• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে

আপনাদের ভালবাসাকে পাথেয় করে, বেশ কিছুটা পথ আমরা একসাথে পেরিয়ে এলাম। ভালো লাগছে আমাদের পঞ্চম সংখ্যা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে। আমাদের সমস্ত লেখক, শিল্পী এবং সহযোগী বন্ধুদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ আমাদের সমস্ত পাঠক বন্ধুদের। আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সঙ্গে থাকুন।

আপনাদের সকলকে জানাই স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা। ভারতবর্ষ একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে সত্তর বছর পূর্ণ করল। স্বাধীনতা বলতে আমরা শুধুমাত্র একটি দেশের ভৌগলিক ভূখণ্ডের স্বাধীনতা বুঝি না, আমরা বুঝি দেশের সকল মানুষের স্বাধীনতা কারণ একটি দেশ স্বাধীন হলেই দেশবাসী স্বাধীন হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, আমাদের চারদিকের কিছু দেশের দিকে তাকালেই সেটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। বিশ্বের অন্যান্য কিছু দেশের বয়সের তুলনায় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারত অপেক্ষাকৃত তরুণ। যখন একই যুগে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশগুলির মধ্যে বেশ কিছু দেশ সামরিক স্বৈরশাসনের এবং অরাজকতার মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তখন, ত্রুটি বিচ্যুতি স্বত্বেও, আমরা গত সত্তর বছর আমাদের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো ধরে রেখেছি সেটা প্রশংসনীয়।

স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি সংবিধানের আলোয় সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সমান ভাবে আলোকিত হবার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা যেমন আমাদের অধিকার এবং তেমনি একে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের । দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দেশের সীমান্ত নিরাপদ রাখা যেমন জরুরি তেমনি জরুরি দেশবাসীর স্বাধীনতা রক্ষা করা। দেশবাসীর স্বাধীনতা বলতে আমারা বুঝি দেশের সকল মানুষের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায় । আমরা বুঝি সকল মানুষের চিন্তা, অভিব্যক্তি, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা। আমরা বুঝি সকল মানুষের অবস্থা এবং সুযোগের সাম্য। স্বাধীনতা সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেয় (জন স্টুয়ার্ট মিল) । আর তাই লাল-কেল্লায় যখন বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের একাত্তর-তম স্বাধীনতা দিবসের পতাকা ওড়ে, আর দেশের উন্নতির পরিমাপ হিসেবে দেশের জাতিয় আয় বা জাতিয় পণ্য উৎপাদনের সূচকের কথা বলা হয়, তখন আমরা স্বাধীনতার মানের পরিমাপের কথা জিজ্ঞেস করি, জিজ্ঞেস করি মানব উন্নয়ন সূচকের কথা । আমরা জিজ্ঞেস করি মানুষের গড় আয়ু, পুরুষ মহিলার ভারসাম্য, সাক্ষরতা হার, বেকারত্বের হার, শিশু মৃত্যুর হার ইত্যাদির কথা । আমরা জিজ্ঞেস করি প্রান্তিক মানুষের কথা, আদিবাসী মানুষের কথা, দারিদ্র্য সীমার নীচে থাকা মানুষের কথা। আমরা জিজ্ঞেস করি সমাজের প্রতি স্তরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সহজলভ্যতার কথা।

আমরা গণতন্ত্রকে শুধু ভোট-বাক্সের রাজনীতি মনে করি না, আমরা মনে করি গণতন্ত্র হল "আলোচনার মাধ্যমে পরিচালনা " (জন স্টুয়ার্ট মিল, অমর্ত্য সেন) । তাই আমরা চাই সমন্বিত এবং সহনশীল পরিবেশ যেখানে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের এবং আলোচনার স্বাধীনতা থাকবে। যেখানে আমাদের মন্তব্য কোন একটি বিশেষ দলের মনোমত না হলেই, আমাদের উপর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার নেমে আসবে না। মানুষ যখন নিজের মত প্রকাশে ভয় পায় তখন সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আদর্শে অনুপ্রাণিত আমরা, এমন এক ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখি - 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির'।

যদিও বাক-স্বাধীনতা আমাদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার, তবুও বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঘটনায় বাক-স্বাধীনতা আক্রান্ত হয়েছে এবং এই অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি জনসাধারণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সোশাল মিডিয়ায় আপত্তিকর বক্তব্য রাখার অপরাধে আইটি আইনের ( 66A of IT act) অপব্যবহারে বিভিন্ন মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। এগুলোর মধ্যে ২০১২ সালে ফেসবুকে কার্টুন পাঠিয়ে গ্রেপ্তার হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বরীশ মহাপাত্র, ওই বছরেই কার্টুন এঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন অসীম ত্রিবেদী। ২০১৩ সালে কবি ও সাহিত্যিক কানওয়াল ভারতী গ্রেপ্তার হন ফেসবুকে উত্তরপ্রদেশের সরকারের সমালোচনা করে। এই তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং এক পরিসংখ্যান অনুসারে সব মিলিয়ে দুই হাজারের উপর লোক আইটি আইনের অপব্যবহারে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে বাক-স্বাধীনতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কিছুর নির্ণয় আমাদের আশার আলো দেখায়। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা আইটি আইন ( 66A of IT act) কে অসাংবিধানিক আখ্যা দেওয়া। আশা করব এবার সরকার দ্বারা আইটি আইনের অপব্যবহার বন্ধ হবে।

গণতন্ত্রের আর এক স্তম্ভ হল সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। স্বাধীন এবং সৎ সংবাদ মাধ্যম, সঠিক তথ্য এবং সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলতে এবং জনগণকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ নিতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে কোনো সংবাদ, তা যতই জনস্বার্থের পক্ষে হোক, প্রভাবশালী কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ আসে। সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন। বেসরকারি মতে ২০১৬ সালে ৮ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে অক্ষয় সিং, যিনি ব্যাপম দুর্নীতি নিয়ে লিখছিলেন, সন্দীপ কোঠারি , যিনি মধ্যপ্রদেশে অবৈধ খনির বিষয়ে লিখছিলেন এবং যোগেন্দ্র সিং যিনি উত্তরপ্রদেশের অবৈধ খনির বিষয়ে লিখছিলেন। এছাড়াও ২০১৬ সালে সাংবাদিকদের উপর ২৭ টি আক্রমণ, ১৫ টি ভয় দেখানোর ঘটনা পুলিসের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।

আমাদের এবারের সংখ্যার থিম – “শিল্পীর স্বাধীনতা”! যদিও অভিব্যক্তির স্বাধীনতা আমাদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার, কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাই দেখছি ? বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে আমরা এই অধিকারের উপর সরকারি এবং বেসরকারি আক্রমণ দেখতে পেয়েছি।

বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের সেন্সরের কাঁচি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্রে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন এবং তথ্য ও সম্প্রচার (I&B) দপ্তর জনগণের কাছে কি সিনেমা এবং কি খবর পৌঁছাবে অথবা পৌঁছাবে না তা নিয়ে বেশ ব্যস্ত থেকেছে। সম্প্রতি বেশ কিছু ছবি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের কৃপায় প্রকাশ পায় নি অথবা অসংখ্য কাটছাঁটের পর প্রকাশ পেয়েছে। ‘ঈন্দু সরকার', ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা', 'উড়তা পাঞ্জাব' 'আলীগড়' এমনি কিছু উদাহরণ।

সাহিত্যে সেন্সরের ক্ষেত্রেও সরকার সমান দরাজ-হস্ত। বিভিন্ন সময়ে সরকারি হস্তক্ষেপে ব্যান হওয়া বইয়ের তালিকা কম লম্বা নয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য The Satanic Verses by Salman Rushdie, The Hindus: An Alternative History by Wendy Doniger, The Ramayana as told by Aubrey Menen, Jinnah: India-Partition-Independence by Jaswant Singh, Lajja by Taslima Nasreen, An Area of Darkness by V.S. Naipaul.

শিল্পের এবং শিল্পীর উপর আক্রমণে বেসরকারি দাক্ষিণ্যও কম নয়। বিভিন্ন সময়ে উগ্র মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন বহু শিল্পী, লেখক এবং যুক্তিবাদী মানুষ। ২০০৬ সালে মৌলবাদীদের হাতে হেনস্থা হয়ে এম এফ হুসেনকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত দেশের বাইরেই কাটাতে হয়েছিল। সময়ের সাথে মৌলবাদী আক্রমণ বেড়েছে বই কমে নি। মনোমত না হলে, মৌলবাদীরা সিনেমা হল ভেঙ্গে দেয়, বই পুড়িয়ে দেয়, লেখক, চিত্রপরিচালক, শিল্পী, সাহিত্যিককে আক্রমণ করে। কিছুদিন আগে পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানশালিকে শারীরিক ভাবে আক্রমণ করে কিছু মৌলবাদী। কন্নড় ভাষার লেখক যোগেশ মাস্টার, ফেডারেশন অব রেশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের নরেন্দ্র নায়ক আক্রান্ত হন। মৌলবাদীদের হাতে মারা যান রেশনালিস্ট নরেন্দ্র দাভোলকার এবং গোবিন্দ পানসারে। মৌলবাদীদের ভয়ে তসলিমা নাসরীন আওরঙ্গাবাদ শহরে ঢুকতে পারেন না তাকে এয়ারপোর্ট থেকেই ফিরে যেতে হয়। এই তালিকা বেশ লম্বা।

সৎ সাহিত্য, শিল্প হল সমাজের আয়না। আয়নায় প্রতিফলিত কুশ্রী মুখের জন্য আমরা আয়নাকে দোষারোপ করতে পারি না। আমরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারি বা কুশ্রী মুখ দেখানোর জন্য আয়নাকে ভেঙ্গে ফেলতে পারি, কিন্তু তাতে সমাজের কুশ্রী মুখ সুশ্রী হয়ে উঠবে না। তাই আমরা যদি সৎ সাহিত্যে প্রতিফলিত কুৎসিত ক্ষত গুলি সহ্য করতে না পারি, তার মানে এই যে, সমাজের বর্তমান অবস্থা হয়ত সহ্য করার মত নয়। সেক্ষেত্রে আয়নার সমালোচনা না করে বরং আমাদের আসল সমস্যা স্বীকার করে, সেই সমস্যার মোকাবিলা করা উচিত।

গণতন্ত্রের এক চরম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌলবাদ। যুক্তি, তর্ক, আলোচনার অবসর কমে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, আমাদের স্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের সংঘবদ্ধ ভাবে সবরকম মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। সেই লড়াইয়ে আমাদের অন্যতম হাতিয়ার চিন্তা ও অভিব্যক্তির স্বাধীনতা। অভিব্যক্তি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হল শিল্প। আর তাই শিল্পীর স্বাধীনতার লড়াই, গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার বৃহত্তম লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

আপনাদের সকলকে শারদীয়ার আগাম শুভেচ্ছা জানাই। আপনাদের সাথে আবার দেখা হবে সামনের অঘ্রানে।সবাই ভালো থাকবেন।

-– শুভাশিস ভট্টাচার্য

Voltaire - 'I Disapprove of What You Say, But I Will Defend to the Death Your Right to Say It'

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮