• সুস্মিতা

প্রবন্ধ - শিশু সাহিত্য


ভর সন্ধ্যেবেলায় নীড় বাসনা পত্রিকার সম্পাদক শুভাশিসের একটা ফোন এলো, শুভাশিস অবশ্য আমার জন্য শুধুই পত্রিকার সম্পাদক নয়, এই সুদূর প্রবাসে ও আমার খুব স্নেহের পাড়াতুতো ভাইও বটে । তবে সম্পাদক হিসেবে ভাইও কিছু অনুরোধ করলে সেটা প্রায় আদেশের মতই শোনায় ওহ্ একটু ভুল করে ফেললাম -নীড় বাসনা তো আমাদের সকলের পত্রিকা ।

যাই হোক্ সম্পাদক মশাই জানালেন -আমাদের পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যার হবে "বাঙ্গলা ভাষায় শিশু সাহিত্য" এবং তার জন্য আমাকে একটি প্রচ্ছদ রচনা করতে হবে। কথাটা শুনেই আমি ঘাবড়ে গেলাম -কারণ আমি কোনোভাবেই প্রচ্ছদ রচনার জন্য যোগ্য ব্যক্তি নই এবং দ্বিতীয়ত কিছু অকাজের কারণে সত্যিই সময়ের একটু টানাটানি চলছে, অতএব সবিনয়ে ভাই কে প্রত্যাখান করতে হলো ।

মস্তিষ্ক এক অদ্ভূত যন্ত্র বটে, শুভাশিসের টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরে বাকি সন্ধ্যেটা সাংসারিক কাজে দিব্যি কেটে গেলো। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটু লেখাপড়া করা, কাগজ কলম নিয়ে বসা আমার বদ অভ্যাস । গতকাল রাতে হঠাত্ দেখি মস্তিষ্ক জুড়ে আমার শৈশব ফিরে এসেছে, মনে পরে যাচ্ছে মেয়েবেলায় পড়া কতো ছড়া ,কবিতা র গল্পের বই এর কথা । আর আমার কলম নিজেরই অজান্তে সেসব কথা লিখে চলেছে , সম্পাদক মশাই এর ফোন কলে জাদু ছিল বটে -আমি আমার শৈশব স্মৃতি ফিরে পেলাম। না না , এটা কোনো প্রচ্ছদ রচনা নয় -সকলের সাথে একটু স্মৃতিরোমন্থন । আমরা যারা সাহিত্যকে ভালবেসে বড় হয়েছি ,তাদের সকলেরই অনেক কথা মনে পরে যাবে হয়তো ।

সকলের মধ্যেই সারা জীবন একটা শিশু লুকিয়ে থাকে, আমার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চা মেয়েটার প্রথমেই মনে পরে গেলো তার বাবার কথা । বাবা অফিস ফেরত লম্বা লাইনে দাড়িয়ে কিনে এনেছিলেন "আলোর ফুলকি"নামের বইটি ,সত্যিই চোখের সামনে এক আলোর জগত খুলে দিয়েছিলো সেই বই -কি ছিলো না সেখানে ?

রূপকথা ,কল্প বিজ্ঞান ,ভূতের গল্প ,ছড়া,কবিতা সব, সব রূপকথায় মনে পড়ল - আমাদের মধ্যে একজনও কেউ কি আছেন -যে ঠাকুরমার ঝুলির মনিমানিক্যর স্বাদ না পেয়ে বড় হয়েছি ? অবন ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল ? আমাদের মনের গঠন তৈরি করেছে শৈশবের সাহিত্য। আমরা দুয়ো রাণীর জন্য কাঁদতে কাঁদতে নিপীড়িত, বঞ্চিতের পাশে দাঁড়াতে শিখেছি। রুপকথার রাজকুমার আমাদের শিখিয়েছে বিপদগ্রস্ত মানুষকে কিভাবে উদ্ধার করতে হয় , কোনটা ন্যায়-কোনটা অন্যায় ? আজও মনে পরে রাক্ষস-খোক্ষস বই এর ডালিমকুমারীর গল্প -মায়ের স্নেহমমতা কি জিনিষ - সেকথা শিখলাম যেন ওই গল্প পরেই। কিম্বা সকলের মধ্যেই যে শুভবুদ্ধি থাকে, ভালো কিছু লুকিয়ে থাকে -রাক্ষসী মায়ের বুক দিয়ে মানুষের সন্তান কে আগলে রাখার মধ্যে সেই শিক্ষাই তো ছিলো।

কল্পবিজ্ঞানের গল্প কি সহজ সরল ভাবে চোখের সামনে খুলে দিয়েছিলো জ্ঞানের জগত কল্পনার হাত ধরে আমরা হাসতে শিখেছি সুকুমার রায়ের কাছে - কোনো শব্দ, কোনো কল্পনাই অর্থহীন নয় - আবোলতাবোল, হ য ব র ল আমাদের মনের সব গন্ডি ভেঙে দিয়ে মুক্তির স্বাদ,আনন্দের স্বাদ বুঝিয়েছে। লীলা রায়ের পদী পিসির বর্মী বাক্স যে মনের মধ্যে এমন ভাবে লুকিয়ে ছিলো - গতকাল শুভাশিসের ফোন পেয়ে সেকথা মনে পরে গেলো । আমাদের শৈশব ,কৈশোরের বর্ষার সন্ধ্যা রাত গুলো কি এতো রোমাঞ্চকর,রহস্যময় হতে পারত – যদি না থাকতেন হেমেন রায়,নীহার রঞ্জন ,স্বপন বুড়ো ,শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ,অন্নদাশংকর রায় ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আর ও অনেকে।

পটলডাঙ্গার টেনিদা পড়ে বুঝলাম গুল মারা র মিথ্যে কথার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে , গুল মারা একটা আর্ট - সঠিক প্রয়োগে নির্ভেজাল আনন্দের উৎস হতে পারে। শীর্ষেন্দুবাবু জানালেন -ভূতরা সবসময়ই খুব ভয়ের ব্যাপার নয় - তেমন ভাবে বন্ধুত্ব করতে পারলে খেলার মাঠে হেরে যাওয়া টিমের হয়ে ওরা গোল দিয়ে টিম কে জিতিয়ে পর্যন্ত দেয় । সত্যিকারের মনের জোর কাকে বলে ? শেখালেন কাকাবাবু ,বন্দুক পিস্তল নয় , এমন কি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও কোনো বাঁধা নয় - মনের শক্তিই আসল ,কাকাবাবু বারবার প্রমাণ করেছেন।

যাই হোক্ লেখার নেশায় কখন যেন শৈশব থেকে কৈশোরের গল্পে ঢুকে পরেছি । আবারও বলি এটা কোনো প্রচ্ছদ রচনা নয় , অনেক স্মৃতি হুড়মুড় করে মনের মধ্যে এসে গেলো ,সেগুলোই লিখে ফেললাম - কারণ সাহিত্যই পিতামাতার মতো প্রকৃত মানুষ তৈরী করে ,আমাদের অনুভূতি তৈরি করে সাহিত্য বোধ ,সাহিত্য পাঠ না থাকলে জীবন একটু অসম্পূর্ণ হয় - সবাই একটু মনে করে দেখুন তো -শৈশবে "মাগো আমার শ্লোক বলা কাজলা দিদি কই ?" পড়ে চোখের জলে ভাসেননি এমন মানুষ কতজন আছেন ?

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮