• মণীষা রায়

আমার ডায়েরি


প্রতি বছর পুজো আসে তার আপন নিয়মে । পুজোর আসার সময় হলেই, হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর মধ্যে একটা মুখের কথা আমার খুব মনে পড়ে,সে নিতাই বাউল ,প্রতি বছর শ্রাবণের ধারা শেষ বর্ষণের প্রস্তুতি নিতো ,ভাদ্র গুটিগুটি পায়ে আসতে শুরু করতো,প্রকৃতি তার আভাস দিতো ,বাগানে শিউলি গাছে ভ'রে আসতো কুঁড়ি,রান্নাঘরের ঘরের পিছনে স্থলপদ্ম গাছে ফুটতে শুরু করতো ফুল ,সাজি ভ'রে আমার মা আনতেন টগর,বেল,জুঁই ,স্থলপদ্ম আর গন্ধরাজ,সকালে শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে আনন্দ পেতাম,সুনীল আকাশ,টুকরো টুকরো শাদা মেঘের রাশি,গঙ্গার ধারে হাওয়ায় দোলা কাশফুলেরা আমায় ডেকে বলতো ,পুজো আসছে ,'শুরু হতো মেঘ বৃষ্টি আর রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা,সকালে সোনালি রোদ্দুর ছড়িয়ে দিতো চারিদিকে পুজোর গন্ধ ,উৎসবের আমেজ আকাশে বাতাসে।

বাড়িতে তখন দুর্গা পুজোর আয়োজন শুরু হয়ে যেত,সাজ সাজ রব,একচালার কাঠামোতে মাটির প্রলেপ,এরপর রঙের প্রলেপ পড়তো ,কুমোর কাকা আর তার সঙ্গীরা রাত জেগে ঠাকুর তৈরি করতো,মালী কাকা সারা বাড়ি পরিষ্কারে লেগে যেতো,ঠাকুরদা লাঠি হাতে সব কিছু তদারকি করতেন, মাঝে মাঝে বাবাকে ধমক দিতেন,---'তোরা আজকালকার ছেলেরা,যদি কোনো কাজ ঠিক মতো করিস',তিন বাচ্চার বাবা আমার ,মাথা নিচু করে শুনতেন আর বলতেন,',হাঁ বাবা, বলুন না আর কী কী করতে হবে?'

এইসময় নিতাই বাউল প্রতিদিন সকালবেলায় তার একতারাটি বাজিয়ে আগমনীর গান নিয়ে হাজির হতো আমাদের দরজায়,এক পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নাচ করতো আমাদের উঠোন ঘুরে,সকালবেলায় ঘুম ভাঙতো ওর গানে,দক্ষিণের জানলা দিয়ে উঠোন পানে চেয়ে দেখতাম ,আমার সদ্য স্নাতা মা,পিঠের ওপর এক ঢাল ভিজে চুল ছড়িয়ে লালপাড় শাদা শাড়ি পড়ে,শাদা শাখা ও লাল পলা পড়া হাতে নিতাই বাউলের গেরুয়া রঙের ঝোলায় ঢেলে দিচ্ছেন থালা থেকে চাল-ডাল-আলু,আজও আমার কানে আসে তার কণ্ঠস্বর:----- 'ঊমা আমার দুধের ছেলে

কেঁদেছে 'মা মা' বলে ও পাষাণগিরি

শিবের নাহি ক' পিতা-মাতা কে জানিবে মায়ের ব্যথা

কারে কবে দুঃখের কথা আমার স্বর্ণলতা বিধুমুখী' নিতাই বাউলের মুখেই আমি প্রথম শুনেছিলাম --মা কে মেয়ে সাজিয়ে যে সব খেলা এ দেশের ভক্ত ও সাধকেরা খেলেছেন তার নিদর্শন অন্য কোথাও হয় না,তাই আগমনী গান কেবল বাঙালীরাই রচনা করেছেন,অন্য কেউ পারে নি ,বাংলা ভাষা ভাণ্ডারে এ এক অমূল্য সম্পদ। দিন চলে যায় কালের গর্ভে,আজ নিতাই বাউল নেই। চলে গেছে দূরে --বহু দূরে,পৃথিবীর বাইরে ,বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে,উথাল পাথাল মন,শুধু একজন জানেন নিঃসঙ্গ মনের করুণ আর্তি,তিনি রবীন্দ্রনাথ,রুদ্ধ কণ্ঠে পাঠ করি তাঁর কবিতা

'দূরে অশথতলায়

পুঁতির কণ্ঠিখানি গলায় বাউল দাঁড়িয়ে কেন আছ ? সামনে আঙিনাতে তোমার একতারাটি হাতে তুমি সুর লাগিয়ে নাচো !'

নিতাই বাউল ফিরে এসো,অন্য কোনো রূপে------

'আমার প্রাণ যেন ভাই বাঁচে —

আমার মন যেন পায় ছুটি ।

ওগো তোমার নাচে'

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮