• পার্থ সেন

গল্প - ক্লেয়ারভয়েন্ট


উত্তরের জানলা টা থেকে থেকে খুলে যাচ্ছে আজ। একবার খুলে গেলে বারবার খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে, বাইরে একটা দমকা হাওয়া চলছে থেকে থেকে, কোন বৃষ্টি নেই, আকাশ বেশ পরিস্কার, একফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু খালি হাওয়া, জানলা টা কিছুতেই বন্ধ থাকছে না, ছিটকিনি টা আলগা হয়ে গেছে বোধহয়। কাল কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দিয়ে ঠিক করাতে হবে। এই রকম আওয়াজ হতে থাকলে ঘুমানো খুব কঠিন। হাতে রিষ্ট ওয়াচে সময় দেখাচ্ছে ১-৫৭, কিন্তু কিছুতে ঘুম আসছে না। নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত, জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে বেশ ভয় লাগে, বাইরে কোন শব্দ নেই। প্রায় তিন গ্লাস জল খাওয়া হয়ে গেল, সাধারণত ডিনারের পর আমি আর সিগারেট খাইনা, কিন্তু আজ দুটো খাওয়া হয়ে গেছে, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। খালি মনে পড়ছে ফোনে ডঃ বারিকের শেষ কথা গুলো।

আমি অমিতাভ ঘোষ, একটা ব্যাঙ্কের ইন্সপেকশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করি, সেই কাজের সুত্রে এই সোমবার এসেছি এই ফুলাং এ – ডালটনগঞ্জের খুব কাছে এই ফুলাং। একেবারে পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কোয়েল নদী, কলেজে থাকতে কতবার পড়েছি ‘কোয়েলের কাছে’, নামটা শুনেই আসবার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া আমি একা মানুষ, চট করে বেরিয়ে পড়তে কোন অসুবিধে হয়না, এই রকম ইন্সপেকশনের কাজে ব্যাঙ্ক আমাকে প্রায় পাঠিয়ে দেয়। আমার ও একটা ছোট ব্যাগ সবসময় রেডি করা থাকে, আমার বস জানেন, তাই এখন আর আমাকে জিজ্ঞাসা করেন না, খালি ডিটেলস জানিয়ে দেন। ব্যাঙ্কের পয়সায় এরকম অনেক জায়গা আমার ঘোরা হয়ে গেছে।

এখান কার একটা ছোট সার্ভিস ব্যাঙ্কে দিন সাতেকের ইন্সপেকশন। তার মধ্যে তিন দিন কেটে গেছে, আর তিন দিন বাকি। আমার এখানকার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার কেমন যেন অন্য ধরনের মানুষ, শেষ তিন দিনের মধ্যে এক দিন মাত্র এসেছেন তাও দুই ঘণ্টার জন্য, ও নার বাড়িতে কি যেন এমারজেন্সি চলছে। কি জানতে চাওয়া তে এমন করে তাকালেন তার পর আর বেশি কিছু জানতে চাওয়া গেলনা। ব্যাঙ্কের অন্য স্টাফ দের কাছে শুনলাম তিনি এমনিতে খুব রেগুলার নন, মাঝে মাঝেই ছুটিতে থাকেন। আমার আগের অভিজ্ঞতায় ইন্সপেকশন হল ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মেয়ের বিয়ে, কিছু গোলমাল হলে ওনার প্রধান দায়িত্ব। কিন্ত এখানকার ওঙ্কার নাথ সাহেব যেন সকলের থেকে আলাদা। যা হোক তাতে আমার অবশ্য কোন অসুবিধা হচ্ছেনা। ব্যাঙ্কের অন্য স্টাফরা আমাকে খুব সাহায্য করছেন, আর সত্যি বলতে কি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার না থাকায় আমার কাজটা এগোচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি, এক মনে কাজ করে অনেকটা কাজ শেষ করে এনেছি। আর দুদিনে পুরোটা হয়ে যাবে।

আজ বিকেলে আলাপ হল ডঃ বৈদ্যনাথ বারিকের সঙ্গে। ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার, আমার সঙ্গে আলাপ হল অফিসের ঠিক বাইরে একটা চায়ের গুমটিতে। ছোট চায়ের দোকান, কিন্তু রাজ্যের জিনিস সেখানে, একদিকে যেমন মুদির জিনিস অন্য দিকে ফোনের সিম কার্ড, তার সাথে চা, বিস্কুট, স্নাক্স। আগের দিন ওঙ্কার সাহেব নিয়ে এসেছিলেন। তারপর থেকে ছোট খাট ব্রেক পেলে এখানেই চলে আসি। অবশ্য বেরোতে আট-টা হয়ে গেল, চা খেয়ে বেরোচ্ছি, ঠিক এমন সময়ে পেছন থেকে শুদ্ধ বাঙলায় ডাক এলো,

-“বাঙালি?”

পেছন ফিরতেই হল, দেখলাম বেশ বয়স্ক ভদ্রলোক, ষাটের কাছাকাছি বয়স, পরনে নিতান্ত সাধারন জামাকাপড়, সাদা হাফ শার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, এই রকম ফ্রেম এখন আর বেশী কাউকে পরতে দেখা যায় না। প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললাম, “আপনি কি এখানেই থাকেন?”

“হ্যাঁ, একটু আগে। আপনি তো ব্যাঙ্কের ইন্সপেকশনের কাজে এসেছেন?”

“ঠিক ধরেছেন!”

“হ্যাঁ, নতুন লোক তো এখানে বড় একটা আসে না! ঐ একজন দুইজন ব্যাঙ্কের কাজে আসেন। কাছে একটা হসপিটাল আছে, ও খানে অবশ্য কিছু নতুন মুখ দেখা যায়।“

হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলাম, ভদ্রলোক আবার বললেন, “কোথায় উঠেছেন এখানে? ডালটনগঞ্জ?”

“না এই ফুলাং – এই। কাছে একটা গেস্ট হাউস আছে, সেখানে। এই তিন চার দিনের ব্যাপার। তাই আর ডালটনগঞ্জ গেলাম না। জায়গা টা বেশ ভালো, বেশ নিরিবিলি।“

“পুরো জায়গাটা কিন্তু ডালটনগঞ্জ – জানেন তো! তিরিশ বছর আগে এই জায়গা টাকে আমরা ডালটনগঞ্জ বলতাম।“

“আপনি কোথায় থাকেন?”

“এই একটু এগিয়ে, সালগাস বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে।“

“তা এখানে কি কোন দরকারে?”

“আসলে আমি পেশায় ডাক্তার, এখানে আমার পেশেন্টরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, দেখতে আসি মাঝে মধ্যে।“

“তাহলে তো খুব ভালো হল, বিদেশে এসে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হওয়াটা খুব জরুরী।“

“তা ভালো!”

ভদ্রলোক খুব ধীর গতিতে কথা বলেন আর গলার স্বর ও খুব নিচু, কথা বলার মধ্যে কোন তাড়া নেই, আর মিনিট দুয়েক কথা হল, যেটুকু জানলাম যে তিনি জন্ম থেকে এই ডালটনগঞ্জে থাকেন। মাঝে এমবিবিএস পড়তে রাঁচি গেছিলেন তারপর থেকে এখানে, কাজের সুত্রে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী গেছেন তবে বেশী নয়। অবিবাহিত, একাই থাকেন। তারপর আমার বাস এসে যাওয়াতে আড্ডাটা মাঝপথে বাধা পড়ল। আমাকে চলে আসতে হল, এখানে বাস আবার ঘণ্টায় একটা। একটা চলে গেলে আর একটা আসতে অনেক সময় লাগে, তবে আসার আগে ফোন নম্বর টা নিতে ভুলিনি।

গেস্ট হাউসে ফিরে আলুর বড়া আর তার সাথে আর এক রাউন্ড চা শেষ করলাম। অন্য দিন ফিরতে আর দেরী হচ্ছিল, তার মধ্যে আজ তাড়াতাড়ি, ভাবলাম একবার ডঃ বারিককে ফোন করি। শনিবার একটু হুড্রু যাওয়ার ইচ্ছে আছে, একটু পরামর্শ করতে পারলে ভালো হতো, স্থানীয় লোক তার ওপর ডাক্তার আমাকে ভালো গাইড করতে পারবেন। তাছাড়া বাংলায় কথা বলার কাউকে পেয়ে আরও ভালো লাগছিল। আমার ব্রাঞ্চের সবাই মোটামুটি নন-বেঙ্গলি, আর আমি হিন্দি একদম সুবিধে করতে পারিনা, বলতে গেলে খালি বাংলা বেরিয়ে যায়, ব্যাঙ্কে তাই আমার গল্পটা একদম জমে না। সুতরাং ফোনটা করেই ফেললাম।

বেশ মিনিট দশেক কথা হচ্ছিল, অবশ্য হুড্রু নিয়ে কথা হয়নি। তারপর হঠাৎ করে ডঃ বারিক বললেন, “এখানে এতো গরম, আপনি মাথার ওপর ফ্যান টা এতো আস্তে রেখেছেন কেন?”

সত্যি খেয়াল করিনি ফ্যানের রেগুলেটর টা দুই এর ঘরে রয়েছে, প্রথমটায় মাথায় আসেনি, এগিয়ে গিয়ে ফ্যান টাকে দুই থেকে চারে করলাম, ফিরে এসে ফোনটা ধরতে ডঃ বারিক আবার বললেন, “আপনি কি ফুল স্পীডে ফ্যান চালান না? সব সময়ে একটু কম করে রাখেন? তাই না! ঠিক আছে, আজ রাখি, কাল আবার দেখা হবে।“

আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি কখন ডঃ বারিক ফোনটা ছেড়ে দিয়েছেন। ডঃ বারিক কি ভাবে জানলেন? তিনি তো ফোনে কথা বলছিলেন! তা হলে কি করে জানলেন ফ্যান দুইয়ে আছে নাকি চারে আছে? ফোন টা হাতে ধরাই ছিল, খেয়াল হতে বুঝলাম অনেকক্ষণ আগে কেটে গেছে, এক নাগাড়ে এনগেজ শব্দ বাজছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন ঘোরালাম, কিন্তু আশ্চর্য! কিছুতেই ফোনটা লাগলো না! প্রায় কুড়ি বার চেষ্টা করলাম কিন্তু না! ডঃ বারিককে পেলাম না, সমানে এনগেজ শব্দ আসছে। কেয়ারটেকার ছেলেটা বলল – এই রকম মাঝে মাঝে নাকি হয়, চার-পাঁচ ঘন্টা ফোন লাইন ডাউন হয়ে যায়, আর মোবাইল ফোনের তো এমনিতেই টাওয়ার নেই।

আর তখন থেকে মনটা কেমন যেন আধা ভয়, আধা বিস্ময় মিশে আছে। এরকম কখন হইনি আগে, কোনদিন শুনিওনি। রাতে ডিনারে চিকেন আর আলু পরোটা হয়েছিল, দুটোই আমার ফেভারিট – কিন্ত খাওয়াটা একেবারে জমল না। খালি মনে পড়ছে ফোনে ডঃ বারিকের কথা। আমার এই সব অশরীরী বা আদি-ভৌতিক ব্যাপারে কোন বিশ্বাস কোন কালেই নেই, ইন্টারেস্টও নেই, ভগবানে বিশ্বাস করি তবে ভুতে একেবারে নয়। তবে আজকে সত্যি একটু ভয় লাগছে। তারপর এই ফাঁকা জায়গা, একেবারে জনমানব শূন্য না হলেও আমাদের বাগবাজারের বাড়ীর মতো নয়, সারা রাত লোকজনের চলার শব্দ শোনা যায় সেখানে। কেয়ারটেকার ছেলেটাকে বললাম আমার ঘরের বাইরে শুতে, ও রাজী হয়ে গেল। আর সেই থেকে জেগে আছি, কিছুতে ঘুম আসছে না।

ডঃ বারিকের কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, ঘুম যখন ভাঙল তখন ভালো করে আলো ফোটেনি। সকালে নানান অফিসের কাজে ডঃ বারিকের কথা খুব একটা মনে পড়েনি। তাছাড়া আজ ও যথারীতি আমাদের ওঙ্কার সাহেব আসেন নি, সুতরাং কাজের মধ্যে কথা বলার কেউ ছিলনা। দুপুরের লাঞ্চের পর একটু বাইরে আসতে হয়, ব্যাঙ্কের মধ্যে সিগারেট খাওয়া যায়না। আর সেখানে ব্যাপার টা আর এক বার মনে পড়ল। আমি অবশ্য কাউকে কিছু বলিনি, সন্ধ্যেবেলা ডঃ বারিকের সাথে দেখা হবে, তখন কথা হবে।

আজ কাজ শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে আটটা হল। প্রায় শেষ করে এনেছি, কাল ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পুরো ব্যাপার টা হয়ে যাবে। তাহলে শনিবার হুড্রু ফলস নিশ্চিন্ত মনে যাওয়া যাবে। অবশ্য জীপ ভাড়া বা অন্যান্য ইনফর্মেশনের ব্যাপারে এখন কিছু কারোর সাথে কোন কথা হয়নি। অনেক ছোটবেলায় বাবার সাথে বেড়াতে এসেছিলাম, সেই স্মৃতি এখন অল্প মনে আছে। ভেবেছিলাম ডঃ বারিকের সঙ্গে এই ব্যাপার টা নিয়ে কথা বলব, কিন্তু কাল রাতে সেও হয়নি।

অফিস থেকে চায়ের দোকানে ঢুকতেই দেখলাম ডঃ বারিককে। পেছনের দিকে একটা বেঞ্চে একা বসে আছেন। ডঃ বারিক কিন্তু খুব সহজ ভাবে আমার দিকে চেয়ে রয়েছেন, আমার মনে একরাশ প্রশ্ন। দোকানের ছেলেটা আমাকে চেনে, চা, বিস্কুট আর সিগারেট নিয়ে ডঃ বারিকের পাশে বসলাম। নিজে থেকেই বললেন – আপনি কি ভয় পেয়েছেন?”

বলার ভঙ্গী সেই খুব মন্থর আর চোখ দুটো ও খুব ক্লান্ত। ভয় যে আমি পেয়েছি কোন সন্দেহ নেই, তবে সেটা ডঃ বারিককে বুঝতে দেওয়া চলবে না। এবারে একটা সিগারেট ধরালেন, তারপর আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, আমি মাঝপথে বললাম, “কাল আমাকে ফোনে যে গুলো বললেন সে গুলো কি করে বলনেন?”

বেশ দশ সেকেন্ডের বিরতি, ডঃ বারিক এক দৃষ্টে বাইরে চেয়ে আছেন, তারপর একটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কথা বললেন, “সিগারেট বেশী খাবেন না, দুটোর বেশী কখনই নয়, ক্যানসার ট্যানসার ওসব বাজে কথা, কিন্তু লাংসটা খারাপ হয়ে যায়।“

আমি কোন কথা বললাম না, তবে সন্দেহ নেই এই সিগারেট বিষয়ক জ্ঞান আমার শুনতে ভালো লাগছিল না, আমার দৃষ্টি বোধহয় প্রখর হচ্ছিল। আর সেটা হয়ত বুঝতে পেরে ডঃ বারিক প্রসঙ্গ বদলালেন, “ইংরাজি তে একটা কথা আছে ক্লেয়ারভয়েন্ট – মানে জানেন?”

এটা আমার জানা প্রশ্ন, কলেজে পড়তে মাসতুতো দাদার সাথে লাইটহাউসে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, আর সেখানেই জেনেছিলাম – “মানে যারা ফিউচারের কোন কোন বিশেষ ঘটনা আগে থেকে দেখতে পান। যত গাঁজা।“

ডঃ বারিক অসম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়লেন, “সমস্যা টা কোথায় জানেন, ব্রিটিশ-রা পুরো ব্যাপার টা না বুঝে না জেনে দুম করে ডিকশনারীতে লিখে ফেলত, আর আমার আপনার মতো লোকেরা সে গুলো ধ্রুব সত্য মনে করে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিলাম। ক্লেয়ারভয়েন্স কোন অলৌকিক ক্ষমতা নয়, না তো এটা কোন ফিউচার টেলিং! এটা একটা সায়েন্স। আজ থেকে হাজার বছর আগে ফ্রেঞ্চ-রা একে বলত ক্লিয়ার ভিশন, মানুষের কোন এক ইন্দ্রিয়ের স্পর্শে তার মনের ভেতর টা পড়ে ফেলা যায়। গাঁজা নয়, প্রচুর রিসার্চ হয়েছে, এটাকে আমরা রিমোট ভিউইং বলি। আসলে আমাদের ইন্দ্রিয় গুলো সব ইন্টার কানেক্টেড, কাজেই একটার স্পর্শ যদি পান আর একটা অন্যটা কে অনুভব করা সম্ভব। ক্লিয়ার ভিশনের নেক্সট স্টেপ হল সিউডোকনসায়েন্স, এর সাহায্যে মানুষের জীবনের কোন ঘটনা যেটা সদ্য ঘটতে চলেছে সেটা কে ও আগে থেকে জানা যায়।“

পুরো ব্যাপারটাই আমার গাঁজাখুরি লাগছিল, আরও কিছু বলছিলেন ডঃ বারিক, মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আপনি কি সেই রকমের ক্লেয়ারভয়েন্ট?”

“একটু আধটু জানি, তবে সকলের মাইন্ড রিড করি না।“

“আমার টা করলেন কেন? আমি কি করতে বলেছিলাম?”

“আমি লজ্জিত এবং দুঃখিত, আপনার অনুমতি না নিয়ে করেছি বলে। কিন্তু কি জানেন আপনাকে দেখে একটা কথা মনে হয়েছিল সেটাকে জানানো দরকার বুঝে এটা আমায় করতে হয়েছিল।“

“কি কথা?”

ডঃ বারিক বেশ খানিকক্ষন বাইরের দিকে চেয়ে রইলেন, আমিও চুপচাপ অপেক্ষায় আছি কি উত্তর আসে! হাতের সিগারেট টা শেষ হয়ে গেছে, শেষ অংশ টা চায়ের ভাঁড়ে ফেলে দিয়ে এবারে খুব শান্ত ভঙ্গী তে বললেন, “আপনি না চাইলে আমার কথা বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু খুব শীঘ্র আপনি একটি বড় ব্যাপারে জড়িয়ে পড়বেন, মানে একরকম আনএক্সপেক্টেড ঝামেলা, আর তাতে আপনি বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠবেন!এমনকি নিউজ পেপারে ও আপনার নাম আসবে। একটু বুঝে শুনে থাকা আর কি? “

“এটা কেমন হল? বলছেন বড়সড় ঝামেলা তে জড়িয়ে পড়ব, তারপর বিখ্যাত হয়ে যাব! মানে কোন খারাপ কাজ টাজ ?” পুরো কথা টা আমি শেষ করতে পারলাম না, সত্যি এবারে ভয় লাগছিল।

আবার ক্লান্ত ধীর গলায় জবাব এলো, “কেন? খারাপ কাজ না করলে কেউ ঝামেলা তে পড়ে না? আর নাকি বিখ্যাত হতে পারে না!”

কয়েক সেকেন্ড আমার মুখে কোন কথা এলো না, তবে ভেতরে ভেতরে যে বেশ উত্তেজনা হচ্ছিল, সেটা বুঝতে পারছিলাম। আসলে কোন অপ্রিয় কথা আমি খুব একটা বলতে পারিনা, তবে এবারে বলে ফেললাম, “ দেখুন এবারে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে! আপনি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন, আমি কিন্তু পুলিশে কমপ্লেন করতে পারি, জানেন?”

“নিশ্চয়ই পারেন” অদ্ভুত ভাবে ডঃ বারিক কিন্তু একই রকম শান্ত আর নিরত্তাপ, “কিন্তু পুলিশে যাবার আগে বেশী দরকার আপনার নিজের ব্যাপারে একটু সচেতন হওয়া। বিদেশে এসেছেন, একটু সাবধানে থাকা, এই আর কি!”

এবারে কিন্তু ব্যাপার টা একটু থ্রেটনিং শোনাল। আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল, ব্যাঙ্কের ইন্সপেকশনের কাজে এসেছি, এই রকম কাজে আগে অনেক বার এসেছি। কোন ঝামেলাতে জড়িয়ে পড়ার কোন সম্ভাবনা বা আশঙ্কা কোনটাই নেই। সুতরাং বেশী কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে উঠে পড়াই আমি ঠিক মনে করলাম। শুধু শুধু উত্তেজনা করছি। হয়ত লোকটার কোন মতলব আছে, আমাকে ইচ্ছে করে উত্তেজিত করছে, তারপর কোন ভাবে ফাঁসিয়ে দেবে। তাছাড়া আমার বাড়ি যাবার সময় হয়ে এসেছে, আর একদিন বাদে আমি ডালটনগঞ্জ ছেড়ে আমি কলকাতা ফিরে যাব। তাছাড়া আমি বরাবর ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপের, উঠে পড়লাম। হয়ত একটু অভদ্রতা হল, কিন্তু কিছু করার ছিল না।

“ঠিক আছে ডঃ বারিক, আমি সাবধানে থাকবো, এখন চললাম, আবার পড়ে দেখা হবে।“

“অমিতাভ বাবু আপনি বোধহয় আমার কথা ঠিক বিশ্বাস করলেন না?”

“না এতে বিশ্বাস – অবিশ্বাস কিছু নেই, আসলে আমি একা মানুষ। এই সব ফিউচারের ব্যাপারে আমার তেমন কোন ইন্টারেস্ট নেই। আপনি বলছেন আমি ফেমাস হয়ে যাব, সে যদি কোন দিন হই তাহলে ভালো!” আর ঠিক বাস টাও সেই সময়ে এসে পড়ল।

ডঃ বারিক এবারে উঠে পড়লেন, খানিক টা আশাহত হয়েছেন বুঝতে পারলাম, যদিও মুখে সে ব্যাপারে আর কিছু বললেন না, “ ঠিক আছে আবার দেখা হবে। আপনার তো বাস এসে গেল!”

ভদ্রতা করে একবার হাত মেলাতেই হল। আমার বাস এসে গেছিল, স্টপেজ টা চায়ের দোকানের সামনেই, কনডাক্টর আমাকে চেনে তাই দেখে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি এগিয়ে গিয়ে বাসে উঠবো, ঠিক এমন সময়ে ডঃ বারিক ধীর, মন্থর গলায় বললেন, “কালকে বোধহয় আপনার আর হুড্রু তে যাওয়া হবে না।“

“মানে?”

“কালকে হুড্রু যাবার প্ল্যান করেছেন তো! বোধহয় হবে না।“

আমার মাথা বনবন করছে, কান বন্ধ হয়ে আসছে, ইতিমধ্যে বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। বেসামাল হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম নেহাত একটি ছেলে আমার হাত টা ধতে ফেলল। হুড্রু ফলসের কথা তো ডঃ বারিকের জানার কোন উপায় নেই, আমি তো কাউকে বলিনি। ব্যাঙ্কের কাউকে নয়, গেস্ট হাউসের কাউকে নয়, এমন কি কোন ট্যাক্সি বা ট্র্যাভেল এজেন্ট কারুর সাথে কথা বলিনি। তাহলে? সত্যি কি আমার সাথে হাত মেলানোর মাঝে আমার মাইন্ড রীড করলেন ডঃ বারিক? কোনমতে একটা সিটে বসলাম। বাসটা একেবারে ই খালি ছিল, নইলে আরো অপ্রস্তুত হতে হত।

গেস্ট হাউসে ফিরে ঘরে ঢুকিনি, সামনের ব্যালকনিতে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম। এরকম কখন হয়নি আগে। ডঃ বারিকের কথা মনে পড়লেই ভয় লাগছে। কি অদ্ভুত উপায়ে তিনি বারবার ঠিক টা মিলিয়ে দিচ্ছেন! সত্যি কি এটা সায়েন্স নাকি কোন অলৌকিক ক্ষমতা? অথচ নিতান্ত সাধারন ব্যাক্তিত্ব, কি রকম মন্থর গতিতে কথা বলেন, অদ্ভুত এক চাহনি, সে চাহনিতে কোন প্রশ্ন নেই, কোন রসিকতা নেই, আবার কোন ধূর্ততাও নেই। তার চেয়েও আশ্চর্য গত দুদিনে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেছি, কখন হাসতে দেখলাম না। এখন এই রকম একজন মানুষের ফিউচার রিডিং – আমি সত্যি ব্যাপার গুলোকে মেলাতে পারছিলাম না! কি কুক্ষণে যে ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হল! কত গুলো সিগারেট খাওয়া হয়ে গেল জানিনা, ডিনার করার একফোঁটা ইচ্ছে নেই। কেয়ারটেকার ছেলেটা দুবার এসে ফিরে গেছে, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে!

পঞ্চম রাত টা কোন মতে কাটল, এক প্রকার না ঘুমিয়ে। কেয়ারটেকার ছেলে টা আজকেও বাইরে শুল, তবে ঘুম হয়নি। রাতে প্যাকিং টা করে ফেলেছি, আর নয়, আজকে আমাকে রাঁচি ছাড়তেই হবে। সন্ধ্যে এবং রাতে দুটো প্যাসেঞ্জার ট্রেন আছে, তাতে রিসারভেশন লাগে না। আজকে ব্রেকফাস্টটাও একদম জমল না। অফিস পৌঁছতে প্রায় সাড়ে নটা হল। যদিও আমার ম্যানেজার এখনো আসেন নি, তবে শুনলাম তিনি আসবেন। ভালই হল, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমার রিপোর্ট টা তৈরি হয়ে যাবে।

ওঙ্কার সাহেব অফিসে এলেন তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা, আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কয়েক টা প্রিন্ট নিচ্ছিলাম, তারপর এক কপি ওঙ্কার সাহেব কে দিয়ে আর এক কপি নিয়ে কলকাতা ফিরে যাব। প্রভীন বলে ওনার এক স্টাফ আমাকে বলল, উনি দেখা করতে চেয়েছেন। যেতেই হল সব কাজ ফেলে। পুরো কথা বার্তা শেষ হতে লাগলো মিনিট তিনেক। কথা হিন্দিতেই হল, “ স্যার, ইন্সপেকশন রিপোর্ট হয়ে গেছে। আর মিনিট দশেক, সব কিছু হয়ে গেলে আমি আজকেই বেরিয়ে পড়ব,”

“নো প্রবলেম, কিন্তু রিসারভেশন পাবেন কি?”

“ও আমি ম্যানেজ করে নেব”

“রিপোর্ট সব ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ, এখানে তো পাবলিক কাজ হয় না, সে রকম ডেভিয়েশন কিছু নেই।“

“বাহ, ভেরি গুড, এদিকে কিছু ঘুরে দেখলেন?”

“না, সে রকম হল না, আসলে বাড়িতে একটু কাজ পড়ে গেছে, তাই আজ ফিরতে হবে।“

“ভালো, তাহলে আমি আপনাকে স্টেশনে ড্রপ করে দেব। আমার আবার হেড অফিসে একবার যেতে হবে। রাস্তায় একটা ভালো রেষ্টুরেন্ট আছে। ওখানে আমরা লাঞ্চ করে নেব। আপনার সাথে তো ভালো করে কথাও বলা হল না। অ্যাট লিস্ট লাঞ্চ টা একসাথে হোক! কতক্ষন লাগবে আপনার পুরো ব্যাপার টা শেষ হতে?”

আমার আপত্তি থাকার কোন কথা ছিল না, এখান থেকে গাড়ি নিয়ে স্টেশন যাওয়া টা আমার পক্ষে একটু অসুবিধাই ছিল, ওঙ্কার সাহেব ছেড়ে দিলে ভালোই হয়।

“এই তো মিনিট পনেরো, ম্যাক্সিমাম! আর একবার গেস্ট হাউসে যেতে হবে, আমার লাগেজ টা নিতে হবে”

“ঠিক আছে আপনি রিপোর্ট টা ফাইনাল করে আমাকে দিন, স্টেশন যাওয়ার রাস্তায় আপনার লাগেজ টা নিয়ে নেব”।

ভালোই হল, মাহিন্দ্রা স্করপিও গাড়ি, ওঙ্কার সাহেব নিজেই চালাচ্ছিলেন, দেখলাম খুব নিয়ম মেনে ড্রাইভ করেন, গাড়িতে উঠেই নিজে সীট বেল্ট লাগালেন, আমাকেও লাগাতে বললেন। এখান থেকে প্রায় ঘন্টা খানেকার রাস্তা, মাঝ পথে আমরা লাঞ্চ করব, তারপর ওঙ্কার সাহেব আমাকে স্টেশনে ড্রপ করে দেবেন। গেস্ট হাউস থেকে মাল পত্তর নিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে বারোটা হয়ে গেলে। ওঙ্কার সাহেবের সঙ্গে একটা ছোট ব্রাউন কালারের ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগের থেকে আর একটু ছোট, সে ব্যাগ নিয়ে আমি ওনাকে আগেও অফিসে আসতে দেখেছি। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে খানিক টা এগোনোর পর দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল, জন বসতি প্রায় নেই বললেই চলে।

আর হঠাৎ করে একটা ঘটনা ঘটল যেটার জন্য আমি একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না। আমার মাথার পেছনে যেন একটা প্রচন্ড জোরে হাতুড়ির ঘা পড়ল, আর আমার কিছু মনে নেই। জ্ঞান যখন ফিরল, তখন কটা বাজে জানিনা, তবে এটা যে একটা হসপিটাল সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না। সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একজন ডাক্তার সেটাও বেশ বুঝতে পারছি। জ্ঞান এসেছে দেখে তিনি আমাকে তিন চারটে প্রশ্ন করলেন। আমার সব কিছু ঠিকঠাক মনে পড়ল। খালি স্টেশন যাওয়ার রাস্তায় মাথায় চোট লাগার পর কি হল সেটা একেবারে মনে নেই। ডাক্তার ভদ্রলোক বেশ ভালো বাংলা বোঝেন, বলছিলেন ও তবে একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা – নাম ডঃ বিনয় কুমার।

শুনলাম প্রায় ঘণ্টা চারেক আমি অজ্ঞান হয়ে ছিলাম, অবশ্য সেই রকম বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। যেটা বুঝলাম, ঘটনা টা একটা কার অ্যাক্সিডেন্ট। প্রথমে টায়ার পাঙ্কচার তারপর ড্রাইভারের ভুল। সব নিয়ে গাড়ি রাস্তা থেকে নিচে নেমে যায়, স্থানীয় কিছু লোক আমাকে এখানে নিয়ে আসে, আমার আইডেন্টিটি চেক করে ব্যাঙ্কে খবর করেন ডঃ কুমার। আমার লাগেজ টা গেস্ট হাউসে নিয়ে গেছে, আর দুচার জন এখন বাইরে অপেক্ষা করছে। আমার শরীর তেমন কিছু জখম হয়নি, মাথায় তিনটে স্টিচ হয়েছে, কয়েক টা রিপোর্ট এসে গেছে, আর কয়েক টা হবে। আমার শরীরে সে রকম কোন প্রবলেম নেই, তবে মাথা টা তুলতে গিয়ে বুঝলাম সেথানে চোট টা বেশ ভালো ই লেগেছে। তবে ডঃ কুমার বললেন ইন্টারনাল কোন ইনজুরি হয়নি, সুতরাং সে রকম চিন্তার কিছু নেই। যদি সব কিছু নর্মাল থাকলে হয়ত ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ওনারা আমাকে ছেড়ে দেবেন।

দুচারটে এলো মেলো কথার পরেই আমার হঠাৎ করে মনে পড়ল, ওঙ্কার সাহেবের কথা। তিনি কেমন আছেন? কথাটা জানতে চাইলে ডঃ কুমার যেটা বললেন সেটা আমার কাছে একটা মস্ত বড় ধাক্কা ছিল, “হি ওয়াস কিল্ড! মাথায় খুব ব্লিডিং হয়েছে বাঁচানো যায় নি। গাড়ি থেকে বডি টা অলমোস্ট পনের ফুট দূরে ছিটকে পড়েছিল।“

আর কিছু বলছিলেন ডঃ কুমার, তবে বেশির ভাগ কথা-ই আমার কানে ঢুকছিল না। হয়ত ভয় আর বিস্ময় দুটোই মুখে প্রকাশ পাচ্ছিল, আর সেটা দেখে ডঃ কুমার প্রসঙ্গ পালটিয়ে বললেন, “খুব শকিং বুঝতে পারছি, বাট কিছু করার নেই। ভগবানের অনেক আশীর্বাদ আপনার ওপর, নাহলে ইউর কো-প্যাসেঞ্জার ওয়াস কিল্ড কিন্তু আপনি মোটামুটি অক্ষত!

“পুলিশ এসেছিল?” কেমন একটা স্বগতক্তির মতো কথাটা বেরোল আমার মুখ থেকে।

“হ্যাঁ, ওরা তো জানবেই, এখন হয়ত বডি পোস্টমরটেম করবে। এদিকে শুনলাম ওনার বাড়ি তে নাকি কনট্যাক্ট করা যায়নি“

“পুলিশ আবার আমাকে নিয়ে কিছু টানাটানি করবে নে তো!”

“কেন? আপনি কি করবেন? আপনি তো অ্যাক্সিডেন্টের ভিকটিম, লাস্ট চার ঘন্টা আপনি সেন্স লেস ছিলেন, আপনার তো জানার কথা নয়! তাছাড়া আমাদের এখানকার লোকাল ওসি খুব ভালো লোক। আপনাকে কোন প্রবলেম করবেন না!”

ডঃ কুমার উঠে যাচ্ছিলেন, ঘুরে দাঁড়ালেন। “হ্যাঁ, আর একটা কথা, একটা ব্রাউন কালারের ব্যাগ স্পট থেকে আনা হয়েছে, সেই টা আপনার গেস্ট হাউসে পাঠানো হয় নি,”

“ও টা তো ওঙ্কার সাহেবের”

“সে আমি জানি না, আপনি যাবার সময় ওটা নিয়ে যাবেন, আপনার বেডের পেছনে রাখা আছে।“

খটকা একটা লেগেছিল, তবে শক টা কাটিয়ে উঠে সেটা বলা হলনা, ওঙ্কার সাহেব কে আমি নিজে সিট বেল্ট লাগাতে দেখেছি, তাহলে গাড়ি থেকে পনের ফুট দূরে ছিটকে পড়লেন কেমন করে?

হসপিটাল থেকে ছাড়া পেতে সন্ধ্যে সাত টা হয়ে গেল, মনে একরাশ ভয়, শঙ্কা আর আঘাত, সব নিয়ে প্রথমে পুলিশ স্টেশনে যাওয়া মনস্থির করলাম। পুলিশের ওসি বাঙালি, একবার হসপিটালে দেখা হয়েছিল, উনি আসতে বলেছিলেন। হয়ত স্টেটমেন্ট নেবেন, তা ছাড়া ওঙ্কার সাহেবের ব্যাগটার একটা গতি করতে হবে। ব্যাগে হয়ত কোন দরকারি জিনিস আছে, সেই গুলো ঠিক জায়গায় পৌছনো দরকার। হসপিটালের বাইরে একটা পুলিশের জীপ দাঁড়িয়ে ছিল, তারাই আমাকে থানায় নিয়ে গেল।

পুলকেশবাবু পুলিশের ওসি, রাচিঁ তে বড় হয়েছেন, তারপর চাকরীর সুত্রে এখানে, সুন্দর বাংলা বলেন। দেখলাম সত্যিই ভালো লোক, দু চারটে কথার পর আমার স্টেটমেন্ট নেওয়া হল। পুলিশ স্টেশনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম, তবে বাজে কোন প্রশ্নের সামনে আমাকে পড়তে হয়নি। আমাদের আলোচনা যখন প্রায় শেষ তখন মনে পড়ল ওঙ্কার সাহেবের ব্যাগের কথা। হাতে ধরাই ছিল, “এটা ওনার ব্যাগ, আমার সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়েছিলেন, হয়ত কিছু দরকারি জিনিস পাবেন।“ পুলকেশবাবু কে ব্যাগ টা দিয়ে আমাকে আর একটা অন্য ঘরে যেতে হল, কোথায় নাকি সই করতে হবে। মিনিট দুয়েক পেরোয় নি, পুলকেশ বাবু ফিরে এলেন, গলায় অসম্ভব উল্লাস, “মিঃ ঘোষ আপনি এই ব্যাগ টা পেলেন কোথায়?”

“এটা নিয়ে তো ওঙ্কার সাহেব বেরোলেন আমার সঙ্গে হেড অফিসে যাবেন বলে”

“আপনি জানেন এর মধ্যে কি আছে?”

আমার জানার কথা নয়, পুলকেশ বাবু সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “অ্যান্টিক কয়েনস, পুরোনো কারেন্সি, দুস্প্রাপ্য জিনিস, ভ্যালুয়েশন করলে হয়ত ষাট – সত্তর লাখ ছাড়িয়ে যাবে।“

“মানে?”

“মানে – আপনার ম্যানেজার ওঙ্কার নাথ ওয়াস এ ক্রিমিনাল, আর আমার কাছে দিস ওয়াস টোটালি আনএক্সপেক্টেড। আমাদের কাছে খবর ছিল, কিন্তু এ যে সেই লোক সেটা বুঝতে পারিনি! কতবার দেখা হয়েছে কিন্তু কখন বুঝতে পারিনি হি ক্যান বি সো ডেঞ্জারাস !”

আমার মুখে কোন কথা আসছিল না, মাথার ভেতরে সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল, শুনতে পারছিলাম পুলকেশ বাবুর গলা – “মিঃ ঘোষ থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী মাচ! মনে হচ্ছে আপনার ইন্সপেকশনের সময়ে ও খানিক টা প্যানিক হয়ে জিনিস গুলো সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, আর ঠিক সময়ে ঘটনা টা ঘটল। মিঃ ঘোষ আপনি জানেন না, আপনি কি ভাবে আমাদের হেল্প করলেন!” আরও অনেক কিছু বলছিলেন পুলকেশ বাবু, আমার আর শুনতে ভালো লাগছিল না! আমি থানা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কলকাতার ঠিকানা আর ফোণ নাম্বার অবশ্য রেখে আসতে হল।

থানা থেকে বেরিয়ে মাথায় আসছিলনা কি করব? প্রায় সাড়ে আটটা হয়ে গেছে, তবে সময়ের আর হিসেব নেই, এতো গুলো ঘটনা শেষ পাঁচ – ছয় ঘটনায় হল, তারপর মাথা আর কাজ করছিল না, মাঝে ডঃ বারিকের কথা বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে, এবারে আরও বেশী করে মনে হল। কাল যা যা বলেছিলেন প্রায় সব কটা কথা মিলে গেছে, এত বড় ঘটনায় কখন আগে এভাবে জড়িয়ে পড়িনি, ওনার সঙ্গে দেখা করা টা খুব জরুরী! ফোন নাম্বার টা আমার পার্সের মধ্যে ছিল, কাছেই একটা এসটিডি বুথ থেকে ফোন করলাম। এক বারে লেগে গেল, সেই পরিচিত ক্লান্ত কণ্ঠস্বর – “বলুন মিঃ ঘোষ!” দু একটা কথার পর বুঝলাম তিনি সব-ই জানেন। একবার দেখা করার ইচ্ছে ছিল, বললাম, “আপনার সাথে একবার দেখা হতে পারে?”

“নিশ্চয়ই! কিন্তু এখন তো হবে না! খুব দরকারি একটা কাজে ধানবাদ যেতে হবে! কাল কে আপনি কখন ট্রেন ধরবেন?”

“সকাল সাতটা পনের তে একটা হাওড়া প্যাসেঞ্জার আছে, সেটাই ধরব ইচ্ছে আছে!”

“ঠিক আছে আমি স্টেশনে আসব, আপনার ট্রেন ছাড়ার আগে দেখা হবে!”

ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করতে হল, “কোন অসুবিধা হবে না তো!”

“না, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আসব”

আজ রাতে ঘুমাতে অসুবিধা হল না! কেয়ারটেকার ছেলেটি দেখলাম সব-ই জানে, ছোট জায়গা খুব-ই স্বাভাবিক, সে ও বেশী কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মাথায় অল্প যন্ত্রণা ছাড়া আর কোন সমস্যা আমার ছিল না! তবে মনের ভেতরে ভয় ঢুকে গেছে, সেটা কবে কাটবে জানিনা! জিনিস পত্র গোছানো ছিল, পরদিন সকালে রেডি হয়ে বেরোতে সময় লাগলো না।

ডঃ বারিক এলেন তখন প্রায় ছটা – পঞ্চান্ন, ট্রেন ছাড়তে বেশী দেরী নেই, আমি একটা বসার জায়গা পেয়ে গেছিলাম! একজন কে বলে ট্রেন থেকে নামলাম ডঃ বারিকের সাথে দেখা করব বলে। একটি স্থানীয় নিউজ পেপারে কালকের খবর টা বেরিয়েছে, আমার নাম নাকি বেরিয়েছে। ডঃ বারিক এক কপি আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। দু চারটে কথার পর আমি সোজাসুজি ডঃ বারিক কে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি তো কথা বলে মানুষ কে চিনতে পারেন! ওঙ্কার নাথ যে ক্রিমিনাল সেটা বুঝতে পারেন নি?”

“খুব পেরেছিলাম!”

“তাহলে কিছু বলেন নি কেন?”

“কি করে বলি বলুন তো! পুলিশ তো আমার কথা বিশ্বাস করতো না! তাছাড়া আমার কাছে কোন প্রমান ও ছিল না! তাছাড়া আমাকে এখানে সবাই চেনে, তাতে অনেক সমস্যা ছিল। যা হোক যা হয়েছে ভালোই হয়েছে!”

“সত্যি করে একটা কথা বলবেন?”

“নিশ্চয়ই!”

“কয়েক টা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগছে, গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে ওঙ্কার নাথ মারা গেলেন কিন্তু গাড়িটার সে রকম কিছু হলনা! তারপর ড্রাইভার মারা গেলেন কিন্তু আমি মোটামূটি অক্ষত! তার চেয়েও আশ্চর্যের কি জানেন? আমি নিজে ওঙ্কার সাহেব কে সিটবেল্ট লাগাতে দেখেছি, তাহলে তিনি গাড়ি থেকে পনের ফুট দূরে ছিটকে পরলেন কি করে? আপনি তো ক্লেয়ারভয়েন্ট! আপনি এটা বুঝতে পেরেছিলেন?”

“শুধু বোঝা নয়। আমি জানি!”

“আপনি জানতেন?”

ডঃ বারিকের দৃষ্টি এবারে অনেক দূরে, আমার দিকে তাকালেন না, তবে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।

“কি হয়েছিল অ্যাকচুয়ালী?”

বেশ চার পাঁচ সেকেন্ড বাদে বেশ আস্তে তবে বেশ কাটা কাটা ভাবে ডঃ বারিক বললেন, “গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি, ওঙ্কার নাথ কে মেরে ফেলা হয়েছে!”

“মানে?”

“প্ল্যান্ড মার্ডার! মার্ডারার আগে থেকেই গাড়ি তে লুকিয়ে ছিল, আপনাকে মাথায় মেরে অজ্ঞান করা হল! আপনি আগের রাতে ঘুমননি, তাই টায়ার্ড ছিলেন, আপনাকে অজ্ঞান করা টা অনেক সহজ ছিল। তারপর ঐ একই আয়রন রড দিয়ে ওঙ্কারবাবু কে মাথায় মারা হল! গাড়ি তো আগেই থেমে গেছিল, অ্যাক্সিডেন্ট হবে কি করে? পোস্টমরটেম হলে সব বেরোবে।“

“আর গাড়ি টা যে রাস্তা থেকে নেমে গিয়েছিল!”

“সে তো অনেক পরে! গাড়ি টাকে ধাক্কা মেরে নামানো হল, তাতে যত টুকু ড্যামেজ হয়েছে!”

“মার্ডার যদি হবে তবে অত অ্যান্টিক জিনিস সে নিয়ে গেল না কেন?”

“হয়তো সমাজসেবা!”

“আপনি জানেন? কে করেছে?”

আবার কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, তার পর সেই অতি পরিচিত সম্মতিসূচক মাথা নাড়া, তার পর বললেন – “এবারে উঠে পড়ুন, আপনার ট্রেনের সিগন্যাল হয়ে গেছে!”

আমি ট্রেনে উঠে পড়লাম, শেষ বারের মতো হাত মেলালেন ডঃ বারিক, তারপর বললেন – “সমাজ বিরোধী কে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া তো সমাজ সেবা! এই রকম সমাজ সেবা আমি অনেক করেছি, এটা নিয়ে সাতাশী হয়ে গেল! সরি আপনার মাথায় একটা মারতে হয়েছিল, না হলে কাজ টা করা হতো না!”

“মানে! আপনি?”

ডঃ বারিক কে আমি প্রথম হাসতে দেখলাম, হাসলে একজন মানুষ কে দেখে যে এতো ভয় লাগতে পারে সেটা আমি জানতাম না! কোন উচ্চ বা অট্ট হাসি নয়, চোখে আর মুখে এক অদ্ভুত ক্রুর পাশবিক চাহনি আর ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা একটা রক্ত হিম করা হাসি! আগে কত বার কথা বলেছি কিন্তু কখন এমন দেখিনি। আশ্চর্য ক্ষমতায় আবার তিনি আমার মনের ভেতর টা আর একবার পরে ফেললেন, আমার প্রশ্নের উত্তর টা এখন পেলাম – “ কিছুটা ক্লিয়ার-ভিশন আর কিছুটা প্ল্যানিং, তবে অমিতাভ বাবু, আপনি কিন্তু কিছুই শোনেন নি, কিছুই জানেন না!”

আমার পেটের ভেতর টা খালি হয়ে আসছে, কথা বলার শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, ইতি মধ্যে ট্রেন টা ছেড়ে দিয়েছে, এখন একদৃষ্টে পলকহীন চক্ষে ডঃ বারিক আমার দিকে চেয়ে আছেন। তবে আমাদের মধ্যে দূরত্ব টা আস্তে আস্তে বাড়ছে!

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮