• শুভাশিস ভট্টাচার্য

সম্পাদকের কলমে



'নিশি অবসান প্রায়, ওই পুরাতন

বর্ষ হয় গত!

আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন

করিলাম নত।‘


পুরনো বছরের অবসানে জীর্ণ জীবনের গ্লানি দূর করে নূতন জীবনের আশা নিয়ে এলো বাঙলা নববর্ষ। আর বাংলা নববর্ষকে সাদরে অভ্যর্থনা করতে আমরা নিয়ে এলাম নীড়বাসনার তৃতীয় বর্ষের বৈশাখ সংখ্যা। আপনাদের ভালবাসা এবং আশীর্বাদকে পাথেয় করে নীড়বাসনা তার দুই বছর পূর্ণ করে তিনে পদার্পণ করল। ধন্যবাদ জানাই নীড়-বাসনার সমস্ত শুভানুধ্যায়ী বন্ধুকে যাদের হাত ধরে আমরা পেরিয়ে এলাম এতটা পথ । আপনারা সবাই ভালো থাকুন। আমাদের সঙ্গে থাকুন।


দেশ এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আর একটা বাঙলা বছর শেষ হল। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি এলাকায় রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সংঘর্ষ ঘটেছে । আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করি। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক বিভেদের এবং পরিচিতির রাজনীতি প্রকট হয়ে উঠছে। আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে, প্রতিটি মানুষের একই সাথে একাধিক পরিচিতি থাকে। মানুষের পরিচয় তার ভাষা ভিত্তিক হতে পারে - কারুর মাতৃভাষা বাঙলা আবার কারুর মাতৃভাষা মারাঠি। তেমনি পরিচয় হতে পারে বর্ণ ভিত্তিক - কেউ শূদ্র আবার কেউ ব্রাহ্মণ। অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস ভিত্তিক - কেউ হিন্দু আবার কেউ মুসলমান । আবার পরিচিতি হতে পারে দেশ ভিত্তিক - কেউ ভারতবাসী তো কেউ আমেরিকান। কিন্তু এই সব পরিচয়ের উপরে আমাদের পরিচয় আমরা মানুষ। তাই মানবতার ধর্ম সব থেকে উপরে। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতির খেলায় মানুষের অনেক পরিচিতির মধ্য থেকে শুধুমাত্র ধর্ম, জাতি বা বর্ণের পরিচয়কে প্রধান করে তুলে সেটার ভিত্তিতে গভীর ও স্থায়ী বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করছে। আশা করব বৈশাখের অগ্নি-স্নানে সাম্প্রদায়িক বিভেদের আবর্জনা দূর হয়ে যাবে। নূতন বছর আমাদের শুভ-বোধের আলো দেখাবে এবং আমরা সবাই সঙ্কীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে বৃহত্তর মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হব।


‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥

……

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’


আমাদের এই সংখ্যার বিষয় কল্প-বিজ্ঞান। কল্প-বিজ্ঞান সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা যেখানে লেখক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে কল্পনার ডানায় উড়িয়ে নিয়ে যান। খুলে দেন নানা সম্ভাবনার দরজা । আইজ্যাক আসিমভের ভাষায় কল্প-বিজ্ঞান সাহিত্যের এমন একটি শাখা যার মুলে আছে মানুষের উপর বৈজ্ঞানিক প্রগতির প্রভাব ( 'science fiction is the branch of literature which is concerned with the impact of scientific advance upon human beings' - Isaac Asimov) । বিশ্ব সাহিত্যে কল্প-বিজ্ঞানের চর্চা অনেক দিনের। অনেক বিখ্যাত লেখক এবং বিজ্ঞানীর নাম এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যেমন এইচ. জি. ওয়েলস, জুলভার্ন, আইজ্যাক আসিমভ, আর্থার সি. ক্লার্ক থেকে শুরু করে স্টিফেন হকিং। বাংলা ভাষাতে কল্পবিজ্ঞানের চর্চাও কম দিনের নয়। । অনেক বড় বড় সাহিত্যিক এবং বিজ্ঞানী সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অদ্রীশ বর্ধন । ১৮৯৬ সালে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা 'পলাতক তুফান' নামে একটি গল্পে কুন্তল কেশরী তেলের বোতলে একটি সামুদ্রিক ঘূর্ণি ঝড়কে বন্দী করার গল্প পাই। এছাড়া বেগম রাকেয়ার 'সুলতানার স্বপ্ন', পেমেন্দ্র মিত্রের 'কুহকের দেশে', হেমেন্দ্র রায়ের 'মেঘদূতের মর্তে আগমন', সুকুমার রায়ের 'হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়রি' ইত্যাদি কল্প-বিজ্ঞানের গল্প পাই। বাঙলা ভাষায় কল্প-বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তুলতে সত্যজিৎ রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কুর গল্প পড়েননি এমন বাঙ্গালি পাওয়া দুষ্কর। অদ্রীশ বর্ধনের সম্পাদনায় ভারতবর্ষের প্রথম কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা ‘আশ্চর্য’বাঙলা ভাষায় কল্প-বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিশেষ অবদান রেখেছিল । যদিও বিশ্ব সাহিত্যে কল্প-বিজ্ঞানের জনপ্রিয়তায় বিশেষ ভাঁটা পড়ে নি, কিন্তু বর্তমানে বাংলা ভাষায় কল্পবিজ্ঞানের চর্চা হঠাৎ করে কমে এসেছে। আশা করব এটা সাময়িক এবং আমরা বাংলা সাহিত্যে আবার নূতন করে ভালো কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক সাহিত্য পাবো।


নীড় বাসনার বৈশাখ সংখ্যায় আছে বেশ কিছু নতুন আঙ্গিকের লেখা। কেমন লাগলো, অবশ্যই জানাবেন। আপনাদের সকলকে বাঙলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই। সঙ্গে থাকবেন, ভালো থাকবেন।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮