• শঙ্খ কর ভৌমিক

একটি আত্মবিশ্লেষণ মূলক রচনা - লেখক না হয়েও লিখি কেন?

অনেকবার ভেবেছি, লিখি কেন? মানুষ লেখে কেন?


আমার এক বন্ধুর যত বেশি মনখারাপ হয় তত বেশি হাসির লেখা লেখে।যত বেশি হাসির লেখা লেখে তত বেশি লোকজন লাইক করে, হেসে গড়িয়ে পড়ে, আর বলে ‘এরকম আরও লেখো।’ আমার মত দুএকজন বুঝতে পারে, মহিলার মেজাজমর্জি এই মূহুর্তে সুবিধার নয়। মূর্তিমান রসভঙ্গের মত আমি একাই কমেন্ট করে আসি, ‘এইসব অলীক কুনাট্যরঙ্গে সময় নষ্ট না করে ভাল লেখাগুলো লিখলে পারিস।’ আর লোকের গালাগালি খাই।


মানুষ কেন লেখে। মানুষ কেন বাঁচে?


আমি লিখি লাইক পাবার জন্য। আর বেঁচে আছি আমার ওপর যারা নির্ভরশীল তাদের ভাল রাখার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে বই কেন লিখেছি? বইতে তো আর লাইক করা যায় না। তা যায় না বটে, কিন্তু রয়ালটি পাওয়া যায়, বইয়ের ভাল কাটতি হলে খবরের কাগজে নাম ছাপে, লোকে সই করে দিতে বলে, পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চায়, শালা-শালীরা ধন্যধন্য করে। ওই একরকম লাইকের মতই ব্যাপার।


আর বেঁচে থাকা? বেশিরভাগ লোকেরই তারা কেন বেঁচে আছে সেই নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তাদের মধ্যে অনেকের আবার বেঁচে থাকার ইচ্ছেও নেই, তবে মরে যাবার অনেক হ্যাপা বলে মরছে না। আর যারা মনে করছে বেঁচে থাকার হ্যাপা মরে যাবার চেয়ে বেশি, তারা গলায় দড়ি দিয়ে বা রেলে গলা দিয়ে, বিষ খেয়ে, জলে ডুবে, গায়ে আগুন দিয়ে এবং আরও বহু বিচিত্র উপায়ে টপাটপ মরছে।


আমি নিজে একবার মরে যাবার চেষ্টা করেছিলাম। তারপর এমন কিছু ঘটনা ঘটে যে মরাটা মুলতুবি রাখতে হয়। তারপর থেকে, এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত বেঁচে ছিলাম কেন বেঁচে আছি জানব বলে। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়েছি। ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’


এতকিছু লেখার সারমর্ম হল, বেঁচে থেকে বা লিখে নিজের বা অপরের কোনো উপকার করছি না।কিন্তু ত্রিসীমানায় কোন মানুষটাই বা কারো উপকার করার জন্য লিখছে বা বাঁচছে?


গুটিকয় মহাপুরুষ বাদ দিলে প্রায় সবাই বাঁচে নিজের জন্য। আর খানিকটা পরিবার-আত্মীয়পরিজনের জন্য। যিনি যত অসাধারণ মানুষ, তিনি তত বেশিজনের জন্য বাঁচেন- সেই মানুষদের পরিধি যত বড়, তিনি তত অসাধারণ। আর যিনি অসংখ্য অন্য মানুষদের জন্য বাঁচেন এবং নিজেকে নিয়ে আদৌ ভাবিত নন তিনি মহামানব।


লেখা ব্যাপারটা অন্যরকম। মহামানবরা, নিজেদের ভাবনা বা জ্ঞান অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দেবার জন্য লেখেন। আমার মত হেঁজিপেজিরা লাইক পাবার জন্য লেখে। আবার অনেকে আছেন, তাঁরা আদৌ লাইকের জন্য লেখেন না। আমি নিজে অনেককে চিনি যাঁরা সুলেখক হওয়া সত্ত্বেও কখনো কাউকে জানতেই দেন না তাঁরা লেখেন। যেমন জীবনানন্দ দাশের অধিকাংশ কবিতা সম্পর্কে লোকে জানতে পেরেছে তিনি মরে যাবার পর।


কিন্তু এই তিনরকমের মানুষদের সবার ক্ষেত্রে বোধ হয় একটা কথা প্রযোজ্য।


এমন কেউ নেই, যার জীবনে কখনো এমন সময় আসেনি যখন গলার কাছে একটা শক্ত কিছুর অস্তিত্ব টের পাননি। না টিউমার বা ওইরকম কিছু নয়, একটা কিছু যাকে ঠিক দুঃখ, মনখারাপ এই ধরণের সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না। প্রিয়জন ভুল বুঝে চলে গেলে, সারা জীবনের চেষ্টা বৃথা হলে, প্রিয়জনকে ভাল রাখতে না পারলে সেই শক্ত জিনিসটা গলার কাছে, বুকের কাছে ঘোরাফেরা করে।


একটা লেখা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্ত জিনিসটা বাইরে বেরিয়ে এসে বিলীন হয়ে যায়।


একটা লেখা শেষ করার পর একটা অতৃপ্তি থেকে যায়, মনের মত হল না। কিন্তু বুকের ভেতরের সেই শক্ত জিনিসটা বাইরে বেরিয়ে গেলে লেখক মনে করে সে বেঁচে আছে, সে ভাল থাকছে। আর লেখা পরে লোকে ভাল বললে আরেকটা তৃপ্তি হয়, সে ভাল রাখছে।

লেখক আত্মকেন্দ্রিক হয়। বাইরে সে হয়তো নিরহংকার, কিন্তু ভেতরে একটা ভাবনা কাজ করে, সে অধিকাংশের থেকে আলাদা, সে ভাল রাখতে জানে।


আমি লিখি, কিন্তু লেখক নই। একটা বই লিখে কেউ লেখক হয় না। লেখক তিনিই যিনি সারাজীবন লিখতে পারেন। আমার লেখালিখির অভিজ্ঞতা খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। আর লেখার মত কথা খুব সামান্যই আছে। যেটুকু আছে সেটুকুও প্রকাশ করার ভাষা আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছি।


তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, আজকাল আর লিখে গলার কাছের শক্ত জিনিসটাকে বার করতে পারছি না। লিখে না পারছি ভাল থাকতে, না পারছি ভাল রাখতে।


আমি অভাজন মানুষ। বেঁচে আছি ভাল থাকব আর ভাল রাখব বলে। ভাল আমাকে থাকতে হবে, রাখতে হবে- লিখে বা না লিখে।

তবে কি আর লিখব না? লিখব। না লিখে পারব না। বই লেখার একটা সময় বাঁধা থাকে। আগামী বইমেলায় যদি আমার দ্বিতীয় বই প্রকাশ করতে হয়, তাহলে লিখতে হবে খুব তাড়াতাড়ি, সেই মনঃসংযোগটা এই মূহুর্তে আসছে না। কোনো ব্যাপার না। এবারে চেষ্টা করছি, না পারলে পরে কখনো হবে। যদি কখনো দেখি আমার লেখা কারো ভাল লাগছে না তখন ভেবে দ্দেখা যাবে। তখনও লিখব, কাউকে নাহয় দেখাব না।


মানুষ লেখে কেন? না লিখে পারে না বলে।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮