• দীপমালা চৌধুরী

স্মৃতিচারণ – কানন দেবী স্মরণে


স্মৃতিচারণ – কানন দেবী স্মরণে – দীপমালা চৌধুরী বাংলা সিনেমার প্রথম মহিলা অভিনেত্রী কানন দেবীর বংশ পরিচয়, জন্ম তারিখ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও বলা হয় ১৯১৬ সালে হাওড়া জেলার এক অতি সাধারণ ঘরে তাঁর জন্ম হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে ১৯২৬ সালে ‘জয়দেব’ ছবিতে রাধার ভূমিকায় তাঁর প্রথম আবির্ভাব। নির্বাক এবং সবাক, বাংলা এবং হিন্দি সব মিলিয়ে ৫৬ টি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর অসাধারণ অভিনয়, অপরূপ নৃত্য শৈলী, অসামান্য কণ্ঠ সংগীত তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি করে তুলেছে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ভারতীয় অভিনয় জগতে অভিনেত্রী খোঁজার পালা শুরু হয়েছিল। তখন শুধুমাত্র অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলারাই আসতেন অভিনয় জগতে। কিন্তু সেই সময়ের সম্ভ্রান্ত বংশীয় ভারতীয় মহিলারা তাঁদের দ্বিধা সংকোচ কাটিয়ে অভিনয় জগতে এগিয়ে আসতে পারেননি। অন্যদিকে সে সময়ে পুরুষরাই মেকআপের আড়ালে মহিলাদের চরিত্রে অভিনয় করছেন। একে তো মহিলাদের সামাজিক মর্যাদা তখন খুব ই কম, তার ওপর অবহেলিত অভিনেত্রীদের সবাই তখন একটু অন্য চোখে দেখে। এই রকম এক সময়ে পিতার অকাল মৃত্যুর পর মাত্র দশ বছর বয়সে শুধু মাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে আর অর্থের প্রয়োজনে সিনেমা জগতে পা রাখেন কানন দেবী। শুভাকাঙ্ক্ষী তুলসী ব্যানার্জি একদিন তাঁকে নিয়ে আসেন ‘জ্যোতি স্টুডিও’ তে। ১৯২৬ সালে ‘জয়দেব’ নামের এক নির্বাক ছবিতে অভিনয় করার প্রথম সুযোগ এসে যায়। এরপর ১৯২৭ সালে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি র পরিচালনায় আবার অভিনয় করার সুযোগ আসে ‘শংকরাচার্য’ ছবিতে। ১৯৩১ থেকে ১৯৩২ এর মধ্যে মদন থিয়েটার্স লিমিটেডের প্রযোজনায় তিনি সবাক ছবিতে অভিনয় করেন – ‘জোর বরাত’, ‘ ঋষির প্রেম’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘বিষ্ণুনাগ’। এরপর নিউ থিয়েটার্স লিমিটেডের প্রযোজনায় ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ এর মধ্যে অভিনয় করেন ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাথী’, ‘সাপুড়ে’, ‘পরাজয়’, ‘অভিনেত্রী’, ‘পরিচয়’ ছবিতে। তথ্যের স্বার্থে জানিয়ে রাখি এই সব ছবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী কুমার বসু, ফনী মজুমদার, হেমচন্দ্র চন্দ্র, অমর মল্লিক, নীতিন বসুর মতো এক এক বিশিষ্ট চিত্র পরিচালকেরা। এর পর এম পি প্রোডাকশনের ব্যানারে মুক্তি পায় ‘শেষ উত্তর’, ‘যোগাযোগ’, ‘বিদেশিনী’। ১৯৪৯ সালে নিজে গড়ে তুললেন এক প্রযোজনা সংস্থা নাম ‘শ্রীমতী পিকচার্স’। আর এই প্রযোজনায় অমর কথা শিল্পী শরৎচন্দ্রের গল্প অবলম্বনে নির্মিত হল ‘অনন্যা’, ‘মেজদিদি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘নববিধান’, ‘আশা’, ‘ইন্দ্রনাথ’, ‘শ্রীকান্ত’ প্রমুখ ছবিগুলি। ইতিমধ্যে বাংলা ছাড়িয়ে হিন্দি সিনেমা তে তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান। ‘অচ্ছুৎ কন্যা’, ‘জবাব’, ‘রাজলক্ষ্মী’, ‘হসপিটাল’, ‘ফয়সালা’ সিনেমা তে তাঁর অসামান্য অভিনয় তাঁকে বাংলার গণ্ডী ছাড়িয়ে সারা ভারতে পরিচিতি দেয়। ১৯৫৯ সালে ‘ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’ তাঁর অভিনীত শেষ ছবি।

অভিনয়ের পাশাপাশি কানন দেবীর ছিল অসাধারণ গানের গলা। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভা আবিষ্কার করেন স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম। তার পর গান শেখেন লখনউ এর ওস্তাদ আল্লারা খান, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, অনাদি দস্তিদার প্রমুখ খ্যাতনামা সঙ্গীত শিল্পীদের কাছে। তাঁর প্রথম রেকর্ড গান হয়ে বেরোল – ‘বলো, সখী বলো’। বাংলা ছাড়া বেশ কিছু হিন্দি গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘জবাব’ ছবিতে তাঁর কণ্ঠে ‘দুনিয়া ইয়ে দুনিয়া’ সারা ভারতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘পরাজয়’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’ আমাদের এক চিরকালীন সম্পদ হয়ে আছে। অভিনয়, গানের পাশাপাশি নাচেও তিনি নিজেকে তৈরি করে তুলেছিলেন। ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’ ছবিতে তিনি তালিম নিয়েছিলেন প্রখ্যাত নৃত্য বিশারদ শমভু মহারাজের কাছে।

তাঁর সমসাময়িক অভিনেতারা ছিলেন অভিনয়ের জগতের এক এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কে এল সায়গল, পাহাড়ি সান্যাল, ছবি বিশ্বাস, প্রমথেশ বড়ুয়া, অশোক কুমার। কিন্তু সে ছবি ই হোক, আর যার সাথেই হোক কানন দেবী নিজের অনন্য অভিনয় ক্ষমতার সাক্ষর রেখে গেছেন বারে বারে। সারা জীবন অভিনয় করে অসংখ্য পুরস্কার এবং সম্মান লাভ করেছেন। তাঁর অভিনীত ‘পরিচয়’ এবং ‘শেষ উত্তর’ ছবির জন্য পরপর দুই বছর তিনি ‘বি এফ জে এ’ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। তাঁর অভিনীত ‘মেজদিদি’ ছবি ১৯৫১ সালে বছরের শ্রেষ্ঠতম চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। এরপর জাতীয় স্বীকৃতি আসে। ১৯৬৮ তে ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী, ১৯৭৬ এ চলচিত্রের সর্ব শ্রেষ্ঠ সম্মান দাদা সাহেব ফালকে, ১৯৯১ এ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত ‘ডি লিট’ সম্মান। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, দরিদ্র এক অতি সাধারণ পরিবারের একটি মেয়ে যার অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল মাত্র দশ বছর বয়সে কোন প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই নিজের শিল্প কর্ম কে যে পর্যায়ে তিনি উন্নীত করেছিলেন সেখানে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন একটি ‘ইন্সটিটিউশন’।

বাংলা সিনেমার ‘চির সবুজ রানী’ কানন দেবী শুধু অর্থ রোজগারই করেননি। বিভিন্ন জনসেবা মূলক কাজে বিলিয়ে দিয়েছেন। মহিলা অভিনেত্রী দের দুরবস্থা দেখে গড়ে তুলেছিলেন ‘মহিলা শিল্পী সংঘ’। ভারতীয় এবং বাংলা সিনেমায় মহিলাদের অভিনয় জগতে নিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ‘ভগীরথ’। তাঁর অসামান্য সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছিল চলচিত্রে মহিলাদের অভিনয় মোটেই মর্যাদা হানিকর নয়, বরং তাঁদের শিল্পী সত্তার বহিঃপ্রকাশ। তাই তাঁর জীবন কাহিনী ছিল নারী মুক্তির জয়ের ইতিহাস। বাংলা চলচিত্রের এই মহীয়সী অভিনেত্রী ১৯৯২ সালে ১৭ ই জুলাই আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যান।

পরিশেষে একটা কথাই বলা যায়, এমন এক অনন্য সাধারণ অভিনেত্রীর সঠিক মূল্যায়ন উত্তরসূরি হিসেবে আমরা তেমন কিছু করে উঠতে পারিনি। গত বছর তাঁর জন্ম শতবর্ষে তাঁর স্মৃতি কথা ‘সবারে আমি নমি’ পুনর্মুদ্রিত হলো না। এ আমাদের সবার লজ্জা, তাঁর প্রতি ঋণ স্বীকারের দৈন্যতা। তবে আশার কথা, তাঁর জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে এক প্রামাণ্য তথ্যচিত্র বানানোর কাজ শুরু করেছেন শম্পা মিত্র। চলচ্চিত্র জগতে কানন দেবীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন, শুধু মাত্র এক সফল অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং এক সাহসী, মহীয়সী নারী রূপে, চলচ্চিত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ করার চালচিত্রটিকে আমূল পরিবর্তন করে দেবার জন্য।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮