• সুস্মিতা

ব্যক্তিগত গদ্য - “স্বাধীনতা, তুমি আমার সাদা কাগজ, কালো কলম আর নীল কালি”

‘স্বাধীনতা’ শব্দটার সোজা – সাপটা সরল মানে হল ‘মুক্তি’ ৷ মুক্তি হল একটা আপেক্ষিক শব্দ- অর্থাৎ কোথাও একটা পরাধীনতা বা বন্ধন আছে ,সেই বন্ধনের দাসত্ব থেকে মুক্তি চাই ৷ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা-এই সব বিষয়ে শ্রদ্ধেয় বিভিন্ন গুণীজনেরা বিভিন্ন সময়ে সব কথা বুঝিয়ে বলে গিয়েছেন – তার বাইরে একটাও নূতন কথা আমার বলার নেই ৷ উপরোক্ত প্রত্যেকটা বিষয়ে স্বাধীনতা একজন সাধারণ মানুষের মত আমারও ভীষণ প্রয়োজন ৷ কিন্তু এই বয়সে পৌঁছে অনুভব করছি তার থেকেও বেশী প্রয়োজন – “আমার নিজের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া” ৷

আমার কাছে স্বাধীনতার মানে – আমার নিজের চেনা-পরিচিত “আমি”টাকে সদাসর্বদা বয়ে বেড়ানো থেকে মুক্তি ৷ স্বাধীনতার মানে – আমার জীবনের প্রত্যেকটা সম্পর্কের দায়বদ্ধতা থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি ৷ বাবা-মায়ের বাধ্য সন্তান হওয়া থেকে দু-দিনের ছুটি , বনেদী বাড়ির সর্ব-গুণসম্পন্না, সর্বংসহা পুত্রবধূর ভূমিকা থেকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়া , সন্তানের স্নেহময়ী মা কিংবা স্বামীর দায়িত্বশীলা যথাযোগ্য অর্ধাঙ্গিনী হয়ে থাকা থেকে কিছুক্ষণের জন্য একটু নারী হয়ে ওঠার মুক্তি------ ৷

সবরকমের বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকেও একটু ছুটি চাই, মুক্তি চাই ৷ কিরকম ? যেদিন হয়ত আমার একটাও কথা বলতে ইচ্ছে করবেনা---- সেদিন আমি একেবারে চুপ করে থাকার স্বাধীনতা চাই ৷ হয়ত একটাও ফোন-কল রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না আমার (কোনো কারণ ছাড়াই )------তার জন্য জবাবদিহি করবোনা আমি------ সেই বন্ধনহীনতা আমার চাই ৷

আজ আমার চোখে কাজল লাগাতে ভালো লাগছে না, কপালে টিপ আজ আমি পরব না, চুলে ফুল লাগাতে বড্ড একঘেয়ে, ক্লান্ত লাগছে------- সবাই মিলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করোনা আমায়-----৷ আমি আমার নিজের ইমেজ থেকে মুক্তি চাই, নিজের পরিচিত ‘আমি’টাকে ভারী বোঝার মত আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখতে চাই ৷ আমি সবরকমের ভীতি থেকে মুক্তি চাই, নিজেদেরই তৈরি করা ধারণা আর সংস্কার থেকে মুক্তি চাই------৷

হয়ত আজ আমার ইচ্ছে করছে – আমার বিশাল ভুঁড়িওয়ালা, মেদজমা, চর্বিজমা শরীরে বিকিনি পরে সমুদ্রের তীরে বসে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিতে---- সময়ের হিসাব রাখবোনা আমি আজ---- ইচ্ছে করছে ঐ আধপাগল চেনা-অচেনা কবি বন্ধুগুলোর সাথে আজ রাতে কোনো এক শ্মশানে গিয়ে রাত-আকাশের চাদর গায়ে জড়িয়ে রাতপরী হয়ে জেগে থাকবো-----৷কাল ভোরবেলা ইচ্ছে হলে আমি চলে যাবো নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে কিংবা দিকশূন্যপুরে ৷ হয়ত পৌঁছে যাবো শান্তিনিকেতনের খোয়াই এর ধারে ---- পলাশগাছের নীচে বসে আমার কোনো এক পুরুষ বন্ধুর পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে আমরা উদ্দাম কবিতা পড়বো কিংবা বেসুরো সুরে গান গাইবো---- ৷ যদি ভীষণ বেশী ভালোলাগায় ডুবে যাই দুজনে হয়ত ওষ্ঠ-সুধা পান করব---হয়ত কোনো বাউলের আড্ডায় পৌঁছে গিয়ে যৌনতার নতুন মানে জানতে চাইবো---- ৷হে আমার ‘চেনা-পরিচিত-আমি’- আমাকে মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করতে দিও তুমি সেদিন, সেদিন তুমি দিওনা আমাকে কোনো অপরাধবোধ ’কোনো বাধা’ আমি তোমার থেকে মুক্তি চাই ---৷

আমি আরও মুক্তি চাই আমাদের সবার চেনা সেইসব নীতিবাগীশ মানুষগুলোর কাছ থেকে যারা আমার ওই গাছতলায় বসে কবিতা পড়ার স্বর্গীয় মূহুর্তটাকে ‘অবৈধ প্রেমে’র তকমা দিয়ে আসলে নিজেদের মনের ইচ্ছেগুলোকে গলা টিপে হত্যা করেন আর গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন- আমি তাদের সবার থেকে একদিনের ছুটি চাই ৷

আরো, আরো অনেক কিছু থেকে প্রতিনিয়ত মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে- প্রাত্যহিকতা থেকে মুক্তি চাই, নিয়মের বোঝা থেকে ছুটি চাই – ইচ্ছে করে একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই আমি দৈনন্দিনতার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করব- আমি যাবো না রান্নাঘরের গ্যাসের আগুনে চায়ের জল চড়াতে ৷ আমি সোজা চলে যাবো পূবের বারান্দায়---- চোখে চোখ রেখে দাঁড়াবো শিশু-সূর্যের, গালে হাত রেখে কান পেতে শুনবো পাখীর ডাক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে----৷ বারান্দার রেলিংগুলো তখন আমার পায়ের পাতায় জাফরি কাটা আলপনা আঁকবে----৷ আমার চেনা-পরিচিত ঘর-সংসারের সব নিয়মকানুনকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে সেদিন আমি একটা কবিতা লেখার মুক্তি চাই ৷

আরো আছে- সবসময় একেবারে সঠিক আচরণ করার দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে নিঃশ্বাস নিতে চাই ৷ আমি অনেক-অনেক ভুল করার স্বাধীনতা চাই ৷ আমার যদি ভীষণ কান্না পায়- চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি হৃদয় উজাড় করে কাঁদতে চাই, আমি আকাশ-বাতাসকে আমার মনের কথা চিৎকার করে বলতে চাই, আমি পৃথিবীর আদিমতম মানবী হয়ে প্রকৃতির নগ্ন নির্জনতায় অট্টহাসি হাসতে চাই---- ৷

আমি সবাইকে খুশী করার চেষ্টা থেকে মুক্তি পেতে চাই ৷ আমি একদিনের জন্য নিজেকে রাজকীয়-ভাবে খুশী করার স্বাধীনতা চাই ৷ আমি আগ্রাসী হিংস্র মানুষের নকল ভালো-মানুষীর মুখোশগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলে স্বাধীনতাকে নুন-গোলমরিচ মাখিয়ে চেটেপুটে খেতে চাই----- ৷

শেষ কথা নয়, তবে শেষ করার আগের কথা- আমি এমন এক স্বাধীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে চাই- যে পৃথিবী সমস্ত রকমের হিংসা থেকে মুক্ত- যে পৃথিবীতে থাকবেনা একটাও রাগী ধার্মিক মানুষের মুখ ৷ আগামী শতাব্দীর মানুষের দিকে ছুঁড়ে দিতে চাই একটা নতুন ধর্মবোধ- যেখানে মানুষকে ভালোবাসা ছাড়া মানুষের আর কোনো ধর্মই থাকবেনা ৷

কিন্ত হায় রে আমার স্বাধীনতা- এর প্রায় কোনোটাই আমি বাস্তবে করে উঠতে পারিনা---- ৷ তাই সাদা কাগজ- তুমি আমার স্বাধীন মনের আকাশ, আমার কালো কলম- তুমি আমার হাতিয়ার, আমার মুক্তি---- আর কলমের নীল কালি? তুমি আমার স্বাধীন বুকের লাল রক্ত ৷

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮