• শ্রাবস্তী সেন

ভ্রমন - ইতিহাস দর্শন

রামায়ণ বা মহাভারত সকল ভারতবাসীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ৷আর এই রামায়ণের পরাক্রমশালী বানরসেনাদের রাজ্য কিষ্কিন্ধ্যার কথা আমাদের সকলেরই জানা ৷ এবার আমাদের গন্তব্য ছিল অতীতের সেই কিষ্কিন্ধ্যা, যা পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় বীর রাজাদের আবাসস্হল ‘বিজয়নগর’ বা ‘হাম্পি’ বলে সুপরিচিত ৷

ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্হিত হাম্পি ৷ ‍‍‌‌‍‍‍ভারতবর্ষে UNESCO নির্বাচিত ‘ওর্য়াল্ড হেরিটেজ সাইট’ এর অন্যতম কর্ণাটকের এই জায়গাটি৷ বিজয়নগর রাজ্যে যে সমস্ত রাজারা বংশপরম্পরায় প্রায় দুশো বছর ধরে রাজত্ব করে গেছেন তারা এখানে অনেকগুলো দুর্গ, মন্দির এবং বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি তৈরী করেছিলেন৷ কিন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপ সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর রোষের হাত থেকে এর অনেকগুলিই মু্ক্তি পায়নি ৷ যে কটা স্হাপত্য রক্ষা পেয়েছিল তার ধ্বংসাবশেষ নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে হাম্পি ৷

তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা এই শহরটা যেন ইতিহাসের গৌরবময় ও ধ্বংসের মূ্র্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ বিজয়নগরের গৌরবময় ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে একদা সমৄদ্ধশালী এই রাজত্ব বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল সুদূর রাশিয়া , পারস্য, ইতালি বা পর্তুগালের মতন দেশগুলির সঙ্গে৷ এইসব দেশের থেকে আগত পর্যটকরা বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন সমৃদ্ধশালী এই রাজ্যের কথা ৷

হাম্পির প্রবেশ পথে “বিরূপাক্ষ মন্দির” একটা উল্লেখযোগ্য ও দর্শনীয় স্হান ৷ কথিত আছে দক্ষযজ্ঞের পর কৈলাস ছেড়ে এসে শিব তপস্যায় বসেন “হেমকূট”এ৷ এইসময় তারকাসুরের আক্রমণে দেবতারা জর্জরিত হয়ে ওঠেন ৷ কিন্তূ তারকাসুর ছিলেন বরপ্রাপ্ত যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু বা মহেশ্বর কেউ তার বধ করতে পারবেন না ৷ তাই দেবতাদের অনুরোধে দেবী পার্বতী হেমকূটে গিয়ে শিবের অর্চনা করে তার ধ্যানভঙ্গ করেন৷ দেবী পার্বতী ‘পম্পা’ র রূপে শিবের ধ্যানভঙ্গ করেন বলে শিবের আরেকনাম ‘পম্পাপতী’ ৷ বিরূপাক্ষ মন্দিরের শিবলিঙ্গের নামও তাই ‘পম্পাপতী’ ৷ বিরূপাক্ষ মন্দিরের অদূরেই রয়েছে আরও দুটো মন্দির – ‘পম্পাদেবী মন্দির’ ও ‘ভুবনেশ্বরী দেবী মন্দির’ ৷

হাম্পির আরেকটা দ্রষ্টব্য হল ‘অরাসরা তুলাভদ্রা’ ৷বলা হয় এইখানে ছিল এক বিশাল ‘তুলাযন্ত্র’ বা ‘দাঁড়িপাল্লা’ ৷ দশেরা বা মহানবমীর দিন দাঁড়িপাল্লার একদিকে মহারাজকে বসিয়ে অন্যদিকে সমপরিমাণে হীরেজহরত ওজন করে সেই মূল্য গরীবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো ৷

বিজয়বিট্টল মন্দির রয়েছে এর অদূরে ৷ এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষন ‘মিউজিক্যাল পিলার’ বা ‘সুরের স্তম্ভ’ ৷ যদিও প্রায় পঞ্চাশটা স্তম্ভ রয়েছে মন্দিরে, আনুমানিক আট দশটা স্তম্ভ থেকে বেরোয় মৃদঙ্গ, জলতরঙ্গের সুর ৷

কোনার্কের সূর্যমন্দিরের প্রভাব পড়েছিল বিজয়নগরের রাজাদের উপর ৷ তাই একটা পাথরের রথের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় এখানে৷ এছাড়াও বিশেষ দ্রষ্টব্য স্হানগুলির মধ্যে ‘হাজাবোরামা মন্দির’,‘কমল মহল’, ‘পাতালেশ্বর মন্দির’. ‘মহানবমী ডিব্বা’ যেখানে বসে রাজারা দশেরার মিছিল দেখতেন সেগুলি উল্লেখযোগ্য৷ রানীদের স্নানাগার, হস্তীশালা, লক্ষ্মীনৃসিংহের মূর্তি, সসীভেকালু গণেশ বা সর্ষেদানার গণেশ দেখলে আজও যেন ইতিহাসের পাতায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয় কিছুক্ষণের জন্য৷

হাম্পি শহরটার অদূরে তুঙ্গভদ্রার বিশাল জলরাশির ওপর গড়ে উঠেছে তুঙ্গভদ্রার বাঁধ ৷ একশো ষাট ফুট উঁচু ও দুমাইল বিস্তীর্ন এই বাঁধে রয়েছে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ৷ এই জলাধারের বাঁদিকে তাকালে একে সমুদ্র বলে ভ্রম হতে পারে ৷ ভালোলাগে এই জলাধারের পাশে প্রায় দুশো ফুট উঁচু একটি টিলা আছে, যার উপর থেকে তুঙ্গভদ্রার অপরূপ সৌন্দর্য্য মন ছুঁয়ে যায় ৷ নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ছোট্ট পার্ক যেখানে রঙ্গীন আলোর খেলা মনে করিয়ে দেয় মহীশূরের ‘বৃন্দাবন গার্ডেন’-এর কথা ৷ উপরিল্লিখিত টিলাটির একটি সুন্দর নাম আছে – ‘বৈকুণ্ঠ’ ৷ এই বৈকুণ্ঠে দাঁড়িয়ে অস্ত রবি কিরণে সেজে ওঠা তুঙ্গভদ্রার রূপ দর্শন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ৷

কিষ্কিন্ধ্যা বা বিজয়নগর যাই বলা হোক না কেন, ভারতবর্ষের ইতিহাসে হাম্পির একটা উল্লেখযো্গ্য স্হান রয়েছে তা অনস্বীকার্য ৷ প্রতিটা মন্দির, সৌধ, মূর্তি যেন সেকালের গৌরবময় অধ্যায়ের জাজ্বল্যমান প্রমাণ ৷ কিন্তু আক্রমণের হাত থেকে মুক্তি পায়নি এর অনেক কিছুই৷ বারে বারে বিদেশীরা এসেছে, ধ্বংস করেছে, লুঠ করে নিয়ে গেছে অনেক অমূল্য সম্পদ৷ তবু যে শিল্পকলা আজও স্বদম্ভে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তা আজও স্বদর্পে ঘোষিত করছে সেকালের ঐশ্বর্য্য, প্রতিপত্তির কথা৷ আর এই শিল্পকলা, স্হাপত্য, এইগুলো তো ভারতবর্ষের অমূল্য সম্পদ, যা যুগযুগান্ত ধরে রচনা করে চলেছে এক সমৃ্দ্ধময় ইতিহাস ৷

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮