• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে


নির্বাসিতের নীড়-বাসনা

কুড়ি এবং একুশ শতকের পৃথিবীর ইতিহাস, বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার শিকার অসংখ্য মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার ইতিহাস। কুড়ির শতকের শুরুতে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে ঘরছাড়া হয় কয়েক কোটি মানুষ। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অল্প কিছু পরে আমাদের দেশ স্বাধীন হয় দেশ ভাগের অপূরণীয় মূল্যের বিনিময়ে। দেশভাগে উদ্বাস্তু হয় আনুমানিক ১ কোটি পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ । ১৯৫১ সালের জনগণনা অনুসারে ঘরছাড়া হয়ে পূর্ব-পাকিস্তান (এখন বাংলাদেশ) থেকে ভারতে আসে ২৫ লক্ষ মানুষ । ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় উদ্বাস্তু হয় আনুমানিক ১ কোটি মানুষ । পরিস্থিতির শিকার হয়ে ভিটে-মাটি ছাড়ার এই দুর্ভোগের যেন আর শেষ নেই । ইউনাইটেড নেশনের বিবরণ অনুসারে বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকা যুদ্ধ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অশান্তির শিকার হয়ে মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার সংখ্যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবথেকে বেশী। দলে দলে মানুষ বাধ্য হচ্ছে তাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে, কখনও নিজের দেশের’ই অন্য কোন জায়গায়, আবার কখনও বা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোনও দেশে, আশ্রয় নিতে । ইউনাইটেড নেশনের জনসংখ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০ কোটি মানুষ ( যা পৃথিবীর ৫ম জনাকীর্ণ দেশ ব্রাজিলের জনসংখ্যার সমান) তাদের জন্মভূমি থেকে বিচ্যুত। এক-দশক আগে যুদ্ধজনিত কারণে বাস্তু-চ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ। যা ২০১৪ সালে বেড়ে হয় ৫ কোটি ১২ লাখ এবং ২০১৫ সালে বেড়ে হয় ৫ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে শুধু মাত্র সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেই দেশছাড়া হয়েছে ৯০ লক্ষ মানুষ। মানুষ যে শুধু মাত্র যুদ্ধের শিকার হয়েই দেশছাড়া-ঘরছাড়া হচ্ছে তা নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দেশের অভ্যন্তরেও ঘরছাড়া হচ্ছে বহু মানুষ। শুধুমাত্র ভারতেই উন্নয়ন প্রকল্পে উদ্বাস্তু আনুমানিক ৬ কোটির বেশী মানুষ।

এই বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু সমস্যার প্রভাব পরছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বিভিন্ন দেশের সরকার উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প করছেন। কিন্ত বেশির ভাগ সময়-ই এই সব প্রকল্প মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রত্যক্ষ প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।

কিন্তু মানুষ তো শুধু শরীর নয়! আর তাই শারীরিক চাহিদার পাশাপাশি, তার অনুসন্ধিৎসু মন যেমন আবিষ্কার করতে চায় তার বাইরের পারিপার্শ্বিক পৃথিবীকে আর তেমনি বুঝতে চায় তার অন্তরের অবচেতন জগতটাকে । এই মানসিক চাহিদার প্রয়োজনে জন্ম নেয় বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য আর মানুষের অস্তিত্বের শিকড় শুধু তার শারীরিক চেতনার জগতে সীমিত না থেকে ছড়িয়ে পড়ে তার অবচেতন জগতেও । যে জগত তৈরি হয় হাজার হাজার বছর ধরে স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ে, সমাজের দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতি-বোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বন্ধনে।

আর তাই যখন আমরা জীবন-সংগ্রামে, কখনো ইচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়, কখনো পরিস্থিতিকে শিকার করে, কখনো বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে, ভিটে মাটি থেকে উৎখাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ি, তখন আমাদের মনে বসতি ও রুজিরোজগার হারানোর কষ্টের সাথে জড়িয়ে থাকে সমাজ, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও পরিচিতি হারানোর সম্ভাবনা-জনিত কষ্ট।

জন্মস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দেশে আবার করে বসতি বাঁধার আমাদের এই চেষ্টায় তাই একদিকে থাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আর অন্যদিকে থাকে নূতন সমাজের সাথে মানিয়ে নেয়ার এবং স্বাধীন সামাজিক পরিচিতি তৈরি করার দ্বন্দ্ব।

এ-অবস্থায় আমাদের মত জন্মভূমি-বিচ্যুত অভিবাসী মানুষের কাছে তিনটি পথ থাকে -

১) নিজেদের মূল পরিচয় ভুলে যেয়ে নূতন সমাজে সম্পূর্ণ ভাবে মিশে যাওয়া

২) নিজেদের মূল পরিচয় ভুলে যাওয়ার সাথে সাথে নূতন-পরিবর্তিত বাস্তবকে অস্বীকার করা

৩) নিজেদের মূল পরিচয় বাঁচিয়ে রেখে নূতনের সাথে মানিয়ে নেওয়া

আচরণগত বিজ্ঞান তত্ত্ব অনুযায়ী, অভিবাসী জীবনে স্থিতি এবং সাফল্য আনতে তৃতীয় পথটাই কাম্য। নূতনের সন্ধানে আমাদের এগিয়ে চলা তখনই সার্থক হবে যখন সেই যাত্রার শিকড় থাকবে আমাদের অস্তিত্বের গভীরে।

আর তাই আমরা, আমাদের মূল পরিচয়, আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, বাঁচিয়ে রাখতে, আমাদের নিজেদের প্রতি এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধ ।

প্রবাসে আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার এই প্রয়াসেই নীড়-বাসনার প্রকাশ। আশা করব নীড়-বাসনার এই প্রয়াস আপনাদের ভাল লাগবে।

বাংলা সাহিত্য, কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে উদ্বাস্তু বাঙ্গালী জীবনের হাহাকার।

কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের “উদ্বাস্তু” কবিতায়, দেখি ভূষণ এবং তার পরিবারকে সব কিছু ছেড়ে যেতে

“চারধারে কী দেখছিস? ছেলেকে ঠেলা দিল ভূষণ- জলা-জংলার দেশ, দেখবার আছে কী! একটা কানা পুকুর একটা ছেঁচা বাঁশের ভাঙা ঘর একটা একফসলী মাঠ একটা ঘাসী নৌকো-“

নিজেদের ঘর-বাড়ি, নিজেদের আজন্ম পরিচয় ছেড়ে, তারা চলেছে এক নূতন দেশে, যেখানে তাঁদের পরিচয় ‘মানুষ’ নয়, সেখানে তারা শুধুই ‘উদ্বাস্তু’ -

“আসল জিনিস দেখবি তো চল ওপারে, আমাদের নিজের দেশে, নতুন দেশে, নতুন দেশের নতুন জিনিষ-মানুষ নয়, জিনিস- সে জিনিসের নাম কী? নতুন জিনিসের নতুন নাম-উদ্বাস্তু।“

(“উদ্বাস্তু” - অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)

এই কবিতায় কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত আমাদের এক নির্মম সত্যের সামনে এনে দাঁড় করান, যখন তিনি লেখেন আমরা সবাই উদ্বাস্তু –

“কেউ উৎখাত ভিটে-মাটি থেকে, কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে।“

(“উদ্বাস্তু” - অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)

এই সব উদ্বাস্তু মানুষেরা খুঁজে বেড়ায় তাদের দেশ, বিষ্ণু দে’র “জল দাও” কবিতায় –

“এখানে ওখানে দেখ দেশছাড়া লোক ছায়ায় হাঁপায় পার্কের ধারে শানে পথে পথে গাড়িবারান্দায় ভাবে ওরা কী যে ভাবে ! ছেড়ে খোঁজে দেশ এইখানে কেউ বরিশালে কেউ কেউ বা ঢাকায়... “

(“জল দাও” - বিষ্ণু দে)

ছেড়ে আসা বাংলাদেশের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে জীবনানন্দ দাশে’র “রূপসী বাংলার” কবিতায় কবিতায় –

“আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়; হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে-ভেসে;” (আবার আসিব ফিরে – জীবনানন্দ দাশ )

তেমনি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের-ও অনেক কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে দেশ ছেড়ে আসার স্মৃতি, ফেলে আসা গ্রাম, নদী, প্রকৃতি ও মানুষজন –

“কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে নিথর দিঘির পারে বসে আছে বক আমি কি ভুলেছি সব স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক? আমি কি দেখিনি কোনো মন্থর বিকেলে শিমুল তুলোর ওড়াউড়ি”

(“যদি নির্বাসন দাও” - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

আবার বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারের কবিতা-যাপনে-ও আমরা শুনি জীবনের চিৎকার

“মনে হয়, মনুমেন্টের চূড়ায় উঠে

চিৎকার ক’রে

আকাশ ফাটিয়ে বলি;

দ্যাখো, সীমান্তের ওইপারে আমার ঘর

এইখানে আমি একা, ভিনদেশী ।“

(তোমার কথা – দাউদ হায়দার)

এভাবেই বারবার, বাঙ্গালী কবি ও সাহিত্যিকদের সাহিত্য-যাপনে, প্রতিধ্বনিত হয়েছে উদ্বাস্তু জীবনের হাহাকার ।

নীড়-বাসনার এই সংখ্যা আমরা উৎসর্গ করলাম পৃথিবীর সমস্ত উদ্বাস্তু মানুষ-কে। তাঁদের শিকড়-হীনতার যন্ত্রণা, আমরা বয়ে চলি আমাদের আত্মায় অনন্তকাল ধরে। শিকড়ের সন্ধানে এই যাত্রায়, আমাদের পাথেয় হোক তাঁদের অস্তিত্বের সংগ্রাম।

আশা করব আমাদের প্রথম প্রকাশনার ভুল ত্রুটি আপনারা নিজগুণে মাপ করে দেবেন এবং আমাদের এই প্রয়াসে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করবেন।

প্রথম প্রকাশনার সময় হিসেবে আমরা বেছে নিলাম আমাদের বাঙালি জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তীর শুভ-সময়।

এই মহাবিশ্বের পথে পথে, অস্তিত্বের শিকড় সন্ধানে, আমাদের পথচলা শুরু হোক মহাকবির হাত ধরে । তাঁর জীবনদর্শন আমাদের উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল, জীবনে ধ্রুবতারার মত জেগে থাকুক, আমাদের পথ দেখাক, আমাদের অনুপ্রাণিত করুক।

আপনাদের সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভকামনা জানাই। নূতন বছর সবার খুব ভাল কাটুক।

শুভাশিস ভট্টাচার্য

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮