• দীপাঞ্জন মাইতি

প্রচ্ছদ কাহিনী - বাংলা সাহিত্যে প্রেম



ভালোবাসা পেলে সব লণ্ডভণ্ড করে চলে যাবো

যেদিকে দু’চোখ যায় – যেতে তার খুশি লাগে খুব।

ভালোবাসা পেলে আমি কেন পায়সান্ন খাবো

যা খায় গরীবে, তাই খাবো বহুদিন যত্ন করে।


শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়া কে আর এমন করে বলতে পারেন বলুন তো!? ভালোবাসার বাস রাজপ্রাসাদে নয়, তার অনুভূতি ছুঁতে বিলাসিতা লাগে না.. রোজ সকালে ঘুম ভাঙা থেকে দৈনন্দিনের প্রতি মুহূর্ত বেয়ে বয়ে যায় ভালোবাসা। আমার আপনার ঘরে ফেরা, ঘুমিয়ে পড়ে আবার জেগে ওঠা, রোজদিন আরেক’টু বেঁচে থাকার রসদ কোড়ানো – কিছু প্রাপ্তি সুখে, কিছু অপ্রাপ্তির শূন্যতায় জীবনের সবটা জুড়ে আছে ভালোবাসা। প্রতিটি সাহিত্য সৃষ্টির জন্ম হয় যাপন থেকে। তাই ভালোবাসা জড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের প্রতিটি অধ্যায়ে ছড়িয়ে আছে প্রতিটি পরতে। আমি নিশ্চিত নই তবে আমার একান্ত বিশ্বাস পৃথিবীর প্রথম লেখা কবিতার উৎস নিশ্চয় ছিল প্রেম। সেই প্রথম ছত্র থেকে আজ এই মুহূর্তে পৃথিবীর যে প্রান্তে যে ভাষাতেই যে কবিতাটি বাঁধছেন কোনও কবি তার গভীরে আলো করে আছে প্রেম। আর সাহিত্য সংস্কৃতিতে যে বাংলার চিরন্তন তার ছত্রে ছত্রে প্রেম তো থাকতে বাধ্য। বাংলার মত এমন মিষ্টি, লিরিকাল একটা ভাষা তার প্রকাশে প্রেম থাকবে না হতে পারে কখনও? তবে তার বাসা যে ঠিক কোন গভীর অন্তঃস্থলে থাকতে পারে সে ধারণা আমার নিতান্তই আবছা ছিল। প্রেমের হাত ধরে এসেছে বিরহ। মিলনে বিরহ, বিরহে মিলন পেরিয়ে সব শেষে মহান আত্মার প্রেমে বিলীন হয়ে গেছেন সৃষ্টি এবং স্রষ্টা। প্রতি কবি, লেখক তাঁদের কলমে চরমতম অনুভূতির কথায় সবাই শেষ অবধি স্বীকার করেছেন প্রেমই এক এবং অনন্ত সত্যি।


বাংলা সাহিত্যে - গদ্য উপন্যাস অপেক্ষাকৃত নবীনতর সংযোজন; বরং এই যাত্রাপথের সবটা জুড়েই ছিল আছে এবং থাকবে কাব্য। আর প্রেম শূন্য হৃদয়ে কবিতা ছন্দ বদ্ধ শব্দের সারি জন্ম দেয় তারা কবিতায় বাঁধা পড়ে প্রেমের বন্ধনে। সেই খ্রিষ্টীয় দশম-দ্বাদশ শতকের মধ্যে কোন এক সময় সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা বাংলা সাহিত্যের প্রথম খন্ড লিখছেন লক্ষ্য ধর্ম, তত্ত্বকথা, তুলে রাখছেন সমাজের প্রতিটি ভিন্ন স্তরের বিভিন্ন দিকের কথা সেখানেও জড়িয়ে পড়েছে প্রেম। শুধু প্রেম নয় চর্যাকারেরা বিভিন্ন পদে নান্দনিক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কামনা-বাসনার কথাও। যেমন ২৮ নং চর্যার আমাদের পরিচিত বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় : ‘উঁচু উঁচু পাহাড়ে শবরী বালিকা বাস করে। তার মাথায় ময়ূরপুচ্ছ ও গলায় গঞ্জরীমালা লাগানো আছে। নানা তরু মুকুলিত হল। তাদের শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত হল। শবর-শবরী প্রেমে পাগল হল। তাদের হৃদয় রঙিন ও উদ্দাম হল কামনার রঙে। অতঃপর শয্যা পাতা হল। শবর-শবরী প্রেমাবেশে রাত যাপন করল।’


শুধু শবর শবরীর প্রেমই নয় চর্যাকারেরা বাংলা সাহিত্যের সেই শুরু লগ্নেও পরকীয়া প্রেমের ইঙ্গিত রেখে গেছেন। চর্যাকার কুক্কুরী পা ২নং চর্যায় লিখেছেন

‘দিবসহি বহুড়ী কাউ হি ডর ভাই।

রাতি ভইলে কামরূ জাই ॥’

যার অর্থ ‘দিনের বেলায় যে গৃহবধূ কাকের ভয়ে ভীত থাকে, সেই বধূই রাতের বেলায় অভিসারে চলে যায়।’ কূলবধূর পরকীয়ার অভিসারের পথে প্রাচীনযুগ ছেড়ে আমরা রওনা দিই শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পাতায়; বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে।


বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে দু’টি ধারা খুব স্পষ্ট। এই মধ্যযুগেই বিশ্ব সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন বাংলা সাহিত্য। একের পর এক জনপ্রিয় হিন্দি, ফার্সি, আরবি সাহিত্য সৃষ্টিগুলির অনুবাদে ব্রতী হন তৎকালীন কবি বাঙালি লেখকেরা। তৎকালীন ঐ অনুবাদ সাহিত্যেও বিশেষ জায়গা জুড়েও কিন্তু সেই প্রেমের উপাখ্যান যেমন - দৌলত উজির বাহরাম খাঁর ‘লায়লী-মজনু’ (মূল লেখক : ইরানী কবি জামি), শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’ (মূল : মহাকবি ফেরদৌসী), মহাকবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ (মূল : মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদ্মাবৎ’। বাংলা সাহিত্যে অনুবাদ সাহিত্যের চরিত্র নির্ধারণে এই সকল মধ্যযুগীয় কবিদের ভূমিকা কিন্তু অবিস্মরণীয়। কারণ প্রতিটি উপাখ্যানের অনুবাদক অনুবাদের স্বকীয়তায় নিজেদের সাহিত্য সৃষ্টিটিকে মৌলিকত্বের চরম সীমায় নিয়ে গেছেন। অপরদিকে বাংলায় তখন লেখা হচ্ছে ধর্মতত্ত্ব, স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রেম, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি।

স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রেমের আখ্যানে ভগবান ও ভক্তকে কবি কলমের আঁচড়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জুড়ে দিয়েছেন সাধারণ মানব-মানবীর মতই। তা যদি না হত সত্যিই কি রাধা বিরহে আজও আকুল হত পাঠকের প্রাণ! মনে হয় না। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রাধার প্রতি কৃষ্ণের প্রাথমিক আকর্ষণ কিন্তু কেবল দেহজ। নপুংসক আয়ান গোপের - স্ত্রী রাধা বারেবারে ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে এবং তৃতীয় অর্থাৎ দান খণ্ডে রাধার সাথে কৃষ্ণ প্রথম মিলিত হয়েছে বলপূর্বক। এরপর নৌকাখন্ডে পুনরায় মাঝির ছদ্মবেশে রাধাকে নদীপারের ছলনায় নৌকোডুবি ঘটিয়ে সঙ্গলাভ করেছে কৃষ্ণ। লোকলজ্জার ভয়ে রাধা ডাঙায় ফিরে সকলকে বলেছে নৌকাডুবির ঘটনা, বলেছে কৃষ্ণ বাঁচিয়েছে তার প্রাণ। পরবর্তী ভারখন্ডেই রাধার মনে আকুলতা কৃষ্ণদর্শনের তাড়নায়। এই বোধহয় পৃথিবীর প্রথম স্টকহোম সিন্ড্রোমের ইঙ্গিত। আর পরকীয়া! রাধা কৃষ্ণের প্রেমই বোধহয় বাঙালিকে শিখিয়েছে প্রেমের কোন লজিক হয় না; হয় না ঠিক ভুল – তাই প্রেম কখনও অবৈধ হতে পারে না। অবিশ্যি আজ আমরা সে সব ভুলে গেছি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে তেরোটি খণ্ডের শেষতম খন্ড রাধাবিরহ। বংশীখন্ডে রাধার প্রতি বিরাগ ভাজন কৃষ্ণ বাঁশির সুরে রাধার মনের আকুলতাকে চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছে রাধার প্রেম। শেষ পর্বে রাধা এবং বৃন্দাবন ত্যাগ করে কৃষ্ণের মথুরা প্রস্থান এবং সেই বিরহ অধ্যায়ের সৃষ্টি যা পরবর্তীকালে অজস্র সাহিত্য সৃষ্টির উৎস হয়েছে। প্রাপ্তি নয় হয়ত বিরহেই প্রেমের সাফল্য।


মধ্যযুগেই প্রেমের পর্যায় রচিত হল পদাবলী সাহিত্যে। পঞ্চদশ শতকের মৈথিলী কবি বিদ্যাপতিও রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনীকে মানবিক প্রেমকাহিনীর রূপ দিলেন। নবোদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরী রাধার বয়:সন্ধি থেকে কৃষ্ণবিরহের সুতীব্র আর্তি বর্ণনা ব্রজবুলিতে রচিত বিদ্যাপতির পদাবলী কবিতায় উপজীব্য। বিদ্যাপতির কাব্যে বালিকা রাধা শৃঙ্গার রসের পূর্ণাঙ্গ নায়িকা, প্রগাঢ় প্রেমানুভূতি তার দেহমনকে আচ্ছন্ন করেছে; কৃষ্ণবিরহের তন্ময়তায় বেদনার রঙে রেঙেছে রাধার বিশ্ব ভুবন। চৈতন্য পূর্বযুগে পদাবলীর আরেক স্রষ্টা ছিলেন চণ্ডীদাস। পূর্বরাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস ছিলেন বাংলা ভাষায় প্রথম পদাবলি সাহিত্যের রচয়িতা। তাঁর পূর্বরাগের পদগুলিতে শ্রীরাধার হৃদয়গ্রাহী ব্যাকুলতা প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে।


"সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম।

কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো

আকুল করিল মোর প্রাণ ॥"


মানবহৃদয়ের যে চিরন্তন প্রেমাকূলতা বেদনাঘন ভাষায় এসকল পদে তুলে ধরেছেন চণ্ডীদাস সমগ্র বৈষ্ণব পদ সাহিত্যে তার তুলনা নেই। এরপর প্রেমের ঠাকুর চৈতন্য মহাপ্রভু। মূলত তাঁর প্রচারিত নামসঙ্কীর্তনগুলিকে নিয়েই রচিত বৈষ্ণব পদাবলী। মানুষের মধ্যে প্রেম স্থাপনের লক্ষ্যই ছিল শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণববাদের মূল ভিত্তি। চৈতন্যদেব প্রবর্তিত কীর্তনের মূল ভাবনা ছিল ঈশ্বরপ্রেম আর মানবপ্রীতির মধ্যে গভীর ঘনিষ্ঠতা; যা তাঁর প্রেমাশ্রিত দর্শনেরই বাহ্যিক প্রকাশ। বিষয় ভিত্তিতে বৈষ্ণব পদগুলি গৌরলীলা, ভজন, রাধাকৃষ্ণলীলা ও রাগাত্মিকা - এই চার ভাগে বিভক্ত হলেও ব্রজধামে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা সম্বলিত তৃতীয় শ্রেণির পদগুলিই সর্বোচ্চ জনপ্রিয় হয়েছে। সাধনার কথা। ষোলো শতকে চৈতন্যের মত প্রচারের পূর্বে রাধা-কৃষ্ণ লীলা জীবাত্মা পরমাত্মার প্রণয় লীলার রূপ পরিগ্রহ করেনি। চৈতন্যোত্তর কালে বৈষ্ণবপদের ভাব ও রসের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাৎসল্য ও সখ্য রসের নতুন পদাবলি। বন্দনা, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক সাধনাযুক্ত পদগুলিও নতুন মাত্রা যোগ করে। এ যুগের কবিগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক পদে ঐশী মহিমা ও আধ্যাত্মিকতার রূপক আরোপ করেন। চৈতন্যোত্তর যুগে গোবিন্দদাস অভিসার পর্যায়ের এবং জ্ঞানদাস মান পর্যায়ের সেরা কবি ছিলেন।


মধ্যযুগের বাকিটা জুড়ে ছিল ধর্মবিষয়ক আখ্যান, মঙ্গলকাব্য। দেবদেবীর গুণগান মঙ্গলকাব্যর প্রধান উপজীব্য হলেও তৎকালীন সমাজের চরিত্রচিত্রণের পাশাপাশি লেখক কবিগণকে প্রেমকেও ব্রাত্য করে রাখতে পারেন নি। চণ্ডীমঙ্গলে চিরায়ত বাংলা বধূ ফুল্লরার স্বামী কালকেতুর সাথে প্রেমের আখ্যানে ফুটে উঠেছে, ছদ্মবেশী চণ্ডীদেবীকে সতীন ভেবে অভিমানিনী ফুল্লর প্রিয়জন হারানোর আশঙ্কা। আবার মনসামঙ্গলে স্বামী লখিন্দরের প্রতি বেহুলার অগাধ প্রেম তাকে চরিত্র হিসেবে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। কেবল প্রেম এবং ভক্তির ওপর অদম্য আস্থা রেখে মৃত লখিন্দরকে ফিরিয়ে এনেছে বেহুলা। অন্নদামঙ্গলের প্রথম খণ্ডে শিব পার্বতীর প্রেমের পৌরাণিক ও লৌকিক দুইটি চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে; তবে উভয় ক্ষেত্রেই দেবত্বের তুলনায় কাহিনী প্রবাহে মানবিক সমাজ জীবনের প্রভাব অনেক প্রচ্ছন্ন। অন্নদামঙ্গলের দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যা ও কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দর এর প্রণয়কাহিনী রচনায় ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য। সতেরো শতকের প্রথম পাদে রামকৃষ্ণ রায়ের শিবায়ন ধারার প্রধানত পৌরাণিক শিবের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শিবের সংসারের অভাব-অনটন এবং তা নিয়ে শিব-পার্বতীর মনোমালিন্য এখানে গতানুগতিক ভাবে বর্ণিত হয়েছে। আঠারো শতকের প্রথম দিকে রচিত রামেশ্বর ভট্টাচার্যের শিবায়নে শিব একেবারে ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছেন; ফলে শিব-পার্বতীর প্রেম সাধারণ এবং মানবিক। পরবর্তী সময়ে দেবতাদের লৌকিক প্রেমে ছাপ পড়েছে পাশ্চাত্য শিক্ষার। ১৮৬২ সালে ব্রজঙ্গনা কাব্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মিস রাধা ও মিস্টার কৃষ্ণ কলিযুগের প্রেম আদর্শের প্রতিমূর্তি। বিশেষ করে রাধা চরিত্র একান্তই ধর্মতত্ত্বনিরপেক্ষ বিষয় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

টেকচাঁদ ঠাকুর অর্থাৎ প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮৫৭ সালে বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস আলালের ঘরে দুলাল লিখলেন। মানসিংহের পুত্র কুমার জগৎসিংহের সঙ্গে বীরেন্দ্র সিংহের কন্যা দুর্গেশনন্দিনী তিলোত্তমার মিলন ঘটিয়ে ১৮৬৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন বাংলার প্রথম সফল প্রেমের উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী। এই সময়টাকে বাঙলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনাকাল বলে চিহ্নিত করা যায়। ১৮৬৫ থেকে ১৮৮৭ সালের মধ্যে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পরপর চোদ্দটি উপন্যাস লিখেছিলেন। দুর্গেশনন্দিনীতে তিলোত্তমা ও জগৎসিংহের মিলনমুখরতার পাশাপাশি নীরবে আয়েষার প্রেম ও আত্মত্যাগের আলোয় আয়েষার চরিত্র চিত্রণে বঙ্কিমচন্দ্র এক অদ্ভুত মায়াচ্ছন্ন আবহ তৈরী করেছেন। পরবর্তী উপন্যাসে কপালকুন্ডলা এবং নবকুমারের প্রেম এবং বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে মতিবিবির ঈর্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিষবৃক্ষে এক অদ্ভুত চক্রবৃত্ত সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য সম্রাট। একদিকে আধুনিকা অনাথিনী বিধবা কুন্দনন্দিনী বিবাহিত নগেন্দ্রের প্রেমকে নিজের প্রাপ্য সুখ হিসেবে গ্রহণ করেছে; নগেন্দ্রকে বিয়েতে সম্মত হয়েছে নগেন্দ্রর স্ত্রী সূর্যমুখীর প্রস্তাব মেনে – অন্যদিকে সূর্যমুখী এই বিয়ের প্রস্তাবকারিনী হলেও ঘর ছেড়েছে বিয়ের পরদিনই। আবার যখন ফিরে এসেছে সূর্যমুখী, আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে কুন্দ। এই চক্রাবর্তে জড়িয়ে পড়েছে ও তার প্রেমিকা হীরা। একসময় দেবেন্দ্রর সামান্য উৎসাহে নিজেকে শরীর বিলিয়ে দেওয়া হীরার; প্রেমিকের হৃদয়ের ওপরে নিজের অধিকার বজায় রাখবার জন্য কুন্দনন্দিনীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিতে তার বাধে নি। বিষবৃক্ষের সবচেয়ে বড় সাফল্য খুব সম্ভবত কুন্দনন্দিনীর চরিত্র চিত্রণ; কারণ এক্ষেত্রে আধুনিকা এবং চরিত্রহীনা সমার্থক করে তোলেন নি বঙ্কিম চন্দ্র। কৃষ্ণকান্তের উইলে রোহিনী সমাজের অসাড়তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। প্রণয়কাতর রোহিণীকে ভালোবেসে গোবিন্দলাল ঘর, জমিদারী, স্ত্রী ভ্রমর.. সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। গোবিন্দলালের প্রতি রোহিনীর ভালোবাসা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ কি করে থাকতে পারে! সে তো গোবিন্দলালকে নিজের ভগবান মেনেছে। কিন্তু রাসবিহারীর সাথে দেখা করতে গিয়ে রোহিনীর উক্তি “আমি যদি ভুলিবার লোক হইতাম, তা হলে, আমার দশা এমন হইবে কেন? একজনকে ভুলিতে না পারিয়া এদেশে আসিয়াছি; আর আজ তোমাকে ভুলিতে না পারিয়া এখানে আসিয়াছি।” পড়লে বারেবারে মনে হয় কি করে জানি বঙ্কিমবাবু সেই তখনই বলে গেছিলেন কে বলেছে একাধিক জনকে ভালোবাসতে কেবল পুরুষই পারে!


বঙ্কিমচন্দ্র যেমন গোবিন্দলালের হাতে রোহিণীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু না দিলেও তার জীবনতৃষ্ণার অন্তিম পরিণতিতে বিনোদিনীকে সেই কঠোর বৈধব্যে জারিত সন্ন্যাসিনীর জীবনপথে নির্বাসন দিয়েছেন। চোখের বালিতে মহেন্দ্র বিনোদিনীর কাছে নিতান্ত কামনা পরিতৃপ্তির মাধ্যম তার ভালোবাসা গচ্ছিত বিহারীর জন্য; তাই হয়ত সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে বিহারীর সাথে ঘর বাঁধতে চায় নি সে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন করে বলার আর কিই বা থাকতে পারে? ঠাকুর তো জন্ম-রোমান্টিক কবি! রবীন্দ্রনাথ ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা পৃথিবী। পাশ্চাত্যের সামাজিক বিশ্বাসও তাই তাঁর চরিত্রায়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে উদাহরণ স্বরূপ একদিকে যেমন সন্দীপের কথা বলা যায় তেমনই বলা যায় অমিতের কাছে। তাই নিখিলেশের মত স্বামী সংসার ভালোবাসা পরিপূর্ণ বিমলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে সন্দীপের ক্যারিশমা ও যৌন তাড়না। প্রেমের যে কোন লজিক হয় না! বিমলার কি ছিল না বলা যায় না তবে সন্দীপের প্রকৃত চরিত্র চিনতে পেরে সে যখন ফিরেছে নিখেলেশের কাছে রবিঠাকুর যেন শাস্তিস্বরূপ কেড়ে নিলেন বিমলার প্রিয়জনকে। শেষের কবিতায় অমিত ও লাবণ্যের পারস্পরিকতার মধ্যে দিয়ে ভালোবাসাকে বাজারের ফর্দ, ঘটির জল, খাওয়া ঘুমনোর মত সংসারের দৈনন্দিকতা ভিন্ন এক স্তরে পৌঁছে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভালোবাসার প্রতিটি স্তর, পর্যায়, বিস্তারকে বারবার ভেঙে গড়ে সামাজিক বৈধ অবৈধতার সামান্যতার অনেক উপরে পাঠককে নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাই বোধহয় কোনদিনই তাঁর লেখা কালের বহতার কাছে হারে নি, হারবে না।


সময় যতো এগিয়েছে, ততই যুগ যন্ত্রণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাংলা উপন্যাসে। বিশেষ করে শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিকের কলমে নাগরিক জীবনের গভীরের কথা ফুটে উঠেছে বারেবারে। শরৎচন্দ্রের দেবদাস বাংলা সাহিত্যে অনন্য এক প্রেমের উপন্যাস। সাধারণ মেয়ের আখ্যান, আটপৌরে রোমান্টিকতা, ঠাসবুনোট, সহজ ভাষা – এই নিয়ে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য বিস্তার। পতিতা, বিধবা, বৈষ্ণবী, সতী, অরক্ষণীয়া অথবা বিয়ে-বহির্ভূতা শরৎচন্দ্রের শব্দ মন্দিরে তারা সকলেই প্রেমের দেবী। মাণিকবাবুর কলম চিরকাল আলো করে থেকেছে পল্লীবাসী হতদরিদ্র মানুষেরা – তাদের প্রেম প্রাপ্তি কামনা বাসনার কথা পাঠকের বড় চেনা। প্রেমের অবাধ্য অঞ্চলে কুবের মাঝি ও কপিলাকে মহেন্দ্র ও বিনোদিনীর থেকে খুব আলাদা করা যায় না। তারা-শঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসে নিতাইয়ের ভালোবেসেয়ে পর স্ত্রী ‘ঠাকুরঝি’ কে কিন্তু, সমাজের বাধা অতক্রম করার ক্ষমতা তার ছিল না তাই চলে যেতে হয়েছে তাকে। বসন্তের ডাকে সে যোগ দিয়েছে ঝুমুর দলে। দেহাপজীবিনী বসন্তের শরীরে যখন মারণ রোগ বাসা বেঁধেছে নিতাই সব দিয়ে তাকে বাঁচাতে চেয়েছে; পারে নি আবার হেরে গেছে বিধির কাছে। সবশেষে যখন ফিরতে চেয়েছে ঠাকুরঝির খোঁজে ততদিনে সেও ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছে। পরিচিত গণ্ডিতে পুরুষের বিরহ-বিহ্বলতা দেবদাসে শরৎচন্দ্রের পর আবার তারাশঙ্কর ফুটিয়ে তুললেন পাঠক হৃদয়ে। মাণিকবাবুর ‘প্রাগৈতিহাসিক’ এবং তারাশংকরের ‘তারিনী মাঝি’ ছোটগল্পে অন্ত্যজ জীবনের প্রেমের কথন হিসেবে অনবদ্য দুই সৃষ্টি। এখানে বিভূতিভূষণের কথা না বললে অন্যায় হয়। আদ্যোপান্ত প্রকৃতি প্রেমী মানুষটির প্রতি সৃষ্টির ছত্রে ছত্রে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতার আবেশ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ। যদিও জীবদশ্শায় জীবনানন্দ প্রাপ্য খ্যাতির অধিকারী হন নি তবে ঐ যে - কবি লিখেছিলেন “আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”। এই সময় ইউরোপীয় সমাজজীবনের ভাঙন চিত্র ছড়ীয়ে পড়েছিল ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে; তার সর্বব্যাপী প্রভাব পড়েছিল বাঙালি কবিদের ওপরও। এ সময়ে একদিকে যখন কাব্য সাহিত্যে অতি আধুনিকতা প্রবর্তনের প্রয়াসে ব্রতী অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্র ইত্যাদিরা ; প্রকাশিত হল রূপাই ও সাজু নামক দুই গ্রামীণ যুবক-যুবতীর অবিনশ্বর প্রেমের করুণ কাহিনী নকশী কাঁথার মাঠ। জসীমউদদীনের অমর সৃষ্টি এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুনঃপ্রতিপন্ন করেছিল। রবীন্দ্র ধারার ব্যতিক্রমী কবিদের প্রথম সারির একজন ছিলেন । প্রেম, দেহজ প্রেম, কামনা, বাসনার কথা বারবার ফুটে উঠেছে বুদ্ধদেব বসুর প্রেমের কবিতায়। তাঁর বেশি বয়সের কবিতা থেকে বোঝা যায় যে, অন্তরের গভীরে তিনি মূলত রোম্যান্টিক কবি ছিলেন ।


এর পরবর্তী সময় নিয়ে আমার বলার বিশেষ কিছু নেই কারণ এরপর শক্তি সুনীলের যুগ যে সময়ের ছায়ায় আমরা বড় হয়েছি তার অস্তিত্বে প্রেম জড়িয়ে শিকড় গভীরে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চার পংক্তিই দিয়ে তো এই লেখার শুরু আর কি নতুন করে বলার থাকে! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মানুষের প্রেম, যৌবন, পাগলামি, প্রতিবাদ, যৌনতা – সবকিছু অবহেলায় তুলে ধরেছেন প্রতিটি সৃষ্টিতে। এই অনায়াস দক্ষতা সচরাচর বড় একটা দেখা যায় নি। জয় গোস্বামীর কলমে পুনরায় পাই সেই আবেদন মন কেমন করা ভালোবাসার গন্ধ। সমসাময়িক নির্মলেন্দু গুন, পূর্ণেন্দু পাত্রী, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর, তসলিমা নাসরিন, সুবোধ সরকার, মল্লিকা সেনগুপ্ত এবং বর্তমান সময়ে শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তা সেন, রেহান কৌশিক, ভাস্কর চক্রবর্তী প্রমুখরা প্রত্যেকে প্রেমের নিজস্ব বাচন গড়ে তুলেছেন। পাঠকের মনকে ছুঁয়ে গেছেন বারেবারে ভালোবাসা দিয়ে – আসলে হৃদয় নগরে পৌঁছতে যে প্রেমের পথ ছাড়া আর কোনও পথ নেই।

আমি নিশ্চিত আমি অনেক তথ্য অনেক স্রষ্টা অনেক সৃষ্টির কথা তুলে ধরতে পারলাম না। কিছুটা আমার অজ্ঞতা আর কিছুটা পরিসরের সীমাবদ্ধতা। এর জন্য আমি নিতান্তই ক্ষমাপ্রার্থী। আজও প্রতিনিয়ত অজস্র অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টিতে মেতে আছে জানা অজানা অসংখ্য সাহিত্যপ্রেমী। এখন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ, পড়ার সুযোগ অনেক বেড়েছে। যতদিন যাচ্ছে কবি লেখকেরা সাহসী হচ্ছেন। সময়ের সাথে পাল্টাচ্ছে দৃষ্টি ও প্রকাশভঙ্গী কিন্তু বিষয় শর্তে প্রেমের বয়স আজও বাড়ে নি কোনোদিন বাড়বেও না; কারণ প্রেম কাব্যের চিরন্তন উপজীব্য। সবশেষে একটি ছোট্ট কথা বলে শেষ করব বাংলা সাহিত্যের শুরুর লগ্ন থেকে যে প্রেমের প্রকাশ দেখেছি আমরা সে প্রেম স্পর্ধার, সে প্রেম পরিণত মননজগতের বাসিন্দার হৃদয়ঙ্গম সুখের উৎস হতে পারে; সে প্রেম বড়ই অবাধ্য, বৈধ অবৈধের সীমা পেরিয়ে.. প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রেম এক পূর্ণতার ছায়া অঞ্চল।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮