• পার্থ সেন

আইডেন্টিটি ক্রাইসিস


যে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা –

নয়নে আঁধার রবে, ধেয়ানে আলোকরেখা।

[১]

আজিমগঞ্জ স্টেশন টা পেরোতেই বৃষ্টিটা যেন ঝাঁপিয়ে এল। অনেকক্ষণ থেকেই আকাশ টা কেমন থমথমে লাগছিল, এবারে একেবারে মুষলধারে নামল। আমার কামরাটা মোটামুটি খালি, আর আমার জায়গাটায় আমি একাই ছিলাম, কাঁচের জানলা নামিয়ে দিলাম নাহলে এতো জোরে বৃষ্টির ছাট যে সীটটাই ভিজে যেত। বেশ ভালো লাগে ট্রেন থেকে বৃষ্টি দেখতে, বাইরের আলো বেশ কমে এসেছে। কামরার ভেতরের আলোর জোর একেবারে কম, সুতরাং বই পড়া সম্ভব নয়। তাকিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টিই দেখছিলাম। আমার গন্তব্য মালদা, এখনো প্রায় তিন ঘন্টা। যাচ্ছি আমার কলেজের এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে। ওদের বাড়ি মালদা থেকে আরো এক ঘন্টা, তাই আজকের রাতটা মালদাতেই একটা হোটেলে থাকবো, বুক করা আছে, তারপর কাল সকালে ওদের বাড়ি। ইচ্ছে আছে দুদিন বাদে কলকাতা ফেরা। অবশ্য পুরো সপ্তাহটাই ছুটি নেওয়া আছে। তাই দু দিনের জায়গায় তিন দিন ও থাকা যায়। নিজের পরিচয়টা জানিয়ে রাখা দরকার, আমার নাম নিখিল চৌধুরী, আসলে আমরা চৌধুরী আর বাবা ছিলেন কবিগুরু র খুব বড় ভক্ত, তাই ছেলে হবার সংবাদ শুনেই আর সুযোগ ছাড়েন নি, ‘ঘরে বাইরে’ চরিত্রের নামে আমার নামকরন করেন। আমি অবশ্য এখন আর নিখিলেশ লিখি না, শুধু নিখিল লিখি। যাই হোক, কলকাতার একটি প্রথম সারির খবরের কাগজে সাব এডিটর হিসেবে অফিসে কাজ করি। আসলে শেষ সময়ে রাতের ট্রেনের রিসারভেশন পেলাম না, তাই তিস্তা তোর্সাই ধরতে হলো। আজ অবশ্য ট্রেন বেশ খালি আসছে, বোলপুরের পর তো আমাদের কামরাটা মোটামুটি খালি ই হয়ে গেল।

যা হোক, ফরাক্কা জংশন পেরোতে প্রায় সাড়ে নটা হয়ে গেল। বৃষ্টি এখনো থামেনি, অবশ্য বেগ টা একটু কমেছে। প্ল্যাটফর্মে নেমেছিলাম, আর একবার চা খেয়ে নিজের জায়গায় ফিরে আসব ঠিক এই সময়ে এক বয়স্ক ভদ্রলোক কে দেখলাম, কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর আমার দিকে কেমন এক জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছেন। একটু অপ্রস্তুত বোধ করলেও আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এলাম। ভদ্রলোক আমার পিছু পিছু ই এলেন, এবারে ওনার গলা শুনলাম, তাকাতে বুঝলাম কথা গুলো আমাকেই বলা হলো –

“ডঃ ঘোষ ভালো আছেন?”

“আমাকে বলছেন?”

“হ্যাঁ, আপনি ডঃ অমিতাভ ঘোষ তো!”

“না আপনি ভুল করছেন আমি অমিতাভ ঘোষ নই”

ভদ্রলোক কেমন অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে খানিক ক্ষন তাকিয়ে রইলেন, আবার বললেন তবে এবারে একটু স্বগোক্তির মতো, “আপনি ডঃ ঘোষ নন? এতো মিল চেহারায়!”

বাধ্য হয়ে চুপ করে রইলাম, এই রকম পরিস্থিতিতে যদিও আগে কখনো পড়িনি, তবে শুনেছি। আমার কোন কথা বলা উচিত হবে কি না ভাবছি ঠিক এই সময়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, “আপনার যদি আপত্তি না থাকে আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে পারি কি?”

“কি জিনিস?”

“আসলে উনি আমাকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলেছিলেন তারপর এই জানুয়ারিতে ওনার সাথে একটা ছবি তুলেছিলাম, আপনাকে একবার ছবি টা দেখাতে পারি?”

“দেখুন ছবি তে যাই থাকুক আমি ডঃ অমিতাভ ঘোষ নই, আমার নাস নিখিল চৌধুরী। ঠিক আছে আপনার দেখাতে ইচ্ছে করলে দেখান, আমার আপত্তি নেই”

ভদ্রলোক নিজের মোবাইলে একটি ছবি বার করে দেখালেন, ডঃ অমিতাভ ঘোষের সঙ্গে ওনার। দেখে আমার সারা শরীর কেমন কাঁটা দিয়ে উঠল। এতো আমার ই ছবি, চোখ, নাক, মুখ, চুলের স্টাইল একেবারে অবিকল এক। এই বয়স্ক ভদ্রলোককে আমি আগে কখনো দেখিনি, ওনার সঙ্গে ফটো তোলানো তো দূরের কথা। রংটা বুঝতে খুব ভুল না হলে এই রঙের একটি শার্ট ও আমার আছে। যা দেখছি একি বাস্তবে সম্ভব? এ জিনিস গল্পের বইতে পড়েছি, সিনেমায় দেখেছি, কিন্তু চোখের সামনে এভাবে কখনো হয়নি। সত্যি বলতে আমার একটু ভয় লাগল, পরিস্থিতিটা ভদ্রলোকই একটু হাল্কা করে দিলেন। “তা এই দিকে এসেছেন কোন দরকারে?”

“হ্যাঁ, মালদায় একটা বিয়ে বাড়ি আছে”

“বাড়ি কি কলকাতা?”

“হ্যাঁ, উত্তর কলকাতা, আর আপনি?”

“আমার নাম অতীন সান্যাল, মালদা জেলায় গৌড় বলতে যে জায়গাটা বোঝায় সেখানেই আমার বাড়ি”

“কি করেন আপনি ?”

“রিটায়ার করেছি প্রায় পাঁচ বছর হল, স্কুল টিচার ছিলাম, এখন ঐ কিছু এখানে ওখানে প্রাইভেটে পড়াই আর একটা দুটো জায়গায় একটু অ্যাকাউন্টসের কাজ দেখি। পেনশনের টাকা তো সামান্য, তাই এখনো দৌড়তে হয়। যা হোক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, আমি আমার স্ত্রী, দুই বুড়ো বুড়ি, দুজনে এই ভাবে চলছে আর কি!”

“তা আপনি বলছিলেন এই ডঃ অমিতাভ ঘোষ আপনাকে চিকিৎসা করেছিলেন, কি হয়েছিল আপনার?”

“ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, তিনটে ব্লক পাওয়া গেছিল, কলকাতা বা ব্যাঙ্গালোর গিয়ে চিকিৎসা করানোর সময় ছিলো না, তা সেই রামপুরহাটের মতো জায়গায় চিকিৎসা হয়, তারপর কলকাতায় গিয়ে ‘লাইফ লাইন’ হসপিটালে বাইপাস সারজারি। সারাক্ষন আমাদের সঙ্গে ছিলেন, উনি ছাড়া আমার বাঁচার কথা ছিলো না। যাহোক আমি এখন পুরো ফিট!”

“হঠাত করে মালদা ছেড়ে রামপুরহাট কেন?”

“ওখানেই একটা কো-অপারেটিভ সংস্থায় আমি তখন কাজ করতাম, সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। শিফট করানোর সময় ছিলো না, তা আপনি মালদা যাচ্ছেন হোটেল বুক করা আছে তো?”

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম, আর বেশী কথা হলো না। আসলে আমার পরপর দুটো ফোন এল, তারপর দুই জন আরো যাত্রী আমাদের সীটে এসে বসলেন। খালি মালদা স্টেশন ঢোকার সময় অতীনবাবু বিদায় নেবার আগে বলে গেলেন “ঠিক আছে, আসছি তা তাহলে। সরি আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম, তবে আপনাকে দেখে কিন্তু অনেকেই ভুল করবে”

মালদা স্টেশনে পৌঁছতে প্রায় দশটা হয়ে গেল, তার পর হোটেলে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে দশটা। ট্রেন থেকে ফোন করে দিয়েছিলাম, রাস্তা খুঁজে পৌঁছতে কোন অসুবিধা হয়নি। সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল, খালি ওদের ডাইনিং রুম টা বন্ধ হয়ে গেছিল। হোটেলের ম্যানেজার আমার ঘরেই খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। হাত মুখ ধুয়ে টিভি টা চালিয়েছি, দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ হল, বুঝলাম আমার খাবার এসে গেছে। দরজা টা খুলে রেখেছি আমার ঘরে খাবার দেওয়ার কাজ চলছে ঠিক এই সময়ে বাইরের প্যাসেজ থেকে একটা গলার আওয়াজ পেলাম,

“ডঃ ঘোষ আপনি এখানে? কি ব্যাপার?”

আমার বয়সী এক ভদ্রলোক, আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। আমি কিছু বলার আগেই আবার বললেন, “সব ঠিকঠাক আছে তো? কারুর শরীর টরির খারাপ নয়তো?”

একে রাত হয়ে এসেছে তারপর খিদেও খুব জোরে পেয়েছে, কোন কথা বারানোর প্রশ্ন আসে না, সরাসরি বললাম “আপনি ভুল করছেন, আমি কোন ডঃ ঘোষ নই, আমার নাম নিখিল চৌধুরী, এখানে এক জনের বাড়ি এসেছি” হাত তুলে এমন ভাবে নমস্কার জানালাম যাতে বোঝা যায় “আমাকে আর বিরক্ত করবেন না”।

ভদ্রলোক খানিক টা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন, তার পর এগিয়ে গেলেন নিজের রাস্তায়। খাবার দিয়ে হোটেলের ছেলেটি চলে গেল, আমি আর দেরি না করে শুরু করে দিলাম। খাওয়া সেরেই সিগারেটের টান এক অমোঘ আকর্ষণ, কাজেই বাইরে একবার বেরোতেই হল। আর বাইরে আবার দেখা হল, সেই ভদ্রলোকের সাথে। তবে এবারে উনি আমাকে আর কোন প্রশ্ন করেন নি। তবে বেশ বুঝতে পারছিলাম থেকে থেকে আমাকে নিরীক্ষন করছেন আর চোখে চোখ হতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছেন। বাধ্য হয়ে ব্যাপারটাকে সহজ করতে নিজেই কথা বললাম,

“আপনি ভুল করছেন, একটু আগে আমার সঙ্গে আসছিলেন এক ভদ্রলোক উনি ও এক ভুল করেছিলেন”

“একটা কথা জিগ্যেস করতে পারি কি?”

“বলুন!”

“আপনি কি কোন কারনে পরিচয় গোপন করে রেখেছেন?”

এ আবার কি বেয়াড়া টাইপের প্রশ্ন? আমি সাধারনত কাউকে কোন কড়া কথা বলি না, তবে এইবার বলতেই হল, “আপনি কি বাংলা ভাষা বোঝেন না! আমি তো বললাম যে আমি অমিতাভ ঘোষ নই, হয়তো চেহারায় মিল থাকতে পারে! শুধু শুধু কেন কথা বাড়াচ্ছেন?”

ভদ্রলোক একটু কাঁচুমাচু ভাবে আমার দিকে তাকালেন, “সরি দাদা, আমার ভুল হয়ে গেছে, আপনি কিছু মনে করবেন না। আসলে আপনি জানেন না, আপনার সঙ্গে ওনার চেহারায় কতো টা মিল আছে?”

সেটা অবশ্য আমি দেখেছি একটু আগে, কিন্তু অনর্থক সেটা বলার কোন মানে হয় না, তাই কিছু ই হয়নি ব্যাপার টা বোঝাতে আমি বললাম, “আপনার নাম কি? কি করেন আপনি?”

“আমার নাম শুভদীপ সাহা, আমি সেলসে কাজ করি। সে কাজেই এখানে আসা। রামপুরহাটে আমার বাড়ি!”

“তা এই ডঃ ঘোষ আপনার কেউ হন?”

“উনি মানুষ নন, সাক্ষাত দেবতা! আমার বাবাকে চিকিৎসা করেছিলেন, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, আমার তো সামর্থ্য ছিল না অত পয়সা খরচা করে চিকিৎসা করানোর। যা করার উনি ই করেছিলেন। পয়সাও তেমন কিছু নেন নি। সরি স্যার, আপনাকে শুধু শুধু বিরক্ত করলাম, আসলে ওনাকে কোন দিন ভুলতে পারবো না তো, তাই! আসি স্যার”

সিগারেটটা শেষ করে ঘরে ফিরলাম, সত্যি এই রকম তো কখনো হয় নি। হালকা মানসিক একটা শক আমাকে মাঝে মাঝে ভাবাচ্ছিল। আমি অবশ্য খবরের কাগজের অফিসে কাজ করি, একটু চেষ্টা করলে রামপুরহাটের জনৈক মানবদরদী ডাক্তার অমিতাভ ঘোষকে খুঁজে ফেলা টা খুব শক্ত হবে না। তাহলে হয়তো এতো দিন যা বই তে পড়েছি সেটা কে সত্যি কিনা একবার পরখ করে দেখা যায়। মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে যে একদম হচ্ছিল না নয়, কিন্তু খুব টায়ার্ড ছিলাম। বেশীক্ষন আর ভাবতে পারিনি, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।

পরের দুটো দিন বেশ কাটল, আমার প্রেসিডেন্সীর বন্ধু শশাঙ্ক। আমরা খুব ক্লোস ছিলাম, কলেজ শেষ করে আমরা কিছু দিন এক জায়গায় চাকরিও করেছি। তার পর দুজনের চলার রাস্তা আলাদা হয়ে যায়, যদিও বন্ধুত্বটা আগের মতো ছিল। সে কারনেই আসা, আর আমাকে ওর বাড়িতে মোটামুটি সবাই চেনেন। সুতরাং আমিও বেশ আনন্দ করলাম এই দুটো দিন। সত্যি বলতে কি এই দুদিনে ডঃ অমিতাভ ঘোষের কথা আমার একেবারে মনে পড়েনি। মালদা তে একটা দুটো ঘোরার জায়গা আছে জানতাম। আমার আবার মিউজিয়াম দেখার খুব শখ, তাই সেটা আর আদিনা মসজিদ দেখে ফিরে যাব সেই রকম ইচ্ছে ছিল। মেয়ের বিয়ের পর বিয়ে বাড়ি ভাঙ্গা হাট হয়ে যায়, তাই কাছাকাছি কোন এক হোটেলে একরাত কাটিয়ে কলকাতা ফিরবো ঠিক করলাম। শশাঙ্ক থাকতে বলছিল কিন্তু আমি আর ভিড় বাড়ালাম না।

আদিনা মসজিদ হয়ে মালদার মিউজিয়াম দেখে ফিরছি। সিগারেট টা শেষ করে সাইকেল রিক্সা ধরবো ঠিক এই সময়ে পেছন থেকে একটা গলা শুনলাম, “কি ব্যাপার ডাক্তার বাবু? আপনি মালদা এসেছেন জানান নি তো?”

মুখ ঘোরালাম মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক, নিতান্ত সাধারন পোশাক, হাফ শার্ট, পরনে রং ওঠা একটা জীনস, আমার দিকে কেমন হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছেন। “আমাকে বলছেন?”

“হ্যাঁ, আমাকে চিনতে পারছেন না, ডাক্তার বাবু?”

“আপনি ভুল করছেন আমি কোন ডাক্তার নই। আর আমি আপনাকে চিনি না। কোন দিন দেখা হয়েছে বলে মনে নেই”

“তাহলে?”

“তাহলে, টাহলে আর কিছু নয়, আপনি যাকে ভাবছেন তিনি আমি নই, হয়তো চেহারায় মিল থাকতে পারে”

সাইকেল রিক্সায় উঠে পড়লাম, বুঝতে পারছি এই ভদ্রলোকও আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অতীন সান্যাল, শুভদীপ সাহা তার পর আর এক জন! এই রকম চলতে থাকলে আমার আইডেন্টিটি নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠে যেতে পারে। আমার কি ডঃ অমিতাভ ঘোষ কে খোঁজা উচিত? বুঝতে পারছি না, একি কেউ ইচ্ছে করে আমাকে সমস্যায় ফেলার জন্য করছে। করলেও পরপর তিনজন? তাছাড়া আমি এক নিতান্ত সাধারন, ভীতু টাইপের মানুষ, কাজ ও খুব সাধারন করি। টাকা পয়সা, সম্পত্তি কিছুই নেই, বিয়ে থাওয়াও করিনি, শোভাবাজারের এক পুরোনো বাড়ির তিনতলার ছোট দুটো ঘরে আমার একার সংসার, আমাকে অনিষ্ট করার কোন কারন কোন মানুষের থাকতে পারে বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া আমার সে রকম বন্ধুও কেউ নেই যারা এই রকম রসিকতা করতে পারে, আবার শত্রুও নেই। এবারে পরামর্শ করার একটা প্রয়োজন আছে। আমার একার বুদ্ধিতে কিছু মাথায় আসছে না। আমার সতীর্থ, সহকর্মী অনিমেষদা, আমাদের কাগজের সাব এডিটর ওনার কথাই মনে পড়ল সবার আগে। হোটেলে ফিরে রাতে ফোন করতে হবে।

পুরো ব্যাপার টা অনিমেষদাকে জানালাম, অনিমেষদার সব চেয়ে বড় গুন, ধৈর্য ধরে সব কিছু শোনেন। পুরো টা শোনার পর প্রথম কথা বললেন –

“ডঃ অমিতাভ ঘোষ কে খুঁজে পাবার তোর কাছে যথেষ্ট কোন কারন আছে কি?”

“অনিমেষ দা, ঠিক কথা, কিন্তু রাস্তা ঘাটে এই রকম অজানা মানুষ যদি আমাকে অমিতাভ ঘোষ বলে ডাকতে শুরু করে তাহলে ব্যাপার টা খুব অস্বস্তিকর নয় কি? তুমি কি বল? তাছাড়া যত দূর বুঝছি এ মানব দরদী মানুষ, কিন্তু কিছু গন্ডগোলে লিপ্ত থাকলে তার প্রাথমিক আঘাত আমার ওপর পড়বে। তারপর সত্যি মিথ্যে প্রমান, সেতো অনেক পড়ে! প্লাস আমরা কাগজের লোক, জানাজানি হয়ে গেলে একেবারে বাজে ব্যাপার হবে একটা!”

“কিন্তু তুই যে রামপুরহাটে ওনাকে খুঁজতে যাবি সেখানে তো লোকে দেখে তোকে সবাই ডঃ ঘোষ বলবে। এতো সেই শেক্সপিয়রের কমিডি অফ এররস হয়ে যাবে। বাংলায় বিদ্যাসাগরের ভ্রান্তিবিলাস! তখন কি করবি? আর তোর কি দরকার? এক রকম দেখতে হতেই পারে। রামপুরহাট যাবার প্রয়োজন নেই, তুই কলকাতা ফিরে আয়, পরে কিছু হলে নয় দেখা যাবে।”

সত্যি আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিলো, কি যে সমস্যায় পড়লাম!

[২]

মনের মধ্যে কাঁটার মতো জিনিস টা আটকে ছিল! আসলে অমিতাভ ঘোষ কে দেখার জন্য আমার মনের মধ্যে একটা তোলপাড় চলছিল। রামপুরহাট যাবার একটা ইচ্ছে ছিল কিন্তু ভেতরে একটা ভয় ও ছিল। সময় নষ্ট করিনি, পরদিন সকালেই পৌঁছলাম গিয়ে ‘ক্যালকাটা লাইফ লাইন’ হসপিটালে। অতনু সান্যালের চিকিৎসা হয়েছিল এখানে, সুতরাং পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটলে কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে। তবে একটা ভয় ছিল আবার কাউকে পাবো না তো – যে কি না আমাকে ডাঃ ঘোষ বলে ডেকে উঠবে। সেই পরিস্থিতিতে খুবই অপ্রস্তুত হতে হয়! যাক সে রকম কোন সমস্যা হয়নি। আমরা খবরের কাগজের লোক তো, প্রাথমিক অনুসন্ধান পদ্ধতি গুলো আমাদের জানা থাকে। প্রথমে রিসেপশনে কথা বললাম, তারা বিশেষ কোন সাহায্য করতে পারলো না। তবে ওদের পরামর্শ মতো সিস্টেমস বিভাগের একজনের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলাম। মিনিট পনের ধরে উনি আর আমি দুজনেই খুঁজলাম – তবে অতনু সান্যাল নামে কোন রুগীর নাম চোখে পড়ল না, অবশ্য ভদ্রলোক বললেন তিন মাসের পুরোনো ডেটা খুব দরকার না হলে তাঁরা রাখেন না। সে তথ্য তাঁদের আর্কাইভে চলে যায়। আর্কাইভে পুরোনো তথ্য সন্ধান করতে গেলে আমার আরো সময় লাগবে, এতো তাড়াতাড়ি কিছু সম্ভব হবে না।

তবে আমি আশা ছাড়িনি। এবারে ডঃ অমিতাভ ঘোষ ধরে খোঁজা শুরু হল, দু মিনিটের মধ্যে একটা তথ্য পাওয়া গেল। আফতাব হুসেন নামে এক পনের বছরের ছেলের নাম দেখলাম, গত বাইশে জুন তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। রেফারেন্স হিসেবে নাম রয়েছে ডঃ অমিতাভ ঘোষ। অবশ্য ইনি ই সেই ডঃ অমিতাভ ঘোষ কিনা সেটা জানি না। কমপিউটারে কিছু ইনফরমেশন ছিল, তারপর একজন নার্সের সাথে কথা হল। মোটামুটি সংক্ষেপে

ব্যাপারটা এই রকম, এই আফতাব হুসেন, পনের বছর বয়স, বহরমপুর থেকে নিয়ে আসা হয়। তার বাঁ দিকের লাংস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে, ডান দিকের টা সত্তর শতাংশ অকেজো। মোটামুটি শেষ অবস্থায় তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়, দু রাতের বেশী রাখা হয়নি, কারন ট্রিটমেন্টের আর কিছু ছিল না। দেখলাম সমস্ত পেমেন্ট করা হয়ে গেছে, বাকী কিছু নেই। একটা কথা জিজ্ঞেস না করে আমি পারলাম না,

“আচ্ছা একটা পনেরো বছরের বাচ্ছা ছেলের ফুসফুস এভাবে নষ্ট হয়ে গেল, আর তাকে একেবারে শেষ অবস্থায় হসপিটালে আনা হল। ফুসফুসের রোগে কি আগে থেকে ইন্ডিকেশন পাওয়া যায় না?”

“সে নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। তবে আর্থিক সমস্যার জন্য অনেকে ব্যাপারটাকে ডিলে করে, এটাও অনেক টা সেই রকম কেস বলতে পারেন।”

মন মানছিল না, একটা বাচ্ছা ছেলে এই রকম পরিস্থিতিতে পড়ে কি করে? ইচ্ছে হল জানতে ‘আচ্ছা, ছেলেটির কি অ্যাকচুয়ালী কি হয়েছিল, সেটা কি জানা যেতে পারে কি?”

“পেশেন্টের ডিসিজের ডিটেল তো ডাক্তারের কম্পিউটারে থাকে, সেটা আমরা দেখতে পাবো না”

“ডাক্তার কে ছিলেন দায়িত্বে?”

“ডাঃ দীপঙ্কর সেন, কিন্তু উনি তো এখন চেন্নাই তে রয়েছেন”

“ফোন নম্বর টা পাওয়া যাবে কি?”

“পার্সোনাল নম্বর তো দেওয়া বারন আছে, তবে আপনার নম্বর টা রেখে যান, আমরা খবর নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানাচ্ছি”

পুরোনো রেকর্ড যা বলছে, অভিভাবক বলতে সঙ্গে যিনি ছিলেন তার নাম দেখলাম বিশ্বনাথ সরকার, আর যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে লেখা হয়েছে ইংলিশ বাজার, বহরমপুর। একটা ফোন নম্বরও ছিল, সেটা টুকে নিলাম। সঙ্গে সঙ্গে একবার নম্বর ঘোরালাম, বাজল কিন্তু কেউ ওঠাল না। বহরমপুর আর রামপুরহাট খুব দূর নয়, কাজেই আমার সন্দেহ টা থেকেই গেল। আমার সামনে বসা ভদ্রলোক যিনি এতক্ষণ ধরে আমাকে এতো ইনফরমেশন দিলেন বুঝলাম বেশ অবাক হয়েছেন, তারপর প্রশ্ন টা করেই ফেললেন, “আচ্ছা কি ব্যাপার বলুন তো?”

“কিছুই না, আপাতত একটা ছোট কেস, কিছু তথ্য লাগবে। এই আর কি!”

“পুলিশ কেস টেস নয় তো”

“না, এখনো পর্যন্ত সে রকম কিছু না” , বেরিয়ে পড়লাম। ফোন নম্বর, ইমেল রেখে এলাম। কিন্তু মনটা খচখচ করছিল, জানি না, এভাবে কত জীবন যে নষ্ট হয়ে যায়!

হসপিটাল থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি ভাবছি আমার পরবর্তী স্টেপ কি হতে পারে, ঠিক এই সময়ে আমার ফোন টা বেজে উঠল, অজানা নম্বর, কি রকম একটা অপরিণত, অপ্রস্তুত গলা, “আচ্ছা, একটু আগে এই নম্বর থেকে একটা কল এসেছিল”

“হ্যাঁ, বিশ্বনাথ সরকার কে খুঁজছিলাম, আপনি কি বিশ্বনাথ সরকার?”

“না আমি ওনার ছেলে, আমার নাম সুকান্ত, আপনি?”

“আমার নাম নিখিল চৌধুরী, সমকালীন নিউজ পেপার নাম শুনেছেন তো? আমি সেখানে নিউজ এডিটর, আপনারা বাবার সাথে একটু কথা বলার ছিল”

বেশ চার পাঁচ সেকেন্ডের বিরতি তারপর জবাব এলো, “স্যার, কিছু মনে না করলে আপনি কি একবার বহরমপুরে আমাদের বাড়ি তে আসতে পারবেন?”

“কেন বলুন তো?”

“স্যার, ফোনে পুরো টা বলতে পারবো না, এলে খুব ভালো হয়, আমি স্টেশনে আপনার জন্য অপেক্ষা করব”

কেমন যেন একটা বিপদের গন্ধ পাচ্ছি, মনস্থির করে ফেললাম ঘুরেই আসি। অনিমেষ দা কে একটা ফোন সেরে সোজা শেয়ালদা স্টেশন, আমাকে বহরমপুরে বিশ্বনাথ সরকারের বাড়ি পৌঁছতে হবে। বিকেলের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। খবরের কাগজে কাজ করার সূত্রে বহরমপুরে আমি আগে এসেছি। বেশীক্ষন খুঁজতে হয়নি, বছর পঁচিশের একটি ছেলে, নিতান্তই সাধারন জামাকাপড়, নিজে থেকেই এসে পরিচয় দিল।

“আমি সুকান্ত, সকালে কথা হল আপনার সাথে। স্যার, আমরা কি ঐ চায়ের দোকানে বসে কথা বলতে পারি?”

আমি পিছু পিছু চায়ের দোকানে ঢুকলাম। চেয়ারে বসার পর কেমন একটা ভয় মিশ্রিত গলায় সে বলল, “আচ্ছা আপনি কি পুলিশের লোক?”

“কেন? আমি তো বললাম আমি কি করি! তা আপনার সেই রকম মনে হল কেন?”

“আসলে আমার বাবা নিরুদ্দেশ, গত তিন সপ্তাহ ধরে বাড়ি আসেন নি।”

“সে কি? পুলিশে খবর দেননি?”

“দিয়েছি, তবে কোন খবর পাইনি এখনো”

“কি করে হল পুরো ব্যাপার টা?”

“আসলে একটি ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় গেছিলেন চিকিৎসা করাতে, তারপর আর ফেরেন নি”

“আফতাব হুসেন?”

“আপনি কি করে জানলেন?”

“আমাদের কিছু কিছু জিনিস জানতে হয়। তারপর?”

“উনি তো আর কলকাতা থেকে ফেরেন নি! আর সঙ্গে ছেলেটি ও আর আসেনি, অনেক বার ফোন করেছি, কিন্তু ফোন তো বন্ধ। পুলিশে গেছিলাম, দুদিন বাদে ওরা আমাদের বাড়ি তে এল, আমাকে বলেছে আমি যেন বেশী আর খোঁজ খবর না করি”

“মানে? আপনার বাবা নিরুদ্দেশ, আর আপনি খোঁজ খবর করবেন না?”

“বাবা নাকি কি সব গর্হিত ব্যবসা তে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন”

“গর্হিত ব্যবসা?”

“ড্রাগস। শিশু পাচার! সেই রকম তো পুলিশ বলল, আর এই সব শুনে মা ও খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আপাতত মালদায়, আমার মামার বাড়ি। পুলিশের কাছে আর যাই নি”

“আপনার বাবা কি করতেন?”

“স্কুল টিচার ছিলেন, বছর পাঁচেক হলো রিটায়ার্ড, তারপর বাড়িতেই থাকতেন। ঐ এক দুজনকে বাড়ি তে গিয়ে পড়াতেন। আসলে এমন একটা সামাজিক লজ্জার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, বাইরে মুখ দেখাতে পারছি না”

“আফতাব হুসেন ছেলেটি কে? আপনারা বাবার ছাত্র?”

“না, ছাত্র নয়। হাইওয়ে তে কেউ বোধহয় ওকে ফেলে রেখে গেছিল, বাবা সেই রকম বলেছিলেন। খুব অসুস্থ অবস্থায় ছেলেটিকে ২০ জুন আমাদের বাড়ি তে নিয়ে এলেন, ছেলেটি তো সেন্সলেস ছিল। খুব জ্বর, বিকারে কি সব বলছিল । তারপর দুদিন বাদে সকালে ওকে নিয়ে কলকাতা গেলেন”

“এতো যখন সিরিয়াস কন্ডিশন তাহলে দুদিন দেরী করলেন কেন?”

“আসলে ঐ টাকা পয়সা গুলো জোগাড় করতে একটু সময় লাগলো, মাঝখানে একদিন ব্যাঙ্ক ছুটি ছিল”

“আচ্ছা, আফতাবকে তো আপনার বাবা চিনতেনই না, তা এতো টাকা পয়সা খরচা করছেন, এটা আপনার বা আপনার মায়ের কোন খটকা লাগেনি?”

“বাবা এই রকম অনেক কে করেছেন। এটা প্রথম নয়। আর নিজে শিক্ষক ছিলেন তাই ছাত্রদের খুব ভালোবাসতেন, আর তাছাড়া এখানে মানুষের কাছে টাকা পয়সার অভাব। অনেক মানুষকে বাবা টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন”

“তা এই ছেলেটি কে ২৪ তারিখে আপনার বাবা হসপিটাল থেকে রিলিজ করে নিয়ে আসেন, সেটা আপনি জানেন?”

সুকান্ত মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।

“আচ্ছা আর একটা খটকা আছে। আপনি বলছেন কলকাতা থেকে আপনার বাবা আর ফেরেন নি। তাহলে ওনার ফোন টা আপনার কাছে রয়ে গেল কি করে? তা উনি কি ফোন ব্যবহার করতেন না?”

“না ওনার নম্বর তো আলাদা, আমি জানি না এই নম্বর টা উনি কেন লিখিয়েছিলেন? তা ফোন কিন্তু সুইচড অফ, সেই থেকে”

বিশ্বনাথবাবুর নম্বর টা নিয়ে নিলাম, “আচ্ছা পুলিশ আপনাকে একজ্যাক্টলি কি বলেছে বলুন তো!”

“ঐ বলল বাবা নাকি ইচ্ছে করে পালিয়ে গেছেন ঐ ছেলেটিকে নিয়ে। আর পুলিশের আমার আর মায়ের ওপর কোন সন্দেহ নেই। তাই কোন ফোন এলে বা কেউ দেখা করতে এলে আমি যেন পুলিশ কে জানাই। একটা ফোন নম্বর ও দিয়ে গেছে। স্যার, সেই জন্য আমি আপনাকে এখানে আসতে বললাম। পুলিশ আমাদের ওপর নজর রেখেছে আর যখন তখন খুব হ্যারাস করে। আপনাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারলাম না, সত্যিই খুব খারাপ লাগছে” বুঝলাম এর সাথে আর কথা বলে কিছু হবে না, কথা বলতে হলে পুলিশের সাথে বলতে হবে, “ঠিক আছে সে সব পড়ে হবে, আচ্ছা, আপনাদের এখানে থানা টা কোথায়?”

কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর সে বলল “স্যার, আপনাকে একটা অনুরোধ করব? আপনি আজ থানায় যাবেন না, থানা এখান থেকে প্রায় ঘন্টা দুয়েকের পথ। কাল সকালে যাবেন। আর প্লীজ আমার কথা বলবেন না। পুলিশ ভাববে আপনি আমার কাছ থেকে জেনে সেখানে গেছেন, ওরা আমাদের আননেসেসারিলি হ্যারাস করবে”

চুপ করে রইলাম, ভয়টা অবাস্তব নয়, সত্যি দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে পুলিশ কিভাবে এখনো মানুষকে ভয় দেখায়! “ঠিক আছে আমি কাল ই যাবো। তবে নিশ্চিন্তে থাকুন আপনার বাবা যাই করে থাকুন সে সব জানার সমস্ত সম্পূর্ণ অধিকার আপনার আছে। পুলিশ না চাইলে ও আছে। তবে আপনার নাম আমি বলব না, চিন্তা করবেন না। আচ্ছা আপনি অমিতাভ ঘোষ বলে কোন ডাক্তারের সঙ্গে আপনার বাবাকে এই আফতাব কে নিয়ে কথা বলতে শুনেছিলেন?”

“নাম তো বলতে পারবো না। তবে হ্যাঁ, ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বলেছিলেন সে আমার মনে আছে”

আরো মিনিট পনের কথা বললাম, বেরিয়ে পরলাম কাছাকাছি কোন হোটেলে রাত টা কাটাতে হবে।

উনিশ বছরের একটা পুরোনো ক্ষত যেটাকে আমি বহু চেষ্টায় শেষ কয়েক বছর ধামাচাপা দিয়ে রেখেছি সেটা যেন আমার বুকের বাঁদিকে একটু একটু করে উঁকি মারছে। কেন জানি না লাইফ লাইন থেকে বেরিয়ে সুকান্তর ফোনটা ছাড়ার পরেই সেই খোঁচা টা প্রথম ফীল করেছিলাম। রাত প্রায় আটটা, অন্ধকার আকাশের দিকে একবার মুখ তুলে চাইলাম, খোঁজার চেষ্টা করলাম সেই মানুষটিকে। আগেও অনেকবার খোঁজার চেষ্টা করেছি কখনো পাইনি। তবে সত্যি উনি আছেন কোথাও না কোথাও, যিনি সব কিছু জানেন, সব কিছু দেখেন, সব কিছু বোঝেন, শুধু দেখাটাই দেন না। না হলে নিজের হারিয়ে যাওয়া আইডেন্টিটিকে আর একবার এসটাবলিশ করার সুযোগ আসবে কেন আমার কাছে?

[৩]

রানিবাজার পুলিশ স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সকাল দশটা, থানার বড়বাবু পুলক মিত্র। ‘সমকালীন’ এর নিউজ এডিটর হয়ে পুলিশের খাতির সাধারনত আমার ভাগ্যে জোটে, এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। কথা শুরু হবার আগেই আমি জানিয়ে দিলাম এটা একটু প্রাইভেট ব্যাপার, সুতরাং একটু আলাদা বসে কথা বলতে পারলে ভালো হয়। মিনিট পাঁচেক লাগল, ব্যবস্থা হয়ে গেল। তার মধ্যে পুলকবাবু চা, সিগারেটের ব্যবস্থা ও করে ফেললেন।

“বলুন স্যার, কি করতে পারি আপনার জন্য”

“বিশ্বনাথ সরকার, নাম টা চেনা লাগছে আপনার?”

“ঐ ইংলিশ বাজারে থাকে? ও তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই! তার কথা আপনি কি করে জানলেন?”

“ভদ্রলোক তো নিরুদ্দেশ, তাই না?”

“কাগজে কি সন্ধান চাই দিয়েছে? না না দূর! ও তো ইচ্ছে করে নিরুদ্দেশ হয়েছে। যা কেলেঙ্কারি করেছে, সে জন্য পালিয়ে গেছে! তা আপনি কি করে জানলেন?”

“আমি কি করে জানলাম সেটা ছাড়ুন। কেলেঙ্কারি? আর ইচ্ছে করে নিরুদ্দেশ মানে?”

“ও তো ড্রাগস পেডলার! কে বাচ্ছাকে নিয়ে গায়েব হয়ে গেছে”

“মিঃ মিত্র, আপনি কতটা জানেন আমি জানি না। আফতাব হুসেন নামে একটি পনের বছরের বাচ্ছা ছেলেকে আপনার এই ডেঞ্জারাস লোকটি কলকাতায় লাইফ লাইন বলে একটা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। কারণ? ছেলেটির দুটো ফুসফুস অকেজো হয়ে গেছে। ছেলেটির ট্রিটমেন্ট ডাক্তাররা করতে পারেন নি, কারন সে নাকি একেবারে ফাইনাল স্টেজে ছিল। তা এই পনের বছরের একটি মৃত্যুপথগামী একটি ছেলে কে নিয়ে একটি পঁয়ষট্টি বছরের রিটায়ার্ড শিক্ষক কি ড্রাগসের ব্যবসা করবে বলুন তো? সেটাই আমি ঠিক বুঝতে পারছি না”

“স্যার শুধু ড্রাগস নয়, বুড়ো শিশু পাচার করত,”

“আচ্ছা শিশু পাচার ই যদি করবে তাহলে এই ছেলেটির পেছনে বারো হাজার পাচশো টাকা সে শুধু শুধু খরচা কেন করলো! আমি নিজে হসপিটালে গিয়ে আমি চেক করেছি, সব পেমেন্ট হয়ে গেছে, কোন টাকা বাকি নেই। তার ওপর আর একটা গণ্ডগোল! বুড়োটা বাড়ির ঠিকানাই হসপিটালে ঠিকঠাক লেখালো কেন? সে কি এতোই নির্বোধ? আর এদিকে আপনি বলছেন সে ড্রাগসের ব্যবসা করছে, চাইল্ড ট্রাফিকিং করছে। দুটো ব্যাপার কি আপনার ডাইজেস্ট হচ্ছে?”

“স্যার ঐ কেস আর আমাদের হাতেই নেই”

“কেন?”

“ওপর থেকে অর্ডার আছে, আমাদের খবর ও বাংলাদেশের বর্ডার ক্রশ করে গেছে,”

“আচ্ছা বুড়োটার কথা নয় বাদ দিন। পনের বছরের বাচ্ছাটার কি হল? সে ব্যাপারে কোন অনুসন্ধান করেছেন? কোথা থেকে এলো ছেলেটি তার পর কোথায় বা গেল?”

“স্যার আমরা তো খালি অর্ডার ফলো করি, আমাদের যা বলা হয় সেটাই করতে হয়, কি করি বলুন! স্যার একটা কথা, একটু সিক্রেট রাখবেন। আমাদের তো ইনভেস্টিগেট করতে বারন করেছে, বলা হচ্ছে এটা নাকি সিআইডি র কেস। আচ্ছা স্যার, একটা কথা বলবেন”

“বলুন কি ব্যাপার?”

“স্যার আপনারা এই খবর পেলেন কোথা থেকে?”

“কেন, এটাকে কি আপনারা হাস আপ করার চেষ্টা করেছেন?”

“না ঠিক তা নয়”

“আমরা খবরের কাগজের লোক তো! খবরের সন্ধানে আমরা ঘুরি, এটাই তো আমাদের কাজ। এসব খবর আমরা পেয়ে যাই”

পুলকবাবুর সাথে কথা বলার আর বিশেষ কিছু ছিলো না। থানা থেকে একটু এগিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসেছিলাম আর তখন আবার মাথায় এল। জিনিসটা কাল রাত থেকেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। উনিশ বছরের আগের সেই স্মৃতি বারে বারে ফিরে আসছে। কাল রাতেই প্ল্যান করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত ফোনটা ঘোরালাম, রনজয় ঘোষাল, স্কুলে আমার তিন বছরের সিনিয়র, এখন লালবাজারের উচ্চ পদস্থ অফিসার।

আগের মতো কড়া গলা, “স্পেশাল ব্রাঞ্চ ঘোষাল বলছি”

“রনজয়দা, আমি নিখিল, চিনতে পারছ?”

“ও তুই? কি ব্যাপার?”

“তোমার কাছে দশ মিনিট সময় হবে? একটা ব্যাপার নিয়ে একটু ডিসকাস করতে হতো। মানে তোমাকে জানাতে চাইছিলাম”

“বল, শুনছি”

পুরো ব্যাপার টা বললাম, সেই মালদার ট্রেন থেকে শুরু করে সদ্য হয়ে যাওয়া পুলক বাবুর সঙ্গে আমার মিটিং। দশ সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙ্গে রনজয়দার গলা শুনলাম, “তুই এখন কোথায়?”

“এই তো রানিবাজার থানায় এসেছি, আজ রাতে কলকাতা ফিরছি”

“ কি করতে চাইছিস এখন?”

“মানে আমার কেসটায় প্রচুর ফাঁক লাগছে। কেমন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি এর মধ্যে”

“সে তো বুঝলাম। তা তোর সমস্যা টা কোথায়? গোয়েন্দা গপ্প লিখবি তাই প্লট খুঁজছিস? নাকি অমিতাভ ঘোষের ডুপ্লিকেট হয়ে থাকতে চাইছিস না?”

“অমিতাভ ঘোষ আমার কাছে খুব ম্যাটার করে না। আমি আফতাব কে খুঁজে বার করতে চাই!”

“তা আমাকে কি করতে হবে? মিডিয়া তোর হাতে, ইনভেস্টিগেট তুই করবি, যেটা সত্যি সেটা বাইরে আসবে, আজ না হয় দশ দিন বাদে! তুই কি আমাদের ইনভেস্টিগেট করতে বলছিস?”

“না ঠিক তা নয়। একটা বাচ্ছা ছেলে লোপাট হয়ে যায়, এটার তো ইনভেস্টিগেশন দরকার আছে। তোমার কি মনে হয়?”

“তা কর। আর তোকে তো খবরের সন্ধানে এই সব করতেই হবে”

কথা শেষ হবার আগেই বললাম, “আমার একটা হেল্প লাগবে। তুমি একটু চেক করবে সত্যি কেসটা সিআইডির কাছে গেছে কি না? মানে আমি চাই না কোন কমপ্লিকেশন তৈরি হোক।”

“ঠিক আছে করবো, আর?”

“আপাতত কিছু নয়, দরকারে আমি ফোন করবো”

ফোন টা ছাড়লাম আর বহরমপুর ফেরার বাস টা ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল। আমি আজই কলকাতা ফিরব, এখন তিন দিন ছুটি হাতে আছে। এর মধ্যে আমাকে কিছু একটা বার করতে হবে। কাল রাতে আমাদের বীরভূম সার্কেলে জানিয়েছি, খবর নিতে রামপুরহাটে ডঃ অমিতাভ ঘোষ বলে কেউ আছেন কিনা? আর থাকলে তার ছবিটাও চাই। এখনো কোন ইনফরমেশন আসেনি। কেমন যেন রহস্য টা দানা বেঁধে উঠছে।

রনজয়দার প্রশ্নটা মাথার মধ্যে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে “তোর সমস্যা টা কোথায়”। সত্যি টা বলতে পারিনি, সেটা কিন্তু আমার জানা আছে। আফতাব হুসেন, বিশ্বনাথ সরকার, অমিতাভ ঘোষ কেউ আমার কাছে ইম্পপরট্যান্ট নয়। নিখিল চৌধুরী বলে যে মানুষটা আমার শরীরে এই ৪০ বছর ধরে বেঁচে আছে তার আইডেন্টিটিকে নতুন করে তৈরি করাটা আমার কাছে খুব দরকার। উনিশ বছর আগে সেটা একবার হারিয়েছি। বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যেবেলার আবছা আলোয় নির্ঝরদার মুখটা আমার এখনো মনে পড়ে, চোখ ভর্তি জল, হতাশা, রাগ, কান্না সব মিশিয়ে একটা গলা, “মানুষের মতো দেখতে হলেই মানুষ হওয়া যায় না। গিরগিটির সাথে বন্ধুত্ব কর, বিকজ ইউ বিলং টু দেম, স্পাইনলেস, অ্যাম্ফিবিয়ান!” আজ আমার কাছে একটা সুযোগ এসেছে, কারুর কাছে নয়, কারুর জন্য নয়, আমাকে আমার নিজের কাছে প্রমান করতেই হবে, ‘স্পাইন’ বলে একটা জিনিস আমারও আছে।

এই সব ভাবতে ভাবতে কেমন যেন চোখ লেগে গেছিল, মনে পড়ছিল বহু দিনের পুরোনো একটা ঘটনা। ম্যাচ টাইম শেষ, রেফারি ঘনঘন ঘড়ি দেখছে, ইনজুরি টাইম চলছে, খুব সম্ভব এটাই ওদের লাস্ট অ্যাটাক, আর কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখতে পারলে আমরাই চ্যাম্পিয়ান। লেফট কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে একটা উঁচু বল নামছে, আমার বাঁ দিকে একটা ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে, মুখ ঘোরাতে পারছি না তবে বেশ বুঝতে পারছি একটা শেষ চেষ্টা কিন্তু হবে। ডান দিকে অভিজিতের গলা শুনলাম, “নিখিল বাঁদিক ছাড়বি না, হেড যেন কিছুতেই না করতে পারে” পেছন থেকে সীতাংশুর গলা শুনতে পাচ্ছি “নিখিল বাঁদিকে ধরে রাখবি, অভিজিত চেজ করছে”। বলটা ছাড়া আমার চোখে আর কিছু আসছে না, এবারে বলটা বেশ নেমে এসেছে, আর কিছু মুহূর্তের মধ্যে আমাদের নাগালে এসে যাবে, আমার বাঁ হাত অনেক টা উঠে গেছে, ছেলেটার জার্সিটাকে খামছে ধরেছি, কোন ভাবেই হেড করতে দেব না, দরকারে চোরাগোপ্তা চলবে। অভিজিত মোটামুটি বলের ফ্লাইট টা ধরে ফেলেছে। হঠাত আমার বাঁ দিক থেকে একটা দেহ যেন শূন্যে ভেসে উঠল, আমার বাঁ হাত চলল, তবে কাজ হলো না। অভিজিতের অনেক আগেই তার মাথা পাখির মতে পৌঁছে গেল বলের কাছে। আমাদের তিন জনের মধ্যে থেকে একেবারে সঠিক দিশায় এক আচমকা হেড, অবাক হয়ে দেখলাম একটা ড্রপ করে বলটা সীতাংশুর নাগাল এড়িয়ে গেল। সীতাংশু একটা শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষনে দেরি হয়ে গেছে, বলটা জড়িয়ে গেল আমাদের জালে। গগন বিদীর্ণ এক চিৎকার, তন্দ্রা টা ভেঙে গেল। সিনেমার মতো সেই দৃশ্যটা আগেও বহুবার দেখেছি, আজকে অনেক দিন বাদে আবার দেখলাম, জর্জের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত।

[৪]

সকালটা এই ভাবে শুরু হবে সত্যি ভাবি নি। একা থাকি বলে সেই রকম সাংসারিক দায়িত্ব আমার নেই, সকালে সাধারনত বেরিয়ে পড়ি, ফেরার তাড়াও থাকে না। আজ তো এমনিতেও ছুটি, গঙ্গার ঘাটে গেছিলাম, চুপ করে বসে ভাবছিলাম পরপর ঘটনা গুলো, পকেটের ফোনটা বেজে উঠল, অনিমেষ দার ফোন,

“কিরে? কোথায় তুই? বাড়িতে?”

“হ্যাঁ, কাল রাতে ফিরে এসেছি। সকালে এই একটু বেড়িয়েছি, কি ব্যাপার বলো”

“আজকের কাগজ দেখেছিস?”

“সমকালীনের সিক্সথ পেজটা দ্যাখ, সন্ধান চাই বিভাগ টা পড়িস, দরকারে ফোন করিস” পরের প্রশ্ন টা করার আগেই ফোন টা কেটে গেল।

আমার বাড়ি তে কাগজ আসে, কিন্তু আমার তার তর সইল না, কাছেই কাগজের দোকান থেকে আজকের কাগজ টা আর একবার কিনে ফেললাম। ষষ্ঠ পাতায় সন্ধান চাই, আমার কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, “ডঃ অমিতাভ ঘোষ গত ২২শে জুন থেকে নিরুদ্দেশ, কোন সহৃদয় ব্যক্তি সন্ধান দিতে পারলে চির কৃতজ্ঞ থাকবো। সন্ধান জানানোর ঠিকানা ২১ উদয় শঙ্কর সরনী, কলিকাতা” একটা ফোন নম্বর ও দেওয়া আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা একটা ছবিও ছাপানো রয়েছে – সেটা কে দেখে কেউ বলবে না সেই ছবি টা আমার নয়।

সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম তবে অনিমেষদাকে নয়, রনজয়দা কে। পুরো ব্যাপার টা বললাম, কথা বলার ফাঁকে রনজয়দা পেপারটাও দেখে নিয়েছিল, “এ তো এক মহা সমস্যায় পড়লাম রনজয়দা, কি করি বলো তো? পুলিশে যাবো?”

“পুলিশ তোর কেস নেবে না। দ্যাখ, টেকনিক্যালি ব্যাপারটার মধ্যে কোন গোলমাল নেই। মূল ব্যাপার টা হলো, তোর মতো দেখতে আর একটা লোক আছে, এই পশ্চিমবাংলায়, আর সে নিরুদ্দেশ হতেই পারে। তাতে তোর তো কোন প্রবলেম হওয়া উচিত নয়।”

“তাহলে আমি কি করি বলতো?”

“কিছুই করবি না, বরং তুই এটাকে একদম পাত্তা দিস না। আফতাবের কেস টা ইন্টারেস্টিং, কিন্তু এটা তেমন কিছু নয়।”

“আচ্ছা, ঐ ব্যাপার টা কিছু খবর পেলে?”

“এখনো নয়, জানাবো তোকে, আর হ্যাঁ বেশী চিন্তা করিস না, দরকারে ফোন করিস”

মিনিট দশেক বাদে অনিমেষ দার ফোন এসেছিল, অনিমেষদাও এক কথাই বলল, “তোর মতো দেখতে আর একটা লোক থাকলে তুই আর কি করবি? খালি জেনে রাখ পেপারে একটা বিজ্ঞপ্তি এসেছে, সেখানে অমিতাভ ঘোষ বলে যে মানুষটির ছবি এসেছে তাঁকে তোর মতো দেখতে”

দুজনের সঙ্গে কথা বলে মনের অস্থিরতা টা একটু হয়তো কমল, তবে আমি মনে মনে কিন্তু ঠিক করেছি ২১ নম্বর উদয় শঙ্কর সরনীর ঠিকানায় আজ একবার যেতেই হবে, অমিতাভ ঘোষ কে খুঁজে পাওয়া গেল কি না গেল তাতে আমার কিছু আসে যায় না, তবে আমার একটাই কৌতূহল, দুজন মানুষ কে একদম সত্যি কি দেখতে হয়? বেরিয়ে পড়লাম, ঠিকানা দেখে যা প্রথমটায় লেগেছিল দূরদর্শন ভবনের খুব কাছে। কিন্তু তা নয়, এ প্রায় আনোয়ার শাহ ছাড়িয়ে। যাহোক, গন্তব্যে পৌঁছে যা বুঝলাম এটা কিন্তু একটা অফিস, আমাকে রিসেপশনে জিগ্যেস করতে হল। যা জানলাম, এটা হিন্দুস্থান গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ওয়ার্কস বলে একটি কোম্পানির রেজিস্টার্ড অফিস, কাগজে বেরোনো খবর নিয়ে এসেছি শুনে আমাকে বলা হল অপেক্ষা করতে। সেখানকার টেকনিক্যাল ডিরেক্টর শশাঙ্ক অধিকারীর সঙ্গে কথা বলাটাই সবচেয়ে ভালো হবে। আমি অবশ্য রিসেপশনে কোন অতিরিক্ত কথা বলিনি। ভেতরে একটা অজানা ভয় ছিল কেউ যদি আবার ‘ডঃ ঘোষ বলে শনাক্ত করে বসেন’, সে রকম কিছু হয়নি। একটি সোফায় বসে অপেক্ষা করছিলাম।

আমার ডাক পড়ল প্রায় আধ ঘন্টা বাদে, মিঃ অধিকারী বেশ দীর্ঘ দেহী এবং দেখে বেশ ভদ্র মানুষ বলেই বলে মনে হল, সোজাসুজি পয়েন্টে এলাম – “আচ্ছা এই সন্ধান চাই বিজ্ঞপ্তি টা কি আপনাদের দেওয়া?”

“ডঃ অমিতাভ ঘোষ বলে তো আমাদের এই অফিসে কেউ নেই! দেখুন এইটা তো আমাদের কোম্পানি অফিস, সব কিছু যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন এখান থেকেই হয়। আমাদের তিনটে ফ্যাক্টরি আছে, এখন সেখানে যদি কেউ অমিতাভ ঘোষ বলে থাকেন আমার জানার কথা নয়। আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি বরং একবার খোঁজ নিয়ে দেখি আমাদের কোম্পানি থেকে কেউ এই নামে আছেন কিনা?”

আমার সামনে শশাঙ্ক বাবু চারটে ফোন করলেন, দুটো জিনিস জানা গেল। এক, এই কোম্পানি তে ডঃ অমিতাভ ঘোষ বলে কোন এমপ্লয়ী নেই, দুই, এই সন্ধান চাই বিজ্ঞপ্তি টা আজকের সমকালীন কাগজে বেড়িয়েছে সেটা এঁদের অফিস থেকে দেওয়া হয়নি। কেউ যদি ব্যক্তিগত ভাবে দিয়ে থাকেন সেটা শশাঙ্ক বাবুর জানার কথা নয়। আর একটা কথা, সেটা না বললেই নয়, আমি প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে শশাঙ্ক বাবুর কথা বললাম, তবে উনি কিন্তু একবার ও বলেন নি, কাগজে বেরোন অমিতাভ ঘোষের ছবির সঙ্গে আমার মিল আছে।

হেঁটেই আসছিলাম টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন, আমি এখনো পুরো ব্যাপার গুলো মেলাতে পারছি না। প্রথমত আগে শুনেছিলাম অমিতাভ ঘোষ রামপুরহাটে থাকেন তাহলে কলকাতার এক ঠিকানা কেন? দ্বিতীয়ত হঠাত করে এই রকম একটা গ্লাস এবং সিরামিক তৈরি করার কোম্পানি দেওয়া হল কেন? তাহলে এটা কি ইচ্ছে করে ধাঁধায় ফেলে দেওয়ার জন্য নাকি এই কোম্পানি কোন ভাবে পুরো ব্যাপারটায় যুক্ত আছে। পকেটটা কেমন ঝনঝন করে উঠল, খেয়াল হতে বুঝলাম ফোন ভ্রাইব্রেট মোডে রাখা আছে। অজানা নম্বর, ধরলাম –

“আচ্ছা আমি ডঃ দীপঙ্কর সেন বলছি, আপনি কি নিখিল চৌধুরী, লাইফলাইন হসপিটালে এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে”

মনে পড়ে গেল ইনি আফতাব কে চিকিৎসা করেছিলেন, “হ্যাঁ, আসলে আমি একটি ছেলের ব্যাপারে জানতে চাইছিলাম। আফতাব হুসেন নাম, বয়স বছর চোদ্দ পনের, শুনলাম কি ফুসফুসে রোগ হয়েছিল! সেই ব্যাপারে একটু ডিটেলে জানার ছিল”

“ছেলেটির সিলিকোসিস,হয়েছিল, ট্রিটমেন্টের কিছু ছিল না, অলমোস্ট লাস্ট স্টেজ, ভেরি স্যাড কেস”

“আচ্ছা এই রকম রোগ সাধারনত হয় কি করে? পনের বছরের ছেলে ডেফিনিটলী নট অ্যা স্মোকার, তাহলে কি কোন রকম ইনফেকশন?”

“হতেই পারে, তবে এটা সে রকম নয়। আনহেলদি কন্ডিশনে ক্রমাগত সিলিকা পাউডার ফুসফুসে ডিপোজিট করে এটা হয়েছিল।”

“আপনি হয়তো জানেন না, ওকে নিয়ে যে দুই ভদ্রলোক হসপিটালে নিয়ে এসেছিলেন তিনি তারপর কিন্তু তাঁরা আর বাড়ি ফেরেন নি, আর আফতাবের ও কোন খবর নেই”

“দুইজন তো নয়, একজন এসেছিলেন তো!”

“ডাঃ অমিতাভ ঘোষ বলে কেউ এসেছিলেন কি?”

“অমিতাভ ঘোষের সাথে আমার ইমেলে কিছু কথা হয়েছিল, তবে উনি তো আসেন নি।“

“হসপিটালের খাতাতে দেখলাম ওনার নাম রয়েছে। আপনার আর কিছু রেলিভ্যান্ট ইনফরমেশন কি মনে আছে?”

“নট মাচ। তবে একটাই জিনিস বলার ছিল, ইট ওয়াস এ কেস অফ চাইল্ড লেবার। আর সে নিয়ে আমার ডাঃ ঘোষের সাথে কথা ও হয়েছিল। আসলে আমাকে মাঝে চেন্নাই যেতে হয়েছিল, আর কেউ আমার সাথে যোগাযোগ ও করলেন না। তবে ওর রিপোর্ট গুলো সবই আমার কাছে আছে। সে গুলো পড়লে আপনি ও বুঝতে পারবেন। আমি সেই গুলো আপনাকে দিতে পারি”

“অনেক ধন্যবাদ, সে গুলো পেলে হয়তো এই কেসে একটু হেল্প হয়”

“হ্যাঁ, ডেফিনিটলী, আর আপনাকে আর একটা জিনিস ও বলার আছে, সেটা বরং দেখা হলেই বলব। অলরাইট আপনি চলে আসুন কথা হবে”

“আজকে আপনার সুবিধা হবে?”

“নো প্রবলেম, আপনি চলে আসুন আজ সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা, রাজারহাটে আমার অফিসে, সামনাসামনি দেখা হলে আপনাকে কয়েক টা জিনিস বুঝিয়ে দেওয়া যাবে”

টালিগঞ্জ থেকে মেট্রো ধরলাম। ট্রেনে বসে কেন জানি না, আবার মনে পড়ে গেল। সকালে গঙ্গার ঘাটেই চোখের সামনে ফ্ল্যাশ ব্যাক দেখেছিলাম, কেন জানি না বারবার ভেসে আসছে, সেই স্মৃতিটা। কুড়ি একুশ বছর আগের কথা, অনেক কাকুতি মিনতি করে সাড়ে ছয় হাজার টাকা জোগাড় করে ছিলাম মা’র কাছ থেকে। আমরা পাঁচ বন্ধু তে মিলে গোয়া যাব। অপূর্ব সমুদ্রতট কালাঙ্গুট – সেখানেই থাকা, বিক্রমের বাবা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যাতায়াতের খরচাটা আমাদের তুলতে হত। আমি, কৃষ্ণেন্দু, বিক্রম, স্পন্দন আর জর্জ। একেবারে ছবির মতো মনে আছে সেই দিনটার কথা। তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা, ওল্ডমঙ্কের দুটো বোতল খালি হয়ে গেছে, তৃতীয় টাও অর্ধ সমাপ্ত, সুমন চট্টোপাধ্যেয়ের ‘তোমাকে চাই’ আর মান্না দে র ‘কফি হাউস’ একসাথে মিশে গেছে, আতলামি সব লেভেল অতিক্রম করেছে, আমরা এলটন জন, পল ম্যাকারথি, এলভিস প্রিসলে ছাড়িয়ে তখন পল রোবসন কে নিয়ে টানাটানি করছি, কত গুলো সিগারেট শেষ হয়েছে তার হিসেব নেই। কৃষ্ণেন্দু টিভির রিমোট নিয়ে সমানে এদিক ওদিক করে যাছে, এবারে আটকে গেল একটা চ্যানেলে। সেখানে সবে বিন্দিয়া গোস্বামীর ওপর সাদা ফুলের বৃষ্টি হয়ে গেল, তারপর অমল পালেকারের মুখে কিশোর কুমার তাঁর অনবদ্য কন্ঠে শুরু করলেন, “একবার ওয়াক্ত সে, লমহা গিরা কাহিন ”

কৃষ্ণেন্দু আওয়াজটা মিউট করে দিল, “জর্জ প্লীস, এই জায়গাটা তুই কর”

আর বলতে হল না, জর্জ শুরু করে দিল, “ওয়াহান দস্তান মিলি, লমহা কাহিন নাহিন” কি অসাধারণ গাইত কিশোর কুমারের গান! ঠিক এই সময়ে আমাদের দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা, ‘কি ব্যাপার ডাকাত পড়ল নাকি?” আমি দরজা টা খুললাম, “স্যার সবাই শীগগির বাইরে যান, আমাদের ফ্লোরে আগুন লেগেছে” বাইরে বেরিয়ে যেটা বুঝলাম সেটা আরো ভয়ঙ্কর। প্রচন্ড ধোঁয়া কেমন যেন দলা পাকিয়ে উইংএর শেষের দিক থেকে আসছে। আর একটা দিক, মানে যেদিকে সিঁড়ি সেদিকেও বেশ ধোঁয়া তবে সেখান টা অত ঘন নয়। সেখানে প্রায় জনা তিরিশ ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ, কেউ বা চেঁচামেচি করছেন ‘তাড়াতাড়ি চল নিচে, জিনিস পত্র থাক যা হবার হবে’, কেউ নিজের লাগেজ বের করছেন ঘর থেকে, কেউ বা দুপা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আবার ওপরে উঠে আসছেন, মহিলা এবং ছোট বাচ্ছাদের কোনমতে সিঁড়ি র মুখটায় একজোট করা হয়েছে, তবে ‘এভাকুয়েশন’ বলতে যেটা বোঝায় সেটা কিন্তু হচ্ছে না। একটা জোরে আওয়াজ শুনতে পারছি একটি ছেলে বলছে – ‘নিচে যান, জিনিসপত্র কিছু হবে না, আপনারা তাড়াতাড়ি ঘর খালি করুন, দমকল এসে গেছে, আগুন নিভে যাবে, আপনারা প্লিজ নিচে যান’। এবারে সিঁড়ি দিয়ে দমকলের একটি লোক এল, সে খুব জোরে আবার চেঁচাল, “কি হচ্ছে, আপনারা কেন বুঝছেন না, নিচে যান জাস্ট গো আউট অ্যান্ড বি সেফ”। এই রকমের চার পাঁচ বার প্রচন্ড চিতকারে শেষে কাজ হল, মানুষজন সিঁড়ি ধরে নিচে নামা শুরু করল। তবে এর মধ্যে ধোঁয়ার আধিক্য আরো বেড়েছে, বিক্রমের কাশি শুরু হয়েছে, আমরা ও তাড়াতাড়ি নিচে নেমে গেলাম। বাইরের মুক্ত বাতাসে খানিক টা স্বাভাবিক হওয়া গেল, দমকলের লোকেরা পাইপ তোড়জোড় করে ফেলেছেন, তাঁরাও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যাওয়া শুরু করছেন। এদিকে বাইরে একটা দক্ষযজ্ঞ চলছে, এক সাউথ ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক তারস্বরে কাঁদছেন, তার স্ত্রী এবং বাচ্ছা ওপরে আটকে আছে। আরো তিনটে গ্রুপ তাঁদের একজন – দুজন করে আত্মীয় বা বন্ধু দলছুট হয়ে আছেন। তাঁদের সকলের প্রচন্ড শোরগোলে বাইরে একটা প্যানিকড অবস্থা। দমকল বাহিনী সকলকেই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে, এর মধ্যে প্রথম স্পন্দন আবিষ্কার করল, আমাদের মধ্যে জর্জ নেই। সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটলাম, কিন্তু এবারে আমাকে যেতে দেওয়া হল না। “আমাদের বন্ধু ওপরে ট্র্যাপড, প্লিজ যেতে দিন”, বরং আটকানো হল, “চিন্তা করবেন না, রেসকিউ টিম এসে গেছে, সবাই কে নিচে নিয়ে আসা হবে। আপনারা কেউ যাবেন না, তাতে বিপদ আরো বাড়বে” দুই-তিন- চার কত মিনিট জানি না, কৃষ্ণেন্দু মোটামুটি কেঁদে ফেলেছে – “জর্জের বাড়ি তে কি বলবি?” এবারে ধোঁয়া সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে, দমকলের লোকজন ধোঁয়ার বিরুদ্ধে ঢুকে পড়ছেন, স্পন্দনের একটা কথা আমাকে যেন চাবুকের মতো আঘাত করল – “কিছু হলো না তো ওর? এতো ফিট ছেলে এটুকু আগুনে ও আটকে যাবে? দশটা সিঁড়ি ক্রস করতে পারবে না? তাহলে এখনো বাইরে এলো না কেন? ” এক মুহূর্তের জন্য আমার জর্জের বাড়িটার ছবি আমার চোখে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াট হয়ে গেল। হতাশা, ভয়, কান্না আমাকে যেন ভেতর থেকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে, ঠিক এক সময়ে চোখে পড়ল – ধোঁয়ার মধ্যে থেকে একজন বেরিয়ে আসছে, তার শরীরে কালো নীল চেক কাটা শার্ট টা আমি খুব চিনি, তার কোলে একটা বাচ্ছা, আর সঙ্গে ওকে ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন একজন মহিলা। দমকলের একজন বাচ্ছাটাকে ওর কাছ নিয়ে নিল, আবার সেই পরিচিত গলা শুনলাম, আধা হিন্দী আর ইংরাজি মেশানো, “বাচ্ছার কিছু হয়নি, খালি একটু ভয় পেয়েছে, আর মিঃ শ্রীনিভাসন কে আছেন? আপনার স্ত্রী” ধোঁয়াটা আর একটু ঠেলে বেরোতে এবারে মুখ টা দেখতে পেলাম, মুখের বাঁ দিকে একটা কালো দাগ হয়ে গেছে, চুলের ওপর প্রচুর সাদা ছাই, কপাল ফেটে হাল্কা রক্ত বেরোচ্ছে, তবে সেই কনফিডেন্স এখন মুখে অমলিন – আমার বন্ধু প্রেসিডেন্সীর সেকেন্ড ইয়ারের ম্যাথস অনার্স স্টুডেন্ট – জর্জ অগাস্টিন।

[৫]

রাজারহাটে ডঃ সেনের ক্লিনিক একটি বহুতল বাড়ির বারো তলায়, আমি বাড়ি টা চিনতাম। পৌঁছতে অসুবিধা হয়নি। শেষের দুশো মিটার হাঁটতে হয়। কিন্তু অটো থেকে নেমে ই যেটা বুঝলাম কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটি পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে এবং তাদের মধ্যে দুটোর মাথাতে আবার চোখ ধাঁধানো আলো ঝিলমিল করছে। সঙ্গে দুটো অ্যাম্বুলেন্স ও চোখে পড়ল। আমার গলায় আইডেন্টিটি কার্ড ছিল, এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুলিশ অফিসার কে নিজের পরিচয় দিলাম, জিগ্যেস করতে হয়নি, নিজে থেকেই উনি বললেন–

“বিচ্ছিরি ব্যাপার, লিফটের মধ্যে খুন হয়ে পড়ে আছে, তিন তলায় জিম করে ফিরছিল, লিফটের মধ্যে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক থেকে তিনটে গুলি চলেছে, রক্তারক্তি, একেবারে বিচ্ছিরি ব্যাপার ”

“কাকে মার্ডার করেছে?”

“কে নাকি ডাক্তার!”

আমার বুকটা কেমন চিনচিন করে উঠল, “ডাক্তার? কি নাম?”

“দীপঙ্কর সেন, আজকেই নাকি চেন্নাই থেকে ফিরেছে সকালে”

এক মুহূর্তের জন্য যেন আমার সারা শরীরের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল, ঘোর ভাঙ্গল সেই অফিসার টির কথায় – “চিনতেন নাকি?”

“না আমি চিনি না, উনি কি এখানেই থাকতেন?”

“হ্যাঁ বারোতে নিজের ক্লিনিক আর উনিশে থাকতেন।“

“তা কখন হয়েছে ঘটনা টা?”

“ঘন্টা দেড়েক আগে, তা আপনি কি এখানে কোন দরকার এসেছিলেন? এখন ঢুকতে পারবেন না। বেটার কাল সকালে আসুন। আমরা রেসিডেন্টদের ও এখনো ঢুকতে দিচ্ছি না, বডি ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ঢুকতে বেরোতে দেওয়া হবে না, প্লাস এভিডেন্সের ও একটা ব্যাপার আছে”

বেরিয়ে এলাম, সম্পূর্ণ ব্যাপার টা ডাইজেস্ট করার চেষ্টা করছিলাম, পারছিলাম না। অমিতাভ ঘোষ এবারেও আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল, আর আফতাব টা কেমন যেন হাত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এতো গুলো ক্লু পেলাম কিন্তু একটাও তেমন ভাবে কাজে দিলো না। ভয়, কনফিউশন, রহস্য – এভাবে তিনটে জিনিস এক সাথে আগে কখনো আমার ঘাড়ে চেপে বসেনি। হাত ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সাত টা পঞ্চাশ, বাড়ি ফেরাই মনস্থ করলাম। সামনেই একটা অটো দাঁড়িয়ে ছিল, চড়ে বসলাম। অটো ড্রাইভার বলল – আমাকে পুরো অটো নিতে হবে, সে হয়তো আর প্যাসেঞ্জার পাবে না। আমি আর কোন কথায় যাইনি, উঠে বসলাম, আমাকে করুণাময়ী পৌঁছতে হবে। টাউনশিপ ছাড়িয়ে থেকে মেন রোডে আমার অটো টা উঠেছে, এই জায়গায় রাস্তায় সেই রকম পর্যাপ্ত আলো নেই। ঠিক এই রকম সময়ে পাশ থেকে দুটো মোটর বাইক আমার অটোর সমান্তরালে চলে এল, বেশ বুঝতে পারলাম ওরা কিন্তু আগে যেতে চায় না, বরং সাথেই থাকতে চায়। এবারে বাঁ দিকের বাইকে পেছনে বসা একটি ছেলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে আমার অটো টাকে থামাতে বলল, আর একবার বলাতেই আমার অটো টা থেমে গেল। এবারে ডান দিকের বাইকের ওপর বসা ছেলেটির গলা শুনলাম, অপেক্ষাকৃত শীতল এবং মার্জিত – “মিঃ চৌধুরী, নেমে আসুন, অটো টাকে ছেড়ে দিন। বাকি রাস্তা আমাদের সাথে যাবেন। কিছু কথা আছে তারপর আমরা আপনাকে শোভাবাজারে আপনার বাড়ি পৌঁছে দেব, চলে আসুন কুইক! সময় নষ্ট করবেন না”

মন্ত্রমুগ্ধের মতো নেমে আসতে হল, অটোটা চলে গেল, আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার দুপাশে দুটো বাইক, একটা তে দুজন বসে আছে আর একটাতে একজন। কারুর মুখ দেখা সম্ভব নয়, একে তো রাস্তায় তেমন আলো নেই, তার ওপর এরা সবাই মুখ ঢাকা হেলমেট পড়ে আছে। তাকাতে ভয় লাগছে তবে বেশ বুঝতে পারছি বাঁদিকের বাইকের পেছনে ছেলেটির হাতে কিছু একটা ধাতব বস্তু ধরা আছে, এই অন্ধকারেও সেটা বেশ চকচক করছে। পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছি, ঠিক এই সময় পেছনে অন্ধকার থেকে সহসা এক ছায়া মূর্তির আবির্ভাব হল, কারুর কিছুর বোঝার আগে বাঁ দিকের বাইকের পেছনের লোকটির ওপর অতর্কিতে একটা আক্রমন হল, খুব সম্ভব হকি স্টিক দিয়ে, তাতে হল কি বাইকের সামনের লোকটিও ভারসাম্য হারাল এবং একটা বিকট শব্দ করে বাইক টা মাটিতে পড়ে গেল। এই সহসা আক্রমনে ডান দিকের বাইকের লোকটি বাইক থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল, তার ওপর ও এই রকমের আক্রমন হল, সেও ভারসাম্য হীন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। হতভম্ব হয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এবারে একটা আওয়াজ শুনলাম – “মিঃ চৌধুরী, বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে দুশো মিটার এগোলেই বাস পেয়ে যাবেন, পালান”। এই গলার স্বর আমি আগে শুনেছি কিন্তু মনে করতে পারলাম না কোথায় শুনেছি?

আমি আর কিছু ভাবিনি, দেখার চেষ্টাও করিনি, এ আমার বাঁচবার দৌড়। পেছন থেকে একনাগাড়ে কিছু অশ্রাব্য গালিগালাজ আসছে, আমি প্রানপনে দৌড়লাম। বাঁদিকের রাস্তা থেকে বেরতেই এবারে মেন রোড টা দেখা গেল, পায়ে ফিতে বাঁধা জুতো ছিল তাই আমার গতি রোধ হয়নি। মেন রোড চোখে পড়তেই দেখলাম একটা পাবলিক বাস ও আসছে। আমার পেছনে দু জোড়া পায়ের শব্দ পাচ্ছি, আমাকে কিন্তু বাসটার কাছে পৌঁছতেই হবে। সমস্ত শক্তিকে এক করে দৌড়লাম, আমার পায়ের সমস্ত মাংসপেশী গুলো যেন ছিঁড়ে আসছে। পৌঁছে গেলাম, বাস কন্ডাক্টর হয়তো আমাকে দেখতে পেয়েছিল, বাস টা একটু গতি কমালো, বাসের দরজা থেকে কে যেন আমার হাত টা ধরে ফেলে একটা জোরে টান দিল। আমি ভারসাম্য হারায়নি, খেয়াল হতে বুঝলাম আমি চলন্ত বাসের ফুট বোর্ডে উঠে পড়েছি। বসার একটা জায়গাও পেয়ে গেলাম, আমার অবস্থা দেখে হয়তো কেউ জায়গা ছেড়ে দিল। বেশ বুঝলাম সহযাত্রীরা বেশ অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, কবে কেউ কোন প্রশ্ন করেনি। একটা গলা কানে এল “কি দাদা, ছিনতাইকারী নাকি?” আমি আর মুখ তুলে চাই নি। বেশ খানিক ক্ষন লাগলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে। কন্ডাক্টর কে জিগ্যেস করে জানতে পারলাম এই বাস যাচ্ছে হাওড়া। শোভাবাজারে বাড়ি আজ ফেরা যাবে না, কারণ যারা আমাকে অ্যাটাক করেছিল তারা জানে আমার বাড়ি কোথায়? সুতরাং আমাকে আজকের রাতটা অন্য কোথাও কাটাতে হবে। হঠাত মনে পড়ল সেই গলা, ‘মিঃ চৌধুরী বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে পালান’, এবারে মনে পড়ে গেছে, সেই গলা আমি শুনেছি, এই গলা ‘সুকান্ত’র। না আমি ভুল করছি না। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব হল? তার তো বহরমপুরে থাকার কথা, সে তাহলে কলকাতায় কেন? ডাঃ সেনের সঙ্গে কি তার ও যোগাযোগ হয়েছিল? নাকি আমার ওপর সে নজর রেখেছে? আমার আর মাথা কাজ করছে না।

উনিশ বছরের আগেকার সেই উনিশে জুন আজ বারে বারে স্মৃতি তে ফিরে আসছে। কফি হাউসে বসে আমাদের প্ল্যান টা হয়ে গেছে, কাল বিকেলে সাড়ে ছটা থেকে নির্ঝরদা ট্যাক্সি নিয়ে অপেক্ষা করবে, ট্যাক্সি ও আমাদের চেনা – আমাদের পাড়ার ছেলে, সেও এই ব্যাপারে হেল্প করবে বলেছে, রোজ সন্ধ্যের মতো জর্জ ছটার মধ্যে পৌঁছে যাবে আইভির বাড়ি। জন্মদিনের মিথ্যে নাটক করে জর্জ একটা কেকের টুকরো খাওয়াবে আইভির কেয়ার টেকারকে, সেটা খেয়ে তাঁকে ঘন্টা খানেকের জন্য ঘুমোতেই হবে। এদিকে বালিগঞ্জের কাজ শেষ করতে সুশান্ত সাহার যাতে দেরী হয়, সে ব্যবস্থাও করা আছে। কাজেই সাড়ে ছটায় চেয়ারবোর্ণ আইভিকে নিয়ে বেরোতে কোন অসুবিধা হবে না। আমাকে খালি সাউথ পয়েন্ট নার্সিং হোমে একটা জায়গা বুক করে রাখতে হবে। সব প্ল্যান শেষ করে বেরিয়ে বাড়ি ফিরছি তখন রাত প্রায় দশটা, রোজের মতো হাতিবাগানের মোড়ে নেমে পড়লাম, তারপর আমি এদিকের গ্রে স্ট্রীটের বাস ধরি আর জর্জ উলটোডাঙ্গার দিকের বাস ধরে। বাস পাইনি সেদিন, হেঁটেই আসছিলাম। এক মাস আগে শুনেছিলাম সেই কাহিনী। সুশান্ত সাহা স্থানীয় কাউন্সিলার, তার বাড়িতে মাঝে মধ্যেই সাত আট থেকে চোদ্দ পনেরো বছরের বাচ্ছা ছেলে মেয়ে কে কয়েক দিনের জন্য দেখা যায়, তারা আসে তবে এক সপ্তাহের বেশী নয়। তার পর তারা যে কোথায় যায় সে খবর আর পাওয়া যায় না। অদ্ভুত ব্যাপার, এই সমস্ত ছেলে মেয়ে যারা হঠাৎ করে আসে, আবার হঠাৎ করে চলেও যায় তাদের বাইরের কারুর সাথে মিশতে বা কথা বলতে দেওয়া হয় না। জর্জের বধ্যমূল ধারণা সুশান্ত সাহা এই সব বাচ্ছা গুলোকে পাচার করে অন্য কোথাও, দেশের অন্য প্রান্তে অথবা বিদেশে। চাইল্ড ট্রাফিকিং কথাটা সেই প্রথম জানলাম ওর কাছে। সারা শরীর, মন ঘেন্নায় আর প্রতিবাদে ভরে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের প্রমান চাই। আইভি সেই রকম দশ বছরের একটি বাচ্ছা মেয়ে, যার ডান পা পোলিও, গত দুদিন ধরে সুশান্ত সাহার বাড়িতে গেস্ট হয়ে আছে। খুব সম্ভব সেও এই এক পরিনতির শিকার হতে চলেছে। সুশান্ত সাহা পলিটিশিয়ান, বিজনেসম্যান, খুব পাওয়ারফুল, মহিলা সমিতিও নাকি ওনার হাতের মুঠোয় সুতরাং আমরা জানতাম সেদিক থেকে কোন সুবিধা পাবো না। পুলিশ কে কমপ্লেন করে যে কিছু হবে না, সেটাও আমাদের জানা ছিল। তবে জর্জের সাথে বুদ্ধিতে পারেনি, আর জর্জ টাও সেই রকম। দুদিনের মধ্যে সেই বাচ্ছা মেয়েটার না বলা কথা গুলো বুঝে গেছে। আমরা কাউকে কিছু জানাই নি, এমনকি ঘরের কাউকে ও নয়। পুরোটাই আমাদের তিনজনের মধ্যে গোপন রাখা ছিল। আইভিকে আমাদের বাঁচাতেই হবে। তাহলে ব্যবসাটাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কাল একবার পুলিশে নিয়ে যেতে পারলেই হয়। পুলিশে ফরম্যালি কমপ্লেন হবে, নির্ঝরদার বাবার খবরের কাগজে জানাশোনা আছে, তারপর দেখি সুশান্ত সাহার ঘাড়ে কটা মাথা আছে?

তখন ফিল্টার উইলস খেতাম, বেশ মনে আছে সেদিন গোল্ড ফ্লেক কিংস কিনেছিলাম, মাকে আগেই বলা ছিল ‘ফিরতে রাত হবে’ তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চিন্তা ছিল না। শোভাবাজারের মেট্রো স্টেশন টা পেরিয়েছি ঠিক এই সময়ে হঠাৎ বুঝলাম আমার পেছনে তিনজন লোক আমাকে ফলো করছে, আর কিছু রিয়্যাক্ট করার আগেই আমাকে জোর করে একটা মারুতি ভ্যানে তুলে ফেলা হল। সহসা সেই আক্রমনে আমি কেমন যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম, না পারলাম কোন চিৎকার করতে, না পারলাম কোন শারীরিক প্রতিরোধ করতে। গাড়িতে তুলেই আমার চোখ দুটো কালো কাপড়ে বেঁধে ফেলা হয়েছিল যাতে বুঝতে না পারি কোথায় নিয়ে যাওয়া হল। মিনিট দশেক হবে, গাড়ি থামল, তারপর আমাকে হাঁটিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া হল। বেশ মনে আছে – প্রায় পনের কুড়িটা সিঁড়ি পেরিয়ে আমাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হল। চাপা গলায় একটা দুটো কথা কানে আসছিল, আর একটা আওয়াজ হচ্ছিল, খুব সম্ভব পুরোনো পাখা। আমার চোখ খোলা হল তবে আমি কাউকে দেখতে পাইনি, গুনেও দেখিনি ওরা কজন? আলো ও স্বল্প আর সকলের চোখ ছাড়া মুখ গুলো কাপড়ে ঢাকা। প্রথম প্রশ্ন এলো, “কি প্ল্যান রে তোদের? সুশান্ত কে জেলে ঢোকাবি? আইভি ওর ভাগ্নি, তাকে নিয়ে ও ইচ্ছে তাই করবে, তোরা বাঁচাবি? পারবি?”

বেশীক্ষন চুপ করে থাকা হল না, ‘কি প্ল্যান তোদের’ দ্বিতীয় বার প্রশ্নের পর যখন উত্তর দিলাম না – আমার মুখের ওপর বাঁদিক থেকে একটা প্রচন্ড আঘাত এল, আমি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম এই অবস্থায় আমাকে পেছন থেকে একজন ধরে ফেলল। আমার বাঁ হাত টা পেছন থেকে মুচকে ধরা হল, আর তারপর গলার কাছে একটা ধারালো জিনিস অনুভব করলাম – এবারে গলা টা আরো কঠিন – ‘তুমি না ভালো স্টুডেন্ট, প্রেসিডেন্সি তে পড়, বলে ফেল কি প্ল্যান তোমাদের?

অসহ্য যন্ত্রণায় আর ভয়ে কুঁকড়ে গেছিলাম, আমি আর পারিনি, সব বলে ফেলেছিলাম, এমনকি কেকের মধ্যে ঘুম পাড়ানী ওষুধ মেশানোর কথাও। আমাকে দুটো কথা বলা হয়েছিল – এক, আমি যেন জর্জ বা নির্ঝরকে কিছু না বলি আর দুই, পুলিশের কাছে যেন ঘুণাক্ষরে না যাই। আমি কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে সে নির্দেশ পালন করেছিলাম। পরদিন জর্জ কে হাতে নাতে পুলিশ ধরেছিল শিশু চুরি করার অভিযোগে, জেলেও নিয়ে যায়, আমি কিন্তু জর্জের হয়ে সওয়াল করতে পুলিশের কাছে যাইনি। আসলে আগে তো জানতাম না, মাঝনদীতে নৌকায় জল ঢুকে যাবে! তাই আগে নিজে নৌকা ছেড়ে পালানোটাকেই ঠিক মনে করে ছিলাম, পালিয়েও গেছিলাম। দু সপ্তাহ বাদে নির্ঝরদা বহু চেষ্টায় জর্জের জামিন করিয়েছিল, আর তার একদিন বাদে বেলেঘাটার ব্রিজের নিচে জর্জের ডেডবডি পাওয়া গেছিল। পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছিল ‘আত্মহত্যা’। জর্জের মা ওর দুই বোনকে কোথায় চলে গিয়েছিলেন কোন খবর পাইনি। আমি ও কোন খবর নেওয়ার চেষ্টা করিনি। আইভির কথাও আর জানতে পারিনি, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বলা ভালো আর কখনো জানতে চাইনি। আর কোনদিন নির্ঝরদার সাথে যোগাযোগ করিনি। আরো একটা কাজ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। দায়িত্ব সহকারে এই পুরো এপিসোডটাকে মেমারি থেকে ডিলিট করতে চেয়েছিলাম। সেটা হয়নি। মানুষের মেমারি তো! কমপিউটার নয়, তাই থেকে থেকে এই স্মৃতি গুলো রিসাইকেল বিন থেকে আমার সিস্টেমে ঢুকে পড়ে আমাকে বারে বারে মনে করিয়ে দেয় সেই কলঙ্কের অধ্যায়, আর তৈরি করে পরিচয় সংকট ।

“দাদা একটু জায়গা দেবেন, নামবো” পাশের ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে নামার জায়গা দিতে হবে। সীট টা এতো ছোট আমাকে উঠে দাঁড়াতে হল, আর ঠিক এই সময়ে আমার মোবাইলে একটা আওয়াজ হল, ইনকামিং টেক্সট মেসেজ এসেছে, পড়লাম – ‘আফতাবের রিপোর্ট গুলো আপনাকে ইমেলে পাঠিয়ে দিলাম, বাকী কথা সন্ধ্যাবেলা দেখা হলে হবে – দীপঙ্কর সেন’। হয়তো কয়েক ঘণ্টা আগে মেসেজ টা করেছিলেন, সেটা এখুনি এলো। অজান্তে চোখ বুজে এল, একটাই প্রশ্ন আমার মনে বারে বারে আসছিল – ভগবান কি আমার একটা পরীক্ষা নিলেন? এবারে উত্তীর্ণ হয়েছি তো? নাকি এখনো চার পেয়ে সরীসৃপের মতো অন্ধকারে স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছি?

[৬]

বটতলা থানায় আমি যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে নটা। বাস থেকে ফোন করেছিলাম, রনজয়দা ই বলল – থানার চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কিছু হবে না, আর সেখানে আমরা ইন্টারনেট ও পেয়ে যাবো। ডাঃ সেনের রিপোর্ট গুলো ও পড়তে হবে। ইন্সপেক্টর নির্মল বাবু রনজয়দার পরিচিত, আর আমার ব্যাপার টা ফোনেও আগে থেকে বলে রাখবে। কাজের প্রয়োজনে আমি আগেও বটতলা থানায় আগে এসেছি, তবে এবারে একেবারে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে পর্যদুস্ত অবস্থা। নির্মল বাবু আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। হয়তো পুরো ব্যাপারটার আর একবার ধারাবিবরনী আমার মুখ থেকে শুনতে চাইছিলেন, তবে আমার আর কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। ডিনারের কথা জানতে চাইলে আমি প্রত্যাখ্যান করলাম, সত্যি ডিনার করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। খালি জিগ্যেস করলাম – “রনজয় দা কথন আসছে জানেন?”

“হ্যাঁ, বাড়ি থেকে তো বেরিয়ে পড়েছেন টা আধ ঘন্টা হল”

“আমাকে একটা ল্যাপটপ বা কমপিউটার জোগাড় করে দেবেন?”

সাথে সাথে ই ব্যবস্থা হয়ে গেল, আমার ইমেলে সমস্ত ডিটেল এসে গেছে, প্রায় কুড়ি টা ডকুমেন্ট, তার বেশীর ভাগ টাই হসপিটালের রিপোর্ট, আমি সব কটাই খুলে খুলে চেক করছিলাম। বলেছিলেন আমাদের সব ডিটেলে বলে দেবেন কিন্তু সে তো আর হল না, শেষ ডকুমেন্ট টা খুলতে বেশ সময় লাগছিল, সাইজ থেকে বুঝলাম এটা একটা স্ক্যান করা ডকুমেন্ট। শেষ পর্যন্ত খুলল – হাতে লেখা একটা প্রেসক্রিপশন , যিনি লিখেছেন তাঁর নাম ডাঃ রাঘব সরকার সেটা লেখা হয়েছে পনের বছরের আফতাব হুসেনের নামে। তাতে দরকারী পথ্য ছাড়া আর একটা জিনিস ও লেখা রয়েছে – খুব শীঘ্র একে কলকাতায় শিফট করানোর দরকার, সব কিছু ই আমার জানা তথ্য তবে খটকা একটা লাগলো, এই প্রেসক্রিপশন লেখা হয়েছে গত ৭ই জুন। লেখা, তাহলে ৭ জুন থেকে ২০ জুন – এই তেরো দিন আফতাব কার জিম্মায় ছিল? বিশ্বনাথ সরকার একে পায় ২০ জুন, বহরমপুর হাইওয়ে তে অজ্ঞান অবস্থায়, তাহলে?

রনজয় দা পৌঁছে গেল দশ মিনিটের মধ্যে, সঙ্গে একজন পুলিশের ডাক্তার, সব ইমেল তাদের দেখালাম, পুলিশি তৎপরতা আর এক বার চোখের সামনে দেখলাম। প্রায় তিন ঘন্টা ধরে পড়াশোনা, ফোন এই সব হল। আমি চুপ করে বসেছিলাম, তবে বুঝতে পারছিলাম পুলিশ কেসটা সমাধান করে ফেলেছে, রনজয়দাই আমাকে ব্রীফ করল – “বহরমপুর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে মোক্তারপুর নামে একটি গ্রামে রাঘব সরকার নামে এক ডাক্তারের কাছে প্রথম এই আফতাব কে নিয়ে আসা হয়, সেখান থেকে আরো বারো কিলোমিটার উত্তরে কুঠি বাড়ি বলে এক জায়গায় সে ছিল একটি শিশু শ্রমিক, কাজ করত – একটি গ্লাস এবং সিরামিক তৈরি হবার প্ল্যান্টে, নাম হিন্দুস্থান গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ওয়ার্কস । সেই প্ল্যান্টের মালিক রামেশ্বর সোমানি বলে জনৈক শিল্পপতি। ক্যালকাটা লাইফ লাইনের ডাঃ দীপঙ্কর সেনের রিপোর্টে এও আছে এতো ভারী মাত্রায় সিলিকা আফতাবের ফুসফুসে পাওয়া গেছে তাতে এটা অনুমান করাই যায় সেই প্ল্যান্টের চারপাশে এক অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং অবিলম্বে সেই গ্লাস এবং সিরামিক তৈরির কারখানা এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান হোক। আমাদের বহরমপুর থানা থেকে একটা টিম বেরিয়ে পড়েছে, ইমিডিয়েটলি কারখানায় ইন্সপেকশন করার জন্য। যাহোক, আফতাব সেখানে দুরারোগ্য সিলিকোসিস রোগ টা বাঁধিয়ে বসে, তারপর ডাঃ রাঘব তাকে কলকাতা নিয়ে যেতে বলেন। এবারে আফতাবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তখন বিশ্বনাথ সরকার বলে একটি জনৈক ভদ্রলোক তার দায়িত্ব নেন, তিনিই তাকে কলকাতা নিয়ে যান এবং লাইফ লাইন হসপিটালে ভর্তি করেন। গত ২৪ শে জুন বিশ্বনাথ সরকার অসুস্থ আফতাব কে তার কুঠিবাড়ির বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসেন, সেখানেই সে তিন দিন বাদে মারা যায়। তারপর বিশ্বনাথ সরকার কোন খবর নেই। আর এই এতো ঘটনার মধ্যে অমিতাভ ঘোষ বলে কোন ডাক্তারের নাম কিন্তু শোনা বা জানা যায় নি”

মিনিট খানেক চুপ করে থেকে তারপর বললাম, “তাহলে ডাঃ সেন কে খুন কে করল আর কেন ই বা করল?”

“বি কস অফ তোর ডুপ্লিকেট অমিতাভ ঘোষ”

“মানে?”

“ওয়েট! এটা ভাবার এখনো সময় আসেনি যে তোকে সবাই অমিতাভ ঘোষ বলে ভুল করছে, আর তাই তোকে অ্যাটাক করেছে। তাকে কেমন দেখতে সেটা এখনো জানা যাচ্ছে না, তবে তোর এই এতো ডকুমেন্টসের মধ্যে একটা ইমেল আছে ডাঃ অমিতাভ ঘোষের অ্যাকাউন্ট থেকে, আর সেটা খুব শকিং!” একটা কাগজের টুকরো তুলে রনজয়দা পড়া শুরু করল, “ডাঃ অমিতাভ ঘোষের লেখা শোন। শ্রদ্ধেয় ডাঃ সেন, আমি যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। আমি খবর নিয়ে জানলাম কুঠি বাড়ির কাছে সোমানির যে প্ল্যান্ট টা আছে, সেটাতে আর একটা বেআইনি কাজ হয়। বাংলাদেশ, নেপাল থেকে বাচ্ছা ছেলেদের কিডন্যাপ করে, এখানে কিছুদিন রেখে আরবে ডিপোর্ট করা হয়। আমার ওপর যে কোন মুহূর্তে অ্যাটাক হতে পারে, জানি না বাঁচবো কিনা? তিনটে ছবি পাঠালাম। দেখলেই সব বুঝবেন আপনি। স্থানীয় পুলিশ জড়িয়ে আছে পলিটিশিয়ানদের সাথে। আমি বললে কেস ওপেন করবে না, আমাকে হয়তো মেরেই দেবে। প্রানের ভয় আমার নেই, কিন্তু এই জিনিসটা বন্ধ করা দরকার। আপনি একটু দেখবেন প্লিজ। আর সোমানিদের রেজিস্টার্ড অফিস ২১ নম্বর উদয় শঙ্কর সরনি।” রনজয়দা একটা সিগারেট ধরালো, “ফটো তিনটে ও আছে ওর মধ্যে, কেস ইস প্রিটি মাচ ক্লোসড নাউ। আর ২১ নম্বর উদয় শঙ্কর সরনি বুঝতে পারছিস তো? তুই যেখানে সকালে হানা দিয়েছিলিস! হয়তো অমিতাভ ঘোষকে আগেই মেরে দিয়েছে, দীপঙ্কর সেনকে থ্রেট করে রেখেছিল, তারপর আজ তাকে মেরে দিল, নাউ নেক্সট তুই। তাহলে সব কটা প্রমান তো লোপাট হয়ে যায়! এবারে বল, তোকে ওরা অ্যাটাক করবে না তো কাকে করবে? আর তোর জন্য তো কেসটা আবার এক মাস বাদে খুলল, এবারে দেখি রানিবাজার থানার পুলক মিত্রকে কে বাঁচায়? স্পেশাল টাস্ক থেকে চিঠি গেছে কাল লালবাজারে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। নিখিল ইউ মেড মী প্রাউড” রনজয়দা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমার মন কিন্তু অশান্ত হয়ে আছে, রনজয়দারা হয়তো ডাঃ সেনের খুনের কিনারা করে ফেলল, কিন্তু আমার মনে যে হাজার প্রশ্ন। অমিতাভ ঘোষের কি হল? বিশ্বনাথ সরকার তার মানে আফতাব কে নিয়ে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজেই আর বাড়ি আসেনি। কি হল বা তার? সুকান্ত ই বা কলকাতায় ঘোরাঘুরি করছে কেন? সে আমার আজ প্রাণ বাঁচিয়েছে, সে কি আমার ওপর নজর রেখেছিল? সবচেয়ে বড় আর একটা প্রশ্ন – অমিতাভ ঘোষ নিরুদ্দেশ বলে পেপারে বিজ্ঞপ্তি টা ঠিক আছে। কিন্তু যোগাযোগের ঠিকানা উদয় শঙ্কর সরনি দেওয়া হল কেন? সেটা কি আমাকে কোন ক্লু দেওয়া হয়েছিল? হাত ঘড়িতে এখন রাত দুটো এগারো, দরকারে আমাদের খবরের কাগজের লোকেদের দিন রাত বলে কিছু হয় না। আমাকে জানতেই হবে – কে দিয়েছিল সেই সন্ধান চাই বিজ্ঞপ্তি? এখুনি। আর এখন তো শহরে চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা, ফোন করতে বাধা নেই। কমলবাবু পনের মিনিটের মধ্যে দেখে জানাবেন বললেন। থানার বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম, আমার ফোনে একটা টেক্সট মেসেজ ফুটে উঠল – বিজ্ঞপ্তি টা যিনি দিয়েছিলেন তার নাম সুকান্ত সরকার।

রনজয়দাকে কিছু বলিনি, নিজে নিজে বসে ভাবছিলাম। আমার অজানা প্রশ্ন গুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মন শান্ত হবে না। সাড়ে তিনটে নাগাদ রনজয়দা একবার বেরোল, “একবার লালবাজার যেতে হবে, এক ঘন্টার মধ্যে ফিরব, তুই একটু ঘুমিয়ে নে। দ্যাখ থানায় তো আর বিছানা পাবি না, তুই বরং এই চেয়ারটাতে বসে একটু রেস্ট নিয়ে নে। কালকে সকালে তো তুই ফার্স্ট পেজে, আর খবরও চলে গেছে, খবরের কাগজের লোক এই এলো বলে। আর শোন, প্রমোশনের পার্টি টা আজে বাজে জায়গায় না করে ভালো জায়গায় করবি। নয়ত যাবো না! আর ককটেল ডিনার পার্টি! কি হলো? হ্যাঁ, না কিছু তো বল! আর শোন, তুই একটু রেস্ট করে নে, তাছাড়া তোর মেন্টাল রেস্টের ও একটা দরকার আছে। ”

রনজয়দা কে আশ্বস্ত করে পেছনের একটা রকিং চেয়ারে বসে আছি, চোখ বুজে এসেছে, খুব চা খেতে ইচ্ছে করছিল। মিনিট দশেকের মধ্যে একটি বাচ্ছা ছেলে এসে আমাকে চা দিয়ে গেল, হাতে একটি কাগজ – “বাবু, একটু আগে একজন এসেছিলেন এইটা আপনাকে দিয়ে গেছেন, পড়তে বলেছেন”

হাতে লেখা একটা নোট –

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! অতনু সান্যাল সেজে আজিমগঞ্জের ট্রেনে আমি আপনার সাথে পরিচয় করেছিলাম। শিশু পাচার আমি ঘৃণা করি, আর সেটা বন্ধ করার জন্য এই পঁয়ষট্টি বছরে আমি যা পারবো তাই করব। শিক্ষক ছিলাম, ছাত্ররা ছিল আমার প্রাণ, সেই শিশুদের নিয়ে ব্যবসা আমি মেনে নিতে পারিনি। আফতাব কে বাঁচাতে পারলাম না, আর তার পর থেকে প্ল্যান করেছি। পুলিশ আমার কেস নিতো না, উলটে আমাকেই শিশুপাচারকারী বানিয়ে দিল। কাজেই আমার একটা কাল্পনিক চরিত্র দরকার ছিল আর দরকার ছিল এক জন ডিটেক্টিভ। অমিতাভ ঘোষ সেই কাল্পনিক চরিত্র আর আপনি সেই ডিটেক্টিভ। আপনাকে অনেক খুঁজে বার করেছি, জানতাম আপনি শেষ পর্যন্ত লড়বেন। আপনার ছবি জোগাড় করে সেটাকে সফটওয়ারের সাহায্যে পরিবর্তন করে আপনাকে দেখিয়েছি। জানি অন্যায় হয়েছে কিন্তু কি করি বলুন তো! আমাদের দেশে আমার মতো লোকের কথা কে শুনবে? আর গোয়েন্দা লাগানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। আর একটা কথা মালদার হোটেলে বা রাস্তায় যারা আপনাকে অমিতাভ ঘোষ বলেছে তারা সবাই আমার ছাত্র। তাদের সব কিছু শেখানো ছিল। সারাক্ষন ওরা আপনার আশেপাশে থাকতো, যাতে আপনার কোন ক্ষতি না হয়। বাকি যা করার আমি ই করেছি সুকান্তর সাহায্যে। আমাদের কাউকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না, পাবেন না। ইংলিশ বাজারের বাড়ি আমরা ছেড়ে দিয়েছি তিন দিন হল, ভারতের একশ কুড়ি কোটি মানুষের মধ্যে আমরাও হারিয়ে গেলাম এই মুহূর্ত থেকে। আপনার চেয়ে আমি বয়সে অনেক বড়, তাই প্রণাম জানাতে পারলাম না। - নমস্কারান্তে জনৈক শিশু পাচার বিরোধী, বিশ্বনাথ সরকার।

পুনশ্চ - পুলিশকে না হয়, নাই বললেন এত কথা।

গল্পে ব্যবহৃত সমস্ত নাম এবং স্থান অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। ‘গোলমাল’ সিনেমার দৃশ্য ছাড়া বাকিটা কাল্পনিক।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮