• বর্ণালী মুখোপাধ্যায়

গল্প - অনীকের কথা


বাবা কেন সেদিন ভগ্নাংশ টুকু বাদ দিয়েছিলো?না দিলে আজ হয়তো ঠিকমতো হতো সব কিছু। যেমনটা হয় পাঁচফোড়ন আর হলুদের গন্ধ লাগা অন্য দশটা বাঙালি সংসারে ।

অথবা ছাব্বিশের জায়গায় ,ছাব্বিশের -এক বলে দিলে কিছু তৈরিই হতো না।কোন ভ্রম। কোন লিপ্সা । এমনকি এই মায়া প্রপঞ্চের সংসার এবং এই আমিও! এখানে,একটেরে ঘুপচি ছাত ঘরে বসে আছি, আমি অনীক --কোলের উপর কালিপ্রসন্ন মহাভারত,বিপুল ভার নিয়ে উল্টে পড়ে রয়েছে এসব কিছুই ঘটমান হতো না। বুঝতে পারি, সবই পূর্ব নির্দেশিত ঘটনাবলী । ক্রমাগত কাটাকুটি হওয়া অবসাদের আকাশ ,ময়লা বিকেল এবং পুরোনো কলকাতায় এতো একা লাগে আজকাল। আমি মহাভারতে ডুবে যাই। আমি ছলনা খুঁজি। মহাকাব্য থেকে খুঁটে খুঁটে ছলনাদের বের করে আনি। আমার পোস্টগ্রাজুয়েশনের পরে এই হবে আমার গবেষণার বিষয়।

আরও অন্ধতা নেমে এলে বাড়ির সামনের রাস্তায় ট্রাইডেন্ট আলোগুলি জ্বলে ওঠে। মরা গঙ্গার কোল থেকে উন্মুখ হাওয়া উঠে এসে কলকাতাকে প্রেমে জড়ায়। ছাব্বিশ নম্বরের প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলে ওঠে গোধূলিকালীন আবছায়াতেই।

ছাব্বিশের -এক জুড়ে কালো রঙ খেলা করে বহুক্ষণ । ইচ্ছে করে না,তবু উঠি। ছাতঘরের আলো জ্বালিয়ে নিচে নেমে আসি। শ্যাওলা উঠোণের কোণে হাড় জিরজিরে বিড়ালটা লাথি খাওয়ার ভয়ে নিজেকে আরো গুটিয়ে নেয়। বাবা ফেরে নি এখনও। তার ঘর অন্ধকার থাকে। মায়ের ঘরে উঁকি দিলাম। ঘরঘর করে ফ্যান ঘুরছে। মা বসে আছে বিছানায়,একটি ছোট আলো, প্রদীপের ই হবে,ঠাকুরের তাকে,মা কালীর ফটোর সামনে দপদপিয়ে জ্বলছে। আমি কদাপি ঐ ফটোটার দিকে তাকাই না । যদিও ঐ ফটোর কল্যাণে সংসারের বাড়তি উপার্জন । মা বসে আছে নোংরা বেডকভারের উপর । তার চুলের দীর্ঘ জট গুলি এলিয়ে। তার চোখের সামনে মা কালী বিন্দুর মতো স্থির। আমার মা সাধিকা। আমার মায়ের শরীরে মঙ্গলবার করে দেবী আসেন আর স্বপ্নাদ্য মাদুলিটি দিয়ে যান। জবাফুলে বশীকরণ মণ্ত্র পড়া হয়,বনমালী নস্কর লেন সে দিন কলকাতার বুক থেকে উপড়ে উড়ে যায় অন্যএক ঐশ্বরিক গ্রহে। ধূপ ,ধুনো ,প্রদীপের তেল যে মাদকতা ছড়ায় আমি তাকে ছলনা বলেই জানি। কিন্তু চুপ করে থাকি।

এরকম কিছুই হতো না হয়তো যদি বাবা সেদিন সত্যি কথা বলতো।

অঙ্কের তুখোড় ছাত্র বাবা পাড়ার একটি বিয়ে বাড়িতে গিয়ে আমার মাকে দ্যাখে ও প্রেমে পড়ে। মফস্বলের মেয়ে রমা কুণ্ডু সবে বিএ ক্লাসে ঢুকেছে,পাস কোর্সে। সে স্টেনোগ্রাফিও শিখছিলো,কারণ আমার মায়ের পিতৃধন বলতে ছিল শুধু অপরূপ রূপ। বাবা মানে তমালবন্দ্যোপাধ্যায় রমাকে দেখে আক্ষরিক অর্থে বোধ শূণ্য হয় এবং প্রেম নিবেদনের সময়ে প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলা অদূরের ছাব্বিশ নম্বর বাড়িটি নিজের বলে দাবী করে বসে। মোহ তাকে এটুকুই মিছে কথা বলায়। গরীবের মেয়েটি,হিসেবি অবশ্যই, ভবিষ্যতের ঐ বিশাল বাড়িটিকে নিজের অশন ব্যসনের ভূমি ভেবে পুলকিত হয় খুব। গোপনীয়তার কারণে সেও আর কারোকে কিছু জানায় না,অতি হিসেবিরও ভুল হয়ে যায় কখনো বা।

জাতপাতের দোহাই দিয়ে তারা বড়দের কিচ্ছুটি না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলে একদিন। বাবার অফিসে গিয়ে বড় ও ছোটমামা বেজায় হামলা করে আর ছাব্বিশের পাশের গলিপথ দিয়ে ঢুকতে গিয়ে রমা কুণ্ডু টের পায় পদবীর সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নটাও বদলে যাচ্ছে তার!আদতে ছাব্বিশের -এক হলো দুকামরার ছোট্ট আউটহাউস,ছাব্বিশ নম্বরের পিছনের গলিপথ দিয়ে সেখানে ঢুকতে হয়। দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি জানলো ওপার বাঙলা থেকে পরিবারের বাঁধা পুরোহিত বংশকে নিয়ে এসেছিলেন ছাব্বিশের সান্যাল পরিবার। মেয়েটি জানলো তার থেকে দশ বছরের বড় প্রেমিক তাকে ঠকিয়েছে। গাঢ় অভিমানে সে কাঠের জানলা দিয়ে ছাব্বিশের দিকে তাকিয়ে বসেছিলো দীর্ঘ প্রহর।

বাবা ঐটুকুই মিথ্যে বলেছিল । আর কোন খাদ ছিল না তার ভালোবাসায়। সে কথা বলেছিল ঠাম্মি।

আদর করে মাকে কাছে টানতে গিয়ে ঠাম্মির আঙুল গুলো যেন বরফে হাত রাখলো। খুব ভয়ে ভয়ে বলেছিল -রমা,মা আমার,পোলাডারে মাফ কইরা দ্যাও। অরে ছাইড়্যো না।

বাবা দোষী মুখে দাঁড়িয়ে দূরে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মা বললো‘-মিথ্যে বলেছে ও।আর আমি কোথায় যাবো?সে উপায় নেই। আমার পেটে বাচ্চা। ওর। ’

ঠাম্মা মাথায় করাঘাত করে,চাকরি করা ছেলেকে চড় মারে এলোপাথারি এবং দুকামরার বাড়িটিতে হাঁসফাস করে। যারা বউ দেখতে এসেছিলো তারা প্রবল ঘৃণায় বাবাকে পুড়িয়ে দিয়ে ঘরে ফেরে। ছাব্বিশ নম্বরের বড়োমা কেবল বলে-‘যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আর কথা বাড়িও না। ’

কথা থেমে যায়। কথারা মনে মনে বেড়ে ওঠে। আমার জন্ম হয়। আর আশ্চর্য জনক ভাবে বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের বহুদিনের পুরোনো মা কালীর ছবিটি রমা কুণ্ডুর সঙ্গে কথোপোকথন শুরু করে।ধীরে ধীরে দেবী ছবি ছেড়ে এসে আমার মা এর শরীরে প্রবেশ করতে থাকে। তটস্থ বাবা মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মা কালীর নির্দেশে মা এর আঁচলে আগুন লাগে। বাবা বা ঠাম্মা আমাকে ঘিরে পালিয়ে বাঁচে। সেই সময় থেকে মা মঙ্গল বার করে মানবের ভবিষ্যৎ বাৎলাতে থাকে। ভক্তরা আসে,গভীর ভয়ে মাএর পায়ের কিছে নৈবেদ্য সাজায়।

মা আমার নাম রেখেছিলো অলীক। বাবা অনেক অনুরোধে সে নাম পাল্টিয়ে করলো অনীক।

একটি অনাকাঙ্খিত শৈশব এলো আমার। এক ক্রমশ উদাসীন মা এর কোল,শিরা ওঠা অসহায় দুটি বৃদ্ধ হাত এবং সঙ্কুচিত এক বাপের ভালোবাসায় কেমন এলোমেলো শিশুকাল।

মা শেখালো-‘তোর তো জন্মই মিথ্যের। তুই মিথ্যে থেকে বের হবি কি করে!’

ঠাম্মা সংগোপনে বলতে লাগলো আমার নিষ্ঠুর মাএর আখ্যানগুলি আর বাবা রাত হলেএকটুকরো ছাতে নিয়ে গিয়ে দেখালো তারাফুল ।

তখন ছাব্বিশ নম্বরে মেজকাকুর মেয়ে কুর্চি দিদিও বড় হচ্ছিল। কুর্চি ফুলের মতো শ্যামল ও ঝকঝকে। পড়াশোনায় একনম্বর। লরেটো স্কুলে যায় বাড়ির গাড়িতে। আমিও আমার নিজস্ব ধারায় মেধাবী । শহরের নামকরা সরকারী স্কুলে পড়ি,সেখানে টাকা লাগে না,মেধা লাগে। কুর্চি দি বাস রাস্তা অবধি গাড়িতে লিফ্ট দেয়। ঠাম্মা টিফিনে রুটি ভরে জলের বোতল গলায় ঝুলিয়ে আমাকে রেডি করে চুমু দেয় গালে। মা এসে উঠোনে দাঁড়ায়। মা ততোদিনে অন্যরকম করে তাকায়। তার শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটোয়,দীর্ঘ চুল থেকে তেলচিট গন্ধ ছাড়ে। মা ঘোলা গলায় বলে-‘অনি,মা কাল রাতে এসেছিলো। ছাব্বিশ নম্বরের মেয়ের সাথে কি এতো ভাব রে তোর? কুর্চির দিকে কুনজর দিবি তো নির্বংশ হবি। তোর লক্ষণ ভাল না। ’

আমি,দশ বছরের আমি,আমির খানের গল্প করা আমি আশ্চর্য হয়ে গর্ভধারিণীকে দেখতে থাকি।

বাবা ‘আর কতো দিন রমা-ওকে তো ছেড়ে দাও’--বলতেই মা বাবার দিকে দ্যাখে আর থরথরিয়ে কাঁপুনি শুরু হয়।

মঙ্গলবারের কাঁপুনি সোমবার শুরু হওয়াতে সদ্য কিশোরটির দিশেহারা লাগে,সে কঁকিয়ে উঠে ঠাম্মার আশ্রয় খোঁজে।

এ ভাবেই আমি অপর এক পৃথিবীর হদিশ পাই টিন এজ শুরু হওয়ার আগেই। সেখানে প্রবল ধূপ ধুনোর গন্ধ আচ্ছন্ন করে রাখে ড্যাম্প লাগা ঘর দোর আর চেতনা। সেখানে থাকলে কোন নারীকে তুমি সোজা সাপ্টা দেখতে পারবে না। তোমার বড় হওয়ার সন্ধিক্ষণে ,তোমার সদ্য গজানো গোঁফ ও দাড়ি তোমার অব্যক্ত যণ্ত্রনার রাত্রি,তোমার অনিচ্ছুক ক্ষরণ তোমাকে ক্রমাগত অপরাধী বানাবে। একা আর ঘরকুনোদের জন্য বরাদ্দ থাকবে একটি চিলঘর,স্বেচ্ছা নির্বাসন,প্রিয় বই কটি।

কম্পারেটিভ লিটেরেচর নিয়েআমি যাদবপুরে পড়া শুরু করলাম। বাবা, অঙ্ক নিয়ে পড়ি নি বলে এতটুকু অভিমান করলো না কারণ বাবা মাথা তুলতেই ভুলে গিয়েছে এ যাবৎ। ঠাম্মা মলমুত্রের বিছানায় ক্লিন্ন যাপন কাটিয়ে রোগ মুক্ত অনেকদিন। মরে বেঁচেছে। সেই ঘরে ইদানীং মা এর আসর বসে।দেবী মা আসনে জ্বলজ্বল করে। মা ভবিষ্যত বলে দেয়। আমাকেও বলে দিল। ‘-তোর বেশিদূর লেখাপড়া হবে না। তোর বাবা পয়সা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালে তাও কিছু করতি,ঐ পড়ে কি হবে?’

ছোটবেলার প্রবল ভয় ঐ নারীর প্রতি এখন কেমন তির্যক ভাবে ঘৃণায় ঢুকে যাচ্ছে। আমি বলি‘-তোমার মা কালী বললো বুঝি!’

জটা দুলিয়ে হাতের সামনে থেকে কোষাকুষি তুলে মা ছুঁড়ে মারে। ঝণঝণ শব্দ তোলে তাম্রপাত্র আর আমি উপর দিকে তাকিয়ে দেখি ছাব্বিশের বারান্দায় একটি অপরূপ মুখ। কুর্চি। সে এখন পিলানিতে কম্পুটারসাইন্স পড়তে গিয়েছে। একটা সেমেস্টার শেষে ছুটিতে ফিরেছে।অবাক হয়ে দেখছে এদিকে। আমি মা কালীর সাবধানবাণী ,আমার মাথা গোঁজা কৈশোর সব ভুলে হাঁ করে সেই শ্যামল মেয়েকে দেখতে লাগলাম।

মা চিৎকার করে বললো-‘নোলা ঝরছে,মেয়ে দেখেই,নোলা। বাপের ছেলে তো। ’

তখনই কুর্চি মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার হল্টার নেক টপের অনেকখানি অনাবৃত পিঠে সকালের আলো লুটিয়ে পড়লো। আমার মুগ্ধ চোখ দেখলো পিঠের ঠিক মাঝখানে একটি ট্যাটু আঁকা।

হয়তো সে কোন গ্রীকদেশীয় দেবী। সে রিয়া কি আফ্রেদিতি। সে ছলনা জানে না। সে অপাপ চোখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে। সে প্রবল যৌন গন্ধী,সে ঈর্ষাপরায়ণ,কিন্তু ছল জানে না।

এ সবই আমার মন গড়া। কারণ একতলা থেকে এক উঠোন দূরের দোতলার ঐ সিলুয়েট মেয়েকে স্পষ্ট দেখার কথা নয় আমার।

তবু আমি দেখলাম।

মা চিৎকার করতে লাগলো-‘পাপে ডুববি তুই। মরবি। মরবি। চামচিকে হবি আর জম্মে। ’

আমি অবজ্ঞার হাসি হাসলাম।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা ছাব্বিশের- এক এ অনিয়মিত । বাবা রান্না করে। না করলে কলা পাঁউরুটি । আজ সেটুকুও নয়। আমার খিদেও পেলো না। প্রবল তৃষ্ণার চোখ মেলে সমান্তরাল সেই ছাব্বিশ নম্বর বাড়িটি দেখতে লাগলাম।

আর একবার যদি কুর্চি দিকে দেখতে পাই। ওর খোলা পিঠের সেই উল্কি।

সে এসে দাঁড়ালো। আরও গাঢ়তর হলো গুমোট ঘর। কোন খুশবু নয়,কোন উতল হাওয়া নয়,তীব্র কামগন্ধী নারী তার পিঠের ঢাকনা সরিয়ে বললো-দ্যাখ,দেখবি বলেছিলি তবে-দ্যাখ এইবার--

আমি মূহ্যমান হয় দেখি সেই উন্মুক্ত পিঠ জুড়ে রিয়া নয়,এথেনা বা আফ্রেদিতি কই!!!সেখানেও সেই মা কালী। চার হাত,নরমুণ্ড মালা। কুর্চির সিল্কের মতো মেহগনি চুলে দেখি বট বৃক্ষের ঝুরির মতো অজস্র জটা ,সেই জটা ক্রমশ আমার গলা পেঁচিয়ে ধরেছে,কুর্চির চোখে অবিকল আমার মা এর চোখ বসানো যেন। সে বললো-‘অনীক,শেষ অবধি সেই পাপ করে বসলি তুই। বাঁচতে পারলি না!!রক্ত রক্ত---’

আমি ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইলাম,সে বললো-‘তুই চামচিকে হয়ে যাবি!!অভিশাপ । ঝুলে থাকবি ঐ কোণে। ফরফর করে উড়বি কিন্তু দেওয়ালে ধাক্কা খাবি রোজ।’

ঘামতে ঘামতে নিজের হাত দুটো- পা- অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ ,কুকর্মে ভিজে যাওয়া বিছানা কিছু আর খুঁজে পেলাম না তখন। দুটি পাতলা চামড়ার পাখনা,আর দীর্ঘ নখ অনুভব করলাম যেন।

বাবা অফিস থেকে ফেরার আগেই মা এর কথা ফলে গেল।

আমার চামচিকে যাপন শুরু হলো। ।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮