• রাণা চ্যাটার্জী

প্রবন্ধ - একাকীত্ব

একাকীত্ব আজ প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে,আপন আপন মহিমায় বিরাজমান। আধুনিক জীবন যাত্রার ভিন্নতার সাথে ঘুণপোকার বাসার মতোই আজ অন্যতম অপ্রতিরোধ্য সঙ্গী হয়ে উঠেছে একাকীত্ব। বেড়েছে মানুষে মানুষে মোলাকাত, হই হুল্লোড়। কত রকমের গেট টুগেদারের আয়োজন শুরু জয়েছে আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততার জীবন পরিসরে, তবুও একাকীত্বের নখর আঁচড় বসাচ্ছে নিজের মতো করে গহন মনের আকাশে , আমাদের বাহ্যিক আচার-আচরণে ।


আপন মানুষজনের পাশেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আজকের সংসার, জীবন তবুও যেন আজ শূন্যতায় ভরা। বড্ড ব্যস্ত জীবনে একাকীত্বের চতুর থাবা আজ বারে বারে আমাদের বিপর্যস্ত করছে। এই একাকীত্ব যাতে না আসে, একে নির্মূল করতে, আমরা নিজেদের ব্যস্ত রাখার কত চেষ্টা না করি। হঠাৎ করে বেরিয়ে পড়ি সপ্তাহান্তিক ছুটিতে, বা একটু ফুরসৎ তো যাই সুপার মার্কেট। মল কালচার, দেখনদারি, আইনক্স, এক্সিভিসনে অবগাহন আজকে আমাদের নিত্যসঙ্গী, তবুও মুক্তি কই ?


একাকীত্ব তবু আপন খেয়ালে নিজ ভঙ্গিমায় এই দ্রুত গতির মানব জীবনে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, সময়ে সুযোগে ঠিক মাথা তোলার অপেক্ষায় । এই একাকীত্বের অন্যতম দোসর আবার অবসাদ, তার মোকাবিলাতেও চিন্তার শেষ নেই । ঐসব থেকে নিজেদের দূরে রাখতে , ভুলতে কতো রকম ভাবে নিজেদের ব্যস্ত রাখার প্রচেষ্টাই না চলছে। যে ছেলে বা মেয়েটি সারাদিনের ব্যস্ততা, পড়াশোনা কিংবা কর্মক্ষেত্রের চাপের মধ্যেও মুখ গুঁজে কাজ করে চলেছে , সেই বা কত দেশ বিদেশের মানুষের সাথে ইন্টারনেটে কথোপকথনে লিপ্ত। কিন্তু যে মুহূর্তে, সে একদম একাকী হয়ে নিজের সঙ্গ দেয়, অল্পেই সে অধৈর্য হয়ে ওঠে, তার সময় আর কাটতে চায় না, আর আসতে শুরু করে সেই একাকীত্ব ! কেড়ে নেয় ঘুম, একরাশ অবসন্নতাকে বুকে নিয়ে বাঁচা শুরু হয়, অনুভবে যেন চলতে থাকে "আমার দিন কাটে না ,আমার রাত কাটে না ' বিরক্তির বোঝা। তারমধ্যে কিছু সময় হয়তো মনের মানুষকে কাছে পেয়ে সব কিছু ভুলে থাকা যায়, আবার পরক্ষণেই একঘেয়েমির করাল ছায়া ঘনিয়ে আসে ! এ যেন থোড় বড়ি খাড়া , খাড়া বড়ি থোড় জীবন যাত্রা আমাদের, একাকীত্বের বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি।


এই একঘেয়েমির জীবনে মানিয়ে চলতে চলতে কখন যে, আমরা রোবট হয়ে পড়ি খেয়াল থাকে না । লোপ পায় দয়া মায়া, স্নেহ ভালোবাসা নামক অনুঘটকগুলো । কাকে কি বলা উচিত আর কি বলছি , কেমন আচার আচরণই বা করছি সেও উড়ে যায় চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকা মাথা থেকে । কেবল একটাই শব্দ মাথায় গেঁথে থাকে লক্ষ্য-পূরণ। এর জন্য চলতে থাকে অ্যাডজাস্টমেন্ট আর কম্প্রোমাইজ। আর এখন তাই অনেকটা পুতুলদের মতো আচার আচরণ আমাদের । এই বিরাট পৃথিবীর নাট্য মঞ্চে , আমাদের ভূমিকা যেন সব কিছুই পূর্ব নির্ধারিত। জন্মগ্রহণ আর একটু বড়ো হবার সাথে সাথে আমরা স্রোতে ভেসে চলছি। ঠিক সেই পুতুল খেলার মতো আমরা আজ এক একটা রঙিন পুতুল, কেন অদৃশ্য সূতোতে বাঁধা । পরিমিত হাসি, পরিমিত খাওয়া আর অভ্যাসে রপ্ত মানব কুলের দৈনন্দিন জীবন ধারণ তাই একাকীত্বের ভেলায় চড়ে ।


ছোটো বেলায় সময় সুযোগ পেলেই মামার বাড়ি ছুটতাম গ্রামে । যোগাযোগ উন্নত না থাকায় ঘুরপথে ঘুরে রিকসা, বাস, নদী-পাড়, হাঁটা , দাদুর ব্যবস্থাপনায় পাঠানো গরুর গাড়ির ওপর বাঁশের ঘেরা ছদরিতে দিদিমার গুছিয়ে দেওয়া মুড়কি, নাড়ু খেতে খেতে হই হই করে আমরা এক দল ভাগ্না ভাগ্নি পৌঁছে যেতাম, বড়ো স্নেহের পীঠস্থানে। সন্ধ্যায় দাদুকে ঘিরে কত আগ্রহ নিয়ে রূপকথা থেকে ব্যাঙ্গমা- ব্যাঙ্গমি, আরো কতো নীতি গল্প শুনে বিভোর হয়ে ক্লান্ত চোখে লেগে থাকতো ঘুমের আড়ষ্টতা । একবারও মনে হতো না আজকের বাচ্চা গুলোর মতো 'এর পর কি করবো , দূর বাবা বোর লাগছে '।এই প্রজন্ম যেন বড্ড বেশিই অস্থির , একটুও তর সয় না।

মামাবাড়িতে "ভারি মজা,কিল চড় নাই" পরিবেশে সকাল শুরু হতো, হাঁসের ছোট ঘরটি থেকে কে প্রথম গুনে গুনে ডিম বার করবে এই তৎপরতা দিয়ে ! তারপর থালায় জল ঢেলে হাঁসেদের জন্য খাবার রেখে আমাদের ছিল তৃপ্তির অপেক্ষা । ওরা খাবার খেয়ে সারিবদ্ধ ভাবে পুকুর অভিমুখে চলে গেলে, সেই অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম । আবার বিকালে' চই চই, চই চই' ডাক দিয়ে , কি সুন্দর হাঁসের দলকে পুকুর থেকে তুলে বাড়ি ফেরানো হত! একটা দুটো ছাড়া কি বাধ্য তারা , বাধ্য তাদের গতিবিধি।

বেলা বাড়লে, রাখাল দাদার সাথে গোয়াল ঘরে তার দৈনন্দিন কাজের খুঁটি নাটি গল্প আর গরুর গলকম্বলে হাত দিয়ে আদর করার অদ্ভুত প্রশান্তি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না । পেয়ারা , আম ,জাম , গাব, খেজুর , তাল কতরকমের ফল ঋতু অনুযায়ী গাছ থেকে পেরে দেবার আবদার করা, আর কখনো ছিল কতো গ্রাম্যগল্পে গা ভাসানো। কখনো কিন্তু একাকীত্ব শব্দটা মনের মধ্যে আসতো না, আসার অবকাশও ছিল না তখন। আজ ছোটো ছোটো বাচ্চা গুলো যেন একদম মিনি কম্পিউটার । এতটুকু সময় নেই যে, বসে থাকবে বা কিছু ভাববে। তাদের সে সময় নেই, মুখে খালি শব্দ চয়ন "ভালো লাগছে না , বোর হচ্ছি "এই সব !

শৈশবের বিকালের মাঠে আমরা কতো রকমের খেলা খেলতাম, খেলা দেখতাম, কি অপূর্ব ছিল সে সব দিন। আজ হারিয়ে গেছে সে সব খেলা, সেদিনের সেই পরিবেশ আজ অসুস্থ আর বিভীষিকাময় । সেই সঙ্গে সময়ের বড়ো অভাব, সঙ্গে বাচ্ছাদের পিঠের ভারী ব্যাগ আর ইস্কুলের দৈত্যাকার সিলেবাস । জানালার গরাদ ধরে জুল জুল চোখে তাকানো, ফ্লাটের খাঁচা বারান্দা থেকে দেখতে থাকা রাস্তার লোক জন অথবা গাড়ির গতিময়তা আর নচেৎ টেলিভিশনে সিনচেন, নবিতা, মোটু পাতলুর চওড়া মুখের হাসি দেখে বড়ো হয় আজকের বাচ্ছারা।আর ফাঁকা হলেই একাকীত্বের পিঠে সওয়ার ।

এই তিন দিন হলো বাড়িতে একটা সাধারণ বোতাম সুইচ মোবাইল এনে রেখেছি , উদ্দেশ্য মেয়েটা ছোটো তো , ঠিকঠাক বাড়ি ফিরে আমাদের একটু জানিয়ে দেবে, সে ফিরল কখন। সহধর্মিণী কাল দেখালো আমার মোবাইলের খসড়া ম্যাসেজ লেখার স্থানে আমার নয় বছরে পা দেওয়া মেয়ে প্রায় সাতাশ টা ম্যাসেজ লিখে রেখেছে, তা কি লিখেছে শুনুন। নিজেই প্রশ্ন করেছে এক একটা ম্যাসেজে আবার নিজেই আর একটা সত্ত্বা হয়ে মনের মধ্যে ওর কাল্পনিক বন্ধু সেজে , উত্তরও লিখেছে প্রতিটা ম্যাসেজের । এটা একটা উদাহরণ মাত্র , অর্থাৎ সময়ের তালে তাল মিলিয়ে একা সন্তান একাকী থেকেও একটা পরিবেশ গড়ে তুলেছে আপন মনের গহনে ।

দেখে খুব খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই , খেলবে কার সাথে এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একক পরিবারে? এই এক সন্তানকেই ঠিক মতো মানুষ করতে পারবো তো এই আতঙ্কের ভয়ে এক সন্তান নিতে আগ্রহী আমরা অভিভাবকরা পাড়ি দেই, দাদু-ঠাকুমা ছেড়ে সুযোগ সুবিধা পেতে শহরে।

আর এই মিনি কম্পিউটার বাচ্চারাও এই সব নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে নিজেদের মতো করে ভাবনার জগতকে সাজিয়ে নেয় । ওরা নিজেদের মতো করে থাকে, বড়ো হয় । স্কুল থেকে ফিরে একদম ম্যামের অনুকরণে যখন আমার বাচ্চা, অদৃশ্য ক্লাস বানিয়ে হোয়াইট বোর্ড , চক ডাস্টার নিয়ে রীতিমতো স্টুডেন্ট দের নাম ডেকে পড়া ধরে, বোর্ডে পড়া বোঝায় , বা নাচের ক্লাস করে এসে আপন মনে নিজেই নাচের ম্যাম হয়ে নাচ শেখায়, বেশ মজা লাগে, আবার ভাবি এর মধ্যেই বাচ্চা তার আনন্দ খুঁজে পেয়েছে , নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে আর খেলছে খেলুক, পড়া পড়া খেলা, আর যতদিন সম্ভব একাকীত্বকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে, ততই আখেরে ওরই লাভ।

আগে যৌথ পরিবারে হই হই করে খেলা, পড়াশোনা, যৌথ কাজকর্মে কি সুন্দর দিন গুলো কাটতো, ছেলে মেয়েগুলো মানুষ হয়ে যেতো ঘরের বা কাজের মাসিদের ওপর ভরসা করে, তাদের কোলে পিঠে চড়ে ! এখন পরিস্থিতি অনেক আলাদা। আজ আমাদের ভরসার লোকের অভাব, নানান সমস্যা সর্বত্রই। উপার্জন বেশি তবু দিশেহারা অভিভাবকগণ। এক সন্তানকে মানুষ করতেই আমরা চিন্তায় অস্থির, ত্রাহি ত্রাহি রব আমাদের অন্তরে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে এক জন সন্তানকেই ভালো করে মানুষ করতেই আমাদের জিভ অর্ধেক বেরিয়ে আসার উপক্রম! সুতরাং একাকীত্ব আছে, থাকবে আগামী প্রজন্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছায়ার মতো, আর আধুনিক জীবনে একে উপেক্ষা করা কি সাধ্যি ! এই চিন্তা বুকে নিয়েই আমাদের আজ বাঁচা, আগামীর পথ চলা । সবেধন নীলমণি সন্তান কে, একটা বেস্ট ক্যারিয়ার দেবার ইচ্ছা, চেষ্টা বা লক্ষ্যমাত্রার স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্বার্থপরতার মোড়কে একাকীত্ব, অবসাদ নামক কিছু অতি আধুনিকতার অলঙ্কার গায়ে চাপিয়ে আমরা দিন গুলো কাটাচ্ছি। জানিনা, এর শেষ কবে?





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮