• প্রদোষপ্রদীপ

গল্প - ভি .আই .পি

ভবানী -ভবনে আমার অফিস। অডিট -এর কাজ- কম্ম হয়। বছরের এই সময়টা কাজের খুব চাপ থাকে। বাড়ী ফিরতে রোজ দেরী হচ্ছে। আজ তো আরো দেরী হয়ে গেল। বাড়ীতে লোক বলতে দুজন ,আমি আর আমার বিধবা মা। আমি না আসা অবধি মা কিছুতেই রাতের খাওয়া খাবে না। মা সুগারের রোগী, সময় -মত ইনসুলিন নিতে হয়। কতবার বলেছি , আমার জন্য অপেক্ষা না করতে। কিন্তু, মা সেকথা শোনে না। বাসের জন্য আজ আমার দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। কপাল গুনে ট্যাক্সি পেলাম,সে ব্যাটা যেতে রাজী- ও হলো। পিছনের সীটে আরাম করে হেলান দিয়ে বসলাম। একটু পরে, একটা জিনিসের দিকে নজর গেল। আমার সামনে তো ড্রাইভার -এর সিটের পিছন দিকটা। সেখানে ট্যাক্সির নম্বর লেখা মত করে লেখা আছে , BOM 8875275288 মহ: রশিদ।তার নীচে লেখা,মহ: জলিল / কলকাতা। অদ্ভুত লাগলো , ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাগজ বের করে জিনিসটা টুকে নিলাম। ততোক্ষণে বাড়ী পৌঁছেছি। ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেলাম।


পরদিন আবার অফিস- আজ কাজ বেশ কম। টিফিনের অপেক্ষায় বসে বসে বোর হচ্ছি। তখন-ই আমার কালকের চিরকুট -টার কথা মনে এলো। ব্যাগ থেকে সেটা বার করে দেখতে দেখতে ভাবলাম, এটা বোম্বে বা মুম্বাই-নিবাসী, রশিদ নামে কোন লোকের মোবাইল -এর নম্বর নাকি ? কালকের ওই ট্যাক্সি -ওলার কেউ হবে বোধ হয়। খানিক-টা মজার ছলেই , নিজের ফোন না বের কোরে , অফিসের ল্যান্ড -ফোন থেকেই নম্বর টিপলাম। ওপার থেকে রিং হবার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, দম বন্ধ করে আছি। এবার ভারী গলায় জিজ্ঞাসা -- কৌন ? আমি বললাম, রশিদ -ভাই- কেয়া ? ম্যায় জলিল বোল রহা হু। আবার শুনলাম, ইয়ে কৌনসা নাম্বার সে বাত কর রহে হো ? অউর, বাত করনে কা ভি হায় কেয়া ? সব - হি তো ঠিক কর রাখা -তেরা কাম হ্যায় সির্ফ জেল গেট পর সূরজ যো হ্যায়, উসে বোল দেনা , কাল সুবে দশ বাজনে পর । ইতনা নহি কিয়া যা সকতা ? তেরা ফোন-কা চক্কর ভি মুঝে … আমি তাড়াতাড়ি ম্যানেজ দিলাম, মেরা মোবাইল কা সিম-কার্ড আচানক লক হো যানে সে, বুথ মে আনা পড়া। লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো, জরুরত কে টাইম যিতনা ঘাপলা ,ইশি লিয়ে হামারা মকসদ পুরি নেই হোতে , তারপর একটা গালাগাল দিয়ে ফোন কেটে দিলো।


বসে বসে ঘেমে উঠলাম , মাথায় কিছু আসছে না তারপর বেরিয়ে পড়লাম। পাশেই থানা -ওখানকার

মেজোবাবু এবং দু-এক জন ডিউটি -অফিসার আমার চেনা। ওনাদের সাথে থানা-র ক্যান্টিনে আমি রোজ খাই। মেজবাবু-কে পেয়ে আড়ালে সব বললাম। উনি চোখ কপালে তুলে বললেন, আপনারা জানেন না ,কাল রাজ্যপাল জেল ভিজিটে আসছেন ,সঙ্গে কিছু বিদেশী অফিসার থাকছেন। হাই লেভেলের সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হচ্ছে , বড়বাবু তো ওই কারণেই লালবাজার গেছেন। গেটে খুব বিশ্বাসী সেনট্রী রাখা হবে। সুরজ ছেলেটার রেকর্ড ভালো, তাই ওকে অ্যাপয়েন্ট করা। কিন্তু, ও তো দেখছি, পারচেসড ! এদের হাত কোথায় না পৌঁছেছে। যাই হোক , আপনি দারুণ খবরটা দিলেন। আমি এখনি লালবাজারে লগ- ম্যাসেজ পাঠাচ্ছি। তবে, একটা অনুরোধ করছি, এতটাই যখন করলেন,তখন কাজ-টা পুরো করুন। সুরজ-কে আজ বিকালে ও কাল সকালে জেল মেন গেটে ডিউটি দেয়া আছে- আপনি আজ বাড়ী যাবার সময় ,ওকে এই খাম দিয়ে চলে যান। এই বলে উনি একটা সাদা কাগজে, কাল সুবে দশ বাজনে পর -কথা টা লিখে,একটা সাধারণ খামে ভরে আটকিয়ে আমাকে দিয়ে দিলেন। বিকালে, ছুটির পর অফিস থেকে বেরোলাম খাম-টা নিয়ে।জেল গেট খুব কাছে হেঁটে যাবো। একটু ভয় -ভয় করলেও ,মনে অদ্ভুত আত্মপ্রসাদ পাচ্ছি।ছোটবেলায় মাস্টার-দার কাহিনী পড়েছি। বড় হয়ে আর্মি-তে জয়েন করতে গিয়ে আটকে গেলাম, হাঁটু -দুটোর মধ্যে ফাঁক বেশি ! আজ যদি আমি দেশের কোনো কাজে লাগতে পারি তো, কিসী সে কুছ পরোয়া নেই, বন্দে মাতরম। গেটে পৌঁছে নাম জেনে সুরজ কে খাম-টা দিয়ে বললাম , জলিল নহি আ সকা, রশিদ-ভাই ইয়ে লেকে হামে ভেজ দিয়ে হ্যায়। তারপর, চলে এসে বাড়ীর পথ ধরলাম।


পরদিন আবার অফিসের জন্য বেরোলাম , সামান্য আগেই বেরিয়েছি। আবার কোথায় কর্ডন করবে, রাস্তা জ্যাম হবে.. আচ্ছা, কিভাবে জিনিষ -টা ম্যানেজ হবে ? ওরা কি ঠিক ওই সময় বোম -টোম মারবে ভিআইপি -দের ? ভাবে ভাবতে অফিসের কাছে পৌঁছে গেলাম। ঘড়ি দেখলাম , দশ-টা বেজে দশ। মেজবাবু-কে দেখতে পেলাম। উনি আমাকে দেখে এগিয়ে এসে হ্যান্ডসেক করে বললেন , কনগ্রাটস। আমি বললাম, ওযেলকাম। কিন্তু, এত ফাঁকা ,ফাঁকা কেন ? মেজবাবু বললেন , আমরা এখন রিল্যাক্স করছি। আজ সকালে আট -টা নাগাদ রাজ্যপাল জেল ভিজিট করে বেরিয়ে গেছেন। কাল অনেক রাতে টাইমিং পাল্টে যাবার ম্যাসেজ এসেছে। আফটার অল , ভিআইপি ইজ ভিআইপি- কি বলেন !


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮