• শুভাশিস ভট্টাচার্য

কবিতা-না-কবিতা এবং কিছু অধুনান্তিক ভাবনা

‘অধুনান্তিক’ ভাবনা কোনো নিছক সাহিত্যতত্ত্ব নয়, এটি আমাদের আর্থ-সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক কালখণ্ডের যুগলক্ষণ। এই কালখণ্ডে আমাদের ভাবনা, সরল রৈখিক না হয়ে, হয়ে উঠেছে বহুমুখী, এবং কোন একটি কেন্দ্রে ঘনীভূত না হওয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে ভাবনার বিশৃঙ্খল জটিলতা। পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চলছে অস্তিত্বের জন্য অবিরাম লড়াই (struggle for existence) । লড়াই চলছে পৃথিবীর পরিমিত প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য । প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ডারউইন সাহেব বলেছিলেন যে অস্তিত্বের লড়াই শেষ হলে, যে যোগ্যতম সে বেঁচে থাকবে (survival of the fittest)। অবশ্য সব লড়াই শেষ হলে, যোগ্যতম যে বেঁচে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কেননা শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই মৃত ('In the long run we are all dead' -Keynes ) । জীবনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে আর আমাদের ভাবনায় সেই অনিশ্চয়তার প্রতিফলন হচ্ছে।

এই কালখণ্ডে সর্বব্যাপী ডিজিটাল মিডিয়া আমাদের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করছে সর্বক্ষণ। সর্বব্যাপী টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, আমাদের পারিপার্শ্বিক প্রত্যক্ষ বাস্তবতার ভাবনাকে, একই সময়ে যুক্ত করছে পৃথিবীর অন্য-প্রান্তে হতে থাকা অপ্রত্যক্ষ বাস্তবতার সাথে এবং দূরের কল্পলোকের সাথে । আমরা একই সাথে অনেক কিছুর সাথে যুক্ত। আর একসাথে অনেক কিছুর সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে আমরা সমস্ত কিছু থেকে অসংযুক্ত। আমাদের এই কালখণ্ডে ভাবনার এই বিশৃঙ্খল জটিলতাই আমাদের চালিকা শক্তি। আমাদের অধুনান্তিক বিশৃঙ্খল ভাবনার জটিলতা ধরতে , চাই অধুনান্তিক ভাষা। আজ এই আর্থ-সামাজিক পরিসরে , বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের কথ্য ভাষার সাথে, বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়ার ভাষা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন এবং উন্মুক্ত বাজারের ভাষার সংকরায়নে তৈরি হচ্ছে অধুনান্তিক ভাষা।

আজকের অধুনান্তিক বিশৃঙ্খল জীবনের অনিশ্চয়তাকে ছুঁতে, বিউটি পার্লারের সাজানো গোছানো, নিটোল সুন্দর, ছকে বাঁধা কৃত্রিম ভালো কবিতা নয়, চাই জীবনের মত অনিশ্চিত, জীবনের মত অগোছালো কবিতা।জামাকাপড় দিয়ে ঢাকা , সুন্দর মোড়কে মোড়া, শপিং মলের জানলায় বসানো, সাজানো নকল জীবন নয়, চাই মুখোশ-হীন সত্যিকারের জীবন। চাই আবরণহীন জীবনের নোংরা লাগা দেহ, মন সবকিছু সহ এক সৎ কবিতা। আর চাই সেই সৎ কবিতার স্বচ্ছ আয়না। সেই সৎ কবিতাকেই আমি কবিতানা অথবা নাকবিতা বলছি।


আয়নায় কাজ দেখানো। সে ভালো, মন্দ বিচার করে না। জীবনকে সৎ ভাবে দেখানো ছাড়া আর কোন নৈতিক দায় কবিতা'র নেই। আশা করি কবিতার আয়নায় প্রতিফলিত জীবন, এই স্বাধীনতা দিবসে, আমাদের ছকে বাঁধা সাজানো ভালোর শাসন থেকে মুক্তি দেবে।


অবশ্য, এই কবিতার আয়নায় প্রতিফলিত জীবনের মুখ সবার ভালো নাও লাগতে পারে। আয়নায় প্রতিফলিত মুখের জন্য আমরা আয়নাকে দোষারোপ করতে পারি না। আমরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারি, অথবা, মনপসন্দ রূপ না দেখানোর জন্য আয়নাকে ভেঙ্গে ফেলতে পারি। কিন্তু তাতে আমাদের জীবনের বা সমাজের মুখ বা চরিত্র বদলে যাবে না। তার চেয়ে বরং, কবিতার আয়নায়, আমরা নিজেদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। আর সেখানেই কবিতার সার্থকতা।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮