• দেবাশিস ভট্টাচার্য

কল্পবিজ্ঞান বিভাগ - (গল্প) - বিপাসনা

বিপাসনা




আজকাল প্রায়ই অপিস থেকে বেরুতে দেরি হয় নিয়নের। সে একটা আন্তর্জাতিক সফটওয়ার কোম্পানির ম্যানেজার, তাদের কোম্পানির বেশির ভাগ ক্লায়েন্টই বিদেশী। তাদের সময় আর আমাদের সময় এক নয়। নিয়ন যাদবপুরে থাকে। সল্ট লেক সেক্টর ফাইভ থেকে পরমা সেতু পেরিয়ে বাই পাস ধরে যেতে মাঝরাতে খুব একটা বেশীক্ষণ লাগে না। ড্রাইভ করতে ভালই লাগে তার। তবে ভিড়ের রাস্তা বা অলি গলিতে নয়।


নিয়নের মা নিয়নের দাদার কাছে বর্ধমানে থাকেন। দাদা তাদের ঠাকুরদার তৈরি রাসায়নিকের ব্যবসাপত্র দেখে। বেশ জমে যাওয়া ব্যবসা। বর্ধমানে তাদের চার পুরুষের বাস। বড় বাড়ি চাকর বাকর দোকান পাট হাঁক ডাক। মা দাদা বৌদি আর তাদের দুটি কিশোর কিশোরী ছেলে মেয়েকে নিয়ে নিজের ঠাকুর দেবতা নিয়ে ভালই আছেন। নিয়ন বাপের বেশি নেওটা ছিল, মায়ের সঙ্গে বরাবরই কিছুটা দূরত্ব ছিল তার। হয়তো ছোট থেকে দার্জিলিঙের হস্টেলে থাকাও তার একটি কারণ।


দাদাও নিয়নকে খুব একটা পছন্দ করে না। কোনও বিশেষ কারণ নেই। তবে বাবার ভালবাসার জন্য একটা সূক্ষ্ম ঈর্ষা থাকলেও থাকতে পারে। সংসার খুবই জটিল জায়গা। সম্পর্ক তার চেয়েও জটিলতর। তাই বোধহয় বৌদি অনেক বেশি আপন তার কাছে। বৌদি আর ভাইপো না থাকলে হয়তো সে দেশে যাওয়াই বন্ধ করে দিত।


বর্ষার এক রাতে অপিস থেকে বেরিয়ে নিয়ন দেখল টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। একটু দৌড়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দরজা খুলে ড্রাইভারের আসনে বসল, স্টার্ট দিয়ে সেকেন্ড গিয়ারে নিয়ে বেরিয়ে এল গেট দিয়ে। পথ ঘাট ভিজে এবং ফাঁকা। পরমা সেতুতে না উঠে নিচে দিয়ে সায়েন্স সিটি পেরিয়ে চলল। রুবি আসার বেশ খানিকটা আগে সে দেখল একজন পুলিস সার্জেন্ট বাইকে চেপে আসছে সামনে থেকে ডান হাত তুলে তাকে দাঁড়াতে বলছে। গাড়ি বাঁদিক করে লাগিয়ে নামল নিয়ন। সে খুব সাধারণ গতিতে যাচ্ছিল। এই মধ্যরাতে কেন পুলিশ দাঁড়াতে বলছে সে বুঝতে পারছে না।


পুলিস সার্জেন্টটি প্রায় ছ ফুট লম্বা, থিয়েটারের সৈনিকের মত চেহারা, গায়ে শাদা উর্দি, চোখে বিশাল কালো চশমা, নিয়ন একটু আশ্চর্য হয়ে দেখল মাঝরাতে কাউকে রোদ চশমা পরতে দেখে নি সে। এরকম চোখ ঝলসানো শাদা উর্দিও আগে দেখেনি সে।



নিয়নের নীল আই টেন গাড়িটি পরদিন পুলিশ আবিষ্কার করে দক্ষিণের বাই পাসে লক করা অবস্থায়, কম্পিউটার দেখে নিয়নের বাড়ি অপিস ফোনে যোগাযোগের চেষ্টাও করে। নিয়ন কাল রাত থেকে নিখোঁজ। সেই রাতে ও বাড়ি ফেরে নি। দাদা খবর পেয়ে কলকাতা চলে আসে, থানা হাসপাতাল মর্গ বিমান বন্দর কোথাও কোনও হদিশ পাওয়া গেল না। এক বছর কাটল, দূর দর্শন ও প্রিন্ট মিডিয়া অনেক চেঁচামেচি করল সফটওয়ার কর্মীর রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে, কিন্তু রহস্য যেখানকার সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কাল রাতে কোনও পুলিশের রেকর্ডে তার কথা লেখা নেই।


এই ঘটনার বছর খানেক পর একদিন ক্যালিফোর্নিয়ার এক মহাকাশ পর্যবেক্ষক কেন্দ্রে মাঝরাতে কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ও দৈত্যাকার দূরবীনে চোখ লাগিয়ে তরুণ মহাকাশ বিজ্ঞানী নীল নয়ন মার্ক হারিসন এক বিস্ময়কর আবিষ্কার করল। মার্ক তরুণ অ্যাস্ট্রোনোমার তার জন্ম কর্ম আমেরিকায় কোনও বাঙ্গালি বন্ধু নেই বাংলা সম্বন্ধে তার কোনও ধারনাই নেই। দূরবীনে চোখ রেখে হঠাৎ সে পরিষ্কার শুনতে পেল কেউ তাকে যেন একটা অজানা ভাষায় কিছু বলছে। কান খাড়া করে সে বোঝার চেষ্টা করল, তারপর সে বুঝতে পারল কেউ তাকে বলছে, আমি কলকাতার নিয়ন আমি কলকাতার নিয়ন। আমি বাংলায় বলছি।


এক মিনিট পর মার্ক আর কিছু শুনতে পেল না। তাদের ভয়েস রেকর্ডারে কিছু ধরা পড়ে নি। তবে কি এসব তার কল্পনা? কাজের বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফল? মার্কের স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ে ভেঙ্গে পড়ার জোগাড় হয়েছে। সেইসব সমস্যা থেকেই কি ?


ইন্টারনেট থেকে মার্ক জানতে পারল এক বছর আগে নিয়ন হাজরা নামে এক ভারতীয় কলকাতা শহরে নিখোঁজ হয়ে যায়। তার সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে কোনও অসুবিধেই হোল না। মার্ক প্রতি রাতের ডিউটিতে কান পেতে থাকে যদি আর কোনও বার্তা পাওয়া যায়। অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে হঠাৎ করে আবার নিয়নের ডাক শোনা যায়। মার্ক কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? সেই কণ্ঠ তাকে বলে তার সঙ্গে কথা আছে, সে যেন অপেক্ষা করে।




আরও ছমাস পরের ঘটনা। মার্ক শুয়ে আছে ফিলাডেলফিয়ার এক ক্লিনিকে। চিকিৎসক ডাক্তার ক্লিনটন তাকে বলছেন, মার্ক আমাদের যতরকম পরীক্ষা সম্ভব সব করেছি, তোমার কোনরকম শারীরিক সমস্যা নেই বন্ধু। সাইকিয়াট্রিয়াস্ট বলছেন, তুমি মানসিকভাবে একশো ভাগ সুস্থ। এই বিচিত্র ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা দিতে আমরা অক্ষম। দুঃখিত মার্ক।


মার্ক উঠে বসে বলল ডক্টর ক্লিনটন, আমি কৃতজ্ঞ কিন্তু আমি যতক্ষণ এই রহস্য ভেদ করতে পাচ্ছি শান্তি পাচ্ছি না।


মার্ক প্রায়ই বাংলায় কথাবার্তা শোনে, তার মাথার মধ্যে, এবং অন্য ভাষা হওয়া সত্ত্বেও মানে বুঝতে পারে। নিয়ন নামক তারই সমবয়সী কোনও বাঙ্গালি যুবক তাকে অদ্ভুত সব কথা বলে। যার সারাংশ করলে এরকম দাঁড়ায়, নিয়ন অজানা এক গ্রহ থেকে তার সঙ্গে কথা বলছে। সেই গ্রহের অধিবাসীরা সভ্যতায় পৃথিবীর তুলনায় কয়েক আলোক বর্ষ এগিয়ে। কিন্তু তাদের সমস্যা হল তাদের লোকসংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে পঞ্চাশ ষাটে এসে পৌঁছেছে। নতুন জন্ম হচ্ছে না। পৃথিবী থেকে কিছু বাছাই করা মানুষ, স্ত্রী পুরুষ, কুড়ি থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসের, তারা নিজেদের গ্রহে এনে বসতি করাতে চায়। নিয়নকে এভাবেই আনা হয়েছে। এখন মার্ক তাদের নিশানা। তাদের প্রযুক্তি এত অগ্রসর যে যে কোনও ভাষায় কথা বললে যে শুনছে সে পরিষ্কার বুঝতে পারবে, ভাষা জানা না থাকলেও।


মার্কের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে, ও এখন একা, বিজ্ঞানী, তরুণ, স্বাস্থ্যবান, এরকম লোকই ওদের দরকার।




নিয়ন তার হ্যান্ডলারের সঙ্গে ( এরা ইংরেজি বা বাংলাই ব্যবহার করে তার সঙ্গে) মিটিং করছিল। এদের গ্রহটা ঠিক কিরকম ও জানে না। কেননা এরা তাকে যেটা বাস্তব হিশেবে দেখায় তা হল থ্রি ডি সিনেমার মত। আমরা যেটা পর্দায় বা বিশেষ চশমা পরে দেখি সেরকম নকল রাস্তা বাড়ি কাফে রেস্তোরাঁ ঝর্না সবকিছু এরা অসম্ভব তাড়াতাড়ি বানায় ও ভেঙ্গে ফেলে। সে যেহেতু পৃথিবী থেকে আসছে তার সঙ্গে এরা পৃথিবীর আদলে সবকিছু করে।


তার বাসা থেকে একটা উড়ন্ত বাইকে একটি রোবট তাকে এনে এখানে পৌঁছে দিয়েছে। ব্রেকফাস্টে তাকে লুচি আর আলুর ছেঁচকি দিয়েছিল সঙ্গে দার্জিলিং চা। সে এসবে এখন আর আশ্চর্য হয় না। সে জানে এরা যা খাওয়াচ্ছে তা কোনও কালে লুচি নয় কিন্তু তার ইন্দ্রিয় লুচি বলেই গ্রহণ করতে বাধ্য।


নিয়নকে পৃথিবী থেকে নিয়ে এসেছিল ভিনগ্রহের কোনও জীব নয় একটি শিক্ষিত রোবট। পুলিশ সার্জেন্ট সেজে অথচ তাকে দেখাচ্ছিল কিছুটা অন্যরকম। সে ঠিক পুলিশের চালানের মত একটা কাগজ এগিয়ে দিয়েছিল তার দিকে তাতে লেখা ছিল নিয়ন আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী বিশেষ কারণে আমার সঙ্গে আসুন প্লিস ভয় নেই ।


নিয়ন তাকিয়ে দেখেছিল সার্জেন্টটির মুখ ঢেকে রয়েছে বিশাল কালো চশমা, থুতনিতে একটা লাল বিন্দুর মত আলো জ্বলছে নিভছে, নিয়ন কিছু বোঝার আগেই তাকে একটা ঠোঙ্গার মত তুলে নিয়ে বাইকে বসিয়ে দিয়েছিল লোকটি তারপর নিজে তার পিছনে বসে হঠাতি ঝড়ের বেগে বিমানের মত উড়ে গিয়েছিল আকাশে। নিয়নের মন একটা অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, বিস্মৃতির অন্ধকার।


হ্যান্ডলার ছাড়া আর কোনও জীবন্ত প্রাণী চোখে পড়ে নি তার এখানে। এরা একা একা থাকে, কাজ করে। পার্টি করে না। বাড়িগুলো সবচেয়ে অদ্ভুত। বাইরে থেকে দেখলে ঠিক গুহা বলে মনে হবে। হ্যান্ডলারের বাড়ি ঢুকে তার মনে হয়েছিল এটা একটা কম্পিউটারের পর্দা। পৃথিবীর ধারনা থেকে বহু যোজন দূর। কিন্তু তার জন্য যে গুহাটি এরা দিয়েছে সেখানে সুইমিং পুল আছে জানলা খুললে সে দূরে একটা সেতু দেখতে পায় অনেকটা আমাদের হুগলী ব্রিজের মত মাথার উপরে দিনের বেলা সুরয় রাতে চাঁদও দেখতে পায়। কিন্তু এখন নিয়ন বুঝতে পারে এসবই ফাঁকি, কৃত্রিম বস্তু।


হ্যান্ডলার একটা জালের পর্দার ওপারে বসে কথা বলে। তাকে দেখতে যে কোনও আরেকজন বুড়ো মানুষের মত। কথা শ্লেষ্মাজড়িত নিচু গলা, উচ্চারণ স্বাভাবিক, বাংলাতেই কথাবার্তা হয়। নিয়ন জানে হ্যান্ডলার প্রকৃতপক্ষে একদম অন্যরকম দেখতে। নিয়ন প্রতিদিন কিছুক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলে, তাদের হয়ে কিছু সফটওয়ার বানায়। যদিও ও জানে এগুলো ওকে ব্যস্ত রাখার জন্য। একদিন মিটিং ঘরে ঢুকে ও হঠাৎ কম্পিউটার পর্দায় একটা ছবি দেখে ফেলেছিল, স্ক্রিন অন্ধকার হতে একটু দেরি হয়েছিল তাই ও দেখে ফেলে যা ওর দেখার নয়, আমাদের ফেসবুক বা লিঙ্কডিন প্রোফাইলের ছবির মত হ্যান্ডলারের একটা মুখ, কয়েক সেকেন্ড মাত্র সেটা ছিল, তার মধ্যে যা দেখার দেখা হয়ে গেছে।


নিয়ন দেখেছিল একটা মানুষের আদলে মুখ কিন্তু চামড়া ভীষণ পুরু ভীষণ কোঁচকানো একেক জায়গায় একেকরকম রঙের ছোপ, নির্লোম মাথায় একটা বা দুটো তামার তারের মত চুল বা লোম সবচেয়ে বীভৎস চোখ দুটো ওরকম চেরা রেখার মত কিন্তু ছুরির মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও কোনও মানুষের কখনো দেখে নি। মুখটা দেখলে হঠাৎ করে গা ঘিন ঘিন করে, ভয়ও হয়।


হ্যান্ডলার বলল, নিয়ন তোমাকে আমাদের ভাল লাগছে আশা করি তোমাকেও আমরা খুশি করতে পারব


নি - ধন্যবাদ


হ্যা - পিকনিক ঠিক ছিল তো?


নি - হ্যাঁ আপনি যে এত ব্যস্ততার মধ্যে আমার খেয়াল রাখেন এতে আমি কৃতজ্ঞ


হ্যা- তুমি আমাদের ভবিষ্যৎ আমরা তো অতীত


নি - তবে পিকনিকে আপনাকে ও আরও কিছু বন্ধুকে পেলে ভাল লাগত


হ্যা - দুঃখিত নিয়ন, আমি ফুরসৎ পাই না একদম, তবে তোমায় তো কিছু বন্ধু পাঠিয়েছিলাম, মেয়েগুলির ফিগার চমৎকার কি তাই না?


নি - সার কিন্তু তারা একজনও সত্যিকারের নয়, সব ভারচুয়ালাইসড আর্টিফিশিয়ালি সিমুলেটেড প্রজেকশন।


হ্যা - তোমরা পৃথিবীর লোকেরা বড় বেশি ইমোশনাল তোমরা এখনো ভীষণ প্রিমিটিভ


নি - হয়তো তাই, যাহোক, আজ কি বলবেন বলেছিলেন?

হ্যা - মার্ক কি বলছে? ওকে আরেকটা কারণে চাইছি, আমাদের অ্যাসট্রোফিসিক্স সেন্টারটার কিছু করা দরকার


নি - ওটা এখন কারা দেখে?


হ্যা - আমারই এক বন্ধু দেখছিল কিন্তু সে কাল রাতে মারা গেছে


নি - বলেন কি? কি করে?


হ্যা - গত পাঁচ বছর ব্লাড রিসাইক্লিং করে চলছিল কাল প্রসেসিঙের সময় সিস্টেম ফেইলিওর হল।


নি - আপনার বন্ধু মানে অনেকদিনের পরিচয়?


হ্যা - অন্তত দুশো বছর ওর সঙ্গে আমি অনেক সাইন্টিফিক প্রজেক্ট করেছি


নি - তাহলে তো আপনার মন বেশ খারাপ আজ ?


হ্যা - আমার দুঃখ হচ্ছে ও আমাদের স্পেস প্রজেক্ট শেষ না করেই মরে গেল খুব দায়িত্বহীন কাজ


নি - মানে? মারা যাওয়া তো কারও হাতে নেই


হ্যা - ( হেসে ) ওঃ আমার মনে ছিল না তোমরা পৃথিবীর মানুষ এখনো মারা যাও হঠাৎ করে আমরা প্ল্যান করি, যখন ভীষণ পুরনো আর ঝরঝরে হয়ে যাই তখন দিন খন ঠিক করতে হয় বিদায়ের জন্য। নাহলে বিস্তর ক্ষতি হয় আমার বন্ধুর ক্ষেত্রে যেমন হল।


নি - আপনাদের শিশুদের দেখতে খুব ইচ্ছে করে, পোষা প্রাণীদেরও


হ্যা - শিশু নেই বলেই তো তোমাদের আনা, পোষা প্রাণী কি করবে রোবটই সব কাজ করে দেয়


নি - আমাদের শিশু গাছপালা কুকুর বেড়াল খেলা ধুলা এসব লাগে নাহলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়


হ্যা কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল, তারপর হঠাৎ অট্টহাস্য করে উঠল, যেন নিয়ন ভীষণ একটা মজার কোনও কথা বলেছে।





একটি সাক্ষাৎকার


মার্ক - নিয়ন তুমি আমায় ঠিক কি জানাতে চাও?


নিয়ন - যে আমরা তোমায় নিয়ে আসব।


মার্ক - আমার কোনও পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে কি?


নিয়ন - দুঃখিত বন্ধু, না।


মা - তাহলে এত দেরি করছ কেন?


নি - তোমায় সুস্থ করে আনতে হবে তো


মা - মানে? আমি আবার অসুস্থ হলুম কবে?


নি - তোমার কণ্ঠনালীতে কর্কট রোগ শুরু হতে চলেছে


মা - হতেই পারে না, ছ মাস আগে আমার সবরকম পরীক্ষা হয়েছে, আমার কোনও রোগ নেই


নি - আচ্ছা তোমায় বুঝিয়ে দিচ্ছি তুমি এখন যে চেয়ারে বসে আছ সেটাকে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে বস


মা - আচ্ছা বসলাম


নি - তোমার সামনে যে বাদাম গাছটি আছে তার যে কোনও এক জায়গায় দৃষ্টি লাগিয়ে মনটাকে ফাঁকা করে দাও


মা - ( পাঁচ ছ মিনিট পর) হুম


নি - কি দেখছ মার্ক?


মা - দেখছি না, ভীষণ কাশি আসছে, গলা বুজে গেছে, ভীষণ দুর্বল, এসব কি হচ্ছে বন্ধু?


নি - ভয় পেও না, এসব ফিউচারিস্টিক থ্রি ডি ভারচুয়ালাইজেশন, আজ থেকে কয়েক মাস পর যা হতে চলেছে তাই অনুভব করছ তুমি। খুবই প্রাথমিক শিশুসুলভ বিজ্ঞান।


মা - আমি সহ্য করতে পারছি না, দয়া করে আমায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দাও


নি - আচ্ছা তুমি ঘুমিয়ে পড় পাঁচ মিনিট পরে উঠো


মা - ( মাথা সামনে ঝুঁকে পড়ছে, চোখ বুজে আসছে )


পাঁচ মিনিট পর


নি - মার্ক ঘুম ভেঙ্গেছে?


মা - হ্যাঁ


নি - এখন সুস্থ লাগছে?


মা - লাগছে তবে মাথাটা দুর্বল লাগছে


নি - ও ঠিক হয়ে যাবে আচ্ছা তোমায় আমাদের একটা পার্কের দৃশ্য দেখাই কেমন?


মা - দেখাও


নি - চোখ বন্ধ করে দশ গোন তারপর চোখ খোল মার্ক


মা - ( দশ গুনে চোখ খুলে ) এ কি স্বর্গ না কল্পনা? এত সুন্দর কোনও জায়গা হতে পারে?


নি - না, তবে এটা আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের বানানো।


মা - ওখানে জন্ম মৃত্যু কিরকম নিয়ন?


নি - এদের সেক্স ড্রাইভ নষ্ট হয়ে গেছে মার্ক। তাই আর বাচ্চা হয় না। এরা শুধু বিজ্ঞান আর কারিগরি নিয়ে থাকে। মৃত্যু অবশ্য হয় তবে অনেক দেরি করে। কেননা এরা জীবনকে আমাদের পৃথিবীর তুলনায় অন্তত তিন থেকে চারগুণ বড় করে নিতে সক্ষম হয়েছে।


মা - এদের মেয়েরা কিরকম?


নি - সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া ঠিক না অন্তত এখুনি


মা - বুঝতেই পারছ এত বড় পরিবর্তন তাই জানতে চাই


নি - এরা উভলিঙ্গ। ইচ্ছা মতন স্ত্রী বা পুরুষ হয়, মানে দুটোই থাকে এদের মধ্যে, স্ত্রী পুরুষ মিলনের দরকার হয় না একটা শরীরের মধ্যেই রাসায়নিক জৈব পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রাণের জন্ম হয়।


মা - আমাদের কি হবে?


নি - ঐ রকমই হবে বন্ধু। স্ত্রী হোক বা পুরুষ, পৃথিবী থেকে যারাই এখানে আসে তারাই এদের জৈব প্রযুক্তির ফলে উভলিঙ্গ হয়ে যায়। এতে সমস্যা জটিলতা দুটোই অনেক কম। বিশ্বাস কর। প্রেম ভালবাসার ঝঞ্ঝাট নেই হা হা হা ।


মা - নতুন শিশুদের বড় করবে কে?


নি - তার জন্য রোবট আছে। এখন এই গ্রহে পঞ্চান্ন জন গ্রহের জীব জনা দশেক পৃথিবীর মানুষ আর কয়েকশো রোবট। তারা শ্রমিক, সেবক, কর্মচারী যা বল।


মা - এদের নদী বা পাহাড় নেই? চাঁদ দেখা যায় না? কৈশোর নেই? অবৈধ প্রেম নেই?


নি - বাব্বা, মার্ক তুমি দেখছি আমার চাইতেও বেশি বাঙ্গালি। হ্যাঁ বন্ধু সব আছে, কিন্তু এসবই কৃত্রিম উদ্যানের মত, ইচ্ছামত তৈরি বা ভাঙ্গা যায়, সবই রবোটিক, সবই আর্টিফিশিয়ালি ভারচুয়ালাইসড। যেমন ফেনার বুদবুদ ঠিক তেমনি।


মা - এরা ক্যান্সার সারাতে পারে বুঝি?


নি - ক্যান্সার কেন এমন কোনও রোগ নেই যা সারাতে পারে না, তাই এরা সহজে মরতে চায় না, আমাদের হিসেবে তিন থেকে চারশো বছর অনায়াসে বেঁচে থাকে।


মা - সত্যি করে বল তো নিয়ন তুমি এদের কাছে ভাল আছ?


নি - এই ভাল মন্দের আইডিয়াগুলো পৃথিবীর মার্ক, এখানে এগুলো অচল এখানে কেউ খারাপ থাকে না শুধু একটার পর একটা মাইলস্টোন অতিক্রম করে যেতে হয় এগিয়ে যেতে হয়। কেউ বেশি দূর যায় কেউ কম। কম এগুলে তাকে জৈব ও রাসায়নিক প্রযুক্তিতে পরিবর্তিত করা হয় ঠিক কোনও যন্ত্রের মত।



মার্ক শেষবারের মত তার প্রিয় বারটিতে গিয়ে প্রিয়তম কোনায় গিয়ে বসল। নিগ্রো ছেলেটি এসে তার প্রিয় পানীয় দিয়ে গেল। ও জানে মার্কের কি পছন্দ। মার্ক জানে তাকে যা করার খুব শিগগিরি করতে হবে। একটি মিনিস্কার্ট পরা সোনালি চুলের মিষ্টি মেয়ে কাউন্টারে একটা বিয়ার নিয়ে বসে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তার সঙ্গিনী আছে বা থাকতে পারে কিনা মাপার চেষ্টা করছে। মার্কের মনে পড়ল তাদের শৈশব ভার্জিনিয়ার বরফ জমা রাস্তা ছেলেবেলার আইসক্রিম সোডা তাদের পাড়ার শাদা কালো মারকুটে বালকের দল, রাগবি, প্রিয় অংকের খাতা।


এমন সময় মাথার মধ্যে একটা কণ্ঠ স্বর শোনা গেল, হাই মার্ক কি যা তা ভাবছ


অসহ্য, এরা কি ওর ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকতে দেবে না?


নি - মার্ক তুমি জানো না তুমি কত ভাগ্যবান


মা - ভাগ্যিস জানি না


নি - ঐ মেয়েটার চেয়ে হাজার গুণে রূপসী আমরা তোমায় দিতে পারি


মা - ঐ মেয়েটা রূপসী কে বলল


নি - ওকে দেখে তোমার চিত্ত চঞ্চল হয়েছে মার্ক


মা - কাজের কথা বল কবে নিয়ে যাচ্ছ ?


নি - যদি বলি আজই, এখুনি?


মার্ক মাথাকে চিন্তাশূন্য করে দিল। বহুদিন বিপাসনা ধ্যান করা অভ্যাস তার, আজ সে কিছুতেই এদের ঢুকতে দেবে না তার মস্তিষ্কে


নি - মার্ক কি হল হঠাৎ, তোমার কানেকশন পাচ্ছি না কেন বন্ধু? খারাপ হওয়া টিভির মত ঝাপসা স্ক্রিন, ছবি আসছে যাচ্ছে


মার্ক উঠে দাঁড়িয়ে অদূরের টেবিলে বড় নিগ্রো দলটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যারা বসে পান করছে তারা প্রত্যেকে একেকটি দৈত্য বিশেষ। মার্ক তাদের সামনে গিয়ে মাতালের মত গলা করে বলল হু হ্যাভ অ্যালাউড দিস ব্ল্যাক সন্স অফ বিচেস হিয়ার?


এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর একটা ঝড় উঠল। টেবিল চেয়ার পানীয়ের বোতল গেলাস উড়ে গেল সেই ঝড়ে, যতক্ষণ জ্ঞান ছিল মার্ক তার মনকে রেখে দিয়েছিল দূরে কোনও অজানা সমুদ্রতীরের বালুবেলায়। জ্ঞান হতে দেখে সে শুয়ে আছে একটি হাসপাতালে। সোনালি চুলের মেয়েটি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। সে হেসে বলল, আমি ডাক্তার, চোখ বুজে শুয়ে থাকো, ভয় নেই


মার্ক বলল, আমি এখনো বেঁচে আছি?


মেয়েটি বলল, আশ্চর্যের বিষয় বেঁচে আছ


একটু হেসে বলল, সবথেকে বলশালী গুন্ডাটার তিনটে পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে বেঁচে আছ


মার্কের মুখের উপর ঝুঁকে নিচু গলায় বলল, সত্যি বল তো ওরকম করলে কেন? আমি জানি তুমি মাতাল হও নি।


মার্ক বলল, তোমায় বলতে পারব না সব, দুঃখিত, আমি কিছু একটা ভেঙ্গে বেরুতে চাইছিলাম, চলে যেতে চাইছিলাম


মেয়েটা বলল, আমি জানতাম তুমি খুব একা


মার্ক কিছু বলল না, তার মৃত্যুর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হয়েছিল একথা তো মেয়েটি বুঝবে না


মার্ক ভাবল, যাওয়া হল না, সেই আবার ফিরে আসতে হল


এমন সময় ফোন বাজার মত মাথার মধ্যে নিয়ন বলে উঠল ওকে কানেকশন পেয়েছি


মার্ক সমস্ত মনঃশক্তি জড় করে, যেমন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে শিখেছিল একটা প্রকাণ্ড হাতুড়ির মত বানিয়ে বাইরের আক্রমণের দিকে ছুঁড়ে মারল, ভিতরে ভিতরে বলতে লাগল, ফিরে যাও ফিরে যাও ফিরে যাও


সোনালি চুলের মেয়েটি ওর হাত ধরে আছে, বোধহয় নাড়ি দেখছে, মার্কের মনে হল ওর চারদিকে আরেকটা ব্যাপক ঝড় উঠছে, ধুলোর ঝড়, সেই ঝড়ে পৃথিবীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে, দিকে দিকে কান্না হাহাকার উঠছে, মার্ক চোখ খুলেও কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, শুধু ঝড় থিতিয়ে একটা গভীর নৈঃশব্দ্য নামছে ওর ভিতরে, ও অনেকদিন আগে দেখা ভিক্ষুর প্রশান্ত গম্ভীর সস্নেহ মুখশ্রীর দিকে চেয়ে আছে, সেই মুখ জলের মধ্যে ছায়ার মত ঢেউয়ের সঙ্গে কাঁপছে স্থির হচ্ছে গভীর অনুকম্পা সেই মুখে মার্কের শরীর মৃগীরোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে একদম স্থির হয়ে গেল।


মার্ক জ্ঞান হারাল। নিয়ন বা ভিন গ্রহের এজেন্টরা অজ্ঞান অবস্থাতেও তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু একটি অদ্ভুত রশ্মি যা বর্ণহীন ও যার স্বরূপ তারা জানে না পরিমাপ করতে পারছে না মার্কের ঘরটিকে আগুনের মত ঘিরে রেখেছে। সবচেয়ে সফিস্টিকেটেড প্রযুক্তিও এই অদ্ভুত রশ্মির কাছে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।


দুদিন দুরাত গভীর নিদ্রার পর জ্ঞান হতে কফি পান করতে চাইল মার্ক। সে খুঁজছে সেই মেয়েটিকে। কোথায় গেল সে? চলে গেল নাকি? একটু পরে কফি আর ডোনাট নিয়ে ফিরে এল সে। মার্ক বলল, আমি কিন্তু অসুস্থ, টার্মিনাল রোগের বীজ আমার ভিতরে বাসা বেঁধেছে।


মেয়েটি হেসে বলল, কফি খাও।


মার্ক জিগ্যেস করল তোমার নাম কি?


মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, বিপাসনা।


মার্ক নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর ভাব দেখে মেয়েটি বলল, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? আমার বাবা বিজ্ঞানী ছিলেন, জাপানে গিয়ে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধ হয়ে যান। তুমি বিপাসনা মানে জান?


মার্ক হেসে বলল, শব্দটা শুনেছি। একধরনের ধ্যান তাই না?












নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮