• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে

‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে হিম হয়ে আসে’

হিম নদীটির শ্বাসে, ধূসর অঘ্রাণের কুয়াশা ভরা সকালে, আপনাদের জন্য নিয়ে এলাম নীড়বাসনার ফসলের ডালি। দেখতে দেখতে নীড়-বাসনা দুই অঘ্রাণ পেরিয়ে পৌঁছল ষষ্ঠ সংখ্যায়। ধন্যবাদ জানাই নীড়-বাসনার সমস্ত শুভানুধ্যায়ী বন্ধু, লেখক এবং পাঠকদের, যাদের হাত ধরে আমরা পেরিয়ে এলাম এতটা পথ । আপনাদের ভালবাসা এবং আশীর্বাদ আমাদের সাথে থাকলে আমরা একসাথে আরও অনেক দূর পাড়ি দেয়ার আশা রাখি। আপনারা সবাই ভালো থাকুন এবং আমাদের সঙ্গে থাকুন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় মন ভালো নেই। খবরের কাগজ, দূরদর্শন, ইন্টারনেট খুললেই খুন-জখম-ধর্ষণ-দাঙ্গা-মারামারির খবর। মন খারাপ করে যখন শুনি, জাতি, বর্ণ এবং ধর্ম বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে মানুষ একে অন্যকে হত্যা করছে, এবং তাতে ইন্ধন দিছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। মন খারাপ করে যখন শুনি যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে শিশুরাও। মনে হয় ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে যৌন হেনস্তার বেশির ভাগ ঘটনাই খবরে আসে না বা পুলিশের কাছে নথিভুক্ত করা হয় না। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে যৌন হেনস্থার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং যে ঘটনা গুলি খবরে আসছে তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক ঘটনার কথা আমরা জানতে পারছি না। তাই আমাদের প্রথমে এটা স্বীকার করে নিতে হবে যে এগুলি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা সামাজিক প্রবণতা। আমাদের এই সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে সামাজিক এবং রাজনৈতিক উভয় স্তরেই । এই সমস্যার মোকাবিলা করতে আমাদের প্রয়োজন - ১)সমস্যাটিকে সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্তরে স্বীকার করে তা নিয়ে আলোচনা করা । ২)সমস্যাটি নিয়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রতিকার করতে সমাজকে এবং আইন ব্যবস্থাকে দায়বদ্ধ করা ।

সামাজিক স্তরে আমাদের প্রয়োজন যৌন নির্যাতন মুক্ত ভারতের জন্য দেশব্যাপী সংগঠিত ও ব্যাপক প্রচারকার্য। আর রাজনৈতিক স্তরে আমাদের প্রয়োজন যৌন নির্যাতন প্রতিকারের নিতি এবং আইন প্রণয়ন।

আসুন আমরা সকলে অঙ্গীকার বদ্ধ হই - 'চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি— নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।'

শ্রাবণ (আগস্ট) সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আমরা, আমাদের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার বাঁচিয়ে রাখার জন্য, সংঘবদ্ধ ভাবে সবরকম মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ার ডাক দিয়েছিলাম এবং শিল্পী, লেখক, মুক্ত চিন্তক এবং যুক্তিবাদী মানুষের উপর আক্রমণের প্রতিবাদ করেছিলাম । অত্যন্ত দুখের সাথে জানাচ্ছি, আমাদের শ্রাবণ সংখ্যা প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে আমরা হারালাম আর এক মুক্ত চিন্তক গৌরী লঙ্কেশকে। আমরা এই হত্যার তীব্র নিন্দা করছি এবং সবরকম মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই জারি রাখার অঙ্গীকার করছি।

বাংলা সাহিত্যে রহস্যের প্রয়োগ কি কমে আসছে? নাকি আমরা রহস্য রোমাঞ্চ গল্প পড়া কমিয়ে দিচ্ছি? আমাদের ছোটবেলার সেই দিনগুলো যেদিন থেকে গল্পের বই পড়ার অভ্যাস শুরু সেদিন থেকেই তো রহস্য গল্প পড়া শুরু। তাই, একবার সেসব দিনের স্মরণে আমাদের এবারের থিম রহস্য আর গোয়েন্দা গল্প। রহস্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার । রহস্য রোমাঞ্চ গল্প তার ঘটনার আকস্মিকতায় পাঠকের মধ্যে, উত্তেজনা এবং উদ্বেগের এক উচ্চতর অনুভূতি প্রদান করে। গোয়েন্দা গল্পের গোয়েন্দারা যখন একের পর এক রহস্যের মোকাবিলা করেন তখন অনেক সময়ই পাঠক সক্রিয়ভাবে তার ‘মগজাস্ত্রে’র প্রয়োগে চেষ্টা করেন গল্প শেষের আগেই রহস্য সমাধান করার। আর পাঠকের এই সক্রিয় মস্তিষ্ক সঞ্চালন পাঠককে দেয় এক অনাবিল আনন্দ।

সাহিত্যের আঙ্গিনায় অনেকেই রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্যকে কুলীন ধ্রুপদী সাহিত্যের সাথে এক পাতে বসাতে চান না। অথচ বাংলার ধ্রুপদী সাহিত্যের বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক রহস্য রোমাঞ্চ গল্প লিখেছেন। এবিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডিটেকটিভ’ বা ‘গুপ্তধন’ গল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গুপ্তধন গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে পাঠক মেতে ওঠে গুপ্তধনের সঙ্কেত উদ্ধারে, তার সম্বল একটি ধাঁধাঁ - ‘পায়ে ধরে সাধা। রা নাহি দেয় রাধা॥ শেষে দিল রা, পাগল ছাড়ো পা’ ।

বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্পের শুরু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। তার আগে বটতলার কিছু বইয়ে অপরাধকাহিনী স্থান পেয়েছিল। কিন্তু সেগুলিতে রহস্যভেদের ব্যাপার এবং সাহিত্য মূল্য তেমন ছিল না । বাংলা গোয়েন্দা গল্পের সূচনা হিসেবে যে বইএর কথা গবেষকরা উল্লেখ করছেন - সেটি হল প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের 'দারোগার দপ্তর'। 'দারোগার দপ্তর' প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে একশো বছরেরও বেশী আগে, ১৮৯২ সালে। তবে গবেষকদের মতে গোয়েন্দা গল্পের ধারাটি সৃষ্টি করেন পাঁচকড়ি দে (নীল বসনা সুন্দরী, মায়াবী)। তারপর বহু সাহিত্যিক সাহিত্যের এই শাখায় অবদান রেখেছেন যেমন স্বপন কুমার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল কর, নিহাররঞ্জন গুপ্ত, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার , ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় এবং আরও অনেকে। এদের সৃষ্ট চরিত্ররা বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের আঙিনায় নূতন এবং শক্তিশালী গোয়েন্দা চরিত্রের আবির্ভাব হঠাৎ করে কমে এসেছে। আশা করব এ এক সাময়িক স্থিতি এবং আমরা বাংলা সাহিত্যে নূতন করে আবার ভালো রহস্য রোমাঞ্চ গোয়েন্দা গল্প পাবো।

নীড় বাসনার ষষ্ঠ সংখ্যায় পড়ুন বেশ কিছু নতুন আঙ্গিকের লেখা। কেমন লাগলো, অবশ্যই জানাবেন।

আপনাদের সকলকে ইংরাজি নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানাই। সঙ্গে থাকবেন, ভালো থাকবেন।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮