• শ্রাবস্তী সেন

একলা চলতে হয়


আজ ২রা অঘ্রাহায়ন, ইংরাজি তে ১৭ই নভেম্বর। এই দিনটা সায়নীর জীবনে যেন একটা সিনেমা দেখার দিন। সিনেমাই তো! তার জীবন সিনেমার চেয়ে কম কি? আজ এই বিয়াল্লিশ বছরে এসে যখন ও ফিরে তাকায় বিগত দিন গুলোর দিকে সেটা একটা পর্দায় ভেসে ওঠা সিনেমার মতই লাগে। যতই মেয়ে অর্ণার দিকে তাকিয়ে সে ভুলে থাকার চেষ্টা করুক না কেন, এই দিনটাতে অতীত যেন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ২রা অঘ্রাহায়ন তার বিবাহবার্ষিকী, উনিশ বছর আগে এই দিনেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল সায়নী ও অনিন্দ্য।

ছোট বেলা থেকেই যৌথ পরিবারে মানুষ সায়নী, বাড়িতে অনেক সদস্য। বাবা মার একমাত্র সন্তান হলেও যৌথ পরিবারের কড়া অনুশাসনে কোন আলাদা সুযোগ বা সুবিধা খুব একটা জোটে নি। বরং বাবা ছিলেন অত্যন্ত কড়া এবং ভীষণ ভাবে সেকেলে মানসিকতার লোক। বড় হতে হতে সে বুঝে গিয়েছিল বাবাকে ভক্তি বা ভয় করা গেলেও সেই ভাবে বন্ধুর মত পাওয়া বোধহয় তার ভাগ্যে নেই। এই ভাবেই আস্তে আস্তে বাবার সঙ্গে একটা দুরত্ব হয়ে গিয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। বরং সেই অভাব পুষিয়ে দিয়েছিলেন মা। মা ছিলেন একেবারে অন্য রকমের মানুষ, পারলে তুলোয় মুড়ে রেখে দিতেন সায়নীকে। সায়নীর কখন কি দরকার, কি পছন্দ, কখন খাবে, কখন শোবে, সব ব্যাপারে মায়ের ছিল নজর। সায়নীর গায়ে একটা আঁচড় লাগলে মনে হতো মা যেন সেই যন্ত্রণাটা ভোগ করছেন।

এই ভাবে আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠা। লেখাপড়ায় আহামরি কোনদিন সে ছিল না, বরং খারাপ ই ছিল। তবু লেখাপড়া, গান শেখা এই সব নিয়ে দিন গুলো কাটছিল বেশ। প্রথম আঘাতটা এল সায়নী তখন ক্লাশ এইটে। বাবার শরীর টা কদিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না। কি রকম একটা র‍্যাশ বেরিয়েছিল আর তার সঙ্গে জ্বর। পারিবারিক ডাক্তার ডঃ চৌধুরী দেখছিলেন, বাবাকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন। সেই দিনটা ছিল শনিবার, সকাল থেকে বাবা বেশ ভালো ছিলেন, জ্বরটা আর ছিল না। বেলার দিকে চান করতে গেলেন, তারপর কিছুক্ষন বাদে জেঠিমা শুনতে পেলেন, বাথরুম থেকে কেমন গোঙানির আওয়াজ আসছে। মা দৌড়ে গেয়ে দরজা ধাক্কা দিলেন, কোন সাড়া নেই, সারা বাড়িতে খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। হুলুস্থুল পড়ে গেল, শেষ পর্যন্ত স্কাই লাইটের কাঁচ সরিয়ে দেখা গেলে বাবা বাথরুমের মাটিতে পড়ে আছেন, কোন সাড়া নেই। দরজা খুলে কোনমতে ধরাধরি করে বাবাকে বিছানায় শোয়ানো হল, ডাক্তার এলেন, অনেকক্ষন ধরে অনেক চেষ্টা হল, কিন্তু বাবা আর জাগলেন না। ম্যাসিভ সেরিব্রাল অ্যাটাক শুধু যে বাবাকে চিরদিনের মত কেড়ে নিল তাই নয়, সায়নী আর মাকে দাঁড় করালো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

অবশ্য যৌথ পরিবারে সবাই পাশে ছিলেন। আরো ছিলেন কিছু শুভাকাঙ্খী আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধব। সবার চেষ্টায় আস্তে আস্তে ওঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেন। কিন্তু একটা চাকরীর খুব প্রয়োজন। বাবার চাকরীটা সায়নীর পেতে হলে তার আঠারো বছর বয়স হতে হয়, সেও বছর তিনেক দেরী। মাঝখানে ভরসা শুধু সরকারী পেনশন, সেও সামান্য কিছু টাকা। শুরু হল এক অন্য জীবন, এক চরম জীবন সংগ্রাম। বাবার সঙ্গে দুরত্ব থাকলেও বাবা ছিলেন মাথার ওপর ছাতা হয়ে, আর সেই ছাতাটা না থাকার অভাব সহজে পূর্ণ হবার নয়, আর হয়ও নি।

যা হোক তিনটে বছর কোনমতে কেটে গেল।মাধ্যমিক পাশ করে সায়নী তার বাবার অফিসে চাকরীতে জয়েন করল, কিন্তু সমস্যা শুরু হল এবারে মাকে নিয়ে। মা কিছুতেই সায়নী কে একা ছাড়বেন না! প্রথম এক সপ্তাহ তো জোর করে অফিসে গিয়ে সারা দিন বসে রইলেন। সেই নিয়ে অফিসে নানান আলোচনা! অফিসে কেউ কেউ তো আপত্তি ও করলেন! শেষ পর্যন্ত অনেকে অনেক বুঝিয়ে সায়নীর সাথে ওনার অফিসে যাওয়া টা বন্ধ হল। কিন্তু সকালে অফিসে পৌঁছে দেওয়া আবার বিকেলে ছুটি হলে অফিস থেকে আনতে যাওয়া শুরু হল। সেও এক বিড়ম্বনার ব্যাপার আর এদিকে সায়নী সবার চোখে এক হাসির পাত্র হয়ে উঠল। শেষে ঝগড়াঝাটি, রাগারাগি, মান অভিমানের পর ঠিক হল মা অফিস পর্যন্ত যাবেন না। সকাল, সন্ধ্যে মেট্রো স্টেশন পৌঁছে দেওয়া আর নিয়ে আসা অবধি ব্যাপার টা সীমাবদ্ধ থাকবে। আজ সায়নী মাঝে মাঝে অর্ণার দিকে দেখে আর ভাবে সে কোন দিন তার মায়ের মতো হয়ে উঠতে পারলো না।সেই কত ছোট থেকে স্কুল, টিউশন সবকিছু অর্ণা একা একা করে, অফিস সামলে সায়নীর পক্ষে আর নিজের মায়ের মতো হয়ে ওঠা হল না।

চাকরীর পাশাপাশি সায়নী প্রাইভেটে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গ্র্যাজুয়েশনে ভর্তি হল। কিন্তু অফিস সামলে বাড়ি এসে পড়াশোনা করা টা খুবই ক্লান্তিকর। আর ঠিক এই সময় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অনিন্দ্যর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ আসে। বাবা না থাকায় বিয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে জ্যাঠা, কাকা দের হাতে। বাড়ি থেকে কথাবার্তা এগোয়, পাত্রপক্ষ থেকে দেখাদেখি সব কিছু হয়, বিয়েও ঠিক হয়ে যায়। অনিন্দ্য দের মানিকতলায় বাড়ি, বাবা মা আর ছোট ভাই কে নিয়ে সংসার, নিজেদের বাড়ির এক তলায় অনিন্দ্যর রেডিমেড গারমেন্টেসের দোকান। এক মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রি হয়ে গেল, আর তার পর থেকে মাঝে মাঝেই এক বৌদির মাধ্যমে অনিন্দ্যর সাথে কথা হত। দু এক বার তো দেখা ও হয়ে হল। ঠিক যেন বাঁধ ভাঙ্গা স্বপ্ন এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আর তার স্রোতে বিয়েটাও হয়ে গেল।

হৈ হৈ করে বেশ দিন গুলো কাটছিল। হনিমুন করতে ওরা গেল দীঘা। দীঘা পৌঁছনোর পরদিন অনিন্দ্য হঠাৎ ওকে বলে তার শরীর ভালো লাগছে না, ওদের কলকাতা ফিরে যেতে হবে। কিন্তু বারে বারে জিজ্ঞাসা করা স্বত্তেও কি হয়েছে সে উত্তর সায়নী পায় নি। কিছুতেই বলে না ‘কি হয়েছে’? সুতরাং পরদিন কলকাতা ফিরতে হল। সারা রাস্তা অনিন্দ্য কেমন চুপচাপ, মুখে কোন কথা নেই। বার বার জিজ্ঞাসা করা স্বত্তেও সায়নী কোন উত্তর পেল না। এবারে বাড়ি ফিরে তার আরো অবাক হবার পালা। অনিন্দ্যর বাবা, ভাই অনিন্দ্য কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। কি অসুখ বা ডাক্তার কি বললেন সে বিষয়ে কিছুই জানতে পারল না সায়নী। যাকেই জিজ্ঞাসা করে হে হয় এড়িয়ে যায় নয়তো এটা ওটা বলে। কয়েকদিন এভাবে চলার পর আবার অনিন্দ্য আগের জীবনে ফিরে এল। সব কিছুই আগের মতো চলতে শুরু করল, কিন্তু খটকা একটা থেকেই গেল।

বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই অনিন্দ্য কেমন যেন সন্তানের জন্য অস্থির হয়ে উঠল। সায়নীর ইচ্ছে ছিল এখনই নয়, দু তিন বছর পরে, কিন্তু অনিন্দ্য কোন যুক্তিই শুনতে বা বুঝতে চাইল না। প্রথমটায় আপত্তি করলেও অনিন্দ্যর জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতে হল। আর বিয়ের বছর ঘোরার আগেই গর্ভধারন করল অর্ণাকে। আর অনিন্দ্য ও খুব খুশী, সায়নী কে যেন চোখে হারাতে থাকে। যতক্ষণ সে বাড়িতে থাকত সায়নী কি খাবে, কি করবে এই ছিল যেন অনিন্দ্যর ধ্যানজ্ঞান। একেক সময়ে তো সায়নী নিজেই বিরক্ত হত অনিন্দ্যর এই অতিরিক্ত খেয়ালে।

তখন ছয় সাত মাস হবে, সায়নী তখন গর্ভবতী, হঠাৎ করে আবার অনিন্দ্যর মধ্যে কি রকম পরিবর্তন দেখা গেল। সারাক্ষন কেমন যেন অদ্ভুত রকমের চুপচাপ, কিছু জিজ্ঞেস করলে কোন উত্তর দেয়না, এমনকি দোকানেও যায় না। সায়নী বারে বারে চেষ্টা করে কিন্তু কোন উত্তর পায় না, তার চেয়েও বড় ব্যাপার সে অবাক হয়ে যায় শ্বশুরবাড়ির লোক জনের ব্যবহারে। সবাই যেন সব দেখেও দেখছে না, আর শ্বশুরমশাই আর দেওর যেন সব সময়ে কি যেন শলা পরামর্শ করে চলেছেন, কিন্তু কিছুই তাকে বলছেন না। দুটো দিন এভাবে কাটল, তৃতীয় দিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সায়নী দেখল বাড়িতে তুলকামাল অবস্থা। অনিন্দ্য কেমন যেন ক্ষেপে উঠেছে, চিৎকার করছে আর কেউ সামনে এলে তাকে মারতে আসছে। সায়নী হতবাক। শ্বাশুড়ি মা তাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেম নিজের ঘরে আর অনিন্দ্যর কাছে যেতে বারন করলেন। কিছুক্ষন এই ভাবে চলার পর একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল, কিছু লোক এসে জোর করে অনিন্দ্য কে নিয়ে চলে গেল। সায়নী আর পারে নি, সব ধৈর্যের বাঁধ গেল, সোজাসুজি শ্বশুর মশাই য়ের মুখোমুখি জয়ে জানতে চাইল, “অনিন্দ্যর কি হয়েছে? কি লুকোচ্ছেন আপনারা আমার কাছে?”

যা উত্তর পেল তাতে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল সায়নীর। অনিন্দ্য নাকি স্রিজোফেনিক! এই রোগ নাকি জিন বাহিত, অনিন্দ্য তার মায়ের কাছ থেকে সে রোগ পেয়েছে। সারা জীবন তাকে ওষুধ খেতে হয় আর মাঝে মাঝে অসুস্থতা বেশী বেড়ে গেল তাকে ‘অ্যাসাইল্যামে’ নিয়ে যেতে হয়। এর আগেও নাকি দু বার এই রকম হয়েছিল আর তখন ও তাকে ‘অ্যাসাইল্যামে’ রাখতে হয়েছিল।

সায়নীর জীবন টা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। কি করবে? কাকে বলবে? কার কাছে যাবে? আর এর মধ্যে সে মা হতে চলেছে। যে বংশ ধারায় অনিন্দ্য এই রোগ তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে, আজ সে সেই অনিন্দ্যর সন্তানের মা হতে চলেছে। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে সে ভয়ে শিউরে ওঠে। না এই কথা গুলো তো মাকে সে বলতে পারবে না। আর যেহেতু মাকে জানাতে পারবে না, অন্য আর কাউকে সে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে না। মা যদি ঘুণাক্ষরে এই সব জানতে পারেন মা হয়তো আর বাঁচবেন না। সেদিন প্রথম নিজেকে প্রতারিত লাগল তার। সত্যিই প্রতারিত ই সে। এতো বড় একটা রোগ কেমন সবাই মিলে লুকিয়ে গেছে তার কাছ থেকে, এমন কি অনিন্দ্য? যাকে সারা জীবন চলার স্বপ্ন দেখেছিল সে কেমন করে পারল তার কাছ থেকে সব কিছু লুকিয়ে রাখতে? আর জ্যাঠা?কাকা? কোন খোঁজ খবর না নিয়ে তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল। এ যেন কেমন কোন রকমে ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলা। আজকের দিনে এ জিনিস কেমন করে সম্ভব হল? সারারাত ছটফট করে কেটে গেল, আর পরদিন সকালেই সে ছুটল গাইনোকোলজিস্টের কাছে। সব কথা খুলে বলল তাঁকে, তবে তিনি ও খুব একটা ভরসা দিতে পারলেন না। আর সেই থেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে চলা শুরু সায়নীর।

সায়নীর বারে বারে ইচ্ছে হচ্ছিল মাকে গিয়ে সব কিছু বলে। তাতে হয়তো সে খানিক টা ভারমুক্ত হতে পারত। কিন্তু মায়ের দুশ্চিন্তা বাড়াতে ইচ্ছে করে না। আর এই দোলাচলের মধ্যে অর্ণা কোলে এলো। আর এই ছোট্ট একরত্তি মেয়েটা যেন সায়নীর জীবনে এক আশার বার্তা নিয়ে এলো। না এবারে আর কোনমতেই আর সে নিজেকে দমিয়ে রাখবে না, কোন বাধা আর সে মানবে না, সব কিছু ভুলে নিজের সব কিছু দিয়ে এই মেয়েটাকে মানুষ করতেই হবে। আর একবার নতুন করে জীবন শুরু হল। অফিস করে বাড়ি ফিরে অর্ণাকে নিয়ে কোথা দিয়ে যেন সময় কেটে যায় বোঝা যায়না। একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে থাকে অর্ণা। কিন্তু অনিন্দ্যর অসুখের প্রকোপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আজকাল তো খুব কড়া ডোজের ওষুধ খেতে হয় তাকে। মাঝে মাঝে সে রোগ যখন বেড়ে যায় তখন সে ভীষণ হিংস্র হয়ে ওঠে আর তাতে অর্ণা খুব ভয় পেয়ে যায়। আর এই ভয় যেন অর্ণাকে সরিয়ে রাখে অনিন্দ্যর কাছ থেকে। বাবার কাছে সে যেতেই চায় না, বরং দূরে দূরেই থাকতে চায়।

কিন্তু অন্য একটা সমস্যা এবারে এসে পড়ে। অনিন্দ্য যত অসুস্থ হয়ে পড়ে বাড়িতে প্রতাপ বাড়তে শুরু করে তার ভাই অনিতের। বাড়িশুদ্ধু সবার ওপর সে সারাক্ষন ছড়ি ঘোরাতে থাকে অনিত। বেশ কয়েক বার তো সায়নীর প্রতি অশালীন ইঙ্গিত করে। সায়নী অনিন্দ্যকে জানালে প্রথমে সে বিশ্বাস করে না, পরে উলটে সায়নী কে বলে ব্যাপার টাকে পাত্তা না দিতে। কিন্তু ক্রমে সে বাড়াবাড়ি এক প্রকার তান্ডবের পর্যায়ে পৌঁছয়। একদিন তো কথা কাটাকাটির মাঝে সায়নীর হাত ধরে টানে অনিত। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় সায়নীর, প্রচন্ড রেগে চেঁচিয়ে ওঠে সে। আর তার ফল হয় আরো ভয়ানক। বাধা পেয়ে ক্রুদ্ধ অনিত সায়নী কে মারতে শুরু করে। চিৎকার করে কাদতে শুরু করে অর্ণা। নীরব দর্শক হয়ে পুরো দৃশ্যটা অনিন্দ্য উপভোগ করতে থাকে তার বাবা মায়ের সাথে। সায়নী জ্ঞান হারায়, যখন জ্ঞান আসে তখন দেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে আর আশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে অর্ণা। চোখের জলের দাগ শুকিয়ে গেছে অর্ণার গালে।

সারা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেই উঠে বসে সায়নী। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি, প্রচন্ড তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে। কোন মতে উঠে বসে জল খায়। মেয়েটার খাওয়া হয়ে গেছে কিনা সেও জানা নেই। আর দেরী নয়। সেই রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে ফেলে, নিজের আর অর্ণার জামাকাপড় নিয়ে তাকে পরদিন বাড়ি ছাড়তে হবে। সকালে মাকে ফোন করে জানায়। মেয়েকে নিয়ে যখন সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসছে অনিন্দ্য এসে দাঁড়ায়। নতুন করে আর অবাক হয়নি সায়নী। অনিন্দ্যর এক ভাবলেশহীন রুপ, এমনকি অনিত যে সায়নীর গায়ে হাত তুলেছে সে ব্যাপারে সে কোন কথা বলে না, বরং বলে সায়নী নাকি তিল কে তাল করছে। সায়নী আর কথা বাড়ায় নি। কোন মতে একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা মায়ের কাছে। আর কিছু লোকাতে পারে নি। সব কিছু সে মাকে বলে ফেলে। মা মুখে কিছু বলেন নি, তবে মুখের ভাব দেখে এটা সায়নী বেশ বুঝতে পারে জীবনে এতো বড় ধাক্কা মা কোনদিন পাননি।

পরদিন অফিসের কলিগ রঞ্জনা, মৈত্রেয়ীদি আর অপর্ণাকে ফোন করে সায়নী সব কথা বলে। ওদেরই বুদ্ধিতে ওদের সাথে করে সায়নী যায় থানায়। অনিতের নামে থানায় একটা ‘বধূ নির্যাতনের’ ডায়েরি করে সেখান থেকে সবাই আসে অনিন্দ্যের বাড়ি তে। অনেক কিছু রয়ে গেছে এখনো সে বাড়িতে। বিয়েতে পাওয়া সব গয়না, সায়নীর সমস্ত সঞ্চয়ের কাগজ পত্র, ব্যাঙ্কের চেক বুক, পাসবুক, আরো কিছু। অর্ণা ও তার নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এগুলো তার প্রয়োজন। অনিন্দ্যর বাড়িতে এসে সে সোজা চলে আসে তার নিজের ঘরে। কিন্তু বিস্ময়ের তো এখনো অনেক বাকী! আলমারি খালি, এক রাতের মধ্যে ওরা সব কিছু সরিয়ে ফেলেছে। অনিন্দ্যকে প্রশ্ন করলে জবাব আসে, ‘থানা, পুলিশ, কোর্ট, কাছারি করে যা পারো জোগাড় করে নাও’। ইতিমধ্যে থানা থেকে এসে অনিত কে গ্রেফতার করে। শ্বশুর মশাই কে তাকে এক রকম শাসালেন, সায়নী যেভাবে অনিত কে অ্যারেস্ট করিয়েছে তার ফল কিন্তু তাকে ভোগ করতে হবে। আর অনিত কে তাঁরা ঠিক বের করিয়ে আনবেন। আর অর্ণার অধিকার কিন্তু ওরা ছাড়বেন না। সায়নীকে জব্দ করে তবেই ছাড়বেন।

ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সায়নী বাড়ি ফিরে আসে। এই দুদিনে অনেক ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে। এই কদিন যেন একধাপে তার বয়স কয়েক বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রধান চিন্তা অর্ণাকে মানুষ করে তোলা। পাঁচ বছরের এই অবোধ শিশু এখনো কিছুই জানেনা। এই বয়সী আর পাঁচ টা বাচ্ছার থেকে অর্ণা অনেক চুপচাপ। প্রথমে ওকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করা দরকার। একটু একটু করে এতোদিনের জমিয়ে তোলা ক্ষুদ্র পুঁজির কথা তার খুব মনে হয়। যে করেই হোক তাকে সেই গুলো ওদের হাত থেকে তাকে উদ্ধার করতেই হবে। সামনে তার অনেক কাজ। সায়নীর নিজের অবাক লাগে, করেক বছর যে শান্ত, ভীরু সায়নীকে সবাই চিনতো সে কি করে আজ বদলে গেল। এটাই বোধহয় জীবনের পাঠ, কেমন করে তাকে পুরো পালটে দিল। আর অবশ্যই মায়ের মন, যা তাকে বারেবারে সাবধান করেছে মেয়ের সুস্থ জীবনের জন্য ঐ পরিবেশ থেকে বেড়িয়ে আসা দরকার। নিজের শারীরিক, মানসিক সব কষ্ট ভুলে এগিয়ে চলেছে অজানা রাস্তায়, লড়ছে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। আর লড়তে তাকে হবেই, সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মেয়েটাকে বাঁচার মতো করে বাঁচতে শেখাতে হবে।

ইতিমধ্যে ছমাস কেটে গেল। প্রথম প্রথম অনিন্দ্য দু এক বার এসেছিল মেয়ের জন্য অনেক জিনিসপত্র নিয়ে, সায়নী কে ফিরে যাবার কথাও বলেছিল। কিন্তু সায়নী সাফ জানিয়ে দেয় সে বাড়িতে তার পক্ষে আর কখনো ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। অনিন্দ্য যদি ঐ বাড়ি থেকে ছেড়ে অন্য কোথাও আলাদা ভাবে সংসার করতে রাজী থাকে সায়নী রাজি, অনিন্দ্যের সঙ্গে থাকবে, নয়তো নয়। আর সায়নীর ও এটা ভালো করে জানা ছিল অনিন্দ্যর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। নিজের অসুস্থতা এই মানুষটাকে বানিয়ে দিয়েছিল অন্যের ওপর বড় বেশী করে নির্ভরশীল। মানিকতলার সে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে আসার কথা সে ভাবতে পারে না। সুতরাং অনিন্দ্যের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেই হল। অর্ণাকে আর অফিস নিয়ে কোনভাবে দিন গুলো কাটছিল। কিন্তু একটা ভয় সমানেই তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, তার জীবনের এই ঝড়, ঝঞ্ঝা মা হয়তো সহ্য করতে পারবেন না। আর সেটা হল অল্প কয়েক দিনের মধ্যে। হঠাৎ করে মা এক দিন জ্ঞান হারালেন, জ্ঞান ফেরানোর সব প্রচেষ্টা বিফল হলে স্থানীয় একটা নার্সিং হোমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বাবার মত মার ও সেরিব্রাল অ্যাটাক। মায়ের জ্ঞান আর ফেরেনি, তিনদিনের মাথায় মায়ের মৃত্যু হয়।

মায়ের মৃত্যু আবার একটা বড় ধাক্কা। কিন্তু সায়নীর তো শোক করার সময় নেই। তার মুখ চেয়ে রয়েছে অর্ণা, সে ছাড়া তার কেউ নেই। তাই চোখের জল চোখেই শুকিয়ে যায়, সায়নী আবার উঠে দাঁড়ায়। আর এবারে আরো শক্ত লড়াই, সে লড়াই তাকে একাই করতে হবে, এবারে পাশে আর কেউ নেই। আর ঠিক এই সময়ে অনিন্দ্যের বাড়ির লোকেরা ওর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। শুরু হয় ফোনে হুমকি দেওয়া, বারবার অর্ণাকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নেবার চাপ। কি করবে সায়নী ভেবে উঠতে পারেনা, কেমন যেন নিজেকে দিশেহারা লাগে। একে মার এই ভাবে চলে যাওয়া, তার ওপর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসার জন্য নিকট আত্মীয়দের তাকে এড়িয়ে চলা, সব মিলিয়ে একা সামলানো সায়নীর পক্ষে খুব কঠিন হয়ে পড়ে। একদিন আর সামলাতে না পেরে মৈত্রেয়ীদির কাছে ভেঙে পড়ে, আর ঠিক সময়ে মৈত্রেয়ীদির কাছ থেকে ঠিক পরামর্শ টাও আসে – “সায়নীর এক্ষুনি বিবাহ বিচ্ছেদ করা উচিৎ”।

মৈত্রেয়ীদির বাবা, দাদা, ভাই সবাই এই আইনের প্রফেসনে রয়েছেন। সায়নী কে নিয়ে যান বাড়িতে, মৈত্রেয়ীদির ভাই মৃন্ময় সায়নীর কেসটা হাতে নেন আর দু দিনের মধ্যে অনিন্দ্যকে বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ পাঠান। এবারে শুরু হয় আইনি লড়াই। সায়নী জানতো এতো সহজে অনিন্দ্যর বাড়ির লোকজন তাকে রেহাই দেবে না। আর হলোও তাই। কোর্টে দাঁড়িয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু হল। নানান মিথ্যে অভিযোগ আনা হল সায়নীর নামে। দাঁতে দাঁত চাপ সে লড়াই চালিয়েছে সারাক্ষন, তবে পাশে পেয়েছে মৈত্রেয়ীদির পুরো পরিবারকে, যারা সবাই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি কোর্ট কেসের দিনে অর্ণাকে মৈত্রেয়ীদির বাড়িতে রাখার ব্যবস্থাও হয়ে যায়। তাতে অবশ্য লাভ হয়েছে অর্ণার। মৈত্রেয়ীদির বাড়ির সকলের সাথে খুব সুন্দর সে মিশে গেছে। হয়তো জীবনে এই প্রথমবার একটা সুস্থ পরিবারকে সে দেখছে, তাই এতো সহজে সব কিছু কে আপন করে নিতে পেরেছে।

দেড় বছর ধরে চলল আইনি লড়াই। অর্ণার কাস্টডির জন্য ওরা অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সব চেষ্টায় জল ঢেলে দেয় অর্ণা নিজেই। কোর্টে জজসাহেব অর্ণার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন, আর সে মায়ের সঙ্গে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করে। কদিনের মধ্যে কোর্টের অর্ডার বেরোয়, সায়নীর পক্ষে রায় বেরোয়। ক্রমাগত লড়াই করে করে সত্যি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সায়নী। কিন্তু ছেড়ে তো দিলে হবে না, আর এ লড়াই তো একদিনের নয়। অর্ণার জন্য তাকে এই জীবনের সংগ্রাম তো চালিয়ে যেতেই হবে।

কিছু দিন আগের কথা, একদিন সন্ধ্যায় মৃন্ময় আসে সায়নীর কাছে। এই দেড় বছরে মৃন্ময়ের সাথে তার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল, অনেক কঠিন মুহূর্তে সায়নী যখন আশা হারিয়ে ফেলত, মৃন্ময় তাকে অনেক ভরসা জুগিয়েছে। আর মৃন্ময় ছাড়া সে এই কেস টা কোনদিন জিততে পারত না। তাই মৃন্ময়ের প্রতি সায়নীর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অর্ণার সাথে ও এই কদিনে মৃন্ময় খুব মিশে গেছে। আর সেই মৃন্ময় আজ এসেছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে। পুরো জীবন টা সায়নী আর অর্ণার পাশে থাকতে চায়। বাড়ির কারুর কোন আপত্তি নেই। বরং ওরা সবাই চাইছেন সায়নী আর অর্ণাকে নিজেদের পরিবারের একজন করে নিতে।

কি করবে সায়নী? এগিয়ে যাবে? মেনে নেবে মৃন্ময়ের প্রস্তাব? আবার নতুন করে সব শুরু করবে? পাশের ঘর থেকে মৃন্ময় আর অর্ণার গলার আওয়াজ। গল্পে মশগুল হয়ে রয়েছে ওরা। কিন্তু আর নয়। এবারে মন শক্ত করে এগিয়ে যায় সায়নী। মৃন্ময় কে জানায়, সে সত্যি এই বন্ধুত্ব কে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে, কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়ে সেই বন্ধুকে সে হারাতে পারবে না। কিন্তু আর নতুন করে কোন সম্পর্কে সে আর জড়াতে চায়না। যে জায়গা টা সে স্বেছায় ছেড়ে এসেছে সেখানে আর ফিরে যেতে সে চায় না। অর্ণাকে নিয়ে সারা জীবনের লড়াই টা শুধু তার, সেখানে যদি পাশে মৃন্ময়ের মতো শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ থাকেন সেটা খুব ভাগ্যের কথা। কিন্তু কেউ না থাকলে সায়নী জানে –

“একলা চলতে হয়”

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮