• শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়

এ-মন-জানলা - গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস - রাজনৈতিক চেতনা ও তিনটি দুষ্প্রাপ্য বই

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, সমগ্র পৃথিবীতে ছিলেন এক স্বতন্ত্র ব্যাক্তিত্ব- একজন যথার্থ আইকন। একদিকে যেমন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, ফিদেল কাস্ত্রোর অন্তরঙ্গ বন্ধু, বামপন্থী ভাবধারায় প্রবলভাবে বিশ্বাসী; অন্যদিকে তেমনি বিল ক্লিনটনের সঙ্গে নৈশভোজে ১৬ বছরের চেলসীর সঙ্গে রীতিমত সিরিয়াস আলোচনা -ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড নিয়ে। কিন্তু এ আলোচনা ঔপন্যাসিক মার্কেসকে নিয়ে নয়, তিনটি ছোট ছোট বইয়ের লেখক মার্কেস - আরও নির্দিষ্ট করে বললে তিনটি বইকে নিয়ে এই লেখা। এই তিনটি বইয়ে আমরা চিনতে পারি এমন একজন লেখককে, যিনি বর্তমান পৃথিবীর রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবজাতির অস্তিত্বের সঙ্কট আর বিশ্বজোড়া অসাম্যের কথা তুলে ধরেছেন।

বই তিনটি হল ১) A country for Children ২) Doom of Damocles ৩) Solitude of Latin America


এই তিনটি বইকে ঠিক বই না বলে discourse বলাই ভাল। কোনটি সাত পাতা, কোনটি নপাতা আর কোনটি দশ পাতায় শেষ। তাও তাদের বই বলছি কারণ এগুলি প্রকাশ পেয়েছে বই হিসেবে দু মলাটের মধ্যে আর প্রকাশকরাও যথেষ্ট নামকরা। মার্কেসের বই সংগ্রাহকদের কাছে এদের মূল্য অনেক। মার্কেসের প্রামাণ্য ক্যাটালগে এদের উল্লেখ আছে। বই তিনটিই দুষ্প্রাপ্য কারণ বহুকাল ছাপা নেই আর প্রথম যখন ছাপে তখন অত্যন্ত কম সংখ্যায় ছাপা হয়। মার্কেসের বই গোটা পৃথিবীতেই অসম্ভব জনপ্রিয়, তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠকের সংখ্যা কোটি কোটি- কিন্তু তাও কেন বইগুলি ছাপা নেই ? এর কোন নির্দিষ্ট উত্তর পাইনি। লেখক যখন মার্কেস, দাম তখন কোন অন্তরায় হতে পারে না। তাহলে কি অন্য কোন কারণ?



A country for Children


মাত্র ১৪৬ পাতার এই বই প্রায় কফি টেবিল বইয়ের মত। বইটিকে কলম্বিয়ার প্রতি মার্কেসের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন বললে অত্যুক্তি করা হয় না। এই বইতে মার্কেস তুলে ধরেছেন কলম্বিয়ার বিশাল মানবসম্পদের কথা, শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর জাতীয় চেতনার কথা। একটি বৃহত্তর গবেষণার ভূমিকা হিসেবে এই লেখাটি লেখেন মার্কেস। নির্ধারিত শব্দ সংখ্যাও ছাড়িয়ে যায়, তা সত্ত্বেও কোন রকম কাটছাঁট না করেই লেখাটি প্রকাশিত হয়। বইয়ের শিরোনামেই রয়েছে ব্যতিক্রমী দ্বন্দ্ব। ‘A Country for Children’ হাফ- টাইটেল পাতায় হয়ে গেছে ‘ For the sake of a country within the reach of the children’।

ছাপা হল কলম্বিয়ার ভিলেগাস এদিতরেস থেকে। দারুণ ঝকঝকে , অসংখ্য ছবি সম্বলিত এই বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে, অনুবাদ করেন এডিথ গ্রসম্যান। লেখা মাত্র সাত- আট পাতার, কিন্তু এই সাত-আট পাতাতেই আমরা এক অন্য মার্কেসকে চিনতে পারি। আমরা জানি যে মার্কেস রাজনৈতিক কারনে কলম্বিয়া ছাড়েন।কখনো কিউবা কখনো স্পেন কখনো বা ফ্রান্স এ বসবাস করে মেক্সিকো তে পাকাপাকি থেকে যান।মাঝে অনেকবার ফিরে গেছেন কলম্বিয়া, গেছেন আরকাটাকা - যার উপর ভিত্তি করে মাকন্দর স্থাপনা। সেই নিরুচ্চারিত ভালবাসার কথা এই বইয়ে ফুটে ওঠে। লাতিন আমেরিকার যে অপূর্ব নিসর্গ প্রথম স্পেনীয় লুণ্ঠনকারীরা আবিষ্কার করেছিল তা নেহাতই ভুলবশত। একটি ছোট ম্যাপ এর ভুলই ক্রিস্টোফার কলম্বাস কে লাতিন আমেরিকায় এনে হাজির করে। লাতিন আমেরিকার এই অংশে ছিল পাখির সুমধুর গান, ছিল ফুলের মাতাল করা গন্ধ আর ছিল সোনাদানা, রত্নরাজি। কলম্বাসের নামে এই ভূস্বর্গের নাম হল কলম্বিয়া। দশ হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে, তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে এইখানেই বসবাস করছিল। তাদের রাজনৈতিক কোন ঐক্য ছিল না কিন্তু ছিল সাম্যের বন্ধন।

স্পেনীয়দের কাছে অবশ্য পাখির গান বা ফুলের গন্ধর চেয়ে ঢের বেশী আকর্ষণীয় ছিল এই সোনাদানা। মাত্র একশো বছরের মধ্যেই সীমান্তরেখা আঁকা হয়ে গেল। কলম্বিয়া ভাগ হয়ে গেল বারোটি খণ্ডে। সবার ভাষাগত ঐক্য চলে এলো এবং কি আশ্চর্য - এক এবং একমাত্র ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটল। ঔপনিবেশিকতার মূলমন্ত্র বোধহয় এই - তা সে যেই উপনিবেশ স্থাপন করুক না কেন! সেই ঔপনিবেশিকতার ফলশ্রুতি বর্ণবৈষম্যবাদ, তারও পরে বর্ণসংকর বা racial mixing। স্বাধীনতার পরেও ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা আর গৃহযুদ্ধের পরেও যে কলম্বিয়ানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি। তার দুটি কারন দেখিয়েছেন মার্কেস। “ one is talent for creativity ,the supreme expression of human intelligence, the other is a fierce commitment to self-improvement.”

এরপরই আমরা আবার ফিরে পাই অসীম রোমান্টিক মার্কেসকে । কলম্বিয়ার চারিত্রিক বিভাজন বোঝাতে বলেন “We have an irrational love of life but kill one another in our passion to love…In other words, the most heartless Colombia is betrayed by his heart”. এইখানে বর্ণনা আর গদ্য থাকে না, কবিতায় রূপান্তরিত হয়।





[endif]--পরবর্তী আলোচ্য বই ‘Doom of Damocles’ ![endif]--




ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যতকে নিয়ে উপস্থাপনা এই বইয়ের। ৬ই আগস্ট ১৯৮৬ সাল, প্রথম পারমানবিক বোমা ফাটার ঠিক একচল্লিশ বছর পর মেক্সিকোর ইক্সটাপা-জিহূয়াটানেও শহরে আলোচনায় বসে ছ টি দেশ- ভারত, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, তানজানিয়া, সুইডেন ও গ্রীস। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী। সভার মুল আলোচ্য বিষয় ছিল সমগ্র বিশ্বে পারমানবিক অস্ত্রের পরীক্ষামুলক বিস্ফোরণরোধ। প্রায় দশ পাতার এই বইয়ের প্রকাশক এদিতরেস ওভেয়া নেগ্রা (কলম্বিয়া) থেকে। কলম্বিয়া থেকে ছাপা বইটি স্প্যানিশ এবং ইংরাজি ভাষায় মাত্র তিন হাজার কপি ছাপা হয়। এদিতরেস ওভেয়া নেগ্রা এর আগে মার্কেসের ‘চিলিতে গোপনে’ (Clandestine in Chile) প্রকাশ করে। প্রথমেই ছাপে প্রায় আড়াই লক্ষ কপি। তারা কেন এই বই মাত্র তিন হাজার কপি ছাপল বোঝা রীতিমত কঠিন।

তখনো বিশ্বে পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ আরম্ভ হয় নি। মার্কেস মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে পৃথিবীতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার পরমাণু অস্ত্র বিদ্যমান- অর্থাৎ এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ প্রায় চার টন ডায়নামাইটের উপর বসে আছে। এরপর আমরা দেখতে পাই মার্কেসের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিক চেতনা। একজন তুখোড় গণিতজ্ঞর মত তিনি উদাহরণ দেন কি করে এই অস্ত্রশস্ত্রের বদলে পৃথিবীর উপকার সাধন করা যায়। ১৯৮১ সালে ইউনিসেফ হিসেব করে দেখে যে পৃথিবীর পঞ্চাশ কোটি শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য ও পানীয় জল জোগান দিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আসবে কোথা থেকে সে উত্তর তারা দিতে পারেনি। এর চেয়ে কিন্তু মাত্র ১০০ টি B-B1 বম্বার প্লেন বা মাত্র সাত হাজার ক্রুস মিসাইল কিন্তু বেশী দামী। অথবা, মার্কেস উদাহরণ দেন আরও; মাত্র ১৫০টি Mx মিসাইল এর খরচে সারা পৃথিবীর ক্ষুধার্ত লোকেদের খাদ্য স্বনির্ভর করে তোলা যায়। কিন্তু রোমান্টিক মার্কেস কে কতক্ষণ আর রাজনীতিক মার্কেস দমিয়ে রাখতে পারেন? এরপরই তাঁর সেই অমোঘ উচ্চারণ ! “ Since the appearance of life on Earth, 380 million years to go by to make a rose with no other commitment than to be beautiful and four geological eras for human beings-unlike their pithecanthropus great grandfather- to be able to sing better than the birds and die of love”. এই অবস্থা থেকে আবার একটি বোতাম টিপে সেই প্রাণহীন আদিম যুগে ফিরে গেলে মানবজাতির সম্মান কিছুমাত্র বৃদ্ধি পাবে না। তৎকালীন পরিস্থিতিতে কিন্তু মার্কেসের মানবজাতির প্রতি কোন দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ পায়নি। তিনি আশা করেছেন যে সুবুদ্ধির উদয় ঘটবে। কিন্তু যদি না ঘটে, তবে ধ্বংসের লক্ষ লক্ষ বছরের পরে যে প্রানের সৃষ্টি হবে তাদেরকে জানিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য যে আমরা এই ধ্বংস রোধ করতে পারতাম- কিন্তু করিনি। শান্তির কথা শুধু মুখেই বলেছি - শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিনি। আর তার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম এই ধ্বংস। তাঁর এই বক্তৃতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল রাশিয়া এবং আমেরিকার উপর। রোনাল্ড রেগন আর গর্বাচোভ দুজনেই একমত হয়েছিলেন এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায়।




এবার আসি তৃতীয় এবং সবশেষ বইটির কথায়।


The solitude of Latin America’-লেখকের নোবেল প্রাইজ বক্তৃতা । অসম্ভব দুষ্প্রাপ্য এই বইটি প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেন লেখক- প্রকাশক উইলিয়াম টার্গ। মার্কেসের আপত্তিতে আর বইটি প্রকাশ করা হয়ে ওঠে নি। গোটা পৃথিবীতে মাত্র ১২ কপি অক্ষত আছে! মার্কেসের বই বারো কপি থাকলে তা যে দুষ্প্রাপ্য আর দুর্মূল্য হবে তা আর আশ্চর্য কি! এই ছোট বইটিতে তুলে ধরা হলও ইতিহাস- ম্যাজিক রিয়ালিজম এর ইতিহাস, কলম্বিয়ার ইতিহাস, সমগ্র লাতিন আমেরিকার ইতিহাস। সোনার খোঁজে আসা স্পেনীয়দের নৃশংসতা, বর্বরতার আর বিশ্বাসঘাতকতার কথা। উপনিবেশিকরা যেখানেই গেছে, সেখানের রীতিনীতি , সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় আচার না বুঝেই নানারকম অলৌকিক গল্পের জন্ম দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মার্কেস বলেন আন্তনিও পিগাফেতার কথা। আন্তনিও ছিলেন ম্যাগেলানের সঙ্গী। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে এরকম অনেক অদ্ভুতুড়ে অলৌকিক গল্প প্রচার করেন লাতিন আমেরিকা সম্বন্ধে। তিনি নাকি এমন এক ধরনের শূয়র দেখেছেন যার নাভিটা পিঠের দিকে। এমন এক জন্তু দেখেছেন যার মাথা আর কান অশ্বতরের মত , দেহ উটের মত আর পা হরিণের মত। ম্যাজিক রিয়ালিজম এভাবেই দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিটি কোষে প্রতিটি রন্ধ্রে সতত বিরাজমান। পরবর্তী কালে , আধুনিক যুগে আবার ইউরোপ আর আমেরিকার অন্ধ অনুকরণের কারনে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির মতো দক্ষিণ আমেরিকার সাংস্কৃতিক গতিপথ সম্পূর্ণভাবে বদলে যাচ্ছে। সবশেষে আবার আশাবাদী মার্কেস। Neither floods, nor plagues nor famines, nor cataclysms, not even eternal wars lasting centuries and centuries have succeeded in reducing the tenacious advantage of life over death.” তিনি স্বপ্ন দেখেন এক utopian পৃথিবীর যেখানে কেউ অন্যের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। যেখানে প্রেম শাশ্বত আর যেখানে আনন্দ চিরস্থায়ী হবে । যেখানে লোকে ১০০ বছরের নিঃসঙ্গতায় নির্বাসিত হলেও জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার অধিকার হারাবে না।

মার্কেসের বেশীর ভাগ বইয়েই রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু আমার এই লেখার বিষয় মার্কেসের রাজনৈতিক চেতনা শুধুমাত্র এই তিনটি বইয়ে কি ভাবে ধরা ফুটে উঠেছে তার এক সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। আলোচিত তিনটি বই কিন্তু বই হিসেবে উল্লেখিতই হয়নি জেরাল্ড মারটিনের লেখা মার্কেসের জীবনী ( Gabriel Garcia Marquez- a life) এ। আর এই তিনটি বইই কিন্তু প্রকাশিত হয় লাতিন আমেরিকা থেকে। মার্কেসের বেশীর ভাগ বইয়ের প্রকাশক অ্যালফ্রেড নফ বা হারপার এন্ড রো , কখনো কখনো লন্ডনের জোনাথন কেপ। তারা অনেক বড় প্রকাশক, প্রচারে অনেক বেশী উদ্যোগী। এটাই কি কারণ বইগুলি দুষ্প্রাপ্য হবার? মার্কেসের বামপন্থী চিন্তাধারা, ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁকে করে তুলেছিল আমেরিকার চক্ষুশূল- এমনকি আমেরিকা তাঁকে ভিসা দিতেও অস্বীকার করে। হয়ত সে জন্যই আমেরিকার প্রকাশকরা উদ্যোগী হয়নি এই প্রধানত রাজনৈতিক লেখাগুলি প্রকাশ করতে, যদিও তারা অত্যন্ত আগ্রহী ছিল উপন্যাস বা গল্প প্রকাশ করতে। অথবা মার্কেস নিজেই হয়ত চান নি যে এই বইগুলি আমেরিকা বা ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হোক। এতদিন পরে এই বক্তৃতাগুলির একটি সঙ্কলন বেরনোয় আমরা চিনতে পারি মানুষ মার্কেসকে আর অনুভব করতে পারি মার্কেসের রাজনৈতিক চেতনার এক সম্যক প্রতিচ্ছবি। মার্কেসের অনুরাগী পাঠকদের কাছে তাই এই বই তিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮