• মমতা দাস

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে - পুণা, যেমন দেখেছি,বুঝেছি- আমার ফিরে দেখা


প্রথম খণ্ডের লিংক



(দ্বিতীয় এবং শেষ ভাগ)


পুণায় বেশ গুছিয়ে নিয়েছি,আনন্দেই আছি। শাশুড়ি মা-কে নিয়ে এসেছিলাম এখানে, কয়েকমাস থেকে তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির ! পুরোনো লোক, ফ্ল্যাটের জীবন তাঁর পছন্দ নয়, বলেন দম আটকে আসে। তার উপরে ভাষার অসুবিধা। আমি নানা কাজে বাইরে যাই,বাড়িতে যখন থাকেন,একটা কথা বলার লোক নাই। কাজের লোকের সঙ্গে যে একটু কথা বলবেন তার-ও উপায় নাই, ভাষার দুস্তর ব্যবধান ! ছেলেকে দিয়ে টিকিট করালেন কলকাতার। সেখানে মামাশ্বশুরের ওখানে কদিন থেকে ফিরে যাবেন আগরতলা, নিজের বাড়িতে। ছেলের তো সময় নেই, টিকিট করে দিয়েই খালাস তিনি। মাকে কলকাতা নিয়ে চললাম আমি-ই। ফেরার পথে একা আসব নাকি ? মোটেই না, এক মায়ের বদলে আরেক মাকে আমার সঙ্গী করি। ততদিনে আমরা বিশ্রান্তওয়াডির বাড়িটা ছেড়ে আউন্ধ-এ চলে এসেছি। সেটাও কোম্পানী লীজ, এটাও, তবে এখানে ফ্ল্যাট বড়, পাড়াটাও আগেরটার থেকে অনেক ভাল.। এ পাড়ায় এসে শুনি অনেক বাঙালী থাকে। আমার তো সংকোচ বলে কিছু নেই,'কানে গুঁজেছি তুলো /পিঠে বেঁধেছি কুলো'.......পৌঁছে গেলাম একজনের বাড়ি। সে যুগপৎ অবাক এবং খুশি। একদম অচেনা কেউ যে এভাবে বাড়ি চলে আসতে পারে, সে দেখেনি বলল। আমি বললাম 'কি আর হবে, না হয় কথা বলবে না। তাহলে আর কোনোদিন আসব না।' তাড়াতাড়ি বলে 'না না খুব ভাল লাগছে।' এসে গেল চা পকোড়া, বেশ বন্ধু হয়ে গেলাম আমরা। পরে দু/একটা ব্যাপারে কিছু কিছু সাহায্য পেয়েছি তার কাছে। যাই হোক সেই বলে দিল কোন কোন ফ্ল্যাট-এ বাঙালী আছে। মোটামুটি জিস্ট-ও দিয়ে দিল কে কেমন নেচারের। আমার সুবিধাই হল তাতে। পরদিন থেকে আমার অভিযান শুরু। প্রিয়বন্ধু হাসে 'বন্ধু খোঁজার চক্করে মারটার খাবে একদিন' রাগ করে বলি 'বেশ,মার খেলেও তোমাকে জ্বালাতন করব না, হল?' হা হা করে হাসে 'ডাকলেও আমি আসব ভেবেছো ? না বাবা, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'----আমি আরো রাগ করি, সে আরো হাসে। ওইরকম-ই স্বভাব ছিল যে ! আমাকে খেপিয়ে কি যে আনন্দ ! বলত 'রাগলে অন্যরকম হয়ে যাও তুমি, সেটাও একটা অন্য রূপ, ভালো লাগে।' বোঝ একবার, ভালো লাগে বলে আমাকে রাগিয়ে, মজা দেখা ! হেসে ফেলতাম হার মেনে, কত আর রাগ করি ? পঁয়তাল্লিশ বছরে কতবার যে রাগ করলাম আর ভুললাম তার ঠিক নেই ! যাই হোক, বেশ অনেক বন্ধু পেয়ে গেলাম পুণায়। ছিল চিন্তামণি নগরে সেন বৌদি,শিপ্রা, শিউলি,প্রথমে এর বাড়িতেই গেছিলাম। সেন বৌদি, শ্রুতি, জ্যোতি বলে কমবয়সী একটি বৌ ছিল, বৌদি ডাকত। আগের বাড়িটাতে এক-ই বিল্ডিং-এ ভাড়া ছিল,পরে এই পাড়ায় ফ্ল্যাট কিনে উঠে আসে।



ইতিমধ্যে আমার ছোট ভাই পুণায় চাকরী নিয়ে এল। পুনার কাছেই ভোসারিতে বাসা নিল।অতএব বেশ একটা যাওয়ার জায়গা হল আমাদের। ভাই মাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। ভাই বৌ এলাহাবাদে কলেজে পড়ায়, গরমের, দুর্গাপূজার আর শীতের ছুটিতে আসে ছেলে-মেয়ে নিয়ে। তখন বাইরে খাওয়া, ঘোরা খুব হয় ! 'আনন্দ আজ দিকে দিকে আলোর বাণী দিল লিখে' ! যেন হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে দিন। ছেলে মাধ্যমিক পাশ করেছে খুব ভালোভাবে। এবার কাছেই সেন্ট্রাল স্কুলে পড়াবার ইচ্ছা। জানাগেল যা রেজাল্ট, ভর্তি হয়ে যাবে কিন্তু মুম্বাই-এর IIT পাওয়াই থেকে একটা নোঅবজেকশন লেটার আনতে হবে। আমি কলকাতা থেকে ফিরেছি সকালে। এই কথা শুনে কাপড় চেঞ্জ করে, একটু জলখাবার খেয়েই রওয়ানা। দুদিন ধরে জার্নি করে এসেছি, তাতে কি ? কাজের জন্য ডাক পড়লে আমার ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ক্লান্তি কিছুই থাকে না। ছেলের কাগজপত্র গুছিয়ে গাড়ি ড্রাইভার সমেত ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মিশন 'সেন্ট্রাল স্কুল পারমিশন'। পুণা থেকে মুম্বাই এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে চার ঘন্টার কিছু বেশি। যখন পৌঁছলাম, তখন স্কুলের কর্মচারীদের লাঞ্চ টাইম। অতএব অপেক্ষা। আমরাও খাওয়া সেরে নিলাম ক্যান্টিনে। মধ্যাহ্ন বিরতির পর অফিস খুলতেই আমরা হাজীর। খুব-ই সিস্টেমেটিক ব্যাপার দেখলাম। হয়ে গেল চটপট। তারপর আবার ফিরতি পথে। সাড়ে চার ঘন্টা পরে যখন বাড়ি পৌঁছলাম,মনে হল আমার শরীরে কিছু নাই ! ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনরকমেকিছু খেয়ে বিছানায়। তারপর আমি আর নেই। পরদিন সকালে উঠে আবার গেলাম ছেলের স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে। এসব সময়ে আমার শরীর-মনে যেন ১০০ হাতির বল এসে যায়, ক্লান্তি কাছ ঘেঁষতে পারে না। ছেলেটার ভর্তির সব কাজ হয়ে যাওয়ার পর শান্তি ! মেয়েটাও ঘরে ফিরে এসেছে কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইংলিশ অনার্স নিয়ে BA পাশ করে। ভর্তি হয়েছে পুণা উনিভার্সিটিতে। ইউনিভার্সিটি আমাদের বাড়ি থেকে খুব কাছে। ছেলের স্কুল-ও এখন কাছে হয়ে গেল। আমাদের ঘর-সংসার আবার খুশিতে ভরে উঠেছে। আমরা চারজন একসঙ্গে থাকলে জগতের কোন অসুবিধাই কিছু করতে পারে না। আমাদের পারিবারিক সঙ্গীত হল 'আমরা সবাই পাগল আমাদের এই পাগল রাজত্বে /নইলে মোরা পাগল ভাবে মিলব কি শর্তে'---কাজেই জীবন সুন্দর ছন্দে চলেছে। মেয়ে পুণে উনিভার্সিটিতে পড়ে, সেই সূত্রে ওদের নানা অনুষ্ঠানের কার্ড পেয়ে যেতাম আমরা। দেখেছি গুলজার সাহেবকে ,তাঁর নিজের শায়েরি ওনার-ই মুখে শোনা, সে এক দারুন অভিজ্ঞতা ! গুলজার সাব আর তাঁর কবিতা দুটোই আমার প্রবল আকর্ষণের। লম্বা, সুঠাম সুন্দর চেহারা মৃদু, মিষ্টভাষি গুলজার সাব সুন্দর কিন্তু তার চেয়েও সুন্দর তাঁর কবিতা, মনকে আবিষ্ট করে রাখে। হিন্দী সিনেমায় তো এখন উনি ছাড়া কেউ নেই, ভালো লিরিকস লিখতে পারে। দেখেছি জাভেদ আখতার কে। দেখেছি শোভা দে-কে। ভদ্রমহিলা ভাল ইংরেজি জানে, টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে ওর আর্টিকল আমাদের খুব-ই আনন্দ দিত, কিন্তু উপন্যাস ? নাঃ সহ্য করা যায় না। যাই হোক বেশ অনেককে দেখা-শোনা হয়েছে তখন। পুণা ইউনিভার্সিটি-তে একটা অবজারভেটরি ছিল, সেখানে গিয়ে আকাশের তারা-টারা দেখেছিলাম। ছোট্টবেলায় ছাদে শুয়ে শুয়ে দেখা সপ্তর্ষি মন্ডল, ধ্রুবতারা, মঙ্গল, বৃহস্পতি এইসব মেলাতে পেরে খুব ভাল লেগেছিল। MCRC একটা আলাদা ডিপার্টমেন্ট। Mass Communication-এর উপর নানারকম রিসার্চ আর প্রোগ্রাম চলত সারা বছর। টিভি তেও নানারকম প্রোগ্রাম করত তারা।পুনা ইউনিভার্সিটিতে ছিল আরেকটা গুরুত্ব পূর্ণ স্থান c-dac( সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট অব অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং),সারা বছর সেখানে কম্পুটার নিয়ে রিসার্চ চলত !এখানেই প্রথম তৈরী হয় ভারতের সুপার কম্পুটার 'পরম'।


পুণার একটা নিজস্ব রূপ-ছন্দ তখন দেখেছি। প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ধরে রেখে, একেবারে আধুনিক জগতের দিকেএগিয়ে চলেছিল। আমরা বোম্বে থেকে এসেছিলাম,এই দুটো মহারাষ্ট্রীয় শহরের তফাৎটা খুব সহজেই নজরে পড়েছিল। বোম্বে ভীষণ রকম কসমোপলিটান। নানাজায়গার, নানাভাষার,নানা সংস্কৃতির মানুষ আসছে, নিজেদের নিজস্বতাভুলে মানবস্রোতে মিশে যাচ্ছে। বোম্বে-র নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই। কিন্তু পুণা বা মাদ্রাজ একদম আলাদা। এরা আধুনিক উন্নতির পতাকাটা নিয়েছে বটে,কিন্তু প্রাচীন পতাকাটাও মাটিতে ফেলে দেয় নি। দুটোই সমানতালে বয়ে নিয়ে যেতে তারা পারছে, সেটাই তাদের কৃতিত্ব ! মাদ্রাজে যেমন দেখেছি সারা বছর ক্লাসিক্যাল গানের অনুষ্ঠান চলে মিউজিক একাডেমিতে,দেখেছিলাম বাল মুরলী কৃষ্ণণকে,বিখ্যাত দক্ষিণ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞ ! পুণাতে তেমনি বাল গন্ধর্ব কলাদালান-এ সবসময় কোনো না কোনো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান বা মারাঠি নাটক চলত। বছরের শেষে আবার নাট্যোৎসব হত ভারতের নানাপ্রদেশের নাট্য দলকে আমন্ত্রণ করে। এইসব সময় আমি দেখেছি বিজয় তেন্ডুলকর, বিজয়া মেহতা, গিরিশ কার্নাড ,শ্রীরাম লাগু, মোহন আগাসে, কুলভূষণ খারবান্ডা, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ ,অরবিন্দ দেশপান্ডে, সদাশিব অমরাপুরকর,অশোক সারাফ, নীলু ফুলে, মোহন জোশি,অমল পালেকর----এক সে এক বড় অভিনেতা। জীবন ধন্য হয়ে গেছে এনাদের সামনে সশরীরে দেখে। নাটক, নাটক নিয়ে আলোচনা। যেমন জ্ঞানগর্ভ, তেমনি সরস ! বালগন্ধর্ব নিজে ছিলেন মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর নামের প্রেক্ষাগৃহে সেরকমটা হওয়াই তো স্বাভাবিক ! মাঝে মাঝেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হত। দেখেছি ভীমসেন যোশী, পন্ডিত যশরাজ, হীরাবাই বোরদেকর,গাঙ্গুবাঈ হাঙ্গল,কিশোরী আমোনকর,বীণা সহস্রবুদ্ধে-----কি সব নাম, কি তাদের গান ! ধন্য ধন্য আমার জীবন। ভগবান এত পাওয়াও লিখেছিলেন আমার ভাগ্যে ! কি করে যে ধন্যবাদ দেব ভাষা খুঁজে পাই না।



পুণা থেকে বেড়াতে যাওয়ার জায়গা অনেক। মহাবালেশ্বর-পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বরের মন্দির,ছোট্ট পাহাড়ি জায়গার ঠান্ডা আবহাওয়া, ট্যুরিস্টদের ভিড়,কুয়াশা মাখা দিনরাত, ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ এখানে। গায়ে সোয়েটার-চাদর চাপিয়ে ঘুরতে বেশ লাগে ! এখান থেকে প্রতাপগড়। শিবাজীর দুর্গ গুলোর মধ্যে অন্যতম। পাহাড়ের উপরের দুর্গ দেখে সহজেই অনুমান করা যায় তখনকার দিনে, নিচ থেকে গিয়ে,ঐসব দুর্গ আক্রমণ করা কত কঠিন ছিল ! সেই কারণেই হয় তো এইরকম দুর্গম স্থানে দুর্গ বানানো হত ! এখন তো আমরা গাড়ি নিয়ে সোজা দুর্গের নীচে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে যুগে ? সেসব দেখে নেমে এলাম, মহাবালেশ্বর ছাড়িয়ে এসে পঞ্চগনি। এখানকার স্ট্রবেরী বিখ্যাত।যেমন তার চকচকে তাজা চেহারা, স্বাদেও যেন অমৃত ! ম্যাপেল বলে একটা কোম্পানী-র বিরাট ফার্ম হাউস-জমি আছে এখানে।সারা বছর স্ট্রবেরী ও আরো নানারকম ফল হয়। এই কোম্পানী-র জ্যাম, জেলি,জুস্ মহারাষ্ট্রে খুব প্রচলিত।খাওয়া এবং নেওয়া হল কিছু। এবার ফেরার পথে। রওয়ানা হয়েছি সাড়ে বারোটা নাগাদ, পরিকল্পনা ছিল রাস্তায় কোথাও লাঞ্চ খেয়ে নেব। শাশুড়ি মা আছেন সঙ্গে, তাই নিরামিষ খাব ঠিক হল। সেতো হল,কিন্তু একটাও খাওয়ার জায়গা খোলা নেই যে ! এটা কিরকম হল ? এইসব টুরিস্ট স্পটের দিকে সারা রাস্তায়-ইতো অজস্র খাওয়ার জায়গা, ধাবা এসব থাকে,তবে আজ ? কি এক অজ্ঞাত কারণে সবগুলোই বন্ধ। দু-একটার চেহারা দেখে আমরাই নাকচ করেছি। মা বুড়ো মানুষ,ছেলে ছেলেমানুষ,আর মায়ের ছেলে ক্ষিদে সহ্য করতে পারে না। সহযাত্রী সকলের-ই কষ্ট ! কেবল আমি ঠিক আছি। ক্ষুধা আমাকে বিচলিত করতে পারে না। অন্য সকলের অবস্থা দেখে চিন্তার ব্যাপার দাঁড়িয়ে গেল। আমরা ঠিক করলাম সামনে যেকোনোটাই পাব ঢুকে যাব,প্রায় তিনটে বাজে, তাই এই অবস্থা, বাছাবাছির অবকাশ নেই আর ! এইসব ঠিক করে চলেছি হঠাৎ সামনে, হ্যাঁ ধাবা। সকলে হৈ হৈ করে উঠলাম অবশেষে পাওয়া গেছে ! প্রিয়বন্ধু সোজা ওদের উঠোনে ঢুকে গাড়ি পার্ক করল। দৌড়ে এল এক তরুণ। লাঞ্চ বলতেই বলল হবে। আমরা নামলাম। মা একটু দ্বিধায় দেখলাম,ওনার তো এসব অভ্যাস নাই ! বললাম যে এইসব জায়গায় খাবার ভালোই হয়, গরম বানিয়ে দেবে,ঠিক খাওয়া যাবে। তখন তো আর উপায়-ও নাই ! বললাম বাইরের উঠোনেই খাটিয়া পেতে দিতে। ঝেড়েঝুড়ে পেতে দিল তারা মূল্যবান অতিথিদের জন্য। রোজ তো ট্রাকের সর্দার ড্রাইভারদের দেখামেলে, আজ......বাইরের দিকেই একটা কল-বেসিন ছিল, সেখানে মুখ-হাত ধুয়ে বসলাম।এলো গরম গরম রুটি-ভেন্ডির তরকারি-বেগুনভর্তা।...খিদের মুখে আহা অমৃত ! মা বললেন ভাল তো গো, রুটি কি নরম ! যাক বাবা শান্তি ! সবাই তৃপ্তি করে খেলাম, খরচ অনেক কম হল। বিল মিটিয়ে,তৃপ্ত মনে আমরা আবার বাহনে সওয়ার ! চলার পথে এরকম কত অভিজ্ঞতা, কত আনন্দ পেলাম প্রবাসের দীর্ঘ সময়ে ! তাই একদিন-ও আমাদের একঘেয়ে লাগে নি,বরং রোজ নূতন আনন্দ, রোজ অপূর্ব অনুভব !---

'ভাঙা পথের রাঙা ধূলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন/

তারই গলার মালা হতে পাপড়ি হোথা লুটায় ছিন্ন !'


'ওই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুল গুলি ঝরে /

আমি কুড়িয়ে নিয়েছি,তোমার চরণে দিয়েছি /

লহ লহ গো করুণ করে '---



সারাটা জীবন কেবল আনন্দ কুড়িয়ে গেলাম। কোন অদৃশ্য অপরূপ যে এত পাওয়া ছড়িয়ে রেখেছিলেন জানি না। বিস্মিত হই মুগ্ধ হই তাঁর অসীম করুণায়, বিনত হই ! পুণা-র আশেপাশে চারদিকে ছড়িয়ে আছে কত যে ঐতিহাসিক,ধর্মীয়,প্রাকৃতিক সুন্দর দর্শনীয় স্থান, বলে শেষ করা কঠিন ! দেখেছি বিখ্যাত সন্ত জ্ঞানেশ্বর-এর পুণ্যভূমি। পুণা থেকে বেশি দূরে নয়, আলন্দি গ্রামে তাঁর মন্দির ইত্যাদি দেখে এসেছি শাশুড়ি মাকে নিয়ে। সির্ডি তো কতবার গেছি তার ঠিক নেই ! কেন যেন ভাল লাগত ! পুজো-টুজোয় আমাদের কোন উৎসাহ নেই, তবু ! সেই সাধারণ গ্রাম্য মানুষটার অসাধারণ জীবন ও কথাগুলো মনকে টানে। যেমন আমাদের ঠাকুর রামকৃষ্ণ ! কিন্তু এঁদের সাধারণ জীবনযাপনের কোন মূল্য তো আমরা দি-ই না। অসাধারণ মানুষদের সাধারণ দেবতা বানিয়ে পুজো, জাঁকজমক, ঘটা-----হয়ত বিরক্ত হন তাঁরা, কিন্তু বোঝে কে ? 'গেঁয়ো যোগী ভিখ পায়না' যে ! তাই প্রয়োজন দেখনদারি ! আমার ভাল লাগে না। আমি তাই বেলুড় মাঠে যাই না, শেষের দিকে সির্ডি-ও যাওয়া ছেড়ে ছিলাম। আর ছিল শনি সিংনাপুর। শনি ঠাকুরের মন্দির। শনিবার বা বিশেষ উৎসবের দিনে খুব ভিড় হত, এমনিতে মোটামুটি ফাঁকাই থাকত। এই মন্দিরের একটা বৈশিষ্ট্য হল এখানে পুজো দিতে হবে ছেলেদেরকে। মেয়েরা বসে আছে, গল্প করছে,বিশ্রাম করছে পুরুষরা লাইনে দাঁড়িয়ে। উৎসবের দিনে সে লাইন বিরাট লম্বা, সাপের মত এঁকে-বেঁকে এমাথা-ওমাথা। নিয়ম হচ্ছে পুরুষরা সেখানে গিয়ে নিজের কাপড়জামা ছেড়ে, সেখানকার কমলা রঙের কাপড় পরে কলের জলে স্নান করবে, তারপর ভিজে কাপড়েই লাইনে দাঁড়াবে। গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের দিনে সেই ভেজা কাপড় গায়েই শুকায়। মাথার উপর চড়চড়ে রোদ, গায়ে সদ্য ভেজা কাপড়, তবে অসুস্থ হতে কাউকে দেখি নি। আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসে অনেকেই যেত সেখানে,একটাও অসুখের ঘটনা জানি না। এখানকার আরেকটা বিশেষত্ব হল কোন বাড়িতে দরজা নেই। খালি পর্দা টাঙিয়ে রাখতে হয়,মানে বন্ধ করা যায় না। কেউ দরজা বানানোর চেষ্টা করলে নাকি ভেঙ্গে পড়ে যায় ! সাধারণ একতলা বাড়িতে মন্দির, তেমন বড় কিছু নয় ! শুনেছি বহুবার চেষ্টা হয়েছে দোতলা বানানোর, কিন্তু পারা যায় নি। যতবার চেষ্টা হয়েছে, ভেঙে যায়। মানে রাজমিস্ত্রিরা হয়ত অর্ধেক দেওয়াল তুলে কাজ বন্ধ করে বাড়ি গেছে রাতে, পরদিন এসে দ্যাখে যতটা বানিয়েছিল সব ভেঙে পড়ে আছে। আবার নতুন করে, ওমা, আবার সেই কান্ড ! কয়েকবার এরকম হওয়ার পর আর চেষ্টা করা হয় নি। এখন মাটির উপরেই যতটা পারা যায় বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। গল্পটা ওখানের স্থানীয় মানুষের কাছে শোনা, সত্য-মিথ্যা কিছুই জানি না।


ইতিহাস তো পুনার সমস্তটা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কাছেই সিংহগড় দুর্গ। শিবনেরি, প্রতাপগড়, সিন্ধুদুর্গ, চাকন বলে শেষ করা যাবে না। ছোট্ট একজন গ্রাম্য রাজা মুঘলদের নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন। মাত্র একান্ন বছর বয়সে মারা যান, নইলে আরো কত কি হত কে জানে ! শিবাজীর শাসনকালের পরে পেশোয়ারা মুঘলদের সঙ্গে একরকম সমঝোতায় এসে বহু বছর চালিয়ে যায়। বৃটিশরা এসে সব দখল করলে তাদের শাসন কালের অবসান। ছোটখাট ঝামেলা হলেও বৃটিশরা বেশ শক্ত হাতেই শাসন চালু রেখেছিল। মাঝখানে নানা ফড়নবীশ সিপাহী বিদ্রোহের সময় একটা চেষ্টা চালায়, তবে সেটা ব্যর্থ হলে আর তেমন কিছু ঘটে নি। তারপর স্বাধীনতা আনার আবেগের জোয়ারে সাভারকার ভাইরা আর আরো কিছু জন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেসব কথা সকলের-ই জানা ! আমি যাই ইতিহাসের দেশে বেড়াতে। আহম্মদ নগর, বিজাপুর,ঔরঙ্গাবাদ ইতিহাসের কি কমতি আছে ? ছড়ানো মণি-মুক্তো থেকে কিছু তুলে আনা আর কি ! ঔরঙ্গাবাদ হয়ে যেতে হয় ইলোরা-অজন্তা। সে যে ইতিহাস-শিল্প-সংস্কৃতির স্বপ্ন রাজ্য ! বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা দিনের পর দিন খেটে কি অমূল্য সব রত্ন রেখে গেছেন, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন ! বলে কি সবটা বোঝানো যায় ! প্রথমবার দেখে সেই বিস্ময়, সেই অপূর্ব অনুভূতি বর্ণনা করা আমার ক্ষমতার বাইরে ! দুটো জায়গাই 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কেভস'-এর তালিকায় স্থান পেয়েছে। আমরা গিয়ে উঠতাম ইলোরার হোটেল কৈলাস বা সরকারী টুরিস্ট লজে। মালপত্র রেখে আগে ঘোরা, অমূল্য দৃশ্যের এতটুকু মিস না হয়ে যায় সেই চিন্তা ! ইলোরায় আছে অপূর্ব সুন্দর পাথরের মূর্তি। কোন নিপুণতায় যে পাথরের গায়ে স্বপ্নের মত সুন্দর কারুকাজ করা এমন মূর্তি খোদাই করা হয়েছে, ভেবে বিস্ময়ের থৈ মেলে না। ইলোরায় অতি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আর মনাস্ট্রি আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মনোলিথিক পাথরের বিশাল মন্দির আছে এখানেই। সর্বমোট বারোটা মন্দির,বিহার আছে। সবচেয়ে বড় চৈত্য গৃহ এখানেই। তার ভিতরে পনেরো ফুট উঁচু বিশাল বুদ্ধ মূর্তি অবশ্য দর্শনীয় ! অজন্তায় মোট ত্রিশটা গুহা আছে। প্রত্যেকটাই অপূর্ব সুন্দর হাতে আঁকা ছবি, দেওয়াল চিত্র (ম্যুরাল?) দিয়ে সাজানো। সেসব দেখা এক বিরল অভিজ্ঞতা। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এইসব ছবি এঁকেছেন নিজেদের কাজের অবসরে, এখন সেগুলোই আমার মত অধমের অতিআনন্দের যোগান দিচ্ছে একি কম কথা ? বৌদ্ধ ধর্মের রীতি অনুযায়ী এখানেও চৈত্য এবং বিহার দেখা গেল। অজন্তা-ইলোরা দুটোই অতি প্রাচীন, ধর্ম এবং শিল্পের নিদর্শন। সেকেন্ড সেঞ্চুরি BC থেকে সিক্সথ সেঞ্চুরি AD পর্যন্ত এই শিল্পকর্ম হয়েছে বলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অভিমত। দুটি জায়গায় আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য,সংস্কৃতি এবং ভারত বর্ষের স্বর্ণালী অতীতের গৌরব গাথা মনে করায়। দেখলে নিজের দেশের অতীত সম্পর্কে বিনয় ও শ্রদ্ধা বাড়ে শতগুন। এইরকম সব বেড়ানোয় মনের প্রসারতা বাড়ে শতগুণ ! সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্তি, মন জানে আলোর ঠিকানা---

'আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে /

আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায় ঘাসে ঘাসে '



খুব ঘুরতাম, প্রিয়বন্ধু শহরে থাকলে একটা শনি-রবিবার বাড়িতে বন্ধ থাকতাম না। কত দেখেছি, তবু কত বাকি থেকে গেল ! দেখা হয়নি গণপতি ফুলের বিখ্যাত বিটঠলবাবা মন্দির, বিটঠল মারাঠি ভাষায় কৃষ্ণের নাম। সারা মহারাষ্ট্ৰেই ছড়ানো অজস্র মন্দির তাঁর। সেই জন্যই হয় তো মারাঠিরা বেশিরভাগ নিরামিষাশী ! দেখা হয় নি পৈঠানি, এখানকার তাঁতিদের তৈরী শাড়ি অতিমহার্ঘ এবং বিখ্যাত। আমার অবশ্য ভালো লাগে না ! আমার ভাল লাগে জিজামাতা সিল্ক আর পুণে শাড়ি। তবে তাতে কি আসে যায় ? পৈঠানি শাড়ির নাম এবং দাম কোনোটাই মমতার মতামতের উপর নির্ভরশীল নয়। দেখা হয় নি রত্ন গিরি, এখানকার হাপুস বা আলফানসো আমি জগৎ বিখ্যাত। এখানেও আমার পছন্দ মেলে না। তিন/চারশো টাকা দিয়ে একটা মাঝারি মাপের আম কিনে খাওয়া আমার জঘন্য লাগে। আনন্দ পাওয়ার অবকাশ হয় না,বিরক্তি জন্মায় ! তবে দুনিয়াসুদ্ধ লোক খাচ্ছে, আনন্দ পাচ্ছে।


আমি তো সৃষ্টিছাড়া মানুষ একজন,মতামতে কার কি এসে যায় ? পুনা-য় আমরা কিন্তু সিনেমা হল-এ কোন সিনেমা দেখিনি। হল-ও দেখেছিলাম কি ? মনে পড়ে নাতো ! অর্থাৎ দেখিনি, তবে মলগুলো চালু হওয়ার পর দেখেছি দু-একটা। কিন্তু হাজার আনন্দ, শত জীবন উত্সব ভরে রাখত আমাদের ! নাট্য উত্সব, সারারাত ব্যাপী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উত্সব, ক্রিকেট,পুনা ইউনিভার্সিটি-র নানা উৎসব, আমাদের দুর্গাপূজা, কত কি ? আমাদের বেঙ্গলি লাইব্রেরী,বেঙ্গলী এসোসিয়েশন-এর পুজো। তাছাড়া বিমান নগরে এয়ার ফোর্সের পুজো,ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্স(AIMS)এর পুজো,কল্যানী নগর, খাড়কি কালী বাড়ি, বেঙ্গল ইউমিউনিটি,কত পুজো, কত আনন্দ ! যেতাম আমরা সব জায়গায়.ওই কদিন কোন ভেদাভেদ থাকত না। কেউ চাইত না,তবু আমরা যেচে চাঁদা দিতাম সাধ্যমত। আমি একা নয়,সকলেই তাই করত। যেদিন যেখানে সুবিধা হত মায়ের ভোগ খেয়ে নিতাম।সেরকম-ই নিয়ম চালু ছিল।মনে করাকরির কথাই উঠত না। পুনায় ডাক্তার পেয়ে গেলাম মনের মত, প্রথমবার ছেলের অসুখে একজনের পরামর্শে পৌঁছলাম এক বাঙালী ডাক্তারের কাছে,কিছুদিন পরেই তিনি আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান,আমার অনুরাধাদি, ছেলেমেয়ের আদরের মাসি। কত ভাল বাসতেন আমাদের সকলকে, তাঁর হাসি মুখটা মনে ভাসে। নিজে তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে, রেখে গেছেন আমাদের জন্য সুখস্মৃতি ! বিদেশ থেকে ফিরে প্রিয়বন্ধু ছিল 'নিলসফ্ট' নামে একটা কোম্পানীতে। সেখান থেকে পেয়ে গেল একটা ডাচ কোম্পানী-র অফার,পোস্টিং হায়দ্রাবাদে। তাতে কি ঘাবড়াই ? মেয়ে-জামাইকে আমাদের ফ্ল্যাটে বসিয়ে,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলেকে তাদের কাছে রেখে, আমরা দুজন চলে গেলাম। তারপর সেখান থেকে পুনা, আসা-যাওয়া চলতেই থাকে। মাসে একবার, মাঝে মাঝে দু-তিন বার-ও আসতাম। দশ ঘন্টার জার্নি,কিন্তু কিছুই মনে হত না। তার মধ্যেই আমার মা মারা গেলেন কলকাতায়,তার আগে গিয়ে ,একমাস মা-র সঙ্গে থাকলাম। দিদির বড় মেয়ের বিয়ে হল,কলকাতায় যাওয়া-আসা হল বেশ কবার ! সেই বিদেশী কোম্পানী অবশ্য ভারত সরকারের সঙ্গে একটা লিগাল ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে খুব short নোটিশ-এ ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেল। তখন আবার বোম্বে,DG2- এ জয়েন করল প্রিয়বন্ধু। এইরকম-ই আমাদের ছিল যাযাবরের জীবন ! সুখে-দুঃখে কেটেই যাচ্ছিল---'আলোতে-ছায়াতে দিনগুলি মিশে রয়'-------------


' ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে'--------------------------------------------------------------------------------------------------------


পুণায় এমনিতে জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি। চাকরীর পরের অবসর জীবন যাপন প্রায় দুঃসাধ্য ! তবে কিছু কিছু জায়গায় অল্প শস্তায় পাওয়াও যায় ! MG রোডের পিছনদিকে পুনার বড় বাজার, সেখানে মোটামুটি ন্যায্য দামে মাছ-মাংস-তরিতরকারি-ফল-মুদিখানার জিনিস পাওয়া যেত। তবে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে, তাই শনি-রবিতে গিয়ে বেশি করে বাজার করে আনতাম। ব্যাঙ্গালোরের রাসেল মার্কেট, মাদ্রাজের মান্দাভেলি মার্কেট সেইরকম। আর ছিল ফ্যাশন স্ট্রিট ,নামি-দামি কম্পানীর নকল কাপড়চোপড় পাওয়া যেত খুব শস্তায়। বোম্বেতেও এরকম একটা বাজার আছেএই নামেই।মনে হয় সেটার থেকেই ব্যবসাবুদ্ধিটা নেওয়া ! MG রোডের কাছেই আজাদ ময়দান, জিমখানার বিপরীতে অবস্থিত এই বাজারে তরুণতরুণীদের ভিড় লেগেই থাকত। আর ছিল বাবাজান চক, এখানে সালোয়ার স্যুটের কাপড়, সিনথেটিক শাড়ি ইত্যাদি অত্যন্ত কমদামে পাওয়া যেত। আরো ছিল হংকং লেন। ইমিটেশন জুয়েলারী,সানগ্লাস,স্টাইলের রিস্ট ওয়াচ ইত্যাদির স্বর্গ ডেক্কান-এর জংলী মহারাজ রোড থেকে ডান দিকে একটু ঢুকলেই গলির মধ্যে এই বাজার। যেতে হত মাঝেসাঝে মেয়ে ছেলেমানুষ, ছাত্রী, বন্ধুদের সঙ্গে যায় এখানে-সেখানে,এইসব জিনিস লাগে। তার উপরে ভাই-এর মেয়েটা ছুটিতে এলে তার জন্য-ও কেনা হয়, আমার মেয়ে বলে ঝিংপ্যাং, সেসব নইলে আজকাল নাকি চলেনা আর বেশি পয়সা খরচ করতে সে রাজি নয়, কাজেই ! পুণা উনিভার্সিটির আরো দু/একটা কথা বলা দরকার। এখানেই ছিল c- dac ,সেখানে অনবরত পৃথিবীর সবচেয়ে মডার্ন কম্পিউটার নিয়ে রিসার্চ চলছে। জগৎ বিখ্যাত 'পরম' নামের কম্পিউটার এদের-ই কাজের ফল। শুনেছি, দেখা হয় নি আমার। কিন্তু পুণাতে থাকতে লোকে খুব আলোচনা করত দেখেছি ,শুনেছি। কিন্তু বুঝিনি খুব একটা,তার সম্মন্ধে আলোচনা অনাধিকার চর্চা হবে, কাজেই বিরত রইলাম সে আলোচনায়। ছিল ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার অফ অ্যাস্ট্রোনমি এন্ড এস্ট্রোফিজিক্স ( IUCAA), মহাশূন্য,আকাশ, অন্তরীক্ষ নিয়ে নানান গবেষণা চলে,চলছে। দেশের এবং বিদেশের নানা ইউনিভার্সিটি-র শিক্ষক,ছাত্র-রিসার্চ স্কলার রা এখানে আসে লেখাপড়া এবং আলোচনার উদেশ্যে Dr.জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার ছিলেন তার প্রধান পরিচালক। এখানে ছেলের স্কুল এবংমেয়ের পুণা ইউনিভার্সিটি-র নানা বিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রদর্শনী, কুইজ কম্পিটিশন,আলোচনার আয়োজন হত। আমিও পেরেন্ট হিসাবে আমন্ত্রিত হয়ে গেছি দু/এক বার, তবে খুব যে বুঝেছি কিছু, এমন কথা বলা যাবে না। দেখার আনন্দে দেখতাম আর কি ! একবার কোনো একটা ধূমকেতু (Hally's?) দেখতে গিয়েছিলাম ছেলেকে নিয়ে। পুণা উনিভার্সিটির এস্ট্রোফিজিক্স-এর হেড অফ দি ডিপার্টনমেন্ট নিজে উপস্থিত ছিলেন সেদিন। পুণার ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এ ফিল্ম সম্মন্ধে যাবতীয় বিষয় পড়ানো হত। ল-কলেজ রোডে অবস্থিত এই ইনস্টিটিউট-এ সিনেমা বানানো, লাইটিং,সেটিং,অভিনয়,পরিচালনা,এডিটিং সব। এদের একটা ইন্ডিয়ান ফিল্ম আর্কাইভসআছে । এরা চেষ্টা করছে নানা ভারতীয় পুরানো ছবি বাঁচাতে ! এভাবেই বড় আনন্দে কেটেছে পুনার দিনগুলো।... .

'তার অন্ত নাইগো /

যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ /

তার অনু-পরমাণু পেল কত আলোর সঙ্গ /

তার অন্ত নাই গো নাই '---------






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮