• মমতা দাস

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে - পুণা, যেমন দেখেছি,বুঝেছি- আমার ফিরে দেখা

'এ জন্মের যা কিছু সুন্দর /

স্পর্শ যা করেছে প্রাণ দীর্ঘ যাত্রাপথে /

পূর্ণতার ইঙ্গিত জানায়ে /

বাজে মনে --নহে দূর,নহে বহু দূর!'


রোলটা-য় থাকতেই প্রিয়বন্ধুকে চাকরির অফার দিল পাটনি কম্পিউটার্স। অপছন্দের জায়গা বোম্বেতে থাকতে হবে না। মহারাষ্ট্রের আরেকটা উল্লেখযোগ্য শহরে পোস্টিং, অর্থাৎ পুণা,---- জীবনবইয়ের আরেকটি পাতা। পুণা-য় পৌঁছুলাম ১৯৯৫-এর ৩০ ডিসেম্বর। নূতন শুরু ,দেখা যাক কি রাখা আছে ! পুনায় এর আগে একবার বেড়াতে এসেছিলাম বোম্বেতে থাকতে। জংলী মহারাজ রোডের কাছেপার্ল হোটেলে ছিলাম, বেশ লেগেছিল তখন জায়গাটাকে। বোম্বের অতিব্যস্ত জীবনের চহল-পহলের পর পুণা-র শান্ত সমাহিত উদাসীভাব মন টেনেছিল।


এখন সেই পুণা ডাক পাঠিয়েছে, সে ডাক ফেরাই সাধ্য কি? কিন্তু মেয়ে পড়ে বহরমপুরে। বছরে দু/তিনবার আমাদের কাছে আসে ছুটিতে। পুণা চলে গেলে মেয়েটার অসুবিধা। তখন পুণা-কলকাতা ট্রেন চালু হয় নি। সুরেশ কালিমাডি রেল মিনিস্টার সেবছর-ই দুর্গাপুজোর সময় আমাদের অনুষ্ঠানে আসে, সেখানেই ঘোষণা করল পুণা-র বাঙালিদের জন্য সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের তরফ থেকে শারদীয় উপহার পুণা-হাওড়া আজাদহিন্দ এক্সপ্রেস।পরের বছর নভেম্বর থেকে সেই ট্রেন চালু হয়। তার আগে অব্দি কল্যাণ স্টেশনে নেমে ট্রেন চেঞ্জ করে অথবা গাড়িতে পুণা আসতে হত। পাটনী থেকে আমাদের জন্য বোম্বেতেও একটা ছোট ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, আমরা কোনো কাজে বোম্বে গেলে দু-একদিন থাকতাম সেখানে। আর মেয়েকে আনতে তো যেতেই হত ! মামাশ্বশুরের ঘরের ননদের বিয়েতে গিয়ে শাশুড়িমা কে জোর করে নিয়ে এসেছিলাম পুণা । মা যখন এসেছিলেন তখন বোম্বে ছাড়াও দু-একটা জায়গায় গেছিলাম। শিরডি, সাইঁবাবার মন্দির দেখে মা খুব খুশি। বৃদ্ধ মানুষের খুশির হাসি দেখলে, মনটা কেমন যেন আনন্দে ভরে যায় ! মাকে নিয়ে গেলাম মহাবালেশ্বর,পঞ্চগনি। খান্ডালা-লোনাভালা তো ঘরের কাছে, যখন তখন যেতাম। নিয়ে গেলাম আলন্দি, সন্তজ্ঞানেশ্বরের পদধূলি ধন্য পুণ্যভূমি। পুণা-র ভিতরে দেখার জায়গা অনেক। পুণা জেলা ধরলে তো অসংখ্য। শুধু পুণা শহরেও কম নয়। পুনাঐতিহাসিক শহর, তার নিদর্শন আছে শিবাজীর দুটি দুর্গ শনিবারওয়াডা আর বিশ্রামবাগ ওয়াডা। আছে লক্সমীরোড মার্কেট, সেটা নাকি বাজিরাও-এর সময় থেকেই আছে। রূপ, ঢং বদলিয়েছে, কিন্তু সেই সাবেক ভাবটাও আছে। আছে ক্যাম্প MG রোড পশ মার্কেট এরিয়া, এখানে কাপড়চোপড়,ফার্নিশিং,গিফট আইটেম,খেলনা,বই সব কিছুর দোকান আছে। কাছেই একদিকে পুণার বিখ্যাত কয়ানীবেকারি--কেক, নানখাটাই আর শ্রুজবেরি বিস্কুট এদের বিশেষত্ব। বহুকালের পার্সি দোকান, বংশ পরম্পরায় ব্যবসা চলেছে। অন্যদিকে আছে ফ্যাশন স্ট্রীট। শস্তায় নামি-দামি কোম্পানী-র মত নকল জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমাদের বাড়িথেকে কাছে হত খড়কী বাজার। কাপড় ইত্যাদি তো বটেই, মাছ-সবজি-ফল সেসব-ও পাওয়া যেত।


প্রথমে এসে আমরা উঠেছিলাম বিশ্রান্তওয়াডি বলে একটা জায়গায়,সেটা এয়ার পোর্ট থেকে বেশ কাছে। তার কাছেই বন্ডগার্ডেন পার্ক আর এই পার্কার উল্টোদিকে কোরেগাওঁ পার্ক।এখানেই ওশোর বিখ্যাত আশ্রম। ছেলেকে ভর্তি করা হল আর্মি পাবলিক স্কুলে,ক্লাস নাইনে। সেখানে কিছুদিনের মধ্যেই সে খুব নাম করে ফেলল।লেখাপড়া ছাড়াও কুইজ কম্পিটিশন-এ প্রাইজ ছিল বাঁধা। স্কুলের জন্য জিতে আনত অনেক পুরস্কার,স্কুলের ম্যানেজমেন্ট খুব খুশি। মহারাষ্ট্রে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকা তখন চালু করেছে নিউজ পেপার ইন এডুকেশন(NIE). তাদের কুইজ কম্পিটিশন-এ ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে সে পেল 'স্টুডেন্ট অফ দি ইয়ার' শিরোপা, তার স্কুল এই কম্পিটিশন-এ সেকেন্ড হয়। একদিন আমি কি একটা কাজে স্কুলের অফিসে গেছি, ছেলে তো তার ক্লাসে। কথা বলছি, এমন সময় বেয়ারা এসে বললো প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল আমাকে ডাকছেন। একটু ঘাবড়েই গেলাম,কি হলো রে বাবা ! একসঙ্গে দুজনের তলব। ভয়ে ভয়ে গেলাম বেয়ারার পিছন পিছন। আমাকে দেখে দুজনেই বললেন 'আসুন আসুন ম্যাডাম আমরা আপনাকে দেখতে চাইছিলাম , তাই ডাকলাম।' 'দেখতে? আমাকে ? কেন?' আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম। না, ঘাবড়াবার কিছুই ছিল না, বরং খুশি হওয়ার কথা। ওনারা বললেন আমি উদয়নের মা, তাই আমাকে দেখার ইচ্ছা। এরকম স্টুডেন্ট ওঁরা নাকি আগে পান নি। নম্র, বিনয়ী, লেখাপড়ায় ভাল, কুইজ-এ এক নম্বর। আগের দিন-ই ছেলে অলমহারাষ্ট্র সাইন্স কুইজ-এ স্কুলকে জিতিয়ে এনেছে। সব মিলিয়ে ওঁদের আগ্রহ ছিল ওর মাকে দেখার। ভাইস প্রিন্সিপাল মহিলা ,জিজ্ঞেস করলেন কি করে মানুষ করেছি, করছি ? ওঁর-ও ছেলে আছে এই বয়সী, তাকে শেখাবেন উদয়নের মত করে ! এসব কথার তো কোনো উত্তর হয় না। আমি হাসলাম, ওঁদের ধন্যবাদ দিলাম। আর ছেলের জন্য গর্বে ভালোবাসায় মন ভরে গেল। মেয়ের জন্য-ও একবার এরকম হয়েছিল পুণা উনিভার্সিটি তে। অল ইন্ডিয়া এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়েছে পুণা উনিভার্সিটিতে MA ক্লাসে ভর্তির জন্য। সেদিন বিকেলে রেজাল্ট দেখতে গেছি, নোটিশ বোর্ডে নামের লিস্ট। দেখি প্রথম নামটাই অরুনিমা দাস। মেয়ে বলল সিরিয়ালি নাম দিয়েছে অক্ষর অনুযায়ী, কিন্তু আমার খটকা লাগে 'কিন্তু তিন নম্বর নামটা দ্যাখ, মিলছে নাতো অক্ষরের হিসাবে' ! মেয়ে বলল 'বাদ দাও না,কাল এসে টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে যাব।' আমরা ফিরে আসার জন্য পা বাড়িয়েছি, দৌড়ে এল বেয়ারা 'স্যার (প্রিন্সিপাল) আপনাকে ডেকেছেন' সেকি, কেন ? আমি তো তাকে চিনি-ই না। 'ওই বোর্ডে যার নাম প্রথমে তার মা-বাবাকে ডাকতে বলেছেন। দেখলাম আপনারা প্রথম নামটা নিয়েই কথা বলছেন, তাই।' তার পিছনে পিছনে ঢুকি স্যারের ঘরে। উনি বসতে বললেন। তারপর বললেন খুব ভাল পরীক্ষা দিয়েছে এই মেয়ে,উঁচু দরের ভাষা, স্পষ্ট মনের ভাব, এক্সপ্রেশন পারফেক্ট ! কলেজটা ভালো ছিল নিশ্চয়, কিন্তু ছাত্র-ও খুব ভাল, সবটাই নিতে পেরেছে। ভালো লাগল খুব ! ছেলে-মেয়ের এইসব কৃতিত্ত্ব আর প্রশংসা কেউ কি ভুলতে পারে ? আমিও সারাজীবন মনের মধ্যে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি সেই আনন্দের ধারা। এরকম-ই আনন্দের ধারা বয়ে চলেছে আমার সমস্ত জীবন জুড়ে। অভিযোগের কোন অবকাশ-ই ছিল না। আজ যদি কিছু কমতি হয়েই থাকে তার জন্য সারাজীবনের সমস্ত পাওয়া ভুলে, তাঁকে দোষ দিলে সেটা অকৃতজ্ঞতা হয় ! তাঁর কাজকর্মের বিচার করার অধিকারী তো আমরা নই। আমরা টুকরো দেখি, তিনি তো পূর্ণ দেখতে পান। তাই আমি বিনা অভিযোগে মাথায় তুলে নি-ই তাঁর বিচার, ভালো অথবা মন্দ হোক, তার দায় তো আমার নয় !


---- 'যা পেয়েছি ভাগ্যবলে মানি /

পেয়েছি তো তবে পরশ খানি /

আছো তুমি এই জানা তো জানি /

যাব ধরি সেই ভরসার তরী'


'কখনো গাও নি তুমি কেবল নীরবে রহি /

শিখায়েছ গান /

স্বপ্নময় শান্তিময় পূরবীরাগিনীতান /

বাঁধিয়াছ প্রাণ '-------


পুণা সুন্দর তো বটেই চারদিকে পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকা, সবুজের সমারোহ চারদিকে। পশ্চিমঘাট পর্বতের পাহারার মাঝখানে প্রকৃতির সুন্দরী কন্যা পুণা। মূলা(ছোট), মুঠা(বড়) দুই নদী তার কণ্ঠমালা, তার মেখলা। অজস্র বড় গাছ, ছোট গাছের বাহার, ফুলের শোভা, মুলশী লেকের জলভার সব মিলিয়ে পুণা সুন্দর ! অথচ ক্ষেতে আগে ফসল কম হত, আমরা প্রথম যখন পুণা গেলাম তখন পেলাম শুকনো, রসকষহীন,বিস্বাদসব্জী। ভ্যারাইটিও কম। সারাবছর বাঁধা কপি, কুমড়ো,লাউ এই ছিল সব্জী, শাক-ও কম পাওয়া যেত। যখন পুণার বাইরে বেরোতাম, বোম্বে বা আহম্মদনগর বা মহাবালেশ্বর যেদিকেই যাই ক্ষেত-মাঠের কেমন একটা শুকনো ভাব। আখ ছাড়া আর কিছু দেখা যেত না। কিন্তু আমরা ওখানে যে কবছর ছিলাম, তারমধ্যেই একেবারে বদলে গেল সব, ফলে-ফসলে ভরে উঠলো ক্ষেত। কি ভাল যে লাগত তখন ! যেন দুঃখীর ঘরের শুকনো,রুক্ষ, কৃশ মেয়েটি হঠাৎ পূর্ণ যৌবনের আশীর্বাদ পেয়ে ভরভরন্ত, সুন্দরী হয়ে উঠেছে ! এই আমূল পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে চমৎকৃত হলাম। পুণা ইউনিভার্সিটি-র হর্টিকালচার এন্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ডিপার্টমেন্টের অক্লান্ত রিসার্চের ফল ! প্রথম সিডলেস আঙ্গুর,পেঁপে আমি এখানেই দেখেছিলাম। শুনেছিলাম ভারতের মধ্যে-ও প্রথম। সত্যি-মিথ্যা জানি না। এদের একটা বোটানিক্যাল গার্ডেন ছিল। সেখানে বেড়াতে গেলে বোঝা যেত কি ধরনের রিসার্চ,কার্যকলাপ চলছে ! এদের আবার এসব জিনিস, বিশেষ করে ফল বিক্রির ব্যবস্থাও আছে ! রোজ সকালে ঘন্টা দুই খোলা থাকে ওদের নিজস্ব স্টল। সব্জী, ফল বিক্রি করে।মাঠ থেকে তুলে আনা তরতাজা শাক-সব্জী,ফলের স্বাদ যেন অমৃত ! দাম-ও বাজারের থেকে অনেকটাই কম। রোজ তো যাওয়া হত না, মাঝে মাঝে যেতাম। দেখতাম বাজারের ফল বিক্রেতারা ওখান থেকে ফল কিনছে প্রচুর পরিমাণে। তারপর তো দাম বাড়িয়ে, সেগুলোই আমাদের কাছে বিক্রি করবে ! সেরকম-ই তো হয় ! কি আর করা, রোজ তো ওখানে গিয়ে কেনা সম্ভব নয় সকালের পক্ষে !







বাঁ দিক থেকে

প্রথম সারি - শিভ নেরী, শনিবার ওয়াড়া

দ্বিতীয় সারি - রায়গড়, সাতারা রোড

তৃতীয় সারি - মুরুদ, লোনার

চতুর্থ সারি - বৃষ্টি স্নাত লোনাভালা, ডগরু শেঠ


শান্তনু ঘোষের সৌজন্যে প্রাপ্ত আলোকচিত্র




আমাদের বাড়ি ছিল আউন্ধ। পুণার নামী এবং মোটামুটি অভিজাত এরিয়া। তার থেকেও নাম করা সিন্ধকলোনী পাশেই। আমাদের এরিয়া থেকে একদিকে পুণা শহর, ইউনিভার্সিটি হয়ে জংলী মহারাজ রোড, তারপর পথ চলে গেছে পুণা স্টেশন, ক্যাম্প, ছাড়িয়ে আরো আরো দূরে। আরেকদিকে ইনফোটেক সিটি ছাড়িয়ে, বোম্বে-ব্যাঙ্গালোর রোড ধরে রাস্তা চলে গেছে বোম্বে। আমরা থাকার সময়-ই এক্সপ্রেস ওয়ে তৈরী হয়ে গেল। তার আগে বোম্বে যেতে হত খান্ডালা-লোনাভালায় পশ্চিমঘাট পর্বত ছাড়িয়ে। সে বড় সুন্দর রাস্তা ! পুণা প্রায় পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত, ডেকান ভ্যালির টুকরো। এখান থেকে বেরিয়ে অনেকটা প্রায় সোজা রাস্তা,তারপর খান্ডালা-লোনাভালা দুই যমজ সখীর মত নিজেদের রূপের পসরা সাজিয়ে, ভ্রমণকারীদের কাছে ডাকছে। এর পর-ই পাহাড় থেকে নামার পথ। খুব সুন্দর ! ঘুরে ঘুরে পথ নামছে, খুলে খুলে যাচ্ছে পাহাড়ের শোভা ! বর্ষায় তো অতি অপরূপ হয়ে ওঠে সে পথ ! দেখতাম পাহাড়ের গায়ে লেগে আছে মেঘ,ঘন কুয়াশা। কখনো তারা এসে ঢেকে দিত পথ, গাড়ি সব। রাস্তাই দেখা যেত না,গাড়ি থামিয়ে বসে থাকতে হত, প্রকৃতির দয়ার উপরে নির্ভর। আমরা কতটা অসহায় এবং নির্ভরশীল এইসব সময় বোঝা যায়,মন আপনি নত হয় ! হয়ত গাড়ি থামিয়ে বসে মেঘ-কুয়াশা সরে যাওয়ার অপেক্ষায়, সরবে কি ? ঝম্ঝমিয়ে নামল অঝোর বৃষ্টি। চারদিকের পাহাড়ের সবুজ ঢেকে জল ঝরছে ,স্তব্ধ পাহাড়-জঙ্গল উপভোগ করছে সেই বর্ষণ,উপভোগ করছি আমরাও। সে এক অপার্থিব আনন্দ,এক অলৌকিক অনুভব ! মন কেমন করে,মনে হয়


------'এমন দিনে তারে বলা যায় /

এমন ঘনঘোর বর্ষায় /

দুজনে মুখোমুখি /

গভীর দুখে দুখী /

তপনহীন ঘন তমসায় /

নিশীথ নির্জন চারিধার /

জগতে কেহ যেন নাহি আর /

আকাশে জল ঝরে অনিবার'---

কতবার হয়েছে আমি আর প্রিয়বন্ধু গাড়িতে বসে, বাইরে অঝোর বৃষ্টি, স্তব্ধ প্রকৃতি,মুগ্ধ আমরা ! কোন কথা নেই, শুধু হাতেহাত ধরে বসে থাকা, সে এক অপূর্ব,অপার্থিব অনুভব ! বলে কি আর সবটা বোঝানো যায় ? মনে মনে কোন কথার,বিশ্বাসের স্রোত বয়ে চলে,সে কেবল উপভোগ করতে হয় সারা মন দিয়ে ! পাহাড় বেশি নয় আট/দশ কিলোমিটার, কিন্তু সেটুকুতেই দেখা যেত প্রকৃতির অপরূপ রূপ ! এই দেখি পাহাড়ের সঙ্গে মেঘের লুকোচুরি খেলা, এই আবার পাহাড়ের খুশির হাসি ঝরছে ঝর্ণা হয়ে শতেক ধারায়। ওই ওখানে ঝুপ্পুস ভিজছে ছোট্ট পাখি, বন্ধ তার ডাকাডাকি।পথ নির্জন,স্তব্ধ। সব গাড়ি-ই কোথাও না কোথাও থেমে আছে,অপেক্ষা করছে সূর্যদেবের হাসিমুখের ঝলকানি দেখার ! বৃষ্টির সময় পাহাড়ি পথে গাড়ি চালানো বিপদজনক ! আর ছিল কুয়াশা ! বেশ চলেছে গাড়ি, কোথাও কিছু নেই,হঠাৎচারদিক ঢেকে নেমে এল ঘন কুয়াশা। যেন কেউ ঝপ করে মশারি ফেলে ঢেকে দিল গাড়িটাকে। অতএব যাত্রা বন্ধ ! কিছু দেখাই যায় না, গাড়ি চলবে কি করে ? এমন কি ফগলাইট-ও কাজ করে না, এমন নিশ্ছিদ্র কুয়াশা ! পুণা-বোম্বে মাত্র একশ বাহান্ন কিলোমিটার বা তার অল্প কম-বেশি , কিন্তু সময় লেগে যেত বেশ ! পাহাড়ের রাস্তায় খুব জোরে তো গাড়ি চালানো যায় না ! পরে এক্সপ্রেসওয়ে তৈরী হওয়ার পরে আসা-যাওয়ার সময় কমে গেল, ডোর টু ডোর চার ঘন্টা, মাঝে চা খাওয়ার একটা ব্রেক ! কিন্তু মনের আনন্দটা কমে গেল। আমি আর ছেলে তখন-ও পাহাড়ী রাস্তাতেই যেতে ভালবাসতাম। কেজো লোকদের মত সময়ের চিন্তা আমাদের ছিল না ! একবার গেলাম পুনার ফিল্ম ইনস্টিটিউট দেখতে ,সেও এক গল্প ---------



পুণার ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট(FTII) সিনেমা জগতে একটা নাম। অনেক ভাল ভাল অভিনেতা, পরিচালক,টেকনিশিয়ান এসেছে এখন থেকে রূপালী পর্দার জগতে। আমরা যখন ছিলাম তখন মোহন আগাসে এর ডিরেক্টর। মনে খুব বাসনা ভিতরে ঢুকে দেখব। প্রিয়বন্ধুকে বলি, সে গা করে না। উইক ডেতে নিজে যেতে পারবে না, তাই নিস্পৃহ খুব। কিন্তু আমি যখন যাব ভেবেছি ,না গিয়ে তো ছাড়ব না ! কোথা থেকে পারমিশন নিতে হয় কিছুই জানি না। একজন বলল দিল্লির ফিল্ম ডিভিশনে এপ্লাই করে আনাতে হবে, দ্যূত অত করবে কে ? ওসব আমার পোষাবে না,এত ক্রেজ-ও নেই আমার। সাধারণ চেষ্টা করব,হলে ভাল না হলে বয়েই গেল ! প্রিয়বন্ধু অফিসে চলে যাওয়ার পরে একদিন সেজেগুজে বেরোই,ড্রাইভার তো ফিল্ম ইনস্টিটিউট শুনেই উৎসাহিত। ভেবেছে পারমিশন আছে. ম্যাডামের সঙ্গে ওর-ও দেখা হবে। ছেলে-আমি-ড্রাইভার বেরোলাম, 'মিশন ফিল্ম ইনস্টিটিউট'--------ল কলেজ রোডের কাছে ইনস্টিটিউটের গেট, গিয়ে 'অহো ভাগ্য ! গেট যে হাট করে খোলা। এটা কিরকম হল ? যেখানে ঢুকতে পারমিশন লাগে, তার গেট এরকম উদার ভাবে খোলা ? যাকগে আমার কি ? কারণ খুঁজে সময় নষ্ট করে লাভ কি ? ড্রাইভার কে ভিতরে যেতে বলি, তার অবাক দৃষ্টি দেখে ঘাবড়াব বা লজ্জা পাব তেমন চিজ তো নই আমি। অতএব নির্বিকার বসে থাকি। এতক্ষণে ড্রাইভার বুঝেছে কোনো পারমিশন নেই, এমনি-ই যাচ্ছি আমরা। একটু ভয় পাচ্ছে, কিন্তু কোম্পানীর ড্রাইভার, ম্যাডামের কথার অবাধ্য হওয়ার হিম্মত রাখে না। তা ছাড়া আমার এইসব উদ্ভট কর্তুতের সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচিত সে, তাই গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়। ঢোকার পরেই দেখি একটু দূরে কয়েকজন সিকুউরিটিওয়ালা দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমাদের গাড়ি দেখে তারা অবাক ! আমি ড্রাইভারকে বললাম 'পুঁড়ে যা,লৌকর সলা'---আগে চল, তাড়াতাড়ি চল। অতএব ছোটে আমাদের পক্ষীরাজ মারুতি এস্টিম। লোকগুলো পিছন থেকে চেঁচাচ্ছে 'থাম্বা থাম্বা' আর থাম্বা-----আমরা তখন হেসেকুটিপাটি, যা হবে দেখা যাবে পরে। দেখলাম ঘুরেফিরে। অমিতাভ বচ্চন জেল থেকে যে বেরোত সেই জেল গেট,বানিয়ে রাখা গ্রাম, স্কুল, পোস্ট অফিস মনের সুখে পুরোটা ঘুরে বেড়ালাম, অনেকেই তাকিয়ে দেখছে, সৌজন্যের হাসিও হাসছে অনেকে, তারা তো আর জানে না পুরো বে-আইনি কাজ করেছি আমরা ! যাই হোক বেশ অনেকক্ষণ বেড়িয়ে ফেরার রাস্তা ধরি। কিছুটা গিয়ে ড্রাইভার বলে 'ম্যাডাম।' দেখি সামনে বিপদ। গেট সেঁটে বন্ধ, আর তার সামনে পুরো দল দাঁড়িয়ে, মুখে তাদের 'এক মাঘে শীত যায়না' গোছের সাবধানবাণী-র হাসি। গাড়ি থামল,একজন জুনিয়র অফিসার ড্রাইভারকে নামতে বলে, তার লাইসেন্স নিয়ে তাকে একটু দূরে বারান্দায় বসা বসের কাছে নিয়ে যায়। নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম যেন জোরে কথা বলে যাতে আমি শুনতে পাই। তাতে স্ট্রাটেজি ঠিক করতে সুবিধা হবে। শুনি সে বলছে --'কোম্পানি কা ম্যাডাম আহে, নোকরি কে সওয়াল সাব' তারপর গোপন খবর দেওয়ার মত 'বহত খরুশ মাতারি সাব'----সবই শেখানো কথা। ম্যাডামটা যে কত পাজী ওর নোকরি খেয়ে নেবে, গরিবের দুঃখ বোঝে না,কাজেই ভিতরে না এসে ওর উপায় ছিল না। সাব কথা শুনছেন আর গাড়ি থেকে সানগ্লাস পরা মুখ বের করা আমাকে দেখছেন। তার পর উঠে,ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন খরুশ মহিলার সঙ্গে একটা এস্পার-ওস্পার করার সঙ্কল্প নিয়ে। আমি আগ্রহ দেখিয়ে চেয়ে থাকি, এমনিতেও সুঠাম , সুপুরুষ,স্মার্ট IPS অফিসারকে দেখে ভালোই লাগছিল। কিন্তু মনে মনে লড়াইটা সাজাচ্ছিলাম। তিনি গাড়ির কাছে আসতেই একটা হাসি উপহার দিলাম,সঙ্গে 'গুডমর্নিং স্যার', আমার মেয়ে বলে 'ওই থাউজ্যান্ডওয়াটের হাসিতেই তো অর্ধেক লোক ঘায়েল, ডিউটি কি করবে ?'......সত্যি কিনা জানি না, তবে কাজ হোতে দেখেছি। তিনি হাসলেন অনুকম্পার হাসি 'পেয়েছি বাগে দেখছি কত খরুশ তুমি'......খুব করুণার সঙ্গে বলল পারমিশন ছাড়া এখানে ঢোকা মানা কিন্তু !' আমি একেবারে দুম করে আকাশ থেকে পড়লাম, 'জানি নাতো' তার হাসি আরো চওড়া হল 'কিন্তু আইন তো তার মতই চলবে ম্যাডাম', আমি একমত, বললাম ড্রাইভারের লাইসেন্স ফেরৎ দিয়ে দিক। সে বেচারা আমার কথায় ভিতরে এসেছে, ওর ডিউটি আমার কথা শোনা, কাজেই ওর দোষ নেই' রাজী, দিয়ে দিল ফেরৎ , বলল গাড়িতে উঠতে। আবার আমার দিকে 'হ্যাঁ তো ?' আমি বললাম 'পারমিশন ছাড়া ঢোকার কথা নয়, অথচ গেট হাট খোলা' তারপর গলা শক্ত করে 'কতবড় সিকিউরিটি ল্যাপ্স বুঝতে পারছেন ? খবর জানাজানি হলে'.......মুখচোখের ভাব গেছে পাল্টে, তবুও 'জানাজানি, কি করে'. গলায় আত্মবিশ্বাসের ছিঁটেফোঁটা নেই, বুঝলাম আমার জয় শুরু ! বললাম 'দেখি আমি-ই দিল্লীতে একটা ফোন,মোবাইল বের করে যেন নম্বর খুঁজি' আর্ত আওয়াজ 'দিল্লিতে কোথায়, কাকে ?' নির্বিকার মুখে বলি 'হোম মিনিস্ট্রিতে আমার বন্ধু আছে, সে সাহায্য করতে পারবে কোথায় নালিশ জানাতে হবে বলে'.....সে ঝাঁপিয়ে পড়ে 'না না ম্যাডাম। এই ছেলেদের কথা ভাবুন। আপনার ড্রাইভারের মত এদের-ও তো পেটের জন্যই। ওদের চাকরী চলে যাবে ম্যাডাম' নিজেরটা আর বলে না। আমি অনেক চিন্তা করে বলি 'তাও বটে, গরিব মানুষ' 'হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যাডাম' উৎসাহে বলে, তখনি নির্দেশ দেয় গেট খুলতে, গেট খুলে যায় 'চিচিং ফাঁক' মন্ত্রে, গাড়ি স্টার্ট করে, তারা দাঁড়িয়ে স্যালুট-ই ঠুকে দেয়। একেবারে স্ট্যান্ডিং ওভেশন 'পাপী পেট কে সওয়াল হ্যায় না ?'........হা হা হা


'এত কথা আছে ,

এত গান আছে,

এত প্রাণ আছে মোর/

এত সুখ আছে,

এত সাধ আছে,---



প্রাণ হয়ে আছে ভোর'-------------------------------------


মাঝে মাঝে ভাবি, সেই মানুষটা, আমার প্রিয় বন্ধু , তার জন্যই তো এত সুখ-আনন্দ পেলাম সারা জীবন ! হয় তো দিয়েছেন ভগবান, কিন্তু নিমিত্ত তো সেই আমার প্রিয়জন ! সেই যে কোন ছোট্ট বেলায়----'পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থী /আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী'........কোন অদৃশ্য বাঁধনে যে বাঁধা পড়েছিলাম, চলতি হাওয়ায় ভেসে ভেসে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর কেটে গেল সে যাওয়ার সময় অব্দি, তবু মনে হয় এই তো সেদিন ! বাইরে হারালেও অন্তরে রয়ে যাবে চিরদিন, বিনি সূতোর বাঁধন যে, ছিঁড়ে যায় না, পোড়ে না, হারায় না। প্রিয় বন্ধুর চাকরী জীবন শুরু হয়েছিল পুণায়। UPSC-র অল ইন্ডিয়া এক্সাম-এ সিলেক্টেড হয়ে, IAT(ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড টেকনোলজি) তে প্রথম ট্রেনিং। জীবনের স্বনির্ভর চলা শুরু। তার আগে স্কলারশিপ পেলেও, আসল দায়িত্ব তো বাবার ছিল ! কিন্তু পুণা আসার পর থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন শুরু হল। সমস্যা, দুঃখ-আনন্দ সব নিজের। তাই পুণা ছিল তার খুব প্রিয় জায়গা। প্রথম আসার পর-ই আমাদের দেখাতে নিয়ে গেল মুঠা নদীর উপরে খড়গভাসলা ড্যামের জলে তৈরী খড়গভাসলা লেক-এর পারে IAT দেখাতে। তারপরে একশোবার শোনা গল্প, তারা কি ভাবে ছুটির দিন পুনায় ঘুরে বেড়াত, জংলীমাহরাজ রোডে হোটেলে খেত সেসব শোনালো। শোনা গল্পই, তবু তার আলো জ্বলা চোখের উজ্বল দ্যুতি দেখতেদেখতে গল্প শোনার আনন্দ পাওয়ার জন্য তাকে থামাই না আমরা। সবটাই ভাল লাগার, ভাল বাসার।


পুণা------ এখানে প্রাচীনতা-ইতিহাস-সংস্কৃতি-আধুনিকতা সব মিলে-মিশে আছে। ১৭৫৮ সালের তাম্রপত্রে পুণ্যনগরী পুণা-র উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাদেব-গনেশ-নারায়ণ-দূর্গা এঁদের মন্দির দিয়ে সাজানো, তাই পুণ্যনগরী। তা থেকেই পুণা ! এখানে ইতিহাস আর আধুনিকতায় কোনো বিরোধ নেই, দুজনে পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি, কোন বিরোধের অবকাশ নেই,শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। দেবগিরীর যাদব সাম্রাজ্য দিয়ে ইতিহাসের সূচনা তেরশ শতাব্দীতে। চৌদ্দশ শতাব্দীতে(১৩১৭) আলাউদ্দিন খিলজি দিল্লীর শাসনভার নিলে, পুণা-ও তার নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। তিনশ বছর মুঘল শাসন চলে,তবে মারাঠাদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ঝামেলা চলতে থাকে। অবশেষে ষোলশ শতাব্দীতে ভোঁসলেরা প্রথম মারাঠা শাসনের সূচনা করে। শিবাজী-র কথা কে না জানে ? তবু একটু বলি। পুণা এবং মহারাষ্ট্রের কথায় তাঁর কথা না বললে লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শিবাজী ছিলেন ভোঁসলে শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। জন্ম ১৬৩০-এ পুণা র কাছে শিবনেরি দুর্গে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তোর্না দুর্গ জয় করেন, তারপর চাকন আর কোন্দানা দুর্গ দুটি বুদ্ধি করে আয়ত্ত করেন। আওরঙ্গজেব এবং মুঘলদের সঙ্গে প্রথমদিকে ভাল সম্পর্ক থাকলেও, পরে প্রচন্ড শত্রূতায় পরিণত হয়। শিবাজী মুঘলদের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামে রত হন। ১৬৭৪ সালে আগ্রা দুর্গে বন্দি হন,বুদ্ধির জোরে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। পরে অসুস্থ হয়ে ১৬৮০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরে সতেরশ(১৭১৪) তে পেশোয়া, তারপরে আঠারোশ(১৮১৮) থেকে বৃটিশ শাসনের সূচনা হয়। এই শাসনকালে রেল, আধুনিক ডাকব্যবস্থা, মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ঘটে এবং মহারাষ্ট্রে বোম্বে-র পরেই পুণা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। মূলা-মুঠা দুই নদীর মধ্যিখানে প্রাচীন পুণা-র অবস্থান। এই দুটি নদী-ই ছিল জলের প্রধান উৎস। মুঠা নদীতে বাঁধ দিয়ে পরে খড়্গভাসলা ড্যাম বানানো হয়। তৈরী হয় খড়্গভাসলা লেক। সমুদ্রতল থেকে অনেক উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায়, মাটির নীচে থেকে জল পাওয়া প্রায় অসাধ্য। লেকগুলি-ই ভরসা। শহরের মধ্যেই আছে পাষান লেক। কোন এক উল্কা পাতের সময় নাকি বিরাট পাথর এসে পড়ে এই স্থানে, সেই পাষান থেকে তৈরী গহ্বরে, জমে যাওয়া জল থেকেই সৃষ্টি এই লেকের, তাই নাম পাষাণ ! বানের এলাকায় জলের সরবরাহ হয় এই লেক থেকেই। এই লেকের পারে চাঁদনীচক, অনেকগুলো রেস্তোরাঁ আছে এখানে। মেঘের সাজ আর বৃষ্টি দেখলেই আমরা পৌঁছে যেতাম এখানে। কিছুক্ষণ বৃষ্টি এনজয় করে, রেস্তোরাঁ-য় খেয়ে ফিরে আসতাম। আশ্চর্যের কথা হল আমাদের চারজনের-ই একরকম স্বভাব, এক-ই রকম নেশা ছিল, নইলে-------! ভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার পরিবারে আমার মতই মানুষ মিলিয়ে দিয়েছেন, অন্য রকম-ও তো হতে পারতো ! পুণায় বেশ কটি মন্দির আছে শহরের ভিতরেই-----গনেশজিকে দিয়েই শুরু করি, সারসবাগ----বিরাট খোলা চত্তরের মধ্যখানে সুন্দর শ্বেতপাথরের গনেশ মন্দির, তার ভিতরে অপূর্ব দেব মূর্তি ! মন্দিরকে ঘিরে পরিখা বানিয়ে জল রাখা হয়েছে। বর্তমানে ওয়াটার সাপ্লাই থেকে জল সরবরাহ করা হয় এখানে। এই জলে আগে নাকি মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ থাকত। সারসবাগ পিছনে রেখে মহাবালেশ্বর-এর রাস্তায় এগোলে পাওয়া যায় পার্বতী----পাহাড়ের উপরে দূর্গা মন্দির। দেড়শোর উপরে সিঁড়ি, শোনা কথা গুনে দেখা হয় নি। ওঠা নামার সময় আর গোনার অবস্থা ছিল না আমার ! উপর থেকে দেখলে, পুনাশহরের একটা বড় অংশ নজরে আসে। আগে নাকি পুরোটাই দেখা যেত,আথবা যতটা দেখা যেত ততটাই ছিল শহরের বিস্তার ! দেখলাম অন্যরকম মূর্তি দেবীর,আমিতো পুজোটুজো দি-ই না, তাই বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর অনুমতি হয় না ! ছিল চতুঃশৃঙ্গী মন্দির। দূর্গার মন্দির, এখানে দূর্গার মূর্তি চার মাথার। সেনাপতি বাপট রোডের উপরেই এই মন্দির। পুণা ইউনিভার্সিটি-র খুব কাছে। দূর্গা পুজোর সময় বেশ ভালো মেলাবসে। গ্রামের মানুষের হাতে বানানো নানা রকম জিনিস বিক্রি হয়। খাবার জিনিস-ও পাওয়া যায় নানারকম। তখন সেনাপতি বাপট রোডে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমরা অনেক রাতে যখন পূজামন্ডপ থেকে ফিরতাম, তখনো দেখতাম লোকজন মেলা দেখছে বা ফিরে যাচ্ছে। পুণার অন্যদিকে বন্দগার্ডেন এর পরে মূলা নদীর ব্রিজ পার হয়ে বিশ্রান্তবাড়ি-র শুরুতেই পাহাড়ের উপরে শিবের মন্দির।বন্দ গার্ডেনের উল্টোদিকে কোরেগাওঁ পার্ক নামক অত্যন্ত পশ এরিয়াতে আছে বিশ্ববিখ্যাত ওশো-র আশ্রম। সেখানে সারা বছর বিদেশী ভ্রমণকারীদের ভিড় লেগেই থাকে। আছে সিংহগড় দুর্গ। না দুর্গ আর এখন নেই, তার ধ্বংসাবশেষ কিছু আছে। তবে জায়গাটা খুব সুন্দর আর অনেক উপরে বলে সেখান থেকে মূলশি লেক, পুণা শহর দেখা যায়।


আমাদের বাড়ির কাছে ছিল খড়কি স্টেশন, বাজার। শুনেছি ইংরাজ আমলে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই স্টেশন। সৈন্য,রসদ সব আসত বোম্বে থেকে এই পথে। এখন-ও মহারাষ্ট্র থেকে দক্ষিণভারতের দিকে ট্রেনে যেতে এই স্টেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ! এই স্টেশনের কাছের বাজারটাই আমাদের সবচেয়ে কাছের বাজার ছিল। নিয়মিত, মাছ-তরিতরকারী আমরা সেখান থেকেই কিনতাম।আবার ঘরের দরকারি জিনিসপত্র, উল-কাঁটা, বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ, ওয়াটার বটল, ক্যাসেট-সিডি,ফিল্ম রোল,জামাকাপড় সেসব-ও পাওয়া যেত। খুব মহার্ঘ বস্তু ছাড়া সব-ই পাওয়া যেত। খড়কি স্টেশন-এর কাছেই ছিল কালী বাড়ি। বাঙালীদের মহা মিলনক্ষেত্র ! রোজ-ই সক্কালে-সন্ধ্যায় যখনি যাও, কিছু বাঙালীকে পাওয়া যাবেই ! আর দুর্গাপুজো,কালীপুজোয় তো একেবারে চাঁদের হাট জমজমাট ! আগে একটা ছোট্ট মন্দির ছিল, সেখানেই দূর্গা-লক্ষী-কালীপূজা হত। পরে লোকের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ভাল করে মন্দির বানানো হয়। তার উদ্বোধনে বোম্বের অভিনেত্রী রাখী এসেছিল বোম্বে থেকে। সেদিন নাকি ভিড়ের চোটে দাঁড়ানোই যাচ্ছিল না ! ভাগ্যিশ যাই নি ! আমাদের পাড়ায় খুললো সরযা রেস্তোরাঁ। সেটানাকি লতা মঙ্গেশকরের ভাইয়ের হোটেল। তাই তার সব ভাইবোন সেদিন এসেছিল। আমাদের বাড়ি থেকে পুণা স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে জংলী মহারাজ রোডের কোণে ছিল সঞ্চেতি হাসপাতাল। হাড়ের যেকোন, চিকিৎসা এবং এক্সিডেন্ট কেস, ট্রমা এসবের চিকিৎসা হত। আমার প্রিয়বন্ধুটির পায়ের একটা অপারেশন হয়েছিল এখানে। অবশ্য লাস্ট যেবার পুণা এসেছিলাম, তখনকার কথা। তার আগে বোম্বেতে থাকতে পায়ের গোড়ালির কাছে মেইন তিনটে হাড় ভেঙে গিয়ে পা একদম ঘুরে গেছিল। তখন বান্দ্রার বিখ্যাত লীলাবতী হাসপাতালে অপারেশন করে সেগুলো সেট করে দিয়েছিল। তখন ছয়টা স্ক্র এবং স্টিলের প্লেট বসাতেহয়েছিল, কয়েকবছর পরে সেগুলো খোলার জন্য পুণার সাঞ্চেতিতে আবার অপারেশন করা হয়। সুখে-দুঃখে জীবনের দিনগুলো যেন উড়ে যাচ্ছে ! দুর্গাপূজা হত বেশকয়েকটা। আমাদের পুজো ছিল বাংলা লাইব্রেরি-র টা। ওখানেই প্রধানত যাওয়া, ভোগ খাওয়া,আড্ডা চলত সারাদিন। তবে আমার-তোমার বলে কোনো সীমানা বাঁধা ছিলোনা। যেকোন পুজো প্যান্ডেলে যেতে পার, ভোগ খেতে পার, কেউ কিছু মনে করবে না। ওই তিনটে দিন অবারিত দ্বার। যে আসছে , সবাই খাবার পাবে। চাঁদা দিলে খুব ভালো,না দিলেও কিছুই বলা হয় না। তখন শুধু আনন্দ, তখন উৎসব !---


'মানবের সুখ-দুঃখে গাঁথিয়া সঙ্গীত /

যদি গো রচিত পারি অমর আলয় /

তা যদি না পারি তবে বাঁচি যতকাল /

তোমাদেরই মাঝখানে লভি যেন ঠাইঁ /

তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল /

নব নব সঙ্গীতের কুসুম ফোটাই'



------ চলবে




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮