• শ্রাবস্তী সেন

গল্প - জন্মদিন

আজ সকাল থেকে পরপর ফোন এসেই চলেছে।এই নিয়ে চারবার হল।সকালে প্রথম ফোন এসেছিল মেয়ে রঞ্জু বা রঞ্জনার।তারপর এক এক করে ছেলে দীপ্ত,নাতনি মৌটুসি ও নাতি অনিকেত ও ফোন করেছিল।সবাই ওনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও প্রণাম জানিয়েছে। হ্যাঁ আজ অনাদিবাবুর সাতাত্তর তম জন্মদিন।তাই সকালে কলকাতা থেকে মেয়ে রঞ্জু প্রথম ফোন করে তাকে অভিনন্দন জানায়।একই ফোনে জামাই তমাল ও ওদের ছোট মেয়ে মৌ ও তাকে প্রণাম জানায়।তার ছেলে দীপ্ত ফোন করে মুম্বাই থেকে।বউমা অদিতিও কথা বলে।এরপর বড় নাতনি মানে রঞ্জুর মেয়ে ফোন করে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে।আর সবশেষে নাতি অনিকেতের পালা।আমেরিকা থেকে ফোন করে দাদুর কুশল সংবাদ নেয় ও শুভেচ্ছা জানায়।অন্যদিন যে টেলিফোনটা নিস্তব্ধ হয়ে পরে থাকে আজ সে বড়ই মুখর। আর তাই প্রাত্যহিক রুটিনে ও বারবার ছেদ পড়ছে অনাদিবাবুর। না হলে এইসময়টা রোজ বারান্দায় বসে কাগজ পরেই কাটিয়ে দেন। অনাদিবাবু কোনও বিখ্যাত লোক নন।পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামের মতই এক গ্রাম বিরপুর এ ওনার বাড়ি। পৈত্রিক সূত্রে কিছু জমিজায়গা আছে,তার চাষবাস দেখে, পুকুরে মাছের চাষ করে বেশ সচ্ছল ভাবেই তার দিন কাটে। একসময় তাঁরা ছিলেন এই গ্রামের মাথা। তাঁর বাবা বিপ্রদাসবাবুকে এই অঞ্চলে বেশ সম্পন্ন লোক বলেই গণ্য করা হত। আজও সেই পরম্পরা কিছুটা হলেও বজায় রয়েছে।


সাতাত্তর বছর কিছু কম দিন নয়।এই বাড়িতেই তাঁর জন্ম।গোয়াল ঘরের থেকে একটু দূরেই একটা ছোট্ট মতন ঘর ছিল।সেটাই ছিল বাড়ির আঁতুড়ঘর। বাড়িতে যখন যার বাচ্চা হয়েছে সবাই ওই ঘরেই সন্তান প্রসব করেছে।অনাদিবাবুরা পাঁচ ভাইবোনেরা ওই ঘরেই জন্মেছেন।ঘরটা আজ আর নেই। সংস্কারের অভাবে অনেকদিন আগেই ভেঙে গেছে।আর বহুদিন হল বাড়িতে প্রসব করার রীতিও উঠে গেছে।অনাদিবাবুর দুই ছেলেমেয়েই তো জন্ম নিয়েছে জেলা সদর হসপিটালে।


আজ সকালে উঠেই লাবণ্য মানে অনাদিবাবুর স্ত্রী বাড়ির কাজের মেয়ে মিনুকে নিয়ে গেছে কাছের কালী মন্দিরে পুজো দিতে।সকাল থেকে উপোষ করে স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য দরবার করতে গেছে ভগবানের কাছে।বাতের ব্যথায় ন্যুব্জ শরীরটাকে টেনে নিয়ে তিনি বছরের কটা দিন যাবেনই মন্দিরে ধর্না দিতে। ডাক্তারের হাজার বিধি নিষেধের কোনও তোয়াক্কা না করে এই বিশেষ কটা দিন যেমন তাঁর স্বামী, সন্তানদের জন্মদিন, সমস্ত রকম ষষ্টি ,বার ব্রত ইত্যাদির দিনে।আগে আগে অনাদিবাবু অনেক রাগারাগি করেছেন ,কিন্তু কোনো লাভই হয়নি। লাবণ্যকে তার জায়গা থেকে একচুল ও সরানো যায়নি। এই পুজো সেরে স্বামীকে প্রসাদ খাইয়ে তবে তিনি জলগ্রহণ করবেন।


আজকাল অনাদিবাবুর অনেক অবসর সময়।আর বসে থাকলেই সমস্ত পুরনো কথাগুলো বায়স্কোপের মতন চোখের সামনে ভেসে উঠে । ওনাদের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে । পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ওনার দিদি শৈলজা সবার বড়। তারপর অনাদিবাবু,মেজভাই অতিন্দ্র,ছোটভাই রনেন্দ্র ও সবশেষে বোন হৈমবতী। তখন তো গ্রামে ইলেকট্রিক ছিলনা। সন্ধ্যে বেলা হ্যারিকেনের আলোতে বসে দুলে দুলে পড়া করতেন পাঁচজনে মিলে।গ্রামের যে স্কুল ছিল সেখানে পঞ্চম শ্রেণী অবধি ছেলেও মেয়েরা উভয়েই পড়তো। মেয়েরা পড়তো সকালের শিফটে ও ছেলেরা দুপুরে। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণীর পরে ছেলেদের যেতে হত এখান থেকে দু কিলোমিটার দূরে। আর মেয়েদের কোনও স্কুল ছিলোনা । তাই পঞ্চম শ্রেণীর পরে দিদি ও বোন দুজনেরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় । দিদি পড়াশোনায় বেশ মেধাবী ছিল, বিশেষ করে অঙ্কে বেশ ভাল ছিল। কিন্তু স্কুলের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আর তারপর মাত্র পনেরো বছর বয়েসে দিদির বিয়ে হয়ে যায়। জামাইবাবু ছিলেন রেল কর্মচারী, কলকাতায় নিজেদের বাড়ি ছিল।সেই প্রথম অনাদিবাবুদের তিন ভাইয়ের কলকাতা যাওয়া । ট্রেন থেকে নেমে জীবনে প্রথম বার হাওড়া ব্রিজ দেখে অবাক হয়ে গেছিলেন ওনারা তিনজনেই। মনে পরে কলকাতা থেকে ফেরার পরে রনেন্দ্র তার বন্ধুদের কাছে হাওড়া ব্রিজ, কালীঘাট মন্দিরের কথা বলত আর বন্ধুরা সবাই অবাক হয়ে শুনত ।


এর বছর দুয়েক পরে ছোটবোনেরও কলকাতায় বিয়ে হল। অনাদি নিজেও স্কুল শেষ করে পড়তে চলে গেলেন কলকাতায়। পরে বাকি দুই ভাইও তাই করলো। গ্রামে তখনও ইলেকট্রিক আসেনি, মেঠো রাস্তা , বর্ষায় এক হাঁটু করে কাদা ভেঙ্গে চলাফেরা করতে হত। তবুও গ্রামের লোকজনদের জীবনে এক অনাবিল শান্তি ছিল।


কলেজের পড়া শেষ করে অনাদি ঠিক করেন শহরেই কোনও চাকরি করবেন। কিন্তু বাবার আদেশে সব ছেড়ে বাড়ি ফিরে আস্তে হয়। বাড়ির বড় ছেলে সে বিষয় আশয় থেকে দূরে সরে থাকবে কি করে ? তাই ফিরে এসে বাবার কাছ থেকে শিখে নিতে হয় চাষের খুঁটিনাটি ।কোন ফসল কোন সময়ে ফলানো দরকার ,কোন ফসল কতটা লাভজনক, কি ধরনের সার মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করবে ইত্যাদি অনেক বিষয়ে বিশদে জানতে হয়। অবশ্য গ্রামের ছেলে হওয়ার দরুন কিছু জিনিষ ছোট থেকে দেখে দেখেও শিখে গেছিলেন।তবু কয়েক বছরের মধ্যে তিনি এই বিশয়ে যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে উঠলেন। অনাদির পরে তার দুই ভাই অতিন্দ্র ও রনেন্দ্র ও কলকাতাতে পড়াশোনা করতে যায়। পরে অতিন্দ্র কলকাতায় ও রনেন্দ্র দুর্গাপুরে চাকরি নিয়ে থেকে যায় । বাকি দুই ছেলে গ্রামে না ফেরায় বোধহয় কিছুটা বিচলিত হয়ে পরেন বিপ্রদাসবাবু।তিনি অনাদিকে এবার সংসারের বাঁধনে বাঁধতে চান।


শুরু হয় বাড়িতে ঘটকদের আনাগোনা। এভাবেই লাবণ্যর খবর আসে । তখনকার দিনে পাত্র- পাত্রীর দেখা হত একেবারে ছাদনাতলায় গিয়ে।অনাদির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। দু বাড়ির গুরুজনেরা মিলে সব কিছু ঠিক করে পাত্র – পাত্রী দুজনকে জানিয়ে দেয় এই তারিখে তোমার বিয়ে।তাই হয়ও। তবু বয়সটা ছিল অল্প , মনের মধ্যে ছিল অনেক রঙিন স্বপ্নের ঘোর। বিয়ের ঠিক হওয়ার পর থেকে শুভদৃষ্টির ছবি দেখেছেন,কিন্তু বাস্তবে যখন সেই সময়টা এলো গুরুজনদের তীক্ষ্ণ নজর, বন্ধুদের হাসি ঠাট্টার ফাঁকে এক পলকের বেশি তাকাতেই পারেননি সেই চোখের দিকে। চুপচাপ মাথা নিচু করে পালন করে গেছেন বিয়ের সমস্ত আচার অনুষ্ঠান।


কিন্তু বিয়ের পরে ঠিক কতটা সময় তারা দুজনে দুজনকে দিতে পেরেছেন?এখন তো সবাই বিয়ের পরে মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে দূরে কোথাও যায়। কিন্তু অনাদিদের সময় সে সব কেউ ভাবতেও পারতোনা। বিয়ের পরে একবার লাবণ্যকে নিয়ে কলকাতায় দিদির বাড়িতে গেছিলেন। সেখান থেকে দুজন মিলে কালীঘাটে গিয়ে পুজো দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তো আবার সেই একই জীবন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে অনাদি চলে যেতেন মাঠে চাষের তদারকি করতে, মাঝে একবার বাড়ি আসতেন সকালের জলখাবার খেয়ে আবার শুরু হয়ে যেতো দৈনন্দিন কাজকর্ম। আর লাবণ্য সে তো একগলা ঘোমটা টেনে সকাল থেকে শাশুড়ি,খুড়শাশুড়িদের সঙ্গে হেঁসেলে ব্যস্ত।তখন বাড়িতে লোকজনও প্রচুর ছিল। আত্মীয়- পরিজন, আশ্রিত মিলিয়ে দুবেলা প্রায় পঞ্চাশ জনের পাত পরত। দুপুরে অনাদি যখন খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিতো, তখনও লাবণ্যকে কোনোদিন ঘরে আসতে দেখেননি। সে তখন থাকত ননদ, জা দের সঙ্গে সেলাই – ফোড়াই নিয়ে ব্যস্ত। তাই নিজেদের জন্য সময় তাঁরা জীবনে খুব কম পেয়েছেন। এরপর একে একে রঞ্জু এলো , তারপর দীপ্ত। বছরগুলো যে কোথা দিয়ে কেটে গেলো বোঝাই গেলনা।


এই বাড়িটাও কত বদলে গেল, যে বাড়ি একসময় লোকজন, আত্মীয় কুটুম্বে গমগম করতো, আজ তা যেন ভয়ঙ্কর রকমের খালি। তিনি আর লাবণ্য , এই দুই প্রাণী যেন এই এত বড় বাড়ি আগলে বসে আছেন। দোতলার ঘর গুলো তো বন্ধই পরে থাকে। ছেলেমেয়েরা না এলে ঘরগুলো বেশি খোলাই হয়না। লাবণ্যর বাতের ব্যথার জন্য সিঁড়িভাঙ্গা তার পক্ষে অসম্ভব। তাই ওনারা দুজনে এখন এক তলার একটা ঘরেই থাকেন।


অথচ একসময় বাড়িতে দুর্গাপূজা হত। অনাদির মনে পরে পুজোর কতদিন আগে থেকেই কত প্রস্তুতি আরম্ভ হয়ে যেতো। প্রথমে সব বাড়ির লোকজন, আত্মীয়- স্বজন, এমনকি বাড়ির প্রত্যেকটা কাজের লোকের জন্য নতুন কাপড় কেনা হত। লাবণ্যরও তখন দম ফেলার ফুরসৎ থাকতো না। পুজোর সময় বাড়িতে লোকজন আসবে, তাদের জন্য বাড়িতে বড়ি, আচার, ইত্যাদি তৈরি করা, নাড়ু তৈরি করে যত্ন করে তুলে রাখা,সব সে হাসিমুখে করে যেতো। অসম্ভব খাটিয়ে ছিল। পুজোর কদিন আগে থেকে ভাই বোনেরা তাদের পরিবার নিয়ে আস্তে শুরু করতো। এছাড়াও ছিল কাছের ও দুরের বেশ কিছু আত্মীয়স্বজন। সারা বাড়ি যেন লোকে লোকারণ্য। অত লোকের খাওয়াদাওয়া, শোয়ার ব্যবস্থা করাও বিশাল ব্যাপার। মহিলারা ও বাচ্চারা সবাই ঘরে শুলেও , পুরুষরা রাতে শতরঞ্চি পেতে ছাদে ঘুমতেন। এখন সে সব গল্প কথা বলে মনে হয়। দুর্গাপূজার কয়েকমাস আগে থেকেই জেলেদের বলে রাখতেন পুকুরের মাছ বড় হতে দিতে। পুজোর সময় বাড়িতে জামাইরা আসবে,অনেক কুটুম্বও আসবে, তখন বড় মাছের দরকার। এখনকার লোকজন এমনকি অনাদির নাতিরা তো মাছ দেখলেই নাক সিটকোয়। আর তখন বাড়ির কোন জামাইয়ের পাতে একটু কম বড় মুড়ো পড়েছে , সেই নিয়ে তুলকালাম লাগতো।


মাছের কথায় মনে পড়লো। সেবার রঞ্জুর বিয়ে। কলকাতা থেকে বরযাত্রী আসবে। বেশ কয়েক মাস আগে থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিয়ের দিন সন্ধেবেলা পাড়ার কেউ মন্তব্য করে যে অনাদিদের পুকুরে মাছের সাইজ বেশি বড় হয়নি। নেমন্তন্ন বাড়িতে সেই কারণে ছোট সাইজের মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে।তখন অনাদির বাবা বিপ্রদাসবাবু বেঁচে এবং কথাটা ওনার কানে যায়। পরের দিন সকালে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি, বিপ্রদাসবাবু চলে যান জেলে ভোলার বাড়িতে। তাকে দিয়ে ভোরবেলা জাল ফেলান পুকুরে। সকালবেলা তখন বাড়িতে চা হচ্ছে,সেইসময় ভোলা বিপ্রদাসবাবুর সঙ্গে এসে দু-ঝুরি মাছ নামায়। যেখানে আগের দিনের সব মাছ ওঠেনি, সেখানে আবার দু-ঝুরি মাছ। তখন গ্রামেতে ফ্রিজ কোথায়? সেই মাছ কেটে, ভেজে, সব আত্মীয় স্বজন যারা সেদিন ফিরে যাবে , সবাইকে বেঁধে দিতে হয়। মনে আছে লাবণ্য একবার রঞ্জুর দুই মেয়েকে বসিয়ে এই ঘটনাটা গল্প করেছিল। প্রথমে তো দুই বোন চোখ গোল গোল করে পুরো ঘটনাটা শুনল, তারপর তাদের হাসি আর থামানোই যায়না।


সময় তার আপন নিয়মে চলে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কিছু সময়। সময়ের করাল গ্রাসের হাত থেকে কেউই বাঁচতে পারে না। অনাদিও তার ব্যতিক্রম নয়। খুব অল্প বয়সেই করাল ক্যানসারে জীবনের মায়া কাটিয়ে চলে যায় তাঁদের ছোটবোন হৈমবতী। অনাদিবাবুর বাবা,মা দুজনেই তখন বেঁচে রয়েছেন। এই সন্তান শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি বিপ্রদাসবাবু। তারপরই তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, এবং এক বছরের মধ্যে মারাও যান। বাবা মারা যাওয়ার পরে আর তিন বছর মা বেঁচে ছিলেন। তারপর তিনিও মারা যান। এরপর থেকেই বাড়ি ফাঁকা হতে থাকে।তার ছেলে দীপ্ত কলকাতায় শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তে চলে যায়। সেখান থেকে পাশ করে চাকরি করতে চলে যায় মুম্বাইতে এক বহুজাতিক কোম্পানিতে। মেয়ে রঞ্জুর তো আগেই বিয়ে হয়ে গেছিল। দুবছর আগে সেই মারণ রোগ ক্যান্সার আবার থাবা বসায় ওনাদের পরিবারে। এবার চলে যায় তাঁর ছোটভাই রনেন্দ্র। রনেন্দ্রর পরিবার দুর্গাপুরেই বসবাস করে। গ্রামের বাড়ির প্রতি কোন টান তাদের নেই। মেজভাই অতিন্দ্র প্রায় এক বছর ধরে শয্যাশায়ী। সেরিব্রাল স্ট্রোকে শরীরের একদিকটা পক্ষাঘাত হয়ে গেছে। দিদি শৈলজা এখনও আছেন, তবে তিনিও বাতের ব্যথায় কাবু।অনাদি বুঝতে পারেন এই জীবনে আর কখনও তাদের ভাইবোনদের দেখা হবে না। ওই ফোনের ওপারে গলার স্বর শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।


লাবণ্য এতক্ষণে ফিরেছে মন্দির থেকে। বাড়ি ঢুকে আগে তাঁকে প্রসাদ দিয়ে গেল। এখন রান্নার লোককে গিয়ে বকাবকি শুরু করেছে। আজকাল লাবণ্য ভীষণ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। একটুতেই ভীষণ রেগে যায়, সারাক্ষণ কাজের লোকদের বকাবকি করে। অনাদি এর আগে কয়েকবার বারণ করেছেন,কিন্তু তাতে ফল বিপরীত হয়েছে। নয় ওনার ওপর রেগে গেছে,অথবা অভিমানে কথা বন্ধ করেছে। আসলে লাবণ্য এখন একটা নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে। ওনাদের দুজনেরই বয়স হচ্ছে,কাউকে তো আগে যেতেই হবে।লাবণ্য সেই আশঙ্কাতে তটস্থ হয়ে থাকে। তার চিন্তা হয়, অনাদি যদি আগে চলে যান, তাহলে সে না পারবে এই এত বড় বাড়িতে একা থাকতে,না পারবে ছেলে মেয়েদের কাছে গিয়ে মানিয়ে থাকতে। জীবনের বেশির ভাগ সময়টা যার এই বাড়িতে কেটে গেছে,তার পক্ষে এখন অন্য কোথাও গিয়ে থাকা অসম্ভব। আবার যদি লাবণ্য আগে চলে জায়,অনাদির কি হবে? তার দেখাশোনা কে করবে?তার কখন কি দরকার,তাঁর ভালোলাগা, মন্দ লাগা লাবণ্যর চেয়ে বেশি আর কে জানে?


এক জীবনে জন্মদিনের অনেক রূপ দেখছেন তিনি।ছোটবেলায় জন্মদিনের দিন সকালে স্নান করে নতুন জামা পরে ঠাকুর প্রণাম করতেন।তারপর মায়ের হাতের পায়েস,সে ছিল জন্মদিনের এক বড় উপহার।তারপর যখন কলেজে পরেন তখন জন্মদিন ছিল অন্যরকম। সেদিন বন্ধুদেরকে নিয়ে কোনও বাংলা সিনেমা দেখতে যেতেন। পরবর্তী কালে জন্মদিন ছিল নিছক একটা অভ্যাসের ব্যাপার।বছরের ওই একটা দিন সবাই তাঁকে যেন একটু বেশী সমাদর করতো, ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া হতো এই অবধি। আর এখন বার্দ্ধক্যে এসে জন্মদিন এক নতুন শঙ্কা নিয়ে আসে। এই কি শেষ? না পরের বছর এই দিনটা তাঁর জীবনে আবার আসবে? যদি আসেও এই একটা বছর ভালোভাবে যাবে তো? অন্তত এই এক বছরে আবার কোন ও প্রিয়জনের বিয়োগ যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে না তো? অনিশ্চয়তার এই জীবন শুধু যে তাঁর একার তা নয়। তাঁর সমসাময়িক সবাই এইভাবেই জীবনযাপন করেন।শুধু তার মধ্যে যেটুকু ভালো খবর পান, সেগুলোকে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। আর তাই ভগবানের কাছে একটাই প্রার্থনা, পরের বছর যদি এই দিনটা ফিরে আসে তাঁর জীবনে, যেন তিনি ভালভাবেই গ্রহণ করতে পারেন, কোনোরকম ভাবে ভারাক্রান্ত মনে যেন গ্রহণ করতে না হয় দিনটাকে।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮