• বর্ণালী মুখোপাধ্যায়

গল্প - অরণ্যদেব ও ডায়না

হোকে যে আদতে ছেলে সে কথা জানে সে আর আমি। হোকে যে এই গল্পের শেষটায় পৌঁছে অরণ্যদেব হয়ে যাবে সেটা সে জানে না অথচ আমি জানি। আমাকে জানতেই হবে অনেক কিছু,কারণ শেষ অবধি তার গল্পটা যে আমাকেই লিখতে হচ্ছে। অথচ আমিই কি তাকে আদৌ চিনি?


আমি দেখেছি একটা হিলহিলে শরীরের ঘন কালো মেয়ে,যার মাথার ঢেউ দেওয়া লাল চুল গুলি একেবারে সিংভূমি মাটির ভোরবেলার রঙ।সে টাটাদের ইস্পাত কারখানায় আনস্কিল্ড লেবার। ঠিকাদার বুধা সিং বলে, এই মেয়েটা খাটতে পারে খুব,কিন্তু দিল্লাগী বরদাস্ত করে না। হোকে যখন শালের বনে সরসিয়ে হেঁটে যায় অথবা সাইকেল চালিয়ে স্টেশন পেরিয়ে এ শিফ্টের কাজে চলে,একেবারে ময়াল সাপের মতো দেখায় তাকে।এই পর্যন্ত আমিও জানি,তার বাপ বুরাণ জানে,আর জানে ডুমনি। কিন্তু তার চেক শার্ট পরা শরীরের ভিতর আর একটা অন্য শরীর যে হোকে বয়ে নিয়ে চলে অহোরাত্র তার কথা জানে শুধু হোকে, আমি তো কোন ছাড়! বাদাম পাহাড়ের সর্বজ্ঞ গুনীন সোমারু কারবাই তো এরম কেস ফার্স্ট টাইম পেয়ে ভয়ানক ঘাবড়ে গেছিল আধ ঘন্টা তক।


হোকেদের ঘর বাদাম পাহাড়ের ঠিক নিচে,যেখানে সূর্যের আলো ছায়াবাজি হয় নিমেষে। ঘন শাল মহুয়ার জঙ্গলে তার বাপ ছাগল চড়ায়।মা শাল পাতার ঠোঙা বানায় সারা দিনমান। মেয়েতে বাপেতে মায়েতে কোন কথা নেই। সে বরং হোকের দিদির সঙ্গে গভীর বুনোট ছিল মায়ের মনের। দিদির বিয়ে হয়েছে গনেশ লোহারের ঘরে। বিরসানগর চার নম্বর জোনে তার ভরন্ত সংসার। দিদি লক্ষ্মীমন্ত সংসারের আড়ালে দারুর ব্যবসা করে। তার নতুন নাম ডলি লোহার।তার সঙ্গে ও হোকের পটে না। হোকের পটে শুধু বুধনির সঙ্গে।


কাজ থেকে ফিরে হোকে ঘরের কোণে রাখা হাঁড়িয়াতে চুমুক মেরে বুদনিকে ডাকতে যায়। বুদনির ঘর গাঁ এর শেষ প্রান্তে। একা থাকে। সে একজন বিধবা খতরনাক ডাইন। তারা দুজনে মিলে গ্রাম প্রান্তের অশ্বথ্থ গাছের ছায়ায় বসে।


আসন্ন শীতে কুসুম গরম সেই ভূখণ্ডটি। হোকে অশ্বথ্থের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে মৌজ করে।এবং বুদনিকে দেখে। এখান থেকে সামান্য দূরে একখন্ড সবুজ ঘাসের জমি আর টলটলে জলের ছোট্ট এক তালাও। পাহাড় থেকে তিরতির করে নামা নদীটা খামোকা -আর আগে যাবেক নাই গো ,বলে থেমে গেল ঠিক এখানে এসে হোকের পায়ের কাছে। ঐ বুড়ো অশ্বথ্থ এবং ঐ তৃণভূমি সমেত ছোট্ট জলাশয়ের ধারেকাছে মোটে কেউ ঘেঁষে না। বাদাম পাহাড়ের আশে পাশে যতো জঙ্গল, ঝোপ, মেঠো গাঁ আর সে গাঁয়ের লক্ষ্মী মেয়েরা, বাপের যোয়ান ছেনা ,ডবকা মরদ,সক্কলে এই সবুজ খন্ডটিকে এড়িয়ে চলে। এটি একটি সীমানা যেন,এর পরই শালের গভীর অরণ্যটি শুরু হলো ।আর কেউ নয়, কেবল তারা দুটিতে ছাড়া ! ডাইন বুদনি আর তার সঙ্গী খেলা ঘর বেঁধেছে ঠিক এইখানে। অশ্বথ্থের গুঁড়ির কাছে ইয়া একটা হাঁমুখ,সে যেন মানুষের মাথার খুলি। গুনীনের কাছে যেমন মাথার খুলি আছে একদম তেমনটা।


কোন কোন চান্দ্র তিথিতে গভীর রাতে বুদনি ঐ গাছটার কাছে আসে। মাটির হাঁড়িতে রক্ত অথবা আসব পান করে। মণ্ত্র পড়ে। অতঃপর নাচ শুরু হয়। শরীর থেকে শেষ ত্যানাটিও খুলে ফেলে সে নগ্ন নাচ নাচতে থাকে। যদি কোন মানুষ চাঁদের আলোয় ভুলেও সে নাচ দেখে ফেলে তো রক্ত উঠে আসবে মুখে তার।অব্যর্থ। কিন্তু হোকে কে আটকাতে পারে না বুদনি। হোকের জন্য তার অবাধ প্রশ্রয়। হোকে ঐ কোটরের ভিতর লুকিয়ে বসে কতোবার সে নাচ দেখে শরীরে আলোড়িত হয়েছে। বুদনির অতি বৃহৎ স্তন ,বাঁকানো গ্রীবা , দীর্ঘ কালো হাত দুটো তার শরীরের ভিতরের অন্য শরীরটাকে অপরূপ যাতনায় বিদ্ধ করতে করতে বলে দিয়েছে তু মরদ বটেক হোকে।


খুব যেদিন জোছনা চাগাড় দিল, ,পাহাড়িয়া ঢালু দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে নীল আলো মরা সোঁতাটার বুকে সেঁধিয়ে গেল , ইমলি গাছের নিচে যেদিন মোড়লের বিচার সভা বসে, বা পঞ্চায়েতের তরফ থেকে কম্বল বিলিতে গোটা গ্রাম লালচির মতো উপচে পড়ে লণ্ঠনের আলোয়,হোকে আরাম করে অশ্বথ্থের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে। ওর ঝোলা শার্টের পকেটে একটা দিশির বোতল থাকে,বুদনিকে চুপিচুপি ডেকে আনে ও। দুজনে স্যাটাস্যাট তিন চার চুমুকে খালি করে দেয় বোতল। বুদনি ফিনিক দিয়ে হাসে। সেই হাসি দিশি দারুতে মিশে হোকের সারাদিনের খেটে মরা হাত, পা, শিরা উপশিরায় ঝিনঝিনিয়ে ওঠে, আনন্দ মাদল বাজায়,দ্রিম দ্রিম। বুদনি তার দীর্ঘ হাতটি হোকের বুকের উপর রাখে,সমান্তরাল সেই বুকের ভিতর যে মরদটি তৃষায় কাতর ,সে তৎক্ষণাৎ জাপ্টে ধরে খুব আদরে,ডাইনের নরম ও ভরা শরীর। সে বুদনিকে চুমু খায়,আর শঙ্খ লাগা সাপের মতো স্থির পড়ে থাকে দুজনেই। ডুমনি টুড্ডু ঐ রাস্তা দিয়ে কম্বল নিয়ে ঘরে ফিরতে গিয়ে এই নিষিদ্ধ দৃশ্যটি দেখে ফেলে। তার পলক পড়ে না। খানিক পরে সম্বিত এলে সে বোঝে এ হলো কুহকিনী মায়া। ভীতু খরগোশের মতো পালায় সেখান থেকে ।


আবার পরদিন হোকে যখন টাটানগরে ঠিকাদারের লেবার হয়ে খাটতে যায়,সাইকেলে বসে,মাথায় হেলমেট আর চেকশার্টটি পরে,ডুমনি বুরানকে গিয়ে আগাপাশতলা সব বলে দেয়। বুরান ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়ে গুণিন সোমারুর পায়ে পড়ে,আর সোমারু ভেবে চিন্তে তিনটে মুরগা আর দু হাঁড়ি হাঁড়িয়া সমেত তাকে আসতে বলে বাদাম পাহাড়ের খাড়াইয়ে।


তারপর খুব যা হোক শলা করে ঠিক হয়,হোকে কে ঝাড় ফুঁক করে ঠিক করা যাবেখণ,তার ঘাড়ে কোন মরদের আত্মা চেপেছে বটে,ঐ বুদনির মরদটাই হবে, কিন্তু বুদনির কি গতি?


ইমলির তিরতিরে ছায়াতে বসে গাঁ বুড়োরা শলা করলো খুব সাবধানে বুধনির ঘরটাকে মণ্তর দিয়ে বাঁধতে হবে,তারপর,কেরোসিন চাই ,অনেকটা মিট্টি তেল দরকার,পাঁশের গাঁ এর পুলিশ চৌকিতে পৌঁছে দিতে লাগবে একটা খাসি,রূপেয়ারও যোগান চাই বটেক।


হেমন্ত বাতাসে লাল চুল উড়িয়ে হোকে যখন গাঁয়ের পথে ফিরছে,দিগন্তছোঁয়া সর্ষে ক্ষেতের পাশটিতে তার জানেমন দাঁড়িয়েছিল। ডাইনের ঠোঁটদুটি থরথরিয়ে কাঁপছিল,ভয়ে। একটু দূরে খাপড়ার একচালা ঘরটির পিছনে একটি লাল সিঁদুরের টিপ অবৈধ আকাশের কপালে লেপ্টে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।


নারীটি তার প্রিয় নারীটির কাছে আশ্রয়ের তাড়নায় ছুটে এসে বললো-ভালোবাসো?

সে কিছু বলতে পারে না,এই আদিভূমি তাকে প্রেমের কথা অতো শেখায় নি,শুধু বললো-হুঁ।

মায়াবী নারী বললো-আমাকে পুড়িয়ে মারবে,আমি জানি।


অমনি হোকে সাইকেলটির মুখ ঘোরালো শহরের দিকে। বল্ল-উঠে বোস। ঠিকাদারকে বলে তোকেও কাজে লাগিয়ে দেব বুদনি। এক সাথে ঘর বাঁধি চল। । টাটা কি রৌরকিল্লা কি কলকাত্তা।


গভীর কুয়াশা নামল আলপথ জুড়ে। তার উপর দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছে হোকের সাইকেল।বুদনিকে দিয়ে কিরা কাটায় গভীর আশ্লেষে, তার ঘাড়ে ঠোঁট গুঁজে, শহুরে যোয়ান পেলে আমাকে ভুলবে না তো বৌ!!ভুলবে না!!বলো বলো,

বয়সে বড় বুদনির ভালোবাসায় চোখ মুদে আসে। সে ফিসফিস করে, তুয়ার থিক্যে যুয়ান!!


অরণ্যদেব ডায়নার শরীরে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে হুহু করে সোডিয়াম ভেপারের আলোপথ খুঁজতে চলে গেল। । সাইকেল করে যাবো রে

রৌরকিলা যাবো রে---

সেদিন কতো যুগ পরে পৃথিবীর শরীর ঘেঁষে মস্ত থালার মতো চাঁদ উঠেছিল।

বাদাম পাহাড়ের লোকজন চাইলেও সেই দুষ্টু ডাইনটাকে অরণ্যদেব বাঁচিয়ে রাখলো।

আমি না চাইলেও হোকের গল্পটা আদতে প্রেমের গল্প হয়ে রইলো। অরণ্যদেবের সবকটা গল্পই তো তাই।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮