• শ্রাবস্তী সেন

ভ্রমণ - জলে জঙ্গলে


প্রত্যন্ত গ্রাম কথাটার সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত । কিন্ত এইরকম একটা গ্রামে আমরা শহরের লোকেরা খুব বেশি লোক গেছি বলে মনে হয়না । আমাদের একবার সৌভাগ্য হয়েছিল এইরকম একটা অজ গ্রামে যাবার। এই সফরটা ছিল যাকে বলে রথ দেখা কলা বেচার মতন। এক সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রাম দেখা ও ভারতবর্ষের একটা অভয়ারণ্য দেখা, সুযোগ এসে গেছিল হটাৎ করে। ভিতরকনিকা অভয়ারণ্য উড়িষ্যার কেন্দ্রপাড়া অঞ্চলে অবস্তিত। মূলত কুমির সংরক্ষনের জন্য এই অভয়ারণ্য বিখ্যাত।

হাওড়া স্টেশন থেকে ধোউলি এক্সপ্রেসে চড়ে বেলা এগারটা নাগাদ আমরা ভদ্রক পৌঁছলাম। ভদ্রক থেকে যেতে হয় চাঁদবালি বলে একটা জায়গাতে। প্রায় ৬০ কিমি রাস্তা। রাস্তার অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। মাঝে একটা জায়গাতে আবার কি নিয়ে অবরোধ থাকায় আমাদের একটু ঘুরে যেতে হল।মধ্যিখানে এক জায়গাতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা লাঞ্চ সেরে নিলাম।

বেলা তিনটে নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম ব্রাহ্মনি নদীর তীরে।বিশাল চওড়া নদী- এপার থেকে ওপাড় দেখা যায়না। কিছুক্ষণ পরে সেখানে একটা মোটরবোট এল, যাতে চরে আমরা রওনা দিলাম। যে দিকে তাকাই শুধু জল আর জল।এত চওড়া নদী এর আগে খুব বেশি দেখিনি তা বলাই বাহুল্য। বেশ কিছুক্ষণ পরে নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছলাম। এখানেই সেই গ্রাম যার নাম “দাঙ্গামল”। আমাদের থাকার জায়গা ও এই গ্রামেতেই। এখানে যানবাহন বলতে ভরসা শুধু সাইকেল ভ্যান। মালপত্তর নিয়ে আমরা তাতেই চড়ে বসলাম। পুরো রাস্তাটাই মাটির কাঁচা রাস্তা।

শহরের লোক আমরা ইলেকট্রিকের ওপর কতোটা নির্ভরশীল সে ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্ত আমাদের চেনা পরিবেশের বাইরে যে ভারতবর্ষ রয়েছে তা আমাদের অজানা।এখন ও এই গ্রামে বিদ্যুত সংযোগ আসেনি। আর এখানে বেশির ভাগ বাড়ি মাটির তৈরি। একতলা বাড়িগুলোর গায়ে মাটির দেয়ালে সুন্দর করে আলপনা আঁকা। গ্রামের মানুষদের দেখলে বোঝা যায় যে এরা বেশ গরীব। যাইহোক এর মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের থাকার জায়গাতে।

আমদের থাকার জায়গাটা গ্রামের অন্যান্য বাড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। রাস্তার ওপর একটা মাটির বাড়ির মতন। তার ভেতরে ঢুকলে একটা খোলা চত্তর যেখানে পরপর তাঁবু খাটানও রয়েছে। বেশ সুন্দর ব্যবস্থা।আমাদের ক্যাম্পে অবশ্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও এরা আলো জ্বালায় শুধু রাতে খাবার সময়, ও ঘুমোনোরর সময়। যাইহোক আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে আশেপাশে একটু ঘুরতে বেরলাম। চারদিকে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। রাস্তায় মানুষ জন বিশেষ নেই। কিছুক্ষণ পরে একজন লোক দেখতে পেলাম। সে আমাদের নিয়ে গেল ধানক্ষেতের দিকে। অন্ধকারে টর্চ ফেলতে দেখতে পেলাম কোন ও অজানা জন্তুর অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা চোখ। ধানক্ষেতের জল খেতে এসেছে একটা হরিণ।ক্যাম্পে ফেরার সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখলাম। গ্রামের কোনও লোক বোধহয় মারা গেছেন, তাকে সৎকার করতে নিয়ে যাবার আগে গ্রামটা ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।যে বাড়ির সামনে সেই মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে, সেই বাড়ির মহিলারা বেরিয়ে এসে উলুধ্বনি করছে।আমাদের বাঙ্গালির দের কাছে উলুধ্বনি শুভকর্মের প্রতিক, কিন্তু এখানে আলাদা৷

পরের দিন সকালে উঠে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম অভয়ারণ্যটা ঘুরে দেখতে৷ ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য মূলতঃ তিনটে অভয়ারণ্যর সমষ্টি৷ সেগুলি হল-“ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য”,”ভিতরকণিকা স্যানটুয়ারি”, ও “গহিনমাথা মেরিন স্যানচুয়ারী”৷ বাহ্মণী, বৈতরণী, ধমা, পাঠশালা ইত্যাদি সুন্দর নামের নদীদের সহাবসথান এই জায়গায়৷ যদিও এই অভয়ারণ্য প্রধানত লবণ জলের কুমিরের জন্য, কিন্তু এখানে আরো অন্যান্য জন্তু ও পাখিদেরও দেখা পাওয়া যায়৷ যেমন চিতাবাঘ, মেছোবিড়াল, হায়না, বন্য বরাহ, চিতল হরিণ, শজারু, পাইথন, কোবররা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য৷ পাখিদের মধ্যে মাছরাঙা, কাঠঠোকরা, ধনেশ, ব্রাহ্মণী হাঁস বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য৷ অভয়ারণ্যে ঢোকার দুটি গেট আছে, যথাক্রমে “খোলা”,”গুপ্তি”৷

আমরা সকলে গিয়ে লঞ্চে উঠলাম৷ এই নদীগুলোতে কুমীর এত বেশি যে কেউ এখানে মাছ ধরতে যেতেও সাহস করেনা৷ আমরা যখন লঞ্চে উঠছি তখন দেখলাম জেটির থেকে কিছুদূরে নদীর পাড়ে একটা বড় কুমীর শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে৷ আমাদের যে মাঝি সে বললো যে এখানে প্রায় ২৫০০ টা মতন কুমীর রয়েছে৷মাঝি আমাদের দেখালো একজায়গাতে একটা বাছুর কে অদ্ধেক খেয়ে কুমীর ফেলে রেখে গেছে৷ ২০০৬ সালে গিনেস বুক্ অফ ওয়াল্ড রেকর্ডে রেকর্ড করা হয়েছে প্রায় ২৩ ফুট লম্বা একটা কুমীর রয়েছে এই ভিতরকণিকাতে৷ নদীর দুপারে শুধু ম্যানগ্রোভ গাছের জঙ্গল৷ ভারতবষের দ্বিতীয় বৃহৎ ম্যানগ্রোভ জঙ্গল রয়েছে এখানেই৷

গহিরমাথা বিচ-এ অলিভ রিডলী কছ্ছপরা ডিম পাড়তে আসে৷ বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত এই বিচ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিম পাড়ার জায়গা এই প্রজাতির কচ্ছপের৷ সূদূর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে এই কচ্ছপরা এখনে ডিম পাড়তে৷পুরো অভয়ারণ্যর মধ্যে মাত্র দুটো দ্বীপে নেমে পায়ে হেঁটে ঘোরার অনুমতি রয়েছে,আর কোথাও লঞ্চ থেকে নামা যায় না৷ প্রথম যে দ্বীপে নামলাম সেখানে রয়েছে একটা ওয়াচ্ টাওয়ার৷ ওয়াচ্ টাওয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে পুরো ভিতরকণিকার এক চমৎকার রুপ দেখা যায়৷

পরের যে দ্বীপে নামলাম সেখানে একটা বিশাল বড় মাঠ মতন রয়েছে৷ শুনলাম এই মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে এক শিব মন্দির রয়েছে৷ বহু দূর থেকে মানুষ আসেন এখানে পূজো দিতে৷নদীর পারে রয়েছে ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গল, প্রকৃতির অদ্ভূত সৃষ্টি। গাছের শেকড় গুলো মাটির ওপর উঠে এসেছে।আর প্রচণ্ড শক্ত এই শেকড়গুলি। যাইহোক এইভাবে সারা দিন ঘোরার পরে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে আমরা আবার ফিরে এলাম আমাদের তাঁবুতে। একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে এল। আগেই বলেছি এখানে সন্ধ্যেবেলা বিদ্যুৎ থাকেনা। প্রত্যেক তাঁবুতে একটা করে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো। আর তাঁবুর বাইরে একটা করে বেশ বড় ও সুন্দর কারুকায করা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। বাইরে চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর তাঁবুর ভেতর আধো অন্ধকার, মুহূর্তে যেন একটা অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেলো।

আমাদের এই দেশে প্রতিটা কোণে ছড়িয়ে আছে এই রকম বহু অমূল্য সম্পদ। পর্যটন এখানে খুব বেশি প্রাধান্য পায়নি। কিন্তু একটু প্রাধান্য পেলে এই শিল্প বহু পরিমাণে বিদেশী মুদ্রা আনতে সক্ষম। এই উপলব্ধি যত তাড়াতাড়ি আসবে প্রশাসনিক স্তরে ততই মঙ্গল আমাদের দেশের অর্থনীতি ও এই শিল্পের সাথে যুক্ত বহু মানুষের। যত বেশী এই ধরণের অভয়ারণ্য ইত্যাদি গড়ে উঠবে ততই বন্য পশুদের সঙ্গে সহমর্মীতার সঙ্গে সহাবস্থান করতে শিখবো আমরা। ‘ইকোলজিকাল ব্যালেন্স’ রক্ষা পেলে রক্ষা পাবে এই বসুন্ধরা। তবে এই ‘ইকো টুরিজি্ম’এর অন্তগত যে তাঁবুতে আমরা ছিলাম, সেখানকার কর্মচারীদের আন্তরিক সহায়তার কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যেভাবে তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের দেখভাল করতেন, আমাদের রসনা তৃপ্তির ব্যবস্থা করতেন তা নিঃসন্দেহে প্রসংশনীয়।

পরেরদিন সকালে উঠে আবার সব গুছিয়ে ঘরে ফেরার পালা।আমরা শহুরে লোক, আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপনের সঙ্গে শহরের সুখ সাচ্ছন্দ্য ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আাছে।শহরের দূষণ থেকে পালিয়ে গিয়ে দুদণ্ড প্রকৃতির কোলে আমরা আশ্রয় পেতে পারি, কিন্তু তারপর আবার ফিরতেই হবে সেই ইঁট,কাঠ, পাথরের খাঁচায়। তবু ভিতরকণিকা তার শান্ত অথচ স্নিগ্ধ সৌন্দর্য নিয়ে আকর্ষণ করে পর্যটকদের। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য পৃথিবী বিখ্যাত, কিন্তু ভিতরকণিকার ম্যানগ্রোভ অরণ্যর কথা বেশি লোক জানেনা। কিন্তু এর সৌন্দর্য কিছু কম নয়।যারা একবার যায় তাদের মনের ক্যানভ্যাসে ভিতরকণিকা তার সৌন্দর্যের সাক্ষর এঁকে দেয় অমলিন ভাবে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮