• শুভাশিস ভট্টাচার্য

প্রবন্ধ - কবিতা বিষয়ে কিছু ভাবনা


গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাস বলেছিলেন “পরিবর্তন-ই একমাত্র স্থায়ী আর কিছু নয়” । আর সেই পরিবর্তনের নিয়ম মেনে পৃথিবীর সব সাহিত্য-ই বিবর্তিত হয়েছে কালচক্রে । বাংলা সাহিত্য-ও সেই বিবর্তনের বাইরে নেই। বিভিন্ন যুগের বাংলা সাহিত্যের ভাষা, গঠন, বিষয় এবং উপস্থাপনা, লক্ষ করলে সেই বিবর্তন স্পষ্ট হয়।

সব শিল্পেরই এক প্রকাশ মাধ্যম থাকে, যেমন সঙ্গীতের মাধ্যম হল শ্রুতি। গায়কের কণ্ঠস্বর ও বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে আমাদের কানে প্রবেশ করলে আমরা সঙ্গীত ও বাদ্য উপভোগ করি।

তেমনি সাহিত্যের মাধ্যম হল লিখিত শব্দ। ভাষা, বিষয় এবং উপস্থাপনা-য় বিবর্তন এলেও, (যদিও ডিজিটাল-বুক এবং অডিও-ভিজুয়াল-এর প্রভাবে সাহিত্যে মিশ্র-মাধ্যমের ব্যাবহার শুরু হয়েছে, তবুও) এখনও পর্যন্ত সাহিত্যের মাধ্যম মূলত হল লিখিত শব্দ।

যেমন আমাদের কানে প্রবেশ করা সব আওয়াজ-ই সঙ্গীত হয়ে ওঠে না। তেমনই সব লিখিত শব্দ-ই সাহিত্য হয়ে ওঠে না।

সঙ্গীতের যেমন রকম ভেদ আছে, হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল আর রক-সঙ্গীত এক নয় এবং তাদের আলাদা করে চেনার উপায় আছে। হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতে-ও আবার অনেক রকম ঘরানা, তাদের সবার আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। আমার মতো অনভিজ্ঞের কানে সেই বৈশিষ্ট্য তেমন চট করে ধরা না পড়লেও, অভিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞ ও সংগীতের ছাত্রদের, বহুদিনের অভ্যাসে তৈরি কানে, তা চট করে ধরা পড়ে।

সাহিত্যের বাগানেও তেমনি রকমারি ফুল - গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, পদ্য, ছড়া। সব-ই সেই লিখিত শব্দ দিয়েই তৈরি । তাহলে তাদের আলাদা করে চিনব কি করে ? ধরা যাক একটা কবিতা খুঁজতে গেলাম, সাহিত্যের বাগানে, অত ফুলের মাঝে তাকে চিনব কি করে ?

আপাত দৃষ্টিতে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন লেখার বাইরের গঠনে কিছু পার্থক্য ধরা পড়ল – যেমন কিছু লেখা হয়, পয়ার, মাত্রা, ছন্দ মিলিয়ে আর কিছু লেখা হয় ছন্দ না মিলিয়ে। কিন্তু বাইরের এই পার্থক্য-ই কি সব ? শুধু ছন্দ মিল থাকলেই কি কবিতা হয়? আর ছন্দ মিল না থাকলে তা কবিতা হয় না ?

আমার মতো অনভিজ্ঞের মননে কবিতার রকমসকম চট করে ধরা না পড়লেও, নিশ্চয়ই বড় বড় কবিদের, বহুদিনের চর্চিত মননে, তা চট করে ধরা পড়বে, এই ভেবে, বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক এব্যাপারে কি ভেবেছেন তার দ্বারস্থ হলাম ।

কবিতা, পদ্য ও ছড়ার রকমসকম বোঝাতে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন (সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ), শুধু ছন্দ মিল থাকলেই কবিতা হয় না, কবিতা হয় কল্পনার সাহসে ভর করে।

“বাংলাদেশের ঘুমপাড়ানি ছড়ার একাধিক পাঠান্তর প্রচলিত আছে যিনি লিখেছিলেন

ঘুম-পাড়ানি মাসি-পিসি মোদের বাড়ি যেয়ো

বাটা ভরে পান দেবো গাল পুরে খেয়ো

– তার ছিল র‍্যাশনাল বা ন্যায়সম্মত মন, নিদ্রা-দেবীকে তিনি ধারনা করেছেন একজন মাননীয়া প্রতিবেশিনী রূপে, যাকে পান খাইয়ে খুশি করলে শিশুর নিদ্রা-রূপ বর-লাভ সম্ভব হবে । এই কার্য-কারণ সম্বন্ধস্থাপনেই বোঝা যায় যে এর লেখক সুগৃহিণী ও সুমাতা – কিন্তু কবি নন, বড় জোর পদ্যকার। কিন্তু

ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি মোদের বাড়ি এসো

খাট নেই, পালঙ্ক নেই, চোখ পেতে বোসো

– এই পদ্যে সাংসারিক জ্ঞানের পরিচয় নেই কিন্তু কবিত্ব আছে। “চোখ পেতে বোসো” মাসি-পিসি নাম্নী অতিথির কাছে এ-রকম একটা অসম্ভব প্রস্তাব তিনি করতে পারতেন না যদি-না তার কল্পনার সাহস থাকত “( প্রবন্ধ- সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ, বুদ্ধদেব বসু )

রবীন্দ্রনাথ তার প্রবন্ধ (কাব্য স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট) তে লিখছেন, যে ভাষার স্পষ্টতা আর ছন্দের মিল থাকেলেই তা কবিতা হয় না। কবিতা হয় ভাবের আভাষে -

-

“বলরামদাস লিখিয়াছেন--

আধ চরণে আধ চলনি,

আধ মধুর হাস।

ইহাতে যে কেবল ভাষার অস্পষ্টতা তাহা নহে, অর্থের দোষ। "আধ চরণ' অর্থ কী? কেবল পায়ের আধখানা অংশ? বাকি আধখানা না চলিলে সে আধখানা চলে কী উপায়ে! একে তো আধখানি চলনি, আধখানি হাসি, তাহাতে আবার আধখানা চরণ! এগুলো পুরা করিয়া না দিলে এ কবিতা হয়তো অনেকের কাছে অসম্পূর্ণ ঠেকিতে পারে। কিন্তু যে যা বলে বলুক, উপরি-উদ্ধৃত দুটি পদে পরিবর্তন চলে না। "আধ চরণে আধ চলনি' বলিতে ভাবুকের মনে যে একপ্রকার চলন সুস্পষ্ট হইয়া উঠে, ভাষা ইহা অপেক্ষা স্পষ্ট করিলে সেরূপ সম্ভবে না।

অত্যন্ত স্পষ্ট কবিতা নহিলে যাঁহারা বুঝিতে পারেন না তাঁহারা স্পষ্ট কবিতার একটি নমুনা দিয়াছেন। তাঁহাদের ভূমিকা-সমেত উদ্ধৃত করি। "বাংলার মঙ্গল-কাব্যগুলিও জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা। কবি-কঙ্কণের দারিদ্র্য-দুঃখ-বর্ণনা-- যে কখনো দুঃখের মুখ দেখে নাই তাহাকেও দীনহীনের কষ্টের কথা বুঝাইয়া দেয়।

"দুঃখ করো অবধান, দুঃখ করো অবধান

আমানি খাবার গর্ত দেখো বিদ্যমান।'

এই দুইটি পদের ভাষ্য করিয়া লেখক বলিয়াছেন, "ইহাই সার্থক কবিত্ব; সার্থক কল্পনা; সার্থক প্রতিভা।' পড়িয়া সহসা মনে হয় এ কথাগুলি হয় গোঁড়ামি, না-হয় তর্কের মুখে অত্যুক্তি। আমানি খাবার গর্ত দেখাইয়া দারিদ্র্য সপ্রমাণ করার মধ্যে কতকটা নাট্য-নৈপুণ্য থাকিতেও পারে, কিন্তু ইহার মধ্যে কাব্যরস কোথায়? দুটো ছত্র, কবিত্বে সিক্ত হইয়া উঠে নাই; ইহার মধ্যে অনেকখানি আমানি আছে, কিন্তু কবির অশ্রুজল নাই। ইহাই যদি সার্থক কবিত্ব হয় তবে "তুমি খাও ভাঁড়ে জল, আমি খাই ঘাটে', সে তো আরও কবিত্ব। ইহার ব্যাখ্যা এবং তার ভাষ্য করিতে গেলে হয়তো ভাষ্যকারের করুণ-রস উদ্বেলিত হইয়া উঠিতেও পারে, কিন্তু তৎসত্ত্বেও সকলেই স্বীকার করিবেন ইহা কাব্যও নহে, কাব্যিও নহে, যাঁহার নামকরণের ক্ষমতা আছে তিনি ইহার আর-কোনো নাম দিন। যিনি ভঙ্গি করিয়া কথা কহেন তিনি না-হয় ইহাকে কাব্যু বলুন, শুনিয়া দৈবাৎ কাহারও হাসি পাইতেও পারে।“(প্রবন্ধ - কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

এখানে, রবীন্দ্রনাথ এবং বুদ্ধদেব বসু দুজনেই একমত যে ছন্দ মিল থাকলেই তা কবিতা হবে এমন নয়। তাহলে কবিতা কিসে হয়?

রবীন্দ্রনাথ তার প্রবন্ধ (কাব্য স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট) তে লিখছেন, কবিতা বুদ্ধির বিষয় নয় ভাবের বিষয়।

“বুদ্ধিগম্য বিষয় বুঝিতে না পারিলে লোকে লজ্জিত হয়। হয় বুঝিয়াছি বলিয়া ভান করে, না-হয় বুঝিবার জন্য প্রাণপণ প্রয়াস পায় কিন্তু ভাব-গম্য সাহিত্য বুঝিতে না পারিলে অধিকাংশ লোক সাহিত্যকেই দোষী করে। কবিতা বুঝিতে না পারিলে কবির প্রতি লোকের অশ্রদ্ধা জন্মে, তাহাতে আত্মাভিমান কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। ইহা অধিকাংশ লোকে মনে করে না যে, যেমন গভীর তত্ত্ব আছে তেমনি গভীর ভাবও আছে। সকলে সকল তত্ত্ব বুঝিতে পারে না। সকলে সকল ভাবও বুঝিতে পারে না। ইহাতে প্রমাণ হয়, লোকের যেমন বুদ্ধির তারতম্য আছে তেমনি ভাবুকতারও তারতম্য আছে।

মুশকিল এই যে, তত্ত্ব অনেক করিয়া বুঝাইলে কোনো ক্ষতি হয় না, কিন্তু সাহিত্যে যতটুকু নিতান্ত আবশ্যক তাহার বেশি বলিবার জো নাই। তত্ত্ব আপনাকে বুঝাইবার চেষ্টা করে, নহিলে সে বিফল; সাহিত্যকে বুঝিয়া লইতে হইবে, নিজের টীকা নিজে করিতে গেলে সে ব্যর্থ। তুমি যদি বুঝিতে না পার তো তুমি চলিয়া যাও, তোমার পরবর্তী পথিক আসিয়া হয়তো বুঝিতে পারিবে; দৈবাৎ যদি সমজদারের চক্ষে না পড়িল, তবে অজ্ঞাতসারে ফুলের মতো ফুটিয়া হয়তো ঝরিয়া যাইবে; কিন্তু তাই বলিয়া বড়ো অক্ষরের বিজ্ঞাপনের দ্বারা লোককে আহ্বান করিবে না এবং গায়ে পড়িয়া ভাষ্যদ্বারা আপনার ব্যাখ্যা করিবে না।“ (প্রবন্ধ - কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

বুদ্ধদেব বসু বলেছেন কবিতা অনুভবের বিষয় - ” কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনা, কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের ‘বোঝায়’ না ; স্পর্শ করে , স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা 'বোঝা' যাবে না , 'বোঝানো ' যাবে না ।” (কবিতার দুর্বোধ্যতা, বুদ্ধদেব বসু)

এখানে, রবীন্দ্রনাথ এবং বুদ্ধদেব বসু দুজনেই একমত যে কবিতা ভাবের বিষয়। কবিতাকে বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যাবে না, তাকে অনুভব করতে হবে।

একই মত কবি হুমায়ুন আজাদের-ও, তার মতে কবিতা হল তাই - ‘যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃৎপিণ্ডে রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না; যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও, রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে।‘

অনুভব যেন চেতনা এবং অবচেতনার, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ইন্দ্রিয়াতীতের মিলিত ঝঙ্কার। তাকে যেমন অঙ্ক কষে, বুদ্ধি দিয়ে, বোঝা যায় না, তেমনি কাউকে বোঝানো-ও যায় না। তাকে অন্তর দিয়ে পেতে হয়। এ যেন প্রতিটি মানুষের, ব্যক্তিগত আকাশে, তার নিজস্ব চেতনা আর অবচেতনার অনন্ত উড়ান।

অনুভব অসীম, তাকে লিখিত শব্দের আভিধানিক অর্থের সীমায় বাঁধার চেষ্টা, অনেকটা হাতের মুঠিতে জল ধরে রাখার চেষ্টার মতো, যতই তাকে শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করা যাক, সে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঠিক গলে যাবে, শুধু রেখে যাবে তার রেশ, করতলের আর্দ্রতায় । তেমনি কবিতার শব্দে শব্দে রয়ে যায় কবির অনুভবের রেশ। আর সেই রেশ পাঠকের মনে তোলে ঝঙ্কার। কিন্তু কোন পাঠকের মনে ঠিক কতটা ঝঙ্কার উঠবে তা হিসেব করে মেপে ফেলা সম্ভব নয়।

আর তাই বুঝি, শেলি তার “A Defence of Poetry” প্রবন্ধে লিখছেন যে কবিতা অনন্ত এবং যতবার তার অর্থের আবরণের স্তর খুলে ফেলা যাক না কেন তার অন্তর্নিহিত সারাংশ অধরাই থেকে যায়। কবিতা অনন্ত, সার্থক কবিতা তাই কালোত্তীর্ণ হয়ে অমর হয়ে যায়।

জীবনানন্দ-ও “কবিতার কথা” প্রবন্ধে, অনুভূতির কথা বলছেন -

“সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ শোনা যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায়- কিংবা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয়, যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেকদিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে আরো অনেকদিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের শেষ জাফরান রৌদ্রালোক পর্যন্ত কথাও যেন রয়ে যাবে, এই সবের অপরূপ উদ্গিরণের ভিতরে এসে হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তু-সঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে।“(কবিতার কথা, জীবনানন্দ দাশ )

কবিতার ভাষা তাই অনুভবের ভাষা। সে ভাষা জ্ঞানের ভাষা থেকে আলাদা। বুদ্ধদেব বসু লিখছেন ( প্রবন্ধ- সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ, বুদ্ধদেব বসু)

“ভাষা দুই ভাবে কাজ করে একদিকে সে খবর দেয়, অন্য দিকে সে জাগিয়ে তোলে। তথ্য বা জ্ঞানের জগতে আমরা চাই স্পষ্ট ও সুসংলগ্ন ভাষা, যার আয়তন তার সম্বাদের সঙ্গে খাপে-খাপে মিলে যাবে, কিন্তু কবিতার ভাষায় আমরা খুঁজি প্রভাব যা তার ব্যাকরণ-নির্দিষ্ট অর্থকে অতিক্রম করে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। যার বেগে আমাদের মনে অনেক স্বপ্ন, স্মৃতি, চিন্তা ও অনুষঙ্গের যেন ঘুম ভেঙ্গে যায়, ধ্বনি থেকে প্রতি ধ্বনি অনবরত প্রহত হতে থাকে।” ( প্রবন্ধ- সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ, বুদ্ধদেব বসু )

রবীন্দ্রনাথ “কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট” প্রবন্ধের’ই অন্য এক জায়গায়, লিখেছেন যে ভাবের প্রয়োজনেই কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে কখনো স্পষ্ট কখনো বা অস্পষ্ট। আর এই স্পষ্টতা ও অস্পষ্টতার আলো-আঁধারে, পাঠকের মনে অনন্তের রহস্যময় ইঙ্গিত নিয়ে আসাই, কবিতার সার্থকতা ।

“ প্রকৃতির নিয়ম-অনুসারে কবিতা কোথাও স্পষ্ট কোথাও অস্পষ্ট, সম্পাদক এবং সমালোচকেরা তাহার বিরুদ্ধে দরখাস্ত এবং আন্দোলন করিলেও তাহার ব্যতিক্রম হইবার জো নাই। চিত্রেও যেমন কাব্যেও তেমনই-- দূর অস্পষ্ট, নিকট স্পষ্ট; বেগ অস্পষ্ট, অচলতা স্পষ্ট; মিশ্রণ অস্পষ্ট, স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। আগাগোড়া সমস্তই স্পষ্ট, সমস্তই পরিষ্কার, সে কেবল ব্যাকরণের নিয়মের মধ্যে থাকিতে পারে; কিন্তু প্রকৃতিতেও নাই, কাব্যেও নাই। অতএব ভাবুকেরা স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট লইয়া বিবাদ করেন না, তাঁহারা কাব্যরসের প্রতি মনোযোগ করেন। "আমানি খাবার গর্ত দেখো বিদ্যমান' ইহা স্পষ্ট বটে, কিন্তু কাব্য নহে। “(প্রবন্ধ - কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তার “কবিতা কী” প্রবন্ধে লিখছেন শব্দ-রূপের ভিতর দিয়ে শব্দাতীতের আভাষ-ই গদ্যের সাথে কবিতায় পার্থক্য।

“গদ্যও একধরনের শব্দ-রূপই, আমাদের ভাবনাকে সেও মূর্তি দেয়, কিন্তু শব্দ সেখানে তার তাৎক্ষণিক বা আভিধানিক অর্থের বেশি-কিছু আমাদের বলে না। কবিতার শব্দ সেক্ষেত্রে তার তাৎক্ষণিক অর্থকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, ছাড়িয়ে প্রায়শ যায়ও, ইঙ্গিত করতে থাকে অন্যতর কোনও অর্থ কিম্বা তাৎপর্যের দিকে” (প্রবন্ধ “কবিতা কী”, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী )

জীবনানন্দ দাশের ভাষায় তাই কবিতা একটা বোধ –

“আলো –অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়,- কোন এক বোধ কাজ করে !”

(ধূসর পান্ডুলিপি – জীবনানন্দ দাশ)

এবার কিছু উদাহরণ দেখা যাক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বলেন -

“ভুবন ভ্রমিয়া শেষে

এসেছি নূতন দেশে

আমি অতিথি তোমারি দ্বারে

ওগো বিদেশিনী”

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তখন, একাধিক ইঙ্গিত মন ছুঁয়ে যায়। “ভুবন ভ্রমণ” শেষ করে যদি “নূতন দেশে” পৌঁছানো যায়, তাহলে সে দেশ কি এই ভুবনের বাইরে, অন্য কোন দেশ ? “আমি অতিথি তোমারি দ্বারে”, - আমি অতিথি, এবং তোমার দ্বারে এসে প্রবেশের অনুমতি ছাইছি – কিন্তু সেই অনুমতি পাব কি না তা অনিশ্চিত। আর এই অনিশ্চয়তাই কবিতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য কবিতায়, এইরূপ অরূপের অনন্ত মণিমাণিক্য ছড়িয়ে আছে, আর সেখানেই তা হয়ে ওঠে সার্থক কবিতা ।

কবি অমিয় চক্রবর্তী ‘রাত্রি' কবিতায় যখন বলেন -

“অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি তাই চুপি চুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে বলি, শোনো, সৌরতারা-ছাওয়া এই বিছানায় —সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি— কত দীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন, আলাদা নিশ্বাসে— এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে ছুঁই কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা— অতন্দ্রিলা, হঠাত্ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না, দেখি তুমি নেই ||”

(রাত্রি – অমিয় চক্রবর্তী )

তখন, “কত দীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন, / আলাদা নিশ্বাসে”, এই বাক্য-বন্ধে বিরহের বিষণ্ণতা নীরবে ছুঁয়ে যায় আমাদের মন। কিন্তু উপরোক্ত পংক্তি কোন পাঠকের মনে কতটা বিষণ্ণতার আভাস দেবে তা বুদ্ধি দিয়ে মাপজোপ করে বোঝা যাবে না, এ অনুভবের কথা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বলেন –

“আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরানসখা বন্ধু হে আমার॥

আকাশ কাঁদে হতাশ-সম, নাই যে ঘুম নয়নে মম--

দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার॥

বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,

তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।

সুদূর কোন্‌ নদীর পারে, গহন কোন্‌ বনের ধারে

গভীর কোন্‌ অন্ধকারে হতেছ তুমি পার”

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তখন, কোন পাঠকের মনে কতটা ঝড় উঠবে তা অঙ্ক করে পাওয়া যাবে না।

অথবা জয় গোস্বামী যখন বলেন-

“অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে

করো আনন্দ আয়োজন করে পড়ো লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো

করেছো, অতল; করেছিলে; পড়ে হাত থেকে লিপিখানি ভেসে যাচ্ছিল–ভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে; –’পড়ে রইল যে!’ পড়েই থাকত–সে-লেখা তুলবে বলে

কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”

(হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে - জয় গোস্বামী)

তখন, এই অতল গভীরতার অনুভবে পৌঁছানোর জন্যে প্রয়োজন কবিতা, সেখানে ফিতে নিয়ে গভীরতা মাপতে গেলে তা আর কবিতা থাকেনা।

আলোচনার স্বার্থে আরো কিছু উদাহরণ দেখা যাক, যেখানে কবিতা, শব্দের আক্ষরিক অর্থের বন্ধন মুক্ত হয়ে, আমাদের নিয়ে চলে অসীম সম্ভাবনার রহস্যময় জগতে।

বিনয় মজুমদার যখন বলেন -

"আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছ; ফিরে এসো ফিরে এসো চাকা,

রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো।

আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন

সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।"

(ফিরে এসো চাকা - বিনয় মজুমদার)

তখন শব্দ শুধুমাত্র দৃশ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, অপার মুগ্ধতায় দর্শনে রূপান্তরিত হয়ে নিয়ে আসে মুক্তির স্বাদ । এই মুগ্ধ উড়ান আমরা বার বার পাই ‘ফিরে এসো চাকার’ কবিতাতে –

একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে

দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে

পুনরায় ডুবে গেল- এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে

বেদনার গাঢ় রসে অপক্ব রক্তিম হল ফল

... বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে..."

(একটি উজ্জ্বল মাছ - বিনয় মজুমদার )

শক্তি চট্টোপাধ্যায় যখন বলেন -

“বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে– ”

(অবনী বাড়ি আছো - শক্তি চট্টোপাধ্যায় )

অথবা,

“দেয়ালির আলো মেখে নক্ষত্র গিয়েছে পুড়ে কাল সারারাত

কাল সারারাত তার পাখা ঝ'রে পড়েছে বাতাসে

চরের বালিতে তাকে চিকিচিকি মাছের মতন মনে হয়

মনে হয় হৃদয়ের আলো পেলে সে উজ্জ্বল হ'তো ।“

(অনন্ত কুয়োর জলে চাঁদ পড়ে আছে - শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

অথবা,

“এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে

চাঁদ্ ডাকে আয়, আয়, আয়।

এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে

চিতা কাঠ ডাকে আয়, আয়, আয়।“

তখন, ইঙ্গিতে আমরা পৌঁছে যাই একটা বাস্তব-পরাবাস্তব রহস্যময় জগতে।

পূর্ণেন্দু পত্রী যখন বলেন

ভালবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী পুরুষেরা জ্বলন্ত কাঠ। সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে পাহাড় ছিল মেঘের ঢেউ জলে। হঠাৎ, আকাশ জুড়ে বেজে উঠল ঝড়ের জগঝম্প ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাইয়ের ভঙ্গিতে ছুটে এল এক ঝাঁক হাওয়া মেঘের আঁচলে টান মেরে বললে – ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে।“

(সেই গল্পটা – পূর্ণেন্দু পত্রী )

তখন, চমকে উঠি “নরম নদী” বা “জ্বলন্ত কাঠের” উপমায় –একাধিক ইঙ্গিত মন ছুঁয়ে যায় শব্দের আভিধানিক অর্থ ছাড়িয়ে।

আবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায়, নিজের স্বরূপ খুঁজে বেরাই হা হা তৃষ্ণায়

“সখী, আমার তৃষ্ণা বড় বেশি, আমায় ভুল বুঝবে? শরীর ছেনে আশ মেটে না, চক্ষু ছুঁয়ে আশ মেটে না তোমার বুকে ওষ্ঠ রেখেও বুক জ্বলে যায়, বুক জ্বলে যায় যেন আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, যেন আমার দিঘির পাড়ে বকের সাথে দেখা হলো না!

সখী, আমার পায়ের তলায় সর্ষে, আমি বাধ্য হয়েই ভ্রমণকারী আমায় কেউ দ্বার খোলে না, আমার দিকে চোখ তোলে না হাতের তালু জ্বালা ধরায়, শপথগুলি ভুল করেছি ভুল করেছি মুহুর্মুহু স্বপ্ন ভাঙে, স্বপ্নে আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, স্বপ্নে আমার স্নান হলো না।

সখী, আমার চক্ষুদুটি বর্ণকানা, দিনের আলোয় জ্যোৎস্না ধাঁধা ভালোবাসায় রক্ত দেখি, রক্ত নেশায় ভ্রমর দেখি সুখের মধ্যে নদীর চড়া, শুকনো বালি হা হা তৃষ্ণা হা হা তৃষ্ণা কীর্তি ভেবে ঝড়ের মুষ্টি ধরতে গেলাম, যেন আমার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, যেন আমার স্বরূপ দেখা শেষ হলো না। “

(সখী আমার – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী’র অমলকান্তি কবিতায়, অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল – আর সেইখানেই কবিতাটা অর্থের সীমা ইঙ্গিতে ছাড়িয়ে অসীমে পৌঁছে গেলো অনায়াসে -

“আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

অমলকান্তি সে সব কিছু হতে চায়নি।

সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!

ক্ষান্তবর্ষণে কাক ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,

জাম আর জামফলের পাতায়

যা নাকি অল্প একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।

মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে,

চা খায়, এটা ওটা গল্প করে, তারপর বলে, ‘উঠি তাহলে’।

আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,

অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,

যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,

উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।

অথচ সকলেরি ইচ্ছাপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

সেই অমলকান্তি, রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে

যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।।“

জীবনানন্দ দাশ যখন বলেন -

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতি দূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।“

(বনলতা সেন - জীবনানন্দ দাশ)

তখন, কবিতার রহস্যময়তা, আমাদের মনকে, কবিতার শব্দগুলির আভিধানিক অর্থের সীমানার বাইরে, নিয়ে যায়। উত্তাল সমুদ্রের হাওয়ায় মন উড়ে যায়, মন ভেসে যায়, আমি হয়ে উঠি এক আদিম নাবিক। আমি, সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, সমস্ত নাবিকের প্রতিভূ। হাজার হাজার বছর ধরে, সপ্ত-ডিঙ্গা ভাসিয়ে, মানব সভ্যতার বন্দরে বন্দরে, আমি খুঁজে ফিরি আমার আশ্রয় (নীড়), খুঁজে ফিরি আমার প্রিয়াকে। আমি যেন অসীম উত্তাল সমুদ্রে, দিকভ্রান্ত অসহায় এক নাবিক, ডুবে যাবার পূর্ব মুহূর্তে, পেলাম জীবনের শেষ আশ্রয় । পেলাম আমার প্রিয়াকে, আর প্রিয়ার চোখে আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়। আমি শেষবারের মতো নোঙ্গর ফেলি। আর ভেসে যাওয়া নেই, আর ক্লান্তি নেই, এবার অনন্ত শান্তি।

“সব পাখী ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন ; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।“

(বনলতা সেন - জীবনানন্দ দাশ)

কিন্তু এ কবিতা পড়ে, কোন পাঠকের মনে, কোন সমুদ্রের কতটা ঢেউ ছুঁয়ে যাবে, আর সে সমুদ্রের রূপ-ই বা কেমন হবে, তা কোনো নির্দিষ্ট হিসেব মেনে বলা যাবে না। এখানে প্রতিটি পাঠক, তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সমুদ্রে পাড়ি দেয়, তাদের ব্যক্তিগত বনলতা সেন কে খুঁজে পেতে।

সার্থক কবিতায় তাই “রূপের মাঝে মেলে অরূপের সন্ধান”। যেখানে শব্দ তার ব্যাবহারিক অর্থ ছাড়িয়ে অসীমে বিলীন হয়ে যায়।

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি

বাজাও আপন সুর।

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ

তাই এত মধুর।

কত বর্ণে কত গন্ধে,

কত গানে কত ছন্দে,

অরূপ তোমার রূপের লীলায়

জাগে হৃদয়পুর।

আমার মধ্যে তোমার শোভা

এমন সুমধুর।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, হুমায়ুন আজাদ, শেলি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, জীবনানন্দ সকলেই কবিতার বিষয়ে ভাব বা অনুভবের কথা বলছেন। অনুভব আমদের একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় । গোলাপ সুন্দর কিন্তু – তার সৌন্দর্য যেমন মাপা যায় না, তেমনি অনুভব-ও মাপা যায় না। কবি তার অনুভব পাঠকের মধ্যে সঞ্চার করে দিতে লিখিত শব্দের সাহায্য নেন। কিন্তু শব্দ সসীম তার এক বা একাধিক আভিধানিক অর্থ থাকে, কিন্ত সেই সকল অর্থ-ই অপরিবর্তনীয়, যেন পাথরে খোদাই করা, অভিধান আমি পড়লেও তার যা অর্থ পাব, অন্য কেউ পড়লেও সেই একই অর্থ পাবে। আজ পড়লেও যা অর্থ পাব, কাল পড়লেও সেই একই অর্থ পাব। কিন্তু অনুভব তো সসীম নয় – সে অসীম – সে পাথরে খোদাই করা কোনও অপরিবর্তনীয় অর্থ নয়। আমার অনুভব কখনয়ই অন্য কারুর অনুভবের সাথে একদম একই রকম হতে পারে না। আবার আমার আজকের অনুভব, গতকালের অনুভবের সাথে বা আগামীকালের অনুভবের সাথে একদম এক রকম নাও হতে পারে। তাই যখন অনুভবের আভাষ দেওয়ার জন্য শব্দ কে ব্যাবহার করার হয় তখন সে শব্দকে তার বাচ্যার্থকে ছাড়িয়ে যেতে হয় – অসীমের সন্ধানে। কবিতায় তাই শব্দ তার অর্থের সীমা ছাড়িয়ে অসীমের আহ্বান নিয়ে আসে । আর তাই যে কোনও মহান কবিতা, প্রতিটি পাঠকের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুভবের ইঙ্গিত নিয়ে আসে। আর এই ভাবেই প্রতিটি পাঠক তার নিজের নিজের কবিতা আবিষ্কার করে চলে অনন্তকাল ধরে।

“All high poetry is infinite; it is as the first acorn, which contained all oaks potentially. Veil after veil may be undrawn, and the inmost naked beauty of the meaning never exposed. A great poem is a fountain forever overflowing with the waters of wisdom and delight; and after one person and one age has exhausted all its divine effluence which their peculiar relations enable them to share, another and yet another succeeds, and new relations are ever developed, the source of an unforeseen and an unconceived delight.” (A Defence of Poetry - Percy Bysshe Shelley )

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮