• শ্রাবস্তী সেন

ভ্রমণ - পঞ্চ প্রয়াগ

অনেকদিন ধরে মনে একটা ইচ্ছে কে লালন করে আসছিলাম, হিমালয়ের কোনো তথাকথিত দুর্গম স্থানে বেড়াতে যাওয়ার। আর তার জন্য প্রথমেই মাথায় এসেছিলো – কেদার-বদ্রীর কথা! আমাদের চেনাজানা যে কজন গেছেন

সবাই বলেছেন ভীষণ দুর্গম আর অত্যন্ত কঠিন সেই যাত্রাপথ! তাই ভাবলাম, বয়স কম থাকতে একবার চেষ্টা করব, আর ঠিক- ও করে ফেললাম।

কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, গঙ্গোত্রী আর যমুনোত্রী – এই চার জায়গা-য় একসাথে ঘোরা কে একসঙ্গে বলে চারধাম যাত্রা। ভারতবর্ষের মানুষের বিশ্বাস চার ধাম যাত্রা পূর্ণ করলে অনেক পুণ্য সঞ্চয় হয়। কিসে কি হয় জানিনা, অপরূপ হিমালয়ের অমোঘ আকর্ষণে বেরিয়ে পড়লাম। তবে আমাদের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় – অফিসের ছুটি! সুতরাং চারধাম যাত্রা পূর্ণ করা আমাদের পক্ষে একটু শক্ত। তাই ঠিক করলাম এই যাত্রায় কেদার আর বদরী যাওয়া যাক, বাকি দুই ধাম বরং পরে কখনো সুযোগ পেলে – যাকে বলে কিস্তিতে পুণ্যলাভ! সেই মতন ব্যাঙ্গালোর থেকে রওনা হলাম, দিল্লী হয়ে হিমালয়ের পথে।

দিল্লীতে থাকার যায়গা ঠিক হয়েছিল বেশ বড় একটা তিনতারা হোটেলে। পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে গেল, আর শুতে শুতে আরো দেরি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার বিশ্রাম – কারণ পরেরদিন ভোরবেলাই আবার শতাব্দী এক্সপ্রেস ধরে আমাদের হরিদ্বারের পথে এগোনো। যা হোক, সব গুছিয়ে ভোর পাঁচটায় রওনা হলাম। ট্রেনে চা, প্রাতরাশ ইত্যাদি সেরে হরিদ্বার পৌঁছতে প্রায় এগারোটা হয়ে গেল। ষ্টেশনে গাড়ি অপেক্ষা করছিলো, সোজা চলে এলাম হোটেলে। আমাদের হোটেল টা ছিল শহরের একটু বাইরে, তাই জায়গা টা বেশ ফাঁকা। বিকেলে আমরা গেলাম হর-কি-পউরি দর্শনে।

হর-কি-পউরি তে পৌঁছে মনটা খারাপ হয়ে গেল। গঙ্গায় একদম জল নেই, সরু একটা জলের ধারা বয়ে চলেছে। শুনলাম বছরের এই সময় টায় জল আটকে এরা নদীপৃষ্ঠ পরিষ্কার করে। যাই হোক, ঐ জলেই গঙ্গা আরতি দেখলাম। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে পাতায় ভেলায় ভাসিয়ে দিচ্ছে জ্বলন্ত প্রদীপ গঙ্গার বুকে।

পরদিন সকালে আমরা হরিদ্বার ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম। আমরা একটা ট্র্যাভেরা নিয়েছি, ড্রাইভার স্থানীয় লোক, নাম মনোজ। পথে রামঝুলা, লক্ষ্মণঝুলা পড়লো। হৃষীকেশে আমরা গঙ্গার প্রকৃত রূপ দর্শন করলাম। হৃষীকেশে ‘রিভার র‍্যাফটিং’ হয়, তাই গঙ্গার পাড়ে প্রচুর তাঁবু খাটানো রয়েছে। কিছুদূর গিয়ে পথ দুভাগ হয়ে গেছে, বাঁ দিকের পথ চলে গেছে দেরাদুন, মুসৌরি হয়ে গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রীর দিকে, আর আমরা যাবো ডান দিকে গুপ্তকাশীর পথে। কেদার যাবার এটাই রাস্তা, এই রাস্তায় ক্রমে শুরু হল পাহাড়ি চড়াই – এ ওঠা। পাশে খরস্রোতা, তীব্রবেগে ধাবমান আঁকাবাঁকা গঙ্গার ধারা, আর যেদিকে চোখ যায় সেদিকে শুধু পাহাড়ের সারি। যেন মাথা উঁচু করে একে অন্যের সাথে এক নিস্তব্ধ প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে আগে আকাশ ছোঁবে বলে, আর অন্য দিকে ঘন গহন বন।

বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা পৌঁছলাম দেব প্রয়াগ, এখানে চির যৌবনা অলকানন্দা এসে মিশেছে ভাগীরথীতে। দৃশ্যপট অপূর্ব, অলকানন্দার স্বচ্ছ নীল জল এখানে এসে মিশেছে গেরুয়াবসনা ভাগীরথীর সঙ্গে। লোহার পুলের পাশে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রয়াগের দিকে। আমরা গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটু খাওয়া দাওয়া করলাম। ছোট্ট, পরিষ্কার ধাবা, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা, ওপারে পাহাড়ের কোলে নিবিড় বনানী, অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য জায়গা টাকে যেন এক স্বর্গীয় মাত্রা দিয়েছে। আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আমরা আবার এগিয়ে চললাম।

আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল রুদ্রপ্রয়াগের দিকে। মাঝে মাঝে পাহাড়ি গ্রাম, পাহাড়ি মানুষের ছোট বাড়ি, কিছু পাকা বাড়ি, তবে বহুতল নয়, আর রয়েছে প্রয়োজনীয় অনেক দোকানপাট। রুদ্রপ্রয়াগে এসে মিলন হয় দুই খরস্রোতা নদীর – অলকানন্দা আর মন্দাকিনী। পাহাড়ের গায়ে পাথরের সিঁড়ি, কিছু টা মানুষের তৈরি তবে বেশীর ভাগ টাই প্রাকৃতিক ভাগে সৃষ্ট। যেখানে দুই নদীর সঙ্গম সেখানে প্রচণ্ড স্রোত, কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম – মন্দাকিনীর পাশ দিয়ে তৈরি পথে গুপ্তকাশীর দিকে। খানিকদূর এগিয়ে পথে পড়ে অগস্ত্যমুনি।

গুপ্তকাশী খুব ছোট পাহাড়ি একটি শহর। বলতে গেলে একটি স্থানীয় বাজার আর তাকে কেন্দ্র করে তার আশে পাশে গড়ে উঠেছে কিছু হোটেল। ৪৮৫০ ফিট উঁচু এই শহরে রয়েছে চন্দ্রশেখর মহাদেব ও অর্ধনারীশ্বর মন্দির। গুপ্তকাশী থেকে মদমহেশ্বরের পাহাড় ও দেখা যায়, অনেক নীচে মন্দাকিনীর উপত্যকা। এখান থেকে নদীটি যেন একটি রুপালী রেখা। অপর পাড়ে রয়েছে উখীমঠ, শীতে যখন কেদার নাথের মন্দির বন্ধ থাকে তখন এই উখীমঠেই তাঁর নিত্যপূজা হয়।

সেই রাতটা গুপ্তকাশীতে থেকে পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হল। এবারে গাড়ি যাবে গৌরিকুন্ড অবধি, তারপর ১৪ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে কেদারনাথ পৌছনো। খানিক টা যাবার পর ‘ফাটা’ বলে একটা জায়গা আছে, সেখান থেকে কেদারনাথ মন্দিরে যাবার হেলি কপটার সার্ভিস চালু আছে। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে একঘণ্টার মধ্যে কেদার নাথ পৌঁছে, পুজো দিয়ে ফিরে আসা যাবে। কি জানি মন যেন সায় দিল না! যাত্রাপথের এই অপরূপ শোভা, দুর্গম রাস্তায় হাঁটার যে উত্তেজনা, সেকি উপভোগ করা যায় এই হেলিকপ্টার যাত্রায়? যাই হোক আমরা এগিয়ে চললাম, পথে পড়ল শোনপ্রয়াগ, শোনগঙ্গা আর মন্দাকিনীর সঙ্গম। আর খানিক টা এগিয়ে আমরা পৌঁছলাম গৌরিকুন্ড।

নীলকণ্ঠ পিক মন্দাকিনীর উৎস

আগে থেকে ঠিক ছিল, সেই মতো তিনটি খচ্চর ভাড়া করে আমাদের পাহাড়ে ওঠা শুরু হল। দুটো বাচ্চা ছেলে আমাদের সহিস হয়ে আমাদের সঙ্গে এগিয়ে চলল। সরু পথ – আসা যাওয়া দুই একই পথ দিয়ে, তার মধ্যেই চলেছে ঘোড়ার দল, পদাতিক মানুষের সারি আর একই সঙ্গে ডান্ডি নিয়ে বাহকের দল। পাহাড়ি রাস্তা কখনো ঢালু, কখনো দুই-তিনটি করে ধাপ পেড়িয়ে ঘোড়া এগিয়ে চলে। মাঝে একটা জায়গায় রাস্তার ওপর দিয়ে পাহাড়ি ঝর্না নেমে গেছে। পথ সেখানে নেই বললেই চলে। শুধু কিছু বড় বড় পাথর ফেলা, তার মধ্যে দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। একদিকের ঘোড়া আর ডান্ডি যখন যায়, অন্য দিকের গুলো অপেক্ষা করে। সরু এই পথ পেরোনোর সময় অতি বড় সাহসীরও গলা শুকিয়ে যাবে। কারণ ঘোড়ার পা যদি একটু ও দিক হয়ে যায় কোথায় গিয়ে পড়বো জানি না! যাই হোক ঈশ্বর কে স্মরণ করে কোন রকমে পেড়িয়ে যাই সেই রাস্তাও। সাত কিলোমিটার গিয়ে পৌঁছই ‘রামওয়ারা’ সেখান থেকে আরো সাত কিলোমিটার গেলে কেদার।

রামওয়ারা তে সবাই একটু বিশ্রাম নেয়। মানুষ ও ঘোড়া দুজনেই নাস্তাপানি খেয়ে দম নিয়ে আবার এগিয়ে চলে। সেই মতন আমরা ও নেমে একটু চা ও জলখাবার খেলাম। আমাদের ছোট্ট দুটো সহিস ছেলেকে দেখে অবাক হতে হয়। এতো ঠাণ্ডার মধ্যে ও গায়ে সামান্য পোশাক, পায়ে ছেঁড়া, ফাটা জুতো। এরা এতো গরীব ভালো করে খেতেও পারেনা, দেখলাম এক প্লেট ম্যাগি কিনে দুজনে ভাগ করে খাচ্ছে। আমাদের কাছে কিছু আপেল, বিস্কুট ছিল, সেগুলো ওদের কে দেওয়াতে ওরা ভীষণ খুশী হল। যা হোক একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার পথ চলা। পাহাড়ের উচ্চতা যেন অবাক করে দেয়। একনজরে নীচ থেকে ওপর অবধি দেখা যায় না। গাছপালা ক্রমে কমে আসতে থাকে। বছরের অনেকটা সময় তুষারাবৃত থাকে বলে পাহাড়ের গায়ে সে রকম গাছপালা নেই। সবুজের ছোঁয়া এখানে খুব কম, আর চারদিকে ধসের চিনহ।

কেদারে পৌছনোর দুই কিলোমিটার আগে শুরু হল বৃষ্টি। একদিকে পাহাড়ি বৃষ্টি, আর অন্য দিকে পাহাড় থেকে সহস্র ধারায় নেমে আসছে মন্দাকিনী। কি স্রোত আর কি গর্জন? দেখি আর মনে হয় এই জায়গায় এসে বিজ্ঞানকে হার মানতে হয় প্রকৃতির কাছে। আমাদের এখানে একরাত থাকার কথা, সেই মতন হোটেলে মাল পত্তর রেখে আবার বেরলাম খাওয়া দাওয়া সারতে। ছোট্ট জায়গা, কেদারনাথের মন্দির কে ঘিরে গড়ে উঠেছে কিছু হোটেল, দোকানপাট, ঘরবাড়ি। বিকেলবেলা আমরা গেলাম মন্দির দর্শনে। মন্দিরের কয়েকটি ধাপ উঠলেই রয়েছে একটি খোলা চত্তর। সেখানেই রয়েছে বিশালাকারের নদী, আর ভেতরে রয়েছেন কেদারনাথ – দ্বাদশ জ্যোতিরলিঙ্গের অন্যতম। শোনা যায় শঙ্করাচার্য নাকি এই কেদারনাথেই দেহরক্ষা করেন। কেদারনাথের ঠিক পিছনেই রয়েছে চৌখাম্বা শিখর। চৌখাম্বার বাঁদিক দিয়ে বলা হয় মহাপ্রস্থানের পথ, যা বদ্রিনাথ দিয়েও যাওয়া যায়। আমাদের আসলে ভাগ্য খারাপ ছিল, কারণ মেঘের আড়ালে এই শৃঙ্গ গুলোর কোন টাকেই ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। চৌখাম্বা আমরা দেখলাম পরেরদিন সকালে, কিছুক্ষণের জন্য একটু মেঘ সরে রোদ উঠলে। তবু যা দেখেছি তা রয়ে গেছে চিরজীবনের স্মৃতি হয়ে।

ফেরার পথে আবার গৌরীকুন্ড অবধি ঘোড়ায় এসে, তারপর গাড়ি করে গুপ্তকাশী ফিরে এলাম। এখানে বিকেলে বেড়িয়ে চন্দ্রশেখর মহাদেব আর অর্ধনারীশ্বর দর্শন করে এলাম। পরের দিন সকালে উঠে তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমরা রওনা হলাম যোশীমঠের উদ্দেশ্যে। দুপুরের মধ্যে পৌঁছে গেলাম যোশীমঠে। এখানে ‘গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের’ হোটেলের সামনে বেশ বড় একটা খোলা চত্তর রয়েছে। আমরা একতলার একটা ঘর পেলাম। বারান্দা কাঁচে ঢাকা আর সেখান থেকে দূরে দেখা যায় পর্বতশৃঙ্গ। আমাদের হোটেলের পাশেই শঙ্করাচার্যের মন্দির, বিকেলে বেড়িয়ে আমরা দর্শন সেরে এলাম।

পরেরদিন খুব ভোর বেলা উঠে বেড়িয়ে পড়লাম বদরী দর্শনে। যোশী মঠ থেকে বদ্রীনাথ পুরো রাস্তা টাই সেনাবাহিনী দেখাশোনা করে। দেড় ঘণ্টা করে একেক দিকের গাড়ি যেতে দেয়। তাই একদিকের গাড়ি ছাড়ার সময় পেরিয়ে গেলে পাক্কা দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। বেশ কিছুটা এগিয়ে পথে পড়ে বিষ্ণু প্রয়াগ – বিষ্ণুগঙ্গা ও অলকানন্দার মিলনস্থল। এখানে একটা রাস্তা চলে গেছে হেমকুন্ড সাহিব আর ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারসের দিকে। আমরা এগিয়ে চললাম সোজা। এখানেও দেখলাম অলকানন্দার ওপর থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের কাজ চলেছে। রাস্তা সমানে বাঁক নিয়ে নিয়ে উঠছে। চারদিকে শুধু উঁচু পাহাড়। দেখা যাচ্ছে কিছু তুষার আবৃত শৃঙ্গ। একেক টা জায়গায় পাহাড়ের ওপর থেকে এমন ভাবে পাথর ঝুলছে মনে হচ্ছে এই বুঝি এক্ষুনি রাস্তায় এসে পড়ল। প্রকৃতির এই রূপ যে দেখবে না তাকে বর্ণনা করা কঠিন। স্কন্দ পুরাণে উল্লেখ আছে স্বর্গ মর্ত পাতালে বহু তীর্থ আছে, কিন্তু বদ্রীর তুলনীয় তীর্থ হয়তো আর হবে না।

অলকানন্দা নদী কর্ণ প্রয়াগ

সকাল নটা – সাড়ে নটা র মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম বদ্রীনাথে। অনেক মানুষ কে দেখলাম তপ্তকুণ্ডের জলে চান করতে। আমরাও মাথায় জল ছিটিয়ে আগে পুজো দিলাম। পূজারি প্রথমে মন্দিরের বাইরে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করালেন করালেন তারপর নিয়ে গেলেম মন্দিরের ভেতরে দেবদর্শনে। বদ্রীনারায়ন কালো পাথরের মূর্তি। মন্দিরের ভেতরে পুজো দিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করে আমরা বেড়িয়ে এলাম।

অলকানন্দার এপারে মন্দির আর ঐ পারে বাস স্ট্যান্ড, হোটেল, দোকান-পাট। অলকানন্দার দুই দিকে দুই পাহাড় – বাঁয়ে নর পর্বত, ডানে নারায়ণ পর্বত। তার ও পিছনে গগনচুম্বী চিরতুষারাবৃত নীলকণ্ঠ শিখর। এই তিন শিখর যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো ঘিরে রেখেছে এই বদ্রীনাথ মন্দির কে। ব্রিজ পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম অপর পারে, গন্তব্য মানা গ্রাম। বদ্রীনাথ থেকে গাড়িতে আরো তিন – চার কিলোমিটার পথ। ভারতের শেষ গ্রাম এই মানা গ্রাম। এইখান দিয়েই গেছে মহাপ্রস্থানের পথ। এখানেও রয়েছে ভারতীয় সেনা বাহিনীর ক্যাম্প। পথে একজন সেনা অফিসারের সাথে আলাপ হল, জানতে পারলাম মানা গ্রাম থেকে যে তুষার শৃঙ্গটি দেখা যায় সেটির নাম ‘বাসুকি পিক’। এই মানা গ্রামেই দর্শন মেলে সরস্বতী নদীর। ভারতবর্ষের অন্য জায়গায় এই সরস্বতী নদী অন্তঃসলিলা, এখানেই একমাত্র তার দর্শন মেলে। সহস্র ধারায় ছুটে এসে সঙ্গম রচনা করে অলকানন্দার সঙ্গে, এই জায়গা টাকে বলে – ‘কেশব প্রয়াগ’। বাসুকি বা বসুধারায় যাবার পথে একটা ব্রিজ আছে – ওপরে লোহার পুল থাকলেও নীচে পাথর সাজিয়ে আরো একটা প্রাকৃতিক পুল রয়েছে। এটাকে বলে ‘ভীমপুল’ – কথিত আছে মহাপ্রস্থানের পথে এখানে এই পাথর ফেলে ভীমসেন এই পুল রচনা করেন। কাছেই রয়েছে ‘গণেশ মন্দির’। বলা হয় কিছুটা দূরে একটা জায়গায় বিরাট পাথরের স্তূপ পরপর সাজানো রয়েছে। যাকে মনে করা হয় ব্যাসদেবের পুঁথি, আর এই গণেশ ছিলেন নাকি ব্যাসদেবের স্টেনো।

বদ্রীনাথ দর্শন করে ফিরে এসে যোশীমঠে বিশ্রাম নিলাম। পরের দিন সকালে এখান থেকে আমাদের যাত্রা হল শুরু হৃষীকেশের উদ্দেশ্যে। যোশীমঠ থেকে হৃষীকেশ পৌঁছতে প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা লেগে গেল। আস্তে আস্তে পাহাড় ছেড়ে আমরা নেমে এলাম সমতলে। আমাদের হোটেল ‘গঙ্গা – নিবাস’ একদম গঙ্গার ধারে। বারান্দায় দাঁড়ালে সামনে ‘রাম-ঝুলা’ দেখা যাচ্ছে। সন্ধেবেলা বেড়িয়ে আমরা ‘রাম-ঝুলা’ ঘুরে এলাম। এখানে গঙ্গায় প্রচুর জল, আবার গঙ্গা আরতি করলাম। হোটেলে ফিরে গঙ্গার ধারে সামনের লনে চেয়ার পেতে বসে সময় কেটে গেল। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অমৃতবাহিনী গঙ্গা, দূরে পাহাড় – তার গায়ে বসতি, আলো গুলো যেন জোনাকির মতো জ্বলে থাকে।

পরেরদিন ঠিক হলো আমাদের ড্রাইভার আমাদের রামঝুলা তে নামিয়ে চলে যাবে লছমনঝুলা। আমরা রামঝুলা তে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে লছমনঝুলার দিকে হাঁটা লাগালাম। এই পাড়ের রাস্তাতে ভিড় বেশ কম, কারণ লোকে গাড়ি বা বাসে করেই বড় রাস্তা দিয়ে লছমনঝুলা যায়। এই রাস্তায় আমরা বেশ কিছু আশ্রম দেখলাম। এখানে রোদের তেজ ও খুব, অল্প কেনাকাটা করে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কাছে একটি কফিবারে ঢুকলাম, সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। এক সাধু এসেছেন তার এক ভক্তের সাথে, কফি পান করতে। আরো কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম একটি দামী মোবাইল ফোন বার করে ছবি দেখাচ্ছেন তাঁর ভক্ত কে। তার আরো কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম তাঁর ঝোলা থেকে বেরোলো এক মূল্যবান, ডিজিটাল ক্যামেরা! আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ। শুনেছি সাধু সন্ন্যাসীরা সর্ব ত্যাগী, কিন্ত ইনি তো সকলের থেকে আলাদা!

যাইহোক খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। পরেরদিন সকালে চেক – আউট। প্রথমে গেলাম শান্তিবন নামে এক আশ্রম দর্শনে। কোন এক বিশেষ সম্প্রদায়ের আশ্রম। সেদিন সেখানে কোন বিশেষ অনুষ্ঠান ছিল, দেখলাম অজস্র ভক্তের সমাগম আর ঢালাও ভোগের ব্যবস্থা। সেখানে কিছু টা সময় কাটিয়ে আমরা গেলাম ‘ভারতমাতা মন্দির’ দর্শনে। খুব ভালো লাগলো, কোন বিশেষ দেবদেবী নয়, ভারত বর্ষের সব ধর্মের, সব বর্ণের বিভিন্ন মনিষীদের এখানে দেবতা রূপে পুজো করা হয়।

এবারে সব শেষে ফেরার পালা। লাঞ্চ করে চলে এলাম হরিদ্বার স্টেশনে। ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষার পর শতাব্দী ধরে আবার দিল্লী। রাত টা সেখানে কাটিয়ে পরের দিন ফিরতে হবে আমাদের রোজকার কর্মবৃত্তে, আমাদের ধরা বাঁধা জীবনে। এর প্রায় বছর তিনেক পর আমরা গেছিলাম আরো দুই ধাম – গঙ্গোত্রী আর যমুনোত্রী – সে কথা পড়ে কোন দিন শোনাব।

বি: দ্রঃ আমরা এই ট্যুর টা করেছিলাম ২০০৯ সালে। তারপর ২০১৩ সালে ‘হিমালয়ের সুনামি’ তে গৌরিকুন্ড থেকে কেদার যাবার পুরো রাস্তা টা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। এখন কেদার নাথ যাত্রা হয় এক অন্য রাস্তা দিয়ে, সেটা আমার জানা নেই।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮