• প্রদোষ সেন

গল্প - দেশদ্রোহী ?

এটা বেশ কয়েক বছর আগেকার ঘটনা। ২৬/১১ মুম্বাইয়ের ঘটনা তখন ও ঘটেনি। হোটেলের ঘরে চেক্ ইন করতে তখনো আইডেন্টিটি কার্ড দেখাতে হত না। দৈনন্দিন জীবনটা তখন আজকালকার মত এতো জটিল হয়ে ওঠেনি।


সেবার শীতের ছুটিতে ঠিক করলাম গ্যাংটক যাব, সেখান থেকে আশেপাশের আরো কয়েকটা জায়গা। শীতের সময় ঠাণ্ডার জায়গায় যাওয়ার একটা মজা আছে। আমার স্ত্রী ও ছেলে বলতেই রাজি হয়ে গেল। বলে রাখা দরকার এটা ভ্রমণকাহিনী লিখতে বসিনি তাই যাওয়ার কথার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে সময় নষ্ট করব না। একটা মোটামুটি ভাল হোটেলে ঘর পেলাম - হোটেলটা বড় না হলেও বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। সামনে ও পাশে সুন্দর একটা লন্ আছে, আর সবচেয়ে যেটা ভাল তার হল আকাশ পরিষ্কার থাকলে ঘর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। বেশ ঠাণ্ডা, মনে হল ৮-৯' হবে – আর রৌদ্রজ্জ্বল দিন - প্রথম দিনটা পায়ে হেঁটে ঘুরে ভালই কাটল। পাহাড়ী জায়গা- তাছাড়া প্রথম দিন সবাই একটু ক্লান্ত বোধও করছিলাম। ছেলে যখন আটটা নাগাদ বলল 'খিদে পেয়েছে' ঠিক করলাম একেবারে ডিনার করে ঘরে যাব। মনে হয় ঘণ্টা খানেক লাগল ডিনার করতে, স্ত্রী কে বললাম "তোমরা ঘরে যাও, আমি আসছি"

"আমি আসছি"র মানে ও জানে - এখন সিগারেট খাবে। আমার দিকে এমন করে তাকালো, তার মানে হল "তোমাকে বলে কোন লাভ নেই"- তার পর ছেলেকে নিয়ে ঘরের দিকে গেল। তখনও পাবলিক জায়গায় সিগারেট খাওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হয়নি - কিন্তু আমি আবার রাবরই একটু সচেতন মানুষ। তাই ভাবলাম একটু বাইরে গিয়ে লনে স্মোক করব। সেই ভেবে বাইরে যাচ্ছি - "বাঙালি নাকি?" - কথাটা আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা, কারণ কাছাকাছি আর কেউ নেই। তাকিয়ে দেখলাম রেস্টুরেন্টের কোণের দিকে জানলার পাশে একজন ভদ্র লোক বসে, উনি ই কথাটা বলেছেন।


দাঁড়িয়ে গেলাম, বললাম - "হ্যাঁ, আপনি ও তো বাঙালী মনে হচ্ছে?"

"ইয়েস স্যার,বসুন না" - ইশারায় আমাকে সামনে রেখে চেয়ারে বসতে বললেন।

সিগারেট টা হাতে ধরে আছি দেখে বললেন - "আপনি এখানে বসেই স্মোক করতে পারেন - জানলাটা একটু খোলা আছে-"

ইতস্তত করলাম, বললাম "জানলা খোলা, ঠাণ্ডায় আপনার অসুবিধা হবে না তো?"

"না না - আই অ্যাম ওকে"।

অগত্যা বসলাম মুখোমুখি একটা চেয়ারে। ভদ্রলোক এক কাপ চা নিয়ে বসেছিলেন।, সিগারেট অফার করতে না বললেন।


প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ে জানতে পারলাম ভদ্রলোকের নাম শ্রীকুমার ব্যানার্জী, আসামের লোক। একটা কলেজে পড়ান। এখানে কোন একটা কাজে এসেছেন - কয়েক দিনের জন্য। চেহারা সাধারণ, চোখে পড়ার মত কিছু নয় - কিন্তু একটা বুদ্ধিদীপ্ত ছাপ আছে। বেশ ভাল কথাবার্তা বলেন, তা না হলে আমার মত স্বল্পভাষী লোকের সঙ্গে মিনিট পনেরো কথা বলে এত ভাব জমাতে পারতেন না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, হাতের সিগারেট টা শেষ হয়ে গেছে। সামনে রাখা অ্যাশট্রেতে ওটা ফেলে যখন দিচ্ছি, ভদ্রলোক বললেন "এবার উঠবেন কি?"

"হ্যাঁ আপনি?"

"আমি একটু পরে যাব, একটা ফোন করব"।

"ওকে বাই, গুডনাইট" - বলে বেরিয়ে যান ঘরের দিকে যাচ্ছি, হোটেল রিসেপশনে অর্ঘ্যর সঙ্গে দেখা। অর্ঘ্য মানে অর্ঘ্য মুখার্জী - এখানে একজন বড় ট্রাভেল এজেন্ট। আমার সঙ্গে অনেক দিন থেকে পরিচয়। ওর মাধ্যমেই হোটেল বুক করেছি। অর্ঘ্য পাকা বিজনেস ম্যান, মুখে সবসময় হাসি - কথা বার্তা ও খুব ভাল, আর অনেক চেনাশুনা আছে। কিন্তু দরদাম খুব একটা কম করে না।

আমাকে দেখামাত্র এগিয়ে এসে - "কেমন ঘুরছেন? সব ঠিক আছে তো? না হলে আমাকে জানাবেন” এই সব বলল। দু একটা আরও কথা বলে ওকে বললাম - "কাল এখানে আছি, পরশু যাচ্ছি রাবাংলা, দেখবেন গাড়ি আর ড্রাইভার যেন ভাল হয়।"

পরিচিত হাসি হেসে বলল - "আপনি চিন্তা করবেন না স্যার - আমি সবচেয়ে ভাল গাড়ি ও ড্রাইভার আপনাকে দেব।" আমি জানি ও সব কাস্টমারকে একই আশ্বাস দেয়। কথা আর না বাড়িয়ে ওকে "গুডনাইট" করে ঘরের দিকে এগোলাম। ঘরে যেতেই স্ত্রী বলল - "এতক্ষণ কি করছিলে? দুটো সিগারেট খেলে না কি?"

"না, না একজনের সঙ্গে পরিচয় হল- কথা বলছিলাম"।

দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে দেখল, বিশ্বাস হল কিনা বুঝতে পারলাম না। তবে আর কিছু উত্তর দেবার মুখে পড়তে হয়নি।


পরদিন সকালে আটটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে বেরোচ্ছি, বাবা মন্দির, ছাঙ্গু লেক আরও কিছু জায়গা দেখতে হবে। হোটেলের গেটের সামনে দেখি কালকের রাতের সেই ভদ্রলোক, সঙ্গে আরেকজন রয়েছে, স্থানীয় ছেলে বলে মনে হল। আমাকে দেখে শ্রীকুমারবাবু এগিয়ে এলেন, "আজ লোকাল সাইট দেখে বিকেলে ফিরবেন তো?"

বললাম "হ্যাঁ, কেন বলুন তো?"

"না, এমনি জিজ্ঞেস করছি, বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে আপনার সঙ্গে একবার দেখা করব।"

আমাদের গাড়ির ড্রাইভার এসে তাড়া দিচ্ছে, আমার স্ত্রী ও আমার দিকে বিরক্ত ভাবে তাকিয়ে আছে। তাই আমি আর দেরি করতে চাইলাম না, "ওকে, নো প্রবলেম" বলে হাত নেড়ে যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছি, তখন আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল "লোকটা কে?"

নাম বললাম,"কাল রাতে পরিচয় হল, আসামের একটা কলেজের প্রফেসর।"

"সঙ্গে যে ছেলেটা ছিল সেটাকে দেখেছিলে?

"না, সে আবার কি করল?"

"করবে আবার কি? আমাদের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল অসভ্যের মত।"

আমি আর কোন কথা বাড়ালাম না, ড্রাইভার কে বললাম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে।

অর্ঘ্য গাড়িটা খুব একটা খারাপ দেয়নি আর ড্রাইভারকেও ভদ্র মনে হল। সারাদিন টা ভালই কাটল - রাস্তায় ঠাণ্ডা পেলাম খুব। বাবা মন্দির ও ছাঙ্গু লেক দুটো জায়গাতেও খানিকটা সময় কাটালাম। নাথুলা অবশ্য যেতে পারলাম না। মিলিটারি থেকে অনুমতি লাগবে, সেটা এখন পাওয়া যাচ্ছে না।

ড্রাইভার ছেলেটি বলল, এখন এই অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি চলছে, কারণ ভারতের নর্থ ইস্ট রাজ্য থেকে কিছু আতঙ্কবাদী নাকি এই রাস্তায় কিছু একটা করার পরিকল্পনা করেছে, এরকম কানাঘুষো শুনেছে।

আমাদের হোটেলে ফিরতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল। শুধু ঘোরাঘুরি নয়, কিছু জিনিসপত্র কেনা হল। পাঁচটা নাগাদ যখন ফিরলাম, শ্রীকুমার বাবুর সঙ্গে দেখা, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বৃছিলেন। আমাকে দেখে হাসলেন, তারপর বললেন "আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে"

সকালেও বেরোবার সময় বলেছিলেন আমার সঙ্গে দরকার এখনও বলছেন, তাই বললাম - "বলুন না কি দরকার?"

"ফোনে একটু সময় লাগবে, তারপর ডিনারের পরে কথা বলব কালকের মত?"

"ওকে" বলে ঘরের দিকে এগোলাম।


কাল ডিনার হোটেলের রেস্টুরেন্টে করেছিলাম, তাই স্ত্রী ও ছেলে দুজনে ই আজ আর এখানে করতে চাইল না। অতএব বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে যাওয়া ঠিক হল। ডিনার করে হোটেলে ফিরে দেখলাম শ্রীকুমার কে রিসেপশনে বসে একটা ম্যাগাজিন দেখছিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে উঠে দাঁড়িয়ে আমার পরিবারের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলেন। দু-এক টা কথার পর আমি আমার স্ত্রী কে বললাম - "তোমরা ঘরে যাও, আমি আসছি।"


অভ্যাস মত সিগারেট ধরালাম, আজ উনিও সিগারেট নিলেন। বললাম -"আপনার কাজ হল? কতদিন এখানে থাকবে না?"


"জানি না, আপনাকে কাল বলা হয়নি- আমি একটা হিউম্যান রাইটস অরগানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত, যদিও সেটা আমার পেশা নয়। পেশায় আমি কলেজের প্রফেসর, যেটা কাল বলেছিলাম"

আমি আর কিছু বললাম না, শুনতে লাগলাম।

“শিক্ষকতায় আমি অনেক দিন, কোন ঝামেলা ছিল না, কিন্তু আসামে, শুধু আসামে কেন? পুরো নর্থ ইস্টে একটা উগ্রপন্থী উৎপাত রয়েছে, সেটা আমরা সবাই জানি”


উনি একবার থামলেন, সিগারেটে টান দেওয়ার জন্য। তারপর বলতে লাগলেন "সেটাকে ট্যাকেল করার জন্য, সরকার পুলিশ, আর্মি সব নামিয়েছে। বুঝতেই পারছেন এইসব কোর্সগুলো তো আর সবসময় নিয়মমতো কাজ করে না, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। আর তার সঙ্গে সেন্ট্রাল গর্ভমেণ্ট একটা আইন করেছে, শুনেছেন হয়তো, আফসপা"।

বললাম "জানি, এটা নিয়ে অনেক লেখা পড়েছি।"


"আপনারা তো পড়েছেন, আমরা যারা ওখানে থাকি তারা দেখছি এটার অপব্যবহার। কত নিরীহ ছেলে মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করছে, তারপর তাদের অনেককে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"

আমি দেখলাম আলোচনাটা এবার অন্য দিকে যাচ্ছে, তাই বললাম, "দেখুন এটা নিয়ে আমার কিছু করার নেই, আপনি আমাকে কি দরকার বলুন।"

উনি হেসে বললেন, "আরে ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে কিছু করতে বলছি না। আমি এই প্রসঙ্গে কথাগুলো বললাম যে অনেক হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন কেস হচ্ছে, এরকম দু-একটা কেস আমাকে এত নাড়া দিয়ে যায় যে আমি এইসব ব্যাপারে একটু ইনভলভড হয়ে পড়েছি। তাই প্রফেসরের সেই শান্তি পূর্ণ জীবন এখন‌ নেই।"

সিগারেট টা শেষ করে অ্যাশট্রেতে ফেললাম, উনি আবার শুরু করলেন - "সুতরাং, বুঝতেই পারছেন আমাকে একটু সাবধানে থাকতেই হয়। ইউ নেভার নো, পুলিশ বা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি হয়তো আপনাকে ট্রাক করছে। একবার থেমে আবার বললেন, “আপনার কাছে আমার অনুরোধ হল আপনি যা শুনলেন সব ভুলে যান”। এবারে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলেন, "এই খামটা যদি আপনি কলকাতা নিয়ে যান, আমার একজন পরিচিত লোক আপনার থেকে নিয়ে নেবে।"

আমি মুহূর্তের জন্য আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম - "এতে কি আছে?"

উনি হেসে উঠলেন "কোন ভয় পাবেন না, আপনাকে দিয়ে আমি কোন আইনবিরুদ্ধ জিনিস পাঠাচ্ছি না। এতে কয়েক টা পেপার কাটিং আর ফটোগ্রাফ আছে- বাই দ্য ওয়ে আপনি কলকাতা ফিরছেন কবে আর কোন ট্রেনে?"

ট্রেনের নাম, দিন এগুলো বললাম, কিন্তু তার পরেও মনে হল কাজটা ঠিক হবে কিনা। এটা হয়তো ঠিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে এবং ভদ্রলোক যে কথাগুলো বললেন তা কিছু টা হলেও সত্যি। কিন্তু আমার এসব ব্যাপারে মাথা গলানোর কি দরকার? আর যদি কোনভাবে জানাজানি হয় যে আমি এই ধরনের জিনিস নিয়ে গেছি, উটকো ঝামেলা য় জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। মানসিক এই দ্বন্দ গুলো র কোন সমাধান এই মুহূর্তে নেই দেখে, বললাম, "আমি সরি, এইসব আমি নিয়ে যেতে পারব না।"

উনি দেখলাম স্মিত হাসছেন। আমাকে বললেন, "নেভার মাইন্ড, আপনাকে আমি জোর করব না। শুধু এটুকু আমি আপনাকে আবার বলছি, "আমি কোন আইন বহির্ভূত জিনিস আপনাকে নিয়ে যেতে বলিনি। একটা এনভেলাপে যাতে কিছু পেপার কাটিং আর ফটোগ্রাফ রয়েছে - অল রিলেটেড টু হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন। এগুলো একটা জায়গায় পাবলিশ করা হবে। এর বেশী কিছু আর বলব না।" উনি এক মুহুর্ত থেমে আবার বললেন "যেদিন আপনি শিয়ালদা স্টেশনে নামবেন, একজন এসে আপনার থেকে সঙ্গে সঙ্গে কালেক্ট করে নেবে - ম্যাটার ওভার।"

আমি মুখ খুললাম এক মিনিট পরে। "আচ্ছা আপনি আমাকে নিয়ে যেতে বলছেন কেন? আই মীন, আপনি নিজে তো নিয়ে যেতে পারেন কলকাতা।"

"আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, আমাকে ফলো করা হচ্ছে।"

চারদিকে দেখলাম যে আর কেউ নেই যে আমাদের কথা শুনতে পারে। আমার নিজের মনের মধ্যে ও একটা টানা উত্তেজনা তৈরী হয়েছে। ওনাকে বললাম -"ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব। আপনার কোন ফোন নম্বর" আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই উনি বললেন - "ফোন নম্বর কি দরকার?"

"যদি স্টেশনে কেউ না আসে?"

"ডোণ্ট ওরি, মিঃ রায়। আপনাকে আমি কোন ঝামেলায় ফেলব না।যদি স্টেশনে কেউ না আসে, আপনি খামটা ফেলে দেবেন, এটাও আপনাকে বলে দিলাম।"

"ওকে" বলে খামটা ওনার হাত থেকে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলাম। সিল করা খাম, কোন নাম বা ঠিকানা লেখা নেই, শুধু লেখা রয়েছে "ফ্রম শ্রীকুমার ব্যানার্জী"।


এরপর পাঁচ দিন কেটে গেছে। রাবাংলা, পেলি়ং এইসব ঘুরে আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়া র কথা। ওখান থেকে ট্রেন ধরবে। সেদিনের কথা আমার স্ত্রীকে বলতে ও বলেছিল-"না বলে দিলেই পারতে, ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে তখন কে দেখবে?" তারপর গত পাঁচ দিন বেড়ানোর আনন্দে আমি প্রায় ভুলেই গেছিলাম সেই খামটার কথা। ফেরার দিন আসতে ফের মনে পড়ল। সুটকেস গোছানো র সময় একবার দেখে নিলাম ঠিক মত আছে কিনা।


দার্জিলিং মেল যখন সকাল বেলা শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে তখন আমি খামটা হাতে নিয়ে বসে আছি। একটু চাপা উত্তেজনা হচ্ছে। কেউ এখনো আসেনি ওটা নিয়ে। অবশ্য দেরী হলনা - ট্রেন দাঁড়ানোর পরে কয়েক জন কুলি দেখলাম তাড়াহুড়ো করে উঠল। তারপরেই একজন মাঝারি হাইটের মাঝবয়সী ছেলে বা লোক বলা যায় আমার সীটে এসে জিজ্ঞেস করল-"মিঃ ব্যানার্জী কিছু পাঠিয়েছেন?"

আমি কোন কথা না বলে মাথা নেড়ে "হ্যাঁ" বললাম আর খামটা ওর হাতে দিলাম।আর কোন কথা নয়। শুধু 'থ্যাংক ইউ' বলে ছেলে টা চলে গেল। ভিড়ের মধ্যে তাকে আর দেখতে পেলাম না। মনে হল যেন ঘাড় থেকে একটা ঝামেলা গেল।


পরের দিন অফিসে যাওয়ার সময় ই ভাবলাম আজ আমার ট্রাভেল অর্ঘ্য মুখার্জীকে একটা "থ্যাংক ইউ" মেল দিতে হবে।কারণ আমাদের ট্যুর টা ভালই হয়েছে, হোটেল, গাড়ি, ড্রাইভার সবকিছু ঠিক ছিল। এরজন্য ওকে একবার বলা উচিৎ। ফোনে কথা বললে ভাল ছিল, কিন্তু কথা বলতে গেলেই ও আবার শুরু করবে "পরেরবার কোথায় প্ল্যান করছেন?"

অনেক ঝামেলা, ইমেলে এসব ঝামেলা নেই, তাই মেলই করব।


সারাদিন সময় পেলাম না মেল করার, বিকেলে র দিকে কাজের ফাঁকে একটু সময় করে মেল করলাম রাতের দিকে বাড়ি ফিরে দেখি অর্ঘ্য র মিসড কল। সময় দেখলাম সাড়ে সাতটা নাগাদ ফোন করেছিল। রাস্তায় ট্রাফিকে হয়তো শুনতে পাইনি। ওকে ফোন করলাম, দুবার রিং হতেই ও ধরল - "হ্যাঁ, স্যার, আপনার মেল পেয়েছি। পরের বার কোথায় প্ল্যান করছেন যানাবেন।"

বললাম "হ্যাঁ, জানাব।"

"আর একটা কথা, ওই যে মিস্টার ব্যানার্জী বলে একজন হোটেলে ছিলেন, উনি মারা গেছেন।"

বিদ্যুৎ চমকের মত কথাটা শোনার। কোনভাবে বললাম "মানে?"

"মানে উনি মারা গেছেন সন্দেহজনক ভাবে। ঘরের মধ্যে ই ডেডবডি পাওয়া যায়।"

"কবে এটা হল?"

"আপনি যেদিন ওখান থেকে চেক আউট করলেন, তার দুই কি তিন দিন পরেই।"


পুলিশ এসেছিল প্রথমেই বলেছিল, তারপর পোস্টমর্টেম করে কনফার্ম করেছে মার্ডার। পুলিশ এটাও বলেছে যে ওর নাম নাকি মিঃ ব্যানার্জী নয়। এখানে তো হোটেলে কোন আইকার্ড দেখাতে বলেনা, তাই হোটেলের ও কোন ডকুমেন্ট নেই যে ওই নামটা ঠিক কিনা সেটা বলার।


আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। ও বলে চলল, "সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার, এটাতো পিক সময় -হোটেলের অন্য গেস্টরা খুব ডিস্টার্বড ফিল করেছে। পুলিশ কেস মানে জানেন তো? আপনারা খুব টাইমে চেক আউট করে গেছেন।"

অর্ঘ্য আবার জিজ্ঞেস করল, "আপনার সঙ্গে ওনার পরিচয় হয়েছিল কি?"

আমাকে মিথ্যে বলতেই হল, "না, শুধু মুখ চেনা।"

আমার পক্ষে পুরো সত্যি বলা কাউকে মুশকিল।

"যারা ওকে মেরেছে, কিছু একটা খুঁজছিল, কারণ ঘরে জিনিস খোঁজার চিহ্ন রয়েছে, কোন টাকা পয়সা নেয়নি।"

কথাটা শুনে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তাহলে কি ওই প্যাকেটটাই খুঁজতে এসেছিল? আমি আর কোন কথা বলতে চাইলাম না। দু-এক একটা কথা বলে ফোনটা রেখে মনে হল আমার মাথাটা ঘুরছে। আমার বাড়ি আর দু মিনিটের হাঁটা রাস্তা। একটু ধাতস্থ হওয়ার জন্য একটা পানের দোকানে গিয়ে গিয়ে সিগারেট ধরালাম। পাঁচ মিনিট সময় পাব একটু চিন্তা করার। মনে হতে লাগলো চিন্তা করে লাভ নেই। আমার কিছুই করণীয় নেই, ব্যাপার টা আমাকে পুরো টা চেপে যেতে হবে। তবু একটা ভয় থেকে গেল যদি কোন সময় কেউ ফোন করে আমাকে।


এইসব যখন ভাবছি, খেয়াল করলাম ফোন বাজছে। স্ত্রী ফোন করছে- "দেরি হচ্ছে?"

আসছি বলে বাড়ির দিকে এগোলাম।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮