতেন। এটার জন্য আমাকে ডাকলেন কেন?”

“দুটো কারণে! এক, আড়াইশো বছর বাদে সিরাজউদ্দৌলার ক্লারিওনেট আমরা খুঁজে পেয়েছি আর সেটা পাওয়া গেছে বিকজ অফ তোমার বাবা। তুমি বিশ্বনাথের ছেলে। তোমার বাবা এখন আর নেই, আমি চাইব এটা তোমার হাতে তুলে দিতে। তারপর সেটা কে তুমি কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার। দুই, এসব করে যদি একটু পুণ্য অর্জন করা যায়! যাতে করে এবারে মুক্তি মেলে। আর ভালো লাগে না, এই বন্দী দশার কবে শেষ হবে!”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর আমি বললাম, “বন্দী দশা কেন? আপনি তো ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে পারেন। আর আপনার পাসপোর্ট, ভিসার সমস্যা থাকা তো উচিত নয়”

“না! আমার সমস্যা অন্য জায়গায়, আর ফিরে যাদের দেখব তারা তো আমায় চেনেই না, জানেও না! এই দেশ টা আমার অনেক বেশি ভালো লাগে। সিক্সটি নাইন ইয়ারস কাটালাম!”

চট করে হিসেব করে নিলাম, তার মানে ইনি আমাদের স্বাধীনতার-ও আগে থেকে এখানে আছেন। কিছু বলার আগে হার্ডিঞ্জ সাহেব আবার বললেন, “আচ্ছা শোন, আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে”

“নিশ্চয়ই, বলুন”

“তুমি যদি এটা কে মিউজিয়ামে দাও, আমার নাম বা ঠিকানা টা বোল না, আমি চাই না মিউজিয়ামের লোক এখানে এসে জায়গা টাকে তছনছ করে!”

মুখে কিছু বললাম না, তবে একটু অদ্ভুত লাগল, এত বড় হিসটোরিয়ান, ওনার বাড়ি টাই তো একটা মিউজিয়াম! এতো বই, জার্নাল – এতো অ্যান্টিক ভ্যালু! কত গবেষণা তে সাহায্য করবে! সে গুলোও তো ন্যাশানাল প্রপার্টি! সেটা তছনছ হয়ে যাবে কেন?

তাও জিজ্ঞেস করলাম “কিন্তু আমাকে তো একটা কিছু বলতে হবে! না হলে ওরা জিনিস টা অ্যাক্সেপ্ট করবে কেন?”

“মুর্শিদাবাদে অনেক পুরনো বাড়ি আছে – সে সব বাড়ি খুঁড়লে আরো কত কি পাওয়া যাবে জানো? বলবে সাগরদীঘির রাজা কৃষ্ণরায়ের পুরনো জমিদার বাড়ি ভেঙ্গে নতুন ফ্ল্যাট হবে। ডেবরিস থেকে উদ্ধার হয়েছে! প্রমোটার তোমার বন্ধু, আর কিছু বলতে হবে না! বিশ্বনাথের জন্য মিউজিয়ামে একটা গ্যালারী রিসার্ভ হয়ে যাবে!”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর, হার্ডিঞ্জ সাহেব আবার বললেন, “না এবারে আমি উঠি, আমি একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ি, ডিনার তো নয়, আমরা বলি সাপ্পার! তুমি ডিনার করে শুয়ে পোড়। কাল সকাল ছটায় একটা বাস আসে, মালবাজার যাওয়ার – তুমি সেটাতেই বেরিয়ে যেও। নয়ত পরেরটা অনেক দেরী হবে। সকালে দেখা হবে কিনা জানি না, আসলে রিজওয়ান আমাকে নিয়ে একটু বেরোয়। সকালে একটু না বেরোলে আমার সারা দিন বেরোনো হয় না। যদি আমাদের না পাও তুমি তোমার মতো বেরিয়ে যেও, ঐ টেবিলের ওপর তালা চাবি রাখা থাকে, তালা টা লাগিয়ে চাবিটা লেটার বক্সে ফেলে রেখে যেও। এখানে আমাকে সবাই চেনে – এ বাড়িতে কিছু হবে না! আর এখানে কিছু হয় না! যা হোক, যদি আর দেখা না হয়, খুব ভালো থেকো। আর তোমাকে অনেক থ্যাংকস এখানে আসার জন্য,”

“আপনার কোন ফোন নম্বর আছে? তাহলে মিউজিয়ামের কাজ টা হয়ে গেলে আপনাকে একটু জানিয়ে দিতাম!”

“মোবাইল নেই, ল্যান্ড লাইন আছে! তবে মাঝে মাঝে-ই লাইন ডাউন থাকে। নিয়ে নিও রিজওয়ানের কাছ থেকে, জানিও আমাকে। ভালো লাগবে!”

“আমার একটা কার্ড রেখে গেলাম, যদি কখনো দরকার হয় আমাকে ফোন করবেন।“

“ঠিক আছে তুমি রেখে যাও। আর ভালো করে ডিনার কোরো। আমার আবার রাত জাগা বারণ! নয়ত তোমার ডিনারে থাকতে পারতাম! গুড নাইট!”

রিজওয়ান হার্ডিঞ্জ সাহেবকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল। বাইরে বৃষ্টিটা একটু কমেছে, এখনো খানিকটা ঘোরের মধ্যে রয়েছি। রিজওয়ান ফিরলে ওর কাছে একটা অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। বর্ষার সময় ব্যালকনি নাকি নিরাপদ নয়, অগত্যা ঘরের মধ্যেই ধরাতে হল – শেষ এক ঘণ্টার প্রায় সব কথা গুলো ফ্ল্যাশব্যাকে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল! বাবাকে বেশী মনে নেই, তাও বাবার কথা মনে পড়ছিল। জানি না, কতক্ষণ হবে, বেশ ঘণ্টা খানেক বা তার বেশি হবে, রিজওয়ানের গলার শব্দে ঘোর ভাঙল – “বাবু, ডিনার রেডি হয়ে গেছে, চলে আসুন!”

ঘড়িতে দেখলাম, নটা পনের, ডিনারের সময় হয়ে গেছে – ডিনারের আয়োজন ও খুব সুসজ্জিত। ভাত, রুটি আবার ইংলিশ ব্রেডের আয়োজন, বেকড পট্যাটো, রোস্টেড চিকেন, মিক্সড ভেজিটেবল – সেটাও খুব কম তেলে বানানো, শেষে ক্যারামেল পুডিং, খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা নেই। বই-এ পড়েছি, ব্রিটিশরা খাবার পরিবেশন করে না, অতিথির ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দেয়। সব খাবার টেবিলে সাজানো রয়েছে। রিজওয়ান সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তবে আমার কিছু লাগে নি, সব ব্যবস্থা টেবিলে ছিল। ডিনারের পর সে রকম উল্লেখ জনক কিছু হয়নি। রাতে শোবার ব্যবস্থা-ও খুব ভাল ছিল। মাঝরাতে আর এক বার বৃষ্টি এসেছিল, তবে সন্ধ্যের মতো অত জোরে নয়। তবে সারা রাত কারেন্ট ছিল না!

পরদিন সকালে ভোর ছটার বাস ধরে মাল বাজারে পৌঁছলাম, তার পর আর একটা বাসে শিলিগুড়ি। সকালে উঠতে কোন অসুবিধা হয়নি, মোবাইলের অ্যালার্ম ঠিকঠাক কাজ করল! সকালে উঠে রেডি হতে সময়-ও লাগেনি। খালি আসার আগে এক বার স্টাডি তে আসার ইচ্ছে ছিল, সেটা হল না! রিজওয়ান বা হার্ডিঞ্জ সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়নি। কথামতো চাবি টা লেটার বক্সে রেখে এলাম, লেটার বক্স টা অবশ্য খোলা-ই ছিল। আমার সঙ্গে একটা ছোট লাগেজ, সঙ্গে ক্লারিওনেটের ব্যাগ টা আমার হাতে রেখেছিলাম। কল্লোলের বাড়ি গেলাম কিন্তু সিকিম ঘোরার প্ল্যান টা ড্রপ করলাম, সঙ্গে এক মহা মূল্যবান জিনিস, সেটা কে মিউজিয়ামে না দেওয়া অবধি মনে শান্তি আসছিল না!

তারপর প্ল্যান মতো কাজ, জিনিস টা মিউজিয়ামে দিলাম, সরকারী জায়গা – প্রচুর ফর্মালিটি, প্রিয় তিরিশ খানা ফর্ম ভরতে হল, কার কাছ থেকে পেলাম, কি করে পেলাম, কেন এখানে ডোনেট করছি ইত্যাদি হাজার প্রশ্ন। অবশ্য ইনভেস্টিগেশন নয়, খালি ইনফরমেশন। একটা নাম চাইতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথবাবুর নাম টা দিয়ে দিলাম, কারণ হার্ডিঞ্জ সাহেবের নাম টা দেওয়া বারণ ছিল। জিনিস টার সত্যতা প্রমাণিত হলে আমার বাবা বিশ্বনাথ মুখার্জি এবং আমার নাম লেখা হবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। যাই হোক, পুরো ব্যাপার টা মিটতে প্রায় সাত দিন লাগল। দু-তিন বার চেষ্টা করেছিলাম হার্ডিঞ্জ সাহেবকে ধরার, তবে লাইন পাইনি। শেষে একটা চিঠি লিখলাম, ভাবলাম আগেকার দিনের লোক বেশ হবে, দেখে খুব খুশী হবেন।

আমার নাম সুশোভন মুখার্জি, উচ্চতা পাঁচ ফুট সাড়ে দশ ইঞ্চি, কলকাতায় একটা সরকারী অফিসে চাকরি করি, বাগবাজারে বাড়ি, বাবার নাম স্বর্গীয় বিশ্বনাথ মুখার্জি, সজ্ঞানে আমি এবারে যেটা লিখতে চলেছি কোন পাঠক কে বিশ্বাস করানোর জন্য লিখছি না। এটা আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা – যেটার কথা মনে পড়লে এখনো আমাকে রাত জেগে কাটাতে হয়।

মিউজিয়ামে ক্লারিওনেট জমা দেবার এগারো দিন বাদে আমার পাঠানো হার্ডিঞ্জ সাহেবকে লেখা চিঠি টা ফেরত এল – আনডেলিভারড হয়ে। সাধারণত এই রকমের রিটার্ন চিঠি তে কিছু লেখা থাকে না, তবে আমার চিঠির ওপর নীল কালিতে লেখা ছিল “নো পিক আপ!” অসম্পূর্ণ ইংরাজি, তবে মানে টা বোঝা গেল! একটু চিন্তা হল, আসলে পঁচানব্বই বছর বয়স দেখে এসেছি তো! দু-চার দিন ধরে ফোনে চেষ্টা করে-ও, ওনার লাইন পেলাম না। মনে পড়ল জ্যোতিরিন্দ্রনাথবাবুর কথা! কিন্তু ওনার ফোন নাম্বার টাও সেভ করা হয়নি। ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম থেকে সিল মারা ধন্যবাদজ্ঞাপক চিঠি এসে গেছে আমার বাড়িতে। একটা গ্যালারী নাকি রিসার্ভ হবে, ডিসপ্লে করার জন্য। সেটা তৈরি হলে নাকি কলকাতা শহরের মেয়র এসে সেটার উদ্বোধন করবেন, সেখানে আমাকে নাকি স্পেশাল গেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর নিজের নিকট কিছু আত্মীয় আর বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাপার টা নিয়ে আলোচনা করতে করতে হার্ডিঞ্জ সাহেবের কথা আমি খানিক টা ভুলে-ই গেছিলাম।

প্রায় মাস খানেক কেটে গেল, ব্যাপার টা খানিক টা ভুলেই গেছি, এই রকম সময়ে একদিন রবিবার, সকাল সাড়ে দশটা, আমার ব্রেকফাস্ট শেষ, সকালের খবরের কাগজটা ওলটাচ্ছি, এরকম সময়ে আমার কাছে একটা ফোন এলো। অজানা নম্বর, ফোন যিনি করছেন তাঁর নাম – সুমিত সরকার, জলপাইগুড়িতে মালবাজারে একটা রেস্টুরেন্ট চালান, নিজের পরিচয়জ্ঞাপক একটা, দুটো কথার পর-ই বললেন – “আচ্ছা আপনি কি সুশোভন মুখার্জি?”

“হ্যাঁ”

“আচ্ছা, কোন কারণে মাস খানেক আগে কি আপনি সামসিং-এ এসেছিলেন?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন! ওখানে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক - এডমন্ড হার্ডিঞ্জ তাঁর বাড়িতে গেছিলাম। কিন্তু কেন বলুন তো?”

“আমি ও সেই বাড়ি তে এসেছিলাম! তারপর সেখানে আপনার নামের একটা কার্ড দেখলাম, সেটাতে নাম্বার লেখা ছিল, সেই দেখে ফোন করছি!”

“কি ব্যাপার বলুন তো?”

“না আমি ওখান থেকে একটা খাবারের অর্ডার পেয়েছিলাম লাস্ট মাসে! অ্যাডভান্স পেমেন্ট পেয়েছিলাম। আসলে ব্যালেন্স টা ফেরত দেবার ছিল, বেশি টাকা আমি নেব কেন? অনেক বার ফোনে ট্রাই করেছি, কিন্তু ফোন লাগেনি। কাল প্রায় এক মাস বাদে ওনার বাড়িতে এসেছিলাম ব্যালেন্সটা ফেরত দেবার জন্য! তা বাড়িতে কাউকে পেলাম না! দেখি দরজা বন্ধ, ডাকাডাকি করেও কাউকে পেলাম না! তারপর বাইরের লেটার বক্সে একটা চাবি ঝুলছিল, সেটা দিয়ে দেখি দরজা খুলে গেল! কারণ টাকাটা আমি বাইরে রেখে আসতে পারি না! আমাকে বাড়ি তে ঢুকতে –ই হবে। তা বাড়ি তে ঢুকে আপনার কার্ডটা দেখলাম, সেটা রাখা ছিল একটা টেবিলের ওপর, তারপর সেটা দেখে আপনাকে ফোন করছি। আচ্ছা, আপনি এই এডমন্ড হার্ডিঞ্জ কে কতদিন চেনেন?”

“আমি চিনি না! আসলে উনি আমাকে ইনভাইট করেছিলেন একরাতের জন্য আসতে”

“সাহেব নিজে এসেছিলেন ইনভাইট করতে?”

“না পাঠিয়েছিলেন একজন কে! তা সাহেবের কিছু ইনফরমেশন দেওয়ার ছিল, আর আমার –ও আসার সে রকম প্রবলেম ছিল না! আসলে উনি আমার বাবার পরিচিত ছিলেন। উনি নিজে হিসটোরিয়ান, বাবা-ও হিসটোরিয়ান ছিলেন! মানে আমি আগে ওনাকে কখনো দেখিনি, জানতামও না! আচ্ছা, ব্যাপার টা একটু খুলে বললে বোধহয় আমার বুঝতে সুবিধা হতো!”

“মানে, পুরো ব্যাপার টা কেমন যেন! আমাকে খাবারের অর্ডার দিলেন, সেও লোক মারফত খবর পাঠিয়ে, তার ওপর টাকাটা অ্যাডভানসে দিয়ে দিলেন, তারপর আজ বাড়িতে এসে দেখি দরজা বন্ধ! আমাকে তো এক প্রকার বিনা অনুমতিতে বাড়ি তে ঢুকতে হল।”

“তারপর?”

“তারপর আর কি, আমি টাকাটা টেবিলের ওপর রেখে এলাম, চাবি দিয়ে দরজা বন্ধ করে আবার চাবিটা লেটার বক্সে দিয়ে রেখে দিলাম! কিন্তু এরকম কখনো হয়নি আগে! তার ওপর এ রকম স্পেশাল মেন্যু, সঙ্গে সারভিং সেট ,আমি তো আশা করেছিলাম আমাকে অ্যাটলিস্ট একটা থ্যাংকস দেবেন!”

“স্পেশাল মানে?”

“হ্যাঁ, কন্টিনেন্টাল! আমাদের এই মালবাজারে কে বানাবে কন্টিনেন্টাল খাবার?”

আপনার গলার ভেতরে যেন কি আটকালো! না চাইতেও প্রশ্ন টা করে ফেললাম, “কি মেন্যু ছিল?”

“ওভেন বেকড কেক, বেকড পট্যাটো, ক্যারামেল পুডিং, রোস্টেড চিকেন,”

আমার সারা শরীর টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল, এতো আমার খাবার মেন্যু! মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আবার প্রশ্ন করলাম – “অর্ডার টা কবে কার ছিল?”

“বাইশ তারিখ, বাইশে জুলাই”

এবারে মাথা টা ঘুরে গেল! আর কোন সন্দেহ নেই, এই বাইশ তারিখের রাতেই তো হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাড়ীতে আমার নিমন্ত্রণ ছিল! তাহলে সেদিনের ডিনার রিজওয়ানের বানানো নয়, রেস্টুরেন্ট থেকে আনানো! আর এও মনে পড়ল – সব খাবার কিন্তু ফয়েলে ঢাকা ছিল, ঠিক যে রকম রেস্টুরেন্টের খাবারে থাকে! কিন্তু হলেই বা, তাতে অসুবিধা কি আছে? আমি তো আর জিজ্ঞেস করিনি! ঘোর ভাঙল সুমিত বাবুর কণ্ঠস্বরে, “আপনার আবার এদিকে আসার প্ল্যান আছে?”

“না, সে রকম তো কিছু নেই”

“ঠিক আছে, যদি আসেন তাহলে একটু দেখবেন তো! আর আমাকে জানাবেন যদি কোন খবর পান, এই রকম ব্যাপার আগে কখনো হয়নি তো! আমি ও দেখছি, কিছু জানলে জানাবো”

ফোন নাম্বার টা লিখে নিতে এবারে ভুলি নি! মনটা কেমন যেন মিশ্র অনুভূতি তে ভরে ছিল। অনেক গুলো প্রশ্ন-ও আসছিল যেগুলোর উত্তর জানা ছিল না। খানিক টা ভাবার পর দুটো জিনিস মাথায় এল, আর সেই মত কাজ।

এক, কল্লোল কে ফোন করে পুরো ব্যাপার টা বললাম, ক্লারিওনেটের কথাটা ছাড়া বাকি টা পুরোটাই বললাম। কলকাতার অফিসে এসে নিমন্ত্রণ, তারপর ওনার বাড়ি তে ওনার সাথে গল্প, রিজওয়ান, ডিনার, রাতে থাকা – সব টা। তারপর আজকের ফোনের কথা! ট্র্যাভেল কোম্পানি চালানোর সুবাদে কল্লোলের বেশির ভাগ নর্থ বেঙ্গল টাই জানা, কাজেই ওর পক্ষে খবর নেওয়া টা অনেক সহজ হবে। তাছাড়া সামসিং-এর রাস্তাটাই ভুটান যাচ্ছে, সে রাস্তা দিয়ে ওকে প্রায়-ই যেতে হয় টুরিস্ট নিয়ে। আমি হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোর লোকেশন টাও বলে দিলাম। কল্লোল বলল, দু-চার দিনের মধ্যে আমাকে জানাবে।

আর দুই, আমার বাবার এক বিশেষ পরিচিত যার সাথে আমার স্বল্প হলেও একটু যোগাযোগ ছিল, তিনি হলেন – ডঃ দিবাকর সেন, দিল্লীতে ছিলেন বহুদিন, ইন্ডিয়ান আরকিওলজিকাল বিভাগে কাজ করতেন। ওনাকে ফোন করলাম, উনিও ঐতিহাসিক, সুতরাং এডমন্ড হার্ডিঞ্জকে হয়ত জেনে থাকবেন! মায়ের কাছে শুনেছিলাম – ডঃ সেন একদম বেশি কথা বলেন না! ঠিক যতটুকু দরকার! ডঃ সেনের কাছ থেকে আমি কিন্তু সে রকম কিছু জানতে পারলাম না। ইতিহাসের ব্রিটিশ পিরিয়ড ওনার সাবজেক্ট নয়, সুতরাং সেই সময়ে ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে এঁর তেমন যোগাযোগ বা জানাশোনা কোনটাই নেই। তবে আমাকে আশ্বস্ত করলেন কিছু জানলেই আমাকে জানাবেন!

আরো দুটো মাস কেটে গেল, কল্লোল কে আর ফোন করা হয়নি, আর কোন খবর – ও পাইনি হার্ডিঞ্জ সাহেবের ব্যাপারে। ইতিমধ্যে মিউজিয়ামে আমার পৌঁছে দেওয়া ক্লারিওনেটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। মিউজিয়ামের ষাণ্মাসিক যে পত্রিকা বেরোয় সেখানে-ও আমার নাম বার হবে শুনলাম। এর মাঝে একদিন কল্লোলের ফোন এলো – “সুশোভন তুই একবার নর্থ বেঙ্গল আসতে পারবি? আসলে কিছু খবর নিতে পারিনি। আর আমি-ও খুব বিজি ছিলাম, তুই আয়, তাহলে বরং এক দিন আমরা দুজনে সাহেবের বাড়ি যাব। তোর-ও আর একবার দেখা হবে, আর এবারে পেলিং টা ঘুরে যা।“

প্রস্তাব টা আমার খারাপ লাগলো না, সত্যি বলতে গত দুমাসে এই মিউজিয়াম জনিত আমার যা যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেগুলো হার্ডিঞ্জ সাহেবকে বলতে –ও খুব ইচ্ছে করছিল। আর এই দু-তিন মাসে ওনার কথা মনেও পড়েছে বহুবার! তাছাড়া সামনে পুজো, অফিসে ছুটির-ও কোন ঝামেলা নেই! আমি –ও হ্যাঁ করে দিলাম! তবে এবারে আর ট্রেনে নয়, এসপ্ল্যানেড থেকে রকেট বাস, একেবারে সোজা শিলিগুড়ি! কলকাতা ছাড়ার আগে সুমিত বাবুকে ফোন করে আমার প্ল্যান টা জানিয়ে রাখলাম। উনি ও বললেন কোন খবর পেলে আমাকে কনট্যাক্ট করবেন!

কল্লোলের কাছে এক রাত থেকে আমরা পরদিন সকালে বেরোলাম সামসিং-এর রাস্তায় হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোর উদ্দেশ্যে! এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট লাগলো পৌঁছতে। সব কিছু ই আগের মতো, সেই ছোট একটা বেকারির দোকান পেরিয়ে, ইলেক্ট্রিসিটির অফিস বাড়ির পাশে এক টা বেশ বড় ফাঁকা জমি, তারপর পোড়া মাটির রঙের বাড়ি। আগের বার শেষ বিকেলে এসেছিলাম, তার ওপর বৃষ্টি –ও হচ্ছিল খুব, ভালো করে দেখা হয়নি। এবারে দেখলাম, কোন সন্দেহ নেই হার্ডিঞ্জ সাহেব কিন্তু খুব শৌখিন! ছোট গেট ঠেলে আমরা ঢুকলাম – সেই আগের মত! আগের বারে রিজওয়ান কে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম এবারে কাউকে দেখলাম না। জানি না হয়ত, হার্ডিঞ্জ সাহেব কে নিয়ে রিজওয়ান এখনো ফেরে নি। বাড়ির দরজা বন্ধ, সুতরাং অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন উপায় নেই।

প্রায় দু ঘণ্টা গেটে অপেক্ষা করার পর যখন কারুর দেখা না পেয়ে খানিক টা হতাশ হয়ে আমি আর কল্লোল চলে আসছি, ঠিক সে সময়ে এক বয়স্ক মানুষকে দেখলাম। গেটের বাইরে দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন,

“আপনারা কি কাউকে খুঁজছেন? আমি সামনেই থাকি, আপনাদের দেখলাম এখানে ঘোরাঘুরি করতে, তাই জানতে এলাম। এই বাড়ীতে তো কাউকে দেখি না!”

“এখানে একজন সাহেব থাকতেন, তাঁর সাথে একটু দেখা করার ছিল!”

“আমার এখানে বেশি দিন হয়নি! তবে এই বাড়ি তো গত দু-বছরের বেশি বন্ধ হয়ে আছে, তার আগের কথা তো বলতে পারব না! তবে এক কাজ করুন, দেখুন দেখি এই অঞ্চলে সাধারণত বাংলো গুলোতে লেটার বক্সে বাড়ির চাবি রাখা থাকে! আছে চাবি?”

অগত্যা টাকা ফেরত দিতে এসে সুমিত বাবু যা করে ছিলেন আমাদের –ও তাই করতে হল। লেটার বক্স থেকে চাবি নিয়ে, দরজা খুলে বাড়ি তে ঢুকলাম! সঙ্গে স্থানীয় ভদ্রলোকটিকে ও নিয়ে নিলাম, পাছে কোন ঝামেলা তে পড়ি! তবে উনি অবশ্য বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন না, আমাদের আশ্বস্ত করলেন, যে এই পাহাড়ি অঞ্চলে এটা প্রায়-ই হয়! কেউ এলে চাবি নিয়ে ভেতরে ঢুকে একটু বসে! বাড়ীতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে এটা বেশ বুঝতে পারলাম, যে এখানে কেউ নেই, বাড়ি খালি! ড্রয়িংরুম কাম স্টাডি তে ঢুকে প্রতি টা জিনিস কে আমি যে রকম দেখে গেছি, একেবারে সে গুলো সেই জায়গায় রাখা! মনে হচ্ছে না, মাঝে তিন মাস কেটে গেছে! কয়েকটা জিনিস দেখে খুব অবাক লাগলো - আমি জল খেতে খেতে গ্লাসটা নিয়ে বুক সেলফের পাশে গেছিলাম, তারপর গ্লাসটা রেখেছিলাম সেলফের পাশে একটা নিচু টেবিলে! সেটা সেখানেই রাখা! আমি জেমস মিলের একটা বই উলটিয়ে পালটিয়ে দেখছিলাম, তখন রিজওয়ান এসে আমাকে ডাকে আর আমি বইটা উলটে রেখে চলে আসি। সেটা এখনো ঠিক সে ভাবে পড়ে আছে! আরো আছে, সে দিন রাতে আমি এই ঘরে বসে দুটো সিগারেট খেয়েছিলাম তার শেষাংশ গুলোও এক ভাবে পড়ে আছে! তার চেয়েও একটা আশ্চর্যের ব্যাপার আছে! টেবিলের ওপর সুমিতবাবুর রেখে যাওয়া টাকা গুলো এখনো পড়ে আছে! সে গুলো কেউ তুলেও রাখেনি! ডাইনিং রুমে গেলাম যে টেবিলে বসে আমি খেয়েছি – সেটা কিন্তু সুন্দর করে সাজানো! যে ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম, সেই ঘরটাতে কোন পরিবর্তন নেই, বেডসীটটা এক-ই আছে! হার্ডিঞ্জ সাহেবের বেড রুমে আমি গেলাম না, কারুর অনুমতি ছাড়া বেড রুমে যাওয়া ঠিক নয়! হটাত কল্লোলের গলা শুনলাম – “সুশোভন, আমার মনে হয়না এই বাড়ি তে কেউ থাকে বলে!”

“মানে?”

“তুই বাথরুম আর কিচেন টা গিয়ে দেখ, নিজেই বুঝতে পারবি! ইলেক্ট্রিসিটি নেই, ফোন নেই, রান্নার কোন ব্যবস্থা নেই। মানুষ থাকতে পারে নাকি এখানে?”

কল্লোল কে মাঝপথে থামিয়ে আমি বললাম, “না ফোন বলছিলেন লাইন ডাউন আছে!”

“বাজে বকিস না! ফোনের কানেকশন-ই নেই, দ্যাখ” সত্যি ফোনের পেছনে কোন তার নেই, আর ফোন দেখে-ও মনে হবে না এটা গত এক বছরে ব্যবহার হয়েছে!

কল্লোল আবার বলল – “তুই বলেছিলি না সাহেব কে নিয়ে হুইল চেয়ারে করে রোজ বেরোয়! বেড রুমে গিয়ে দেখ, হুইল চেয়ার-টা এখানে পড়ে আছে! সাহেব তোকে খুব ধোঁকা দিয়েছে!”

ইচ্ছার বিরুদ্ধে হার্ডিঞ্জ সাহেবের বেড রুমে ঢুকলাম, সত্যি কাঠের হাতল ওয়ালা হুইল চেয়ার টা পড়ে আছে! কল্লোলের কথা মতো বাথরুম, কিচেন দেখলাম – কল্লোল কিছু ভুল বলেনি! যে বাথরুম টা আমি ব্যবহার করেছিলাম, সেটাতে রিজওয়ান এসে একটা বাতি দিয়ে গেছিল, সেটাও আগের মতো এক-ই জায়গাতে আছে। কিন্তু আর বাথরুম গুলো দেখলেই বোঝা যায় অনেক দিন কোন ব্যবহার হয়নি।

তার মানে কি হার্ডিঞ্জ সাহেব রিজওয়ান কে নিয়ে কোথাও চলে গেছেন? তাহলে এতো অসংলগ্নতা কেন? বাইশে জুলাই এই বাড়ীতে আমি এসেছি, কিন্তু ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হচ্ছে – এখানে কেউ থাকে না! আসলে হার্ডিঞ্জ সাহেবকে সত্যি আমার ভালো লেগেছিল, এতো সহজে আমি হার মানতে চাইছিলাম না! আমাকে এত বড় একটা জিনিস দিয়ে গেছেন, এই ‘ধোঁকা’ ব্যাপার টা ওনার সঙ্গে ঠিক করে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না! মাথা কাজ করছে না, কল্লোলের কাছ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালাম, ভাবছি কি করা যায়। সিগারেট খেতে বাড়ির বাইরে আসতেই হলো, আমাদের সঙ্গের স্থানীয় যে ভদ্রলোক যাকে নিয়ে আমরা হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলো তে ঢুকে ছিলাম, তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, জিজ্ঞেস করলেন –

“আপনাদের কাজ হলো?”

“না! আচ্ছা আপনি সাহেব কে দেখেছেন এর মধ্যে?”

“আপনারা বরং আমার সাথে আসুন, এখানে আরো কিছু মানুষ আছেন যারা অনেক দিন ধরে রয়েছেন, হয়তো তাঁরা বলতে পারবেন”

ইলেক্ট্রিসিটির অফিস বাড়ির কাছে আমাদের সঙ্গে তিন-চার জনের সাক্ষাত হল, যারা এই কাছে পিঠেই থাকেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম সাহেবের এই বাংলো বাড়ি অনেক দিনের পুরোনো, এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস না করলেও তাঁর নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল! তবে প্রায় দু-তিন বছর হয়ে গেল তাঁকে আর আসতে দেখা যায়নি! সুতরাং আমাদের অনুমান কিছু ভুল নয়, হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলো খালি পড়ে আছে। খানিক-টা বোকা হয়ে যাবার ভয় আবার খানিকটা মানসিক ধাক্কা জনিত কারণে আমি বলতে পারলাম না – যে আমি নিজে তিন মাস আগে বাইশে জুলাই রাত টা এখানে কাটিয়ে গেছি। কল্লোল আমার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পেরে হয়ত চুপ করে ছিল।

পেলিং, ইয়ামথাম – ঘুরে আমার শিলিগুড়ি ফিরতে আরো পাঁচ দিন লাগলো, কিন্ত আমার মন অশান্ত হয়ে ছিল। ফেরার সময় এবারে আর কল্লোলের বাড়ি গেলাম না, মালবাজারে নেমে পড়লাম। কল্লোল আমাকে একটা হোটেল বলে দিল সেখানে কয়েক ঘণ্টা থেকে একটু ফ্রেস হয়ে বিকেল বেলা কলকাতা ফেরার বাস ধরব। কল্লোল চলে যাবার মিনিট দশেকের মধ্যে-ই একটা ফোন এলো, সুমিত সরকারের।

“আপনি এখন কোথায়?”

“এই তো আজ সকালে নামলাম, এখন মালবাজারে! কলকাতা ফিরব। আজ বিকেলে!”

“আরে! আপনি মালবাজারে? মানে আমাদের পাড়ায়! আজ বিকেলে ফেরা টা, কাল সকালে করুন। আপনার সঙ্গে একজনের পরিচয় করাবো।”

“কার সাথে?”

“দেখবেন! থাক না এখন সারপ্রাইজ! কোথায় উঠেছেন?”

হোটেলের নাম বলতেই বুঝে গেলেন, বললেন দশ মিনিটে পৌঁছবেন। এগারোটার আগেই সুমিত বাবু এসে গেলেন। সুমিত বাবু কে আগে দেখিনি, ছোটো খাটো চেহারা, বেশ দ্রুত গতিতে চলাফেরা করেন। ওনার পেছনে পেছনে যে মানুষটি ঘরে আমার ঢুকলেন – তাঁকে আমি একেবারেই আশা করিনি! ইনি তিন মাস আগে কলকাতায় আমার পূর্ত ভবনের অফিসে এসেছিলেন হার্ডিঞ্জ সাহেবের নিমন্ত্রণ নিয়ে – সেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী। আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি ওনার দিকে, আর ভদ্রলোক কেমন যেন অপরাধী গোছের মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন।

সুমিত বাবু ঘরে ঢুকে আমার চেয়ার টাতে বসলেন, “দেখুন বেশি সময় নষ্ট করব না! সব বুড়ো সাহেবের সব কিছু প্ল্যান করা, এই যে প্রশান্তবাবু আসুন, বসুন। আর লজ্জা পেয়ে কিছু হবে না! আরে আমরা একটা মিসট্রী সলভ করার চেষ্টায় ছিলাম, আপনি ছাড়া সেটা হয় কি করে?”

আমার কনফিউশন গুলো আরো বেড়ে যাচ্ছিলো, প্রশ্ন করে ফেললাম “আপনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী নন?”

সুমিতবাবু উত্তর দিলেন, “না না, ইনি শুকনার কাছে কোন একটা সরকারী হাসপাতালে চাকরি করতেন, এখন রিটায়ার্ড! নাম প্রশান্ত বসু। সাহেব একে লাগিয়েছিল সব অ্যাক্টিং করার জন্য! ঘর সাফ করার জন্য, খাবার আনার জন্য! কি হল আপনি বলুন না পুরো ব্যাপার টা!”

ভদ্রলোক কে দেখে আমার খারাপ লাগলো, পুরো ব্যাপার টা না বুঝলেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিলাম। আমি বললাম “দেখুন আপনি প্লিজ পুরোটা বলুন, আপনার কোন ভয় নেই। আমরা পুলিশে যাবো না!”

মিনিট দশেকের মধ্যে প্রশান্ত বাবু খানিক টা সহজ হতে পারলেন, পুরো ব্যাপারটা বলতে আধ ঘণ্টা লাগল। প্রথমত আমার অনুমান একেবারে সঠিক! জলঢাকার উৎস স্থান রকি আইল্যান্ডের কাছে সামসিং জেলার এডমন্ড হার্ডিঞ্জের বাড়ি শেষ দু-তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে! সে বাড়ির তালাবন্ধ থাকে, তবে ঢোকার চাবি টা বাগানের সংলগ্ন লেটার বক্সে রাখা থাকে! বাড়ীতে প্রচুর ভালো বই আর পুরনো কিছু আসবাব! প্রশান্ত বসু শুকনা তে হাসপাতালে চাকরি করতেন, রিটায়ার করে এখন সোনাদার কাছে থাকেন। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান কাজের সন্ধানে। রিজওয়ানের সাথে তাঁর মাস পাঁচেক আগে পরিচয় হয়, তারপর কাজের সূত্রে হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাংলোতে এসে পৌঁছন। সেখানে হার্ডিঞ্জ সাহেব তাঁকে পুরো প্ল্যান টা বলে দেন, সেটা শুরু হয় - প্রথমে জ্যোতিরিন্দ্রনাথবাবু সেজে আমাকে ইনভাইট করা দিয়ে, তার পর সুমিত বাবু কে খাবারের অর্ডার দেওয়া আর অ্যাডভান্স পৌঁছে দেওয়া, বাইশ জুলাই তারিখ রাতে হার্ডিঞ্জ সাহেবের বাড়ীতে আমার থাকার ব্যবস্থা করা, বাথরুমে জল ভরা, ডিনারের আগে সমস্ত ডাইনিং টেবিল সাজানো, পরদিন এসে আমার খাওয়া প্লেট পরিষ্কার করা এবং সুমিত বাবুর সব সারভিং সেট আবার ফেরত নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ঘরের অন্য যা জিনিস ছিল সে গুলো তে তাঁকে হাত লাগাতে হয়নি নি, কেননা তাঁকে বলা হয় নি। আর এই পুরো কাজটা করার জন্য হার্ডিঞ্জ সাহেব তাঁকে দশ হাজার টাকা দিয়েছেন! মালবাজারে চলতি বাসে তাঁকে আজ সকালে দেখতে পান সুমিত বাবু আর সাথে সাথে ধরা পড়লেন! আমার একটাই প্রশ্ন ছিল, “আচ্ছা, আপনার ঐ বাড়ীতে কাজ করে মনে হয়নি সে বাড়ি অনেক দিন খালি পড়ে ছিল?”

স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রশান্তবাবু বললেন “হ্যাঁ, মনে হয়েছিল তো! প্রথম দিন – ই মনে হয়েছিল, আমি জিজ্ঞেস করাতে আমাকে সাহেব বলেছিলেন – ওনার প্ল্যান অনুসারে কাজ টা এখান থেকেই করতে হবে, আর এই বাড়ি এমনিতে বন্ধ-ই থাকে! ওঁরাও এমনি তে অন্য কোনো জায়গায় থাকেন।”

প্রশান্তবাবু কে নিয়ে আরা টানা-হেঁচড়া করিনি! সুমিতবাবু র অনূরোধটা উপেক্ষা করতে পারলাম না, সেদিন সন্ধ্যের স্ন্যাক্সস আর রাতের ডিনার টা ওনার রেস্টুরেন্টে করতে হলো।

পরদিন দুপুরের বাস ধরলাম কলকাতা ফেরত যাবার জন্য। খালি মনে পড়ছে, শেষ তিন মাসের কথা গুলো! দুবার নর্থ বেঙ্গল আসা হল, আড়াইশো বছরের পুরনো ক্লারিওনেট উদ্ধার হল, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের কত সব সুন্দর অভিজ্ঞতা, আর এডমন্ড হার্ডিঞ্জের নানান লুকোচুরি! পুরো প্ল্যানটার মধ্যে খালি একটা ভুল করেছিলেন হার্ডিঞ্জ সাহেব – ভেবেছিলেন বেশি টাকাটা সুমিত বাবু আর ফেরত দেবেন না! নিজের কাছেই রাখবেন। কিন্ত আমাদের এই গরীব দেশে এখনো সৎ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি! সেই অতিরিক্ত টাকাটা ফেরত দিতে এসেই পুরো ব্যাপার টা জানা হলো! আমার প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গেছি! খালি একটা প্রশ্নের উত্তর ছাড়া – এই কাজটা হার্ডিঞ্জ সাহেব করলেন কেন?

বাড়িতে ঢোকার সময় আমাদের ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি ছেলেটির সাথে দেখা হল, আমার একটা চিঠি আছে! উলটে দেখলাম চিঠি টা ডঃ দিবাকর সেনের পাঠানো, হয়তো এডমন্ড হার্ডিঞ্জের কোন খবর আছে! বাড়ীতে এসেই চিঠি টা খুললাম। ভেতর কোন হাতে লেখা চিঠি নেই, খালি একটা জেরক্স করা কাগজ, জেরক্স টা করা হয়েছে ইংরাজি খবরের কাগজ থেকে নেওয়া একটা ছোট পেপার কাটিং-এর। পড়া শুরু করতেই এক মুহূর্তে আমার শরীর যেন রক্তশূন্য হয়ে গেল,

“৯ই আগস্ট ২০১৩, কাল সন্ধ্যায় উত্তর ভারতে পীথরাগোরের কাছে, পঁচানব্বই বছর বয়সী ঐতিহাসিক এডমন্ড হার্ডিঞ্জ এক মারাত্মক মোটর অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। গাড়ির ড্রাইভার রিজওয়ান ঘটনাস্থলেই মারা যান, ঐতিহাসিক এডমন্ড হার্ডিঞ্জকে নিকটবর্তী একটি হসপিটালে নিয়ে এসে অস্ত্রোপচার করা হয়, কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ভারতে ব্রিটিশদের অভ্যুত্থান নিয়ে তাঁর গবেষণা আর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

মাথা টা বনবন করছে! আরো কিছু লেখা ছিল, আমার আর পড়া হয়নি! কারণ আমার বাকি প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গেছি – বাইশে জুলাই আমি যাঁদের দেখেছি – তিন বছর ধরে মুক্তির আশায় অপেক্ষমাণ তাঁরা দুই অশরীরী আত্মা। একজন ইতিহাসের পাতায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক এডমন্ড হার্ডিঞ্জ আর অন্যজন তাঁর সব সময়ের সঙ্গী ড্রাইভার রিজওয়ান। সৎ উদ্দেশ্যে-ও যাঁদের প্ল্যানিং করতে হয় বা লুকোচুরি খেলতে হয়। পাছে উত্তরবঙ্গের এই প্রত্যন্ত জায়গায়, পাহাড়, জঙ্গল আর নদীতে ঘেরা, সাধারণ মানুষের লোকালয় থেকে অনেক দূরে তাঁদের সেই জায়গা টা যেন তছনছ না হয়ে যায়!

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮