• রাহুল দেব লাহিড়ী

গল্প - কালু

জামশেদপুর শহরের সাকচি বাজারে কালু কে চেনেনা, এরকম লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কালু একটা বারো-তেরো বছরের ছেলে। গুপ্তাজি র চা এর দোকানে কাজ করে। দোকানেই থাকে। চায়ের বাসন ধোয়া, খদ্দেরকে চা এগিয়ে দেওয়া, অন্য দোকানে চা পৌঁছে দিয়ে আসা, এসব করাই ওর কাজ।

কালুর সাথে আমার পরিচয় ছিলোনা সেভাবে। গুপ্তাজির দোকানে চা খেতে যেতাম নিয়মিত। দেখতাম কালুই মহামায়া হয়ে দশ হাতে একাই গোটা দোকান সামলাচ্ছে গম্ভীর মুখে। অতটুকু ছেলে, মুখে হাসি দেখিনি কখনো। প্রচুর এনার্জি। চা ছাঁকা থেকে শুরু করে খদ্দেরকে এগিয়ে দেওয়া কাপ এ ঢেলে, কাপ ধুয়ে রাখা, খদ্দের এর ফরমায়েশ মত বিস্কুট বার করে দেওয়া বয়াম থেকে, সবই করছে একা হাতে। ক্লান্তি নেই। রাতে নাকি দোকানের ভেতরই থাকে। কালুর সম্পর্কে কৌতূহলী হলাম একদিন একটা ঘটনা শুনে।

দোকানে বসা কয়েকজন খদ্দের কালুর সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন। এটুকু বুঝলাম, কালুকে গুপ্তাজি পেয়েছিলেন নাকি একটা মাদি কুকুরের কাছে, এক শীতের ভোরে দোকানের সামনে। তারপর থেকে সে গুপ্তাজির কাছেই মানুষ। বড় হয়েছে গুপ্তাজির বাড়িতেই। গুপ্তাজির ছেলেপেলে না থাকায় গুপ্তাজির স্ত্রী সন্তান স্নেহে মানুষ করেছেন ওকে। দুপুর বেলা দোকানে খরিদ্দার কম থাকায় গুপ্তাজির সাথে বসা শুরু করলাম নিয়মিত। ধীরে ধীরে অনেক কিছু জানা গেল।


গুপ্তাজি কালুকে পেয়েছিলেন এক শীতের সকালে দোকান খোলার সময়। তখন দোকানের সামনে একটা মাদি কুকুর বাচ্চা দিয়েছে। দোকানের সামনের উনুনে ওম থাকায় ওর তলে শুয়ে থাকে। দোকান খোলার সময় কুকুরের বাচ্চার কুঁই কুঁই শব্দের সাথে মানুষের বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনতে পান তিনি। তাকিয়ে দেখেন একটা মানুষের বাচ্চা, তিন চার দিন বয়েস হবে, কুক্কুরীর বুকে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, কষে দুধ লেগে রয়েছে। মাঝে মাঝে কেঁদে উঠলে কুক্কুরী নিজের থাবা দিয়ে বাচ্চার মুখ নিজের দুধের বোঁটায় ধরলেই বাচ্চাটা দুধ খাওয়া শুরু করছে। গুপ্তা জি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে গিয়ে বউ কে জানালেন সব চুপিচুপি। ওনার বউ ফুলমতি তখন পুজোর ঘর থেকে বেড়িয়েছেন সদ্য। স্বামীর সাথে ছুটলেন ঘটনা দেখতে আলুথালু বেশে। বাড়ি থেকে দোকানের দূরত্ব মেরেকেটে ২০০ মিটার। পাঁচ মিনিটের পথ।

দুজনে যখন পৌঁছলেন দোকানের সামনে, কালু তখনো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার কুক্কুরী মায়ের পেটের ওপর মাথা রেখে। পরম যত্নে আর কুক্কুরীর সামান্য ঘরঘর করে আপত্তি সত্ত্বেও কালুকে বাড়ি নিয়ে এলেন তাঁরা।

কালু বড় হতে লাগলো তার নতুন বাবা মায়ের কাছে। শুধু একটাই সমস্যা তৈরি হল। অতটুকু বাচ্চা কিছুতেই দুধ খেতে চাইতোনা। দুধের বোতল মুখের কাছে ধরলেও হাত পা ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানাতো। একদিন ফুলমতি রান্না ঘরে ছিলেন। কালু শুয়ে ছিল ঘরে। হঠাৎ খেয়াল করেন, ঘর থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না। বুক টা ছ্যাঁত করে ওঠে। দৌড়ে ঘরে গিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। কালু পরম নিশ্চিন্তে দুধ খাচ্ছে তার কুক্কুরী মায়ের বুক থেকে। সেটা তক্কে তক্কে ছিল, দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে ঘরে। তারপর কালুর কাছে পৌঁছে তাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। কালুর পরমানন্দে হাত পা ছোঁড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে খুব আনন্দিত। কুকুরটা করুণ চোখে তাকায় ফুলমতির দিকে। ফুলমতির চোখে তখন জল। মানা করতে পারেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকেন এই অদ্ভুত দৃশ্য।

এরপর এটাই রীতি হয়ে যায়। সেই কুক্কুরী প্রতিদিন তিনবার করে এসে কালুকে দুধ খাইয়ে যেতে থাকে। কালুও যেন বেশি খুশি হত এই মায়ের কাছেই। গুপ্তাজি আর তাঁর স্ত্রী কোনোদিন কাউকে কিছু জানাননি এ ব্যাপারে।

কালু বড় হচ্ছিল খুব তাড়াতাড়ি। বাবার সাথে দোকানেও যেত ছোট্ট কালু মাঝে মাঝে। কিন্তু কিছু অদ্ভুত আচরণ ধরা পড়তে থাকে কালুর ভেতর ধীরে ধীরে। যেমন ওর বয়েস যখন সাত আট বছর গুপ্তাজি লক্ষ্য করেন, কালু একটা রাস্তার কুকুরকে অবলীলায় কোলে তুলে নিয়ে তার বুকে মুখ লাগিয়ে দুধ খাচ্ছে। কুকুরটাও পরম নিশ্চিন্তে লেজ নাড়াতে নাড়াতে উপভোগ করছে এটা। গুপ্তাজি ধমক দিতেই কালু নামিয়ে দেয় কুকুরী টাকে মাটিতে। তারপর হাঁটা দেয় দোকানের দিকে।

কালুর মুখে কথা ফুটলনা অনেক চেষ্টাতেও। কিছু চাওয়ার হলে কালু কুকুরের মত ঘরঘর শব্দ করত মুখ দিয়ে। ওর মা, ফুলমতি বুঝতে পারতেন সে কি চায়। কালুর হাত আর পায়ের নখ গুলো অস্বাভাবিক দ্রুততায় বাড়তো। তাছাড়া অন্ধকারে চোখগুলো জ্বলজ্বল করত। যে কেউ দেখলে ভয় পাওয়ার কথা। বাড়িতে বিভিন্ন লোকের যাতায়াত। তাই গুপ্তাজি রা দুজনে ঠিক করলেন কালু রাতে দোকানে থাকবে।

দোকানে থাকা শুরু করতেই কালুর মধ্যে আরো কিছু অস্বাভাবিক আচরণ তৈরী হচ্ছিল। সে রাতে ঘুমোত না কিছুতেই। গুপ্তাজি তাকে ভেতরে রেখে দোকান বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দিয়ে আসতেন। শুনতে পেতেন নখ দিয়ে আঁচড়ানোর খর খর আওয়াজ আর দুর্বোধ্য গোঙানি। দোকানের সামনে অনেক কটা রাস্তার কুকুর জমা হত ততক্ষণ।

কালু বাবা আর মা কে শ্রদ্ধা করত অসম্ভব। কথা বলতে না পারা পুষিয়ে দিত সেবা আর যত্ন করে। ফুলমতি তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিতেন আর কালু মাথা নিচু করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকত। কালুর শোয়া টা ছিল অদ্ভুত মুদ্রায়। সে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকত দুপুরবেলা। সারারাত জেগে থাকতো বোধ হয়। তাই দিনের বেলা একটু ঝিমিয়ে থাকতো। সন্ধের পর থেকেই কালুর মধ্যে অদ্ভুত একটা চঞ্চলতা ফুটে উঠত। আমি ততদিন কালুকে নিয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে পড়েছি।

কালুর সাথে গল্প করার চেষ্টা করতাম মাঝে মাঝে। দেখতাম রাস্তায় কুকুরের ডাক শুনলে বা ঝগড়া শুনলেই সে উৎকীর্ণ হয়ে শুনছে। যেন বুঝতে পারছে পুরোটাই। আমার সমস্ত কথা বুঝতে পারতো সে। কোনো উত্তর দিতনা। শুধু উদগ্রীব হয়ে শুনলেই দেখতাম ঘাড় টা হেলে যেত একদিকে। আরেকটা কথা বলা আবশ্যক এখানে। পূর্ণিমা এলেই কালু কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠত। আকাশের দিকে তাকাতো ঘনঘন। আমাকে খুব খাতির করত কালু। গেলেই অল্প চিনি দিয়ে চা এগিয়ে দিত 'মালাই মারকে'।

শুধু একজন ছিল কালুর দু চক্ষের বিষ। ছেলেটার নাম মানস। সে ছিল উঠতি মস্তান। একটা খারাপ স্বভাব ছিল তার। রাস্তার কুকুর দেখলেই লাথি মারতো। কালু ওকে দেখলেই কেমন যেন ক্ষেপে যেত। মানস দোকানে এসেই হুকুম করত, "এ কুত্তে কে আওলাদ, চায়ে লা" কালুর উদ্দেশ্যে অবশ্যই। গুপ্তাজি গম্ভীর হয়ে যেতেন, কিছু বলতে পারতেন না। মানস তখন দাপুটে গুন্ডা। ওয়াগান ব্রেকার হিসেবে যথেষ্ট নামডাক। কালু কিন্তু কিছুতেই চা এনে দিতনা মানসকে। জ্বলজ্বলে হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকত শুধু। গুপ্তাজিকে বাধ্য হয়ে চা এনে দিতে হত। মানস কে বোঝাতেন, বাচ্চা হ্যায়, মাফ কর দিজিয়ে। অতবড় বয়স্ক লোকের মুখে মাপ করার কথা শুনে মানস বিকৃত আনন্দ উপভোগ করত নিশ্চই।

মানস একবার ধরা পরে গেল পুলিশের কাছে ওয়াগান ভাঙতে গিয়ে হাতেনাতে। বিচারক পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন। আমরাও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। সবচেয়ে খুশি হল কালু। তার চোখদুটো সারাদিন যেন খুশিতে চকচক করতে লাগলো।



জেল থেকে বেরিয়ে এসে মানস যেন আরো হিংস্র হয়ে উঠলো। তার ধারণা হয়েছিল, কুকুরের পাল নাকি চিৎকার করে মানসের দল কে ধরিয়ে দেয়। তাদের দলের পান্ডা ছিল যে দশাসই লালচে রঙের কুকুরটা, মানস তাকে খুঁজে বেড়াত প্রায়ই। মুখে বলতে শুনেছি, "একবার মিল যানে সে সালী কো জিন্দা জ্বালা দেঙ্গে", সে যে সত্যি সত্যি বলছে বুঝিনি ঘুণাক্ষরেও।

একদিন ভোরবেলা শুনি মোড়ের মাথায় প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে। দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি বীভৎস কান্ড। মানস সেই লালচে কুকুরটাকে বেঁধে রেখেছে একটা ল্যাম্প পোস্ট এর সাথে। হাতে উদ্যত পিস্তল। মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজ কুকুরটার উদ্যেশ্যে। ভোরবেলা প্রচুর লোকজন জুটে গেছে তখন। কুকুরটা অস্থির আর্তনাদ করছে। মানসের হাতে একটা কেরোসিনের ক্যান ধরা। আরেক হাতে পিস্তল। কেউ এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতেও সাহস পাচ্ছেনা। হঠাৎ দেখি মানস উপুড় করে কেরোসিন ঢেলে দিচ্ছে কুকুরটার ওপর। এতক্ষন বুঝিনি। এবার বুঝলাম মানস সত্যি সত্যি কুকুরটাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে আজ। গায়ের রক্ত হিম হয়ে এলো আমার। মানস একটা হিংস্র চাহুনি দিয়ে তাকালো দর্শকদের দিকে। তারপর দেশলাই জ্বেলে আগুন ধরিয়ে দিলো কুকুরটার গায়ে। কুকুরটা তখন জান্তব আর্তনাদ করছে আর ছটফট করছে অসহ্য যন্ত্রনায়। আমরা অসহায় দর্শক হয়ে দেখছি এই নারকীয় কান্ড। কারো এগিয়ে যাওয়ার সাহস নেই পিস্তলের ভয়ে।

হঠাৎ দেখি পেছন থেকে কালু ছুটে আসছে মানসের দিকে। সে কেমন করে যেন জানতে পেরে দোকানের দরজা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে রাগে ঘৃণায় আর প্রতিশোধ স্পৃহায়। মানসও কেমন থমকে গেছে দেখলাম। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেতেই চিৎকার করে বারণ করে উঠলো কালুর উদ্দেশ্যে। হুমকি দিল, কালু আর এগোলেই সে গুলি করবে এবার। কালু থামলনা তাতেও। ছুটে আসতে লাগলো। সাথে মুখে একটা জান্তব আওয়াজ। মানস মুহূর্তের মধ্যে গুলি চালালো কালুকে। কালু সেই গুলি খাওয়া অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়লো মানসের ওপর। গোটা ঘটনাটা ঘটতে ৭-৮ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগেনি। আমরা ভয়ে আতঙ্কে স্থির হয়ে দেখছি। কালু মানসের কণ্ঠনালিতে সরাসরি কামড় বসালো দেখলাম। মানসের সব প্রতিরোধ বিফল হল। মানস ছটফট করে স্থির হয়ে যাওয়া অবধি কালু ধরে থাকলো কন্ঠনালী। আগুন দেওয়া কুকুরটাও ততক্ষণ স্থির হয়ে গেছে।

গুপ্তাজি আর ফুলমতি ছুটে এলেন। কালু ততক্ষণ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। কালু আর মানস দুজনকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কেউই বাঁচেনি।

শ্মশান থেকে ফিরে আসার পর সে রাতে। গুপ্তাজি আর তাঁর স্ত্রীর সাথে পাড়ার কুকুরগুলো চিৎকার করে কেঁদেছিল সারারাত। স্বজনবিয়োগ।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮