• শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রচ্ছদ কাহিনী - কল্পবিজ্ঞান কি সাহিত্য?

বিষয়বস্তুর নির্মাণে দুটো আবশ্যক প্রশ্ন উঠছে। সাহিত্য কি আর কল্পবিজ্ঞান কি? সাহিত্য আর কল্পবিজ্ঞানের কি দুটি সমান্তরাল রেখা নাকি সময়ের সঙ্গে কোন একবিন্দুতে মিলিত হবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে? দুইয়ের এই বিভাজন কি সাহিত্যিকরা তৈরি করেছেন? সব উত্তর দেওয়ার দায়ভার নেই আমার, পলেমিকের উত্থাপন করাই মূল লক্ষ্য।


সাহিত্যের কি কোন সংজ্ঞা হয়? সহিতের সঙ্গে ষ্ণ প্রত্যয় যোগে হয় সাহিত্য, জানাচ্ছেন সংস্কৃত পণ্ডিতরা। কিন্তু এ তো শুধু ব্যাকরণের বিদ্যা। সাহিত্য বলতে আমরা বুঝি যা আমাদের মানসিক বিকাশ ঘটায়, যা আমাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে, আমাদের মনন, ধীকে বিকশিত করে তোলে, এবং সাহিত্য সম্পূর্ণ আপেক্ষিক। কার চিন্তা কোন বই বা লেখক প্রভাবিত করবে, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। সাহিত্য হল লেখক এবং পাঠকের একাত্মতা- “ একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুইজনে”। এবারে উপরোক্ত আলোচনায় সাহিত্যের বদলে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য বসিয়ে দিলে কোনরকম অসুবিধে হবে না। সাহিত্য সম্বন্ধে প্রতিটি কথাই কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য সম্বন্ধে প্রযোজ্য। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী গ্রেগরি বেন ফোরড সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন কল্পবিজ্ঞানকে-তিনি বলেন যে সাহিত্য এই পৃথিবীতে মানুষের জীবনকে প্রতিফলিত করে আর কল্পবিজ্ঞান এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রেক্ষিতে মানুষের জীবনকে ব্যক্ত করে। অবশ্য সব কল্পবিজ্ঞানই কি সাহিত্য? এ ব্যাপারে অবতারণা করবো কল্পবিজ্ঞান লেখক থিওডোর স্টারজনের সূত্রের। স্টারজন নাটকীয়ভাবে একটি সহজ সরল সাদাসিধে কথাকে নিউটনের সূত্রের মতো একটি সূত্রের রূপ দিয়েছেন- “ ৯০% কল্পবিজ্ঞান একবারে ফালতু(crap)। কিন্তু সবকিছুর ৯০%ই তো ফালতু।” এ কথা কে জানে না? অর্থনীতিতে যেমন প্যারেটোর ল তো সবাই জানে! কিন্তু স্টারজনসাহেব এই মহান সূত্রে নিজের রাবারস্ট্যাম্প মেরে দিয়েছেন!


কল্পবিজ্ঞানের প্রথম পরিচয় আমরা পাই খৃস্টের জন্মের প্রায় চারশো বছর আগে। অ্যারিস্টোফিনিস কিছু কল্পবিজ্ঞান-নির্ভর নাটক লেখেন, সেখান থেকে এইচ জি ওয়েলস, জুল ভেরন পেরিয়ে আমরা পাই অ্যাসিমভ, আরথার সি ক্লার্ক থেকে একেবারে আধুনিক যুগে ইয়ান ব্যাঙ্কসকে। ১৯৫৩ সালে আসিমভ লিখছেন মডার্ন সায়েন্স ফিকশন বইয়ে “Science fiction is that branch of literature which is concerned with impact of scientific advances upon human beings” । ১৯৭০ সালে সেখান থেকে আমরা পাচ্ছি পামেলা সার্জেন্টের প্রশ্ন “ what isf there is a world existed in which this or that were true?” এইখানেই কল্পবিজ্ঞানের সাফল্য, যে এই চিরন্তন প্রশ্ন মানুষকে করতে শিখিয়েছে।


কল্পবিজ্ঞান সম্বন্ধে এক অদ্ভুত উন্নাসিকতা আছে সাহিত্যবোদ্ধাদের। যেন কল্পবিজ্ঞান ধ্রুপদী সাহিত্যের অন্তর্গত নয়। গোয়েন্দা গল্প সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য ছিল কিছুদিন আগে পর্যন্ত, এখন অবশ্য আর তা বলা যায় না- উমবারতো একো বা ওরহান পামুক যখন গোয়েন্দা গল্প লিখে ফেলেন, তখন সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে ফেলা ছাড়া কোন উপায় থাকে না।

এইচ জি ওয়েলস বা জুল ভেরন এর কথাই ধরা যাক। বাংলায় এমন কোন সাহিত্যিকের কথা মনে করতে পারছি না যিনি শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান নিয়েই বিখ্যাত হয়েছেন- তাই অগত্যা বিদেশি সাহিত্যিকদের নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে।


গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখক জুলিয়েট ম্যাকেনা লেখেন “Speculative fiction’s unifying identifying characteristic is that it does not attempt to mimic real life is a way that literary fiction does.”

Genre বা ঘরানার প্রশ্ন কিন্তু তোলেন প্রকাশকরা- লেখকরা নন। সুতরাং উন্নাসিকতার কোন কারণ দেখতে পাই না। কোন অজ্ঞাত কারণে বিখ্যাত পুরস্কার- নোবেল বা বুকার এর ইতিহাসে কিন্তু উপেক্ষিতই থেকেছেন আরথার সি ক্লার্ক, আইজ্যাক অ্যাসিমভ বা ইয়ান ব্যাঙ্কসরা। বাংলা বা ভারতীয় পুরস্কারও অধরা থেকেছে কল্পবিজ্ঞানের লেখকদের।


পুরস্কারের আর্থিক মূল্য বাদ দিলেও বহু পাঠক আগ্রহী হন পড়তে- সেখানেই পুরস্কারের গুরুত্ব। সমালোচকরা পালন করেন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁরা কিন্তু পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেন লেখকদের। কিন্তু তাঁরাও অবজ্ঞা করেছেন কল্পবিজ্ঞানকে। কিন্তু শুধু পুরস্কার কোন সাহিত্যের শেষ কথা হতে পারে না। শেষ কথা অবশ্য পাঠক। কল্পবিজ্ঞানের এক নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠী আছে। যদি সাহিত্য কালোত্তীর্ণ হয়, তাহলে পাঠক পড়বেনই। যেমন সত্যজিৎ রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র বা জুল ভেরন এর লেখা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যেই বাঁধা থাকে না।

আগেই বলেছি পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। এবারে কাজুও ইসিগুরোর নোবেল প্রাইজ কিন্তু সেরকমই ইঙ্গিত করছে। তাঁর লেখায় কল্পবিজ্ঞানের প্রভাব অনস্বীকার্য। যদিও তিনি নিজেকে এই ঘরানার লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে একেবারেই নারাজ। কিন্তু সমালোচকরা তাঁর ‘নেভার লেট মি গো’ বা ‘বেরিড জায়ান্ট’ কে কল্পবিজ্ঞানের বই বলেই অভিহিত করেন।


কল্পবিজ্ঞানের কিন্তু একটা ‘Point of reference’ আছে আর সেই ‘Point of reference’ টা সততপরিবর্তনশীল। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে যেমন আরথার সি ক্লার্ক বা আইজ্যাক অ্যাসিমভ নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, প্রবল জনপ্রিয় হওয়া স্বত্বেও সবার কাছে সমান আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি, এখন কিন্তু কাজুও ইসিগুরো, নীল গেইম্যান এর কারণে কল্পবিজ্ঞান মূল স্রোতে পরিগণিত হচ্ছে।


কোন সৃষ্টিশীল রচনাকেই বেশিদিন দুরে সরিয়ে রাখা যায় না। সাহিত্যগুনে সমৃদ্ধ লেখা পাঠক পড়বেনই। কল্পবিজ্ঞান যে কতোখানি আকর্ষণীয় হতে পারে জুল ভেরন বা আরথার কোনান ডয়েল দেখিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। বাংলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর কথায় আসি। সুনীলের নীলমানুষ, শীর্ষেন্দুর অনেকগুলো কল্পবিজ্ঞান গল্প আর সত্যজিৎ রায়ের অনবদ্য কিছু ছোটগল্প আর প্রফেসর শঙ্কুর নানা কল্পবিজ্ঞান গল্প সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ছোটদের এবং বড়োদের অভিভূত করে রেখেছিল। এখনো সেই গল্পগুলো পড়লে এখনো আমাদের গায়ে কাঁটা দেয়। তফাত যেটা বুঝতে পারি, যে ওই গল্পগুলোতে যে মনস্তাত্বিক জটিলতা আছে, যা ছোটবেলায় ভালো বুঝিনি, এখন সেটা বেশীভালো বুঝতে পারি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ঘনাদার যে কোন গল্প বা সত্যজিৎ রায়ের ‘অনুকূল’ গল্পটি একবার পড়ে দেখবেন- বা বই হাতের কাছে না থাকলে ইউ টিউবে পরমব্রত, সৌরভ শুক্লা অভিনীত স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমাটি দেখবেন- মানুষের হতাশা, ডিস্টোপিয়ার কি নিদারুণ নিদর্শন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প পড়ে অবশ্য হতাশ হয়েছি বেশী- কল্পবিজ্ঞান যে তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্র নয় তা দ্বিতীয় পাঠেই বোঝা যায় অনায়াসে।

বলা কঠিন লেখকের কাছে কোনটা বেশী আকর্ষণীয়- সমালোচকদের প্রশংসা না জনপ্রিয়তা। প্রবল জনপ্রিয়তা আর সার্থক সৃষ্টিশীলতা সমালোচকদের ঢোক গিলতে বাধ্য করবেই- শুধু সময়ের অপেক্ষা।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮