• দেবযানী গাঙ্গুলী

গল্প - আলোর দিশা

আজ বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। দিনটা বিশেষ বলে নয়, তবু ও আজ একবার 'আলোর দিশা' য় যেতে হবে বলে সকালটা অন্যদিনের থেকে একটু বেশীই ব্যস্ত। পাঞ্চালী সন্তানহীনা, এই 'আলোর দিশা'র ছেলেমেয়েরাই ওর সবটুকু বাৎসল্য অধিকার করে আছে। ওরা বড় নিষ্পাপ - পবিত্র, ফুলের মত সুন্দর, আবার ফুলের মতই কোমল, অসহায়। কেউ দলে গেলে মাথা তোলার ক্ষমতা নেই।

আজ অর্জুনও একসাথে যাবে । তাই ব্যস্ততা তুঙ্গে। ভোর পাঁচটায় উঠে সারাদিনের সব ব্যবস্থা করা। যেন পথে কোন কষ্ট না হয়। পাঞ্চালী তো একাধারে স্ত্রী, মা, সেবিকা সবকিছুই। এভাবেই পার হলো বিবাহিত জীবনের ষোলটা বছর। দর্শনে স্নাতকোত্তর পাঞ্চালী নিজের স্বপ্নগুলোকে সংহত করে সমস্ত ফুল ফুটিয়েছে নিজের সংসারে আর সমস্ত সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছে আলোর দিশার আকাশে বাতাসে। তবু কখনো কখনো সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। পূর্ণিমা রাতের মত সুখের ষোলকলায় পূর্ণ দিনগুলি সব।


সালটা ১৯৯৬। পণ্ডিচেরী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাস্ট্রো ফিজিক্সে এমএসসি করে অর্জুন ফিরেছে কলকাতায়। চোখে স্বপ্ন আমেরিকা গিয়ে গবেষণা করার। ছোটবেলা থেকেই বই পাগল, শান্ত স্বভাবের অর্জুন কোনদিনই কলকাতার দুর্গাপুজোর সন্ধ্যার ভীড় ঠেলে ঠাকুর দেখে নি। পাড়ার পুজোয় প্রতিদিন সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে সঞ্চালনার দায়িত্ব থাকত ওর ওপর। পাড়ার পুজোর আন্তরিকতা, উৎসবের পারস্পরিক একাত্মতা, সর্বোপরি সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর দেবীমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দু'টি চোখে আত্মসমর্পণ - অর্জুনের পুজোর দিনগুলোকে উদ্ভাসিত করে তুলত।

সেবার অষ্টমীর সন্ধ্যায় লাল পাড় হলুদ শাড়ীর এমনই এক দেবীমূর্তির দু'টি চোখে আত্মসমর্পণ করে বসল সঞ্চালক অর্জুন । নাম পাঞ্চালী সেন। অর্জুনের ঘোষণার পর পাঞ্চালী মঞ্চে যখন গান ধরল--- 'আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে', সেই সুর, সেই কণ্ঠ যেন বহুমাত্রিকতা নিয়ে স্পর্শ করল, শিহরিত করল পদার্থবিজ্ঞানের মিতভাষী ছাত্রটিকে। সাহিত্য আর সঙ্গীত চিরদিনই তার মনকে চুপকথা দিনে আলোড়িত করেছে। কিন্তু আজ যেন অর্জুনের সর্বাঙ্গ অবশ সেই সুরতরঙ্গে ।

বিস্ময়ের বাকি ছিল আরো। অনুষ্ঠান শেষে বাড়িতে পৌঁছে মায়ের ডাকে ডাইনিং টেবিলে তাকিয়ে আবার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অর্জুন। সেই লাল-হলুদ কাঞ্জিভরম! অর্জুনের বোন বিশাখার পাশে বসে ততক্ষণে অর্ধেক খাওয়া শেষ করে ফেলেছে সে। হলুদ শাড়ী যে তারই বোন বিশাখার সাথে প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী - পড়াশোনার জন্যে দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় এই তথ্যটি তার জানা ছিল না।

সে রাতে বহুক্ষণ ঘুম এল না চোখে। প্রতিদিনের অভ্যাস মত ডায়রির পাতায় দিনলিপি লিখতে বসে অর্জুন লিখল - 'পাঞ্চালী, ঈশ্বর কি তোমাকে আমার জন্যই পৃথিবীতে এনেছেন? না হলে কেন এমন নামকরণ হল দুজনের! আমি যে সারাবছর দুর্গাপুজোর জন্য অপেক্ষা করে থাকি দেবীর ঐ দু'চোখে আত্মসমর্পণ করব বলে। আজ তোমার দু'চোখে ঐ শান্তি, ঐ বরাভয় খুঁজে পেলাম!' রাত তিনটে পর্যন্ত কিছুতেই এক হল না দু'চোখের পাতা। জ্বালা ধরা চোখে মাথার কাছের নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে অর্জুন লিখল -

ভালোবাসা মানে কথাদের ভীড়ে থেমে যাওয়া কিছু কথা ভালোবাসা মানে উতাল আবেগ, প্রচ্ছদে নীরবতা। ভালোবাসা মানে সব সঞ্চয় উজাড় করার দিন তোমার গানের সুরের অসীমে আমার হৃদয় ঋণ। ভালোবাসা মানে অপরিচয়ের বাঁধ ভেঙে ছুটে চলা ভালোবাসা মানে মুখে নয়, শুধু মনে মনে কথা বলা।


বিশাখার কাছে ওর দাদার ছবি দেখে আর গল্প শুনে পাঞ্চালীর মনে পূর্বরাগের পটভূমি যে প্রস্তুত আছে তা অজানা ছিল না বিশাখার। আর দুষ্টুমি করে দু'জনকে দু'জনের সামনে আনার জন্যেই সল্টলেকের মেয়ে পাঞ্চালীকে বালিগঞ্জে নিজেদের পাড়ার অনুষ্ঠানে অষ্টমীর সন্ধ্যায় গান গাইতে অনুরোধ করেছিল সে। সকালে উঠে দাদার মন জানতে দাদার ঘরে গিয়েই বালিশের পাশে রাখা ডায়রির পাতার লেখা ও কবিতা হস্তগত হল বিশাখার। ঘুমন্ত অর্জুনের অজান্তেই সে বার্তা তখনই টেলিফোনে পৌঁছে গেল সল্টলেকে । ডায়রি যথাস্থানে ফিরে এলে ও 'ভালোবাসা মানে' পৌঁছে গেল সল্টলেকে যথাস্থানে নবমীর সকালেই। আর দশমীর প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে অর্জুন পেল তার প্রার্থিত উপহার- প্রদীপের আলো এ মনে জ্বালানো অনুরাগ অনুক্ষণ ছায়াপথ ধরে খুঁজে ফিরি চলো দু'জনার দু'টি মন।

দশমীর সাজে লাল সাদা ঢাকাই জামদানীতে পাঞ্চালী যেন অপরূপা লক্ষ্মীপ্রতিমা। ভালবাসার সাথে এক অপার্থিব শ্রদ্ধায় কানায় কানায় পূর্ণ হৃদয়ে অর্জুন লেখে -

কন্যা রে ! তুই বন্যা রূপের মূর্তিমতী পবিত্রতা - অবুঝ এ মন স্বপ্ন সাজায় বাঁধ ভেঙে যায় আকুলতা। তোর ঘাটেতে ভাসিয়ে দিলাম কল্পনা আর ইচ্ছে সুর বাড়াচ্ছি হাত - নে চিনে নে আমার মনের অচিনপুর।


দর্শনের ছাত্রী পাঞ্চালী ও শৈশব থেকেই সুর, তাল, ছন্দে পারদর্শিনী। ইতিমধ্যে অর্জুনের সাথে মৌখিক আলাপ মুগ্ধ করেছে তাকে। বিজয়ায় বিশাখার বাবা মা কে প্রণাম করতে এসে বিশাখার হাতে পাঞ্চালী পাঠালো তার উত্তর-


অচিন মনে আলাপনের হাত বাড়িয়ে দিও - পরশ চিরাগ আলাদিনের খুনসুটি দিন হিসাবহীনের হৃদয় চিনে নিও। বন্ধু হয়ে চাও গো যদি পবিত্র এক মন গভীর শপথ পাঠিয়ে দিলাম থাকব আজীবন।


বিশাখাদের পরিবারের সকলেরই পাঞ্চালীকে পছন্দ। এমন মিষ্টি স্বভাবের মেয়েকে পুত্রবধূ রূপে বরণ করতে উতলা হলেন কাবেরী দেবী। কিন্তু অর্জুন জানালো এখনই নয়। অ্যাস্ট্রো ফিজিক্সের গবেষণার জন্য আমেরিকার মিচিগানে যেতে চায় সে। সমস্ত বন্দোবস্ত ও প্রায় পাকা।পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে বিয়ের সিদ্ধান্ত। পাঞ্চালী ও ততদিনে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে চলুক। কোজাগরী চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাতে হাত রেখে ওরা শপথ নিল। দুই ভিন্ন মহাদেশে থাকলেও চাঁদের দিকে চোখ রেখে ওরা একে অপরকে খুঁজে নেবে।

পাঞ্চালীর মনে পড়ে, আমেরিকায় যাবার একমাস পর অর্জুন সুপিরিয়র লেকে বেড়াতে যাবার ছবি পাঠিয়েছিল। তার কিছুদিন পর আরো ছবি এল। চারিদিক যখন বরফে মোড়া -তখনকার ছবি, লিবিয়া থেকে পড়তে যাওয়া সতীর্থ গবেষকের ছবি, আরো কত কী। একবার চিঠি দিতে দেরী হওয়ায় পাঞ্চালীর বড্ড অভিমান হয়েছিল। মান ভাঙাতে পূর্ণেন্দু পত্রীকে উদ্ধৃত করে তখন অর্জুন লিখেছিল-


'লক্ষীসোনা, আমি তোমার রৌদ্রছায়ায় সর্বক্ষণই সঙ্গে হাঁটি, সমুদ্রতীর কষ্ট দিলে,বিছাই বালির শীতলপাটি বুকের কাছে নেই, তবু তোমার বুকেই বসতবাটী ভুল বুঝো না!'


না, ভুল বোঝে নি পাঞ্চালী। কারণ অর্জুনের পবিত্র ভালোবাসা কোনোদিন ওর প্রেমকে ভীরু হতে দেয় নি।

পাঁচ বছর পর গবেষণা শেষ করে সায়েন্টিস্ট অর্জুন দেশে ফিরল। পাঞ্চালীর পাণিগ্রহণের পর আবার পশ্চিমে ফিরে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হবার ইচ্ছা তার। ২৫শে জানুয়ারী বিয়ের তারিখ স্থির হয়েছে। অধিকাংশ বাজার আগে হয়ে গেলেও অর্জুনের ইচ্ছা নিজে পছন্দ করে পাঞ্চালীর জন্য হীরের নেকলেস আর আংটি কিনবে। স্বপ্নের সেই দিনটিতে স্বপ্নের রাজকন্যাকে আরো স্বপ্নময় করে তোলার কল্পনায় বিভোর হয়ে নিজে ড্রাইভ করেই অর্জুন পি.সি. চন্দ্রের বৌবাজার শাখায় যাচ্ছিল।

**** ****


তারপর হুইল চেয়ার। যেন প্রকৃত অর্থেই নক্ষত্রপতন। একটা দ্রুতগামী প্রাইভেট বাসের ধাক্কায় নতুন গাড়ীটার একটা দিক পিষ্ট, অপরদিক অক্ষত। রক্তে ভেসে যাওয়া অর্জুনকে নিয়ে পাঞ্চালী .... আর ভাবতে পারছে না। নিয়ে যাওয়া হল চেন্নাই অ্যাপোলো। চেন্নাই অ্যাপোলোর ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনোমতেই বাঁচানো গেল না। হাঁটুর নীচে থেকে দুটো পা-ই বাদ দিতে হল। জীবনের সব স্বপ্ন মেঘে ঢেকে তিরিশ বছরের অসম্পূর্ণ অর্জুন বাকী জীবনটার জন্যে হুইল চেয়ারে বসল --চরম ডিপ্রেশন নিয়ে। প্রতিবন্ধী জীবন। এর মানে যে জানে, সে-ই জানে!! শাখাহীন পাতাঝরা গাছের মতোই - অসহায়, শ্রীহীন। সকলের নিষেধ সত্ত্বে ও পাঞ্চালী পারল না সরে যেতে। আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে অবিরত চেষ্টা করল মরা গাছে ফুল ফোটাতে। কিন্তু সে পাথরে ফুল ফোটানো সহজ কাজ ছিল না। মাঝে পেরিয়ে গেছে আরো চারটি বছর। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে, বাড়ীর সকলের অক্লান্ত সহমর্মিতা ও সহযোগিতায়, পাঞ্চালীর উজাড় করা ভালবাসায় অর্জুন ধীরে ধীরে জীবনে ফেরার চেষ্টা করেছে ।

পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পর অভিভাবকরা আর দেরী করতে চাইলেন না। বিয়ের জন্য কোন দিনক্ষণ নয় - নিকটাত্মীয় ও বন্ধুজনের উপস্থিতিতে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হল। তার আগের দিন ঘুম ছেঁড়া রাতে অর্জুন আপনমনে লিখল -


ভরা নদী নয়, জীবনের কূলে মরা চাঁদ-- অন্ধ দু'চোখে স্বপ্ন দেখাও বন্ধ, নোনা জলে তোর বিরহী অধর জুড়ে চতুর্দশীর চন্দ্রের চক্রান্ত।


প্রতিবন্ধকতাকে প্রাণপণ জয়ের চেষ্টায় বিয়ের পর থেকে হুইল চেয়ারের ব্যবহার কমাতে দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা জয়....হাতে নিতে হয় লাঠি। আর সবচেয়ে বড় লাঠি তার স্ত্রী পাঞ্চালী। এমন একজন জীবনসাথী সাথে থাকলে যাপনের ক্লান্তি, গ্লানি সব মিটে যায়। অর্জুনের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে পাঞ্চালী বলে - ' আমি তোমার সব লক্ষ্য ভেদ করব অর্জুন! চোখ রাখো আমার চোখে।'

ওদের দু'জনের মিলিত ইচ্ছাতেই ওদের দশম বিবাহবার্ষিকীর দিন আসানসোল সংলগ্ন দামোদর নদীর কাছে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটা হোম তথা স্কুল খুলেছে ওরা। নাম রেখেছে 'আলোর দিশা'। মন প্রাণ ঢেলে চেষ্টা করে চলেছে হোমের কচি প্রাণগুলোকে অমল আলো দেখাতে।

দশটা নাগাদ ওদের গাড়ি থামল হোমের সামনে। নামার সময় অর্জুন আজ লাঠিটা আর হাতেই নিল না। অন্যকে আলোর দিশা দেখাতে হলে নিজের মনোবল আর সৎসঙ্কল্পের চেয়ে বড়ো আর কী হতে পারে! 'আলোর দিশা' র স্কুলে তখন প্রার্থনা সঙ্গীত চলছে। পাঞ্চালী গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের সাথে গলা মেলালো -

"আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে, দুঃখবিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে। বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা আত্মহোমের বহ্নিজ্বালা - জীবন যেন দিই আহুতি, মুক্তি আশে।"


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮