• পার্থ সেন

গল্প - পুরোটাই কাল্পনিক


[১]

সকাল থেকেই আজ বৃষ্টি হচ্ছে, থেকে থেকে রীতিমত জোরে, সারা কলকাতা জলমগ্ন। আমি অমিত রায়, আই পি এস, কলকাতা পুলিশের ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করি। কাল রাতে একটা কেস শেষ করে চেন্নাই থেকে ফিরেছি, তখন প্রায় মাঝ রাত। রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল, সকাল থেকে বেশ জোরে। তার পর সকালে পার্ক স্ট্রিট থানায় আসতে হয়েছে একটা মার্ডার কেসের প্রাথমিক তদন্ত করতে। তদন্ত শেষ করে বেরোতে প্রায় দু ঘণ্টা লাগল, বৃষ্টির জন্য আজ আমার ড্রাইভার আসেনি, নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছি। এদিকে জীপের বাঁদিকের ওয়াইপারটা কাজ করছে না, আর সমানে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় গাড়ির জ্যাম, কখনো খুলছে আর কখনো অন্যের পেছনে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবে প্রায় পার্ক সার্কাসের মোড় পর্যন্ত এলাম, আর ঠিক এই সময়ে ফোন টা বেজে উঠল - ডিসি ডিডি র নম্বর। গাড়িটা রাস্তার বাঁ দিকে দাঁড় করালাম। কয়েক সেকেন্ড মাত্র কথা হলো, বুঝলাম লালবাজার নয় এবারে গন্তব্য ভবানী ভবন, আমার ডাক পড়েছে। সুতরাং পথ পরিবর্তন করতে হল। পৌঁছতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগল, তবে অপেক্ষা করতে হয়নি, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পড়ল।

“অমিত এটা একটা অত্যন্ত সেন্সিটিভ ব্যাপার, ফোনে বলতে চাইছি না, তাই তোমাকে ডাকলাম, বাই দ্যা ওয়ে চেন্নাই থেকে এস পি ফোন করেছিলেন। খুব ইম্পপ্রেসড তোমার কাজে। ওয়েল ডান!”

“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার”

“ফিরলে কখন রাত্রে?”

“বাড়িতে ঢুকতে প্রায় দেড়টা হয়ে গেছিল। এনি ওয়ে স্যার, কি ব্যাপার বলুন”

“ডঃ পাবলো স্পিন্যালো, এক ইটালিয়ান ভদ্রলোক কলকাতায় এসেছেন সপ্তাহ খানেক হল কিছু রিসার্চের কাজ নিয়ে, লন্ডনে ইউনিভার্সিটি অফ আর্টসে পড়ান। আপাতত সোনারে উঠেছেন, কাল ওয়েলিংটন স্কোয়ারে সেন্ট পিটার চার্চের কাছে ওনাকে নিয়ে একটা বাজে ব্যাপার হয়েছে। কিছু ভ্যান্ডাল এই ভদ্রলোকের ওপর চড়াও হয়ে ওনাকে বাজে রকম অ্যাসল্ট করে, তারপর ওনার টাকা পয়সা, রিসার্চ পেপার সব কিছু নিয়ে ওনাকে লিটারেলি রাস্তায় নামিয়ে দেয়। কাল রাতেই আমাকে জানিয়েছে, যে করে হোক খবরটা অবশ্য কাগজে ফ্ল্যাশ করতে দিইনি। প্রেস জানতে পারলে একটা যাচ্ছেতাই ব্যাপার হতো”

“উনি এখন হসপিটালে?”

“না, হোটেলেই আছেন, হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়নি”

“এনি মোটিভ?”

“সেটা এখনো ক্লিয়ার নয়, লোকাল থানা ইনভেস্টিগেট করছে, এখনো অবধি যতটুকু জানা গেছে মনে হচ্ছে এটা স্থানীয় গুণ্ডাদের কাজ নয়”

“ভদ্রলোক নিজে কিছু বলেছেন? কোন উগ্রপন্থী সংগঠন এর মধ্যে নেই তো?”

“আমি ব্রিফলি ওনাকে মিট করেছি আজ সকালে, উনি এখনো একটা মেন্টাল ট্রমাতে রয়েছেন, তবে ওনার মনে হয় না সে রকম কিছু আছে। কারণ যারা অ্যাটাক করেছিল ওরা কিছু খুঁজছিল। তারপর কিছু না পেয়ে ওনাকে অ্যাসল্ট করে। বাট মোর ইম্পপরট্যান্টলি অমিত, এটা একটা কমিউনিটি সেফটির প্রশ্ন, বিদেশীদের ওপর এই রকম ঘটনা আগে কখনো আমাদের শহরে হয়নি। সব হারানো জিনিস আমাদের উদ্ধার করে দিতে হবে। অ্যান্ড উই নিড টু ফাইন্ড দ্যা ট্রুথ বিহাইন্ড দিস”

“স্যার, মিনিস্ট্রি ব্যাপার টা জানে?”

“হ্যাঁ, আমার হোম মিনিস্ট্রির সাথে কথা হয়েছে, চিফ সেক্রেটারি ও ফোন করেছিলেন। সেন্টারকে ওরা জানিয়ে রেখেছে। ইটালিয়ান এম্ব্যাসীকেও ওরা জানিয়েছে। দে অল উইল কোঅপারেট, আর তুমি এটাকে ইনভেস্টিগেট করবে। আই ক্যান নট ডিপেন্ড এনি ওয়ান এলস। তোমার লোকজনকে লাগিয়ে দাও, আর অবভিয়াসলি ইনভেস্টিগেশন চুপিচুপি হবে। প্রেস যেন কোন মতেই না জানতে পারে”

“প্রেস আমাদের দিক থেকে জানবে না স্যার। ডোন্ট ওরি! কিন্তু ইনি লন্ডনের প্রফেসর, ইন্টারনেটে জিনিসটা ফ্ল্যাশ করতে কতক্ষণ?”

“স্পিন্যালো আমাকে কথা দিয়েছেন উনি সে রকম কিছু করবেন না”

“স্যার কোন অ্যারেস্ট করার দরকার হলে?”

“ইউ নো মাই আনসার! খালি দেখো কাস্টোডিয়াল ডেথ যেন না হয়, রেস্ট ডু হোয়াট এভার ইউ ওয়ান্ট টু ডু। সত্যিটা আমাকে জানতেই হবে অমিত! আর একটা কথা আমাদের কাছে কিন্তু বেশী সময় নেই। কামিং ফ্রাইডে উনি ফিরে যাচ্ছেন”

বেরিয়ে পড়লাম, উদ্দেশ্য ডঃ স্পিন্যালোর সঙ্গে দেখা করা। ভবানী ভবন থেকে ডঃ স্পিন্যালোর হোটেলে পৌঁছতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। মাঝখানে ছোট একটা লাঞ্চের বিরতি। বিপ্লব আমার বন্ধু, আমার সতীর্থ, লালবাজারে ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে, আমার সঙ্গে অনেক কাজ করেছে আগে, ওকে বলে রেখেছিলাম, আর এসব ব্যাপারে ও খুব এফিসিয়েন্ট। আমার আগেই হোটেলে পৌঁছে গেছিল আর প্রাথমিক ব্যাপার গুলো ও আগেই সেরে রেখেছিল। হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গেও আগে থেকে কথা বলে রাখা হয়েছিল, যাতে ডঃ স্পিন্যালোর সময় পাওয়া যায়।

হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে বসে কথা হচ্ছিল, এখন অবশ্য মানসিক অবস্থা বেশ স্টেবল লাগল। ডঃ স্পিন্যালোর ইংরাজি টা একটু জড়ানো, তবে বোঝা যায়। পুরো ব্যাপার টা আমাকে যা বললেন সেটা অনেক টা এই রকম –

“গত পনের বছর ধরে, আমি পুরোনো চার্চ নিয়ে রিসার্চ করি। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে আমি গেছি নানা তথ্যের সন্ধানে। মূলত ইউরোপে আমি ঘোরাঘুরি করতাম, শেষ বছর দুয়েক ধরে এই সাউথ ইস্ট এশিয়ায় আসা শুরু করেছি। কলকাতায় আমি প্রথম আসি বছর দুয়েক আগে। বেশ অনেক গুলো চার্চ আমি কভার করেছিলাম, তার মধ্যে একটি ছিল এই ওয়েলিংটনে সেন্ট পিটার চার্চ। সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো ক্যাথলিক চার্চ, তা সেখানে আমি এক অদ্ভুত স্থাপত্য আমি দেখতে পাই। জার্মানিতে একটি ক্যাসল আছে, তার নাম নিউসওয়ানস্টেন ক্যাসল, প্রায় অস্ট্রিয়ার সীমানায়, ফুসেন শহরে, আল্পসের ওপর, জার্মানরা একে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা বলে। যাই হোক যেটা বলার, এই দুর্গে এক অদ্ভুত আর্কিটেকচার দেখা যায়। দুর্গের ভেতরে অসাধারণ সব পেন্টিং করা আছে, বিভিন্ন অপেরার ছবি, কিছু বাইবেলের ছবি, আর আছে অসাধারণ বিচিত্র রঙের লাইম স্টোনের কাজ। আপনি দিল্লী, আগ্রায় মুঘল স্থাপত্যের মধ্যে এ জিনিস দেখবেন, যদিও নানা রঙের প্রয়োগ সেখানে খুব বেশী দেখবেন না। ইউরোপে এই রকম ইন্টেরিয়রে লাইম স্টোনের কাজ একটু আনকমন, যাই হোক সে কাজ কিন্তু অসাধারণ, আর তার জিওমেট্রিক প্রিসিশন তো দেখার মতো। শুনলে অবাক হবেন, এই সেন্ট পিটার চার্চে এসে আমি আবার সেই রকম লাইম স্টোনের কাজ দেখলাম। দেওয়ালে, সিলিঙে, আরো আশ্চর্যের চার্চে আঁকা কিছু ছবি এবং কিছু কারুকাজ একেবারে হুবহু এক রকমের। আমি নিজে ক্যামেরা তে কিছু ছবি তুলে নিয়ে যাই এবং আর এক বার নিউসওয়ানস্টেন ক্যাসলে যাই। শুনলে অবাক হবেন এ যেন অবিকল কার্বন কপি। সে যুগে ক্যামেরার প্রয়োগ তো সেভাবে ছিল না। তাহলে কি কানেকশন? কিন্তু কোন এক যোগসূত্র তো থাকতে হবে। আমরা হিস্টোরিয়ানরা আবার অলৌকিক ব্যাপারে বিশ্বাস করি না। আমি আরো ডিটেলে রিসার্চ করা শুরু করি। মাস তিনেক আগে আর একটা নতুন তথ্য পাই। উইলিয়াম আরলট নামের ইংল্যান্ডের এক চিত্রকর, যিনি সেই দুর্গে কাজ করতেন, তিনি জীবনের শেষ তিরিশ বছর কলকাতায় কাটিয়ে গেছেন। তাহলে কি ইনিই সেন্ট পিটার চার্চে আসেন এবং সেখানে এই ডেকরেশন করেন? এর উত্তর অবশ্য আমি এখনো নিশ্চিত ভাবে পাই নি। যাই হোক, গত সেপ্টেম্বরে আমি একটা পেপার পাবলিশ করি এই নিউসওয়ানস্টেন ক্যাসল আর সেন্ট পিটার চার্চের এই অজানা কানেকশনের ওপর। লন্ডন ইউনিভার্সিটি অফ আর্টস সেটাকে প্রকাশ করে। তা সেই নিয়েই আমার আবার কলকাতায় আসা। উদ্দেশ্য এই উইলিয়ামের ব্যাপারে আরো কিছু জানা। তো কাল সেই চার্চেই গেছিলাম, আর ফেরার পথে এই ঘটনা। বাকী টা তো আপনারা শুনেছেন”

“কি করে ব্যাপার টা হলো, একটু ডিটেলে বলুন”

“আমি হোটেলের গাড়িতে করে গেছিলাম, এই নিয়ে থার্ড টাইম গেলাম। ফাদারের সাথে কিছু কথা বলার ছিল আর কিছু ফটোও তোলার ছিল। তা কাজ হয়ে গেলে দেখলাম নতুন একজন ড্রাইভার আমার জন্য অপেক্ষা করছে। শুনলাম আগের ছেলেটির নাকি বাড়িতে কিছু এমারজেন্সী, তাই তাকে চলে যেতে হয়েছে। আর হোটেল থেকে তাকেই পাঠানো হয়েছে। তা আমি ঠিকঠাক ই আসছিলাম, রাস্তা তো চিনি না। তা মাঝরাস্তায় গাড়ি দাঁড় করালো, সে জায়গাটাও বেশ ফাঁকা ছিল। বললো কি নাকি আওয়াজ আসছে গাড়ি থেকে। সে নামল, আর ব্যাস, দরজা খুলে চার জন লোক আমাকে ঘিরে ধরল। তারপর ধাক্কাধাক্কি হাতাহাতি, আমার সঙ্গে একটা ব্রিফ কেস ছিল, তারমধ্যেই আমার সব কাগজ পত্র থাকে। সেটাকে নিয়ে চলে গেল। আর ফোনটাও নিয়ে গেছে”

বিপ্লবের দিকে তাকাতে চাপা গলায় সে আমাকে বলল, “আগের ড্রাইভারকে গানপয়েন্টে রেখে সরিয়ে নিয়েছিল। বাই দ্য ওয়ে আমরা ওকে কাস্টডি তে নিয়েছি, জিজ্ঞাসা বাদ চলছে, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে রিপোর্ট চলে আসবে”

“রাস্তায় কাউকে দেখেন নি?”

“না, রাস্তা তো খালি ছিল, আর সাহায্যের জন্য কাউকে পাইনি”

“আপনার পাসপোর্টটাও গেছে?”

“না সেটা, কোটের পকেটে ছিল, সেটা ওরা নেয়নি”

“কোন উইপেন ছিল?”

“আমার সামনে তো কিছু বের করেনি”

“কথাবার্তা কিছু হয়েছিল?”

“একটি ছেলে ইংরাজি তে কথা বলছিল, চার্চ থেকে কি পেলাম জানতে চাইছিল? বাকীরা তো চুপ করেই ছিল”

“ওদের দেখলে আপনি চিনতে পারবেন?”

“না মুখ কাপড়ে ঢাকা ছিল”

“আপনাকে ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট করেছে?”

মাথা নেড়ে উনি সম্মতি জানালেন, আমি আর বেশী কিছু জানতে চাইলাম না। বুঝলাম স্পিন্যালো সাহেব বেশ অপ্রস্তুত বোধ করছেন। আমি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলাম,

“তা এই তিন দিন ধরে যে চার্চে যাচ্ছিলেন আসল ইনফরমেশন কিছু পেলেন?”

“উইলিয়ামের ব্যাপারে তো নাথিং। একটা পুরোনো বই পেয়েছিলাম, কিন্তু সেও তো গেল!“

“আচ্ছা আর একটা কথা, আপনি যে পেপার পাবলিশ করেছিলেন সেখানে উইলিয়ামের কথা লিখেছিলেন?”

“না, কারণ সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না”

“স্যার আপনি চিন্তা করবেন না, আপনার সব জিনিস আপনি ফেরত পাবেন। আমাদের গ্যারান্টি। আমরা এখানে স্পেশাল পুলিশ পোস্টিং করছি, আর আপনার সঙ্গে সবসময় প্লেন ড্রেসে একজন অফিসার থাকবেন। প্লীজ ফিল সেফ, আমাদের শহরটা এতো খারাপ নয়”

[২]

বিপ্লব আগে থেকে খবর নিয়েছিল তবুও একবার দেখতে যেতে হল। হন্ডা সিটি গাড়ি, সাদা রং এর। গাড়ি টা পাওয়া গেছে সল্টলেকের সি এ ব্লকের কাছে কাল সন্ধ্যে বেলা, তারপর হোটেলে নিয়ে আসা হয়েছে। মানে স্প্লিন্যালো কে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে এরা গাড়ি নিয়ে এই জায়গায় চলে আসে। গাড়ির মধ্যে আমরা কিছু পাইনি। আর কিলোমিটারের হিসেব মিলিয়ে যা বুঝলাম গাড়িটাকে খুব একটা এদিক ওদিকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। মোবাইল কোম্পানি তে ফোন করে যা জানলাম ফোন ঘটনা স্থলে সুইচ অফ করে দেওয়া হয় তারপর আর অন করা হয়নি। খুব সম্ভব সীম কার্ড ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর একটা কথা, গাড়িতে আমরা কোন হাতের ছাপ পাইনি। সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে যারা কাজ টা করেছে তারা এই লাইনে নতুন লোক নয়। সেটা একদিকে দিয়ে ভালো, নতুন লোক হলে খুঁজতে আরো অসুবিধা হতো। স্পিন্যালো র জিনিস উদ্ধার করা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তায় ছিলাম না, বরং আমার মনে হচ্ছিল অন্য একটা রহস্য আছে। শুধু শুধু স্পিন্যালো কে অ্যাটাক এরা করবেই বা কেন? সেটাই আমাদের বার করতে হবে।

বুঝে গেলাম, আমাকে এখন একজনই বাঁচাতে পারেন, অরুনেশ্বের সেনগুপ্ত, স্বনামধন্য ঐতিহাসিক, প্রেসিডেন্সির প্রফেসর ছিলেন এখন রিটায়ার্ড, আমার সিধু জ্যাঠা। অবশ্য তার মানে কেউ যেন আমাকে ফেলুদা না ভাবেন। না তো আমার তোপসে আছে, না আছে জটায়ু, না আছে সেই বিখ্যাত মগজাস্ত্র! মিঃ সেনগুপ্তর বাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে আটটা। আমার ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টে আসার শুরু থেকেই ওনার সঙ্গে পরিচয়। আমাকে অনেক কাজে সাহায্য করেছেন। আর শুধু সাহায্য কেন বলব? অনেক বার তো আসল রহস্য ও সমাধান করে দিয়েছেন। আগে উত্তর কলকাতায় শ্যামপুকুর স্ট্রীটের কাছেই থাকতেন, কতো গেছি সে বাড়িতে, এখন রাজারহাটে চলে গেছেন। দরজা খোলাই ছিল, স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে মুখে চুরুট আর হাতে কফির কাপ, পরনে সাদা পাজামা আর সাদা হাফ শার্ট, মাথার সব চুল সাদা, সারা শরীরে কালো বলতে খালি চোখের চশমার ফ্রেম টা, সেটা শেষ পনের বছরে বদলাতে দেখলাম না, বরাবরের মতো শুরুর কথা টা এবারেও সেই এক

“কি অমিত? লাবণ্যর সন্ধান পাওয়া গেল?”

আমি কিন্ত এবারে তৈরি হয়ে গেছিলাম “না স্যার, কোথায় পেলাম? আর বিয়াল্লিশ হয়ে গেল, এখন আর লাবণ্যর সন্ধান কি পাবো? তাছাড়া গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট হলেও লাবণ্য কে হসপিটালে নিয়ে যাবার জন্য আমার আগে অনেক অমিত রায় এসে যাবে। এই বয়সে না তো আসে রোমান্স না আসে বিরহ। ”

মিটিমিটি হাসলেন মিঃ সেনগুপ্ত, “কেন? বয়স বাড়লে তো ব্যাচেলরদের এলিজিবিলিটি বাড়ে? অবশ্য ষাটের বেশী হয়ে গেলে আর নয়” মিনিট পনেরোর এলোমেলো কথার পর প্রফেসর সেনগুপ্ত নিজেই বললেন, “তা বলো কি ব্যাপার? এতোদিন বাদে আমাকে আবার মনে পড়ল কেন?”

“উইলিয়াম হেনরি আরলট নাম টা কোন ভাবে মনে পড়ছে আপনার?”

চোখের কোনে একটা ঝিলিক দেখলাম, “বাবা, ইতিহাস যাদের মনে রাখতে চায় না, তার কথা আবার তোমাদের মনে পড়ল কেন?”

“আপনি জানেন?”

আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে আর একটা প্রশ্ন করলেন, “তা পুরো ব্যাপার টা শুনি? তুমি নামটা জানলে কোথা থেকে?”

ডঃ স্পিন্যালো র কাছ থেকে যা শুনেছি পুরোটাই বললাম, সেনগুপ্ত স্যার চোখ বুজে পুরো ব্যাপার টা শুনলেন। “তা ইন্টারনেটে কিছু পেলে না?”

“সত্যি কথা খুঁজিনি, আর আপনিই আমার ইন্টারনেট!”

চুরুট টা নিভে গেছিল, দেশলাই দিয়ে অগ্নিসংযোগ করলেন, তারপর শুরু করলেন “তোমার এই স্পিন্যালো কে আমি চিনি না, তবে সে যা বলেছে সেটা ঠিক। ওর পেপারও আমি পড়েছি। তবে নিউসওয়ানস্টেন বলে কিছু নেই, ন্যয়-সওয়ান-স্টেইন, জার্মান শব্দ, মানে পাথরের ওপর আঁকা নতুন রাজহাঁস, আসলে সোয়ান রয়্যাল ফ্যামিলির প্রতীক তো! পুরো ব্যাপার টা বুঝতে গেলে তোমাকে আর একটু পিছিয়ে যেতে হবে, ১৮৬০ র শেষের দিকে। উত্তর পশ্চিম ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কশায়ার কাউন্টিতে, আইরিশ সীর উপকুলে ব্ল্যাকপুল নামের এক ছোট শহরে জন্ম নিলেন এক কাঠের মিস্ত্রীর দ্বিতীয় সন্তান, উইলিয়াম হেনরি আরলট । ছোট থেকেই পড়াশোনায় উইলিয়ামের তেমন আগ্রহ নেই, অতীব অমনোযোগী, বেশীর ভাগ দিনে সে স্কুলেই যায় না, খেলাধুলাতেও তেমন বিশেষ মন নেই। বরং তার অসম্ভব আগ্রহ ছবি আঁকায়। এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে উইলিয়াম জন্মেছে, সে যে কোন গল্পকে ছবির রূপ দিতে পারে। এ জিনিস কিন্তু কারোর শেখানো নয়, জীবনের শুরুতে সেই সেই কিন্ডারগার্ডেনে পড়া রূপকথা র গল্প দিয়ে শুরু, তারপর ঠাকুমা, দাদু, কাকা, মামা, বন্ধু, শিক্ষক যার থেকেই শোনা হোক, সেই গল্প গুলো ছবি হয়ে যায় তার হাতে পড়ে। একেবারে হুবহু না হলেও মোটামুটি কাছাকাছি হয়, বিষয়টা বোঝা যায়। জন বয়্যার, ইভান বিলিবিন তখনও এই সমস্ত বহুশ্রুত রূপকথা গুলোর চিত্রণ করেন নি, তাই উইলিয়ামের এই ছবি গুলোর গুনমান বিচার করার জন্য সেই ছোট ব্ল্যাকপুল শহরে কেউ ছিলেন না। এদিকে একে অভাবের সংসার, তার ওপর তিনদিনের জ্বরে হঠাৎ করে বাবা হেনরি চলে গেলেন, জমানো টাকা পয়সা তেমন নেই। মা দুই ছেলে স্টুয়ারট আর উইলিয়াম, আর তিন বছরের মেয়ে মার্গারেট কে নিয়ে চলে এলেন নিজের বাবার কাছে, ইংল্যান্ডের উত্তর পূর্বে ডারহাম শহরে। বড় ছেলে স্টুয়ারট ছিল স্কুলের সেরা ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম, ডারহাম কলেজে ভর্তি হতে তার অসুবিধা হল না, কিন্তু উইলিয়ামের তেমন আর পড়াশোনা হল না। তার ওপর সেভাবে অভিভাবকও নেই, ষোল বছরের উইলিয়াম এখানে সেখানে ছোটখাট কাজ করা শুরু করল। যে ভাবে হোক পয়সা রোজগার করা এই আর কি? তবে ছবি আঁকার অভ্যাস কিন্তু সে ছাড়ে নি, আর তার জন্য একটা সুযোগও এসে গেল”

একটা ফোন এসে গেছিল, সেটা সেরে এসে সেনগুপ্ত স্যার আবার শুরু করলেন,

“১৮৬৯ সাল, জার্মানি দেশ টা তখনো তৈরি হয়নি। ষোলটা আলাদা আলাদা দেশের মধ্যে একটা দেশ তখন ব্যাভেরিয়া। সেখানকার রাজা দ্বিতীয় লুডভিগ, ইতিহাসে যাকে ‘সোয়ান কিং’ বলে মনে রেখেছে। ফুসেন শহরের কাছে হোহেনসয়াঙ্গু গ্রামে, আল্পস পর্বতের ধারে এক শ্বাসরোধকারী জায়গায়, প্রখ্যাত জার্মান নাট্যকার রিচার্ড ওয়াগনারের সম্মানে এক রোমান দুর্গের স্থাপনা শুরু করেছেন। নাম দিলেন ন্যয়সওয়ানস্টেইন ক্যাসল। লক্ষ, কোটি টাকা খরচা হবে সেই দুর্গের নির্মাণে। লুডভিগের ইচ্ছে সেই দুর্গের দেওয়ালে শোভা পাবে ওয়াগনারের অপেরাতে ব্যবহৃত কিছু কিংবদন্তি দৃশ্য, তা সেখানে ছবি আঁকার চাকরি হলো উইলিয়ামের। ১৮৮৬ সালে লুডভিগের রহস্যময় মৃত্যুতে দুর্গের কাজ বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে উইলিয়াম চাকরিচ্যুত হলেন, কিন্তু নয় বছরের এই পেন্টিঙ্গের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করে বড়ভাই স্টুয়ারট ভারতে চলে গেছেন চাকরি নিয়ে, সঙ্গে গেছেন চোদ্দ বছরের বোন মার্গারেট। কিছু ব্যাপার নিয়ে মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্য হলো, এদিকে ডারহামে তার কোন বন্ধুবান্ধব কাজ কর্ম কিছুই নেই। ন্যয়সওয়ানস্টেইনে কাজ করে কিছু টাকা পয়সা জমেছিল। তা সে সব নিয়ে উইলিয়াম পাড়ি দিলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। প্রথমে এক বছর দাদার সাথে বোম্বাই শহরে থাকলেন, কিছুদিন বাদে বোন মার্গারেট কে নিয়ে কলকাতায় চলে এলেন এবং এই শহরে বসবাস শুরু করলেন”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, সামনের রাখা বোতল থেকে খানিক টা জল খেয়ে আবার শুরু করলেন, “যাহোক, কলকাতায় এসে সে পেন্টিং এ বেশ নাম করে। তার সূত্রে ব্রাহ্ম সমাজের সংস্পর্শে এসে পড়ে। উইলিয়ামের কথা আবার ইতিহাসের পাতায় ফিরে আসে ১৯১৩ সালের মাঝামাঝি, কবিগুরুর নোবেল প্রাইজের খবরটা তখনো দেশবাসীর কাছে এসে আসেনি। ততদিনে উইলিয়াম বিবাহ করেছে এবং পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে পাকাপাকি ভাবে বসবাস করা শুরু করেছে। সেই বছরে কবিগুরু আবার চিত্রাঙ্গদা কে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন নাম রেখেছেন ‘চিত্রা’ আর ‘ভারত সোসাইটি অফ লন্ডন’ সেটাকে বইয়ের আকারে প্রকাশ করেছে। সেই বইয়ের কভার পেজের চিত্রাঙ্কন করল এই উইলিয়াম। কিন্তু ঠিক সময়ে সেটা তৈরি হল না বলে প্রিন্ট টা হলো না। কিন্তু সেই থেকেই গুরুদেবের প্রেরণায় উইলিয়াম বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করল। নিজে সে শিল্পী মানুষ, আর এক শিল্প কে রপ্ত করতে তার আর কেন অসুবিধে হবে? তাছাড়া কাজের সূত্রে আগে সে জার্মান শিখেছে, এবারে আর একটা নতুন ভাষা, শেখা শুরু হয়ে গেল।

তা ইতিহাস বলছে এই উইলিয়ামের খুব ইচ্ছে ছিল বিশ্বভারতী তৈরি হলে গুরুদেবের প্রকৃত ছাত্র হিসেবে সেখানে পড়াশোনা করার, যে কারণে হোক ছোটবেলার স্কুলের দিন গুলো তার খুব সুখের ছিল না। কিন্তু সে বোধহয় হয়ে ওঠেনি। ১৯১৯ এর পরে তার কথা আর জানা যায় নি। আসলে এতো গুনের মধ্যে উইলিয়ামের একটা মস্ত বড় দোষ ছিল, সে রেসে খুব পয়সা লাগাতো। প্রথমটায় খানিকটা টাকা পয়সা ছিল, সে নিয়ে কোনমতে চলছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে খারাপ দিন আসা শুরু হল, একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেল কিছু দিনের মধ্যে, এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় স্ত্রী চলে গেলেন । ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েদের বিয়ে থাওয়া হয়ে গেছে তারাও এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়েছে, এই রকম করে করে একটা প্রতিভা একদম হারিয়ে গেল। মানসিক অবসাদ গ্রাস করল, ১৯১৯ এর শেষের দিকে হঠাৎ করে উইলিয়াম নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আর সেই সময়ের রাজনৈতিক ভাবে উত্তাল বাংলায় একটি সাহেবের হারিয়ে যাওয়া কেমন করে যেন ধামাচাপা পড়ে গেল। ইতিহাসে এর পর তুমি আর উইলিয়ামের কথা পাবে না।”

“কিন্তু স্যার, এই সেন্ট পিটার চার্চে র সাথে কোন লিংক আপনার জানা আছে কি?”

“সে রকম তো কিছু আমার জানা নেই”

আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “আপনার কি মনে এই স্পিন্যালোর ব্যাপারটার এটার কোন কানেকশন আছে?”

“থাকতেই পারে, লুডভিগকে যদিও ইতিহাসে পাগলা রাজা নামে জানে, তবে খুব দান ধ্যান করতেন, অনেকটা আমাদের রাজা হরিশচন্দ্রের মত। তা সেখানে দশ বছর চাকরি করে একটা লোক ভারতে এলো, সঙ্গে কিছু দামী জিনিস থাকতেই পারে! এদিকে তোমার এই স্পিন্যালো পেপার পাবলিশ করলো সেখানে সে লিখলো সেন্ট পিটার চার্চ আর ন্যয়সওয়ানস্টেইনে নাকি অনেক মিল আছে। সে পেপার আমি ইন্টারনেটে পড়েছি। সেখানে সে কিছু ছবি ও ছেপেছিল। এদিকে ১৯৮৫ তে হিন্দুস্থান পাবলিকেশনস একটা বই বার করেছিল, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতের কিছু হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্ম নিয়ে। সেখানে এই উইলিয়ামের ওপর কিছু লেখা ছিল। আমার পুরোটা মনে নেই, তবে আমি তোমাকে যা বললাম তার বেশ খানিক টা তুমি এই বইতে পাবে। এই বইটা লিখেছিলেন পুনের এক হিস্টোরিয়ান, বিনায়ক জোশী, আমার সঙ্গে একবার পরিচয় হয়েছিল। মূলত গবেষণা মূলক, বেশ উচ্চমানের লেখা। তা ধরো পুরোনো জিনিস নিয়ে ব্যবসা করছে এমন কেউ, সেটা যদি পড়ে থাকে আর তারপর সেই এক লোক এই স্পিন্যালো র পেপারটা পড়ল, তারপর দুই দুইয়ে চার করাটা কি খুব অসুবিধা হবে? তোমার ক্রিমিনাল সাইকোলজি কি বলছে? তাছাড়া আমাদের দেশ তো আবার এইসব প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণে তো খুব অগ্রণী নয়, তাই এই সব হবেই!”

চুপ করে রইলাম, যুক্তি টা আমার ঠিকই লাগল, “আপনি তাহলে এখন আমাকে কি সাজেস্ট করেন?”

“স্পিন্যালো র হারানো জিনিস কি করে খুঁজে বার করবে সেই নিয়ে কোন সাজেশন চেয়েও না! আমি বলতে পারবো না। তবে ইতিহাসের কানেকশন টা জানতে গেলে আর একটু পড়াশোনা করতে হবে”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর আবার বললেন, “তুমি এক কাজ করো, একবার বরং এশিয়াটিক সোসাইটি বা আমাদের ন্যাশনাল লাইব্রেরী চলে যাও, এই বইটা তো অবশ্যই পড়বে, আর আমাদের ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি আর কালচার সোসাইটি তে একটা এনকোয়্যারি পাঠিয়ে দাও। দেখো কিছু পাও কি না?”

[৩]

ন্যাশনাল লাইব্রেরী আমার বাড়ির কাছে আসে, তাই সেখানেই আগে গেলাম। বিনায়ক জোশীর বই খুঁজে পেতে আমার বেশীক্ষণ লাগেনি। প্রফেসর সেনগুপ্ত যা বলেছেন একেবারে ঠিক, সত্যি বলতে কি আমি কোন নতুন তথ্য পেলাম না। মনে হচ্ছে যেন, কাল রাতে উনি বইয়ের পাতা থেকেই পড়ছিলেন। ওনাকে যত দেখি তত অবাক হয়ে যাই, সাতাত্তর বছর বয়স কিন্তু কি অসাধারণ মেমারি! কবে কোন যুগে এই এই দুই পাতা পড়েছিলেন কিন্তু সব মনে আছে! লাইব্রেরিয়ান কে সংক্ষেপে আমাদের আসার কারণ টা বলে রেখেছিলাম, উনি ও ক্যাটালগ দেখছিলেন। হঠাৎ করে বইয়ের পাতায় চোখে পড়ে গেল, উইলিয়ামের অংশ টা শেষ হবার পর একটা ছোট অ্যাস্টেরিক, মানে কৃতজ্ঞতা স্বীকার মূলক একটি ক্রেডিট নোট, শেষের দিকে পাতা মিলিয়ে খুঁজে একটা নাম পেলাম গডউইন সেবাস্টিন। সুতরাং আমাদের পরের কাজ এই গডউইন কে খুঁজে বার করা।

এসব ব্যাপারে বিপ্লব তুখোড়, একটা সূত্র পেয়ে গেলে ইনফরমেশন বার করার সব রাস্তা তার জানা। বিনায়ক জোশীর নম্বর খুঁজে ফোন লাগানো হল। ন্যাশনাল লাইব্রেরী থেকেই পাওয়া গেল, শুনলাম উনি মারা গেছেন বছর পনের আগে। তবে ওনার ছেলের সঙ্গে কথা হল, সেই আর একজনের নম্বর দিল। তিনি নাকি এই বিনায়ক জোশীর অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন, এখন পুনে ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, তিনি তখন ওনাকে এই সব রিসার্চে সাহায্য করতেন। তারপর তাঁকে ফোন করা হল, পুরোনো নোটস ঘেঁটে তিনিই বার করে দিলেন। এই গডউইন সেবাস্টিন কলকাতার রিপন স্ট্রীটে থাকতেন, আর কোন এক রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। তারপর গডউইন কে খুঁজে বার করতে আমাদের আর বেশী সময় লাগে নি।

ছোট একটা কাজ ছিল, সেটা শেষ করে রিপন স্ট্রীট পৌঁছতে আমার সন্ধ্যে হয়ে গেছিল, বিপ্লব সঙ্গেই ছিল। গডউইনকে আমরা ওনার বাড়িতেই পেলাম। প্রায় সত্তরের ওপর বয়স, চেহারা ও ভেঙ্গে গেছে, বাড়ির অবস্থা দেখে অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল লাগে না, ঘরে কিছু পুরোনো আসবাব, পরনে জামা কাপড় ও নিতান্তই সাধারণ। আমাদের দেখে খানিক টা হতবাক হয়ে ছিলেন কয়েক সেকেন্ড, তারপর নিজেই বললেন, “আপনারা?”

“আমরা লাল বাজার থেকে আসছি, তবে চিন্তা নেই, আসলে একটা কেসের ব্যাপারে কিছু ইনফরমেশন লাগবে”

“কি রকম ইনফরমেশন?”

বিনায়ক জোশীর বইটা হাতেই ছিল, খুলে দেখালাম “আচ্ছা এই ক্রেডিট নোট কি আপনাকে লেখা?”

“হ্যাঁ, কিন্তু এ তো অনেক দিন আগেকার কথা”

“আপনার সঙ্গে উইলিয়াম আরলটের কি রকম রিলেশন?”

“আমার দিদিমার বাবা”

“আপনার কাছে উইলিয়াম আরলটের কোন জিনিস আছে? থাকলে একটু দেখতে চাই”

“জিনিস কিছুই নেই, আমি কোনদিনই কিছু দেখিনি! শুনেছি সব তো বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আসলে আমার দিদিমা এলিজাবেথ, উইলিয়াম আরলটের মেয়ে, আমি ছোটবেলা থেকে আমার দিদিমার কাছে মানুষ হয়েছি, বাবা জাহাজে চাকরি করতেন, আর মা হসপিটালে নার্সের চাকরি করতেন। তা দিদিমার সঙ্গেই থাকতাম, আর স্বাভাবিক ভাবেই খুব ক্লোস ছিলাম। ওনার কাছে উইলিয়ামের কিছু পুরোনো আঁকা ছবি, লেখাপত্তর ছিল। শুনেছি উইলিয়াম নাকি লেখালেখি করতেন, ছবি ও আঁকতেন, তবে ওর কোন বইটই বেরোয় নি। ওনার পেন্টিং আমি দেখিনি, তা দিদিমার খুব ইচ্ছে ছিল যদি সেই লেখাগুলোকে কেউ যদি বইয়ের আকারে বের করে। ১৯৮০ সালে দিদিমা মারা গেলেন, তার পর থেকে সেসব লেখা আমার কাছেই ছিল। আমার এক বন্ধু ছিল, সে আবার এশিয়াটিক সোসাইটি তে কাজ করতো, তা সেই আমাকে এসে বললে আর এই যোগাযোগটাও করে দিল। তো লেখা গুলো সেই ভদ্রলোককে দিয়েছিলাম। আর দিদিমার কাছে শোনা কিছু পুরোনো গল্পও ওনাকে বলেছিলাম। উনি অনেকবার এই বাড়িতে এসেওছিলেন, আমার সঙ্গে কথা বলতেন আর অনেক নোটস করতেন। উইলিয়ামের লেখাগুলো কিছু বেরোয় নি, ঐ যে পড়লেন বইটাতে ওইটুকু ই বেরিয়েছিল। কাজ শেষ হলে উনি লেখাগুলো আবার আমাকে ফেরত দিয়ে গেছিলেন।“

“সে লেখা গুলো আছে এখনো আছে আপনার কাছে?”

“হ্যাঁ, সব আমার কাছেই আছে, আপনি চাইলে নিয়ে যেতে পারেন। আপনার কাছে রেখে দেবেন, আমি আর কি করব সেসব লেখা নিয়ে?”

“আপনি কখনো সে লেখা পড়েন নি?”

“পড়ার চেষ্টা করেছি, বেশির ভাগ টাই বুঝিনি, ইউসলেস! কার অতো সময় আছে বলুন তো? আমার এই পুরোনো আলমারিতে সব আছে, দিচ্ছি আপনাকে, আপনি সব নিয়ে যান”

“এই সব লেখা আপনি আর কাউকে পড়িয়েছেন?”

“সেই তো বিনায়ক জোশীকে দিয়েছিলাম, তারপর আর কেউ না! উইলিয়াম আরলটের ব্যাপারে কেউ কখনো আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি! আমি ও বলিনি, আর বলবোই বা কি? দিদিমা খুব বলতেন ওনার বাবার কথা, অনেক গল্প শুনতাম ওনার কাছে। দিদিমার জন্যই সেসব লেখা ওনাকে দিয়েছিলাম যদি কখনো ছেপে বেরোয়”

“আচ্ছা, এই উইলিয়াম তো শেষ জীবনে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন। সে ব্যাপারে কিছু জানেন?”

“তাই তো শুনেছি দিদিমার কাছে, দিদিমার বিয়ে হওয়ার বোধহয় বছর চারেকের মধ্যে উনি চলে যান কোথায়, আর পাওয়া যায় নি। শেষ জীবনটা নাকি খুব দুঃখে কেটেছিল ওনার, শুনেছি রাস্তায় বসে ছবি আঁকতেন, আর যা পয়সা পেতেন সব রেসে আর নেশা করে উড়িয়ে দিতেন”

“উনি আর বাড়ি ফেরেন নি?”

“না , সেই রকমই তো শুনেছি। শেষ বয়সে ওনার নাকি মাথার ও একটু গোলমাল হয়। একবার বোধহয় দিদিমার সঙ্গে দেখাও হয়েছিল, কিন্তু চিনতে পারেন নি। তার পর একদিন হঠাৎ করে বাড়ি থেকে চলে যান, আর ফেরেন নি”

“উইলিয়াম থাকতেন কোথায়?”

“বৌবাজারের কাছে। ছোটবেলায় দিদিমা একবার বাড়ি টা দেখিয়ে ছিলেন, তবে সেটা এখন ভেঙ্গে মাল্টিস্টোরিড হয়ে গেছে“

গডউইন আলমারি খুলে একটা খাম বের করে দিলেন, দেখেই বোঝা যায় অনেক দিনের পুরোনো জিনিস, দীর্ঘ দিন অব্যবহারের জন্য জায়গায় জায়গায় বিবর্ণ হয়ে গেছে, একটু ইতস্তত করছেন দেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কিছু বলবেন?”

“স্যার, কি ব্যাপার বলুন তো? কিছু গোলমাল হয়েছে?”

“সে রকম কিছু নয়, আসলে একটা কেসের ব্যাপারে একটু পড়াশোনা করতে হচ্ছে, সেই কারণে একটু ইনফরমেশন চাই, এই আর কি?”

“আর একটা জিনিস ও আছে। উইলিয়ামের একটা ডাইরি আছে, সেখানেও হয়তো কিছু ইনফরমেশন পেতে পারেন। সেটাও আপনি নিয়ে যান। এটা কিন্তু আমি ঐ বিনায়ক জোশীকে দিই নি। মানে, তখন এটার ব্যাপারে জানতাম না। দিদিমার পুরোনো জিনিসের মধ্যে এইটা পেয়েছিলাম, অনেক দিন বাদে। তারপর থেকে সেটা আমার কাছে রাখা আছে”

“ঠিক আছে, আজ এই পর্যন্ত থাক। আপনার নম্বরটা রইল, দরকার হলে আবার ফোন করব”

গডউইন কে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে সোজা বাড়ী। সত্যি বলতে কি এই রাতের মধ্যে ই আমার পুরো জিনিস গুলোতে একবার চোখ বোলানোর ইচ্ছে ছিল। কোন মতে ডিনার টা সারলাম তারপর লেখা গুলো নিয়ে বসলাম। খামের মধ্যে ছটি আঁকা ছবি, হয়তো উইলিয়ামের আঁকা। আমি নিজে আর্টিস্ট নই, ছবির গুনমান বিচার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দেখে তো বেশ ভালোই লাগলো। বেশীর ভাগ ছবি পেন্সিলে আঁকা, তিনটে ছবি তে রঙের প্রয়োগ হয়েছে। দেখে আমার রং পেনসিল ই মনে হল। আর দশ বারো টা লেখা পাতা, বেশীর ভাগ ইংরাজিতে, কিছু বাংলাতেও রয়েছে। তবে লেখা গুলো আমার তেমন ভালো লাগল না। লেখার মান ভালো নয়, আর সবচেয়ে বড় খুবই অগোছালো, কখনো মহাভারতে অর্জুনের কথা লেখা, তারপরেই আবার একটা গল্প লেখার চেষ্টা হয়েছে। সেও হয়তো এক পাতা, অসমাপ্ত। মনে হচ্ছে হয়তো উনি বাংলা শিখতে চাইছিলেন, তাই হয়তো বই পড়ে অনুবাদের চেষ্টা করেছেন।

তুলনায় ডাইরি টা মন্দের ভালো। সেখানে পুরোটাই ইংরাজিতে লেখা। ব্রিটিশ মানুষ, সুতরাং তাঁর ইংরাজি র উৎকর্ষতা বিচার করাটা আমার উচিত নয়। তবে কোন তারিখ লেখা নেই, আর তার চেয়েও বড় কথা ডাইরিটা দিনের হিসেবে লেখা নয়। যেমন এক জায়গায় লেখা, ব্রিটিশরা ধর্মের নামে দেশ টাকে দুভাগ করছে, তার কোন বন্ধুর নাকি বাড়ি ঘর সব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। বুঝলাম সে লেখা ১৯০৫ এর আশেপাশে, কিন্তু তার পরের পাতায় আবার কোন জার্মান বন্ধু কে নিয়ে লেখা। তার সঙ্গে নাকি উইলিয়াম আল্পস পেরিয়ে অস্ট্রিয়া যাবার প্ল্যান করছেন। তার মানে সে লেখা জার্মানি থাকা কালীন। তার পরের পাতায় আবার লেখা, অনেক দিন বাজে আজ খবরের কাগজ পড়লাম, বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছে, জানি না আমার ফুসেনের বন্ধুরা কেমন আছে? অর্থাৎ এ লেখা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রচনা। তাছাড়া বেশীর ভাগ লেখায় সে রকম কোন বক্তব্য নেই, খালি কিছু তথ্য আছে। আর সব লেখাতেই নিজের বন্ধু বা পরিচিত কোন মানুষের কথা আছে। তিনটে নাম বেশ কয়েক বার ফিরে ফিরে এসেছে, এরিক গুডেনবার্গ, কালিকামোহন বড়াল আর সোফিয়া। সব কটাই আমার অজানা। এক জায়গায় লেখা, শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম সোফিয়াকেই বিয়ে করবো, কিন্তু বাড়ির লোক রাজী হবে তো? তবে কোন জায়গায় নিজের স্ত্রীর নাম লেখা নেই। পড়ে মনে হল, এরিক খুব সম্ভব জার্মানির সেই ক্যাসলে কাজ করার সময়কার বন্ধু, দুজনে মিলে নাকি একবার নেকড়ের হাত থেকে বেঁচেছিলেন সেও পড়লাম। আর এক বার নাকি, কোন অসুস্থ মহিলা কে নিয়ে এরিক আর উইলিয়াম মেডিক্যাল সেন্টারে গেছিলেন। খুব ঠাণ্ডার রাত, সেখানে ডাক্তার নেই। সারা রাত অপেক্ষা করেছিলেন ডাক্তারের জন্য, শেষ পর্যন্ত সেই মহিলা মারা যান। প্রফেসর সেনগুপ্ত বলেছিলেন ইনি নাকি কবিগুরুর ভক্ত ছিলেন, সেটা ঠিক। এক জায়গায় উল্লেখ দেখলাম, অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হল। কালকে শেষ পর্যন্ত টেগোর কে দেখলাম, খুব জ্ঞানী লোক, ইউরোপ হলে এতো দিনে কতো গুলো যে নোবেল পেতেন কে জানে? এ দেশে কেন যে পড়ে আছেন? আলাপ করার ইচ্ছে রইল, জানি না হবে কি না? আর এক জায়গায় লেখা রয়েছে পড়লাম, গীতাঞ্জলীর বাংলা বই টা জোগাড় করতে হবে, ইংরাজিটা পড়ব না। দেখি বাংলায় বুঝতে পারি কিনা? ডাইরিতে দুতিনটে ছবি আঁকা রয়েছে সেই গুলো গুরুদেবের আঁকা ছবির অবিকল কপি। অন্য এক পাতায় লেখা, একটা নাম জানলাম আজ ভীষ্মলোচন শর্মা, সত্যি বাংলা ভাষাটা খুব ইন্টারেস্টিং। মানে বুঝলাম সুকুমার রায়ের লেখাতেও চোখ পড়েছে। আবার এক জায়গায় লেখা আজ খাট টা বিক্রি করে দিলাম, সুইট হার্ট কিছু মনে করো না। তুমি চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকবে। কি করি বলতো? টাকা না পেলে তোমার কফিনে ফুল দেব কেমন করে? মোটামুটি ব্যাপার গুলো বুঝতে পারছিলাম, খালি একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না। শেষের দিক থেকে তৃতীয় পাতায় লেখা, সব কিছু চলে গেছে, এটাকে আমি বিক্রি করবো না, ভারতে এসে এটাই আমার প্রথম কাজ। এটা পবিত্র সাইমনের হাতেই থাক, এতেও তো ধর্মের কথাই লেখা আছে।

[৪]

রাতে শুতে শুতে প্রায় তিনটে বেজে গেছিল। সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গল, বিপ্লবের ফোন। খবর এল, ডঃ স্পিন্যালোর জিনিস গুলো আমরা উদ্ধার করে ফেলেছি । হংকং এর কোন ব্যবসায়ী নাকি ভারতের কোন এজেন্টের সূত্রে কিছু লোকাল গুণ্ডাকে লাগিয়েছিলেন। সেই এজেন্ট কেও আমরা অ্যারেস্ট করেছি, সব জিনিস নিয়ে বিপ্লব গেছে ডঃ স্পিন্যালোর কাছে ফেরত দিতে। ডিসি ডিডির ফোন এসেছিল, কথাও হয়েছে, তবে আমার এই সব ব্যাপারে তেমন কোন ইন্টারেস্ট লাগছিল না, অনেক বড় রহস্য আমাদের উদ্ঘাটন করতে হবে। আমার মন বলছে কোন বড় কিছু ব্যাপার আছে। আর আমি তো এখনো কোন লিংকই খুঁজে পাচ্ছি না। তাই আমাকে বাঁচানোর একজনই আছেন।

রাজারহাটে প্রফেসর সেনগুপ্তর বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন সকাল পৌনে আটটা, স্যার বাড়িতে ই অপেক্ষা করছিলেন। পুরো ডাইরি আর লেখা গুলো কে সংক্ষেপে বললাম, প্রফেসর সেনগুপ্ত কিছু বললেন না। খালি একটাই কথা, “দেখি লেখা গুলো, একটু সময় দাও”

আমি আর সময় নষ্ট করিনি, লেখাগুলো আর ডাইরি টা ওনার হাতে ধরিয়ে বাইরের ব্যালকনিতে গেলাম সিগারেটে টান দিতে। সেখানেই অপেক্ষা করছিলাম, পাছে কোন ডিস্টার্ব না হয়। ঘণ্টা দুয়েক বাদে ডাক পড়ল –

“তুমি কিছু পেলে না লেখা গুলোর মধ্যে?”

“সত্যি বলতে কি ঐ ক্যাসল আর চার্চের কোন কানেকশনের কথাতো লেখাই নেই”

“তা তোমার কোন প্রশ্ন নেই?”

“আছে একটা দুটো। আচ্ছা, কালিকামোহন বড়াল কে?”

“আর্মহারস্ট স্ট্রীটের বাঙালি, বিশাল বড়লোক, ওদের আবার রাজশাহী জেলায় বিশাল জমিদারি ছিল। ওর বাবা সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের অফিসে কাজ করতেন, খুব সম্ভব তার কথাই বলছে। ঐ যুগান্তরের চিঠির কথা বলছে, কালিকা ছিলেন আবার যুগান্তরের রিপোর্টার। তবে ব্রিটিশ রা হাত লাগাতে পারেনি। তবে এই অ্যারেস্টের ব্যাপার টা জানা ছিলো না। আর?”

“সোফিয়া কি স্ত্রী?”

“জানা নেই, তবে তার সম্পর্কে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তো ডাইরিতে আর কিছু আছে কি?”

“আর ঐ সাইমনের কাছে রইল মানে?”

“ওটাই তো আসল! আর কাছে নয়, ঠিক করে পড় উইলিয়াম লিখছে পবিত্র সাইমনের হাতেই থাক, এতেও তো ধর্মের কথাই লেখা আছে। সত্যি তুমি কিছু বোঝনি ব্যাপার টা?”

সত্যি বুঝতে পারছি না, চুপ করেই রইলাম। মিটিমিটি হাসলেন প্রফেসর সেনগুপ্ত, কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, চুরুটে অগ্নিসংযোগ হল, তারপর বললেন “ভগবান কি মাথাটা খালি আমাদের চুল আঁচড়াতে দিয়েছেন?”

“কি করব স্যার, মাথায় আসছে না!”

“জেসাস খ্রাইস্টের বারো জন প্রধান শিষ্যের নাম মনে আছে, যাদের আমরা অ্যাপোসেল বা ভগবানের দূত বলে জানি”

আবার চুপ কারণ এ উত্তর ও আমার জানা নেই,

“এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সাইমন, যার পরে নাম হয় পিটার। নিউ টেস্টামেন্ট বলছে, ইজরায়েলের বেথসাইডা গ্রামে জন নামক এক জেলের ছেলে ছিলেন এই সাইমন। জন্মসূত্রে নাম সিমিয়ন, পরে নাম হল সাইমন, পরে পৃথিবী খ্যাত হলেন পিটার নামে। ব্রিটিশ, জার্মান, ডাচরা বলে পিটার, ফরাসীরা বলে পিয়ের, ইটালিয়ানরা বলে পিয়েট্রো, স্প্যানিশরা বলে পেড্রো। তাঁর নামে সারা আজ পৃথিবীতে সেন্ট পিটার চার্চ হয়েছে, তিনিই তো আসলে সেইন্ট পিটার।”

খুব অবাক লাগল, “উইলিয়াম তাকে মীন করেছে?”

আমার কথার উত্তর না দিয়ে নিজের স্টাইলে প্রফেসর সেনগুপ্ত আবার বললেন, “সেই সেন্ট পিটারের হাতে কি আছে। ডান হাতে স্বর্গে যাবার চাবি আর বাঁ হাতে ভগবান যীশুর ধর্মবানী, ইংরাজিতে যাকে আমরা গসপেল বলে জানি। এবারে তোমার স্পিন্যালো কি বলছেন? সেন্ট পিটার চার্চে ইন্টেরিয়রে উইলিয়ামের হাতের কাজ রয়েছে। কাজেই উইলিয়াম এখানে এসেছিল সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় এই অগোছালো, ইনডিসিপ্লিন্ড সাহেব, উইলিয়াম আরলট, সেই চার্চে সেন্ট সাইমন পিটারের হাতে কিছু লুকিয়ে রাখলো। যেটা কিনা ভারতে আসার পর তার প্রথম সৃষ্টি। এবারে বোঝা যাচ্ছে একটু একটু? এখন আমাদের জানতে হবে সেই সৃষ্টিটা কি?”

সত্যি বলতে কি পুরো ব্যাপারটা আমি এখনো বুঝতে পারছি না। সেন্ট পিটারের হাতে মানে? তবে কি ঐ সেন্ট পিটার চার্চেই রাখা আছে উইলিয়ামের কোন সৃষ্টি, যার সন্ধানে সেই হংকং এর ব্যবসায়ী ডঃ স্পিন্যালোর পেছনে গুণ্ডা লাগিয়েছিল, জেনে কি না জেনে তা জানি না? প্রফেসর সেনগুপ্ত কে আর কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না, জানি উত্তর পাবো না। তবে, এই টুকু বুঝতে পারছি আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অবশ্যই ওয়েলিংটনের সেন্ট পিটার চার্চ। আমি একা যাবো না, সঙ্গে সেনগুপ্ত স্যার কে নিয়ে যাবো। সত্যি বলতে আমার মগজাস্ত্র তো আসলে উনিই! একবার বলতেই রাজী হয়ে গেলেন, আসলে পুরো ব্যাপার টা তাঁকেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত করে তুলেছে।

ইচ্ছে করে একটু দেরী করে গেলাম, যাতে কোন ভিড় না থাকে। ফাদার ম্যাথিউসকে সব কিছু বুঝিয়ে বললাম, তিনি কোন রকম বাধা দেননি। পুরো শোনার পর খালি একটা কথা বললেন, আমার মন ভরে গেল “নিজেদের দেশের সম্পদ কে উদ্ধার করার দায়িত্ব তো আমাদের সবার”।

সমস্যা টা হলো কোথা থেকে খুঁজবো? চার্চ টা কিন্তু খুব বিশাল না হলেও বেশ বড়। কাজের সূত্রে আমি আগেও চার্চে এসেছি, তুলনায় এটা বেশ বড়। আর তার চেয়েও বড় কথা চার্চের সংলগ্ন তিনটে ঘর এবং প্রতি কটা ঘর ই বেশ বড়। আর পুরোনো ক্যাথলিক চার্চ বলে এখানে স্থাপত্যের প্রয়োগ ও খুব বেশী। অবশ্য ফাদার বললেন, “এই রকম ভাবার কিছু নেই সব কিছুই সেই তিনশো বছরের পুরোনো। যুগে যুগে এর পরিবর্তন হয়েছে” দেওয়ালে ছোট ছোট হাতে আঁকা পেন্টিং, কোথাও বাইবেলের গল্প, কোথাও বা মাদার মেরীর ছবি, এক জায়গায় ভগবান যীশুর জন্মের ঘটনা গুলো পরপর রয়েছে, আর এক জায়গায় ‘লাস্ট সাপার’ অঙ্কিত হয়েছে। সেন্ট পিটার সব জায়গায় রয়েছেন বিভিন্ন ছবিতে ঘরের দেয়ালে, চার্চের দেওয়ালে, এমনকি একটা ঘরের সিলিঙে। এর মধ্যে কিছু ছবি বেশী পুরোনো, সেটাই বোঝাই যাচ্ছে। তবে এর মধ্যে কোন গুলো উইলিয়ামের আঁকা সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। ফাদার আর একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দিলেন, চার্চের পুরোনো কথা তিনি যত টুকু জানেন তাতে উইলিয়াম আরলট বলে কারুর কথা তিনি শোনেন নি।

বেশ পনের মিনিট ঘোরাঘুরির পর সেনগুপ্ত স্যার প্রথম কথা বললেন, “আমার কি মনে হয় জানো অমিত, এই ছবি গুলোর মধ্যে কিছু নেই। আমার তো মনে এ ছবি একশো বছরের পুরোনো নয়, অনেক পড়ে আঁকা। তার ওপর এই একশো বছরে চার্চে নিশ্চয়ই হোয়াট ওয়াশ, পেন্টিং হয়েছে। আর যদি সেটা নাও হয়, দেওয়ালে একটা পেন্টিং করে তার মধ্যে সে আর কিই বা রাখতে পারবে? ”

“এমন ও তো হতে পারে উনি কোন আঁকা ছবি কেই নিজের প্রথম সৃষ্টি বলে মীন করেছেন”

“তাতে দুটো অসুবিধে আছে। এক, সে বলেছে এটাকে বিক্রি করবো না, তাহলে একটা দেওয়ালে আঁকা ছবিকে বিক্রি করার প্রশ্ন উঠছে কি? আর দুই, কি পড়লে ডাইরিতে? সাইমনের হাতেই থাক আর তাতে ধর্মের কথা লেখা আছে। সে এমন কি ধর্মের কথা লিখলো যেটা আঁকা ছবির রূপে সাইমনের হাতে রেখে দিয়ে গেল?”

“তার মানে কি এটা কোন আলাদা জিনিস?”

“অবশ্যই আলাদা জিনিস! আরো কি মনে হয় জানো, সেটাকে সে খুব নিরাপদে রেখে গেছে। যাতে অবাঞ্ছিত কেউ সে জিনিস না পায়”

“তার মানে কোন হিডেন ট্রেজার?”

সম্মতি সূচক ভাবে মাথা নাড়লেন সেনগুপ্ত স্যার, মুখে খালি একটাই কথা বললেন, “নিঃসন্দেহে”। তারপর পকেটে হাত দিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন। বুঝলাম বুদ্ধিতে ধোঁয়ার প্রয়োজন হয়েছে, আমার তো অনেকক্ষণ থেকেই ইচ্ছে করছিল। নেহাত স্যার সঙ্গে ছিলেন তাই ধরাতে পারিনি।

আরো আধ ঘণ্টা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি হল, তারপর সেনগুপ্ত স্যার নিজে থেকেই বললেন, “অমিত আমার কি মনে হয় জানো, এর মধ্যে কতো গুলো উইলিয়ামের আঁকা, সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বরং এই লাইমস্টোনের স্থাপত্যের কাজ দেখছো চারদিকে তার মধ্যে কিছু হবে”

আমার মুখে প্রশ্ন দেখে সেনগুপ্ত স্যার আবার বললেন, “ন্যয়সওয়ানস্টেইনে লাইম স্টোনের কাজ শিখে সে এখানে এসে সেটার প্রয়োগ করেছে। আর স্পিন্যালো তো একই কথা কি বলছে। লাইম স্টোনের কাজ! মনে হচ্ছে এই সব লাইম স্টোনের কারুকাজের মধ্যে কিছু আছে”

মন্দিরের প্রতিটা স্থাপত্যের কাজ খোঁজা শুরু হল, প্রতিটা জায়গা যেখানে সেন্ট পিটার আছেন। সেও কম নয়, কিছু হাতের নাগালের বাইরে। একটা উঁচু চেয়ার জোগাড় করা হলো, খুঁজতে খুঁজতে শেষ অবধি পাওয়া গেল। দেওয়ালে ঝুলন্ত একটা সেন্ট পিটারের বেশ বড় স্ট্যাচু আর তার ওপর লাইমস্টোনের ল্যামিনেশনের কাজ, যে হাতে ধর্মবানী থেকে সেই হাতের কাছ স্পর্শ করতেই মনে হল তার ভেতরে কিছু আছে। ইচ্ছে না থাকলেও একটু ঠোকাঠুকি করতেই হল। ফাদার অনুমতি দিলেন, আর একটু চেষ্টা করতেই হাতের ওপরে লাইমস্টোনের কভার টা ভেঙে গেল, তার ভেতর থেকে বেরোল সেই হাতে ধরা বাইবেলের মধ্যে রাখা ছোট একটা লাল রঙের একটা বই। বরং খাতা বলা ভালো। সেটাকে বের করলাম, আমার ভেতরে উত্তেজনা টা বেশ অনুভব করছিলাম। সেনগুপ্ত স্যার কি রকম অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন, ফাদার ও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সেই লাল বইটার দিকে।

বহু দিনের পুরোনো জিনিস এবং প্রথম পাতায় সুন্দর হরফে লেখা নাম উইলিয়াম হেনরি আরলট। দীর্ঘ দিনের অব্যবহারের হলে কিছু পাতা বেশ কয়েক জায়গায় জোড়া লেগে আছে। তবে লাইম স্টোনের মোড়কে এতো সুন্দর ভাবে রাখা আছে তাতে বই টা কিন্তু মোটামুটি অক্ষত আছে। কোন জায়গা পোকায় কাটা দেখলাম না, বহুদিনের পুরোনো বইয়ের পাতার রং যেমন বিবর্ণ হয়ে যায় এখানে সেই রকম কিছুই হয়নি। খুলতে দেখলাম সেটা একটা হাতে আঁকা একটা অসাধারণ সৃষ্টি। প্রায় পঞ্চাশ পাতার এক সংকলন, মহাভারতের নানা ঘটনা ছবির আকারে সেখানে আঁকা, আর সেই ছবি গুলো দিয়ে সুন্দর গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে। পঞ্চপাণ্ডব, কৌরব, হস্তিনাপুর, পাশা খেলা, বস্ত্রহরণ, অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণ, অভিমন্যু, কর্ণের রথের চাকা, ভীষ্মের শরশয্যা কি নেই তাতে? বুঝলাম বাংলা শেখার জন্য উইলিয়াম আরলট মহাভারত দিয়ে শুরু করেছিলেন। আর সেটা শিখে অথবা শিখতে শিখতে এটাই প্রথম নিজের হাতে বানিয়েছিলেন। নানান রঙের পেনসিলে সেই ড্রয়িং, কোন লেখা নেই। তবে ছবি গুলো এতো সুন্দর করে সাজানো তা থেকে গল্প টা অনায়াসে বোঝা যায়। গল্প থেকে ছবি বানানোর অনন্য কৌশল, তাঁর আগে থেকেই জানা ছিল। আর সে থেকেই এর সৃষ্টি। আর সত্যিই তো এতেও তো ধর্মের কথাই লেখা আছে। হোক না সে অন্য ধর্মের কথা! আর নিজের এই অমর সৃষ্টি কে চিরতরে উৎসর্গ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা বোধহয় তাঁর আর জানা ছিল না।

প্রফেসর সেনগুপ্তর দিকে তাকালাম, “স্যার এর হিস্টোরিক্যাল ভ্যালু কি রকম হবে?”

পাশ থেকে সেনগুপ্ত স্যারের গলা শুনলাম “প্রাইসলেস!”

আমার মুখের অবস্থা কি রকম হয়েছিল দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবে এইটুকু বেশ বুঝতে পারছিলাম আরা দেশের সম্পদ নিয়ে ব্যবসা করে তাদের কাছে এ এক মহা মূল্যবান জিনিস, আবার সেনগুপ্ত স্যারের গলা শুনলাম, “কি ভাবছো? এটা কে হাতছাড়া করো না, ইউরোপিয়ানরা জানতে পারলে আর রক্ষে নেই। উনবিংশ শতাব্দীতে মহাভারত ছবির আকারে লেখা হয়নি। ডিটেল গুলো দেখো, একটা সাহেব মানুষ। বাংলা শিখে এই রকম একটা বই বানিয়ে ফেলল। কি ডেডিকেশন দেখেছো! সত্যি অসাধারণ। আর আমাদের দুর্ভাগ্য, এই সব ট্যালেন্টেড মানুষের কথা তুমি ইতিহাসের পাতায় পাবে না।“

বই টা একটু উলটে পালটে দেখে আবার বললেন, “অমিত একটা বেয়াড়া রিকোয়েস্ট আছে, একটা রাত আমাকে সময় দাও, আমি একটু পড়ব এটা। সব লেখাপত্তর, ছবি যা যা পেয়েছ গডউইনের কাছ থেকে সব কিছু পাঠিয়ে দাও এশিয়াটিক সোসাইটিতে, আমাদের মতো হিস্টোরিয়ান রা খুব উপকৃত হবে। এর চেয়ে ভালো রিসার্চ মেটিরিয়াল আর হয় না। আর হ্যাঁ, এই খবরটা কিন্তু বাজারে একদম ছেড়ো না। তোমার ঐ স্পিন্যালো কে তো একদম এইসব বলো না! জানতে পারলে সব নিয়ে চলে যাবে, আর এই মহাভারত ইউরোপের কোন মিউজিয়ামে শোভা পাবে। এই হাতে আঁকা মহাভারতটা বরং আমরা আমাদের কাছেই রেখে দিই, আমাদের দেশ থেকে তো যুগে যুগে অনেক কিছু চলে গেছে! কিছু না হোক এক অসফল সাহেব শিল্পীর ভারতে বসে বাংলা শিখে এই প্রথম সৃষ্টি, সেটা না হয় থাক আমাদের দেশে!”

ন্যয়সওয়ানস্টেইন বলে জার্মানিতে সত্যি একটা ক্যাসল আছে। কিন্তু পাঠকদের কাছে একটাই অনুরোধ, সেটা ছাড়া কাহিনীতে কিন্তু আর কোন ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক সত্যতা খোঁজার চেষ্টা বৃথা, সুতরাং কাহিনীর নাম যথার্থ, ‘পুরোটাই কাল্পনিক’।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮