• শোভন কাপুরিয়া

গল্প - অদৃশ্য চতুষ্কোণ

(বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – শোভন কাপুরিয়ার গল্পটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্য।)

১ মার্চ , ২০১৬

প্রিয়া‌‌1996-র সাথে অনলাইন চ্যাট ভালোই চলছে রাজীবের , এই নিয়ে 4 মাস হোলো এই Virtual আনন্দের। প্রতি রাতে যখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ে , রাজীব-এর অনলাইন বিচরণ শুরু হয়। বলতে গেলে আস্তে আস্তে কেমন যেন প্রেমে পড়ে যাচ্ছে প্রিয়া1996-এর , বা ভালো নামে প্রিয়া সরকারের। রোজ রাতে যদি তার সাথে কথা না হয় শান্তি যেন কিছুতেই হয়না রাজীবের। প্রিয়াকে দেখতে বেশ সুন্দরী , বছর ২০-র তন্বী মেয়ে ... পারসোনাল চ্যাটে ছবি পাঠিয়েছিল। গায়ের রঙ তামাটে একটু , ঘন কালো চুল , চোখ দুটো যেন আবেদনে ভরপুর... ছবি দেখেই রাজীব একটা আদিম আনন্দের স্বাদ পেয়েছিল। কিন্তু আজকে রাত ১২টা বাজতে চলল ,প্রিয়া তো চ্যাটে আসছেনা , কি ব্যাপার , ওর কি রাজীবের প্রতি টান চলে গেল ? আজ ওদের যা করার প্ল্যান ছিল সেটা কি এড়িয়ে গেল প্রিয়া!

রাজীবের কথা বলার কায়দা বেশ ভালো লাগে প্রিয়ার , 4 মাস আগে রেডিফের চ্যাট রুমে আলাপ আর তারপরে ধীরে ধীরে পার্সোনাল চ্যাট-এ কথা শুরু। বয়স ২৫ হলেও রাজীবের মধ্যে একটা ম্যাচুইরিটি আছে যা প্রিয়াকে খুব টানে , সত্যি বলতে কি এই চার মাসে অনেকবার-ই শারীরিক সম্পর্কের ইচ্ছে হয়েছে দুজনের-ই , কিন্তু রাজীব এখন-ই কিছু করতে চায়না সরাসরি ... তাই ওরা লাস্ট ১ মাস ধরে সেক্স চ্যাটে লিপ্ত হয়েছে। সে এক অদ্ভুত আদিম টান , প্রত্যেক দিন একবার করে না করলে আশ মেটে না প্রিয়ার। আজ বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে বড্ড দেরী হয়ে গেল। প্রিয়া দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল ১২:১০ বাজে , একবার ছোটো করে অনলাইন না হলেই নয় .. হয়তো রাজীব ওর জন্য বসে আছে অনলাইন।

২ রা জুলাই , ২০১৬

সকাল থেকেই নিউজ চ্যানেল গুলো একটাই খবর ফ্ল্যাশ করছে : ‘Breaking News : রাজারহাট সিটি সেন্টার ২-এর সামনে একটি ২৫ বছরের ছেলের রক্তাক্ত মৃতদেহ পাওয়া গেছে , পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুসারে গতকাল ১লা জুলাই রাত ১০টা নাগাদ কে বা কারা এই ছেলেটিকে খুন করে ছুরি দিয়ে বারবার কুপিয়ে , ছেলেটির পরিচয় এখনো জানা যায়নি। কিন্তু পুলিশের আশ্বাস তাড়াতাড়ি-ই জানা যাবে।‘ নিউটাউন থানায় বসে ইন্সপেক্টর অভিমান সেন খবরটা দেখছিলেন , টিভির সাউন্ড কমিয়ে বললেন ‘কি রে হারু ,মালটা কিছু বলল? না বললে আমি বলাচ্ছি।‘ সেলে একজন ৪৫ বছর বয়সের লোক হাতে হাতকড়া পরে বসে রয়েছে , আজ সকালে পুলিশ ধরে এনেছে ছেলেটিকে খুনের দায়ে। সেন লোকটার কলার টেনে বলল ‘দেখ , সব স্বীকার কর , এমনিতেই তোর নাম মিডিয়াকে দিয়ে দেব। কেন খুন করেছিস শালা?’ লোকটা সেনের দিকে তাকিয়ে বলল ‘প্রিয়া আর এই ছেলেটা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করত সবার সামনে তাই সহ্য করতে না পেরে....’ সেন আরো কিছু বলতে যাবে , ওর জুনিয়র হারু কিছু বলল কানে কানে। সেলের বাইরে তাকিয়ে দেখল এক ৪২ বছরের মহিলা দাড়িয়ে আছে আর তার সঙ্গে একটা ১৬-১৭ বছরের মেয়ে , তার নজর হাতকড়া পরা লোকটার দিকে। সেন ওনাকে বসতে বলে প্রশ্ন করলেন ‘এই প্রিয়া মেয়েটি কে , যে নাকি এনাকে ঠাট্টা করত বলে ছেলেটাকে মেরেই ফেলল?’ মহিলা চোখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলেন আর বললেন ‘ওর অনলাইন বন্ধু...’

১০ মার্চ , ২০১৬

রাজীব : এত দেরী করলে কেন আসতে ... জানো কখন থেকে তোমার জন্য বসে আছি!

প্রিয়া1996 : মা শুতে দেরী করল তো , নাহলে আগেই আসতাম ... এই শোনো না , আজ আবার করবে?

রাজীব : করাই যায় , কিন্তু কাল তো তোমার কলেজ সকাল সকাল....

প্রিয়া1996 : আ: , আজ না করলে রাতে ঘুমটাই আসবেনা ... আমি কিন্তু শুধু পাতলা নাইটি পরে শুয়ে আছি ... আর কিছু পরার দরকার মনে করিনি ... তুমি?

রাজীব : মমমম , আমি আজ একটা পারফিউম কিনেছি তোমার জন্য , দেখা হলে তোমায় গায়ে মাখিয়ে...

প্রিয়া1996 : মাখিয়ে কি? বলো না সোনা....

প্রিয়া1996 : এই আছো ... কথা বলছোনা কেন? গেলে কই...

চ্যাট-এর অন্য দিক থেকে পরের দশ মিনিট কোনো মেসেজ এলোনা। ঠিক ১৫ মিনিটের মাথায় একটা মেসেজ এল প্রিয়ার কাছে।

রাজীব : নিচের ছবি টা ভালো করে দেখ ...

প্রিয়া দেখল একটা ছবি এসেছে , ছবিটাতে ৪ জন রয়েছে। একটা বছর ৪৫-৪৬ –র মধ্যবয়স্ক মত লোক , তার সঙ্গে এক মধ্যবয়স্কা মহিলা আর দুটি মেয়ে। প্রিয়ার কপালে একটু ঘাম ফুটে উঠল।

রাজীব : আমি রাজীব বিশ্বাসের স্ত্রী প্রমীলা বলছি , শোনো মেয়ে , এই যে মধ্যবয়স্ক লোকটা দেখলে , এই হোলো রাজীব আর ও বিবাহিত।

প্রিয়া1996 : মানে ?

রাজীব : মানে ও কোনো ২৫ বছরের ছেলে না , দুই বাচ্চার বাবা।

২ রা জুলাই , ২০১৬

ইন্সপেক্টর সেন ১০ মার্চ – এর চ্যাট টা পড়লেন আর প্রমীলার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘ কতদিন ধরে এইসব চলছিল আপনি জানেন।‘ প্রমীলা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন ‘ ও তো বলল , ডিসেম্বর থেকে ... সত্যি বলছে কি না জানিনা। .. আমার কথা না-ই ভাবলো , মেয়ে দুটোর কথা ভাবলো না একবার!’ , বলে তিনি আবার কাঁদতে শুরু করলেন। সেন ওনাকে জল দিয়ে উঠে পড়লেন। হারু কে ডেকে বললেন ‘সাইবার সেলের অমিত কে নিয়ে বস আর এই চ্যাট টা থেকে এই প্রিয়া সরকারের আইপি বের কর আর সেখান থেকে ঠিকানা।‘ হারু একটু নিচু স্বরে বলল ‘স্যার , এ তো পুরো অনলাইন ত্রিকোণ , জমে গেছে।‘ সেন রেগে-মেগে তাকাতেই হারু মাথা নিচু করে চলে গেল। ঘরে ঢুকলো সেনের আরেক জুনিয়র আবীর বোস , বললেন ‘স্যার , উনি এসে গেছেন।‘ অন্য এক ইন্টারোগেশন রুমে সেন ঢুকলেন , একজন বুড়ো মত লোক বসে আছে, সেন ওনার সামনে বসে বললেন ‘আপনার ছেলের রুম আমার লোকেরা সার্চ করেছে , একটা কথা বলুন তো , প্রচুর টাকা পাওয়া গেছে ওর ঘর থেকে , ২৫ বছরের একটা ছেলে কি এমন কাজ করত।‘ বুড়ো লোকটা বলল ‘স্যার , আমিও জানিনা , কিন্তু আমার সন্দেহ কোনো বদ সঙ্গে পরেছিল ও।‘ সেন একটু ভেবে বললেন ‘প্রিয়া নামে কোনো মেয়ের কথা শুনেছেন ওর কাছ থেকে।‘ ‘না’ , বুড়ো উত্তর দিল। সেন বুড়োকে জল খেতে দিয়ে উঠে বাইরে যেতে যাচ্ছেন , বুড়ো হঠাৎ বলে উঠল ‘স্যার , মনে পড়েছে , আমার এক বন্ধু অনেকবার-ই নাকি ওদের বাড়ির দিকের এক হোটেলে ছেলেকে দেখেছে ঢুকতে , আর....’ একটু আমতা আমতা করতে লাগল বুড়ো। আবীর ধমক দেওয়াতে বুড়ো বলে উঠল ‘প্রত্যেক বার-ই আলাদা মহিলার সাথে দেখা গেছে।‘ সেনের চোখটা একটু জ্বলে উঠল , ‘ধন্যবাদ’ বলে সেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

২৫ মার্চ , ২০১৬

গত ১০-১৫ দিন ধরে আর প্রিয়ার সাথে কোনো কথা হয়নি রাজীবের , সেদিনের ঘটনার পর থেকে সত্যি বলতে কারোর সাথে কথা বলার, এমনকি কারোর সাথে দেখা করার ইচ্ছেটা রাজীবের চলে গেছে। অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। নিজের মেয়েরাও যেন আজকাল ঠিক ভাবে কথা বলেনা আর , প্রমীলা কি ওদের-ও বলে দিল? এইসমস্ত উল্টোপাল্টা চিন্তা করে আর সারাদিন অনলাইন হয়ে বসে থাকে যদি প্রিয়া আবার ওর সাথে কথা বলে। গত ২০ দিন ধরে এই হল ওর রুটিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পরিচিত চ্যাটরুমে লগ-ইন করল রাজীব , ঢুকতেই প্রিয়া1996 কে অনলাইন দেখতে পেল। কিন্তু কিছু বলার আগেই বাজে কিছু কথাবার্তা শুনতে হল রাজীবকে।

প্রিয়া1996 : ওই দেখ সন্তু , বুড়ো রাজীব এল।

সন্তু‌‌দুষ্টু : ঐ কি সেই মালটা , তোমাকে শোয়ানোর ধান্দা ছিল! ও দাদু , কেন খুকি দের পেছনে আছ , বউ কি কিছুই করতে দেয়না নাকি!

প্রিয়া1996 : আমার জন্য নাকি আবার পারফিউম কিনেছিল , আমার গায়ে মাখিয়ে কিসব যেন করবে বলছিল , হা হা হা!

শুনে রাজীবের চোখ দিয়ে জল পরতে লাগল , অসহায় হয়ে কাঁদতে লাগল।

২ রা জুলাই , ২০১৬

কথা শেষ করে রাজীব একটু জল খেয়ে নিল , সেন রাজীবকে দেখছিলেন। রাজীব মাটির দিকে তাকিয়ে বসেছিল , সেন বললেন ‘অনলাইন একটা চ্যাটকে এত সিরিয়াস কেন নিলেন? রিয়েল লাইফের সাথে কি করে গুলিয়ে ফেললেন আমি জানিনা।‘ সেন উঠতে উঠতে বললেন ‘আর কারোর জন্য না , নিজের মেয়ে দুটোর কথা ভেবেই নিজেকে শুধরোতে পারতেন।‘ রাজীব মুখ নিচু করে বসে রইল। সেন বললেন ‘কাল বাকি কথা হবে , আজ রাত হল।‘

আবীর বোস সেনকে স্টেশন থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন ‘স্যার , আপনার কি অন্য কিছু সন্দেহ হচ্ছে!’ সেন চিবুকে হাত বুলিয়ে ভুরু কুচকে বললেন ‘খুনটা তো রাজীব-ই করেছে ফর সিওর, কিন্তু মোটিভ? শুধু একটা অনলাইন চ্যাট! এত ফালতু একটা ব্যাপারের জন্য খুন! এখানেই হজম হচ্ছে না। ভুলে যেওনা ওই সন্তু ছেলেটা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাত, কি ভাবে? প্রিয়ার সাথেও সামনে কথা হওয়া দরকার। ওর কাছে অনেক উত্তর আছে।‘

৫ ই জুলাই ,২০১৬

এখন সকাল ৯টা , রজত আর আভা সরকারের দমদমের বাড়িতে বসে আছেন ইন্সপেক্টর সেন আর হারু। সামনের সোফাতে প্রিয়া সরকার বসে। রজতবাবু একটু ভারি গলাতে বলে উঠলেন ‘আপনারা আমার বাড়ীতে এই খুনের ব্যাপারে কেন এসেছেন সে তো বুঝছিনা , ওদিকে আভা সরকার-ও চিন্তাগ্রস্ত মুখে দাড়িয়ে। সেন পুরো অনলাইন চ্যাটের ব্যাপারটা খুলে বললেন ওদের। রজত বাবু প্রমাণ আছে কিনা বলে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলেন , হারু কিছু চ্যাটের নমুনা দেখিয়ে দিল , উনি মাথাটা নাড়াতে নাড়াতে আরেক ঘরে চলে গেলেন। সেন দেখল প্রিয়ার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ‘তুমি আর সন্তু মিলে রাজীব বাবু কে খুব খেপাতে কি?’ , সেন শান্ত স্বরে বলে উঠলেন। প্রিয়া বলল ‘দুই-তিন দিন ওকে অনলাইন দেখে ইয়ার্কি করেছি আমি, কি করব রাজীবের মিথ্যে জানার পর আমার-ও তো রাগ হয়েছিল, তাই আমি আর সন্তু মিলে...’। সেন আবার বললেন ‘রাজীব কিন্তু বলেছেন তোমরা ইয়ার্কি করতে তাই সহ্য করতে না পেরে উনি সন্তুকে মেরেছেন’। প্রিয়া একটু উত্তেজিত হয়ে বলল ‘কিন্তু সে তো দু-আড়াই মাস আগের কথা...’। হারুও বলে উঠল ‘মানে! রিসেন্টলি এরকম কোনো কথা হয়নি?’ প্রিয়া মাথা নাড়ল। সেন একটু কিছু ভেবে বলল ‘তোমার সাথে সন্তুর কিরকম রিলেশন ছিল? ওর সাথে লাস্ট কবে কথা হয়েছে! আর সত্যি বলবে কিন্তু , নাহলে বিপদে পড়বে।‘ প্রিয়া মাথা নিচু করে আছে। সেন বললেন আবার একটু ধমকের সুরে ‘যদি কিছু বলার থাকে এখন-ই বল, নাহলে কিন্তু রাজীবকে প্র্ভোকেশনের জন্য তোমার-ও জেল হবে!’ প্রিয়া তাও চুপ , আড় চোখে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। সেন বুঝতে পেরে আভা সরকারকে অন্য ঘরে যেতে বললেন। আভা সরকার একটু অসন্তুষ্ট হয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন। সেন বললেন ‘এবার বল!’ প্রিয়া মুখ তুলে বলতে শুরু করল....

২৭ শে এপ্রিল , ২০১৬

সন্তু আর প্রিয়া আজ দেখা করার প্লান করেছে , দেখা করার জায়গা হল ইকো-পার্ক নিউটাউন। রাজীবের সাথে চ্যাট বন্ধ হওয়ার পর থেকেই সন্তুর সাথে চ্যাট শুরু হয় প্রিয়ার। সন্তুকে ভালোই লেগেছে প্রিয়ার। এবার আর কোনো রিস্ক না নিয়ে ভিডিও চ্যাট-ও করে নিয়েছে । ছেলেটার কথা বলার স্টাইল ,ফিজিক , লুকস ,স্মার্টনেস সব-ই প্রিয়াকে আকৃষ্ট করেছে। সত্যি বলতে ছেলেটাকে টু-গুড বলেই মনে হয়েছে। বাসে যেতে যেতে ভাবছিল প্রিয়া এইসব। পৌছোলো ৫টা নাগাদ , গেটের সামনেই দাড়িয়ে আছে সন্তু। প্রিয়ার হার্টবিট যেন আরেকটু বেড়ে গেল ,নিজেকে সামলে নিল প্রিয়া। আজ ইকোপার্ক একটু ফাকা ,দুজনে কিছু সময় ধরে ঘুরল , খাওয়া-দাওয়া করল , সবশেষে বেঞ্চের উপরে গিয়ে বসল। যেখানে ওরা বসেছিল , তার সামনে অনেক গুলো কটেজ আছে , তার-ই মধ্যে একটা দেখিয়ে সন্তু বলল ‘ওটা আমাদের জন্য বুক করেছি , চল নিরিবিলিতে টাইম কাটাই।‘ প্রিয়া অবাক হয়ে বলল ‘এতো অনেক ভাড়া , তুমি কি করে...’’ ,সন্তু ওকে থামিয়ে বলল ‘আমি যাদের জন্য কাজ করি , তারা আমার কাজে খুশী হয়ে প্রমোশন দিয়েছে , তাই বুক করলাম তোমার জন্য’। প্রিয়ার সন্দেহ হলেও গেল ওর সাথে।

ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে ফ্রেশ হয়ে গেল সন্তু আর প্রিয়াকেও ফ্রেশ হতে বলল। প্রিয়া বাথরুমে ঢুকে ভাবতে লাগল সে এরকম কিছুতো এক্সপেক্ট করেনি , এবার কিন্তু ভয় করতে লাগল তার , যদি কিছু উল্টোপাল্টা হয়ে যায় তাহলে মা-বাবাকে মুখ দেখাবে কি করে। কিন্তু আবার সে ভাবল তার ভাবনা হয়তো ভুল , সন্তু কে তো ভালো ছেলে বলেই মনে হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই সন্তু তাকে পুরো শুইয়ে দিল আর তার উপর নিজে শুতে যাচ্ছে ,এমন সময় সন্তুর ফোনে একটা মেসেজ এল ,প্রিয়া সংগে সংগে তুলে নিয়ে দেখল “আজ কখন দেখা হচ্ছে? আজ আমি খুব ওয়াইল্ড মুডে আছি , জলদি এস আমার বাড়ীতে , তোমাকে খুশী করে দেব।“ প্রিয়া সন্তুকে ঠেলে সরিয়ে দিল , সন্তু ওর হাত চেপে ধরে জবরদস্তি করতে যাচ্ছিল , প্রিয়া থাপ্পড় মেরে বেরিয়ে গেল কাঁদতে কাঁদতে। বাসে উঠতেই সন্তুর মেসেজ “তোমার সাথে কিছু করতে পারলাম না , বাট ইউ কুড হ্যাভ গিভেন গুড বিজনেস।“

৫ ই জুলাই , ২০১৬

মেসেজটা দেখে নিয়ে গম্ভীর মুখে বসে থাকলেন সেন , সামনে বসে প্রিয়া অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে । সেন হারুকে ইশারাতে জল দেওয়ার জন্য বললেন । প্রিয়া জল খেয়ে একটু শান্ত হল , সেন বললেন ‘তার পর নিশ্চয়ই সন্তুর সাথে আর কথা হয়নি!’ প্রিয়া মাথা নাড়ল। হারু বললো ‘তোমার আর কিছু মনে আছে , ওই রুমে কিছু দেখেছিলে?’ প্রিয়া ঠিক মনে করতে পারল না। সেন আর হারু প্রিয়ার বাবা-মাকে চিন্তা করতে না বলে আর যদি কিছু মনে পড়ে প্রিয়ার জানাতে বলে বেরোলেন । বাইরে আবীর বোস এসেই গেছিল সেনের কথা মত , সেন হারু আর আবীরকে বললেন ‘তোমরা সন্তুর বাড়ীতে গিয়ে আবার দেখ , ল্যাপটপ বা আরো কিছু যদি পাও , বোঝাই যাচ্ছে যে এই সন্তু ছেলেটি সুবিধার ছিল না আর রাজীব ওকে অন্য কোনো কারণে মেরেছে যেটা ও কোনোদিন-ই স্বীকার করবেনা যদিনা আমরা প্রমাণ জোগাড় করতে পারি। আর সন্তুর ফোনটার রিপোর্ট আসলে জানিও।‘

৮ ই জুলাই , ২০১৬

সন্ধ্যার দিকে আবীর ফোনের রিপোর্ট নিয়ে সেনের অফিসে এল , বলল ‘স্যার , যে নম্বর থেকে ২৭ এপ্রিল সন্তুর কাছে এসএমএস এসেছিল সেই নাম্বারটা চেক করেছি আমরা , সেটা আয়ুশী খান্নার নম্বর। ইন্টারোগেশন রুমে এনেছি ওকে আমরা । আর , একটা ভিডিও আছে ফোনে বাট স্যার একদম ক্লিয়ার না , সাইবারের অমিত কে পাঠিয়েছি। মনে হয় ওটাতে পুরো কেস পরিষ্কার হবে।‘ সেন আবীরের পিঠ চাপড়ে বললেন ‘তার মানে বুঝছ! প্লানড মার্ডার হলে খুনি পুরো ফোন সাফ করে দিত, হয়তো ফোনটা নষ্ট-ই করে দিত। অতএব এটা হিট অফ দা মোমেন্ট মার্ডার, আর রাজীব এ ব্যাপারে যথেষ্ট-ই কাচা।‘

সেন আর আবীর ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকে আয়ুশীকে প্রশ্ন করতেই সে ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল ‘স্যার , ওই সন্তুকে আমরা টাকা দিতাম।‘… একটু থেমে আবার নিচু স্বরে বলতে আরম্ভ করল ‘ও আমাদের শারীরিক চাহিদা মেটাতো আর তার বদলে টাকা নিতো।‘ সেন আয়ুশীর দিকে ঝুঁকে পরে বলল ‘আমাদের মানে? আরো অনেকেই এরকম করতো!’ আয়ুশী বলল ‘হ্যাঁ, স্যার আরো অনেকে।‘ এর মধ্যে হারু ঢুকেছে রুমে ,দেখে সেন উঠল ‘কি হারু , হোটেল থেকে কি খবর পেলে? ওরা সন্তু কে চিনতে পেরেছে?’ হারু সেনের কানে কানে আর রিপোর্ট দেখিয়ে কিছু একটা বলল, সেনের মুখ বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আবীরের সেলটা বাজল ‘অমিতদা বল , গ্রেট নিউজ , পাঠিয়ে দাও ভিডিও টা আমার মেল-এ।‘ মেল আসতেই আবীর আর সেন ভিডিওটা দেখতে শুরু করল , একটা এমএমএস ভিডিও। ভিডিওতে ছেলেটিকে চিনতে পেরেছে ওরা দুজনেই ,সন্তু। কিন্তু মেয়েটার মুখ এখনো পরিষ্কার নয় , আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতেই চমকে উঠলেন দুজনেই। আবীর বলে উঠল ‘স্যার একে তো আমরা চিনি’। সেন বললেন ‘ভিডিও-র Authenticity ল্যাবে চেক করাও ,উই হ্যাভ সলভড দি কেস!’ আবীর তখনো অবাক ‘রাজীব কি সত্যি-ই খুনী?’ সেন হাসতে হাসতে বললেন ‘জানতেই পারবে!’

১০ ই জুলাই , ২০১৬

স্থান – রাজীব বিশ্বাসের বাড়ী । উপস্থিত আছেন রাজীব বিশ্বাস , প্রমীলা বিশ্বাস , প্রিয়া সরকার , সন্তুর বাবা , হারু, আবীর আর ইন্সপেক্টর সেন

সেন বলতে আরম্ভ করলেন ‘সোজা পয়েন্টে আসি। গল্প খুব সিম্পল , রাজীব বিশ্বাস প্রিয়া সরকারের সাথে চ্যাট শুরু করে কিন্তু মিথ্যে বলে যে সে ২৫ বছরের। দুর্ভাগ্যক্রমে রাজীবের এই মিথ্যে বেশিদিন টিকলনা আর সে ধরা পড়ল , প্রিয়া-ও তার সংগে সব চ্যাট বন্ধ করে। তার পরে প্রিয়ার আলাপ হয় নিয়ার-পার্ফেক্ট সন্তুর সাথে অনলাইন চ্যাটে , দুজনের প্রেম জমে। আর দুজনে মিলে রাজীবকে Bully করতে শুরু করে।‘ সেন একটু থেমে রাজীবের দিকে ফিরে বলেন ‘কিন্তু রাজীব বাবু, সেসব তো কবে চুকে গেছে , ২ মাস আগেই। তাহলে এখন-ই ওকে মারলেন কেন ?’ রাজীব মাথা নিচু করে বসে থাকল।

সেন একটু হেসে বললেন ‘কারণ এই খুনের উদ্দেশ্য অন্য কিছু ছিল , প্রিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি একটা এসএমএস-এর কথা যা ও দেখেছিল সন্তুর ফোনে।‘ সেন এবার সন্তুর বাবার দিকে ফিরে বললেন ‘আপনি ঠিক ধরেছিলেন, আপনার ছেলে বাজে কাজ-ই করতো ,সে ধনী মধ্যবয়স্কা মহিলাদের সাথে শুতো আর তার বদলে পয়সা নিত।‘

প্রমীলা এইসময় ফিউরিয়াস হয়ে উঠল ‘আপনি ভদ্রলোকের বাড়িতে দাঁড়িয়ে এসব কি বলছেন!’ সেন ওনার দিকে ফিরে চোয়াল শক্ত করে বললেন ‘ভদ্রবাড়ির মহিলারা নিজেদের শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য পয়সাও দেয়না কাউকে, দেয় কি প্রমীলা দেবী!!’ প্রমীলা মাথা নিচু করে বসে রইল। সেন বললেন ‘আপনি দিনের পর দিন সন্তুর সাথে সম্পর্ক রাখেন নি? বিভিন্ন হোটেলে ,আয়ুশীর বাড়ীতে দেখা করেননি? আয়ুশী সব স্বীকার করেছে ,কারণ সে-ই তো সব পাকা করাত তাই না? আরো যদি চান , যে হোটেলে আপনি যেতেন তার ম্যানেজারের বয়ান-ও আমাদের কাছে আছে।’ প্রমীলার মুখ পুরো কালো হয়ে ছোট হয়ে গেল। সেন বলে চললেন ‘তারপর যখন সন্তু আরো পয়সা চাইতে শুরু করল....’ প্র্মিলা চিৎকার করে উঠল ‘হ্যাঁ, আমি ওকে মেরেছি। টাকা চেয়ে যাচ্ছিল বেশী, আমি দিতে রাজী ছিলাম না। ভয় দেখাচ্ছিল যে সব বলে দেবে, তাই ১লা জুলাই আমি ওকে পয়সা দেওয়ার ছুতোয় ডেকে খুন করি। কিন্তু ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি আর বুঝেছিলাম যে আমি ভুল করেছি, তাই রাজীবকে সব খুলে বলি সেই রাতে.....’

সেন গলা নামিয়ে বললেন ‘ আর রাজীব নিজের বউকে স্ক্যান্ডেলের হাত থেকে বাচাতে নিজের উপর দোষ নিয়ে নিলেন...এই তো! কেন মিথ্যে বলছেন? ... হারু , পাশের ঘর থেকে রিমিকে নিয়ে এস’ রিমি ঘরে আসতেই রাজীব কেঁদে উঠলেন ‘ স্যার , প্লিজ সবার সামনে ওকে কিছু বলতে বলবেন না , ও বাচ্চা মেয়ে.... প্লিজ স্যার!’ রিমি বলে উঠল ‘ বাবা চুপ করো , আর কত মিথ্যে বলবে , স্যার আমি বলছি। আমার মায়ের সাথে সন্তুর কি সম্পর্ক ছিল আমি জানতাম না, কিন্তু একদিন মায়ের ফোনে সন্তুর করা একটা এসএমএস আমি দেখে ফেলি আর জেনে যাই ওদের সম্পর্কে। আমি সন্তুকে ১ বছর ধরে চিনতাম ,একমাত্র ভুল ছিল ওকে ভালোবাসা, ওর সাথে একটা শারীরিক সম্পর্কে আমি জড়িয়ে পরি আর ও আমায় না জানিয়ে ভিডিও করে। পরে বারবার ওই ভিডিও ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে অনেকবার নিজের বাড়িতে , হোটেলে ডেকেছে আর আমার সাথে.....’ ,বলে কাঁদতে থাকল রিমি। সেন রিমিকে থামিয়ে বললেন ‘আর তুমি যখন জানতে পারলে সন্তু তোমার মাকেও ব্ল্যাকমেল করছে , তখন তুমি ওকে ডেকে দেখা করার ছুতোয় ওকে মারলে।‘ রিমি মাথা নাড়ল। রাজীব কেঁদে উঠল ‘আমি আমার মেয়েকে বাঁচাতে নিজের ওপর দোষ নিয়েছি ,ওর সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে স্যার!’ সেন রাজীবকে থামিয়ে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘খুব বাঁচা বেচেছ তুমি...’। প্রিয়া মুখ নিচু করে বসে থাকল। সেন আবীর আর হারু কে বললেন ‘চল হে, কাজ শেষ।‘ হারু অবাক হয়ে বলল ‘আর গ্রেপ্তার?’ সেন বলল ‘তোমার মর‍্যাল কি বলে? আর ওই আয়ুশীকে নিয়ে কিছু একটা কেস সাজিয়ে দেব।‘ সেন রাজীবকে এক কোণায় ডেকে নিয়ে গেলেন ‘এবার আর কোনো দিকে মন না দিয়ে রিমিকে ভালো করে বড় করার দিকে মন দিন... চলি।‘

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮