• বিজয় ব্যানার্জি

গল্প - জগার খিচুড়ি


জানতাম, আজকের দিনটা খারাপ যাবেই! যেতেই হবে!

একটা হুমদো দাঁড় কাকের আওয়াজে অসময়ে ঘুমটা দুম করে ভেঙ্গে গেল। ওর মুখটাই তো আজ দেখেছি সবার আগে! নচ্ছার একটা। আর কোন জানলা পেলি না! তখনই ঠিক বুঝেছি, আজ কপালে দুঃখ আছে। নেহাত পাশ ফিরে শুয়ে বউয়ের মুখটা দেখেছিলাম বলে তাই, নইলে তো এতক্ষণে হয়ে গেছিল আর কি!

অফিস টাইমে ব্যাস্ত গাড়ি ঘোড়ার মাঝখানে কলার খোসায় পা হড়কে ফ্ল্যাট হবার পরেও বেঁচে আছি! উফ! চাট্টিখানি কথা! বউয়ের মুখটা ঝট করে মনে পড়ে গেল। দেখি, আজ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা গোলাপ কিনে নিয়ে যাবো না হয়। সে সব তো না হয় হবে, কিন্তু আদৌ কি আর অফিস যাওয়া যাবে আজ? ইস্ত্রি করা জামা প্যান্টে ধুলো কাদা লেগে একেবারে যা তা অবস্থা! ইশ! আবার বাড়ি যাও, স্নান কর, কাপড় চোপড় পাল্টাও…ধ্যাত! দিনটাই পুরো ভেস্তে গেল। থাক, গোলাপের প্ল্যানটা বরং কাল বিকেলেই করব। তাই করতে হবে। এই ল্যাজেগোবরে অবস্থায় তো আর গোলাপ হাতে নিয়ে বাড়ি ঢোকা যায় না!

বাঁ হাতটায় বেশ লেগেছে বুঝতে পারছি। ঐ হাতেই তো ভর দিয়েছিলাম পড়ে যাওয়ার সময়। ভাঙল নাকি? ডাক্তার দেখাবো? না থাক বাবা! ঢুকলেই তো পাঁচশর নীচে বেরোতে পারব না। তার ওপর এই টেস্ট, সেই টেস্ট, এক্সরে, ওষুধ, প্লাস্টার। হয়ত রক্তও নেবে। দরকার নেই। এমনিতেই দিনটা খারাপ যাচ্ছে। আর বিপদ বাড়িয়ে লাভ নেই। বউকে বরং বলব একটু তেল হলুদের মলম লাগিয়ে দিতে। ও এইসব টোটকাগুলো ভালোই জানে।

ঈষৎ খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটছি আর নিজের কপালকে সমানে গাল মন্দ দিচ্ছি। দাড়ি কাটতে গিয়ে গালটা কাটল। সকাল সকাল রক্তপাত। তখনই জানতাম আজ ঝামেলা হবে। কোন মানে হয়! অফিসে তাড়াতাড়ি পৌঁছব ভেবেছিলাম। কাল ইনডিয়া গোহারান হারিয়েছে পাকিস্তানকে। অমলের নিশ্চয়ই মন ভালো আজ। মুডে থাকলে ভাল খাওয়ায় ছেলেটা। মিস হল। যাক, কি আর করা যাবে। তাও তো ভাগ্য ভালো বলতে হবে, ল্যাপটপের ব্যাগটা অন্য হাতে ধরেছিলাম। ওটা ভাঙ্গা মানেই তো…নাহ! ওটার কোন অমঙ্গলের কথা ভুলেও যেন কখনো মনে না আসে। ওই ল্যাপটপটার মধ্যে যা আছে, সেগুলো যে আমার জীবন, সংসার, দায় দায়িত্ব এগুলোর থেকে অনেক বেশি মূল্যবান, সেটা বুঝি বলেই তো অফিসের বড় চেয়ারে বসতে পেরেছি। কিন্তু সে যাই হোক, অমলের খাওয়াটা মনে হচ্ছে মিস হল। যাকগে, কাল দেখবো। এখন বাড়ি যাই।

ভাবছি কি করি। বাসের জন্য দাঁড়াব নাকি ট্যাক্সি নেব? অবশ্য, ট্যাক্সির যা ভাড়া বেড়েছে আজকাল! আর তার ওপর যদি ঘুড়িয়ে ঘাড়িয়ে নিয়ে যায়! কোন তো বিশ্বাস নেই এদের। তাছাড়া, বউ বলছিল কালকে বেশ অনেকটা দূরে একটা বিয়ে বাড়ির নেমন্তন্ন আছে। তখন তো ট্যাক্সি করতেই হবে। না থাক। বাসেই যাই এখন। নেমে তো একটুখানি হাঁটা। ও ঠিক ম্যানেজ করে নেব। বাইক একটা কিনলে হয় অবশ্য। বউ তো উঠতে বসতে বলেই চলেছে। কিন্তু, ও তো বলেই খালাশ। মাস গেলেই যখন ইএমাই এর গুঁতো শুরু হবে, সেটার জোগাড় তো আর ওকে করতে হচ্ছে না। কিন্তু কে বোঝে সে সব কথা! আর আমার বউটাও হয়েছে বলিহারি একটা! বিয়ের আগে নার্সিং এর ট্রেনিং নিয়েছিল। ভালো। ভেবেছিলাম বিয়ের পর চাকরি করবে। কোথায়! তার নাকি আমার নার্সিং করতে করতেই আর সময় থাকে না। আশ্চর্য! সারাটা দিনে ওর কাজটা যে ঠিক কি, সেটাই তো আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারলাম না। এত কিসের ব্যাস্ততা সবসময়? ধুস! ওজুহাত, সব ওজুহাত। আমি ভালো করেই জানি। আরামের জীবনের অভ্যাস হয়ে গেলে কেউ কি আর গতর খাটাতে চায়? ভুলটা কিন্তু আমার নয়। কুষ্ঠী মেলেনি আমাদের। আমি রাজীও ছিলাম না। কিন্তু বাবা মা মিলে এমন করল না, যেন পৃথিবীর শেষ মেয়েমানুষ হল এই মেয়ে। আমার তো আজও সন্দেহ হয়, মেয়ে দেখার দিন মিষ্টিতে নিশ্চয়ই কিছু মিলিয়ে দিয়েছিল ওরা।

বাস চলে এল। আরে দাঁড়া রে বাবা! আগে উঠি! দেখছিস না চোট পেয়েছি, ঠিক মত চলতে পারছি না? বলি, সবসময় তোদের এত তাড়া কিসের রে? রোজকার এই এক বাঁধা ধরা নাটক হয়েছে। ধুর! আর ভালো লাগে না। তোদের ওপর এই যে রাগটা রোজ রোজ পুষে যাই না, এটাই অফিসে গিয়ে অন্যদের ওপর ঢালি, বুঝলি। বেশি কিছু তো করার নেই। ওই, টুকটাক। ফাইল চেপে রাখি। চা খেয়ে, পান খেয়ে সময় কাটাই। দোষটা আসলে তোদের, কিন্তু নামটা খারাপ হয় কার? গালিগালাজটা খায় কে? এই শর্মা। বাঃ! কি সুন্দর! সাধেই কি আর বলে, ঘোর কলি! সে তো বটেই, নইলে এই যে প্যাসেঞ্জার গুলো, চোখ টেরিয়ে দেখছে আমায়। সবাই কিন্তু বুঝতে পারছে কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে আমার। ঠিক করে দাঁড়াতেই তো পারছি না। তার ওপর হাতে ভারী ব্যাগ। তাছাড়া, জামা কাপড়ও নোংরা হয়ে আছে। কিন্তু ব্যাস, ওই একবার একটু টেরিয়ে দেখে নেওয়া। ভুরুটা একটু কোঁচকানো। ওইটুকুই। একটা কেউ উঠে দাঁড়িয়ে একবার বলছে না, ‘আপনি বসুন’।

বাসটা সজোরে ব্রেক কষল। একে ওপরের ওপর হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম। আবার বাঁ হাতটায় ব্যাথা পেলাম। কাঁতরে উঠলাম। কিন্তু তাতে কারোর কিছুই যায় এলো না। সহানুভূতির তো প্রশ্নই উঠছে না, উল্টে, যে মহিলার ওপর টাল খেয়ে পড়েছিলাম, সে এমন ভাবে তাকিয়ে দেখল যেন…ছিঃ! কি ছোট মন না মহিলার! আর তাছাড়া, সে বয়স কি আর আছে আমার? অবশ্য বয়স যখন ছিল, তখনও যে কিছুই করে উঠতে পারিনি, সেটা অন্য কথা। বিদ্যুতের মত রিনার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। ‘তুমি একটা কাপুরুষ। একটা জানোয়ার’! নিজের অজান্তেই বাঁ হাতটা বাঁ গালে চলে গেল। ঠিক সেই দিনের মত। থাপ্পড়ের রেশটা আবার অনুভব করতে পারলাম। ‘দাদা, সাইড দিন। নামব’। সম্বিৎ ফিরে পেলাম। সামনের সীটের লোকটা উঠছে। যাক বাবা! অবশেষে বসার সুযোগটা এল। তার থেকেও বড় প্রাপ্তি, রিনার চিন্তাটা মাথা থেকে গেল, এখনকার মত।

জানলার বাইরে তাকিয়েই হেঁচকি খেলাম। বিশাল বড় হোরডিঙ্গে বড় বড় হরফে লেখা আছে এক আশ্চর্য আবেদন। ‘বাঙালী কি তার পৌরুষ হারিয়েছে? আপনার মতামত হ্যাঁ অথবা না লিখে এসেমেস করুন ৫২০৪৫’। অদ্ভুত তো! এর মানে কি, অ্যাঁ? কারা জানতে চায় এই সব? কি সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার! আমার পৌরুষকে প্রশ্ন? আসে পাশের কয়েকজনও ওটা দেখেছে। ব্যাস, আর যায় কোথায়! গজ গজ গুন গুন শুরু হয়ে গেল। কানের চারপাশে যেন মশা ঘুরে বেড়াতে শুরু করল। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। সবারই উত্তরই ‘না’, মানে বাঙালী তার পৌরুষ হারায়নি। মনটা বেশ উৎফুল্ল হল। এইতো, সবাই এখনও একই নৌকায় আছি। একটা মেয়ে দেখি মুখ টিপে হাসছে! ঝাঁ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। মনে হল ওর শাড়ীটা এখনই টেনে ছিঁড়ে দিয়ে বাসের সব পুরুষগুলোকে লেলিয়ে দিই। একটা অল্প বয়সের ছোকরা বোধহয় ‘হ্যাঁ’ বলতে চাইছিল। তাকে তো সবাই ‘এই শালা’ বলে প্রায় এই মারে, কি সেই মারে। ভেতরটা কিন্তু হটাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল। যদি একজনেরও উত্তর সত্যি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলেই তো কেলেঙ্কারির শুরু! ফাটলটা ধরবে! যাকগে যাক। এসব নিয়ে ভেবে কাজ নেই। স্টপ এসে গেছে। নেমে পরলাম।

এবার কিন্তু মনে হচ্ছে কোমরটাতেও একটু টান ধরছে। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছি না তো? রোঁদটাও আবার খুব চড়া। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। একটু বমি করলে ভাল হত বোধহয়। বেল বাজালাম। দাঁড়িয়ে থাকতে সত্যি কষ্ট হচ্ছে এবার। এখনও খুলছে না কেন? কি যে করে বউটা সারাদিন! নিশ্চয়ই টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। আবার বেল বাজালাম। দরজা খুলল এক মহিলা। আমার চোখ ততক্ষণে ঝাপসা। ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কে। কিন্তু মনে হল নতুন কেউ। এ আবার কেডা? ভুল বাড়িতে বেল বাজাইনি তো! ‘কে রে, মালতি?’ ভেতর থেকে আওয়াজ এল। ওই তো, আমার বউয়ের গলা। শাড়ীর কোঁচায় হাত মুছতে মুছতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল আমার বউ। আমার অবস্থা দেখে হাউ মাউ করে উঠল। আমিও আর পারছিলাম না। দরজার সামনেই বসে পরলাম। চোখ বন্ধ হয়ে এলো। বোধহয় মরে গেলাম। ভালোই। এবার শুধু অপ্সরার নাচ দেখা।

ভুলটা ভাঙল চোখ খুলে। অপ্সরার জায়গায় বউয়ের মুখ। অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখলাম। অন্ধকার। দেওয়াল ঘড়িতে দশ’টা চল্লিশ। সেই দুপুর থেকে এতক্ষন ঘুমিয়েছি! সারা শরীরে একটা হাল্কা ব্যাথা মত। মাথাটা ভাড় হয়ে আছে। হটাৎ মনে পড়ল ঐ অচেনা মহিলার কথা। মালতি না কি যেন নামটা। জিজ্ঞেস করতে যাব, তার আগেই বউ মুখ খুলল। ‘রিনা কে?’ থমথমে গলায় ছোট্ট প্রশ্ন। মাথাটা দপ করে উঠল। ও কি করে জানল! ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। ‘ঘুমের ঘোরে শুধু ঐ নামটাই জপে গেছ। আরও অনেক কিছু বলেছ’। প্রায় সাপের মত হিস হিস করে কথাগুলো ওর মুখ থেকে বেড়িয়ে এল। আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। চোখের পাতা পড়ছে না। কিছু বলতেই যাচ্ছিলাম। হটাৎ, ঠাস! আগুনের গোলার মত বউয়ের ডান হাত আমার বাঁ গাল ছুঁয়ে গেল। মাথাটা সাংঘাতিক রকম বন বন করে উঠল। আমার বুকের ওপর ওর হাতের লাল চুড়ির কয়েকটা টুকরো এসে আছড়ে পড়ল। কিছু বুঝে ওঠবার আগেই বউ আমার মুখের ওপর সজোরে একটা বালিশ চেপে ধরল। এত শক্তি ওর গায়ে! কোনোদিন বুঝিনি তো এর আগে! আমি বেসামাল হয়ে প্রাণপণে হাত পা ছুঁড়ছি শুধু। আর কিছুই করতে পারছি না। আমার বুকের ওপর দুদিকে পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে বউ। বালিশটা আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে আর উন্মাদের মত চিৎকার করে চলেছে - ‘একটা কুমারী মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তারপর আমার কাছে সতীপনা দেখানো?’ বুঝতে পারলাম আজ আমার শেষ। ‘রিনাকে তুই মেরেছিস, হারামজাদা। ওর পেটে তোর বাচ্চা ছিল।’ হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। ‘তুই আমায় মা হতে দিস নি।’ আর বেশিক্ষণ শ্বাস ধরে রাখতে পারবো না। ‘একটা জীবন নষ্ট করে শখ মেটেনি না, জানোয়ার! আমার জীবনটাও নষ্ট না করলে হত না?’ শেষ শ্বাসটা গলার কাছে এসে গেছে বুঝতে পারলাম। ‘তোর ঐ ন্যাকা ন্যাকা পৌরুষের মুখে থু। আর যাবার আগে শুনে রাখ, নতুন কাজের দিদির বর রাজী হয়েছে। মা আমি হবই। তোর আর দরকার নেই।’ আর পারলাম না। স্পষ্ট দেখলাম রিনা ফ্যান থেকে ঝুলছে। মাথাটা একদিকে হেলান। জিব বেড়িয়ে। লালা ঝড়ে পড়ছে। চোখ দুটো টকটকে লাল। দুহাত বাড়িয়ে আমায় ডাকছে।

‘এই, কি হয়েছে? এমন করছ কেন? এই!’ ঝাঁকানি খেয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। ‘কি হয়েছে কি? গোঙাচ্ছ কেন?’ বউয়ের মুখটা চোখের সামনে। চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে আকুল ভাবে তাকিয়ে আছে। শাড়ীর কোঁচা দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিল। বুঝলাম কুলকুল করে ঘেমে গেছি। সারা শরীর ভিজে গেছে। ‘কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকব?’ আমার কথা বেরোল না। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। জিব দিয়ে ঠোঁটটা চাটতে গেলাম। একেবারে শুকনো। ‘জল খাবে?’ শুন্য চোখে তাকালাম বউয়ের দিকে। ‘জল খাবে?’ বোধহয় মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম। বউ মশারী উঠিয়ে ছিটকে চলে গেল জল আনতে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ঘাড় ঘুড়িয়ে জানলার দিকে তাকালাম। ভোরের আলো সবে বেরিয়েছে। দেওয়াল ঘড়িতে পাঁচটা কুড়ি। জলের গ্লাস। চোঁ করে এক ঢোকে সব জল খেতে গিয়ে জোরে বিষম লাগল। বউ মাথায়, পিঠে আলতো করে চাপড় দিয়ে দিল। কাশিটা আস্তে আস্তে থামছে। বউ জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে আমার বুকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবার জানতে চাইল, কি হয়েছে। একটু ধাতস্ত বোধ করলাম এতক্ষণে। শরীরের সব শক্তি জড়ো করে গলা দিয়ে আওয়াজ বার করলাম। ‘কিছু না। বাজে স্বপ্ন।’ বউ স্নিগ্ধ হেঁসে আদর ভরে ওর বুকে আমার মাথাটা টেনে নিল।

সোফায় বসে চা খাচ্ছি। আজ সোমবার। কাগজে রাশিফলটাতে চোখ বুলিয়ে মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। লিখেছে, আপনার প্রিয়জনের স্বপ্ন আজ সফল হবে। মনে মনে ছক কষে নিলাম। আজ আর অফিস যাবো না। নতুন এক কাজের মহিলা ঘর মুছছে। হটাৎ বুকের ভেতরটা কেমন যেন পাক দিয়ে উঠল। মহিলাকে কোথায় যেন দেখেছি মনে হচ্ছে। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে স্থিরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, মালতি। সজোরে ধাক্কা খেলাম একটা। নির্বাক হয়ে সোফায় বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। রান্নাঘর থেকে বউয়ের গলা। ‘মালতি, ওদিকটা তাড়াতাড়ি করে আয় এদিকে। দাদার টিফিনটা বানাতে হবে না? বেরোতে নইলে দেরী হয়ে যাবে তো।’ অফিস যাবো না বলতে গিয়েও বললাম না। হটাৎ খুব ক্লান্ত লাগছে। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলাম। ঘুম ভাঙল বউয়ের গলার আওয়াজে। ‘এই শুনছ। ন’টা বেজে গেছে কিন্তু। অফিস যাবে না?’ বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে করার চেষ্টা করলাম শেষ কবে ও আমাকে অফিস যাবার জন্য তাড়া দিয়েছিল। কলিং বেল বাজল। মনে হল বউ যেন একটু বেশি রকম হন্তদন্ত হয়ে দরজার দিকে গেল। শোবার ঘর থেকে দেখা যায় দরজাটা। একটা মাঝ বয়সী লোক। কি যেন কথাবার্তা হল ওদের মধ্যে। লোকটা চলে গেল। আমার বুকের মধ্যে দামামা বাজছে। সবটুকু সাহস জড়ো করে বউকে জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, মালতির বর। কিছু কাজ আছে। আজ আর হবে না। কাল আসবে।

একটা দাঁড় কাক জানলায় এসে বসে ডাক দিলে গেল। বোধহয় আমার দিকে তাকিয়ে দেখলও একবার।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮