• পার্থ সেন

কল্পবিজ্ঞান বিভাগ - (গল্প) - রোহিণী

বাক্যহীন প্রাণীলোক-মাঝে

এই জীব শুধু

ভালো মন্দ সব ভেদ করি

দেখেছে সম্পূর্ণ মানুষেরে ;

দেখেছে আনন্দে যারে প্রাণ দেওয়া যায়

যারে ঢেলে দেওয়া যায় অহেতুক প্রেম,

অসীম চৈতন্যলোকে

পথ দেখাইয়া দেয় যাহার চেতনা।



বারেলি থেকে দুধওয়া পৌঁছতে আমার সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমার হোটেলটা পালিয়াকালান বলে একটা জায়গায়। অপূর্ব সুন্দর সেই যাওয়ার রাস্তা, হিমালয়ের তরাইয়ের সৌন্দর্য অন্য রকম, যারা এসেছেন তাঁরা জানেন, সে সৌন্দর্য বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। দুদিকে গহন অরন্য, পেছনে অনন্ত হিমালয়ের হাতছানি। আমি এক সাধারন ব্যাঙ্কের কর্মচারী আমার কি আর সাধ্য আছে সেই অসাধারণ দৃশ্য বর্ণনা করার? হিমালয়ের কোলে দুধওয়া এক অনন্য সুন্দর ন্যাশানাল পার্ক। আমার ফরেস্ট খুব ভালো লাগে, আমি আগেও এখানে এসেছি তবে ঠিক এবারের মতো নয়। বছর তিনেক আগে করবেট থেকে ফেরার সময় কয়েক ঘন্টা এখানে কাটিয়ে গেছিলাম। পাইন, শাল, টিক আর মহুয়ার ভর্তি এই অরন্য, মহুয়া মানেই ভাল্লুক আর সঙ্গে বাইসন, নীলগাই, লেপার্ড, হায়না, প্রায় একশোর বেশি প্রজাতির পাখি, নানা প্রজাতির হরিণে অধ্যুষিত এই অরন্য, জলে অসংখ্য কুমির আবার পাইথন সাপ এখানে। কয়েকদিন আগে বইয়ে পড়লাম কাজিরাঙ্গা থেকে বেশ গন্ডারকেও নাকি এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। পিলভিট, শুকলাফাটা আর দুধওয়া এই তিন জায়গা নিয়ে এতো বড় অরন্য সারা ভারতে খুব একটা বেশী নেই। আবার অন্য দিকে বর্ষার সময় এই অরন্য অন্য এক রুপ নেয়। একে গহন অরন্য, হিংস্র, বন্য পশু, পাখী অধ্যুষিত, আবার হিমালয়ের পাদদেশে প্রকৃতির তান্ডব, তার পর বর্ষার সময় সারদা নদী উত্তাল হয়ে ওঠে, এক এক জায়গায় কূল ছাপিয়ে যায়। তাছাড়া শুনেছি জঙ্গলের মধ্যে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে ফরেস্টের কর্মীরাও যান না। যা হোক ঘুরতে আমি আসিনি, তাই জঙ্গল বা পাহাড়ের বর্ণনা বেশী করব না। আসল কথায় আসা যাক, হোটেলে ঢোকার সময় অবশ্য মিথ্যে কথা বলতেই হল, কিন্তু সত্যি টা তো আমাকে বলতেই হবে। প্রথম খেকেই বলি বরং।


ছয় মাস মাত্র আগের ঘটনা, সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলাম বারো নম্বর সেক্টরে একটা কাজ ছিল। সাধারনত আমি সেন্ট্রাল পার্ক মানে আমরা যেটাকে চিত্তরঞ্জন পার্ক বলি, সেই রাস্তা দিয়ে আসি না, কিন্তু কাল কি খেয়াল হল পার্কের রাস্তা ধরলাম। আসলে পার্কের পাশের দোকানে এই সময়ে গরম জিলিপি ভাজে। আমার তেতাল্লিশ বছর বয়স বা ২২০ সুগারের চোখরাঙ্গানীকে উপেক্ষা করে সকালের আকাশে জিলিপির সেই পাগল করে দেওয়া গন্ধ এমন হাতছানি দেয় যে আমি ‘না’ করতে পারিনা। গাড়ি রাস্তার বাঁ দিকে পার্ক করে নেমেছি একটু এগিয়েছি বাঁ দিক থেকে কেমন যেন একটা গোঙানির শব্দ শুনলাম। প্রথমটায় বুঝি নি, ভালো করে তাকিয়ে দেখি একটা ফলের ঝুড়ি আর তার মধ্যে একটা কাপড় চাপা দিয়ে রাখা একটা কিছু, সেটা নড়াচড়া করছে। দেখে সেটাকে জীবন্ত কিছু মনে হল। আমার আবার এই সব জীবজন্তু তে খুব অ্যালার্জি, মানে হাত দিতে কেমন যেন লাগে। একটু এগিয়ে একটা চায়ের দোকানে সেখানে দেখি আমার পাড়ার ছেলে খোকন দাঁড়িয়ে আছে। ওকেই ডেকে আনলাম, “দ্যাখো তে খোকন কিছু আছে মনে হচ্ছে এটার মধ্যে”।


সাদা চাদর সরাতে হঠাৎ করে নাকে কেমন একটা বেশ জোরাল ওডিকলোনের গন্ধ এল, আর দেখা গেল ঝুড়িতে শুয়ে আছে একটি বাচ্ছা কুকুর, কুকুর দেখে তার সঠিক বয়স আমি বলতে পারিনা, তবে দেখে মাস খানেকের বলেই মনে হল। সাদা আর হাল্কা খয়েরী রঙের, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, দাঁড়াতে গেলে খালি পড়ে যাচ্ছে, কুকুরের জাত আমি চিনি না, সুতরাং অনুমানের চেষ্টা বৃথা। দেখে অবশ্য বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এই কুকুর নিশ্চয় খুব যত্নে কোন ঘরে লালিত। গায়ে ঢাকা দেওয়া চাদরটা পরিষ্কার, গলার স্ট্র্যাপটা একেবারে নতুন, কিন্তু একি রকম ব্যাপার? এই রকম ভাবে পার্কের ধারে সুরক্ষিত বাস্কেটে একটি বাচ্ছা কুকুর কে রেখে গেল? যদিও অভিজ্ঞতা নেই তবে এটা জানি ভালো প্রজাতির কুকুর বাজার থেকে কিনতে বেশ ভালো টাকা পয়সা লাগে। প্রায় দু ঘন্টা অপেক্ষা করার পর যখন কেউ এলো না তখন একটা জিনিস বুঝতে আমার অসুবিধা হল না, এই এক মাসের বাচ্ছা কুকুরটি মোটেই হারিয়ে যায়নি। চিত্তরঞ্জন পার্কের পাশে ঘাসের গাদার ঝুড়িতে তাকে প্ল্যান করে রেখে যাওয়া হয়েছে। আমার কেমন একটা অদ্ভুত মায়া হল, ছেড়ে আসতে পারলাম না। সত্যি বলতে তার আগে কখন কোন কুকুরকে আমি নিজের হাতে ধরব এ আমার স্বপ্নের অতীত ছিল কিন্তু আজ কি যে হল আমি নিজেই জানি না, কেউ কিছু বলার আগে নিজেই ঝুড়ি শুদ্ধু বাচ্ছা কুকুরটাকে হাতে তুলে নিলাম, আর গাড়িতে করে বাড়িতেও নিয়ে এলাম।


কাজু আমার ভাগ্নে, আমার বাড়ির কাছেই থাকে, ভালো নাম রুদ্রনীল। সে আবার কুকুর, মাছ, পাখি নানান ধরনের প্রানীকে বিভিন্ন সময়ে পালন করেছে। এখন দুটো কচ্ছপ, একটা সাপ আর প্রায় চল্লিশ টা মাছের এক মস্ত অ্যাকোরিয়াম। কোথা থেকে যে তাদের জোগাড় করে জানি না। সে সব নিয়ে আমার দিদির হয়েছে মহাজ্বালা, আসলে দিদি হচ্ছে ঠিক আমার মত। জীবজন্ত থেকে যতটা দূরে থাকা যায় তত ভালো। কিন্তু কাজু বাড়িটাকে এমন চিড়িয়াখানা বানানোর চেষ্টা করলে অশান্তি তো হবেই। তো শেষ পর্যন্ত ঘরের শান্তি বজায় রাখতে কাজু থাকে ছাতের ওপরের ঘরে, আর দিদি নীচে একতলায়। কচ্ছপ আর সাপ বন্দী থাকে সেই ঘরে, তাদেরকে নিচে নামানো গর্হিত অপরাধ। তা সেই কাজুকেই খবর দিতে হল, সে তো খুব খুশী, মহানন্দে আমার বাড়ি চলে এল,

“মামা কতদিন ধরে বলছি একটা পাগ বা ল্যাব নিয়ে নাও, দেখবে কেমন সে তোমাকে ভালোবাসে”

“পাগ ল্যাব মানে?”

“কুকুরের ব্রীড, কিছুই তুমি জানো না! দেখো সেই ল্যাবই তুমি বাড়িতে নিয়ে এলে” ‘ল্যাব’ মানে ‘ল্যাব্রাডর’, ওর কাছেই জানলাম এই কুকুর নাকি জাতে ল্যাব্রাডর। আরো বলল, “মার্কেট থেকে কিনতে গেলে তোমার মিনিমাম তিরিশ লাগতো। রেখে দাও, তোমারই ভালো”

“কি আজে বাজে বকছিস? অন্যের কুকুর আমি রেখে দেব। বাজে কথা ছেড়ে একটা ভালো বুদ্ধি দে তো”

কাজুই বুদ্ধি দিল, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলাম ছবি সহকারে, “গত কাল ১১ই ফেব্রুয়ারী, সকালে রঞ্জন নগরের সেন্ট্রাল পার্কে কেউ বা কারা এই কুকুর টিকে ফেলে গেছেন। কুকুরের গলায় একটি লাল রঙের নতুন একখানি স্ট্র্যাপ এবং তাতে সাদা মোটা সুতোয় কাজ করা। কুকুরটি বর্তমানে নিম্নলিখিত ঠিকানায় নিরাপদে আছে। অনুগ্রহ করে উপযুক্ত প্রমান সহকারে যার কুকুর তিনি এসে ওকে নিয়ে যান। যোগাযোগ করার ঠিকানা”

আপনাদের অদ্ভুত লাগছে না? অদ্ভুত তো লাগারই কথা। কুকুরের নিরুদ্দেশ হবার সংবাদ কাগজে কেউ পড়ে? কুকুর ব্যাপারটায় আমার আবার চিরকালের ভীষণ ভয়। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন মজা করে বলেন আমার নাকি ‘ডগ ফোবিয়া’ আছে। সেই কোন কালে ক্লাস টুয়েলভে পড়তে একবার বাবার সাথে ওঁর দূরসম্পর্কের এক কাকার বাড়ি গেছিলাম, উত্তর কলকাতায় গিরীশ পার্কের কাছে। বিরাট বাগান বাড়ী, দাদু ছিলেন আর্মির রিটায়ার্ড কর্নেল, বিয়ে থাওয়া করেন নি, আর বাড়িতে প্রকান্ড একটা জার্মান শেপার্ড। নাম ছিল ডেভিল, জিজ্ঞাসা করতে জেনেছিলাম ফ্যান্টম সেই কমিক চরিত্র মানে আমাদের বাংলায় অরন্যদেবের পালিত চরিত্রের নামে নাম রাখা।

“কিন্তু সে তো নেকড়ে”

দাদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন “তাতে কি হল, নামটা তো খারাপ নয়! নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী টিনটিনের স্নোয়ি কে কুট্টুস বানিয়েছিলেন কিন্তু অরন্যদেবের ডেভিলের নাম তো পাল্টান নি,”


তো আমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে সে আমার দুই কাঁধে পা রেখে নিজের মুখটা আমার মুখের কাছে নিয়ে এসেছিল, তাতে আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নেহাত দাদু কাছেই ছিলেন, মুহূর্তে সেই ডেভিলকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে সে যাত্রায় আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। দাদু বলেছিলেন সে নাকি নতুন লোক কে ঐ ভাবে স্বাগত জানায়। এই ভালোবাসার নমুনা? তাহলে রাগের সময় ও যে কি করবে বা করতে পারে সে আর আমি ভাবতে পারেনি। যাইহোক, সেদিনের কিন্তু সেই জার্মান শেপার্ড আমার মনে এমন একটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল এখনো কুকুর দেখলে আমি রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে হাঁটি। এমনকি আমার যে সব বন্ধুবান্ধব বা নিকট আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কুকুর আছে তাদের বাড়ি আমি পারতপক্ষে মাড়াই না। আর সেই আমার আজ কি হল?


আমার বিজ্ঞাপন জলে গেল, অত গুলো টাকা কাজুর বুদ্ধিতে খরচ করলাম, কিন্তু তাতে কিছু হল না। এক জন অবশ্য এসেছিলেন, তিনি কুকুর নিয়ে কেনা বেচা করেন, আমার কাছ থেকে ওকে কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কিছু টাকার বিনিময়ে কিন্তু আমি বিক্রি করিনি, আর তাছাড়া আমি তো তার অরিজিন্যাল মালিক ও নই, ডিশিশন নিই কি করে? দিন সাতেকের অপেক্ষার পর যখন কিছু হল না, বুঝলাম যে কারনেই হোক এর আগেকার পালক আর এর দায়িত্ব নিতে চান না। কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, এই সাত আট দিনের মধ্যে আমার যেন কেমন একটা অদ্ভুত টান তৈরি হল এই কুকুরটির ওপর। যে আমি রাস্তায় একটা বাচ্ছা কুকুর দেখলেও অন্য প্রান্ত দিয়ে হাঁটতাম বা কারুর বাড়িতে গিয়ে মাটিতে নিচে ছোট কুকুর ঘুরলে চেয়ারের ওপর পা তুলে বসতাম সেই আমার যেন হঠাৎ করে সব ভয় কেটে গেল এই কয়েক দিনে। আর হ্যাঁ, কাজু বলল, ইনি নাকি মহিলা, কোন একটা গল্পের বইএ নামটা পড়েছিলাম, মনেও ছিল, সেখান থেকেই ওর নাম রাখলাম ‘রোহিণী’।

রোহিণীর সাথে প্রথম দর্শনে আমার নাকে যে ওডিকলোনের গন্ধ টা এসেছিল সেটা দেখলাম ভুল নয়। ওর মাথার কাছ থেকে ঐ রকম একটা গন্ধ আসে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমার পাড়ায় ডঃ সন্দীপন মৌলিক ভেটেনারি ডাক্তার আছেন, ওনাকে একদিন ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উনি বললেন, কখন কখন এটা নাকি হয়। জন্তুদের দেহ থেকে কোন বিশেষ গন্ধ নাকি পাওয়া যায়, আবার তারা অসুস্থ বা উত্তেজিত হলে সেই গন্ধ নাকি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ওডিকলোনের গন্ধ অবশ্য খারাপ নয়, আমার তো ভালোই লাগে।


সপ্তাহ তিনেক কাটল, রোহিনীর সন্ধানে কেউ আসেনি, একদিক দিয়ে আমার ভালোই হল। সত্যি বলতে আমি ও চাইছিলাম কেউ যেন না আসে। কুকুরের প্রভুভক্তি বা বন্ধুত্ব যে কতটা গভীর হয় বা হতে পারে যাঁদের কুকুর আছে তাঁরা জানেন, সুতরাং সে সব কথা বলে সময় নষ্ট করব না। রোহিণী তার ব্যতিক্রম নয়, আর আগে শুনেছিলাম এখন সেটা উপলব্ধি করলাম “কুকুরের ওপর ভয়টা কেটে গেলে তার মতো ভালো সঙ্গী নাকি হয় না”। আমার বাড়িতে আমি একাই থাকি আর রোহিনী হল আমার বাড়ির দ্বিতীয় সদস্য। আমার বাড়িতে এক রাঁধুনি আছেন, যিনি কিছু সময়ের জন্য রোজ আমাদের বাড়িতে আসেন এবং রান্না করেন, তাঁর মুখেও শুনেছি, রোহিণীর কোন ঝামেলা নেই। তাকে যা খেতে দেওয়া হয় সে তাই খায়, আর আমি বাড়িতে না থাকলে সব সময়ে কেমন একটা ঝিম মেরে পড়ে থাকে। আমি বাড়িতে থাকলে অবশ্য আলাদা কথা। আমার গলির মোড় থেকে আমার বাড়ি প্রায় একশো মিটার, কিন্তু আমি গলি তে ঢুকলেই আমার শরীরের গন্ধ তাকে চাঙ্গা করে ফেলে। অবশ্য সে কোন দৌড় ঝাঁপ করে নিজের উৎফুল্লতা দেখায়, বরং ওর একটা নিজস্ব স্টাইল আছে, সজাগ, সতেজ কিন্তু অকারনে কোন চাঞ্চল্য নেই।


রোহিণীর এখন দু মাস ও বয়স হয়নি, কিন্তু এই তিন সপ্তাহের মধ্যে ও কিন্তু আশ্চর্য ভাবে যে কোন ব্যাপারে আমার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ টা ভীষণ ভাবে বুঝতে শিখে গেছে। আমাকে মুখে কিছু বলতেও হয় না, শুধু চোখের ইশারাই যথেষ্ট ওর জন্য। কুকুরদের ট্রেনিং দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি থাকে যদিও আমি সে রকম কিছুই জানি না, সুতরাং সে সব দেওয়ার কোন প্রশ্ন ও আসে না। আর পয়সা দিয়ে ট্রেনার ও আমি রাখিনি। কিন্তু কি রকম নিজে নিজেই সে আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে শিখে গেছে। আরো কয়েকটা জিনিস বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়, যেমন, রোহিণী শারীরিক ভাবে বেশ বলিষ্ঠ, বয়সের অনুপাতে সে অনেক বেশী পরিনত, ওজন ও অনেকটাই বেশী। চেহারাতেও তার একটা বিশেষত্ব আছে, ওর কোমরের কাছ টা অন্য কুকুরদের কাছ থেকে অনেক টা সরু, আর চোয়ালের কাছ টা একটু চওড়া। আগেই বলেছি আচারে ব্যবহারেও সে বেশ পরিনত। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে আমি রোহিণী কে স্ট্র্যাপ ছাড়া কখনো বের করিনা তবে কখনো আমাকে অতিক্রম করে দৌড়নো বা আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে অন্যদিকে হাঁটা লাগানো – এইসব করতে দেখিনি। বরং ওর হাঁটাচলাতে বেশ একটা রাজকীয় ভঙ্গী আছে। কাজু তো বলে সে কি নাকি অভিজাত বংশের কুকুর! যাই হোক, রাস্তায় অন্য কুকুরদের আমি কখনো কাউকে তার কাছাকাছি আসতে দেখিনি, এমনকি আমাদের বাড়ির পশ্চিমের বারান্দায় অনেক পায়রা, চড়াই আসত, তারাও রোহিণী আসার পর থেকে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। একদিকে ভালোই হয়েছে, পাখি গুলো খুব নোংরা করত। সেদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। আমার তিনটে বাড়ি পড়ে চাকলাদারবাবুর বাড়ি, ওনার গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর, বছর সাত আট বয়স তো হবেই। সেদিন সকালে বেড়িয়েছি রোহিণীর সঙ্গে, ওদের মুখোমুখি হলাম। তারপর সাত আট বছরের সেই বলিষ্ঠ কুকুর রোহিণী কে দেখে সে কেমন একটা বিকট চিৎকার করতে শুরু করল, আর আমার দেড় মাসের রোহিণী কেমন একটা ভাবলেশহীন মুখ করে চুপ করে অন্য দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কিছুই হয়নি। রোহিণী কিন্তু একেবারেই আগ্রেসিভ মানে আক্রমনাক্তক টাইপের নয়, সে কিন্তু যে কোন পরিস্থিতিতে চুপচাপই থাকে, কিন্তু কি যে হল? কাজু কে বলতে সে বললে, হয়তো ওডিকলোনের গন্ধে গোল্ডেন রিট্রিভার ঘাবড়ে গেছিল। আর চেঁচানোর কথায় মনে পড়ে গেল, এখনো পর্যন্ত কোনদিন আমি রোহিনীকে জোরে ডাকতে শুনিনি। একটু আধটু আওয়াজ করে তবে কখনো জোরে নয়।

আমার এই নিরত্তাপ জীবনে এই রকম করে হঠাৎ করে এক রহস্য এসে পড়বে সেটা আমার ধারনার বাইরে ছিল। যেদিনে তার সূচনা, সেটা ছিল এক রবিবার সন্ধ্যে। আগেই বলেছি, আমার বাড়িটাকে কাজু আর একটা মিনি চিড়িয়াখানা বানানোর চেষ্টায় আছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি এখন। গত মাসে একটা অ্যাকোরিয়াম কিনে এনে রাখলো, বলল ওরটা নাকি ছোট হচ্ছে। দেখতে দেখতে প্রায় নয় – দশ খানা মাছ হয়ে গেল আমার অ্যাকোরিয়ামে। কাজুর অবশ্য আর একটা উদ্দেশ্যও ছিল। কি সেটা? ‘সিয়ামিস ফাইটিং ফিস’ যাকে বিজ্ঞানীরা ‘মেল বেট্টা’ বলে থাকেন, সে মাছ নাকি অনেক ছোটমাছ কে মেরে ফেলে, কাজু সেই রকম মাছ কিনে এখানে রেখে যেতে চায়। ও বাড়ির অ্যাকোরিয়ামে অনেক ছোট মাছ আছে, তাই সেখানে ‘সিয়ামিস ফাইটিং ফিস’ থাকলে সে অনেককেই কাবু করে ফেলতে পারে। তুলনায় আমার বাড়ির মাছ গুলো অনেক বড় এবং ফাইটার মাছের কাছে কাবু হওয়ার মত নয়। সুতরাং রবিবারের হাট থেকে কেনার পর তাকে রেখে যাওয়ার জন্য আমার বাড়ির অ্যাকোরিয়াম সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কাজুর দৌলতে আমার ও চেনা হয়ে গেল ফাইটার মাছের সাথে। সত্যি সুন্দর দেখতে, ঘন লাল রং, পিঠের পাখনা টা লেজের সাথে এমন ভাবে জোড়া লেগেছে দেখে মনে হয় নাচের পোশাকে সজ্জিত কোন এক ‘জলপরি’।


সেদিন সকাল থেকেই রোহিণীকে একটু অসুস্থ লাগছিল, ডঃ মৌলিক কে ফোন করেছিলাম। উনি বললেন, কাল শরীর ঠিক না হলে নিয়ে আসতে, উনি দেখবেন। আপাতত তেমন চিন্তার কিছু নেই। বিকেলের দিকে একটা কাজ ছিল বেরিয়েছিলাম, বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে সাতটা হল। সন্ধ্যেবেলা ফিরে রোহিণীকে দেখে অনেকটা ভালো লাগল, এখন সে অনেক টা সুস্থ, চুপ করে এক জায়গায় বসে নেই, আমার কাছে কাছে সমানে রয়েছে, কিন্তু আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম। আমি যত বারই তাকে কাছে ডাকি সে কিন্তু আমার কাছে আসে না। অন্যদিন এই রকম কখনো হয়না। একবার ডাকতেই আমার কাছে এসে বসে, কিন্তু আজ হয়তো শরীর এখনো ডাউন আছে। তাই আমি আর বিশেষ পাত্তা দিই নি। ঘরে ঢুকে টিভিটা চালাতে গিয়ে অ্যাকোরিয়ামের দিকে চোখ গেল, কিন্তু আমার অ্যাকোরিয়ামে ‘জলপরি’ কোথায়? বাকীরা সবাই ঠিক আছে কিন্তু ‘ফাইটিং ফিস’ যে সবার মধ্যমনি হয়ে এতক্ষন ঘুরছিল সে কোথায়? বাকীরা সবাই মিলে তাকে কাবু করে ফেলল নাকি? কিন্তু অ্যাকোরিয়ামে তো তাকে খুঁজে পেলাম না। তাহলে সে গেল কোথায়? কাজু কি নিয়ে গেল নাকি? কিন্তু ও যে বলে গেল সে এখন এখানেই থাকবে, তাহলে? ভাবলাম একবার ফোন করি, কিন্তু তালে গোলে ব্যাপারটা ভুলে গেছিলাম।


কাজু এল তখন প্রায় সাড়ে নটা, আমি তখন টিভিতে খেলা দেখছি। ওকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল সন্ধ্যের কথা, “কি রে? তুই কি ফাইটার ফিসটাকে নিয়ে গেলি নাকি?”

“কেন? নিয়ে যাবো কেন? ওকে তো এখানেই রেখে গেলাম, বললাম তো তোমায়, আরে? সেটা গেল কোথায়?" এবারে অ্যাকোরিয়ামের দিকে তার চোখ গেছে।

আমার বাড়িতে অজানা কোন মানুষ আসেন না। আমার বাড়িতে বাইরের লোক বলতে বংশীদা, আমার রাঁধুনি, তিনি সকালে এসেছিলেন, রান্না করে চলেও গেছেন দুপুরের আগে। তারপর থেকে কেউ আসেনি, আর বিকেলে তো আমি নিজেই বাড়ি ছিলাম না। তাহলে এই রকম করে আমার জলপরীর উধাও হয়ে যাওয়া টা সত্যি অদ্ভুত লাগছিল। কাজু মাঝে মাঝে কোন কারণ ছাড়া এমন এক একটা কমেন্ট করে আমার ভয় লেগে যায়, “মামা ব্যাপার টা কেমন ভুতুড়ে লাগছে না?”

“বাজে বকিস না! একে আমি একা বাড়িতে থাকি আর আমাকে ভয় দেখান হচ্ছে?”

“না ঠিক তা নয়, কিন্তু সেটা গেল কোথায়? অ্যাকোরিয়াম থেকে ওকে বার না করলে সে তো নিজে নিজে বেরোতে পারবে না। তবে? তুমি বলছ বিকেলে কেউ আসেনি। তাহলে? বংশীদা নিয়ে যায়নি তো?”

“বংশীদা? তার কি উদ্দেশ্য? বাড়িতে গিয়ে রান্না করে খাবে? আর আমার মনে আছে, বংশীদা চলে যাবার পরও তোর ফাইটার ফিস কে আমি দেখেছি ঐখানে”

“না বংশীদার কাছে তো তোমার বাড়ির আর একটা চাবি থাকে? যদি বিকেলে আবার এসে থাকে!”

“ঠিক আছে, কাল আসুক তারপর জিজ্ঞেস করব”

একবার ভাবলাম কাজুকে আজ রাতটা বাড়িতে থেকে যেতে বলি, কিন্তু তারপর ব্যাপার টা আর বেশী পাত্তা দিইনি। রাতের ডিনার করে একটু টিভি দেখে শুতে শুতে প্রায় এগারোটা হল, রোহিণী কিছুই খেল না। আমি ওর খাবার রেখে দিয়েছিলাম কিন্তু ও কিছুই মুখে দেয়নি। মাথার কাছ থেকে ওডিকলোনের গন্ধ টা আজ বেশ তীব্র কিন্তু তবে জ্বর নেই। আমার ঘরের বাইরে একটা বিন ব্যাগের ওপর রোহিণী সাধারনত শোয়, কিন্তু আজ কিছুতেই তার ওপর থাকছে না। বেশীর ভাগ সময়টা দাঁড়িয়ে আছে, কখনো কখনো ঐ শোবার জায়গাটার আসে পাশে চলাফেরা করছে। আর থেকে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আর বিশেষ ঘাঁটায় নি। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি আমার মনে নেই।

সকালে অফিস বেরোনের আগেই বংশীদা এলো, আমার অনুমান ঠিক। সে অ্যাকোরিয়ামে হাত লাগায় নি। সুতরাং রহস্যের উত্তর পাওয়া গেলো না। সকালে রোহিণীর দিকে তাকানোর সময় থাকে না, কোনমতে ব্রেকফাস্ট করে লাঞ্চ বক্স নিয়ে অফিসে দৌড়তে হয়। জুতো পরছিলাম, বংশীদা এল – “দাদা, দক্ষিনের জানালার নিচে কিছু একটা মরে পড়ে আছে, কাক গুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে। আপনি বেরোনোর সময় একটু দেখবেন?”

যেতেই হল, এখন আমাদের লোকাল মিউনিসিপ্যালিটির যা চাপ, রাস্তায় কিছু হলে বাড়ির মালিকের সব দায়িত্ব। গেলাম, আর গিয়ে যেটা দেখলাম তাতে সেই মার্চ মাসের গরমেও শরীরে একটা ঠাণ্ডা ছোঁয়া পেলাম। কালকে কাজুর কিনে আনা ফাইটার ফিস আমার ‘জলপরী’ মরে পড়ে আছে, আর গোটা তিনটে কাক সেটাকে ঘিরে রয়েছে। ঘোর কাটলে বুঝলাম আমার বাড়ির দক্ষিনের জানালার ঠিক নিচে তাকে ফেলা হয়েছে। এ কাজ কার? কেউ কি অলক্ষ্যে আমার বাড়িতে ঢুকে এই কাজ করে গেছে? আর একটা সুন্দর ফাইটার ফিস কার কিই বা ক্ষতি করতে পারে? তাহলে তাকে মারা হল কেন?


কাজুর হাজার খোঁচা সত্ত্বেও আমি কিছুতেই এই ফাইটার ফিসের অকালমৃত্যু কে ভৌতিক বলে ভাবতে পারছিলাম না। অলৌকিক ব্যাপার গুলো বইয়ের পাতায় বা সিনেমার পর্দায় ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সে সব কখন হয় না, সব টাই গ্যাঁজা গপ্প বলেই আমার বিশ্বাস ছিল। কিন্তু আমার সব বিশ্বাস আর সব সাহস খুব জোরে আর এক বার আঘাত খেল তার থেকে ঠিক ছয় দিন পরে। আবার এক অতি সাধারন জিনিস কিন্তু তার অদ্ভুত পরিনতি। আমার এক দুরসম্পর্কের ভাই আমার বাড়ির কাছেই থাকে, তার আবার কুকুর ভীষণ প্রিয়। আমার বাড়িতে কুকুর এসেছে শুনে প্রায়ই বলছিল আসবে কিন্তু আসা হচ্ছিল না। তা অবশেষে সেদিন অবকাশ হল। রোহিণীর জন্য ও খুব সুন্দর একটা রিমোট চালিত খেলনা গাড়ি এনেছে। রিমোটে তিন-চার খানা বোতাম, কোনটায় চাপ পড়লে গাড়িটা অ্যাম্বুলেন্সের মতো আওয়াজ করে চলতে থাকে, কোনটায় চাপ দিলে গাড়ীটা মাথায় লাল আলো জ্বলতে শুরু করে মানে ভি আই পি গাড়ি হয়ে যায়, কোনটা চাপ দিলে একেবারে রেসের গাড়ির মতো আওয়াজ করে বেশ জোর গতিতে এগোতে থাকে, এই রকম। রোহিণী এক একটা করে বোতামে চাপ দেয় আর গাড়ি ও সেই রকম আওয়াজ করে চলতে শুরু করে। মজার জিনিস আর আমার দেখে মনে হল রোহিণীর ভালো ই লেগেছে। আমি একা থাকি বলে আমার বাড়িতে অতিরিক্ত রান্নার ব্যবস্থা থাকে না, তাই বাড়িতে হঠাৎ করে কোন অতিথি এসে পড়লে আমি সাধারনত বাইরে খেতে নিয়ে যাই। সেদিন ও তার কোন ব্যতিক্রম হয় নি। খাওয়া দাওয়া শেষ করে বারই ফিরতে প্রায় এগারোটা হল, আর এনার্জি ছিল না, শুয়েই ঘমিয়ে পড়েছি। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গল কলিং বেলের শব্দে। এই রকম সময়ে সাধারনত আমার বাড়িতে কলিং বেল বাজে না। ঘুম চোখে দরজা খুলতেই হল, আর খুলে দেখি কাগজ দেয় যে ছেলেটা, সে দাঁড়িয়ে, অন্যদিন তো কাগজ দিয়েই পালায়, কিন্তু আজ কি হল? ‘কি ব্যাপার?’

“এই খেলনা গাড়িটা আপনার বাড়ির ঠিক বাইরে পড়ে আছে, আমি ভাবলাম হয়তো আপনার বাড়িতে কোন বাচ্ছা এসেছে, ভুল করে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে, তাই দিতে এলাম। কর্পোরেশনের গাড়ি এসে গেলে তো সব উঠিয়ে নিয়ে চলে যাবে। তাই! রেখে গেলাম এখানে,” কালকে আমার ভাইয়ের আনা রিমোট চালিত গাড়িটা আমার দরজার পাশে রাখা একটা ভাঙ্গা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। কালকে এটাকে সুন্দর চালু অবস্থায় দেখেছি, আজ দেখছি সেটা তোবড়ানো, মোচড়ানো। আমার চোখ থেকে ঘুম উড়ে যেতে আর সময় লাগে নি।


নিঃশব্দে একটা ভয় আমাকে আস্তে আস্তে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলছিল। আমি নিজে খুব সাহসী না হলেও ভূতের ভয় শেষ কবে পেয়েছি সেটা কষ্ট করেও মনে পড়ে না। কিন্তু এখন যে কি হল? ছয় দিনের ব্যবধানে পরপর দুটো ঘটনা যে রকম আগে কখনো হয়নি। তাহলে কি রোহিণীর আসার সঙ্গে এর কোন যোগাযোগ আছে? সত্যি বলতে কি আমি অফিসেও বিশেষ মন দিতে পারছিলাম না। আমার অফিসে নিরঞ্জনদা আছেন, আমার সিনিয়র, বেশ ভরসা করা যায়। তাঁকে সব কিছু বললাম, সব শুনে টুনে তিনি ও আমি তেমন কোন বুদ্ধি দিতে পারলেন না। মুখে বললেন, ভূত টুত সব বোগাস কিন্তু এই সব ঘটনার জন্য বাড়িতে সদ্য নিয়ে আসা একটি কুকুরকে তো কখনো দায়ী করা উচিৎ নয়। কুকুর কি কখনো একটা ফাইটার ফিস কে আক্রমন করতে পারে? নাকি একটা খেলনা গাড়ি কে বাড়ি থেকে বাইরে ফেলে দিতে পারে? তাহলে কাজ দুটো করল কে? উত্তর কলকাতার এই বাড়িতে আমি আজন্ম কাল কাটিয়েছি। এই রকম কাজ তো আগে কখনো হয়নি। তাহলে? অন্য একটা সন্দেহ মনে উঁকি দিতে শুরু করল, অন্য কেউ হয়তো আমার অলক্ষ্যে আমার বাড়িতে ঢুকছে তারপর একের পর এক এই রকমের কুকাজ কাজ করছে। তাহলে কি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য এই সব করা হচ্ছে? কিন্তু আমাকে ভয় দেখিয়ে কার কি লাভ?


তিনদিনের জন্য দৈনন্দিন জীবন থেকে একটা অবসর নিয়েছিলাম, ঘুরতে গেছিলাম গাদিয়াড়া, আর সেখান থেকে ফেরার সময় ই আবার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। দিল্লী রোডে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চা খাচ্ছিলাম, রোহিণী গাড়িতেই ছিল। পেছনের সীটে চুপ করে বসে থাকে, যদিও আমার আগের অভিজ্ঞতা নেই তবুও দেখেছি অন্য সারমেয় রা জানলা দিয়ে মুখ দিয়ে বার করে থাকে, প্রভুর সন্ধানে সবসময় একটা চাঞ্চল্য বজায় রাখে। এ কিন্তু সে রকম নয়, নিজের জায়গায় থাকে, কোন গোলমাল নেই, কোন অভিযোগ নেই, খালি গাড়ি থেকে আমি যখন নামছিলাম প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি কোথাও যাবার সময় সাধারনত ওকে বলেই যাই, কি বোঝে জানিনা, তবে আমার কাজ আমি করে থাকি, “তুই একটু বোস, আমি একটু চা খেয়ে আসছি”, এসি টা বন্ধ করে গাড়ির কাঁচটা একটু নামিয়ে দিয়ে এলাম। চা শেষ করে সিগারেট ধরিয়েছি, ঠিক এই সময়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে আমার গাড়ির ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। মাথায় লাল আলো জ্বলছে তবে ঘুরছে না, গাড়ির ড্রাইভার কিছু একটা ঠিকানা খুঁজছিল, হঠাৎ দেখি রোহিণী নামানো কাঁচের মধ্যে থেকে মুখ বার করে ফেলেছে আর সেই অ্যাম্বুলেন্স টার দিকে তাকিয়ে আছে, আর কেমন একটা গরগর করে আওয়াজ করছে, আমি এই রকম আওয়াজ কখনো শুনিনি, আর সেই রকম তীব্র ওডিকলোনের গন্ধ আমার নাকে এল। এর আগে কখনো আমি এই রকম দেখিনি, স্বাভাবিক ভাবেই একটু অবাক হলাম, হাতের সিগারেট টা ফেলে গাড়ির দরজা টা খুলতেই হল, হয়তো ওর শরীর খারাপ লাগছে! “কিরে নিচে নামবি শরীর খারাপ লাগছে?”


গাড়ির দরজা খুলে দিলাম সে নেমে এল, তবে একদম আমার গা ঘেঁসেই দাঁড়িয়ে রইল, আমি ওর মাথায় হাল্কা হাত বোলাচ্ছি ঠিক এই রকম সময়ে পেছনের অ্যাম্বুলেন্সটা আবার স্টার্ট নিল, এবারে তার সাইরেন চালু হল আর মাথার লাল আলো ও বনবন করে ঘুরতে শুরু করল, আর তার পরের মুহূর্তের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ছিলে ধনুকের মত রোহিণী ছিটকে বেরোল, ওর গলায় কোন স্ট্র্যাপ ছিল না, সুতরাং ওকে আটকানোর কোন উপায় আমার ছিল না, একটা প্রকান্ড জাম্প দিল আর মুহূর্তে পৌঁছে গেল অ্যাম্বুলেন্সের মাথার কাছে। এবারে বাম হাতের একটা প্রচন্ড আঘাত আর মাথার লাল আলো টা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। পুরো ঘটনা টা এমন ভাবে হল আমার কোন রিয়্যাকশন টাইম ছিল না। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে এসেছে, গাড়ির ভেতর থেকে আরো দুজন নেমে এসেছেন, এছাড়া রাস্তায় অনেক পরোপকারী আর দরদী মানুষ থাকেন যারা অন্য মানুষের সত্যিকারের বিপদে কিছু করার সময় বা অবকাশ পান না, কিন্তু কেউ সমস্যায় পড়লে তাকে আরো সমস্যায় ঠেলে দিতে এগিয়ে আসেন, সেই রকম চার পাঁচ জন মানুষ ও সাহায্যে এগিয়ে আসেছেন। আমার মুখে কোন শব্দ আসছে না, গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোচ্ছে না, আমার সামনে প্রায় মারমুখী সাত আট জনের ভিড়, অনেক কিছু কানে আসছিল, “এটা কি হল দাদা”, “কুকুর কে যদি কনট্রোলই না করতে পারবেন তবে নিয়ে বেরিয়েছেন কেন?”, “ এর গলায় স্ট্র্যাপ লাগান নি কেন?” “আদিখ্যেতা দেখো, জংলী কুকুর নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়েছে” কেউবা আর একটু বেশী, “ কি দাদা, কুকুরকে ডাকাতির ট্রেনিং দিচ্ছেন নাকি?” “আপনাকে তো পুলিশে দিতে হবে” “আর সঙ্গে কুকুর টাকেও” বিস্ময়, ভয়, লজ্জা আমাকে ভেতর থেকে খানখান করে দিচ্ছে ঠিক এই সময়ে দেখি রোহিণী ঠিক আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার মনের ভেতরটা কান্নায় ভিজে গেছে, রোহিণী বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেছে, আমার দিকে সে তাকায় নি, পায়ের দিকে মুখ করে চুপ করে এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একটাই কথা আমার মুখে এল – “আমাকে এতো লজ্জা দিলি কেন? তাই কি রাস্তা থেকে তোকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম?”


শেষ পর্যন্ত দেড় হাজার টাকা দিতে হল ক্ষতিপূরণ হিসেবে। দরাদরির কোন প্রশ্ন ছিল না, টাকা দিয়ে যে রেহাই পাওয়া গেল এই অনেক। আবার গাড়িতে উঠলাম, আমরা দুজন, রোহিণী দেখলাম এবারে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, রোহিণী কে রক্তচক্ষু দেখানো ছাড়া আমি কোন কথা বলিনি। তবে এটুকু বুঝলাম, দুম করে রাস্তার মধ্যে আর তাকে গাড়ি থেকে নামানোটা আমার ঠিক হয়নি। এবারে গাড়িতে জোর ভলুউমে রেডিও চালিয়ে দিলাম, মনের ওপর সহসা একটা ধাক্কা লেগেছিল, সেটা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য রেডিও ই বোধহয় সবচেয়ে ভালো। মিনিট দুয়েক বাদে খেয়াল হতে বুঝলাম, রোহিণী কিন্তু আবার বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে, আবার ওডিকলোনের গন্ধ আমার নাকে এল। সত্যি কি তাহলে ওর শরীর খারাপ আর আমি শুধু শুধু ওর ওপর রাগ করছি, আবার গাড়ি থামালাম। এবারে সে কিন্তু এক জায়গায় চুপ করে বসে নেই, সমানে নড়াচড়া করছে। নজর অবশ্য সামনের দিকে, খুব সম্ভব আমার গাড়ির ড্যাশ বোর্ড অথবা উইন্ডস্ক্রিন! মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কি হয়েছে তোর, এই রকম ছটফট করছিস কেন? কোনদিন তো করিস না! জল খাবি?”

তবে এবারে আর আমি ওকে গাড়ি থেকে নামাবো বা, তাই গাড়ি বন্ধ করে পেছনের ট্রাঙ্ক থেকে ওর জল খাবার প্লেট বের করলাম, জলটা দিতে গিয়ে দেখি ওডিকলোনের গন্ধ টা আর নেই, ও কিন্তু চুপ করে বসে আছে ঠিক আগের মত। বুঝলাম জলতেষ্টা তার পায়নি, তবে আমাকে না বলার ক্ষমতা নেই তাই জল টা তাকে জবরদস্তি খেতে হল। আবার গাড়ি চালু করলাম, রেডিও চালু হল, আবার এক জিনিস, তীব্র ওডিকলোনের গন্ধ আর রোহিণী নিজের জায়গায় স্থির নেই। তাহলে কি রেডিওর আওয়াজে ওর কোন সমস্যা হচ্ছে? কিন্তু আমার বাড়িতে তো সর্বক্ষণ টিভি চলে, আওয়াজ নেহাত কম থাকে না, কিন্তু তাতে তো তার কোন সমস্যা হয় না, তাহলে আজ কি হচ্ছে?


চরম মানসিক উদ্বেগ আর অশান্তি নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, রেডিওর আওয়াজ এখন একেবারে কম কিন্তু রোহিণী চাঞ্চল্য তাতে কিছু কমেনি। বুঝতে পারছি না, রোহিণীর কাছে জোরে আওয়াজ কোন সমস্যা কিনা, ঠিক এই সময়ে আমার পেছনে আবার তীব্র সাইরেন বেজে উঠল, রিয়ার মিররে দেখলাম পুলিশের গাড়ি, আমি বাঁ দিকে সরে গিয়ে জায়গা দিয়ে দিলাম, আগের বারে অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র শব্দে রোহিণীর প্রতিক্রিয়া আমি ভুলিনি। কিন্তু এবারে আশ্চর্য! পুলিশের গাড়ি মাথায় নীল সাদা আলো জ্বালিয়ে, শব্দ করে চলে গেল রোহিণী একবার তাদের দিকে দেখল না পর্যন্ত, ওর নজর সামনের দিকে, ফ্রন্ট ভিউ কাঁচ দিয়ে সে কি দেখছে এতক্ষন ধরে? নাকি ড্যাশবোর্ডে কিছু আছে? আমি এবারে ভালো করে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকালাম, নজর পড়ার মতো একটাই জিনিস যদিও আওয়াজ কম আমার রেডিও টা কিন্তু চলছে, কিছু লাল আলো নড়াচড়া করছে। এবারে আমি সেটাকে পুরো সুইচ অফ করলাম, আর অবাক হয়ে দেখলাম সেটা মন্ত্রের মত কাজ করল, মুহূর্তে রোহিণী একদম শান্ত হয়ে গেল, ঠিক যে রকম রোজ থাকে সে রকম, তাহলে?

আমার মাথার মধ্যে দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ চলে গেল, আমি বুঝে গেছি রোহিণীর সমস্যা। চলমান লাল আলো হল ওর সমস্যা, অ্যাকোরিয়াম থেকে লাল জলপরীকে সেই সরিয়েছে, তারপর আমার ভাইয়ের আনা রিমোট চালিত লাল আলোর গাড়িকে সেই ভেঙে চুরে ছুঁড়ে ফেলেছে, তারপর আজ অ্যাম্বুলেন্সের মাথার আলো ভেঙে দিয়েছে, আর এখন রেডিওর চলমান লাল আলো তে সে এতো চঞ্চল হয়ে উঠছে। কিন্তু কিছু করতে পারছে না কারণ আমি রয়েছি, আমি না থাকলে সে কি করত জানিনা! পুলিশের গাড়ির সাদা নীল আলো তাই তাকে উত্তেজিত করতে পারেনি, অথবা দিনের বেলার প্রখর সূর্যের আলোয় রেডিও র চলমান লাল আলো গুলো বড়ই টিমটিম করে তার কাছে, আর দিনের আলোয় গাড়িতে কোন সমস্যা হয়না। কিন্তু পরক্ষনেই প্রশ্ন এল, সাদা কালো ছাড়া আর কোন রং তো কুকুর কেন কোন জন্তুই দেখতে বা পার্থক্য করতে পারে না। তাহলে সে দেখতে পায় কি করে? হয়তো এটা কোন শারীরিক অসুস্থতা, তাহলে তো তার নিরাময় প্রয়োজন। আমাকে কাল একবার সন্দীপন মৌলিকের কাছে যেতেই হবে।

রাতেই ডঃ মৌলিকের সাথে কথা হয়েছিল। সকালে আটটার সময় যেতে হল, বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে, সে গুলো সব হয়তো ডঃ মৌলিকের অফিসে নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে হয়তো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অফিসে বলাই ছিল, ছুটি পেয়ে গেলাম। রোহিণীকে আমি নিজের ইচ্ছেয় নিয়ে আসিনি, কিন্তু দুমাসের এই বন্ধন আমাকে কেমন আস্টেপিস্টে বেঁধে ফেলেছে! ওর এই রকম অবস্থা টা আমার একদম ভালো লাগছিল না। সত্যি, এটাতো একটা যন্ত্রণা, আর আমি তো ফীলও করতে পারছিনা!

মিনিট দশেক পরীক্ষার পর যেটা বোঝা গেল যে রকম ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে এই অসুখটা অনেক জটিল এবং সেটার কারণ খুঁজতে বা বুঝতে একটু বেশী সময় লাগবে। কিছু পরীক্ষার সময় হয়তো রোহিণী কে সংজ্ঞাহীন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে হয়তো ইনজেকশনের সাহায্য নিতে হতে পারে। ডঃ মৌলিক মুখে না বললেও ওনার সঙ্গে অন্যদের কথা শুনে আমি বুঝতে পারছিলাম, এটা কোন রকম নিউরোন বাহিত রোগ, এবং তাতে বোধহয় রোহিণীর মস্তিষ্ক সংক্রামিত হয়েছে। একটা কাঁচের দরজা আছে, সেটা দিয়েই তাকিয়ে ছিলাম, বেচারা কি যে রোগ বাঁধিয়েছে? এই মাত্র তিম মাস বয়স তাতে এত ইনজেকশন দেওয়া, এত ওষুধ, মনে মনে নিজের কথা ভাবছিলাম আর হাসছিলাম। আমি ছিলাম যাকে বলে চূড়ান্ত ‘ডগ ফোবিয়ায়’ আক্রান্ত একটি মানুষ, আর সেই আমি আজ রোহিণীকে ছেড়ে যেতেই পারছি না! কি অদ্ভুত মায়ার খেলা! কে যে বলে ভগবান নেই? দুই ঘন্টা ধরে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চলল, ডঃ মৌলিকের কাছে জানলাম রোহিণী কে এখনো দিন দুই বা তিন রাখতে হতে পারে।


চার দিন রোহিণী হাসপাতালে ভর্তি ছিল, ডঃ মৌলিক আমাকে তেমন কিছুই বলেন নি। প্রথম কথা বললেন, চারদিন বাদে, ডাক পড়তেই ঢুকলাম ডঃ মৌলিকের ঘরে, আমাকে প্রথম যে প্রশ্নটা উনি করলেন এই পরিস্থিতিতে সেটার কি প্রয়োজন জানতাম না, “আচ্ছা, আপনি একে কোথা থেকে পেয়েছেন?”

“ঐ তো চিত্তরঞ্জন পার্কের পাশে কেউ ঝুড়িতে করে রেখে গেছিল”

“আপনার কখনো মনে হয়নি ওর মালিক ওকে রাস্তায় এই রকম করে ছেড়ে রেখে গেছে কেন?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মনে হয়েছে, কিন্তু অনেক সময়ে তো মানুষ অর্থাভাবে কুকুর কে আর লালন পালন করতে পারে না, আর তখন সেই সব মানুষের কাছে রাস্তাই একমাত্র অল্টারনেটিভ থাকে, এ জিনিস তো নতুন নয়! আর তাছাড়া আমি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ আসেনি তাকে নিতে। তখন তাকে আমার কাছেই রেখে দিই। কুকুরের জন্য থানা পুলিশ করলে সেটা বোধহয় বাড়াবাড়ি হয়ে যেত। কিন্তু আপনি এখন এই সব জানতে চাইছেন কেন? ওর শরীর খারাপের সঙ্গে এই সবের কি রিলেশন?”

“ওর শরীর খারাপ তো হয়নি! সে যথেষ্ট সুস্থ এবং সবল। চারদিন আগে আপনি যেটা দেখেছেন সেটা একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে তার রিয়্যাকশন, সেটা হতেই পারে, কিন্তু তার সাথে শরীর খারাপের কোন রিলেশন নেই”

“মানে? আপনি প্লিজ একটু ডিটেলে বলুন”

“দেখুন সোজাসুজি ব্যাপার টা জানাই ভালো আপনার জন্য। বিজ্ঞানে কুকুরকে আমরা ‘ক্যানিস লুপুস’ ফ্যামিলি বলে থাকি। নেকড়ে, শেয়াল আর কুকুর কে আমরা ক্যানিস বলি। ক্যানিসের শরীরে ৭৮টা ক্রোমোজোম থাকে, কিন্তু ডিএনএ টেস্ট বলছে আপনার রোহিণীর শরীরে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৯৮। ৭৮ টা ক্রোমোজোম ক্যানিসের, আর অতিরিক্ত ২০টা হল ফেলিডি প্রজাতির। ফেলিডি হল ক্যাট ফ্যামিলি, মানে বাঘ, সিংহ যার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং রোহিণী নামে যে কুকুরটিকে আপনি গত দুই মাস ধরে লালন পালন করছেন সে কিন্তু সম্পূর্ণ কুকুর নয়“ আমি যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, ডঃ মৌলিক আবার বললেন, পরের কথা গুলো হয়তো এই জীবনে আমার পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। বেশ কাটা কাটা শব্দ গুলো কানে এল, “রোহিণী হল এক মিক্স অফ ক্যানিস লুপুস আর প্যান্থারা লিও, অন্য কথায় বলতে পারেন কুকুরের বেশে প্যান্থারা লিও”

ছোটবেলায় বইয়ে পড়েছিলাম ‘প্যান্থারা লিও’, পশুরাজ সিংহের বৈজ্ঞানিক নাম! আমার মাথার ভেতরটা কেমন ঝনঝন করে উঠল, “মানে? আপনি কি বলছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না!”

“বুঝতে না পারারই কথা, আমি তো কখন দেখিনি, বলা ভালো শুনিও নি। এই লাইনে প্রায় তিরিশ বছর হয়ে গেল, কিন্তু এ জিনিস দেখিনি। বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ, নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল এটা। নিঃসন্দেহে ওর মা বাবা ল্যাব্রাডার, কিন্ত রাইট আফটার ব্রিডিং ফেলিডি জীন ইমপ্ল্যান্ট করা হয় ওর শরীরে। এতে কিছু ক্রোমোজোম ডরম্যান্ট হয়ে যায়, কিছু আবার অ্যাকটিভ হয়ে ওঠে। তাই এর মধ্যে আপনি মিক্সড চরিত্র দেখতে পাবেন। আরো একটা জিনিস, জন্তু জানোয়ারের স্বভাবগত বর্ণান্ধতা এর ক্ষেত্রে নেই, আর তার জন্য খালি লাল রং টা সে বুঝতে পারে। কিন্তু সে বোঝা তাকে কোন সাহায্য করে না বরং আরো উত্তেজিত বা হিংস্র করে তোলে। যেভাবে হাজার জীবন নষ্ট হয়ে যায় বা নষ্ট করে দেওয়া হয়, তেমন করে এর জীবনটাও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আর আপনার মতো কিছু দুর্ভাগ্যবান মানুষ থাকেন যাঁদের বাকি পরিণতিটা দেখতে হয়”

“কিন্তু আপনি এটা সিওর করে কি করে বলছেন? কুকুরের সমস্ত বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে আছে, চেহারাগত, স্বভাবগত”

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ডঃ মৌলিক, “অস্বীকার করছিনা সে মূলত কুকুর, কিন্তু সিংহের জীন তার শরীরে ইমপ্ল্যান্ট করা হয়েছে, তাই সম্পূর্ণ কুকুরের মত সে কখনোই নয়। ওর চেহারার গঠন দেখুন, ও কিন্তু টিপিক্যালি আর দশটা কুকুরের মত নয়। একটা মস্ত বড় ব্যাপার দেখুন, আপনার রোহিণীর কটা দাঁত আছে জানেন? তিরিশ টা! কুকুরের কিন্তু আঠাশ টা থাকে। কুকুরের মোলার টিথ থাকে না, কিন্তু এর আছে, এর ভয়েস বক্স অনেকটা বড় একটা নরম্যাল কুকুরের থেকে, তাই এ কখনো জোরে ডাকতেই পারে না, আপনি যদি ডিএনএ স্ট্রাকচার নাও বোঝেন এই গুলোতো সহজেই বুঝতে পারছেন! এই গুলো প্রমান করে না যে সি ডাস নট বিলং টু ক্যানিন মানে ডগ ফ্যামিলি।

“তাহলে এখন উপায়?”

“আপনি ভুলেও একে ঘরে লালন পালন করার কথা ভাববেন না। মনে রাখবেন, রোহিণীর শরীরে সিংহের জীন আছে, সুতরাং এ কোন ভাবেই গৃহপালিত প্রাণী নয়। আর তাছাড়া নিশ্চয়ই মনে আছে জয় অ্যাডামসন কিন্ত এলসা কে জঙ্গলে ছেড়ে এসেছিলেন। আমাদের সত্যজিৎ রায়ও চঞ্চু কে জঙ্গলে ছেড়ে এসেছিলেন”। দুটো উদাহরণই মনের ফ্ল্যাশব্যাকে এসে ভিড় করল, মার সাথে ছোটবেলায় দেখেছিলাম চ্যাপলিন সিনেমা হলে জয় অ্যাডামসনের ‘বর্ণফ্রি’, আর ছোটবেলায় বইমেলায় কেনা ‘আরো বারো’ বইয়ে পড়েছিলাম টেরর বার্ড বা ভয়াল পাখি, অ্যান্ডালগালার্নিসের সেই রক্তহীম করা কাহিনী, ‘বৃহচ্চঞ্চু’।


ডঃ মৌলিক বলে চলেছিলেন, “আপনাকেও সে রকম কিছু করতে হবে। ঘরে ওকে আপনি রাখতে পারবেন না, জঙ্গল হচ্ছে ওর একমাত্র জায়গা। এখন ওর বয়স মাত্র তিন মাস, যত ওর বয়স বাড়বে কুকুরের বৈশিষ্ট গুলো লোপ পেতে থাকবে, আর ও আরো বিপদজ্জনক হয়ে উঠবে। বেসিক্যালি কুকুর হওয়ার জন্য সে হয়তো প্রভুভক্ত থাকবে কিন্তু ঘরের বাইরে সে কি দেখে হিংস্র হয়ে উঠবে সে বলা শক্ত। আর একবার যদি সে হিংস্র হয়ে ওঠে আপনি আর তাকে কন্ট্রোল করতে পারবেন না। আর তার প্রমান আপনি পেয়েওছেন। তারপর এখনো তো সে রক্তের স্বাদ পায়নি, সেটা যখন পাবে তখন সে যে কি হবে সেটা কিন্তু কেউ জানে না। আর তখন সেটা গোটা সমাজের পক্ষেই সেটা খুব বিপদজ্জনক হয়ে উঠবে”

আমার মন মানছিল না, আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে যদি নেওয়ার থাকে তাহলে এলো কেন আমার বাড়িতে? বুঝতে পারছি আমার গলার কাছ থেকে একটা কান্না দলা পেকে উঠছে, সব শক্তিকে এক করে জিজ্ঞাসা করলাম “ওকে কি আমি এখন নিয়ে যেতে পারি”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, তবে আরো ঘণ্টাখানেক এখনো ও ঘুমোবে, তারপর ওকে নিয়ে যান, আর লাল আলো থেকে সাবধান। আর পারলে এই কয়দিন মাংস টা দেবেন না, আমি কিন্তু আপনার সেফটির কথা ভেবে বলছি। আরো একটা কথা, আমি কাউকে ব্যাপার টা বলিনি, আপনি ও বলবেন না। শুধু শুধু আপনার ওপর বিভিন্ন মহল থেকে প্রেসার আসবে, তারপর হয়তো রোহিণী কে আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে তার ওপর, সেই গুলো মিউজিয়ামে সাজানো হবে, সেটা কিন্তু আপনার জন্য খুব কষ্টের হবে। তার চেয়ে বরং এখনই কোন জঙ্গলে তাকে ছেড়ে আসার ব্যবস্থা করুন। সেটাই তার আসল জায়গা। সেখানেই সে নিজের মতো কিছু খুঁজে নেবে।”

“কিন্তু জঙ্গলে অন্য প্রাণীরা রয়েছে, তার মধ্যে কিছু হিংস্র প্রাণী ও আছে, ও পারবে সারভাইভ করতে?”

“মাত্র তিন মাস তো বয়স, শিখে নেবে ঠিক”

মন মানছিল না। দশ দিন লাগল সব ব্যবস্থা করতে, শুধু জঙ্গল খুঁজলেই তো হলো না, পুরো ব্যাপার টা জানার পর আমাকে ব্রেক ভ্যানের ব্যবস্থা করতে হল। অফিসে লোকাতে হল, নেহাত আমার সংসার নেই তাই বাকিদের এতো কিছু জানানোর প্রশ্ন ও ছিল না। প্রথমটায় মেনে নিতে না পারলেও পরে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতেই হল। সত্যি তো, এক নিষ্পাপ প্রাণীর ওপর বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ হয়েছে, তারওপর সেই অবস্থাটাকে আরো জটিল করার কোন মানে ছিল না। সত্যি যদি রোহিণী কে আমি ভালোবাসি তাহলে তাকে বাড়িতে রাখাটা কখনোই ঠিক নয়। সব মায়া কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ওকে ছেড়ে আসব সেই ঠিক করেছিলাম। প্রথমে রোহিণী বুঝতে পারেনি, ও বুঝতে পেরেছিল আমরা যেদিন রওনা হব তার আগের রাতে। ওর চোখের করুন দৃষ্টি আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি, বারবার আমাকে বলছিল “আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেও না, আমাকে তোমার সঙ্গে থাকতে দাও”, শেষ পর্যন্ত ডঃ মৌলিকের দেওয়া সিডেটিভ দিতে হয়েছিল। বাধ্য হয়ে ওকে ঘুম পাড়াতে হয়েছিল। তারপর অশ্রুসিক্ত নয়নে জঙ্গলের একটা কোণায় ওকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম কোনমতে।

ফিরে এসে দুটো জিনিস দেখেছিলাম, এক আমার বাড়ির পশ্চিমের বারান্দায় পায়রা আর চড়ুই এর আক্রমন শুরু হয়ে গেছে আর দুই, কুকুর দেখলে আমি আর রাস্তার অন্য পাড় দিয়ে হাঁটি না, মানে কুকুরের ওপর থেকে আমার সব ভয় উধাও হয়ে গেছে।


================================


প্রায় দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে আমি সেই ইউক্যালিপটাস গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। চার মাস আগে এখানেই ছেড়ে গেছিলাম রোহিনীকে, এছাড়া অন্য কোন জায়গায় গিয়ে ওকে খোঁজা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চোখ বেঁধে, ইনজেকশনের ঘোরে তাকে ছেড়ে দিয়ে যেতে হয়েছিল আমাকে, শুধু মন কান্নায় ভেজে নি, চোখ ও ভিজে গিয়েছিল, কিন্তু আমার আর কোন উপায় ছিল না। সত্যি বলতে এবারে আমার একটু ভয় ভয় করছে, জঙ্গলে বন্যপ্রানী থাকাটা খুবই সম্ভব। তারপর না জানা জায়গায় এসে কি যে বিপদে পড়ব জানি না। জীপ টা আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে, বলেছে সাড়ে ছটায় আসবে। এখন আলো বেশ কমে এসেছে, সূর্য প্রায় অস্তগামী, শুনেছি এই সময়টাই সবচেয়ে বিপদজনক সময়। শাকাহারিদের ঘরে ফেরার সময় তাই অচানক আক্রমন হয় তাদের ওপর। হঠাৎ করে একটা শম্বরের ডাক শুনলাম। বইয়ে পড়েছিলাম ভয় না পেলে শম্বর সাধারনত ডাকে না, তাহলে শুধু শুধু ডাকল কেন? কিছু দেখেছে? নাকি কোন গন্ধ পেয়েছে? এবারে আমার সামনে দিয়ে তিনটে শম্বরকে দৌড়ে পালাতে দেখলাম। জানি না দৌড়নোর কোন কারণ হয়েছে কি না? আবার সব চুপচাপ, কোন শব্দ নেই চারপাশে, একটা পাখির আওয়াজও নেই, আকাশে লাল একটা আভা, দশ মিটার দূরে গাছের পাতা গুলো কেমন যেন ঝিরঝির করে নড়ছে। আরো মিনিট পনের হয়তো আমি অপেক্ষা করব, খুব বেশী হলে মিনিট কুড়ি। তার বেশী হলে জীপ টা চলে যাবে। আমার মন ক্রমে অস্থির হয়ে উঠছে, ঘড়িতে এখন প্রায় ছটা দশ, এবারে হঠাৎ আমার নাকে একটা তীব্র ওডিকলোনের গন্ধ এল, এ গন্ধ আমার খুব চেনা, আমার নাকে যেন লেগে আছে। সে গন্ধ আস্তে আস্তে আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, মনে পড়ল ডঃ মৌলিক বলেছিলেন সে যত বড় হবে তত ভয়ঙ্কর হবে, কিন্তু এখন আমার আর ভয় করছে না। আমার শরীরের প্রতিটা রোমকূপে আমি ওর অস্তিত্ব উপলব্ধি করছি। আমি জানি আমার শরীরের গন্ধ সে পেয়েছে, বুঝতে পারছি সেই রাজকীয় চালে ধীর গতিতে সে আসছে। অধীর আগ্রহে আমি সামনের দিকে তাকিয়ে আছি, কখন সামনের ঝোপটা নড়ে উঠবে।



কবিগুরুর পদ্যের চার পঙক্তি, জয় অ্যাডামসনের ‘বর্ণ ফ্রি’ আর সত্যজিৎ রায়ের ‘বৃহচ্চঞ্চু’ ছাড়া বাকিটা পুরোটাই কাল্পনিক। আর একটা কথা, যারা যুক্তি দিয়ে সব কিছু কে বিশ্লেষণ করে তারপর বিশ্বাস করেন তাঁদের জন্য আমার এই কাহিনী নয়। এই গল্প আমার মত কিছু অপরিণত মানুষের জন্য যারা কল্পনার পাখায় ভর করে আকাশ ছুঁতে চায়।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮