• শোভন কাপুরিয়া

শিকার


॥প্রথম॥

ঘরটা বেশ অন্ধকার , খুব একটা বড় না ঘরটা। আর কি কি আছে ঘরে তা বোঝার উপায় নেই কিন্তু ঘরের কোণাটা আলোকিত হয়ে রয়েছে কম্পিউটার স্ক্রীণের আলোতে। একটা লোক তার সামনে বসে আছে , যদিও মুখটা দেখার উপায় নেই। ডিসেম্বর মাসের কনকনে ঠান্ডাটা কলকাতাতে বেশ পড়েছে , তাই হয়তো লোকটা সর্বাঙ্গ কালো শাল দিয়ে মুড়ে বসে আছে আর মাউসটা ক্রমাগত মেয়েটির ছবিটার উপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ডান হাতে ফোনটা ধরে কানে লাগিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে .... ‘কাল তোমার কাছে ফোন আসবে , আর তারপর যেরকম বলেছি সেরকম। প্ল্যান মত সব কিন্তু আমার করা হয়ে গেছে।‘ ওদিকের কথা শোনার পরে সে এবার একটু ধমকের সুরেই বলল ‘ছবিটা পেয়েছ তো! আর কোনো কথা না। কাজ ঠিক হলে সব ঠিক থাকবে।‘ বলে সে ফোন কেটে দিল।

॥দ্বিতীয়॥

কয়েক মাস পরের ঘ্টনা......

অমিত সোমানি , সোমানি গ্রুপ অফ কোম্পানিজ্-এর মালিক আজ কোলকাতার এক Lavish হোটেলে নিজের একমাত্র্ মেযে রিয়া সোমানির জন্মদিনের পার্টি রেখেছেন। ছেলেবেলায় মা মরা মেয়ে তার খুব কাছের , তাই রিয়ার সমস্ত রকম আবদার তিনি রাখেন। এই জন্মদিনের পার্টিও রিয়ার অনুরোধেই রাখা , কোনো খামতি রাখেননি তিনি। খাওয়া-গান-নাচ সবরকম ব্যবস্থা করে একদম এলাহি কান্ড ঘটিয়েছেন। কিন্তু আজকের পার্টি শুধু জন্মদিনের জন্য না ... অন্য কারণ্-ও আছে। অমিত রিয়া কে একটু আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন ‘’রোহান তো এখনো এলোনা... তার তো 7টার সময় আসার কথা।‘ এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন ‘আমি তোমার সব আবদার রাখি আর এটাও রেখেছি। কিন্তু আমি লোক হাসাবো না।‘ রিয়া-ও একটু চিন্তাতে পড়ল , সত্যি তো রোহান এখোনো কেন এলোনা। রোহানের সাথে রিয়ার আলাপ ফেসবুকে , বার কয়েক দেখাও হয়েছে তার সঙ্গে কিন্তু অমিত সোমানির সাথে আজ-ই প্রথম দেখা। রোহান থাকে পুনে তে , একটি আই টি কোম্পানিতে কর্মরত। কিছুদিন আগে রিয়ার জন্মদিনের জন্য ছুটি নিয়ে এসেছে কোলকাতাতে। রিয়া ভাবলো একবার ফোন করবে কি না রোহান কে , কিন্তু ফোনটা খুলতেই মনে পড়ল যে ফোনে টাকা তো নেই। তখন-ই কোমরে সে একটা হাত অনুভব করল , চমকে ফিরে সে আনন্দে চিতকার করে জড়িয়ে ধরল ‘রোহান....কোথায় ছিলে!! চল বাবা ওয়েট করছেন।‘ অমিত বাবুর সাথে হাত মেলানোর পরে সে অমিত সোমানির সাথে স্টেজে উঠল। অমিত মাইক হাতে নিয়ে গান-বাজনা থামাতে বলে বলতে আরম্ভ করলেন ‘আজকের অনুষ্ঠান শুধু রিয়ার জন্মদিনের জন্য না। আমার মেয়ে একটি ছেলেকে ভালোবাসে , তার নাম রোহান। আই হ্যাপিলি অ্যানাউন্স যে ওদের বিয়ে হবে , কবে হবে সেটা আমি পরে ডিসাইড করব। আপনারা এনজয় করুন। আপনারা এসেছেন খুব ভালো লাগছে আজকের দিনটা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পেরে।‘ কথা শেষ হতেই চারদিক হাততালিতে ফেটে পড়ল।

হঠাত অমিত সোমানির কাছে একটা ফোন এল ‘স্যার, লালবাজার থেকে সেন বলছিলাম। রিয়া ম্যাডামের বান্ধবী রাশী রায় খুন হয়েছেন।‘ ‘সো! আমি কি করতে পারি। আমি রিয়াকে জানিয়ে দেব ,সে গিয়ে দেখা করে আসবে।‘..অমিত একটু রেগে বললেন। সেন বলে উঠলেন ‘রোহান বসু মানে আপনার হবু জামাই হয়তো এতে জড়িত আছে। তাই আপনাকে জানালাম।‘ অমিত একবার রিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে আর রোহান গল্পে মত্ত , রিয়ার হাসিমুখ দেখে অমিত একটু বিষন্ন হয়ে পড়লেন। অমিত নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন ‘কাল আমি আসছি। মিডিয়া যেন এই ব্যাপারে জানতে না পারে।‘

ফোনটা কেটে কিছু একটা ভেবে একটা নাম্বারে ট্যাপ করে কানে লাগালেন ‘রাহুল , কালকে একটু ফ্রি থেকো। তোমাকে নিয়ে এক জায়গাতে যাওয়ার আছে।‘

॥তৃতীয়॥

রাশী আর রিয়া অনেকদিনের পুরোনো বন্ধু যদিও দুজনের তেমন কোনো মিল নেই। রাশীর সবসময়-ই রিয়ার প্রতি একটা ঈর্ষা কাজ করত , রিয়ার যদি কোনো জিনিস পছন্দ হয় রাশীর-ও সেটা চাই-ই। তাই যখন সে শুনল রিয়া একটা ছেলেকে ভালোবাসে তখন সে দেখা করতে চাইলো , রিয়া বেশ খুশি খুশি দেখাও করিয়েছিল রোহানের সাথে রাশীর। কিন্তু রাশীর আসল উদ্দেশ্য ছিল রোহানের কান ভাঙিয়ে রিয়াকে দুর করে রোহানকে নিজের করে পাওয়ার। কিন্তু কিভাবে তা করা যায় সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না রাশী। এরকম ভাবে কিছুদিন যাওয়ার পরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

দিন টা ছিল শুক্রবার , সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় দেখে একটা অল্পবয়সী ছেলে রাশীর বাড়ির সামনে দাড়িয়ে। রাশী একটু সন্দেহের বশে বলল ‘কাকে চাই!’ ছেলেটি তার দিকে ফিরে জবাব দিল ‘রাশী রায়। একটা পার্সেল আছে তার নামে।‘ রাশী ছেলেটির হাতের দিকে তাকিয়ে নিয়ে সে জানাল সে-ই রাশী। ছেলেটি সাদা খামে মোড়া পার্সেলটা তার হাতে দিয়ে চলে গেল। সে পার্সেলটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল , কোনো নাম-ঠিকানা নেই পাঠালো কে এই পার্সেল। ঘরে ঢুকেই খামটা ছিড়ে ফেলল সে , বেরোলো একটা একটা ছোটো পেনড্রাইভ। সেটা রাশী ল্যাপটপে পোর্ট করে ওপেন করল.... একটাই অডিও ফাইল রয়েছে। ডাবল ক্লিক করতেই একটা ভারী আওয়াজ “হ্যালো রাশী , আমি জানি তুমি রোহানকে নিজের করে পেতে চাও। আমি তোমাকে এতে সাহায্য করতে পারি , তোমাকে ওকে শুধু নিজের বাড়িতে ডেকে ওর সাথে একটু ঘনিষ্ঠ হতে হবে আর সেই ভিডিও রেকর্ড করে আমাকে দিতে হবে। তারপরে বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দাও , এই ভিডিও এমনভাবে ছাড়ব যাতে তোমার বন্ধু রিয়া রোহানের সাথে সম্পর্ক ভাঙে। ভিডিও কিভাবে দেবে সেটা আমি পরে জানাবো। আমার ফোন নম্বর - 9018567849“ রাশী বেশ খুশী হলেও ভাবছিল কে এই ব্যক্তি যে তাকে বিনা কারণে সাহায্য করছে নাকি তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।

বেশী না ভেবে রোহানকে সে আমন্ত্রণ দিল তার বাড়ীতে খাওয়ার ,রোহান প্রথমে ইতস্তত: করলেও পরে রাজী হয়ে যায়। সেই অচেনা ব্যক্তির কথামোতো রোহানকে মদ খাইয়ে তার সাথে ঘনিষ্ঠ-ও হয় আর ভিডিও তোলে। বেশকিছুদিন পরে সেই ব্যক্তিকে হোয়াটস্অ্যাপে ভিডিওটা পাঠায় , আজ বেশ খুশী সে। ইতিমধ্যে তার বাড়ীর ডোরবেল বেজে উঠল , রাশী দরজাটা খুলতেই একজন কালো হুড দেওয়া লোক ঘরে ঢুকে এল। রাশী একটু ভয় পেয়ে বলল ‘কে আপনি??’ লোকটা একটু হেসে বলল ‘ভিডিওটার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু তোমার জীবন আমার কাজে বাধা হতে পারে আর তাই সেই বাধা দুর করতে এলাম। তোমার সাথে রোহানের প্রেমালাপ করানোর কোনো ভাবনা আমার ছিলনা , তুমি ছিলে শুধু একটা টোপ।‘ রাশী কিছু একটা বলার আগেই লোকটার গ্লাভস পরা হাতের শান দেওয়া ছুরি রাশীর গলার নলী চিরে দিল। লোকটা বেরোনোর সময় রাশী কে দেওয়া পেনড্রাইভটা নিয়ে গেল।

॥চতুর্থ॥

পার্টির পরেরদিন ইন্সপেক্টর সেনের সাথে কথা মত অমিত সোমানি লালবাজারে তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সেন নিজের চেম্বারে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিলেন। সোমানিকে ঢুকতে দেখে উঠে সম্বোধন করলেন ‘আসুন স্যার...’ আরো কিছু একটা বলতে গিয়েও সোমানির পাশের ব্যক্তি কে দেখে আটকে গেলেন। বললেন ‘এনাকে তো ঠিক চিনলাম না।‘ সোমানি জবাব দিলেন ‘ইনি রাহুল সাহা, আমার ফিনানসিয়াল অ্যাডভাইসার। আমাদের এখানে এই 7-8 মাস ধরে কাজ করছেন আর আমার খুব ক্লোজ। আপনি যা বলার বলতে পারেন , রাহুল থাকলে আমি একটু ভরসাই পাবো।‘ সেন সম্মতি জানালেন। যা কথোপকথোন হল তা এরকম :

সেন –স্যার , আপনাকে কিছু লোকাবোনা। রাশী রায়ের ফোন থেকে একটা ভিডিও আমরা পেয়েছি যেখানে রাশী আর রোহান কে বেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থাতে দেখা গেছে রাশীর বেডরুমে।

সোমানি – কবেকার ঘটনা?

সেন – ৪-৫ দিন আগের ভিডিও।

রাহুল – আচ্ছা , ভিডিওটা কি আসল? মানে আজকাল তো টেকনোলজি ইউজ করে অনেক কিছুই করা যায়!

সেন – ল্যাব থেকে অলরেডি রিপোর্ট পেয়েই স্যার কে আমরা জানিয়েছি।

সোমানি – ওসব বাদ দিন! আমার রেপুটেশন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কোনো প্রমাণ কি আছে?

সেন – স্যার , মার্ডার ওয়েপন পাওয়া গেছে খুনের জায়গা থেকেই। হাতের ছাপ পেয়েছি যা টেস্ট করলেই বোঝা যাবে।

সোমানি – যা করবেন করুন , আই ডোন্ট কেয়ার। মিডিয়া যেন কোনোমতে জানতে না পারে , রেপ-মার্ডার কেস বলে চালিয়ে দেবেন। এত রেপ হয় আজকাল কেউ খেয়াল-ও করবেনা।

সেন- হ্যা স্যার , সে তো আগেও .... যাক গে। আমরা অলরেডি রোহানকে উঠিয়ে এনেছি আর ওর হাতের ছাপ টেস্ট করা হচ্ছে। জলের মত সোজা কেস স্যার।

সোমানি একবার রাগের দৃষ্টিতে সেনকে আপাদমস্তক দেখে নিলেন।

রাহুল এবার সোমানির দিকে তাকিয়ে বলল ‘সব-ই তো হল স্যার , কিন্তু রিয়াকে কি করে বোঝাবেন।‘ সোমানি তাকে একটু কোণে নিয়ে গিয়ে বললেন ‘রিয়ার দায়িত্ব তোমার ওপর ছাড়তে চাই। রোহানকে কোনোকালেই আমার ভালো লাগতোনা।রিয়া কে বোঝানোর কাজ তোমাকে দিলাম।‘ রাহুলের চোখে যেন একটা আনন্দ ফুটে উঠল।

ইতিমধ্যে একজন কন্সটেবল আসলেন হাতে একটা খাম নিয়ে আর সেনের হাতে দিলেন। সেন খামটা খুলে ভিতরের রিপোর্টটা পরলেন ‘যা ভেবেছিলাম তাই স্যার , রোহানের হাতের ছাপ-ই ছুরির ওপর।‘ ওই কন্সটেবলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন ‘ওকে জেলে ভর!’ রোহানের আর্ত চিতকার শোনা গেল ‘আমি কিছু করিনি!! আমাকে কেউ ফাসিয়েছে স্যার! প্লিজ বিলিভ মি স্যার। আমার কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে।‘

হঠাত রিয়া সোমানি চেম্বারে ঢুকে এল ‘বাবা এসব কি হচ্ছে আমায় না জানিয়ে? রোহানকে পুলিশ কেন ধরে এনেছে!’ সোমানি চিতকার করে উঠলেন ‘চুপ!! একদম চুপ! একটা লোক কিরকম সেটা কি জানো তুমি? তোমার রোহান রাশীকে ভোগ করার পরে খুন করেছে। যদি বিশ্বাস না হয় ওর হাতের ছাপের রিপোর্ট দেখে নাও।‘ রিয়া যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলোনা আর কেদে ফেলল। বলতে লাগল ‘রোহান নির্দোষ। ও কিছু করেনি।‘ রিয়া এবার রাহুলের দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল ‘আমি জানি কে আছে এর পিছনে। আমি রোহানকে নির্দোষ প্রমাণ করবোই।‘

সেন এবার বললেন ‘স্যার , এখানে আর কিছু বলবেননা ওনাকে। বাড়ি চলে যান। রোহান যেন কঠোর শাস্তি পায় সে ব্যবস্থা আমরা করবো।‘ অমিত সোমানি কোনরকমে রিয়াকে ধরে নিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। রাহুল বলল ‘স্যার , আপনারা যান আমি সেন সাহেবের সাথে কিছু কথা বলে আসছি।‘

ওদের গাড়ি বেরিয়ে গেলে রাহুল সেনের চেম্বারের ভেতরে আসল। ওদের মধ্যে কথা এরকম হল:

সেন – আমার টাকা পৌছে গেছে তো অ্যাকাউন্টে! তোমার কথা মতই কিন্তু রিপোর্ট বানালাম। বেচারা রোহান! কেন করছ এরকম।

রাহুল(একটু কিছু ভেবে) – রিয়া শুধু আমার। ওকে পাওয়ার জন্য আমি সব করতে পারি , এমনকি খুন-ও। রোহানের ভাবনা নেই আর , এবার সোমানির ব্যবস্থা করতে হবে। আপনি কিন্তু মিডিয়াকে আসল খবরটাই বলবেন।‘

এ কথা শুনে সেন একটু অবাক হয়ে বললেন ‘তাতে তো বদনামি বাড়বে , তোমার কি লাভ তাতে?’

রাহুল একটু ভেবে বলল ‘সময় মত সব জানতে পারবেন। আমি যা বলছি তা শুধু করে যান। ‘ কথা শেষ করে রাহুল নিজের পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে বলল ‘এটা নষ্ট করে দিন। রাশীকে দেওয়া ইন্সট্রাকশন যেন কেউ জানতে না পারে।‘ সেন ক্রুর হাসি হেসে বললেন ‘ সে তুমি যা করার কর, শুধু আমার পকেটের দিকে খেয়ালটা রেখো , বাকি সব কাজ হয়ে যাবে।‘ রাহুল এবার সেনের দিকে তাকিয়ে বলল ‘আপনি যা যা পাওয়ার যোগ্য আপনি সব পাবেন।‘

॥পঞ্চম॥

গত দুইদিন হল রোহান জেলের কাঠগড়ার পেছনে , সে আর কোনো কাকতি-মিনতি করছেনা। হয়তো তার সব আশা শেষ হয়ে গেছে বলে এরকম ভাবে আছে। একজন কনস্টেবল তার সেলের কাছে এল ‘তোমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন। ২ মিনিটের বেশী দেওয়া হবে না।‘ রোহান একটু আকুল হয়ে বাইরে দেখল , রিয়া দাড়িয়ে সামনে। রোহানকে দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল , রোহান তাকে শান্ত করল। রিয়া এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল ‘আমি জানি কে তোমায় ফাসিয়েছে!’ রোহানের চোখে যেন আশার আলো ফুটে উঠল , জানতে চাইল ‘কে?’ রিয়া বলে চলল ‘সেদিন আমরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম আর রাহুল ইন্সপেক্টরের সাথে কথা বলতে ঢুকল আমাদের তুলে দেওয়ার পরে , আমি না যেয়ে দরজার বাইরেই দাড়িয়ে ছিলাম আর ওদের সব কথা শুনেছি। রাহুল রাশীকে খুন করেছে আর তোমায় ফাসিয়েছে। সেন-ও ঐ কাজে ওকে হেল্প করছে আর পয়সা-ও পাচ্ছে ওর কাছ থেকে।‘ রোহান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল ‘কিন্তু রাহুল কেন এইসব করবে? আমায় ফাসিয়ে কি লাভ। আমি তো ওকে চিনিওনা।‘

‘ওর আমার ওপর নজর আছে আর বাবার টাকা-ও ওর চাই। তুমি চিন্তা কোরোনা আমি ঠিক তোমাকে ছাড়িয়ে....’ রিয়া কথা শেষ করার আগে ওর কাছে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। ফোন উঠিয়ে একটু চমকে উঠে সে বলল ‘কখন? আমি এখন-ই হসপিটালে আসছি।‘ রোহানের কপালেও চিন্তার ভাজ ‘কি হোলো ,হসপিটাল কি জন্য্!’ রিয়া কাপা কাপা গলায় বলল ‘বাবার একটা ছোটো অ্যাটাক হয়েছে। তুমি ভেবোনা , তোমাকে আমি এখান থেকে বের করবো-ই।‘ বলে রিয়া বেরিয়ে গেল।

সল্টলেকের বেসরকারি হাসপাতালটাতে পৌছতে একটু বেশী সময়-ই লাগলো সোমবারের ব্যস্ততার কারণে। হাসপাতালে ঢুকে ডাক্তারের সাথে দেখা করে জানতে পারল যে অফিসেই হঠাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি, অফিসের একজন মেয়ে তাকে এনে ভর্তি করে এখানে। এখন তিনি একটু সুস্থ হলেও রেস্টের দরকার। বাবাকে কে এখানে নিয়ে এল সেটা জানতে চাইল রিয়া আর ডাক্তার একদিকে আঙুল দেখিয়ে দিতে সে দেখল একজন মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার বয়স খুব বেশী হলে ২৮, রিয়া তার কাছে এসে বলল ‘ধন্যবাদ, আপনি কি বাবার অফিসে কাজ করেন? আসলে আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো তাই আর কি....’ মেয়েটি বলল ‘আমি শ্রেয়া, আমি কিছুদিন হল কাজে এসেছি। বাই দ্য ওয়ে , আপনার বাবার পকেট এটা পড়ে গেছিল’ বলে সে রিয়া কে একটা পেনড্রাইভ দিল। রিয়ার সাথে নিজের নম্বর বিনিময় করে থেকে সে বিদায় নিল। বাবার কেবিনে ঢুকে রিয়া দেখল বাবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে , একটু কষ্ট হল তার। মা মারা যাওয়ার পরে এই লোকটাই তো তাকে বড় করেছে আদর দিয়ে কিন্তু রোহানের সাথে যে অন্যায় বাবা করছেন সেটাও সে মানতে পারছেনা। রিয়া ভাবতে থাকল এই পেনড্রাইভটাতে কি এমন কিছু আছে যাতে বাবা এতটা অসুস্থ হয়ে পড়ল। সে ঠিক করল রাতে বাড়ীতে ফিরে শুনবে সে এতে কি আছে।

॥ষষ্ঠ॥

রিয়া রাতে বাড়ীতে ফিরে পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে লাগিয়ে অডিও ক্লিপ টা চালাল আর একটা ভারী আওয়াজ শুনতে পেল ‘আপনার কি বদনামটাই না হল স্যার, আপনার হবু জামাই খুনের দায়ে জেলে আর যা প্র্মাণ ওর বিরুদ্ধে আছে বেরোতে ও পারছেনা। ওর কোনো দোষ নেই কিন্তু বড় জাহাজ যখন ডোবে সেই তোড়ে আশেপাশের ছোটো নৌকো-ও তো ডোবে তাইনা! এবার আপনার আর আপনার মেয়ের পালা। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর দিনটা কি মনে পড়ে স্যার? কি ভাবে একটা জঘন্য অপরাধ করে আপনি নিজের মত কেস সাজিয়ে পুলিশকে পয়সা খাইয়ে একজন নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন ! আপনার আসল চেহারা সবাই জানবে আর তারপরে আমি আপনাকে মারব।‘ রিয়া যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা যে সত্যি-ই তার বাবা কিছু এমন করেছে?

হঠাত মোবাইলটা বেজে উঠল , রিয়া রিসিভ করল। ওদিকে ইন্সপেক্টর সেনের উত্তেজিত গলা ‘রিয়া , আজ দুপুরের দিকে রোহানকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়ীটা উল্টে যায় শোভাবাজারের কাছে। তারপরে....’ বলতে গিয়ে থেমে বললেন ‘আপনি বাকিটা টিভিতে দেখে নিন , খবরে এসেছে!’ রিয়া জলদি ফোনটা রেখে টিভি চালাতেই একটা খবরের হেডলাইনে ফুটে উঠছে ‘শোভাবাজার ঘাটের কাছে পুরোনো একটা কারখানাতে একটি মাথাকাটা মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গায়ের জামাকাপড় আর পরিচয়পত্র দেখে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান মৃতদেহটি সদ্য ধৃত খুনের আসামি রোহান বসুর। সে পুলিশের থেকে পালাতে কারখানাতে ঢোকে কিন্তু কে বা কারা তাকে মারল পুলিশ তা তদন্ত করছে।‘ বাজের মত যেন আঘাত করল খবরটা রিয়া কে , হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু নিজেকে সামলে সে ভাবল এবার রাহুলকে আটকাতেই হবে। কিন্তু রাহুলের সঙ্গে বাবার শত্রুতাটা যে বেশ পুরোনো সেটা পরিষ্কার , ২০১২ সালে কি ঘটনা ঘটেছিল জানা গেলে পরিষ্কার হত।

আবার মোবাইলটা বেজে উঠল , ‘হ্যালো রিয়া , আমি শ্রেয়া। চিনতে পারছো?’ রিয়া প্রথমে ঠাহর করতে না পারলেও বুঝল কে। রিয়া জবাব দিল ‘হ্যা, বল’। শ্রেয়া বলল ‘তোমাকে একটা ঠিকানা আমি পাঠাচ্ছি , আমি ওখানে তোমার বাবাকে নিয়ে এসেছি। রাহুল সাহা বলে একজন নাকি তোমার বাবাকে খোজ করতে এসেছিল বারবার আর আমার সুবিধার মনে হয়নি। তাই আমি তোমার বাবাকে নিয়ে এসেছি। তিনি ভালো আছেন।‘ ফোনটা রাখতেই রিয়া শোভাবাজারের দিকেই একটা ঠিকানা পেল মোবাইলে। রিয়ার মনে খটকা লাগল , শ্রেয়া মেয়েটা এত ভাবছে কেন বাবাকে নিয়ে। শুধুই কি অফিসে কাজ করে না বাবার সাথে অন্য কোনো যোগ আছে।

॥সপ্তম॥

ইন্সপেক্টর সেন নিজের গাড়ীতে উঠেছেন শোভাবাজার কারখানার ক্রাইম সাইটে যাওয়ার জন্য। মৃত্যুর মিছিল এত লম্বা হয়ে যাবে তিনি সেটা ভাবতে পারেননি। রাহুলকে একটা ফোন করলেন তিনি , রাহুল তুলল ‘বলুন।‘ সেন বললেন ‘সোমানিকে পেলে?’ রাহুল বলল ‘না , আর ওকে শেষ না করা অবধি আমার শান্তি নেই। সাবধানে থাকবেন, আরেকজন কিন্তু খেলাতে আছে।‘ বলে ফোনটা কেটে দিল রাহুল। সেন গাড়ীতে বসেই নিজের মনেই বলতে থাকলেন ‘আরেকজন মানে?’ গাড়ীর পেছনের সিটের অন্ধকার থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ শোনা গেল ‘সেই আরেকজন আপনার পেছনে!’ বলে একটা সরু তার সেনের গলাতে পেচিয়ে দিল। সেন অনেক কষ্টে বললেন ‘কে তুমি?’ মেয়েটি এবার সামনে এগিয়ে আসতেই সেন যেন চমকে উঠলেন আর গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরোলো ‘শ্রেয়া!! তুমি??’ শ্রেয়ার হাত আরো শক্ত হয়ে উঠছে ‘মনে পড়ছে ? কত করে বললাম কেস নিতে। কিন্তু সেদিন মিথ্যে কেস সাজালেন আপনি! এবার মরুন!’ সেন লুটিয়ে পড়লেন। শ্রেয়া রওনা দিল শোভাবাজারের উদ্দেশ্যে।

রিয়া শোভাবাজারের সেই ঠিকানার কাছে প্রায় পৌছে যাওয়ার সময় দেখতে পেল রাহুল-ও ওখানে ঢুকছে। রিয়া রাহুলের পেছনে যেতে শুরু করল পা টিপে টিপে। হঠাত পেছন থেকে একটা হাত অনুভব করল , ফিরে দেখে শ্রেয়া। রিয়ার কাছে রাহুলের কথা শুনে শ্রেয়া ও রিয়া আস্তে আস্তে ঢুকল ভেতরে , ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা বড় রুমের মধ্যে রাহুল ঢুকল , তারা আবছা আলোয় দেখতে পেল। ঘরটার কাছে গিয়েও তারা ভেতরে গেল না। শ্রেয়া এবার ভেতরে আস্তে ঢুকতে থাকল আর হাতে একটা পিস্তল বেরিয়ে এল। রিয়া শিউরে উঠল। শ্রেয়া ঢুকতেই রাহুল যেন ভূত দেখার মত চমকে উঠল। শ্রেয়া রাহুলের দিকে বন্দুক তাক করে ঠান্ডা মাথায় বলল ‘সোমানিকে মার। তাহলেই ভিডিও ডিলিট করব আমি নাহলে তোমার আসল রুপ কিন্তু সবাই জানবে!’

রিয়া শ্রেয়াকে আটকাতে গেলে শ্রেয়া এক ঘুষিতে রিয়াকে ফেলে দেয়। রাহুল প্রায় কাদোকাদো অবস্থাতে বলল ‘একটা ভুল হয়ে গেছিল, মাফ করে দাও! প্লিজ্।‘ শ্রেয়া ক্রুর হাসি হেসে বলল ’৪০ মিনিট ধরে তোমরা ভুল করছিলে? সোমানি আর তোমাকে দুজনকেই মরতে হবে কিন্তু আমি দেখতে চাই তুমি সোমানিকে মারবে।‘ সোমানি এতসময় ধরে চুপ করেছিল ভয়ে , এবার সে বলল ‘প্লিজ শ্রেয়া, আমার পরিবার আছে একটা। মেরোনা আমাকে!’ শ্রেয়া এবার বলল ‘ওকে! তাহলে নিজের কীর্তি নিজের মেয়েকে শোনা!’ রিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে আছে চোখে জল নিয়ে ,’বাবা তুমি কি করেছ?’ সোমানি এবার মাথা নিচু করে বলতে থাকল ‘আমি যখন কলেজের প্রফেসর ছিলাম, শ্রেয়া আমার ছাত্রী ছিল। আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি আর ওর সাথে ফেস্ট নাইটে শারীরিক সম্পর্ক করি...মা..মানে ধর্ষণ করি!’ রিয়া ‘ছি:’ বলে বাবার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তিনি বলতে থাকলেন ‘এই ঘটনা দেখে ফেলে রাহুল আর রাহুল ওই কলেজেই পড়ত। ওর মুখ বন্ধ রাখতে আমি আর রাহুল মিলে আবার শ্রেয়াকে বারবার ধর্ষণ করি আর রাহুল পুরো ঘটনাটা নিজের মোবাইলে তোলে যাতে শ্রেয়া মুখ না খোলে। তারপর শ্রেয়া কলেজ ছেড়ে দেয়।‘ এটুকু বলে তিনি থামলেন। সবাই চুপ। হঠাত গুলির আওয়াজ এল আর সোমানি লুটিয়ে পড়লেন। রিয়া শ্রেয়ার দিকে দেখল ,না , শ্রেয়া চালায় নি গুলি। গুলির চালক বাইরে দাড়িয়ে , সে বলল ‘পুরো দায় কোনোদিন নিল না শালা!’ রিয়া তাকে দেখে অবাক , রোহান হাতে বন্দুক নিয়ে দাড়িয়ে আর রাহুলের দিকে তাক করা ‘জানো রিয়া, আমার বাবা ওই কলেজে এক সাধারণ ক্লার্ক ছিলেন। তোমার বাবা ওই ইন্সপেক্টর সেন আর হারামি রাহুল সাহার সাথে মিলে আমার বাবাকে ফাসিয়ে দেয় ধর্ষণ কেসে। বাবা অপমান না নিতে পেরে আত্মহত্যা করে। আ-আমার বাবা ছাড়া কেউ ছিলনা, তখন আমি ঠিক করি যে শোধ আমি তুলবই। আমি প্ল্যান করতে শুরু করি। প্রথমে শ্রেয়া কে খুজে প্ল্যানে নিলাম, তারপরে তোমার সাথে প্রেমের নাটক করতে থাকলাম। রাহুলের সেই ভিডিওটা আমি পেয়েছিলাম রাহুলের কাছেই , সেটা ইউজ করলাম যাতে ওকে আমি ইউজ করতে পারি। তাই হোলো.... তোমার বাবার কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ানো, তোমার বন্ধুকে খুন করানো, নিজের হাতের ছাপ ছুরির ওপর দিয়ে আসা , অডিও ক্লিপ গুলো সবাইকে পাঠানো সব আমার করানো কিন্তু করেছে রাহুল।‘ রিয়া বিশ্বাস করতে পারছেনা যাকে খুনের দায়ে ধরা হয়েছিল সে সত্যি-ই খুনী। কোনোরকমে সে বলল ‘তোমার গলা কাটা দেহ?’ রোহান হাসতে হাসতে বলল ‘ওটা তো যখন পালিয়ে ঢুকলাম কারখানাতে এক কন্স্টেবল-ও ঢুকেছিল আমাকে পিছু নিয়ে। ওকেই মেরে গলা কেটে নিজের জামাকাপড় , ওয়ালেট বডির কাছে রেখে গেলাম। দুনিয়ার কাছে আমি মৃত।‘ এবার চোয়াল শক্তা করে রাহুলের দিকে তাকিয়ে সে বলল ‘আর কিছু বলার আছে? না থাকলে টা টা।‘

রিয়া এবার মুখ খুলল ‘দাড়াও রোহান! আমি মানছি তোমার আর শ্রেয়ার সাথে যা হয়েছে তা অন্যায় আর তার শাস্তি বাবা পেলো-ও। রাহুল-ও পাবে কিন্তু আমি কি দোষ করেছিলাম। আমি তো তোমায় সত্যি ভালোবেসেছিলাম , একসাথে থাকতে চেয়েছিলাম! আমার ভালোবাসার এই প্র্তিদান দিলে তুমি?’ রোহান একটু গম্ভীর হয়ে বলল ‘তুমি কোল্যাটেরাল ড্যামেজ।‘

এবার হঠাত কাছেই পুলিশের গাড়ীর সাইরেন বাজল , পুলিশ এসে পড়েছে। রিয়া এবার পকেটের থেকে মোবাইলটা বের করল ‘শ্রেয়া যখন ফোন করে বলল যে বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে সে, আমার খটকা লাগল আমি পুলিশকে জানালাম। কিন্তু আমার কাছে খুন গুলোর কোনো প্রমাণ ছিলনা। হাতে নাতে-ই আমায় খুনের প্রমাণ নিতে হত। তাই আমি ফোনটা পুলিশের লাইনের সাথে কানেক্ট করে রেখেছিলাম শ্রেয়া আর রাহুলকে ধরার জন্য। কিন্তু তুমি যে এসবের মাস্টারমাইন্ড সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।‘ পুলিশ এসে শ্রেয়া, রাহুল আর রোহান তিনজনের হাতেই হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে পুলিশের গাড়িতে তুলল। রিয়া শেষবারের জন্য গাড়ির দরজার কাছে এল , চোখে তার জল। রোহান মুখটা নামিয়ে বসে। রিয়া বলল ‘শেষবারের জন্য একটা কথা বলে যাই। আমি জানি আমার বাবা একজন জঘন্য লোক আর সে তোমার জীবন শেষ করে দিয়েছে , কিন্তু একটা কথা মনে রেখো যে ঘৃণা কিন্তু খুব ভেবে চিন্তে করা উচিত... কারণ আমরা যাকে ঘৃণা করতে থাকি একদিন আমরাও তার-ই মত হয়ে যাই। আর সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ গুলো হারিয়ে যায়।‘ বলে সে একটা দীর্ঘ:শ্বাস ফেলে বলল ‘চলি।‘ রোহান রিয়ার চলে যাওয়া শূন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকল।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮