• সব্যসাচী রায় চৌধুরী

গল্প - একটু আলোর জন্য

এক আধদিনের ব্যাপার নয়।কত বছরের সাধ ছিল অনিলের মনে। কী সে করেনি? মিউনিসিপ্যালিটিকে ধরেছে, ইলেকট্রিক ডিপার্টমেণ্টকে সেধেছে, ওয়ার্ড কমিশনারকে বলেছে। তবু হয়নি।

দুটো বড় রাস্তাকে যোগ করেছে এই গলি। গলির পাশে অনিলের ঘর। বড় রাস্তায় টিউবলাইটের আলো , মাঝের গলিটা অন্ধকার। গাঢ় নয়, তবে বেশ আবছা। বড্ড অসুবিধা হয়। রিকশা , সাইকেল ,মানুষজনের তো বটেই , এমনি,- যারা সন্ধেয় বা রাতে অনিলের ঘরে আসেন, তাঁদের - দু’পাশের ড্রেন , রাস্তার ময়লা , ভাঙ্গা রাবিশ , ট্যাপওয়াটারের পাইপ , এ সব বাঁচিয়ে দরজার ঠিক সিঁড়িতে পা রাখতে হিমশিম খেতে হয়। গরীবের কথা কে শোনে! মিউনিসিপ্যালিটির অফিসার ডেঁটে দিলেন – অতো সস্তা নয় হে, লাইট দেন বললেই কি লাইট দেওয়া যায় ? সবেরই একটা সিস্টেম আছে। অনিল জানে তার কোন পায়াজোড় নেই। সরকারী চাকরি করে না । বাজারে ফল বেচে খায়। সব সিস্টেমের খবরও রাখে না। ইলেকট্রিক অফিসের বাবুরা বললেন – এটা আমাদের জুরিডিকশন নয়। মানে বুঝতে পারে নি অনিল। পরে তারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন , এটা তাদের কাজের আওতার মধ্যে পড়ে না। শেষে একদিন শম্ভুর সাথে দেখা হল। ইলেকট্রি্কের কাজ করে। অনিলের চেনা । তাকেই বলল, দাও না ভাই শম্ভু – একটা বাল্ব ঝুলিয়ে । তোমাদের তার তো চলেই গিয়েছে ঘরের পাশ দিয়ে । তোমাদের কত সরঞ্জাম । ইচ্ছে করলেই পার। তা, শম্ভু পাত্তাই দিলে না। - কেন, জানালা দিয়ে রাস্তার ফ্রি আলো ঢুকলে নিজের ইলেকট্রি্কটা বাঁচাবে নাকি রেতের বেলায় বউ-এর মুখ দেখবে-অ্যাঁ ? ইয়ার্কি করে , লম্বা মই কাঁধে করে চলে গেল শম্ভু ও তার জুড়ি । তা, ইয়ার্কি সে করতেই পারে। কথার ওপর এখনও কোন ট্যাক্স নেই।

আর এ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় নি অনিল। ক’মাস চুপচাপই ছিল। কিন্তু সেদিন তার বউ যা বলল আর যা দেখালো তাতে আবার সে অস্হির হয়ে উঠল । মনে হল, না- এটা করা দরকার। লাইটের ব্যবস্থা একটা করতেই হবে। অন্ধকারের সুযোগ নিচ্ছে সব। বিরক্তিতে ভরে গেছে তার মন।

সব সবিস্তারে বলে শেষে বউ বলল , কথাটা তুমি শ্যামলবাবুকে বলবে নাকি? অনিল হাত নেড়ে বলল, মাথা খারাপ? এসব কথা কি বাপকে বলতে হয়? পাড়ার চেনা মেয়ে। শ্যামলদা ভাববে আমি তার মেয়ের বদনাম করছি।

-তাই বলে , ঐ সব নোংরামো করবে নাকি? আমাদের ঘরের সামনে? হুমদো মতো ছেলেটা কোন পাড়ার কে জানে? দিনের বেলা সাইকেল নিয়ে ঘুরঘুর করে আর সন্ধ্যে্বেলায় , অন্ধকারে- এই সব! ছিঃ! রাগ, বিরক্তি, ঘেন্না সব একসঙ্গে ঝরে পড়ছিল অনিলের বউ –এর গলায়।

তা আমি কী করব? অনিলও ঝঙ্কার দিল। তারও ভিতরে ছিল রাগ। হতাশার ক্ষোভ। সব কিছুই তো একটু আলোর অভাবে।

এর মধ্যেই একদিন এক রিকশা কাত হয়ে পড়ল ড্রেনের মধ্যে । বুড়ি মতো এক যাত্রীর হাতটা ভেঙ্গেই গেল বোধহয় । টর্চ নিয়ে ছুটে গেল অনিল, আর দু’চারজন প্রতিবেশী । বোঝা গেল একটা কালো গরু শুয়ে ছিল গলিতে, রাতকানা রিকশাওয়ালা সেটা ঠিক বুঝতে পারে নি অন্ধকারে । অনিল মনে মনে বলল , ঠিক হয়েছে। এরকম হোক দু’চারটে । তবে যদি কিছু হয়-

কিন্তু মাস দুয়েক পরেই নিজের চোখে যা দেখল অনিল, মানে , বউ যা দেখাল, তাতে আর চুপ থাকা গেল না। চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল তার। ঘেন্নায় গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করল। তার ঘরের পাশের একটুখানি ফাঁকা জায়গায় নতুন একটা গ্যারেজ হয়েছে বিশ্বাসবাবুদের । ফলে পাশের জায়গায় একেবারে অন্ধকার এবং নিরালা দুটো লোক কোনোক্রমে দাঁড়াতে পারে। তো , সেখানেই রেল কলোনীর কোনো পাউডার মাখা মেয়ে আর অচেনা একটা মাঝবয়সী লোক । একেবারে প্রাপ্তবয়স্কের দৃশ্য । জোরে জানালাটা বন্ধ করে দিল সে, যাতে শব্দটা গ্যারেজ পেরিয়ে ওদের কানে পোঁছায় ।

ওয়ার্ড কমিশনার মধুবাবু। খুব কাকুতি করে বলল অনিল। এমন কি সে সন্ধ্যের ঘটনাটিও বলল খুব ভদ্র করে। মধুবাবু হাসলেন। এতে হাসির কি আছে বুঝতে পারল না অনিল। শেষে মধুবাবু বললেন , বেশ তো , একটা দরখাস্ত করে দাও, দশপনের জনের সই দিয়ে। একটা বাল্ব , মানে একটা রেকারিং খরচা তো , দেখি কি করা যায় ! তোমার জন্যই না হয় বিশেষ করে বলব চেয়ারম্যানকে । অনিল বিগলিত হয়ে গেল। উৎসাহ ফিরে পেল দু’গুন । পাশের রাস্তার উপরেই থাকেন

প্রফেসরবাবু। ওঁকে গিয়ে বলল, বেশ একটু জোরালো করে লিখে দিন তো স্যার , সই আমি করিয়ে নেব । দরখাস্ত লেখা হল , সই হল বারোজনের , দেওয়াও হল মধুবাবুকে । সেও প্রায় বছরদুয়েক তো হবেই ।অবস্হা যে তিমিরে সেই তিমিরে। লাইট হয়নি। মিউনিসিপ্যালিটির ভোটের এখনও দেরি আছে – এই কথা বলল সবাই।

শেষমেশ আবার শম্ভু । অনিল তার হাত ধরে বলল, ও শম্ভু , একটা উপায় হয় না ভাই?- ওঃ তুমি যে একেবারে ছিনে জোঁক হে।

-না,না; ব্যাপারটা তুমি বুঝছ না। আসলে, বউ নিয়ে সংসার করি। সে বেচারি অ-দৃশ্য , কু- দৃশ্য সইতে পারে না। কেই বা পারে বল? – শম্ভুকে সে বলল ঘটনাটা।

শুনে সে খানিক হাসল খ্যা খ্যা করে। বলল, তা ভালই তো হে। বিনেপয়সায় বুলু দেখছ। তুমি কেন তাদের বাড়া ভাতে ছাই দেবে? গলায় মিনতি ঢেলে অনিল বলল , না না- ইয়ার্কির কথা নয় ভাই। খুব সিরিয়াস। তখন শম্ভু একটু গম্ভীর হল। হাসি থামিয়ে বলল, খরচা করতে পারবে?

কত?

এই ধর, পঞ্চাশ।

পঞ্চাশ? গলা খাদে নেমে যায় অনিলের।

বেশ, তিরিশ।

কুড়িতে হয় না? মিনমিন করে বলল অনিল।

কুড়ি? না, পঁচিশ দিও। তবে বাল্ব, হোল্ডার, তার-খরচা সব তোমার কিন্তু। মানে সেও গোটা পনের বটে । আর বাল্ব কেটে গেলে তোমাকেই পাল্টাতে হবে।

বেশ বেশ, তাই হবে। আমি বাল্ব-তার কিনে দেব। তুমি শুধু লাগিয়ে দিও।

অতি উৎসাহে, সাড়ে সতের টাকা খরচ করে একটা একশ’ ওয়াটের বাল্ব, একটা হোল্ডার আর খানিকটা রবার-মোড়া তার কিনে আনল অনিল। শম্ভুর হাতে দিয়ে বলল, কাল ভাই আমি থাকব না। ফল কিনতে যাব আসানসোল । তুমি কিন্তু ঠিক লাগিয়ে দিও যেন ।শম্ভুর হাতে পঁচিশ টাকা – বড্ড মায়া হচ্ছিল , ফলের বিক্রি বাটা একেবারে মন্দা- তবু একটা আশার আলোয় তার হাতে পঁচিশ টাকা ধরিয়ে দিল সে।

পরের দিন দুপুর নাগাদ সে যখন আসানসোলে ফলের দোকানে - , একটা গুনগুন আনন্দ মনের মধ্যে গান গাইছিল তার।

আঃ । তারপর সত্যিই আনন্দ। সন্ধের মুখে ঘর ঢুকবার আগে দূর থেকেই অনিল দেখতে পেল রাস্তার তারের সঙ্গে ঝোলানো একটা নতুন ঝকঝকে বাল্ব থেকে সাদা উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ে সমস্ত রাস্তাটা একেবারে ভাসিয়ে দিচ্ছে । গলির মধ্যে কোথাও এতটুকু আঁধার নেই, মলিনতা নেই, ক্লেদ নেই। কেমন যেন একটা পবিত্র-শুঁচি ভাব।

ঘরে ঢুকে দেখে বউয়ের মুখেও হাসির আলো উপচে পড়ছে। সে বারে বারে জানালার কাছে গিয়ে দেখছে আলো কতদূর ছড়িয়েছে । অনিলও দু’বার ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার কাছে গিয়ে খাতা-পেন্সিল নিয়ে হিসেব কষা যায় কিনা পরখ করে দেখছিল । না, তা যায় না বটে , তবে রাস্তাটা একেবারে ঝকঝক করছে। মনটা খুশির বন্যায় ভেসে গেল তার। ছেলেবেলায় পড়া ইংরাজি গল্পটা মনে পড়ে গেল তার- চেষ্টা থাকিলেই উপায় হয়। বউকে বলল , দেখলে তো!

পাড়ার সবাই বলল, এতদিনে ভাল একটা কাজ করেছে মিউনিসিপ্যালিটি । অনিল আর ভাঙ্গেনি রহস্যটা । বলুক না মিউনিসিপ্যালিটির নাম- সে আর শম্ভু তো জানে- আসল কাজটা কে করেছে।

দু’দিন; ঠিক দু’দিন কেটেছিল ।

আজ সকালে , কি কুক্ষনে, কার মুখ দেখে উঠেছিল অনিল। সকালে উঠে জানালার দিকে তাকিয়েই তার বুকটা ঝনঝন করে উঠল । দেখে বাল্বটা ভাঙ্গা! রাস্তায় অজস্র পাতলা কাঁচের টুকরো । ঢিল মেরে ভেঙ্গে দিয়েছে কে। কালো হোল্ডারটা ফলহীন বোঁটার মতো ঝুলছে ন্যাড়া তারে। একটা ভয়ঙ্কর দমবন্ধ করা চাপা কষ্ট অনিলকে বাকরুদ্ধ করে দিল। পঁচিশ আর সাড়ে সতেরো – মোট সাড়ে বিয়াল্লিশ টাকার কষ্ট নয়। অন্য একরকম কষ্ট ।

অনিল বোঝে নি। বোঝা উচিত ছিল। সবাই কি আর আলো চায়?

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮