• শর্মিষ্ঠা বসু

আলোর খোঁজে


[১]

আজ সকাল থেকেই মেঘলা ছিল আকাশ। পশ্চিম দিগন্তে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরে। বেলা বাড়তেই শুরু হল বৃষ্টি। অকাল নিম্নচাপের অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায় ভেসে যাচ্ছিল মহানগরী। এই প্রবল বর্ষণে শহরের জীবন যাত্রা প্রায় স্তব্ধ আজ। তবে ‘happy home’ এ আজও ভিড় কিছু কম নয়। কোন এক খবরের কাগজ তিয়াসার কাজ নিয়ে স্টোরি করতে বিশেষ আগ্রহী। তিয়াসা যে এতে খুব অখুশি তা নয়। তার স্বপ্নের ‘happy home’ একটু প্রচারের আলোয় এলে হয়তো বা সরকারী সাহায্যের একটা সুযোগ মিলবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আকাশ দেখছিল তিয়াসা। মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে সূর্য। সমস্ত বিশ্ব চরাচর জুড়ে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। গেট খোলার আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘোরাল সে। এক মুখ আপ্লুত হাসি নিয়ে এগিয়ে গেল সে দরজার দিকে। “তুই! এসেছিস? আয় বোস”, তিয়াসার কণ্ঠস্বরে খুশীর ঝলক। “রং, তুলি এনে রেখেছি তোর জন্য, খুব সুন্দর করে আজ একটা ছবি আঁকতে হবে তোকে”, তিয়াসার কথায় রুমানার মুখে ম্লান হাসির আভাস। “আজ আমায় তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে দিদি, আজ যে আমার কেমো নেবার ডেট”। এই মুহূর্তে নির্বাক তিয়াসা, একভাবে তাকিয়ে আছে রুমানার দিকে।

আজ ‘happy home’ এ বাচ্চার সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। এদিকে তার সহকারী নন্দনা আজ বৃষ্টিতে অনুপস্থিত। এতো গুলো বাচ্চা, তার ওপরে প্রেসের ঝক্কি, সব কিছু যে একা কি করে সামলাবে সেই ভাবছিল তিয়াসা। হঠাৎ অনিকে দেখে প্রায় লাফিয়ে উঠল সে, “অনি তুই? এতদিন বাদে কোত্থেকে উদয় হলি?” ছদ্মরাগ দেখিয়ে প্রশ্ন করল তিয়াসা। অনি কোন পাত্তাই দিলো না, চারদিকে তাকিয়ে বলল, “করেছ কি বস? এতো দেখছি চাঁদের হাট!” তিয়াসা হেসে ফেলল, অনি টা এমনই, ওর ওপর রাগ করে থাকাই যায় না। চিরকালের খামখেয়ালী, হুজুগে আর পাগলাটে স্বভাব, কখন যে কোথায় উধাও হয়ে যায় কে জানে। এদিকে স্টোরের ফর্দ নিয়ে এসেছে পার্বতী। তিয়াসা মন দিয়ে কাগজটা দেখল। এই বৃষ্টিতে বাজারে যাওয়া অসম্ভব। স্টোরে যা চাল, ডাল, মশলা পাতি আছে তা দিয়ে দুটো দিন চালিয়ে দেওয়া যাবে। পার্বতীর সাথে প্রয়োজনীয় কথা সেরে পাশের ঘরের দিকে দ্রুত পায়ে এগোল তিয়াসা। খবরের কাগজের লোকেদের এবারে অ্যাটেন্ড করা দরকার। অনেকক্ষণ ধরে ওনারা অপেক্ষা করছেন।

[২]

চার নম্বর শিবধন মিত্র রোড, তিয়াসাদের বাড়ির ঠিকানা। রাস্তার মোড়ে লালরং এর তিনতলা বাড়িটায় একসময় অনেক লোক জন থাকলেও এখন এ বাড়ির বাসিন্দা মাত্র তিনজন। তিয়াসা, তার বাবা আর মা। পাঁচ কাঠা জুড়ে তিয়াসাদের এই বাড়ি। গেটের গায়ে লাগানো ফলক ‘শান্তিনীড়’ এ ফাটল ধরেছে। সামনেটায় একটা ছোট পকেট মাপের ঘাস জমি, অযত্নে লালিত দু চারটে মরশুমি ফুল ফুটে আছে তাতে। বাড়ির একতলাটা এখন খালি, কেউ থাকে না সেখানে। ভাঙ্গা চোরা কি সব পড়ে আছে সেখানে। পেছনের চাতাল ঘেঁষে কয়েক টা আম, পেয়ারা আর সুপারি গাছ। তিয়াসার ঠাকুরদা অনাদিনাথ বসু যখন এ বাড়ি বানিয়েছিলেন তখন এ অঞ্চলে বসতি তেমন গড়ে ওঠেনি। চারদিকে প্রচুর খোলা জমি, কয়েকপা হাঁটলেই বেশ বড়সড় দু-দু খানা দীঘি। প্রথম দর্শনেই এ জায়গা টা বেশ পছন্দ হয়েছিল অনাদিনাথের। অনেক সাধ করে তাই বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘শান্তিনীড়’। তবে হালে তার স্বপ্নের বাড়ি ‘শান্তিনীড়’ এর বাসিন্দারা কতটা শান্তিতে আছে তা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

তিয়াসাদের বাড়ির কিছুটা দূরেই এ শহরের সবচেয়ে বড় ‘multi specialty’ শিশু হাসপাতাল। দূরদূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষের ভিড় এখানে। আর এই হাসপাতালকে ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অজস্র খাবার দোকান তিয়াসাদের বাড়ির আশে পাশে। এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের বহু প্রতিবাদ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দাদাদের মদতপুষ্ট এইসব দোকান গুলোকে ওঠানো যায় নি। সকাল থেকেই তাই ই অঞ্চলে জমজমাট ব্যস্ততা। গ্যাসের উনুনে ফুটন্ত ভাত আর গরম তেলে ভাজা মাছের গন্ধে ভরপুর চারদিক। দিন ভর অপেক্ষমাণ বেশীরভাগ মানুষের সেই হাসপাতালের মহার্ঘ ক্যান্টিনে খাওয়ার সঙ্গতি নেই। আর তাই ছোট দোকানগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তুঙ্গে। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হত তিয়াসা। ভোর হতে না হতেই, তেল, মশলার ঝাঁঝালো গন্ধ, দোকানের পাশে রাখা খোলা প্লাস্টিকের বালতিতে স্তূপীকৃত ডিমের খোলা, সবজীর খোসা, কেমন যেন শরীর গুলিয়ে উঠত ওর। আজকাল অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছে। বরং ছুটির দিন গুলো তে মনখারাপ হয়ে যায় ওর। আউটডোর বন্ধ, তাই দোকানগুলোতে তেমন ভিড় থাকে না। কেমন যেন একটা ঝিমিয়ে থাকা পরিবেশ। উদগ্রীব হয়ে সে অপেক্ষা করে পরের দিনের জন্য।ভোরের আলো ফোটার আগেই দুধ আর পাউরুটির গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়। দোকান গুলোতে টিমটিম করে আলো জ্বলে ওঠে, সবজীর ঝুড়ি মাথায় সব্জীওয়ালা এসে হাঁক পারে, দাঁড়িপাল্লায় ওজন হয় ঝিঙে, পটল, বেগুন, আর অলস শিবধন মিত্র রোড তখন আড়মোড়া ভাঙতে থাকে। আর কিছুক্ষণ বাদে চায়ের জল ফোটা শুরু হয় গ্যাসের উনুনে, আর শোনা যায় কেটলি আর কাপের টুংটাং শব্দ। ভোরের আলো ফুটতেই দপ করে নিভে দোকানের আলো, ভোরের সূচনা হয় শিবধন মিত্র রোডে। বড় পরিচিত দৃশ্য আর বড় একঘেয়ে।

[৩]

ফোন বাজছে তিয়াসার। তিয়াসা জানে ওটা মায়ের ফোন। রোজ এই সময়টা মা ফোন করেন অফিস থেকে। “বলো, কি বলবে?” বিরক্তির সুর তিয়াসার গলায়। গতকাল সন্ধ্যে থেকে বৃষ্টি পড়ছে, ঝলসাচ্ছে, বিদ্যুৎ, বাজ পড়ছে কড়াত কড়াত। এমন দিনে একা থাকতে কারই বা ভালো লাগে? “ব্রেকফাস্ট করেছ?” ফোনের ওপারে নিবেদিতা বসুর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর। তিয়াসা জানে মা এটাই বলবে। রোজই বলে যায়, যন্ত্রের মতো। “উঃ মা! রোজ এক কথা বলো না তো, ভালো লাগে না। এমনিতেই বোর হচ্ছি একা একা!” একরাশ বিরক্তি চেপে রেখে কথা বলছিল তিয়াসা। “ও মা? সেকি? কত কিছু করার আছে?” নিবেদিতার কণ্ঠে এবারে প্রশ্রয়ের ছোঁয়া। “যাও একটু টিভি দেখ, নয়তো বই পড় আর নাহলে দিম্মাকে ফোন করে একটু গল্প করে নাও। শোন, তোমার জন্য চিকেন স্টু...” কথা শেষ হবার আগেই ফোন কেটে দেয় তিয়াসা। ডোরবেল বাজছে, নির্ঘাত কোন সেলসম্যান। এখন কিছু সময় জিনিস গচানোর জন্য অনুনয়, বিনয় চলবে। আপন মনে গজগজ করতে করতে দরজা খুলছে তিয়াসা আর দরজা খুলতেই সব বিরক্তি একনিমেষে উধাও। দরজার ওপাশে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে অনিব্রত, মুখে হাসি।

কফির কাপে চিনি মেশাচ্ছিল তিয়াসা। অনি প্রায় ছোঁ মেরে তিয়াসার হাত থেকে কাপটা নিয়ে চুমুক দিল কফিতে। তারপর মাথা টা একটু ঝাঁকিয়ে বলল , “বাড়িতে আলোচনা হল?” মাথা নাড়ল তিয়াসা, “কি বলব বল তো? সেদিনে তুই যে ফোনে কি বলে গেলি কিছুই তো বুঝতে বুঝলাম না। রোগীদের হোম মানে কি?” অনি তিয়াসার দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর বলল “ওহ এখনো কথা বলে উঠতে পারিস নি? তোর দ্বারা কিসসু হবে না। আসলে কাজ করা তোর ধাতে নেই” তাচ্ছিল্যের সুর অনির গলায়। তিয়াসা রেগে গেল, গলা চড়িয়ে বলল “কি বলতে চাইছিস তুই? রেজাল্ট না বেরোলে করব টা কি? ছুটির মধ্যে গিয়ে কলেজ ঝাড়পোছ করে কাজ দেখানোর বাসনা আমার নেই। হে মহান কর্মবীর অনিব্রত সেন, ওসব তোমার জন্য।“ হেসে ফেলল তিয়াসা এবারে, অনি ও হাসছিল। তারপর দুচোখ বন্ধ করে বলল, “বাইরের বারান্দায় গিয়ে একবার দাঁড়িয়ে দেখ। দোকানগুলোতে যারা বসে আছে তাদের দিকে একটু ভালো করে তাকা” তিয়াসা অনির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, বিস্মিত তার দৃষ্টি, বোঝার চেষ্টা করছিল ওর কথাগুলো। “hospice ব্যাপারটা সম্বন্ধে কোন idea আছে তোর?” চোখ খুলে অনি তাকিয়ে আছে তিয়াসার দিকে। মাথা নাড়ল তিয়াসা, শব্দটা সত্যিই একেবারে অচেনা লাগছে। অনি কিন্তু এবারে খুব গম্ভীর, “একটু ভেবে দেখ তিয়াসা, এত ছোট ছোট বাচ্চা, এত কঠিন সব অসুখ, এই বাচ্চাগুলোকে কিছুটা সময় যদি একটু আনন্দ দেওয়া যায়, তাহলে কেমন হয়? ভালো নয়? তোর মনে হয় না, এভাবে কিছু করা যায়? আসলে তোদের একতলাটা তো ফাঁকা পড়ে আছে, তাই বলছিলাম। বাড়িতে একটু কথা বলে দ্যাখ না!” ‘happy home’ এর সেই পথ চলার শুরু।

[৪]

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি বোলাচ্ছিল তিয়াসা। পাশের চেয়ারে অনি প্রায় আধশোয়া হয়ে ঝিমোচ্ছে। তিয়াসা ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে ফেলল, তারপর বলল, “ওঠ কুঁড়েরাম, হাসপাতালে যেতে হবে। বেশী দেরী করলে আর কাজ হবে না” হালকা হলুদ রং এর ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিল তিয়াসা। টেবিলের ওপর রাখা কালো ব্যাগটা ঝুলিয়ে অনিকে ডাকল, “ওঠ, অনি! এগারোটা বেজে গেছে”।

“কোথা থেকে আসছেন আপনারা?” হাসপাতালের সুপারের কণ্ঠে বিরক্তির ছোঁয়া, অনি ব্যাপার টাকে যতদূর সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করছিল। তিয়াসা বুঝতে পারছিল না, কি বলবে? উল্টোদিকে বসে থাকা মানুষটা এমনিতেই যথেষ্ট বিরক্ত, “কি বললেন? A home for sick and terminally ill?” সুপারের ঠোঁটের কোণায় তাচ্ছিল্যের হাসি। আপনার idea টা unique, no doubt , তবে কি জানেন ছাত্র বয়সে ঐ সব সমাজ সেবা-টেবার শখ অনেকের হয় আবার মিটেও যায়। ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে সুপারের। আর কিছু বলার আগেই মুঠোফোন বেজে উঠছে, আর তিনি ও ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন ফোনে। অপমানে পুড়ে খাক হচ্ছিল তিয়াসা। ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিচ্ছিল এখানে বসে থেকে আর লাভ নেই। অনি এবারে উঠে দাঁড়াল, এবারে তিয়াসা ও। এতটা অপমান সে আশা করেনি। প্রথম দিনে কাজটা হয়ে যাবে এমনটা যদিও ভাবেনি তবু হেরে যাওয়ার একটা কষ্ট তো ছিলই!

বাড়ি ফিরে আসছে তিয়াসা। বড় অসহায় লাগছে আজকে। না, তবে থামলে চলবে না! কিছু একটা করতেই হবে। দোকানের আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাগুলোকে কদিন ধরে খুঁটিয়ে দেখেছে সে। কি করুন সেই মুখগুলো! কি ভয়ার্ত ওদের দৃষ্টি? হাসপাতালের একটা দিন যেন ওদের সমস্ত জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছে। মন জুড়ে জমাট একরাশ অভিমান, হতাশা, রাগ, শঙ্কা সব যেন জলভরা মেঘের মত ভিড় করেছে তিয়াসার চোখের কোলে। দুহাতে মুখ চেপে কাঁদছিল সে। আজ হাসপাতালের সুপারের অবজ্ঞা আর অপমান কিছুতেই ভুলতে পারছিল না সে। মাথায় হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে তাকালো সে, মা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। এমন একটা স্নেহস্পর্শের বড় প্রয়োজন ছিল তার। ঠিক এই মুহূর্তে, এক্ষুনি!

[৫]

মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল তিয়াসা। সুপারের সাথে দেখা করার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই মুহূর্তে অনি অন্য কাজে ব্যস্ত। অগত্যা তিয়াসা একাই আবার এসেছে হাসপাতালে। এসে অবশ্য মনে হচ্ছে ফিরে গেলেই ভালো হত। আজ আবার অপমানিত হতে হবে। তিয়াসা উঠে দাঁড়াল, তারপর কি মনে হল আবার বসে পড়ল। সাততলার জানলা দিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বর্ষার জল পেয়ে গাছগুলো কেমন সতেজ, সবুজ হয়ে উঠেছে। উঠে দাঁড়াল তিয়াসা, সামনেই কাঁচ-ঘেরা ঘর, নীল পর্দায় মোড়া। বাইরের বোর্ডে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘Pediatric Center for Excellence’, মনে হচ্ছে ঘরে এই মুহূর্তে কোন ভিজিটর নেই। ঢুকে পড়বে ঘরে? কোন গণ্ডগোল হবে না তো? ঘরের দিকে এগিয়ে গেল তিয়াসা, মাথা দপদপ করছে। উত্তেজনায় স্নায়ু টানটান।

“কি নাম বললেন?” কাঁপা কাঁপা গলায় জবাব দিল তিয়াসা। “আপনি জানেন নিশ্চয়ই এখানে আসতে গেলে appointment নিয়ে আসতে হয়” মাথা নাড়ল তিয়াসা। নিয়মটা সত্যিই তার জানা নেই। “অসুস্থ বাচ্চাদের ভাল থাকার জন্য home করতে চাইছেন ভাল কথা কিন্তু হাসপাতাল আপনার home কে promote করবে কেন? এভাবে আপনি আমার কেন সময় নষ্ট করছেন বুঝতে পারছি না”, ভাঁজ পড়ছে দুই ভুরুর মাঝে। বাতানুকূল ঘরের মধ্যে ঘামছিল তিয়াসা। কথা বলা হয়ে গেলে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলে মুখ ডুবিয়েছেন ঘরে বসে থাকা সেই মানুষটি, গভীর মনোযোগে কি যেন পড়ছেন ঘরে তিয়াসার উপস্থিতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে। ভুলে ঠিক নয়, আসলে অবজ্ঞা, ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা। শিথিল পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে, এখন সোজা বাড়িতে যেতে হবে। রাস্তা দিয়ে মন্থর গতিতে হাঁটছিল সে। দুপাশের দোকান গুলো চলছে নিজের নিয়মে। বাড়িতে ঢুকে ধপ করে বসে পড়েছিল তিয়াসা। বিবর্ণ মুখে রক্তচ্ছটা, দগ্ধ হচ্ছে রাগে, অপমানে। হঠাৎ দেওয়ালের দিকে নজর আটকে যায় ওর। একটা টিকটিকি দেওয়াল ঘড়িটার গা ঘেঁষে সিলিং এর দিকে ওঠার চেষ্টা করছে। ছোট ছোট পা গুলো পিছলে যাচ্ছে বারে বারে, তবু ও উঠছে, দেওয়াল ধরে কিন্তু নামছে না। ভাল করে স্নান করল তিয়াসা, একটা লম্বা ঘুমের দরকার এখন। অনেক হয়েছে হাসপাতাল অভিযান, আর নয়।

[৬]

আজ আকাশ জুড়ে মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। তবে বৃষ্টির পর একটা চাপা গুমোট। মধ্য দুপুরের গনগনে সূর্য অস্বস্তিটাকে আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইজিচেয়ারে বসে একটা বই পড়ার চেষ্টা করছিল তিয়াসা। মন বসছে না কিছুতেই। একটা ভাবনা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে মনের মধ্যে। ডোরবেল বাজছে, মুহূর্তে চিন্তা ছিঁড়ে খানখান, দরজা খুলল গিয়ে। রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে, সই করে চিঠিটা রাখল তিয়াসা। তারপর আর দাঁড়াল না। ঘরের দরজাটা বন্ধ করে সোজা চলে এসেছে রাস্তায় দোকানগুলোর সামনে। চাপা উদ্বেগে কাঁপছে বুক, কষ্ট হচ্ছে নিশ্বাস নিতে। দোকানের সামনে ভিড় এখন বেশ জমজমাট। আধখোলা ডেকচি তে ভাত, ট্যালটেলে ডাল, পাশে একটা গাঢ় লাল রংয়ের ঝোল। হঠাৎ বাঁদিকের দোকানের পাশের বেঞ্চে নজর পড়েছে ওর। বছর দশেকের একটা ছেলে কুঁকড়ে বসে আছে তার বাবা আর মায়ের মাঝখানে। বিবর্ণ, শুষ্ক তার মুখ। এগিয়ে গেল তিয়াসা, রোদটা এখন বেশ চড়া। ঘাম হচ্ছিল ওর। ছেলেটির পাশে বসে থাকা মহিলাটি তাকালেন ওর দিকে, অবাক চোখে। “আপনারা কি চেক আপ করতে এসেছেন?” গলায় জোর আনার চেষ্টা করছিল তিয়াসা। মাথা নাড়লেন মহিলা, ঠোঁটের কোণায় শুকনো হাসি। “আমার বাড়িতে আসুন না, এই কাছেই আমার বাড়ি। আপনারা এতো রোদ্দুরে বসে আছেন তাই বললাম” কথাগুলো অগোছালো হয়ে যাচ্ছিল তিয়াসার। ভয় করছিল খুব। কে জানে, যদি অন্য কিছু ভেবে বসেন এঁরা? “আপনার বাড়িতে বসে আমার ছেলেকে একটু খাওয়াতে পারি? আসলে হাসপাতালের ক্যান্টিনে তো বাইরের খাবার খাওয়ানো বারণ” কথা শেষ হল না, কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠছিলেন মহিলা, দেহ মন ক্লান্ত, অবসন্ন। শাম্বর সঙ্গে তিয়াসার এভাবেই প্রথম পরিচয়।

অনির পরামর্শে নীচের ঘর দুটো সাজিয়ে ছিল তিয়াসা। এমনিতে তো পাকাপাকি বন্ধ হয়ে পড়েছিল ঘরদুটো। ভাঙ্গা চোরা কি সব পড়েছিল ডাই হয়ে। ঘরদুটোকে সাফসুতরো করে ঘরের সাজ বদলেছিল তিয়াসা কিছু খেলনা, ছবি আর বই পত্তর দিয়ে। ঘরের কোণায় ছেলেবেলার ছোট্ট কাঠের ঘোড়াটাকে একটু রংচঙে করে নতুন করেছিল সে। আজ ঘরে ঢুকতেই শাম্বর হাসি দেখে মনে হল এই হাসিটুকু দেখার জন্য অনেকদিন বেঁচে থাকা যায়।

[৭]

‘Happy home’ এর বয়স এখন প্রায় তিন ছুঁই ছুঁই। দু কামরার এই হোমে বাচ্চার সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে। আজ সেই হাসপাতালে আসা বহু বাবা মায়ের ভরসার জায়গা এই ‘Happy home’। এই তিনটে বছর খুব সহজ ছিল না। ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, শ্লেষে জর্জরিত হয়েছে তিয়াসা। তবু থেমে থাকেনি। শান্ত রেখেছে নিজেকে, নিস্তরঙ্গ দীঘির মত শান্ত। অবিচল থেকেছে নিজের লক্ষে। এক আলোর পথের হদিশ পেয়েছে সে, এগিয়ে চলেছে সেই পথ ধরে, সমাজের অঙ্গুলি-লেহন, ভ্রূকুটি আর বক্রোক্তি কে উপেক্ষা করে। প্রথম দিকে দু-চারজন নিজের থেকে এলেও, বেশীর ভাগ মানুষই হোমে এসেছেন নিছক কৌতূহলে। মনের মধ্যে কোথাও একটা চাপা অবিশ্বাস, তবে একটু একটু করে কোথাও একটা বিশ্বাস জন্মেছে সবার মধ্যে। ‘হোকাস ফোকাস গিলি গিলি’ ম্যাজিক দেখাচ্ছে অনি। ডান হাতে একটা রঙিন ফুল, বাঁ হাতে একটা রুমাল। অনি যখন ই আসে বাচ্চাগুলোকে মাতিয়ে রাখে এই ভাবে। হাততালি দিচ্ছে সবাই শুধু ঘরের একপাশে সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে প্রগতি, ঘরের আনন্দ তাকে স্পর্শ করছে না। ডায়ালিসিস চলছে ওর, তিয়াসা এগিয়ে গিয়ে হাত রাখে ওর মাথায়। মুখ তুলে তাকায় প্রগতি, ক্লান্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট সেই দৃষ্টি। গানপাগল সেই মেয়েটার কানের কাছে গুনগুন করল তিয়াসা,

Raindrops on roses or whiskers on kittens

Bright Copper Kettles and warm woolen mittens

উঠে বসেছে প্রগতি, গলা মিনিয়েছে তিয়াসার সাথে

Brown paper packages tied up with strings

These are a few of my favorite things

সব কষ্ট যেন এক নিমেষে উধাও মেয়েটার। অপার্থিব খুশীর ছটায় ভরে উঠেছে তার মুখ। দুলে দুলে গাইছে প্রগতি, কি সুরেলা কণ্ঠস্বর! গান শুনে থ্যালাসেমিয়া major শাম্ব, HIV পজিটিভ অরিত্র চলে এসেছে এই দিকে। আজকাল এদের নিয়ে দিন কেটে যায় তিয়াসার। বাচ্চাগুলো হোম ছেড়ে বাড়ি ফিরতেই চায়না। আর তিয়াসা আরো স্বপ্ন দেখে , তার ‘Happy home’ আরো বড় হবে। তার অরিত্র, শাম্ব, প্রগতি, রুমানা সবাই একদিন সুস্থ হয়ে যাবে। অবসান হবে ওদের সব কষ্টের, সব বেদনার, আরো অনেকদিন বাঁচবে ওরা, সুস্থ হয়ে। জীবনের প্রতিটা দিন আনন্দে কাটবে ওদের, শঙ্কায় নয়, করুণার পাত্র হয়ে নয়।

[৮]

বাইরের বাগানে দাঁড়িয়েছিল তিয়াসা। আকাশ দেখছিল একমনে। এখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যে, ‘Happy home’ এখন ফাঁকা। আবার কাল সকালের অপেক্ষা। কাল আবার ‘Happy home’ ভরে উঠবে চেনা অচেনা মুখের কলকাকলিতে, প্রতিদিনের মত। আজ আকাশ দেখতে বড় ভাল লাগছিল তিয়াসার। প্রবল বর্ষণের পর মেঘমুক্ত আকাশ, ঝিরি ঝিরি হাওয়া দিচ্ছে, আর সেই হাওয়ায় দুলছে ‘শান্তিনীড়’ এর গায়ে লাগানো হলুদ সাইন বোর্ড টা। সবুজ রঙের গোটা গোটা অক্ষরে তাতে লেখা “Happy Home, dealing better with the inevitable”

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮