• শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রবন্ধ - ছোটদের জন্য লেখা

সম্পাদককে জিজ্ঞাসা করলাম কি লেখা লিখব, উনি বললেন ছোটদের নিয়ে এবারের সংখ্যা, তাই ছোটদের লেখা চাই। সবশেষে ভেবে চিন্তে মুখবন্ধ লিখে ফেললাম। পরে পুরো লেখাটা।

মুখবন্ধ - মুখবন্ধ লিখতে আমার বেশ ভালো লাগে। আমাদের মুখ তো সারাক্ষণ খোলাই আছে - হয় খাওয়া নয় বকবক করা। মুখবন্ধ করে অনেক কথা লিখে ফেলা যায়। পাতার পর পাতা ইনিয়ে বিনিয়ে একই কথা লেখা। যদি এটা আন্তর্জাল পত্রিকা না হতো তা হলে অনায়াসে আমি পাতা তিরিশেক ‘শরৎ সাহিত্যে নারী’ বা ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে কাবুলিওয়ালা’ লিখে ফেলতে পারতাম। কিন্তু এই ইলেক্ট্রনিক যুগে সংক্ষেপে লেখাই দস্তুর। এখানে দেখি ‘you’ কে ‘u’ বা ‘এইটা’ কে ‘8a’ সহজেই লেখা যায়- সুতরাং সম্পাদককে ক্ষিপ্ত করে লাভ নেই, সংক্ষিপ্তই ভালো। সম্পাদকই তো লেখকের লক্ষ্মী।

১। আলোচ্য লেখাটি ছোটদের লেখা নয়- যারা মনে মনে ছোট আছেন, তাঁরা চটপট বন্ধ করে দিন কম্প্যুটার। যদিও এই কথার পর আমি গ্যারান্টি দিতে পারি যে কেউ কম্প্যুটার বন্ধ করবেন না।

২। লেখাটি অন্য কোন পত্রিকায় আরও বর্ধিত রূপে ছাপাবার ইচ্ছা আছে আমার- সুতরাং দয়া করে ঝাড়িতং করবেন না- দরিদ্র মানুষ, ধনে প্রানে মারা যাব।

৩। কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টঃ বড়ো বড়ো পত্রিকায় এই কথাটা দেখে ভালো লাগে- সম্পাদক আমার বোন, তাই ছেপেছে, নইলে এই লেখা আর কেই বা ছাপাবে?

৪। লেখাটিতে কোন উত্তর পাওয়ার আশা করবেন না- শুধু প্রশ্ন রেখেছি কিছু। আমি বিদ্বান নই , লেখক নই, আর সব জানেন যারা সেই রকম বুদ্ধিজীবীও নই। সুতরাং প্রশ্ন রেখেই থেমে যাব।

৫। যত পারেন কমেন্ট করবেন। এতে আরও বড়ো করে লেখাটি লেখার সময় বাজারচলতি করতে সুবিধা হবে। যেদিকে হাওয়া সেদিকে একটু বেশী লিখে দেবো- তাহলে আর কে আটকায়? যদি একটু বেশী রেগে যান একটু আধটু ‘troll’ করবেন। হাওয়া বুঝতে সুবিধা হবে।

৬। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- বর্তমানে এই লেখা লেখার সময় আলোচিত একটি বইও আমার কাছে নেই- সবই স্মৃতি থেকে লেখা- অন্তত পঁয়ত্রিশ বছর আগে পড়া। ভুলভ্রান্তি থেকে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। দয়া করে ধরিয়ে দেবেন।

ছোটদের জন্যে লেখা- ছোট কারা?

ছোট কারা? এ তো প্রচণ্ড গোলমেলে। একথার কোন উত্তর হয় না কি? হয় না, সে কথাই তো বলছি। যদি ছোট কে তা চিহ্নিতই না করতে পারি তা হলে ছোটদের জন্যে লিখব কি করে? ‘ছোটদের বই’ বলে বড়ো প্রকাশনীর যে ক্যাটালগ দেখতে পাই তাতে দেখছি ছেলেভুলানো ছড়াও রয়েছে, রাজকাহিনী রয়েছে, নন্টে ফন্টে রয়েছে, অনিল ভৌমিকের সোনার ঘণ্টা রয়েছে আবার বুদ্ধদেব গুহর রুআহা রয়েছে। এরা কি সবাই একই পর্যায়ের? সাহিত্যের কোন বয়সের বেষ্টনীতে বাঁধা যাবে এদের একই সঙ্গে? বলছেন - বয়সের বেষ্টনী হয়, বলছেন যখন , নিশ্চয় হয়। তাহলে হুপ্পোকে নিয়ে গপ্পো ছোটদের বই, বাদশাহি আংটিও তাই এবং দুরন্ত ঈগল তো নিশ্চয় ছোটদের বই। অর্থাৎ একটি দশ বছরের ছেলে বা মেয়ে এই তিনটি বই সঙ্গে পাণ্ডব গোয়েন্দা, টুনটুনির বই, টিনটিন এবং হাঁদা ভোঁদা একই রকমভাবে উপভোগ করতে পারবে? এখন কিন্তু আপনাকে ঠিক নিশ্চিত মনে হচ্ছে না। আবার পনেরো বছর বয়সী একটি ছেলে (অবশ্যই, বা মেয়ে) অরুণ বরুণ কিরণমালা, মতি নন্দীর স্ট্রাইকারের মৃদুমন্দ প্রেম আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মনোজদের অদ্ভুতবাড়ি, বা দুরন্ত ঈগলে জুরার প্রেম বা নারীদের ‘পুরুষ মনোরঞ্জন’ এর মতো ‘ abuse ’ এর ইঙ্গিত একই রকম আনন্দ দেবে? দেবে না, তার কারণ, হরমোনের পরিবর্তন। কারণ, পৃথিবীর জটিল ব্যাপারগুলো তার মাথায় এখন ঢুকছে। এছাড়াও আছে টিভিতে সারাক্ষণ ষড়রিপুর হড়কানি। তাহলে এই সংজ্ঞাটাতেই অসুবিধা যে ছোট কারা।

তাহলে ছোটদের জন্য কোন লেখা?

‘ছোটদের জন্য লেখা’ কথাটাই আমার বুঝতে অসুবিধে হয়। এই লেখাগুলো যে ছোটদের সেটা কে ঠিক করে দিলো? ছোটরা না বড়োরা? বড়োরা যেহেতু বোঝেন অনেক বেশী তাই তাঁরা ঠিক করে দেবেন যে কোন লেখাগুলো ছোটরা পড়বে আর কোনগুলো পড়বে না। আবার এই বড়োরা যখন সিনেমা দেখতে যান বা যেতেন , তখন সেন্সরবোর্ড অ্যাডাল্ট সীনগুলো কেটে দিতো, তখন হাহুতাশ করতেন! যদি ছোটদের নিয়ে শুধুমাত্র কোন সেন্সরবোর্ড বা সিলেকশন বোর্ড তৈরি হতো,তাহলে কি হতো বলা মুশকিল। যখন খবরে দেখি ছোটদের মধ্যে পর্ণোগ্রাফি দেখার প্রবণতা বাড়ছে, তখন তাদের হাতে পাণ্ডব গোয়েন্দা বা অরুণ বরুণ কিরণমালা তুলে দিয়ে দেখা যেতে পারে। কি বলছেন? ওসব খারাপ ছেলেরা দেখে? ঠিক কথা। কিন্তু ভালো ছেলে কে আর খারাপ ছেলে কে? সেটাই বা কে ঠিক করে দেবে? যারা ওইসব আজেবাজে বই পড়ে তারা খারাপ ছেলে আর বাকিরা ভালো ছেলে? দারুন! দেখবেন আবার ঠগ বাছতে গাঁ না উজাড় হয়ে যায়! ভালো লোক বা ভালো ছেলে তারাই যারা সকালে উঠে প্রতিদিনকার খবর মন দিয়ে পড়েন, স্কুলে/অফিসে যায়- তাই না? তা আনন্দবাজারে দেখলাম খবর ‘এই পর্ণ ওয়েবসাইটগুলো তে ভুলেও ঢুকবেন না- তিন বছর অবধি জেল হতে পারে’। খুবই অবাক হলাম দেখে। যারা আনন্দবাজার পড়েন তাঁরা কি ওই ওয়েবসাইটগুলোতে কোনদিনও ঢোকার কথা ভাবেন? তাঁরা তো পড়েন কারণ ‘পড়তে হয়, নয়তো পিছিয়ে পড়তে হয়’। তাদের জন্য এই সতর্কবাণীর কি প্রয়োজন? প্রয়োজন এইজন্যেই যে আমাদের ফেলে আসা সময়কে ফিরে দেখে আমরা জানি আপনার আমার বেশীর ভাগ ছেলেমেয়ে কোন না কোন সময় এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলো বা বইগুলো কোন না কোন সময়ে চোখে বা চেখে দেখবে- দেখবেই। অর্থাৎ সহজভাবে যা বলতে চাইছি যে যৌনতা আর ভায়োলেন্স বাদ দিলেই যে ছোটদের বই হবে আর তা থাকলেই যে বড়োদের বই হবে তার কোন ভিত্তি নেই। ছোটরা কি পড়বে তা তাদেরই বিচার্য, আমাদের নয়।

আমার ছেলে(মেয়ে) কিন্তু শুধু ছোটদের বই পড়ে।

ঠিক কথা। হক কথা। কিন্তু সত্যিই কি পড়ে আর কেন পড়ে? আমি নিজে ছোটবেলায় পড়ার বইয়ের মধ্যে রেখে বহু বইই পড়েছি- কোন অসুবিধা হয় নি। আর যদি তারা শুধু এই বইগুলো পড়ে, তার কারণ তারা ‘conditioned’ বলে। আমাদের সমাজ, পরিবার আমাদের শিখিয়েছে কোনটা ছোটদের বই কোনটা বড়োদের, বুঝিয়েছে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল। দোষ করলে শাস্তি পেতে হবে- সব ছোটদের বইয়েই এই মিথ্যে কথা সেখানও হয়। ফেলুদার মতো গোয়েন্দা ঠিক ধরে ফেলবে, পুলিশ চুরির দায়ে (বেণীর মতো) ফাঁসি দিবে - সেখানে মাসি না থাকলে এমনকি কান কামড়ানোর মতো লোকও পাওয়া যাবে না। সেই একই গল্প সেই একই বয়সের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, সুযোগাভাবী বা অপরাধীদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা বাচ্চাকে শোনাতে পারবেন , যে প্রতিটি পকেট মারার আগে প্রদোষ সি মিটার তার কান ট্যাক্সির মিটারের মতো মুচড়ে দেবে- এ কথা ভাবলে অনাহারেই হয়তো মারা যাবে।

হাত ওঠাচ্ছেন কেন? প্রশ্ন করবেন? ঠিক একই রকম ‘conditioned’ সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলা - যে বকবক করছে তাকে বলতে দাও- প্রশ্ন থাকলে হাত তুলতে হবে। তা করুন, তবে দয়া করে সমাজবিজ্ঞানের বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশ্ন করবেন না। কোন সরকারের অকর্মণ্যতায় ওই ছেলেটি বা মেয়েটি পকেটমার হল স্বাধীনতার এতো বছর পরে - অথবা চশমাটা একটু নাকের উপর ঠেলে - ব্রিটেন বা আমেরিকায় কেন হয় না, তার উত্তর আমি দিতে পারব না। বস্তুত কোন প্রশ্নের উত্তরই আমি দিতে পারব না। শুধু প্রশ্নই থাকবে। ভাবার দায় আমাদের সবার। বিচার্য শুধু এইটুকুই যে আপনার বারো- তেরো বছরের ছেলেমেয়েদের হাতে সব রকম বই তুলে দিয়ে দেখুন সে কোন বইটা পড়ছে? লেডি চ্যাটারলিজ লাভার, ট্রপিক অফ ক্যান্সার না মিতুল নামে পুতুলটি অথবা সুনির্মল বসুর ছন্দের টুংটাং।

কিন্তু গাইডেন্স তো একটা দরকার!

বাঃ, এতক্ষণ প্রশ্ন থেকে এবারে একটা রফার সুর শোনাচ্ছে! অবশ্যই লাগবে। সেটা আমি আপনি বলতেই পারি। আমরা বড়ো। ছোটদের গাইড করতেই হবে। সবার গাইডেন্স লাগে - তাই নয় কি? কোলকাতার কিছু সিনেমা হলে সঠিক সময়ে সেন্সরের কাঁচি চলে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। কেউ কখনো তাদের বোঝানোর চেষ্টাই করেনি যে সেন্সবোরডের কর্তা ব্যক্তিরা তাদের গাইড করার জন্যই এরকম করত। সেই জন্যই ফিল্ম ফেস্টের সময় হলের বাইরে দাঁড়ানো জিভ দিয়ে জল পড়া দাদুর বয়সী লোকেরা জিজ্ঞাসা করতেন “ ভাই, সিনেমাটা বোল্ড তো?” এর থেকে বোঝা যায় যে গাইডেন্স শুধুমাত্র ছোটরা বড়োদের কাছ থেকে পাবে আর বড়োদের গাইড করতে গেলেই বিপত্তি। আবার গাইড করা ব্যাপারটি সময়, ব্যক্তি এবং বাচ্চা ভিত্তিক। এর কোন বাঁধাধরা গৎ নেই। গাইডেন্স জিনিষটা তাহলে ঠিক কি রকম? আমার তেরো বছর বয়সে পড়া লোলিটা , লেডী চ্যাটারলি বা বিবর। বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে। রামকৃষ্ণ মিশনের হস্টেলে মহারাজরা যাতে না জানতে পারেন। তখন লুকিয়ে পাশের বটতলা (আক্ষরিক অর্থে বটতলা) থেকে আরও অনেক বই পড়েছিলাম- লুকিয়ে কারণ মহারাজরা জানতেন না যে সেদিনকার সেই পড়ুয়া ফার্স্ট বয় একদিন সেই অভিজ্ঞতার কথা নীড় বাসনার মতো ম্যাগাজিনে লিখবে! তাহলে, আমি নিশ্চিত আমাকে তাঁরা পড়তে দিতেন- নিজেরা উল্টেও না দেখে।

তাহলে এবার আমাকে ভাবতে হয় বাঁধাধরা গৎ কোন কিছুরই নেই- কোন বয়সী ছেলেমেয়েদের ছোট বলবো, কোন লেখা ছোটদের জন্যে, কি বই তারা পড়বে আর কি বই তারা পড়বে না - এর সবকিছুই আপেক্ষিক। কোন কিছুই শক্ত বুনিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে নেই। এর স্বাভাবিক সমীকরণসূত্র হিসেবে বলা যায় এখন যে শিশুসাহিত্যিক বলে কিছু হয় না। না কি, হয়?

বাজে বকছে। টিনটিন, অরন্যদেব বা ম্যানড্রেক , সোনার ঘণ্টা, ফেলুদা এগুলো কি ছোটদের বই নয়?

অবশ্যই ছোটদের বই। আমি নতজানু হয়ে স্বীকার করছি এগুলো সব ছোটদের বই। একটু দেখি বইগুলোর গল্পগুলো। টিনটিনের কমিক্স। বড়ো হয়েছি এই পড়ে- এখানে মধ্য প্রাচ্য বা আফ্রিকানদের কিভাবে দেখান হয়েছে- চূড়ান্ত বর্ণবৈষম্যবাদের ছড়াছড়ি। বিশ্বাস না হয় , আবার পড়ে দেখুন। যখের ধন, আবার যখের ধন বইতে কাফ্রি (অর্থাৎ আফ্রিকার মানুষদের) বর্ণনাটা পড়বেন আরেকবার। তাদের যতটা অপমান করা হয়েছে আর আমরা গোগ্রাসে গিলেছি সে সব, সেটা কি তাদের প্রাপ্য ছিল? আমাদের কি সেই বইগুলো পড়া উচিত ছিল ওই বয়েসে যখন মানুষকে সম্মান করতে শিখতে হয়। এবার আসি অরন্যদেবে। অরন্যদেব না পড়ে কেউ বড়ো হয়েছেন কি? অসম্ভব। চলমান অশরীরীর গল্প আমাদের মজ্জায় মজ্জায়। সেই অরন্যদেবের প্রেমিকা এবং পরবর্তীকালে স্ত্রী ডায়না যখন আসন্ন প্রসবা তখন কি পরামর্শ দিয়েছিল গুরাণের বউ? সেটা কি একজন দশ/ বার বছরের বাচ্চার জানার কথা? আর ম্যানড্রেক বা লোথারের- দুই বান্ধবী নারদা ও কারমা সারাক্ষণই শুধু কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হয়েই বসে থাকত- ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সে বিকিনি কি আমাদের এক নকল জীবনের স্বপ্ন দেখায় নি? সে যাক, এবারে আসি সোনার ঘণ্টা, হিরের পাহাড় প্রভৃতি অসাধারণ ভাইকিং অ্যাডভেনচার গল্পে- গল্প জুড়েই ভায়োলেন্স, মকবুলকে হাত পিছনে বেঁধে বিষধর সাপের সামনে মাথা নিচু করে বসিয়ে রাখা হল যাতে সাপ তার মাথায় কামড়ায়! কিন্তু তাও ছোটদের বই। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হারাধনের দশটি ছেলে- ভেবে দেখুন কিভাবে ভায়োলেন্স দেখান হয়েছে -কেউ বাঘের পেটে যাচ্ছে, কেউ গলা কেটে মরছে! সমরেশ বসু বিখ্যাত হলেন গোগোলের গল্প লিখে। সোনালি পাড়ের রহস্য। সেখানে গোগোল পুরিতে গিয়ে তার মায়ের কোমর জড়িয়ে বলছে “তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে মা”। কেন? তার মা একটি স্যুইমিং কস্ট্যুম পরেছেন। এই কথাটি গল্পের কোন কাজে আসে না। দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের কল্পনাকে প্রোৎসাহিত করার জন্য। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে পুরীর সমুদ্রে বাঙালী মহিলা স্যুইমিং কস্ট্যুম! হা ঈশ্বর! আবার রুআহা বুদ্ধদেব গুহর ক্লাসিক- ঋজুদার গল্প। তাতেও দেখি নায়িকা তিতির প্যান্টে নোংরা লেগেছে বলে গাছের আড়ালে চলে গেলো? আমরা কি সত্যি তাই করি? গাছের পাতা দিয়ে সবার সামনে প্যান্ট মুছতে অসুবিধে কোথায়? না কি এখানে একটা ছোটমতো ইঙ্গিত করে আবার কল্পনায় একটু সুড়সুড়ি?

তাহলে কি ছোটদের বই কিছুই নেই? তা কেন? সব বইই তো ছোটদের বই- যা লেখা হবে কোন রকম ভন্ডামি না রেখে, কোন রকম অ্যাজেন্ডা না রেখে , তাই ছোটদের বই। যেমন সুকুমার রায়ের বই ছোটদের তো বটেই, বড়োদেরও। প্রতি লাইনে মজা, প্রতি লাইন ভাবাবে। ওই একজনের বই পড়তে পড়তে ছোট থেকে বড়ো হয়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই। সুকুমার রায় উদাহরণমাত্র। যদি আমার ছেলেমেয়ের রাত ভরে বৃষ্টির রোমান্টিক কবিতার মতো কিন্তু তথাকথিত বড়োদের লেখা বোঝার ক্ষমতা থাকে তাহলে তা না পড়ার কোন কারণ আছে কি?

আবার উল্টোটা হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের বইয়ে। দৃষ্টিকটুভাবে নারীচরিত্রের অভাব দেখা যায় এখানে। কোন পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিচ্ছি আমরা যদি গল্পে মা, বোন, বান্ধবী, স্ত্রী না থাকে? কিশোরীদের কখনো কি মনে হয় নি যে তারা কোনদিন এই গল্পে স্থান পাবে না? মনে হয় নি বলেই আমার ধারনা কারণ তারা ‘conditioned’ তারা ধরেই নিয়েছে ফেলুদা কোন অজ্ঞাত কারনে বিয়ে করবে না। তোপসের কোন বান্ধবী থাকবে না - থাকবে শুধু এক অকৃতদার সিধুজ্যাঠা।যখন গোটা পৃথিবীতে নারীঘটিত অপরাধের সংখ্যা এতো বেশী, তখন ফেলুদা শুধুমাত্র পুরুষ-ঘটিত অপরাধের কিনারায় ব্যস্ত। কেন? প্রফেসর শঙ্কুর গল্পে বিড়ালের কথা যে কোন মহিলার কথার চেয়ে বেশীবার বলা হয়েছে। ছোটদের উপন্যাস কিন্তু বেশীর ভাগ ফেলুদার উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে শারদীয়া দেশ এ। এখানে ফেলুদা পড়ার পর পড়ে ফেলেছিলাম সম্রাট ও সুন্দরী।

অতএব বোঝা যাচ্ছে যে ছোটদের বই ব্যাপারটাই অস্বচ্ছ। যেগুলো ছোটদের বই তার অনেকগুলো বড়োদের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে- অর্থাৎ ধরে নিতে পারি বড়োদেরও সে লেখাগুলো পছন্দ। আবার যা ছোটদের বলে চালানো হয়, তার অনেকগুলোই ছোটদের নয় বলেই অনেকে তর্ক করতে পারেন। ছোটদের, বড়োদের, ছেলেদের বা মেয়েদের বলে কোন বই লেখা হতে পারে কি? না কি বই শুধু দু প্রকার- ভালো বই আর খারাপ বই। আর এই ভালো বা খারাপ অন্য কেউ কি নির্ধারণ করতে পারে ? আমি, আপনি বা সেন্সরবোরডের কি সে দায় থাকে না কি এ দায় শুধু পাঠক পাঠিকার?

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮