• রাণা চ্যাটার্জী

আত্মমগ্নতা

আজকাল একটুতেই, কেমন যেন বেশি অস্থির হয়ে যাই আমরা। এটা লক্ষ্য করেছি একটা কেমন যেন অসহনীয়তার পরিমণ্ডলে গিনিপিগের মতো বসবাস আমাদের। সবকিছু আগে থেকেই শুধু চলছে, তা নয়, বেশ গতিশীল জীবন যাপনে অভ্যস্ত পড়েছি এই নাগরিক জীবনে। নগরীকরণ ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় সবকিছু মোটামুটি যা চাইছি তা পেয়েও যাচ্ছি । হঠাৎ মধ্য রাতে বুকের মাঝে চিনচিন ব্যথা তো, একটা ফোনে ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স , খুব কপাল খারাপ না হলে হাজির হয়ে পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে। "কি খাই, কি খাই" চিন্তার মাঝেও, আমার সব খাবারে কড়া নিয়ন্ত্রণ বলেও ঝাঁ-চকচকে মলে, মিষ্টি,নোনতার রকমারি যুগলবন্দিতে অতি সহজে রসনা তৃপ্তি,সেটাও সম্ভব হচ্ছে। ব্যাঙ্ক সহ নানান,আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ,দু'মিনিটের মধ্যে লোনের ব্যবস্থার কল্যাণে নানা বিধ ছোটখাটো চাহিদা মেটাতে বদ্ধ পরিকর। আজকাল মাথা গোঁজার ছোট্ট বাসা একটু চেষ্টা করলেই দীর্ঘমেয়াদি লোনের মাধ্যমে জুটিয়ে নেওয়া খুব কষ্টের নয়,সঙ্গে আছে সরকারি নানা পরিকল্পনার সুবিধা প্রাপ্তি।


চাহিদা প্রাপ্তির এমন লোভনীয় পরিবেশে অর্থ উপার্জনে স্বাবলম্বী নাগরিকগণের তবু যেন কোথাও একটা সন্তুষ্টি প্রাপ্তিতে ছেদ ঘটছে। "কি চাই আর কি পেলাম", এই হিসেব কষার ভাবনায় ডুবসাঁতারে, আধুনিকতার নিয়ন আলো চুষে নিচ্ছে রাতের ঘুম। খিটখিটে মেজাজ যেন বড় চেনা সঙ্গী হয়ে আজ রাত পাহারায় মগ্ন । চারিদিকে ওয়েব ক্যামেরার নজরদারি নাগরিক জীবন, তবু যেন ,কে পাশে এলো, কে কি করছে বাড়ির আপন সদস্যদের গতিবিধিও কেমন একটা অচেনা, অজানা পাঁচিলের গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ঠিক যেন একটা ঘোরের মধ্যে দিন যাপন করছি আমরা, মোবাইল আর ডিজিটাল জমানায় । নিজেদের চেনা পরিমণ্ডলেই এক ঘেরাটোপ জীবন যাপন, সেই সঙ্গে বড়ো বেশি নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা, আমিত্ব'র প্রচার, তাতে আমার গুণাবলী থাকুক আর নাই থাকুক। আমিই সেরা, আমি সব কিছু জানি, এই মানসিকতা অন্যের ওপর প্রকাশ করার প্রবণতা নিরন্তর গতিতে চলছে।


কাছের এবং আপন মানুষদের সম্পর্কের মধ্যে যেন একটা ধুলোর আস্তরণ জমছে। সঠিক পরিচর্যা, একটু ঝাড় পোঁছ, সামনে বসে দুদণ্ড কথা বলাতেই আবার সেই মনের নৈকট্য ফিরে আসে এটা জেনেও সময় কই! ব্যস্ততার দৈনন্দিনতায় মুখ গুঁজি, স্বান্তনা দেই নিজেকে "ফুরসৎ এর খুব অভাব" এই রকম অজুহাত দেখিয়ে । আর যদি সময়, সুযোগ অল্প পাওয়া যায়, তখন মন আস্কারা দেয়। তাহলেও 'এই বেশ আছি'র অভ্যস্ত জীবনদর্শন কড়া নাড়ে মনন ,চিন্তনে। বড়ো বেশি স্বার্থপরতার কাঠিন্য, প্রলেপ দেয় মনে, বাহবা যোগায়,"এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না"। আদতে দূরত্ব ,ধুলোর আস্তরণ কমে না, বরং বাড়তেই থাকে। আর আমরা মানুষেরা "পুতুল নাচের" চরিত্র হয়ে দিন গুজরান করি, নিজের ঢাক নিজে পেটাই। এই ভাবেই সম্পর্কের মধ্যে একটা দূরত্ব,পাঁচিল আপনা আপনি তৈরি হয়। পাশের, ঘরের আপন মানুষদের মধ্যে খোশ মেজাজে গল্প,কথা বার্তাও এক প্রকার অধরাই থেকে যায় নিজেদের দোষে। ছোটবেলায় শুনতাম,'লোকে যাকে বড় বলে, বড় সেই হয়', কিন্তু কোথায় লোকের সময় আছে, যে আপনাকে আপনার সৃষ্টিশীলতা, ভাল গুণাবলী কে উৎসাহ দেবে তাই ছুটছি সবাই আপন খেয়ালে। এই ঘেরাটোপ জীবনে, নিশ্চিন্ত মনে বাসা বাধছে ঘুণপোকা সম্পর্কের ফাটলে।


শৈশবের বিদ্যালয়ে শিক্ষকমশাই, ক্লাসে একবার প্রশ্ন করেছিলেন,"মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে কাকে? কেউ উত্তর দিয়েছিল ,"মা",কেউ বলেছিল "বোন", আমি সাহসে ভর করে বলেছিলাম,"নিজেকে মানুষ বেশি ভালোবাসে "। এই উত্তরটায় তিনি 'সাবাস' বলে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন আজও যা ভুলতে পারি না।


এটা কিন্তু খুব সত্যি কথা যে আমরা ,খাওয়া দাওয়া, পোষাক-পরিচ্ছদ ,দেখনদারি, যাবতীয় মগ্নতায় নিজেদের সঁপে দিয়ে এই আধুনিক গতিপ্রবাহে দিব্যি খাপ খাইয়ে বসবাস করছি। সূক্ষ্ম ভাবে লক্ষ্য রাখলেই বোঝা যাবে কেবল নিজেকে ভালবাসা, নিজেকে ভালো রাখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই আধুনিক বেঁচে থাকার নির্যাস।


নিজের জীবনের জন্য, ন্যূনতম চাহিদা মিটলেই যেখানে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু কেউ যদি কিছু ভাবে, আমি ব্যাকডেটেড বা আমায় হেয় প্রতিপন্ন করে, অন্যদের এই সব আগডুম চিন্তা ভাবনার স্রোতপ্রবাহ কিলবিল করে আমাদের মনের মধ্যে। এর সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে ছুটছে নিজেকে আপডেট রাখার প্রবণতা। নেট দুনিয়ায় নিজের নানান প্রোফাইলে ছবি আপলোড করা আর নিজেকে ফোকাস করার উদ্দেশ্যই কেবল নয়, ঘন্টায় ঘন্টায় চুম্বকীয় আকর্ষণে দেখতে ছুটছি , কজন লাইক, কজন কি কি প্রশংসার কমেন্ট দিলো !


সবকিছু হাতের মুঠোয় পেয়েও মানুষের মধ্যে কি যেন,নেই নেই আর একটা দুঃখী ভাব, অভাব বোধ। অতীতে কম পাওয়া, মানিয়ে নেওয়া, অল্প পেয়েও সবার সাথে ভাগ করে নেবার মধ্যে একটা স্বর্গীয় আনন্দ ছিল । সহনশীলতা, ঔদার্য, আন্তরিকতা এই সব গুনাবলি গুলো প্রোথিত হয়ে অনেক কিছু শেখাতো আমাদের। আজকের একটা দশ বারো বছর বয়সী ছেলে, মেয়ে, সব কিছু যেন তাদের মস্তিষ্কে আপডেটেড ভার্সন হয়ে গাঁথা। তবু যেন কিছু একটা না থাকার মন খারাপের দারুচিনি গন্ধ মেখে এই নাগরিক জীবন চর্চা। সব হাতের মুঠোয় থেকেও কি যেন না থাকার ভ্রম নিয়ে ব্যস্ততার দিনযাপন আসলে মরীচিকার মতো আমাদের প্রলোভন দেখায়।


ঝির ঝির বৃষ্টির বিষণ্নতা ছেড়ে উৎসবমুখর বাঙালি আলো ঝলমল মণ্ডপে ভিড় করলো । কিন্তু যে লাখ লাখ টাকার পূজামণ্ডপ শিল্পীদের অপূর্ব কাজের সাক্ষী, কি অপূর্ব সূক্ষ্ম হাতের কাজ মনোরঞ্জন দেবার জন্য হাজির তাও যেন ব্রাত্য! কি অপরূপ দেবী মূর্তি, পুরোহিতের পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ পরিবেশ কে স্বর্গীয় করে তুলেছে, তবু দেখছি এই যুব সমাজ ,ঝাঁকে ঝাঁকে যুবক যুবতী, সকলের একটাই যেন উদ্দেশ্য সেলফি তুলে সরাসরি পোস্ট, আপডেট দিয়ে নিজেকে জহির করা। দেবীমূর্তিকে পাশে রেখে যেকোনো মূল্যে একখান মনের মতো সেলফি চাই ই চাই , নইলে কিসের এই সাজ, এতো অপেক্ষার প্রহর গোনা! এই ভাবে কেবল দেখছি নিজের মধ্যে নিজের আত্মমগ্নতা, বিলিনতা । এ যেন এক যেচে প্রতিযোগিতাকে নিয়ে আসা যা আখেরে তৃপ্ততার শেষ বিন্দু তে নিজেকে পৌঁছাতে দেয় না, বরং জন্ম দেয় এক রাশ হতাশা আর হীনমন্যতার। কেবল কে কি খাওয়া দাওয়া করবো, আর অল্প সময়ে বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষনের প্রচেষ্টা ঝড় যা তিতলি ঘূর্ণিঝড়ের থেকে কোনো অংশেই কম তো নয়ই, বরং যেন বেশিই এক আত্মমগ্নতার আর একান্ত নিজ গন্ডির লক্ষণ রেখা।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮