• পার্থ সেন

গল্প - সুকুমার রায় স্মরণে ননসেন্স

পূর্ব কথা

সময় টা ১৯৯০ র মাঝামাঝি, সবে মাত্র দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত’ সে বছরে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছে। প্রলয় সরকার সেই সময়ের এক শিশু এবং কিশোর সাহিত্যের চর্চায় ব্যস্ত এক পঁচিশ বছরের তরুন। অবশ্য শিশু সাহিত্যের তকমা টা নিয়ে তার একটু আপত্তি আছে। ইংরাজিতে একটা কথা খুব চলে – ‘ইয়ং রিডার’, তার নিজের কথায় সে সেই সমস্ত ইয়ং রিডার দের জন্য লেখে। ইয়ং মানে যে শুধু বয়সে কিশোর তা তো নয়, মনটাই আসল। নিকট আত্মীয় স্বজন আর বন্ধু বান্ধব রা জানেন, সাহিত্যে তার দখল বা যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই, তবে প্যাশন হলো ওই কিশোর সাহিত্য। নিকট বন্ধুবান্ধব দের বলে – “দ্যাখো, এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত! আমি বই লিখলাম আর বাবা মা বাচ্ছাদের লুকিয়ে লুকিয়ে সে বই পড়ল বা বই টা নিয়ে তুমি তোমার ছেলে মেয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে পারছো না, সে লেখা আমি লিখতে চাইনা! ভালো খারাপের তর্কে যাবো না, তবে সে লেখা আমার পোষাবে না! সে লেখা সবাই পড়তে পারবে, বাচ্ছা, বুড়ো, কিশোর, কিশোরী, তরুন, তরুনী সকলের ভালো লাগতে হবে! না হলে আমি কিসের লেখক!” তার পছন্দ ভুতের গল্প, প্রধানত আজগুবি কিন্তু বেশ বাস্তবের মোড়কে অলীক রচনা। সাসপেন্স, থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশান – এসব ও তাকে ছুয়ে যায়, তবে কোন গল্পে সে তার নিজের তৈরি সীমাকে লঙ্ঘন করেন না। তার গল্পে কোন প্রেম, প্রনয়, ভালোবাসা, বিচ্ছেদের কাহিনী থাকে না, তার গল্পে মানুষের মনের বা সম্পর্কের কোনো জটিলতা থাকে না, খালি থাকে শব্দের জাদু তে ভয় আর সাসপেন্স মেশানো সুন্দর ভাবে একটা গল্প বলা। আর সেই গল্প ঠাকুমা নাতনি কে পড়ে শোনাতে পারেন, আবার নতুন বাংলা পড়তে শেখা প্রবাসী বাঙালিও সহজে বুঝতে পারে।

সুকুমার রায় কে সে নিজের গুরু মানে, তার নিজের কথায় অনুকরন করে না তবে অনুসরণ করে। গত পুজোতে তার লেখা গল্প - যেখানে স্যার কোনান ডয়েলের সৃষ্ট চরিত্র প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, সুকুমারের সৃষ্ট চরিত্র প্রফেসর হুশিয়ারের বিজ্ঞান সাধনা চলছে কঙ্গো নদীর উপত্যকায় । আর একের পর এক ঐতিহাসিক বা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীরা আবার নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে! একেবারে কাল্পনিক গল্প, তবে অসাধারন নাটকীয় অবতারণা, উচ্ছসিত প্রশংসা পেয়েছে সেই গল্পটি লিখে, একটি প্রকাশনী হাউস তার গল্পের স্বত্ত কিনতেও চেয়েছিল কিন্তু শেষ সময়ে আর হয়নি! কিন্তু শ্রেষ্ঠ পুরস্কার এসেছে – ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোড থেকে তার যখন ডাক আসে। সেই ছয় ফুট চার ইঞ্চির মানুষ টা যিনি ফেলুদা কে জন্ম দিয়ে স্বযত্নে লালন করেছেন। তিন মাস ধরে দেখা করতে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত বারো মিনিট সময় পেয়েছিল, আর শুনেছিল দুটো খুব দামী কথা। এক, মনে রাখবে লেখকের দায়িত্ব পাঠক কে গল্প বলা, তাই সব সময়ে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করবে, আর যেটা জানবে সেটা লিখবে। যাতে তোমার লেখা পড়ে সবাই সেই গুলো জানতে পারে। তাই পড়াশোনা টা সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট। টপিক যা খুশি হতে পারে কিন্তু সাবজেক্ট তা তোমাকে জানতে হবে। আর দুই, কখনো কাউকে নকল করবে না, নিজের মৌলিক স্টাইল গড়ে তুলবে। সেটাই পাঠক চায়।

ব্যাক্তিগত জীবনে সে আরো সহজ। দু মাস হলো পচিশে পা দেওয়া প্রলয় সরকার লেক টাউনের কাছে একটি বাড়ীতে একা ভাড়া থাকে। বাবা মা দুজনেই গত হয়েছেন বছর তিন-চারেক হলো। অবিবাহিত, নিজের কাজ নিজেই সে করে, খালি রান্না করার জন্য একজন রাঁধুনি আছে। লেখার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের ম্যাগাজিনে লিখেছে, তারপর কলেজে পড়তে নিজে হাতে করে লিটল ম্যাগাজিন ছাপিয়েছে। প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে কেমিস্ট্রি তে স্নাতক তারপর নিকট আত্মীয়দের পরামর্শে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে থেকে বি টেক। দু–তিন টে ছোট–খাটো জায়গায় চাকরি করলেও এই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপার টা তার ঠিক জমেনি। সাহিত্যের প্যাশন তাকে দু বছর বাদে আবার কলকাতায় ফিরিয়ে আনে। আর গত এগারো মাসে কাজ বলতে থালি গল্প লেখা। পাঁচ মাস হল ‘সময়ের সঙ্গে’ বলে একটি বাংলা ম্যাগাজিনে কাজ করার সুযোগ এসেছে। বেশ উচ্চ মানের সাহিত্য পত্রিকা আর কালচারাল বৈচিত্রের জন্য এখনকার প্রখমসারীর ম্যাগাজিন হিসেবে খুব প্রসিদ্ধ ‘সময়ের সঙ্গে’। সেখানে চীফ এডিটর সমরেশ সেন, তাকে খুব স্নেহ করেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক, বহু পুরস্কার পেয়েছেন! এখনো প্রত্যেক লেখা নিজে রিভিউ করেন, বানান গুলো শুধরে দেন। দরকারে কোন লেখা কে একটু আধটু পরিবর্তন ও করেন! খুব ইচ্ছে আছে সন্দেশ, শুকতারা, আনন্দমেলার সঙ্গে যুক্ত হতে। চেষ্টায় আছে তবে এখনো কোন সুযোগ আসেনি।

ঝামাপুকুর লেনের একটা ছোট্ট ঘরে ‘সময়ের সঙ্গে’র অফিস। এই অফিসেই তার রোজকারের ঝামেলা! নগেন সান্যাল, অসীম বসু আর রনজয় ঘোষ! এরা তিনজনে তার বয়োজ্যেষ্ঠ, তার সহকর্মী, এবং তিনজনেই সাহিত্যের জগতে স্বনামধন্য । প্রলয়ের থেকে এঁদের অনেক বেশী পরিচিতি, নাম যশ, অর্থ ও অনেক বেশী। নগেন সান্যাল – মুলত কবি, গত বছরে বই মেলাতে তাঁর একটি বই বেস্ট সেলারের তালিকায় প্রথম দশে এসেছিল, অসীম বসু – উপন্যাস, বড় গল্প, ছোট গল্প সব কিছু ই লেখেন। অনবদ্য রচনা শৈলী, অনেক বেস্ট সেলার লিখেছেন। রনজয় ঘোষ – মুলত প্রবন্ধ লেখেন, রম্য রচনা, কভার স্টোরি লেখেন। নিয়মিত এঁদের লেখা বই প্রকাশিত হয়, সেখানে প্রলয়ের কোন বই এখনো পর্যন্ত ছাপা হয়ে আসেনি। এঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো কম্পিটিশন নেই। প্রথমটা তে বেশ ভালোই চলছিল! এই তিন সাহিত্য জগতের হোমড়া – চোমড়া ব্যাক্তিত্ব প্রায়ই তাকে নানা বিষয়ে জ্ঞান দিতেন তবে অবশ্য মাঝে মাঝে লেখার ব্যাপারে উৎসাহও দিতেন। কিন্তু পুরো গণ্ডগোল টা শুরু হয় যখন সমরেশদা কিশোর সাহিত্য সেকশন টা শুরু করলেন। সেখানে নগেন সান্যাল, অসীম বসু, রনজয় ঘোষ ব্রাত্য! প্রথমত এটা তাঁদের সাবজেক্ট নয়! আর দ্বিতীয়ত সমরেশদা’র সঙ্গে এই ব্যাপারে তাঁদের তিনজনের একটা মতবিরোধ ও ছিল! আর তাই এখানে সব দায়িত্ত এসে পড়ল প্রলয়ের ওপর, প্রলয়ের নাম তৃতীয় পৃষ্ঠায় সকলের সাথে এক সাথে ছাপা হওয়া শুরু হল। মাত্র দু বছর সাহিত্য চর্চার পর তার এতো তাড়াতাড়ি উত্তরন বোধ হয় এঁদের খুব ভালো লাগলো না! আর ব্যস, সামনে পেছনে টিপ্পুনি চালু হলো! একদিন বিকেলে চা খাবার সময় নগেন-দা বললেন, “যোগীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে ঠাকুরদার ঝুলি টা তোমাকে দিয়ে –ই লেখাতেন!”

কোন এক অবসরে অসীম-দা বললেন –“প্রলয় তুমি রূপকথার গপ্প লেখো না কেন? রাজা, রানী, রাজকুমারী, ডাইনী – তোমার আজগুবি র থেকে সেটা হয়তো ভালো হতো!”

রনজয়-দা গম্ভীর ভাবে বলেন, “প্রলয় তুমি যাঁদের নিজের গুরু মানো সত্যজিৎ, সুকুমার, উপেন্দ্রকিশোর, অবনীন্দ্রনাথ - এঁদের লেখার ডেপথ আর কভারেজ দেখো। খালি কাল্পনিক কিশোর সাহিত্য লিখলে কিসসু হবে না!”

প্রলয়ের গল্পে মহিলা চরিত্র থাকে না, সে নিয়েও অনেক ব্যাঙ্গাত্বক শ্লেষ তাঁকে শুনতে হয়। থেকে থেকে প্রলয়ের ইচ্ছে হয়, বলে - “আচ্ছা! আমার ইচ্ছে, আমি যা খুশি তা লিখবো, তোমাদের কি?”, কিন্ত বলতে পারে না।

একদিন বাধ্য হয়ে সব কথা সমরেশদা কে জানাতেই হলো, সমরেশ-দা তেমন পাত্তা দিলেন না। তাছাড়া বাইরে অন্য কাগজে বা পত্রিকায় যে এ জিনিস যে হবে না, তা তো কেউ বলতে পারে না! বরং সমরেশ-দার কাছে একটা দারুন ইন্টারেস্টিং খবর পাওয়া গেলো।

নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন যা শুরু হয়েছিল ১৯২২ সালে – বেনারসে যার প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন স্বয়ং গুরুদেব তাঁদের ১৯৯০ র অধিবেশন সামনে নভেম্বরে। সারা ভারতের নামী-অনামী বহু মানুষ আসবেন যারা বাংলা সাহিত্য কে ভালো বাসেন। কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার – সবার ছড়াছড়ি! আর এবারের সম্মেলনে একটি বিশেষ সময় থাকবে কিশোর সাহিত্যের ওপরে। সেই অংশের দায়িত্বে থাকবেন সমরেশ-দা! প্রলয় কে স্বরচিত কিছু পাঠ করতে হবে। আর যেমন শোনা তেমন কাজ! ৩০শে অক্টোবর সুকুমার রায়ের জন্মবার্ষিকী, কাজেই এবাবের লেখা টা তাঁকে উৎসর্গ করেই হবে।

বেশ ভালো কাজ হলো, সুকুমার রায়ের স্মরণে তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ নিয়ে খুব একটা সুন্দর লেখা তৈরি হল। সমরেশ-দা একটু হেল্প করলেন, এমন কি প্রলয়ের সবচেয়ে বড় সমালোচক নগেন সান্যাল, অসীম বসু, রনজয় ঘোষ ও লেখায় দরাজ সার্টিফিকেট দিলেন। বঙ্গ সম্মেলনের পরে শ্রেষ্ঠ লেখা গুলোর যে সংকলন তৈরি হয়, যেটা মাস দুই-তিন পড়ে বই এর আকারে প্রকাশিত হয় – সেখানেও সে লেখা মনোনীত হল। সব গণ্ডগোল হয়ে গেল সম্মেলনের তিন দিন আগে! সকলকে অবাক করে সহসা পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন সমরেশ-দা! ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, ঝামাপুকুর লেনের সেই ছোট্ট ঘরে এগারো মিনিটের মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। কাউকে কোন চান্স দিলেন না!

রঙিন পৃথিবী টা এক মুহূর্তে সাদা কালো হয়ে গেল। সম্মেলনে কিশোর সাহিত্যের জন্য মনোনীত সময়টা আর রইল না! পুরো বঙ্গ সম্মেলনে প্রলয়কে সাহিত্য জগতের নাম করা ব্যাক্তিত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো-ও কেউ আর রইল না! সুনীল, শক্তি, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব, সমরেশ মজুমদার, সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে আসেন নি? কিন্তু তিনদিনের সম্মেলনে মাঝে মাঝে সে এটা বুঝতে পারছিল না যে সে নিজে পাঠক নাকি লেখক? যা হোক, সমরেশ-দা র অবর্তমানে সম্পাদক হলেন সব চেয়ে সিনিয়র এবং যোগ্য রনজয়-দা। আর যেগুলো হবার সেই গুলো হল! এক মাস বাদে ‘সময়ের সঙ্গে’ ম্যাগাজিন থেকে কিশোর সাহিত্য বিভাগ টা বাদ পড়ে গেল। অবশ্য প্রলয় কে একেবারে বাদ দেওয়া হলো না, একটা রহস্য ধারাবাহিক শুরু হয়েছিল যেটা সমরেশ-দা চালু করে গেছিলেন সেটা চলতে থাকলো! কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে এটা বেশ বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল- “দ্যাখো ভাই, আমরা কেউ সমরেশ-দা নই। কিশোর সাহিত্য বাজারে বেশী চলে না। এমনকি যেসব পত্রিকা কিশোর সাহিত্যের জন্য বিখ্যাত তাদের ও বাজার আজ খারাপ। পাঠক কম, ওসব আজগুবি, আষাঢ়ে গপ্প লিখে পাতা ভরানোর কোন প্রয়োজন নেই। আজকালের বাচ্ছারা তুলনায় অনেক ম্যাচিওরড! ভুতের গল্প লিখলে মানুষের রিলেশনের অ্যাঙ্গেল আনো! থ্রিলার লিখতে হলে রোম্যান্টিক থ্রিলার লেখো! হয় তুমি লেখার স্টাইল পালটাও নয়তো অন্য কিছু খুঁজে নাও”।

কোনমতে দেড় মাস কাটল কিন্তু আর হলো না, অন্য কারুর জন্য নিজের লেখার স্টাইল পাল্টাতে পারলো না প্রলয়। তবে একটা জিনিস বেশ বোঝা যাচ্ছিল রনজয়-দা রা কিছু ভুল বলেন নি। যে ধরনের লেখা সে লেখে তার চাহিদা বেশ কম। যারা সাহিত্য রচনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের জীবিকা করেন তাঁদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি একটা নিয়মিত চাকরি র খুব প্রয়োজন থাকে। আর সেই অবলম্বনটা চলে গিয়ে প্রলয় যেন কেমন করে হারিয়ে যেতে থাকল। সমরেশ-দার ছত্রছায়ায় বড় হতে হতে নিজেকে আলাদা ভাবে প্রতিষ্ঠা করার সে রকম চেষ্টা প্রলয় করেনি, আর বাকি ক্ষতি টা নগেন সান্যাল, অসীম বসু, রনজয় ঘোষ করলেন। ১৯৯১ সালের শেষের দিকে একটি রবিবারের কাগজে তাঁর একটি গল্প প্রকাশিত হয়। তারপর আর কোন খবরে প্রলয়ের সন্ধান মেলেনি, আর কোন লেখার কথা ও জানা যায় নি। একবার দুবার তাকে ঝামাপুকুরের অফিসে দেখা গেছে তবে কোন খবরে আর আসেনি। প্রতিভাবান, ক্ষণস্থায়ী এই সাহিত্যিক কেমন করে যেন উধাও হয়ে গেল।

******

সতের বছরের কেরিয়ারে এমন কখন হয়নি। প্রায় চারদিন হয়ে গেল কেস টার সাথে ধ্রুব যুক্ত হয়েছে কিন্তু এখনো বিশেষ কিছুই সে করে উঠতে পারেনি। লালবাজারের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের অফিসার ধ্রুব গাঙ্গুলি – সাহসী, সৎ, বুদ্ধিমান - মোটামুটি সব কথা বিশেষণ ই তার জন্য প্রযোজ্য! সেই তেইশ বছর বয়সে চাকরি শুরু, তার পর থেকে নানা কেস, নানা স্টেশন, নানা অপরাধী কে নিয়ে কাজ করতে করতে তার বাইরে যে একটা জীবন আছে সেটা সে ভুলেই গেছে। চাকরি তে তার কোন পছন্দ বা অপছন্দ নেই, ট্রাফিক ডিউটি, দুর্গা পুজার স্পেশাল ডিউটি, ইলেকশন কভারেজ, মন্ত্রীদের রাজনৈতিক মঞ্চে পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের সুরক্ষার ব্যবস্থা - সব কিছু সে করেছে। ব্যক্তিগত জীবন বা সংসার বলে তার কিছু নেই, বাবা মা চলে যাবার পর কলকাতার পৈতৃক বাড়ির সাথে সম্পর্ক ও চুকে গেছে। পূর্ব সিঁথির সেই পুরোনো বাড়ি টায় যেখানে তার ছোটবেলার দিন গুলো কেটেছে সেখানে বোধহয় শেষ দশ বছর তার আর যাওয়া হয়নি! উল্টোডাঙ্গা পুলিশ কোয়ার্টারে একটা ঘর সব সময় তার জন্য বুক করা থাকে। বিবাহের সুযোগ বা যোগাযোগ কোনটাই তার হয়নি, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয় স্বজন বয়সের সাথে সাথে আস্তে আস্তে সব সরে গেছে। কিন্তু নিজেকে কখনো একা লাগে না তার, আসলে পুলিশের চাকরি টাকে ভীষণ ভালো বেসে ফেলেছে সে। সাব ইন্সপেক্টর হয়ে শুরু করে আজ সে লালবাজারে স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের অফিসার, ডিসি ডিডির ভীষণ পছন্দের, কিন্তু এই কেসটাকে এখনো পর্যন্ত তার যাবতীয় অভিজ্ঞতার বাইরে!

পুরো জিনিস টার শুরু প্রায় চার সপ্তাহ আগে, ১০-ই সেপ্টেম্বর রাতে। সন্ধ্যে থেকে সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শুরুর দিকটায় টিপটিপ করে, তারপর সাড়ে নটা থেকে বেশ মুষলধারে। সাধন সরকার কাশীপুর পুলিশ স্টেশনের ইন-চার্জ, সেদিন সেকেন্ড অফিসার নেই – আউট অফ স্টেশন! সারা বছরেই ছোট-বড় নানা রকমের ক্রাইম লেগেই রয়েছে। এই জন্মাষ্টমী গেল, এই বড় উৎসব গুলোর সময় এখন থানায় দুজন অফিসার পোস্টিং হয়। তাতেও বিশ্রাম হয় না! সেদিন আবার সাধনবাবু একা! প্রায় সাড়ে এগারোটা, এই সময় টায় ব্যস্ত শহর কেমন যেন ঘুমোনোর তোড়জোড় করে। রাস্তাও বেশ থালি, থানার ঠিক পাশেই চায়ের দোকান টার ঝাঁপ বন্ধ করার কাজ চলছে। সাধন বাবু সিগারেট নিয়ে থানার ঠিক বাইরে জিপটার সামনে দাঁড়িয়ে আর সঙ্গে হেড কনস্টেবল সুব্রত বাবু, ফোন টা ঠিক তখন-ই এলো। থানার লাইনে এলো, সাধন বাবু ই ধরলেন -“দমদম স্টেশন থেকে বিশ্বজিত সান্যাল বলছি স্যার! জিরাপি স্টেশন ইন-চার্জ, স্টেশন অফিসার কে আছেন?”

-“হ্যাঁ আমি, সাধন বসু, অফিসার ইন-চার্জ! বলুন কি ব্যাপার!”

-“দমদম মেইন থেকে ক্যান্টনমেন্টের মাঝখানে ট্র্যাকে একটু আগে আমরা একটা লাশ পেয়েছি! রেললাইনের ধারে পড়ে ছিল,”

-“অ্যাকসিডেন্ট!”

-“না! বডি ডিফর্মড! মনে হচ্ছে পুরোনো লাশ, কেউ ফেলে দিয়ে গেছে! মুখ দেখে চেনার কোনো উপায় নেই, আমরা জিরাপি থেকে বডি পোস্ট মরটেমে পাঠাচ্ছি আর জি করে, আপনি একটা ডাইরি এন্ট্রি করে নিন! আপনার ফ্যাক্স নম্বর টা বলুন – বাকি ডিটেলস পাঠাচ্ছি! আপনাদের কাউকে আসতে হবে”

সুব্রতবাবু ও আরো দুজন কনস্টেবলকে দায়িত্বে রেখে সাধন বাবু কে একাই বেরোতে হলো, এটা তাঁর জুরিসডিকশন, সুতরাং তাঁকেই যেতে হলো। তারপর সারা রাতের ব্যস্ততা, হাসপাতাল, মর্গ, সমস্ত কাজ শেষ করে থানায় ফিরতে প্রায় সকাল সাড়ে নটা হয়ে গেল। পুলিশের ডিউটি তে একটানা পঁয়ত্রিশ, ছত্রিশ ঘন্টা কাজ করার অভ্যাস সাধনবাবুর আছে। এটা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়, তবে গত এপ্রিলে তিনি পঞ্চাশে পা দিয়েছেন, এখন রাত জাগলে শরীর আর চলে না!

যাই হোক, এবাব্রের কেস টা কিন্তু একটু অন্যরকম। সাড়ে পাঁচ ফিটের লাশ, পরনের জামা কাপড় নিতান্ত সাধারন, প্রায় দুদিনের পুরোনো মৃতদেহ, মুখ টা একেবারে বিকৃত হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করেই কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করেছে মুখ টা নষ্ট করার জন্য। যদিও পোস্ট মরটেম না করলে বোঝা যাবে না, তবে অভিজ্ঞতা থেকে সাধন বাবুর মনে হচ্ছে – ষাটের কাছাকাছি বয়স! শরীরে সে রকম ভাবে গায়ে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই, সাথে কোন মোবাইল ফোন নেই, পকেটে কোন টাকা পয়সা নেই, মানি ব্যাগ ও নেই! জিনিস বলতে একটি ছোট পকেট ডাইরী – তার বেশির ভাগ পাতা খালি, কয়েকটা পাতায় হিজিবিজি কাটা, কিছু জন্তু জানোয়ারের ছবি আঁকার হয়তো চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু কোনো ছবিই সম্পূর্ণ নয়। আর শেষের আগের পাতায় একটা ছোট প্রিন্টেড কাগজের টুকরো – যেটাতে চারটে লাইন লেখা –

আদিম কালের চাঁদের হিম

তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম

ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর

গানের পালা সাঙ্গ মোর।

ডাইরির শেষ পাতায় লেখা – ‘ইন দ্য মেমারি অফ এডওয়ার্ড লিয়ার’ , ডাইরির প্রথম পাতায় খুব সুন্দর হরফে হাতে লেখা একটি নাম – প্রলয় সরকার আর তার নীচে এমারজেন্সি কন্ট্যাক্ট বলে আর একটি নাম – সন্দীপ সরকার এবং তার ফোন নম্বর!

প্রথমটায় কেউ মানে বোঝেনি, কিন্তু হাসপাতালের এক জুনিয়র ডাক্তার যিনি সেই সময় উপস্থিত ছিলেন তিনি বললেন – এটা নাকি সুকুমার রায়ের লেখা একটি কবিতা! আর বললেন, এডওয়ার্ড লিয়ার নাকি একজন লেখক যিনি সুকুমারের মতো অনেক আজগুবি জানোয়ার সৃষ্টি করেছেন, তবে বিদেশী সাহিত্যে! সুকুমারের লেখায় এবং আঁকায় তাঁর প্রভাব পাওয়া যায়। যাই হোক সাধনবাবু আর দেরি করেননি ফোন ঘোরালেন, ব্যাঙ্গালোরের নম্বর – দ্বিতীয় বাব্রের প্রচেষ্টায় ফোন লাগলো –

-“আমি কলকাতার কাশীপুর পুলিশ স্টেশন থেকে অফিসার ইন-চার্জ সাধন বসু বলছি! আপনি কি সন্দীপ সরকার বলছেন?”

গলায় সম্মতি শোনা গেল, “হ্যাঁ, বলুন!”

-“আচ্ছা, প্রলয় সরকার আপনার কে হন?”

-“আমার ভাই! মানে দাদা! কেন?”

-“আচ্ছা উনি কি কলকাতায় থাকেন?”

-“হ্যাঁ উত্তর কলকাতা, শ্যামবাজার স্ট্রীটে!”

-“কে আছেন ওনার বাড়ীতে?”

-“আমি ছাড়া ওর কেউ নেই, ও একাই থাকে! কি ব্যাপার বলুন তো?”

-“কোথায় চাকরি করেন উনি?”

-“সে রকম কিছু না! কিছু অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করে!”

-“বয়স?”

-“এই তো একান্ন তে পড়ল! এতো কিছু জানতে চাইছেন কেন বলুন তো? কি ব্যাপার?”

-“শুনুন একটা খবর আছে! আমরা দমদম স্টেশনের কাছে কাল রাতে একটা লাশ পেয়েছি, আর ডেডবডির পকেটে আমরা একটা পকেট ডাইরি পেয়েছি। তাতে লেখা আছে ...” ডাইরির খানিকটা পরে শোনানোর সময়ে মাঝপথে থামিয়ে জবাব এলো, “হ্যাঁ উনি আমার দাদা!”

“ওনার ইমিডিয়েট কোন রিলেটিভ আছেন কলকাতাতে?”

বেশ কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, তারপর ওপাশ থেকে জবাব এলো – “না আমি ছাড়া আর কেউ নেই”

-“তাহলে আপনাকে একবার এখানে আসতে হবে! লাশ সনাক্ত করতে!”

আবার কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, এবারের টা আগের বারের চেয়ে লম্বা, মাঝপথে সাধন বাবু আবার বললেন – “দেখুন আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু আমাদের কয়েকটা অফিসিয়াল ব্যাপার আছে, সেগুলো তো আমাদের করতেই হবে! আমি আশা করবো আপনি বুঝতে পারছেন আমাদের সিচুয়েশনটা!”

বেশ পাঁচ ছয় সেকেন্ড বাদে জবাব এলো – “ঠিক আছে আমি আসছি! দুপুরের ফ্লাইটে! জানি না টিকিট পাবো কি না? না পেলে পরের যেটাতে পাই সেটাতে করে আসছি!”

“আপনি এখানে এসে আমাকে একটা ফোন করবেন,” কথা শেষ হবার আগেই সন্দীপ বাবু ফোন ছেড়ে দিয়েছেন!

যাই হোক সন্দীপ বাবুর কাশীপুর পুলিশ স্টেশনে এসে হাজিরা দিতে দিতে প্রায় রাত দশটা বাজলো, তারপর লাশ সনাক্তকরণের সময় আসল ব্যাপার টা হলো! সন্দীপবাবু কে দেখে নিতান্তই ভালো লোক মনে হয়। বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে মনে হয়, বেশ লম্বা তবে স্বাস্থ্য হারিয়েছেন, দেখে বেশ অসুস্থ মনে হয়। লম্বার অনুপাতে ওজন বেশ কম, মাথার চুল কাঁচাপাকা, অবিন্যস্ত, পরনে নিতান্তই সাধারণ জামাকাপড়, চোখে পুরোনো কালো ফ্রেমের চশমা! তবে অসুস্থ মুখের মধ্যেও চোখ দুটো অসম্ভব উজ্জ্বল! সাধনবাবু সঙ্গেই ছিলেন, লাশ সনাক্তকরণের এই ব্যাপার টা খুব-ই বেদনাদায়ক, সেটাকে একটু সহজ করার চেষ্টা আর কি! ১১ নম্বর বাঙ্ক থেকে তথাকথিত প্রলয়বাবুর অর্ধনগ্ন লাশ টা যখন সন্দীপ বাবুকে দেখানো হলো – দু-তিন সেকেন্ডের বাদে প্রথম কথা শোনা গেল – ‘ইনি আমার দাদা নন!”

“ইনি নন? এতো তাড়াতাড়ি সিওর হলেন কি করে?”

“পয়সা খরচা করে বোলপুরের মেলায় গেছিলাম – সে ১৯৮৫’র কথা, উল্কি লাগিয়েছিলাম বাঁ হাতে – ও লাগিয়েছিল গোমড়াথেরিয়ামের ছবি আর আমি লাগিয়েছিলাম রামগরুড়ের ছবি! দুজনেই খুব গম্ভীর ছিলাম তো! এই দেখুন আমার হাতে আছে!” সন্দীপবাবু বাঁ হাতের জামাটা অনেক টা তুলে দিলেন, সেখানে বেগুনি হয়ে যাওয়া একটা ছবি উল্কি করা আছে বটে!

সাহিত্যে আগ্রহ বা সময় কোনোটাই সাধন বাবুর নেই, সুতরাং খানিকটা হতভম্বের মতো তাকিয়েছিলেন, ঘোর টা কাটতে বললেন - “এসব কারা?”

“এরা সব সুকুমার রায়ের সৃষ্ট ক্যারেক্টার! দুজনেই খুব ভক্ত ছিলাম তো! কই এখানে তো কোন উল্কি নেই! তাহলে ইনি আমার দাদা নন!”

সুতরাং পুরো ব্যাপার টা পাল্টে গেল। ব্যাঙ্গালোর নিবাসী সন্দীপ সরকারের ভাই প্রলয় সরকারের মৃতদেহ মেলেনি, তিনি নিরুদ্দেশ! এক দিনের দ্রুত অনুসন্ধানের পর যেটা জানা গেল – প্রলয় সরকার জীবনের শুরুতে সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বেশ কিছু প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের সঙ্গে একটুআধটু কাজ করেছেন কিন্ত প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি, কিছু লেখা এখানে ওখানে ছাপা হয় কিন্তু কেমন করে যেন তিনি হারিয়ে যান! গত পনের মাস ধরে শ্যামবাজার স্ট্রীটে প্রায় একশো বছরের একটি পুরোনো বাড়িতে তিনি ভাড়া থাকেন, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা খুব কম! তার আগে দুর্গাপুরে থাকতেন। যা হোক বাড়ীতে কাজের লোক কেউ নেই, কাছেই একটি জায়গায় তিনি পেয়িং গেস্ট হয়ে দুবেলা খাওয়া দাওয়া করেন, তবে বাড়ীতেও স্বল্প রান্নার ব্যবস্থা আছে। যদিও একটা আপাত দারিদ্র্য চোখে পড়ে কিন্তু কোথাও কোন টাকা পয়সা বাকি নেই। গত তিন দিন ধরে সেখানে তিনি বাড়ি ফেরেন নি, এবং তাঁর মোবাইল গত তিন দিন ধরেই সুইচড অফ! প্রতিবেশীদের একজন – দুজনের কাছে যেটা জানা গেল মাঝে মাঝেই তিনি বাড়ি তে থাকতেন না, সুতরাং তাঁর তিন দিন ধরে বাড়িতে না ফেরা টা তাঁদের কাছে নতুন কিছু নয়। এবং সন্দীপবাবুর কথায় সেটা মিলেও গেল, সাপ্লাই য়ের কাজে তিনি ও শুনেছেন দাদাকে এখানে ওখানে যেতে হতো! মোবাইল কোম্পানির রিপোর্টে জানা গেল ফোন সুইচড অফ হয় হাওড়া স্টেশনে! দিন চার-পাচেক একটু কথা বার্তা হলো, নিরুদ্দেশের কেস সুতরাং কেসও আর কাশীপুরে রইল না, শ্যামপুকুর স্ট্রীটের আওতায় চলে এলো! প্রথমটায় সন্দীপ বাবু রোজ শ্যামপুকুরস্ট্রীট থানায় হাজিরা দিচ্ছিলেন, কিন্তু কেসটা আসতে আসতে হারিয়ে যাচ্ছিল! প্রলয় সরকার কেমন করে যেন উবে গেলেন!

দুই সপ্তাহ বাদে ২৬-শে সেপ্টেম্বর রাজারহাট পুলিশ স্টেশনে আর একটি কেস খুলল – আলাদা ধরনের কেস কিন্তু একটাই কমন সুত্র – সুকুমার রায়! ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটল সেদিন সকালে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক নগেন সান্যালের – রাজারহাট নিউ টাউনের কাছে বাইশ তলার ফ্ল্যাটে! নগেন বাবু স্বপরিবারে বেড়াতে গেছিলেন সিমলা, কুলু – মানালি, ফেরার কথা আজ বিকেলে, আর ফিরে দেখেন এই ভয়াবহ ব্যাপার! ওনার বাইশ তলার ২৩০০ শো স্কোয়ার ফিটের অসম্ভব সুন্দর ফ্ল্যাট টা কেউ যেন তছনছ করে দিয়ে গেছে, মানে যে রকম সে রকম নয় – সিলিং থেকে পাখা গুলো টান মেরে খোলা হয়েছে, পাখার ব্লেড গুলো যেন কেউ নৃশংস ভাবে তুবড়ে দিয়েছে, নতুন এলইডি টিভি একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সাড়ে চারশো সিসির মস্ত তিন দরজার ফ্রিজটা আর বাক্সের মতো দেখতে নেই, দেখে মনে হয় যেন এক মস্ত ওজনবাহী ট্রাক তার ওপর দিয়ে চলে গেছে, সুসুজ্জিত কাঠের বা কাঁচের আলমারির প্রত্যেক কটা দরজা ভাঙ্গা – আর এমন ভাবে ভাঙ্গা যাতে আবার জোড়া লাগানো অসম্ভব! রহস্য অনেকগুলো – এক, পুলিশের অভিজ্ঞতায় কোন মানুষের পক্ষে একাজ করা অসম্ভব! এত শক্তিশালী একজন মানুষের পক্ষে হওয়া সম্ভব নয়! দুই – যারা বাড়ির ওপর বা নিচের তলায় থাকেন তাঁদের কাছে কোন রকম শব্দ পৌঁছয় নি। অদ্ভুত! জিনিস গুলো এই রকম করে ভাঙলে আওয়াজ হবে না! কাঁচের জিনিস আওয়াজ ছাড়া ভাঙ্গা যায় কি করে? তিন – ঘরের কোন জিনিসে বাইরের লোকের হাতের বা পায়ের কোন ছাপ নেই! কি করে সম্ভব! এই রকম তছনছ হয়ে যাওয়া বাড়ীতে তার মানে বাইরের কোনো লোক আসেনি? চার – বাড়ির সদর দরজায় সেফটি লকটি ভাঙ্গা হয় নি! বরং খুব নিপুন হাতে সেটাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেন সেটাকে মেরামত হবে! এই রকম করে চুরি ডাকাতি কি হয়? পাঁচ – সিসি টিভিতেও সন্দেহজনক কিছু দেখা যায় নি! আর সবচাইতে উল্লেখজনক – আবার সুকুমার রায়ের কবিতা! নগেনবাবুর মস্ত ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে লাল রঙ্গে তুলি দিয়ে লেখা –

খেলার ছলে ষষ্ঠীচরণ হাতী লোফেন যখন তখন,

দেহের ওজন উনিশটি মণ, শক্ত যেন লোহার গঠন।

একদিন এক গুন্ডা তাকে বাঁশ বাগিয়ে মারল বেগে –

ভাঙল সে বাঁশ শোলার মতো মট করে তার কনুই লেগে।

আবার একটা অপরাধ আবার সুকুমার রায়ের কবিতাকে ব্যবহার করে! এবারে ১০-ই অক্টোবর, একবারে পুজোর মুখে, মহালয়ার দুদিন আগে – এবাব্রের আক্রমন আর এক দিক পাল সাহিত্যিক – অসীম বসু। সদ্য একটা বেস্ট সেলার লিখেছেন, পুজোর দুদিন আগে কোন এক নিকট আত্মীয়ের বাড়ি গেছিলেন। বউ বাজারে পৈতৃক বাড়ীতে কেউ এসে তাঁদের বাড়ির সমস্ত বই, কাগজ, বিছানার চাদর, জামা কাপড় সমস্ত টুকরো টুকরো করে কেটে দিয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে এবাব্রের আক্রমনের প্রধান অস্ত্র কাঁচি! দুষ্কর্মের সময় কেউ বাড়ীতে ছিলেন না, এবং যথারীতি কোনো হাতের ছাপও পাওয়া যায় নি। এবারে ঘরের কোন দরজা ভাঙ্গা হয়নি, অন্য কোন মানুষের ঘরের মধ্যে ঢোকার কোন চিনহ ও নেই! আশ্চর্যের ব্যাপার যে পরিমান কাটাকাটি করা হয়েছে এবং যে রকম নিপুন ভাবে করা হয়েছে পুলিশের অভিজ্ঞতায় তা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়, নিশ্চয়ই যন্ত্রের ব্যবহার হয়েছে! আর একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার আছে – অসীম বাবুদের বিশ্বস্ত গত চোদ্দ বছরের পোষ্য এক বুড়ি গোল্ডেন রিট্রিভার যে সেই সারাদিন বাড়িতে ছিল, এবং তার শরীরে কোন আঘাত বা অন্য কোন আক্রমনের চিনহ পর্যন্ত নেই! আর আগের বারের মতো এবাব্রেও লাল রঙের তুলিতে বেডরুমের দেওয়ালে লেখা -

কাটা ছেঁড়া ঠুক ঠাক, কত দেখ যন্ত্র,

ভেঙে চুরে জুড়ে দেই তারও জানি মন্ত্র।

চোখ বুজে চটপট বড় বড় মূর্তি,

যত কাটি ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস তত বাড়ে ফুর্তি।

ঠ্যাং-কাটা, গলাকাটা কত কাটা হস্ত,

শিরীষের আঠা দিয়ে জুড়ে দেয় চোস্ত।

এইবারে বলি তাই, রোগী চাই জ্যান্ত –

ওরে ভোলা, গোটা ছয় রোগী ধরে আনত।

ঠিক এই রকম সময়ে কেসটার সঙ্গে ধ্রুব যুক্ত হয়, অসীম বসুর খুড়তুতো ভাই বর্তমানে কলকাতার ডিসি ডিডি। পারিবারিক প্রেস্টিজ জড়িয়ে যাওয়ায় তিনিই ধ্রুব কে নিয়ে আসেন। এটা একটা সিরিয়াল ক্রাইমের কেস, ধ্রুব এই রকম বেশ কয়েক টা কেসে আগে কাজ করেছে। এই কেস টা বোঝাও তেমন শক্ত নয়, প্রলয় সরকারের নিরুদ্দেশ হওয়া, তাঁর সুকুমার রায়ের ওপর প্রেম, তাঁর কবিতার ভাবের সঙ্গে মিলিয়ে অপরাধ করা – বোঝা টা শক্ত নয়। তাছাড়া নগেন সান্যাল, অসীম বসুর সঙ্গে প্রলয় সরকারের একসাথে বাংলা ম্যাগাজিনে কাজ করার সব খবর-ও ধ্রুব কয়েক ঘন্টায় জোগাড় করে ফেলে। ঘটনা গুলোকে সাজালে মেলে এই ভাবে যে, প্রলয় সরকার প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে আর নগেন সান্যাল, অসীম বসু কে ভয় দেখাচ্ছে সেটাও ঠিক আছে। হয়তো পরের আক্রমন হবে রণজয় ঘোষের ওপর, কিন্তু প্রচুর ফাঁক রয়েছে! বেশ কয়েকটা জিনিস মিলছে না! প্রতিহিংসা যদি হয় তাহলে এত দেরি হল কেন? পঁচিশ বছর বাদে? আর প্রাণহানির কোন চেষ্টা এখানে নেই, খালি আছে অপরাধ! মানে খানিক টা বুঝিয়ে দেওয়া আমি এসে গেছি, যে কোন দিন তোমার অনিষ্ট করতে পারি! দ্বিতীয়ত প্রতিহিংসা নেবার মতো কিছু হয়েছিল কি? পলিটিক্স করে নতুন লোক কে চেপে দেওয়া সে তো নতুন নয়, তাহলে? প্রলয় সরকার কি এতোই বোকা? অন্য কোন লাশ নিজের বলে রেল লাইনে ফেলে দিয়ে যাবে, আর সেটা পেয়ে পুলিশ তাকে সন্দেহ করবে না। শুধু শুধু তার ভায়ের নম্বরটাই বা পুলিশ কে জানানোর কি প্রয়োজন ছিল? কিছু না জানালেও চলতো! সে কি চাইছিলো যাতে ভাই খবর টা পায়! সে তো পুলিশ এমনিতেই বের করে ফেলতো, হয়তো দু-দিন বেশি সময় লাগতো! তাহলে? তারপর হাতের বা পায়ের ছাপটা সে লোকাচ্ছে কি করে? ধ্রুব নিজে গিয়ে বউবাজারে অসীম বসুর বাড়ীতে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করেছে, কিন্তু কিছু পায়নি! অবশ্য প্রাথমিক নিরাপত্তা হিসেবে রনজয় ঘোষের বাড়ি তে পুলিশ পোস্টিং হয়েছে। প্রায় এগারো দিন হয়ে গেছে এখনো কোন বাজে খবর আসেনি!

সমস্ত কেস ফাইল জোগাড় করে ধ্রুব পড়ছিল, সঙ্গে ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টের নিখিল ঘোষ। প্রায় এগারোটা হয়ে গেছে, ধ্রুব একমনে ভাবছিল। সামনের একটা বোর্ডে তার সমস্ত প্রশ্ন গুলো সে স্টিকি প্যাডের কাগজে লেখে আর সাঁটিয়ে দেয়। উত্তর পেলে সেটাকে খুলে দেয়, এটাই তার অনুসন্ধান পদ্ধতি! সন্ধ্যে থেকে অগুনতি সিগারেট হয়ে গেছে, কিছুতে ব্যাপারটা ধরতে পারছে না! আজ বিজয়া দশমী, শেষ তিন দিন লালবাজার থেকে বেরোয় নি ধ্রুব! মা এলেন আবার চলে যাবার দিন ও এসে গেল কিন্তু অপরাধী এখনো ধরা পড়ল না! নিখিল বাবু খালি বলছিলেন, “স্যার ভাইটা এর মধ্যে নেই তো!”

ধ্রুবর মন মানছে না! “তাহলে সে এখনো কলকাতায় বসে আছে কেন? এই রকম অসুস্থ শরীর নিয়ে? তার তো ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাবার কথা! আজকেও সকালে দাদার খোঁজে সে শ্যামপুকুর স্ট্রীট থানায় দু ঘন্টা কাটিয়ে গেছে!”

“না স্যার, আমি ভাবছিলাম একটু একা ডেকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করা – আর কি?”

“সে করা যায়, কিন্তু করবেন কি ভিত্তিতে? না ক্রাইম স্পটে তার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে, না সে তার পরিচয় গোপন করেছে, না তার মোবাইল রেকর্ডে কোন অসঙ্গতি আছে! তার ওপর ব্যাঙ্গালোর পুলিশ কনফার্ম করেছে উত্তর ব্যাঙ্গালোরে রাজাজিনগরে দেওয়া তার ঠিকানা ভুয়ো নয়! তাহলে?”

“কিন্তু ও ছাড়া ঘটনার মধ্যে কোন কি লিঙ্ক আছে আমাদের?”

“না সে হয়তো নেই, কিন্তু প্রলয় সরকার কে তো আমরা পুলিশ এখনো খুঁজে বের করতে পারিনি! সেটা কি তার ভায়ের দোষ? অত সহজে হবে না নিখিল বাবু, আরো ভাবতে হবে!”

চেয়ারে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল ধ্রুব। পুলিশ স্টেশনে এভাবে ঘুমিয়ে সে অনেক রাত কাটিয়েছে! সাড়ে তিনটের সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল একটা বিশ্রী ফোনের শব্দে।

“ধ্রুব গাঙ্গুলি?” এই গলা ধ্রুব আগে শুনেছে কিন্তু এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ল না,

“কে বলছেন?”

“আমি রণজয় ঘোষ বলছি”

“আপনার গলার এরকম অবস্থা কেন? ঠাণ্ডা লাগিয়েছেন নাকি?”

“আপনি একবার আসুন প্লিজ”

“আপনার ওখানে পুলিশ পোস্টিং নেই”

“জানি না! আপনি প্লিজ আসুন, আমাকে মেরে ফেলবে!”

“কে মেরে ফেলবে?”

“জানি না! আপনি আসুন!”

“শুনুন আমি আসছি, কিন্তু ব্যাপার টা বুঝুন! লালবাজার থেকে সল্টলেক যেতে আমার আধ ঘন্টা সময় লাগবে! এর মধ্যে যদি আপনার কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে আমাকে ইমিডিয়েটলী কিছু করতে হবে! পুরো ব্যাপার টা আমাকে খুলে বলুন!”

“আমি জানি না, আমি বলতে পারবো না! আপনি আসুন এই মুহূর্তে! আমার খুব বিপদ, আপনি কেন বুঝতে পারছেন না!”

“আপনি এখন কোথায়? আপনার বাড়ি তে?”

“না আমার বাড়ির ব্যালকনি তে! বাইরে থেকে কে বন্ধ করে চলে গেছে!”

“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখনি আসছি, আপনি ফোন টা ছাড়বেন না! আমার সঙ্গে লাইনে থাকুন, আমি কনট্রোল রুমে আপনাকে কানেক্ট করে রাখছি”

পুলিশি তৎপরতা ধ্রুব-র খুব জানা, তাই এই রকম কেসে কাজ করার সব সময়ে তার ফোন কনট্রোল রুমে কানেক্টেড থাকে, সুতরাং এই বিপদের কথা টা তাকে আর ধারাবিবরণী দিতে হল না, বিধাননগর পুলিশ স্টেশন থেকে তিনজনের একটা দল সঙ্গে সঙ্গে ছুটল করুণাময়ীতে রনজয়বাবুর বাড়ি, তাঁকে উদ্ধার করতে! রনজয় বাবুর ফোন টা লেগে থাকলো কনট্রোল রুমের সাথে, যাতে একটু হলেও ভরসা দেওয়া যায়। নিজের ভ্যানে ধ্রুব-র বেরোতে আরো পাঁচ মিনিট লাগলো, নিখিল বাবু –ও সঙ্গে রইলেন!

প্রায় চারটে পনের নাগাদ ধ্রুব যখন সল্টলেকে পৌঁছল পুলিশের অন্য দল রনজয় বাবু কে উদ্ধার করেছে। রনজয় বাবু ঠিক কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। একটা ভীষন শকের মধ্যে রয়েছেন, শোনা গেল ওনার স্ত্রী আর মেয়ে আজ রাতে ঠাকুর দেখতে গেছেন বাড়ির অন্য আত্মীয়দের সাথে, রনজয় বাবু ভিড় সহ্য করতে পারেন না, তাই তিনি বাড়িতেই একাই ছিলেন। আর তার মাঝে ই পুরো ব্যাপার টা হয়েছে! আপাত দৃষ্টিতে ঘর অক্ষত, রনজয়বাবু ও শারীরিক ভাবে সুরক্ষিত এবং শরীরে আঘাতের কোন চিনহ নেই। তবে অপরাধীর উদ্দেশ্য যে এক সেটা বুঝতে অসুবিধে হবার নয়!

ঘরের ড্রয়িং রুমের সাদা সুন্দর দেওয়ালে লাল তুলি তে লেথা সুকুমার রায়ের সেই বিখ্যাত ‘ভয় পেয়োনা’ কবিতার কয়েকটা লাইন –

হাতে আমার মুগুর আছে তাই কি হেথায় থাকবে না?

মুগুর আমার হালকা এমন মারলে তোমার লাগবে না!

অভয় দিচ্ছি শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?

বসলে তোমার মুন্ডু চেপে বুঝবে তখন কান্ডটা!

প্রায় একঘন্টা পর রনজয় বাবুর সাথে কথা হল। ভোর হয়ে গেছে, তিনি ও খানিক টা ধাতস্থ হয়েছেন, পারিবারিক ডাক্তার ও এসেছেন তিনি বললেন সে রকম চিন্তার কিছু নেই কারন প্রাথমিক শকটা কেটে গেছে, রক্তচাপ ও মোটামুটি স্বাভাবিক। ব্যাপার টা অনেক টা এই রকম ছিল – বেশ মধ্য রাত, ঠিক সময় জানা নেই তবে রনজয় বাবু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, সহসা ঘুম ভাঙ্গে! ভেঙ্গে দেখেন সামনে রাখা কাচের জলের জাগ টা কেউ যেন সম্পূর্ণ ভাবে তার মুখের ওপর উলটে দিয়েছে, সমস্ত মুখ এবং শরীরের ওপর অংশ এবং বিছানা ভিজে গেছে, বিরক্তি আর বিস্ময়ে বিছানা থেকে উঠে, হাত বাড়িয়ে আলোর সুইচ অন করলেন আর তারপর সেই ভয়ংকর দৃশ্য! হাত বাড়িয়ে চশমা টা যেই নিতে যাবেন চশমা টা নিজে থেকে চার ইঞ্চি সরে গেল। প্রথম টায় বুঝতে পারেন নি ভেবেছিলেন চোখের ভুল কিন্তু সে জিনিস আবার হল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার সময়! একাশি বছরের রনজয় সান্যাল ধাতস্থ হবার আগে আবার এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখলেন – এবারে বেড রুমের কোনে রাখা একটি ক্রিকেট ব্যাট – যেটি তাঁর নাতির সবচেয়ে প্রিয় খেলার সরঞ্জাম সেটি আপনা আপনি উঠে আসে আর প্রচন্ড জোরে ধেয়ে আসে তাঁকে আঘাত করার জন্য, কিন্তু আঘাত হয়নি। শেষ মুহূর্তে সেটি নিজে থেকে থেমে যায়। বেশ বার চারেক এই রকম চলতে থাকে, তবে শুধু ভয় দেখানো, শারীরিক কোন আঘাত নয়। তারপর আবার এক ভয়ংকর দৃশ্য! রনজয় বাবু বেড রুমে খুব সুন্দর সাজানো বই রাখা থাকে, এবারে আক্রমন সেই বই গুলোর ওপর! নিজে থেকে ছটা বই উঠে আসে আর তাদের মধ্যে বেশ জাগলিং চলতে থাকে, এবারে বেড রুমের আসবাব নিজে থেকে চলতে শুরু করে। কতক্ষন মনে নেই – তবে রনজয় বাবু শেষ পর্যন্ত ব্যালকনি তে আশ্রয় নেন। ভাগ্যিস মোবাইল ফোন টা পকেটে ছিল, তারপর কোন ভাবে ধ্রুব কে ফোন করেন।

আজ ৩০শে অক্টোবর – আজ দুই সপ্তাহ হয়ে গেল ধ্রুব এই কেস টা নিয়েছে, কিন্তু এখনো কিছু তেমন সুত্র পাওয়া যায় নি। সিরিয়াল ক্রাইমের সময় পুলিশকে অপরাধীর আগে ভাবতে হয় তবেই পরবর্তী অপরাধ টা আটকানো যায়, কিন্তু সত্যি এবারে অপরাধীর কাছে সে হেরে যাচ্ছে, একটা রহস্যের ও সমাধান সে পায়নি! বরং আরো বেড়েছে! বিকেল প্রায় চারটে, হটাৎ করেই সন্দীপ বাবুর ফোন এলো – “মিঃ গাঙ্গুলি আমি সন্দীপ বলছি! আমি কাল চলে যাচ্ছি এখান থেকে। খুব ইচ্ছে ছিল একবার আপনার সঙ্গে দেখা করার!”

“কাল আপনি ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাচ্ছেন?”

“জানি না তবে কলকাতা আর ভালো লাগছে না!”

“তাহলে কোথায় যাবেন?”

“চিন্তা নেই! আপনার কাছে ফোন নম্বর রেখে যাবো! দাদা কে খুঁজে পেলেন কিনা আমাকে জানতে হবে না? যাই হোক দেখা হবে আজ?”

“নিশ্চয় হবে! আমি আসছি! আপনাকে আর অসুস্থ শরীরে আসতে হবে না, আমি আসছি! ঘন্টা খানেকের মধ্যে আসছি”

শ্যামবাজার স্ট্রীটে প্রলয় সরকারের বাড়ীতে ই সন্দীপবাবু আপাতত রয়েছেন গত এক মাস, ধ্রুব নিজেই গাড়ি নিয়ে বেরোল! এই বাড়িতে গত দু-সপ্তাহে ধ্রুব বেশ কয়েকবার এসেছে, প্রলয় সরকারের দোতলার ঘরে বসেই কথা হল, সন্দীপ বাবু ই কথা বলছিলেন,

আপনাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম তখন ই মনে হয়েছিল আপনি সত্যি ভালো লোক, পুলিশে এই রকম লোক হয় না! না, আপনাকে কিছু লুকোব না। কিছু কথার বলার ছিল আপনাকে। আর আপনার ও জানার আছে অনেক! এ অনেক দিন আগেকার কথা! পুলিশ ফাইলে এতো কিছু পাবেন না! প্রলয় সরকার, নগেন সান্যাল, অসীম বসু, রনজয় ঘোষ এদের কথা আর সেই ‘সময়ের সঙ্গে’ ম্যাগাজিনের কথা তো আপনি জানেন! এটা তার কিছু দিন বাদের কথা! প্রলয় সরকার তখন মোটামটি বাদ পড়ে গেছে, স্বপ্ন গুলো তখন আগের মতো আসে না, লেখার ইচ্ছেও এখনো আছে আগের মতো - তবে পড়ার লোক নেই। বেশ কিছু কাগজে লেখা পাঠিয়েছে কিন্তু প্রায় সব জায়গাতেই রিজেক্টেড! আসলে আজগুবি থ্রিলার পড়তে কেউ চায় না! পাড়ার কোন দাদার কাছে হঠাৎ শুনল – কোন জাপানি টেলিভিশনের জন্য টালিগঞ্জের এক প্রোডাকশান হাউস নাকি এক খানা গল্প চাইছে! ছোটদের জন্য, কল্পবিজ্ঞানের ওপর! লিখে ফেলল সে - সুকুমারের সৃষ্ট চেল্লানোসেরাসের সাথে স্পিলবারগের ইটি-র দেখা হয়েছে আমাজনের গহন অরন্যে। কিন্তু পড়াবে কাকে? রনজয়দা র কথা মনে পড়ল, কারন সকলের মধ্যে রনজয়-দা কে তাঁর তুলনামূলক ভাবে ভালো লাগতো! পরদিন ঝামাপুকুর লেনের অফিসে দেখা করল সে – “রনজয়-দা ছাপাতে হবে না, খালি বলুন কেমন হয়েছে? একটা হাউস গল্প টা চাইছে, দেখি নেয় কিনা?”

– “ঠিক আছে তুমি রেখে যাও, পরশু এসো, পড়ে রাখবো”

পরশু এসে কোন ভালো মতামত সে পেলো না, আর পাবার কোন কারন-ও ছিল না! কারন এই ব্যাপার গুলো তাঁদের মতো গুণী সাহিত্যিকদের কাছে এক প্রকার ননসেন্স ছিলো! পাড়ার এক দাদাকে সে সব লেখা পড়াত, তিনি সেরকম কিছু জ্ঞানী না হলেও বললেন – ভালো হয়েছে! চার দিন বাদে আর আগে পিছু না ভেবে সমস্ত সাহসকে এক করেও লেখাটা জমা দেওয়া হল না। ক্রমাগত ব্যর্থতা আর লেখা নির্বাচিত না হওয়ার জন্য প্রলয়ের আত্মবিশ্বাস যেটা একদম তলানি তে ঠেকেছিল, সেটাই বোধহয় তাকে আটকালো। প্রায় দুমাস বাদে কোন ভাবে সেই প্রোডাকশান হাউসের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা! জানতে ইচ্ছে করল – কোন গল্পটা নির্বাচিত হল? লিখতে এখনো ভালো লাগে, তাই পড়তে তো তাকে হবেই। গল্প টা পড়ার সুযোগও সে পেল, পরদিন! কিন্তু পড়তে দুই সেকেন্ডের বেশি সময় লাগলো না! তার লেখা গল্প টা যেটা ঝামাপুকুর লেনের অফিসে জমা ছিল সেই দু রাত্রের মধ্যে নকল হয়ে গেছে, আর এই প্রোডাকশান হাউস সেই গল্প টাকে কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে কিনেছে, শুধু লেখকের নাম আলাদা। রাগ, দুঃখ, অভিমান, হতাশা, বেদনা, অশ্রু – সব কিছু একাকার হয়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ল ঝামাপুকুর লেনের সেই অফিসে – “রনজয়-দা এটা কি করলেন?”

“প্রলয় তুমি একটা সত্যি ননসেন্স! এক্ষুনি বিদেয় হয়!”

জোর করে তাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হল! প্রলয় সরকারের সাহিত্যিক হওয়া আর হল না!

সন্দীপবাবু থামলেন, সামনে রাখা বোতল থেকে খানিক টা জল খেয়ে আবার শুরু করলেন। পাশের বাড়ি থেকে খুব চাপা আওয়াজে গান শোনা যাচ্ছে – “শীর্ষেন্দুর কোন নতুন নভেলে, হঠাৎ পড়তে বসা আবোল তাবোলে”, শুরু করতে গিয়ে সন্দীপবাবু থেমে গেলেন, হয়তো খেয়াল হলো ধ্রুবর হাতে একটা সিগারেট অনেকক্ষণ ধরে ধরা, তবে এখনো সেটা ধরায় নি! “আপনি সিগারেট খেতে চাইলে খেতে পারেন।”

“না ঠিক আছে, আপনি বলতে থাকুন!”

“এদিকে কপর্দকশুন্য প্রলয়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকল, শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সমস্ত দিক থেকে! চরম এক মানসিক অবসাদ তাকে গ্রাস করল! হঠাৎ করে মধ্যপ্রদেশে অমরাবতী চলে গেল সে – ভাবতে পারেন ট্রেনের জেনারেল বগিতে চেপে, প্রেসিডেন্সি, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের ঐ রকম এক সম্ভাবনাময় ছাত্র, একসময়ের লেখক প্রলয় কলকাতা ছেড়ে অমরাবতী চলে গেল, কেন? কেন সে নিজেই জানেনা! কিন্তু ভগবান অন্য রকম ভেবে রেখেছিলেন! সেখানে দেখা হয়ে গেল প্রেসিডেন্সীর শিক্ষক – প্রফেসর সুজয় মুখার্জির সাথে। আবিবাহিত, ছাত্র-অন্ত প্রাণ, এক দেখায় চিনতে পারলেন আট বছরের পুরোনো মেধাবী ছাত্রকে, তারপর এক মাসের চেষ্টায় মানসিক রোগের কিনারা থেকে টেনে আনলেন তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে। নিজের সব টাকা পয়সা দিয়ে রাঁচি তে নিজের বাড়িতে এক ল্যাবরেটরি বানিয়েছিলেন তিনি – সেই ল্যাবরেটরি প্রলয় সরকারকে এক নতুন জীবন দিল! এক বছর বাদে প্রফেসর মুখার্জি চিরতরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, কিন্তু যাওয়ার আগে নিজের সব কিছু, টাকা – পয়সা, বাড়ি, ল্যাবরেটরি সব, প্রলয়কে দিয়ে গেলেন। কে যে বলে ভগবান নেই! যা হোক, এবারে সাহিত্য সে একেবারে ভুলে গেল, কিন্তু ভুলতে পারলো না সেই তিন ব্যক্তিত্ব কে, যারা তাকে সাহিত্যিক হতে দেয়নি! এবারে শুরু হল রিসার্চ! উদ্দেশ্য তাকে এক অপরিসিম বুদ্ধিমান রোবট বানাতে হবে!”

“রোবট?”

“আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শিখতে এগারো মাসের জন্য প্রলয় গেল – কানাডা! আর ব্যাপার টা সেখানে-ই মাথায় এলো! চার থেকে পাচ ইঞ্চির বেশি লম্বা হবে না, তবে অপরিসীম বুদ্ধি, অমানুষিক শক্তি হবে, যে কোনো কাজ করার জন্য সে হবে সক্ষম এবং সাবলীল! প্রায় কুড়ি বছরের অক্লান্ত প্রচেষ্টার পর রাঁচির সেই ল্যাবরেটরিতে সেই রোবট তৈরি হল! তার হাতের কোন ছাপ নেই, সে হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে না, সুতরাং অপরাধ করলে তাকে ধরা সম্ভব নয়, সে আকারে এতো ছোট অন্ধকারে সে একটা গ্লাস সরালে মনে হবে – গ্লাস টা নিজে নিজে সরে যাচ্ছে, গোল্ডেন রিট্রিভার তার গায়ের কোন গন্ধ পাবে না, সুতরাং সেখান থেকে ও কোন বিপদ নেই, বিনা শব্দে সে কোন জিনিস ভেঙ্গে ফেলতে পারে অথবা দেওয়ালে লাল তুলি দিয়ে শেখানো বুলি লিখতে পারে আর... “

“এক মিনিট! ক্রাইমের এতো ডিটেল আপনি জানলেন কি করে?”

হালকা হাসলেন সন্দীপ বাবু, তারপর বললেন “প্রলয় সরকারের তো কোন ভাই তো কোনকালেই ছিলো না!”

“মানে? আপনি-ই!” ধ্রুব একটা মস্ত বড় ধাক্কা খেল।

সম্মতিসুচক মাথা নেড়ে উত্তর এলো “হ্যা আমিই প্রলয় সরকার! শেষ দুবছর ধরে দুটো আইডেন্টিটি আছে আমার – একটা কলকাতায় প্রলয় সরকার আর একটা ব্যাঙ্গালোরে সন্দীপ সরকার! একটু পোশাক–পরিচ্ছদ পাল্টাতে হয় থেকে থেকে! পুরোনো কেস তো! পুলিশ ও খোঁজ নেয়নি আর ব্যাপার গুলো সাজাতে আমার খুব অসুবিধা হয়নি!”

চোখের সামনে অপরাধী বসে, সে নিজের অপরাধ স্বীকার করছে এবং ধীরে ধীরে রহস্য উন্মোচন হচ্ছে, ধ্রুব একজন নীরব দর্শক! সত্যিই এবারে হেরে গেল ধ্রুব। অনেকক্ষণ ধরে আঙ্গুলের ফাঁকে ধরে থাকা সিগারেট টা এবারে ধরিয়ে ফেলল! কষ্ট করেই বলতে হল, “পুরো ব্যাপার টা শুনি, শুরু থেকে বলুন!”

“মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে একটা পুরোনো লাশ সরিয়ে সেটাকে ফেলা হয় দমদম স্টেশনের কাছে! পকেটে একটা ফোন নম্বর – যাতে পুলিশের কোন ভাবে সন্দেহ না হয় সন্দীপ আর প্রলয় আসলে এক লোক! তাছাড়া ঘটনা গুলো যখন কলকাতায় হবে তখন সন্দীপ কে কলকাতায় থাকতেই হবে! আর প্রথম মোলাকাতেই পুলিশের সহানুভূতি সে জিতে নিল! তারপর যা করেছে সব করেছে সেই ননসেন্স!”

“ননসেন্স?”

“হ্যাঁ, প্রলয় সরকারের তৈরি রোবট! তার নাম ননসেন্স! যা হোক, সন্দীপ রোজ থানায় হাজিরা দিতো যাতে পুলিশের কাছ থেকে নগেন সান্যাল, অসীম বসু আর রনজয় ঘোষের গতিবিধি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়! তারপর খালি সময়ের প্রতীক্ষা”

“কিন্তু আপনি সত্যি বিশ্বাস করেন আপনাকে আমি যেতে দেব? এতো কিছু শোনার পর কেস টা হারতে গেলে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হবে!”

“আমি জানি, বিকেল বেলার ফোন টার পর থেকেই আপনি আমায় সন্দেহ করছেন। তাই আপনার ফোনে এই সব কথা রেকর্ড করে নিয়েছেন! তাই তো? কিন্তু আমার ননসেন্স আছে যে! সে আপনাকে এসব নিয়ে যেতে দেবে না! দেখুন তাহলে! আপনাকে একটা ডেমো দেখাই!”

হাতে ছোট একটা রিমোট, সেটা তে চাপ পড়তে টেবিলের তলা থেকে ছয় ইঞ্চি র এক নিকস কালো কিন্তু অসম্ভব চকচকে একটা রোবট বেরিয়ে এল, যার ওজন খুব বেশি হলে – চার কেজির মতো হবে! দেখতে ঠিক একটা খেলার পুতুল! এক অদ্ভুত কায়দায় সরীসৃপের মতো সে চেয়ারে উঠল তারপর সন্দীপ ওরফে প্রলয়ের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে নির্দেশের অপেক্ষায়! ধ্রুব অবাক দৃষ্টি তে দেখতে থাকে, নির্দেশের কয়েক সেকেন্ড বাদে এক অসম্ভব দ্রুত গতিতে সে ধ্রুব–র সামনে এসে দাঁড়ায় , তারপর আবার সরীসৃপের মতো চেয়ারে ওঠে যেখানে সে বসে আছে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগে ধ্রুব-র প্যান্টের পকেট থেকে তার মোবাইল টা বার করে ফেলে। তারপর অ্যানড্রয়েডের ভয়েস অপশনে – সেখানে থাকা ৪৭টা ফাইলের মধ্যে একটি ফাইল ডিলিট করার ঠিক আগের ধাপ পর্যন্ত যায় এবং থেমে যায়। সুতরাং সে এতোটাই বুদ্ধিমান – কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যে সে বুঝে যায় কোন ফাইলে এই কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে! এত বিস্ময় বা এত ভয় ধ্রুব আগে কখনো পায় নি। মাথা দপদপ করছে, গলার স্বর শুকিয়ে গেছে, ঘোর ভাঙল সন্দীপ বাবুর গলার শব্দে – “আপনি একটু জল খাবেন? ভয় লাগছে? না? কিছু করবে না। ওকে আমি আর কিছু বলিনি! আর আপনি বলছিলেন না আমাকে যেতে দেবেন না, রাখতে আমাকে আপনি পারবেন না! এমনি তে আমার ফুসফুসে মারণ রোগ, বেশিদিন আমার থাকার কথা নয়। তাছাড়া এই আপনি আসার আগে এগারোটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছি বড্ড ঘুম পাচ্ছে – আর বড় জোর দশ মিনিট! কিছু প্রশ্ন থাকলে করে নিন।“

“আপনার সাহিত্যের গুরু এসব জানলে খুশি হতেন? যদি জানতেন এভাবে আপনি অন্য কে মৃত্যুভয় দেখাচ্ছেন!”

“কে বললে আমি তাঁকে খুশি করতে এই কাজ টা করেছি। তাঁকে খুশি করতে অনেক লেখা লিখেছিলাম, কেউ তো সেসব পড়লোই না! যাক যা হয়েছে ভালো হয়েছে! আর আমার তো কোন সেন্স নেই, তাই খালি ভয় দেখিয়েছি। যদি সেন্স থাকতো তাহলে মানুষের স্বপ্নকে খুন করতাম!”

“বুঝলাম অনেক বাজে ব্যাপার হয়েছে আপনার সাথে! কিন্তু লেখক হয়ে স্বীকৃতি পেলেন না বলে এই রকম অসামাজিক কাজ করলেন কেন?”

“কোথায় অসামাজিক কাজ দেখলেন! এই তো আপনাদের সমাজে দিয়ে গেলাম – ননসেন্স, ওকে কেউ কোনদিন ধ্বংস করতে পারবে না। ঠিক যেমন কেউ কি পারবেন আবোল তাবোল কে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে? ট্যান্টানাম হাফনিয়াম কার্বাইড দিয়ে তৈরি – ওকে ধ্বংস করতে গেলে আপনাকে ৪১৯৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা লাগবে! পৃথিবীতে পাবেন না! বুধ গ্রহে যেতে হবে, আর ওকে আপনি ডায়মন্ড কাটার দিয়ে কাটতে-ও পারবেন না। আর একটা কথা, ওর শরীরে কোন ফ্রিকশান নেই, ওকে আপনি হাতে করে ধরতে পারবেন না। মারকারির মতো! পিছলে যাবে! খালি ও আপনার সঙ্গে থাকবে! আর আপনার নির্দেশ মেনে চলবে! হাঁটার সময় ওর পায়ের নীচ থেকে পাঁচ টা স্পাইক বেরিয়ে আসে! আর কাজ যা করার সব কিছু ম্যাগনেটিক ফোর্স দিয়ে করবে। কোন কম্পিউটার, কোন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের দরকার নেই, শুধু ওকে মুখে বলবেন কি করতে হবে! সাড়ে তিনশোর বেশি ভাষা বোঝার ক্ষমতা ওর আছে! আর সব কিছু পারে ও! আপনি তো দেখেওছেন!”

একটু থামলেন প্রলয় ওরফে সন্দীপ, আবার বললেন

“আজ ৩০শে অক্টোবর! ১৮৮৭ সালে বিধুমুখী দেবীর কোল আলো করে পৃথিবী তে এসেছিলেন সুকুমার রায়, আর আজ ননসেন্সের সামাজিক জন্ম হল! দেখবেন অন্য কোন বাজে লোকের হাতে যেন ও না পড়ে, তাহলে কিন্তু পুরো ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে যাবে ও! সারা পৃথিবীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে ও! আর একটা অনুরোধ রইল – পুলিশের খাতায় প্রলয় সরকারের মৃত্যু দিন ১০-ই সেপ্টেম্বর –ই রাখবেন, সারা পৃথিবী কে কাঁদিয়ে সেদিনই তো চলে গেছিলেন সুকুমার! বিদায় বন্ধু, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোন থ্রিলার শেষ হয় না! বুঝলেন!

ফিরিবার পথ নাহি,

দূর হতে দেখ চাহি,

পারিবে না চিনিতে আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়”

আর কথা শোনা গেল না, এবারে চোখ বুজলেন প্রলয় সরকার! কোন ভাবে ডান হাতের জামা টা অনেক খানি উঠে গেছে আর তার নীচ দিয়ে বেগুনি রঙের উল্কি তে উঁকি দিচ্ছে গোমড়াথেরিয়াম! সত্যি রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোন কিছুই শেষ হয় না! পাশের বাড়ির রেডিওতে এবারে চাপা আওয়াজে শোনা যাচ্ছে,

“নীরব নিশি তব চরণ নিছায়ে

আঁধার-কেশভার দিয়েছে বিছায়ে।

আজি এ কোন্‌ গান নিখিল প্লাবিয়া

তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া!

ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে,

গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে”

ধ্রুব চুপ করে বসে আছে, সামনে দু হাত দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছয় ইঞ্চি লম্বা অবিনশ্বর ননসেন্স, এক দৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে, অপেক্ষা করছে পরবর্তী নির্দেশের জন্য।

** সুকুমার রায় আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার দু চার পঙক্তি ছাড়া বাকি টা পুরোটাই কাল্পনিক। অলঙ্করনের স্বার্থে ইন্টারনেট সুত্রে পাওয়া সুকুমার রায়ের অঙ্কন ব্যবহার করা হল ।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮