• অমৃতা চক্রবর্তী

অণুগল্প - প্রচেষ্টা

বিভাদেবীর আজকাল নিজেকে বড়ো অপ্রয়োজনীয় মনে হয় সংসারে, বড়ো একা লাগে। জীবন হয়তো ওনাকে ভরিয়ে দিয়েছে, কোন কিছুর কমতি রাখেনি, তাও। মাত্র উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এই সংসারে এসেছিলেন অলোকবাবুর হাত ধরে। বনেদি বাড়ি, শ্বশুর, শাশুড়ি, ঠাকুর, চাকরে ভরা বাড়ি ছিল। বিভাদেবী আবার ছিলেন চার বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, আর ছোট বলে বাবার খুব আদরে মানুষ হন। কোনদিন সেভাবে কিছু কাজ করতে হয়নি। তার আগে তাঁর দুটি ভাই ছিল। আদরে, আবদারে, ভালোবাসায় বিভাদেবীর মা, বাবা ছেলে মেয়েদের কোন তফাত করেননি।


এই সংসারে আসার পর প্রতিটা কাজ হয়তো হাতে করে করতে হয়নি। কিন্তু শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামীর মন জুগিয়ে চলাটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড়ো কাজ। তখনকার দিন অনুসারে আবার বিভাদেবীর একটু বেশী বয়সে বিয়ে হয়েছিল। ওনার বাবা ছিলেন মেয়েদের শিক্ষায় বিশ্বাসী, আর তাই বিভাদেবীর পড়াশোনা বেশ কিছুটা শিখেছিলেন। স্বামী অলোকবাবু ছিলেন পেশায় ডাক্তার। শ্বশুরবাড়ি বা স্বামী কেউই প্রথমে উচ্চশিক্ষিত স্ত্রী কে মেনে নিতে পারেননি। দুজনের মনোমালিন্য ও অনেক হয়েছে। কিন্তু সময় আবার সবথেকে বড় ঔষধ। সবকিছুকে ঠিক করে দেয়। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সবকিছু বদলাতে শুরু করে।


যথাসময়ে বিভাদেবীর কোল আলো করে আসে অজিতাভ, তারপর অঙ্কিতা। স্বামী, সংসার সব কিছু সামলাতে সামলাতে সময় হু হু করে কাটতে শুরু করে। বিভাদেবীর খুব ইচ্ছে ছিল আরো খানিকটা পড়াশোনা করা, কিন্তু আর পড়াশোনা হয়ে ওঠেনি। অলোকবাবুকে সময়ে সময়ে খাওয়া, টিফিন, সন্তানদের দেখভাল করতে করতে বিভাদেবীর মনের ইচ্ছে মনের মধ্যেই মরে যায়। আজ তাঁর চেষ্টায় সন্তানরা সকলে সফল। তাঁর স্বামীর মতো পুত্র অজিতাভ আর কন্যা অঙ্কিতা দুজনেই আজ সফল ডাক্তার। অজিতাভ, স্ত্রী রুমা আর সন্তান তোজোকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকে। অঙ্কিতার বিয়ে হয়ে ডাক্তার স্বামী রৌনক আর কন্যা অলির সঙ্গে দিল্লীতে থাকে।

ছেলে, বৌমা যথাসময়ে অফিসে বেরিয়ে যায়। স্বামী অলোকবাবু ঘরের সামনেই ক্লিনিক। তিনি এখনো যথেষ্ট সক্ষম, নিয়মিত রুগী দেখেন। নাতি স্কুলে বেরিয়ে যায়। আসে সেই তিনটের সময়। সবাই বেরিয়ে গেলে এই সময়টা বিভাদেবীর বড় একা লাগে। বাড়ির কোন কাজ জোর করে করতে হয়না, নিজে থেকে যতটা ইচ্ছে হয় ততটাই করেন। কিন্তু আজকাল বড় হীনমন্যতায় ভোগেন। সবার একটা নিজস্ব জগত আছে, কিন্তু সংসারে বাইরে ওনার কিছু নেই। সর্বোপরি সবার কাজের স্বীকৃতি আছে, কিন্তু ওনার কাজ গুলোকে কেউ কাজ বলে গণ্যই করে না।


বিভাদেবী বরাবর বই পড়তে খুব ভালোবাসেন। ওনার বাড়িতে প্রচুর বই। অলোকবাবু ওনার এই ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেননি। চারদিকে উঠতি অনেক লেখক লেখিকা আর বইও অনেক। আজ ওনারও মনে হল আজ কিছু লিখে দেখবেন। নিজের জীবনের যন্ত্রণা নিয়ে লিখে ফেললেন ‘একটি মেয়ের কাহিনী’। নাতি তোজো স্কুল থেকে ফিরলে তার সাহায্য নিয়ে প্রথমে খুললেন ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট, আর তারপর তাতে গল্পটা পোস্ট হল।


***


আজ দু বছর কেটে গেছে। বিভাদেবী আজ পুরোদমে লেখেন। ফেসবুকে আজ তিনি সাহিত্য গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ভক্ত পাঠক পাঠিকাও হয়েছে বেশ কিছু। জীবনে আবার নতুন করে আলো দেখতে পেয়েছেন, সবার কাছে নিজের কাজের জন্য সম্মান পেয়েছেন। দুটো ছোট ম্যাগাজিনে তাঁর লেখাও বেড়িয়েছে। তাই আজ বিভাদেবী শুধু একজন স্ত্রী, মা আর ঠাকুমা নন, একজন সফল লেখিকাও।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮