• মিঠু সরকার

ভ্রমণ কাহিনী - নবরূপে কেদারদর্শন

২০১৩ সালের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে স্বয়ম্ভূ কেদারনাথ নবরূপে বিরাজ করছেন কেদারখণ্ডে । এই জ্যোতির্ময় শিব শক্তি দর্শনের আকুলতা নিয়ে সেদিনের মতো আজও মানুষ দলে দলে ছুটে চলেছেন কেদারনাথ দর্শনের আকুলতা নিয়ে। পথের দুর্গমতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আতঙ্ক আজ আর মানুষকে ভীত করে না, আর সেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়েছি ।

আপ দুন এক্সপ্রেস ভোর ৪ টে ৪০ মিনিটে হরিদ্বার পৌঁছে দিল। ট্রেনে আলাপ হয়েছিল একটি ট্রেকার দলের সঙ্গে , তাদের একজনের মুখে শুনেছিলাম টেহরিতে নাকি মেঘ ফাটা বৃষ্টিতে রাস্তা বন্ধ – সেই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই সাড়ে দশটায় শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে আগে স্থানীয় পুলিশ চৌকিতে খোঁজ নিলাম, জানা গেল, কেদার বদ্রীর পথ খোলা আছে, সুতরাং যাওয়া যাবে। যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

পরদিন “শ্রী কেদারনাথজী” কে স্মরণ করে যাত্রা শুরু করলাম। পথে ‘কোটেশ্বর মহাদেব ও রুদ্রপ্রয়াগ’ দর্শন করে বেলা তিনটেয় ফাটা পৌঁছলাম, ছোট্ট জনপদ, স্থানীয় মানুষের বাড়িঘর , দোকানপাট , ধাপে ধাপে চাষের জমি আর সবুজ পাহাড় , পাহাড়ের গা দিয়ে ঘন ঘন উড়ে চলেছে বিভিন্ন কোম্পানির হেলিকপ্টার।

সকাল দশটায় ফাটা হেলিপ্যাডে পৌঁছে গেলাম। প্রথমে ওজন মাপা হল, ব্যাগে ট্যাগ লাগানো হল, তারপর সাড়ে এগারোটায় পবনহংসের ১৮ নং কপ্টার এলো। সবুজ পাহাড়ের পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছি, বহু নীচে মন্দাকিনীর সরু ফিতের মতন ধারা দৃশ্যমান । একটি পাহাড় পেরোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল পায়ে চলা পথ , কত শত যাত্রী ওই পথ ধরে হেঁটে চলেছে, ক্রমশ দূরে বরফের পাহাড় চোখে পড়ল, ডানদিকে অনেক নীচে কিছু তাঁবু দেখা যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম ।

কেদার-শৃঙ্গের হাতছানি

মন্দাকিনীর জলোচ্ছ্বাস

পাঁচ থেকে সাত মিনিটের রাস্তা, কেদার হেলিপ্যাডে পৌঁছে গেলাম । বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন দেখিয়ে এগিয়ে গেলাম মন্দিরের পথে । হেলিপ্যাড থেকে মন্দির পাঁচ কিমি পথ। কত মানুষের ভিড়! মন্দাকিনীর নতুন ধারার উপর নবনির্মিত ব্রিজ পেরিয়ে হালকা চড়াই ভেঙ্গে এগিয়ে চলেছি। দূর থেকে মন্দিরের চূড়া দেখতে পাচ্ছি। লম্বা লাইন পড়েছে পুজো দেওয়ার। আকাশে মেঘ, অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে, মন্দিরের পিছনের বরফের চুড়া লুকোচুরি খেলছে সাদা মেঘের আড়ালে।

কিছু কিছু বাড়িঘর ভগ্নদশা নিয়ে ঝুলে রয়েছে । কিছু কিছু নতুন ঘর তৈরি হয়েছে । পুজোর উপকরণ নিয়ে দোকানী অস্থায়ী দোকান সাজিয়েছে , সাধুরাও পথের ধারে বসে আছেন ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ।

মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঘোর ভাঙল, আবার এসেছি , সত্যিই এসেছি!!! বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছে না ।অনেক বছর আগে বাবা-মা কে নিয়ে এসেছিলাম, এবার একা এসেছি , কিন্তু একাকীত্ব বোধ করছি না , কারণ সারা ভারত থেকে আসা অসংখ্য মানুষ আমার চারপাশে ।

২০১৩ সালের প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেদারনাথের রূপ বদলে দিয়েছে। আগেকার সেই দোকান, সেই ধর্মশালার ভিড় নেই, এখন অনেকটা উন্মুক্ত ফাঁকা জায়গা, মন্দিরের সামনে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ, বিরাট বড় একটা ঘণ্টা, আর কয়েকটি ছোট ঘণ্টা দিয়ে শোভিত প্রবেশ দ্বার, ঘণ্টা বাজিয়ে সবাই আঙ্গিনায় প্রবেশ করছে, তাই সর্বক্ষণ ঘণ্টাধ্বনি শুনছি ।

আমার পূর্বপরিচিত শ্রীরাজীবচন্দ্র শুক্লাকে খুঁজে বার করলাম । তিনি মন্দির কমিটির গেস্ট-হাউসে থাকার ব্যবস্থা করে জানালেন , ভোরবেলা পুজো দেওয়া ভাল হবে , তাই আজ সারাদিন হাতে অনেক সময় । পুরো কেদারনাথ ঘুরে দেখবো ।

গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । প্রথমে মন্দিরের পিছন দিকটায় গেলাম । সেই বিশাল আকৃতির পাথরটিকে স্পর্শ করে শিহরিত হলাম , প্রবল জলস্রোত এই পাথরেই ধাক্কা খেয়ে দুটি ভাগ হয়ে মন্দিরের দুইপাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল । এখন এটি ‘ভীমশিলা’’ নামে পূজিত হচ্ছে । জগৎগুরু শঙ্করাচার্যর সমাধিস্থল , শ্বেতপাথরের সন্ন্যাসীর দণ্ড সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে । শুধু পড়ে রয়েছে অসংখ্য বোল্ডার । কিন্তু মন্দাকিনী নদী কোথায় ! খুঁজতে খুঁজতে মন্দির থেকে অনেকটা দূরে চলে এলাম , তবে দেখা মিলল । এদিকটা খুব ফাঁকা, আর নির্জন , এক-দুজন সাধুকে দেখলাম, আর একজন নির্মাণ-কর্মীকেও হেঁটে যেতে দেখলাম ।

সেই ভীম-শিলা – ২০১৩ সালের সেই বিপর্যয় থেকে যা এই মন্দির কে রক্ষা করেছিল

২০১৩ সালের বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি

ফিরে এলাম মন্দিরে। হাঁটতে হাঁটতে নেমে এলাম সেই ব্রিজটার কাছে, বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি ভেঙ্গে কয়েকটি পাথর টপকিয়ে দুই ধারার মিলনস্থল দেখলাম, শীতল পবিত্র বারি মাথায় নিলাম। এখান থেকে ব্রিজটা বড় উঁচু মনে হচ্ছে, তার পিছনে সবুজ পাহাড়টি ছবির মত দেখাচ্ছে।

বৃষ্টি পড়ছে, তাই উঠে আসতে হলো। হেঁটে আসা যাত্রীরা প্লাস্টিক সীট গায়ে দিয়ে পুজোর লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজীবজীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ২০১৩ সালের সেই ভয়ঙ্কর দিনটিতে তিনি কোথায় ছিলেন? উত্তর শুনে গায়ে কাঁটা দিল। তিনি মন্দিরে পুজো করছিলেন। অনেক ভক্তও সেখানে ছিলেন। অকস্মাৎ প্রবল জলস্রোত গর্ভগৃহে প্রবেশ করল, উপস্থিত সকলেই কিছুক্ষণ জলের তলায়, তারপর জলের চাপে পশ্চিম দিকের বন্ধ দরজা খুলে যায়। আর সমস্ত জল ওই পথে বাইরে বেড়িয়ে যায় । মন্দিরের ভিতর সকলেই প্রাণে বাঁচে । সেদিন জলের স্রোতে বহু মানুষ, বাড়ি-ঘর ভেসে যায় । এখন কেদারনাথের অন্য এক রূপ, আর এরূপ দেখতেই তো আসা । প্রকৃতি আবার আপন হাতে সব কিছু নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছে।

কেদারনাথ মন্দির

মন্দিরের সামনে পূজা সামগ্রীর দোকান

বিকেল চারটে থেকে মাইকে শিব-স্তুতি ও বন্দনা গান শুনছি । ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার চলে এলাম মন্দিরে। প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়েছে প্রাঙ্গণে। চারপাশের পাহাড়গুলি সাদা মেঘে ঢেকে গেছে। মনে হচ্ছে যেন বিরাট এক শূন্যতার মাঝে শুধু দাঁড়িয়ে আছে কেদারনাথ মন্দিরটি ।

ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। মন্দিরের সামনে ঝোলানো নীল আলো জ্বলে উঠল। দুজন সাধু ধুনি জ্বেলে বসে আছেন, ঘি আর কর্পূরের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে । শুরু হল আরতি, উচ্চ কণ্ঠে পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের সাথে আরতি চলল। উপস্থিত দর্শনার্থীদের কণ্ঠেও “হর হর মহাদেব” ধ্বনি। অপূর্ব পরিবেশ, কত দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম এই মুহূর্তটির, মনে হচ্ছে না বাড়ী থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি । এ যেন আমার বাড়ীর আঙ্গিনাতেই পুজোর আয়োজন হয়েছে । আরতি শেষে আমরা একে একে মন্দিরে প্রবেশ করলাম শ্রী কেদারনাথজীর রাজবেশ দর্শনের জন্য । স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত রৌপ্য ছত্রে শোভিত অপূর্ব দেবদর্শন । পরিতৃপ্ত মন নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। আরও অনেকক্ষণ কাটালাম মন্দিরে , ঠাণ্ডা বাড়তে লাগল , রাতের খাওয়া সেরে ঘরে ঢুকলাম ।

রাতে খুব ঠাণ্ডা, ভাল ঘুম হল না, ভোর চারটেয় মন্দিরে চলে এলাম । কুড়ি জনের পর লাইনে দাঁড়ালাম । ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে , অন্ধকারে পাহাড়গুলো কালো দেখাচ্ছে, তবে আকাশ পরিষ্কার , অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে, লাইন ক্রমশ বাড়তে লাগল, মানুষের কথাবার্তায় ভোররাতের নিস্তব্ধতা অনেকটাই বিঘ্নিত হচ্ছে। গত সন্ধ্যার সাধুর ধুনিতে অল্প আগুন এখনও জ্বলছে, পূর্ব দৃষ্ট সাধু এখন নেই, তবে তার আসন শূন্য নয়, অন্য একজন বসে আছেন। অনেক দেশোয়ালি মানুষ পুজোর থালি নিজের মত করে গুছিয়ে নিচ্ছেন, বাড়ী থেকে আনা নানা উপকরণ প্যাকেট থেকে বের করে থালায় সাজাচ্ছেন ।

ভোর ৫টায় মন্দিরের দরজা খুলল – সমবেত কণ্ঠে “হর হর মহাদেব” উচ্চারণ, ক্রমশ চারিদিকে দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ছে, পূব আকাশে রক্তিমাভা , কেদার-শৃঙ্গে লাল রঙের ছোঁয়া – অপূর্ব একটি ভোর প্রত্যক্ষ করলাম, পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী, কুন্তী, লক্ষ্মী – নারায়ণ দর্শন করে গর্ভগৃহে ঢুকলাম , ভিড় যথেষ্ট আছে, রাজীবজী অপেক্ষাকৃত একটা ফাঁকা জায়গায় বসিয়ে শ্রী কেদারনাথের দর্শন-স্পর্শন-মন্ত্রোচ্চারণ–পুজো ভালভাবেই করালেন। মাথা ঠেকিয়ে অন্তরের প্রার্থনা জানালাম। এখন প্রচুর মানুষের ভিড়, কেউ দর্শনের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছেন। নন্দীর মূর্তির সামনে একজন মধ্যবয়সী মহিলাকে দেখলাম মহাদেবের বন্দনায় নৃত্য–গীতে বিভোর ।

চারপাশের পাহাড়গুলি সকালের সোনালি আলোয় ঝলমল করছে, এমন পরিবেশ ছেড়ে যেতে মন চায় না ,তবু একটু পরেই আমাকে বিদায় নিতে হবে, মনের কোণায় “আবার আসিব ফিরে” – এই ইচ্ছা লালন করব দিন-দিন প্রতিদিন, মানুষের এই আসা – যাওয়ার ধারাকে কোন বিপর্যয় রুদ্ধ করতে পারেনি কোনোদিন, স্বয়ম্ভূ কেদারনাথকে দর্শনের পিপাসায় মানুষ আসতেই থাকবে যুগে যুগে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮