• সতীশ বিশ্বাস

ছড়াক্কা-গাথা - ডালিমকুমার (’ঠাকুমা’র ঝুলি’)

এক রাজার এক রানি ছিল,---একজন রাজপুত্র।

একটি জোড়া পাশার উপর

করতো রানির আয়ু নির্ভর।

রাজপুরীর এক তালগাছে

এক রাক্ষসীর বাসা আছে।

সে জানত রানিমায়ের মরণের কী সূত্র।

#

একদিন রাজা মৃগয়া গেলেন,রানিমার কী ফূর্তি!

ভিখারিনী সাজল খাসা

কাতরস্বরে চাইলো পাশা,

যেই দিল তা,রাজার কুমার,

রাক্ষসী কি দেরি করে আর?

রানিকে খেয়ে নিখুঁৎভাবে ধরল রানির মূর্তি।

#

রাজা এলে রানি করেন সেবাও যত্ন তার।

রাজপুত্র দেখেন কেবল--

খাবার দেবার সময় রানির

জিভের থেকে এক ফোঁটা জল

পড়ল। দেখেই রাজার কুমার

উঠে দাঁড়ালেন। এ কথাটি জানল না কেউ আর।

#

কেটে গেল কয়েক বছর। রাজার পুত্র সাত।

বড় হয়ে খুব যতনে;

বলল, ‘যাব দেশভ্রমণে।’

রাজাও হলেন খুশি তাতে।

বলেন, ‘তোদের দাদাও সাথে

যাবে।’ সাত আর এক মিলে হয় রাজার কুমার আট।

#

বড়কে দেখে কৌটা খুলে রানি সাপকে বলে, ‘সূতাশঙ্খ,সূতাশঙ্খ

শাঁখের আওয়াজ।

কুমারের আয়ু কিসে

বল দেখি আজ?’

শাঁখের মতো আওয়াজ সাপের,সূতোর মতো চলে।

#

রানির প্রশ্ন শুনে সে সাপ শঙ্খের মতো কয়,

‘তোর আয়ু কিসে রানি

মোর আয়ু কিসে?

ডালিমকুমারের আয়ু

ডালিমের বীজে’।

রাক্ষসী বলে, ‘এবার ডালিম হবে নিশ্চিত ক্ষয়।’

#

হাত পা ছুঁড়ে,বলেন আরো, ‘আর চিন্তা নাই।

‘যাও ওরে সূতাশংখ

বাতাসে করি ভর,--

যম-যমুনার রাজ্য শেষে

পাশাবতীর ঘর।

এই লিখন দিও নিয়া পলাশবতীর ঠাঁই।

#

সাত ছেলের জন্যে আমার সাত কন্যে চাই।

রিপু অরি যায়,সূতা,

চিবিয়ে খাবে তারে,

সতীনের পুত্র যেন

পাশা আনতে নারে।’

উড়ল সাপ পৌঁছে দিতে এই লিখনটাই।

#

রাক্ষসী তখন মন্ত্র পড়ে,ডালিম নিয়ে হাতে

‘পক্ষীরাজ,পক্ষীরাজ,

উঠে চলে যা

পাশাবতীর রাজ্যে গিয়া

ঘাস জল খা।’

ধংস শুধু খেলা করে রাক্ষসীর মাথাতে।

#

রাজপুরীর হাজার সিঁড়ির ধাপে উঠে বলে,

‘সিড়ি তুমি কার?’

সিঁড়ি বলল নিজের স্বরে,

‘যে যখন যায়,তার।’

‘তবে সিঁড়ি দু’ ফাঁক হও’

রাক্ষসী কয়, ‘ডালিমের বীজ থাক তোমার ফাটলে।’

#

নিশ্চিন্তে রানি গিয়ে ঘুমালো শয্যায়।

ডালিমের বীজ হতেই বন্ধ

ডালিমকুমার হলেন অন্ধ।

যেন সূর্য ডুবল হঠাৎ

নীল আকাশে কী বজ্রপাত!

বড়-কে ফেলেই ছোট ভায়েরা তীরের বেগে ধায়।

#

ক্লান্ত হয়ে সূতাশঙ্খ এক ফলের মধ্যে ঘুমায়।

রাজকন্যা খায় তা কেটে

সূতাশংখ গেল পেটে

লিখনটিও সঙ্গে গেল।

ভায়েরা হঠাৎ দেখতে পেল—

দাদাতো নেই সঙ্গে। তবে দাদা গেল কোথায়?

#

ভাবলো তারা হয়তো দাদা এসেছে এতক্ষনে। চলল আবার ঘোড়ায় উড়ে— থামল পাশাবতীর পুরে। পাশাবতী বলল দেখে, বলো তোমরা প্রথমে, কে? বলল তারা, ‘রাজপুত্র,এলাম দেশভ্রমণে।’

#

জানো কি পণ? আমার সঙ্গে খেলতে হবে পাশা।

‘যে জিতে সে মালা পায়,

হারিলে মোদের পেটে যায়।’

‘লিখন দেখাও’ ‘লিখন নাই’।

তবে খেলো। হারানো চাই।

সাত ভায়েতে হারল ও শেষ হল স্বপ্ন আশা।’

#

অন্ধ রাজারকুমার পিঠে,উড়ল পক্ষীরাজ

হাতের লাগাম ঢিলে হতেই

ডালিম কুমার পড়ল সেই

এক পাহাড়ের চূড়োর পর।

পক্ষীরাজও হল পাথর।

যে নগরে পড়ল কুমার,অদ্ভুত তার সাজ।

#

রাজপুরীতে সন্ধ্যার পর লক্ষ কাড়া ও লক্ষ সানাই/

‘নগরটি ভরে ওঠে কোলাহলে

পথে পথে আলো জ্বলে।

ভোরে সব চুপ। শুরু হাহাকার

আনন্দ করে দুপুরে আবার।

যে কোন কাউকে রাজা করেদেয়,পথথেকেতুলে সান্ত্রীসেপাই।

#

পরদিন রাজকন্যার ঘরে থাকে না সে রাজা আর/

এইভাবে এলো গেলো কত রাজা।

চলছে এমন খেলা রাজা-সাজা।

নিত্যনতুন এক রাজা চাই

কিন্তু ভোরে সে রাজা আর নাই।

রাজকন্যার ঘরের ভিতর পড়ে থাকে শুধু হাড়।

#

জ্ঞান ফিরতেই ডালিমকুমার দেখে—সে সিংহাসনে।/

চার দিকে শুধু

‘রাজা’-‘রাজা’ রব

একটু পরেই

ঘুমে কাদা সব।

ডালিমকুমার একা জেগে শুধু,ভয় নেই তার মনে।

#

নীরব শীতল বাতাসে কে যেন ছড়ায় অলীক গান।/

নগরে শহরে সাড়াটি নাই

কোন দরজায় পাহারা নাই।

কারণ থাকার নেই কোন মানে

কী হবে—সেটাতো সব্বাই জানে।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ও রাজকন্যা হারাল জ্ঞান।

#

বেরোল সুতোর মতো এক সাপ কন্যার নাক থেকে /

ঘরেতে তখন আলোর বন্যা

ডালিম কিছুই দেখতে পান না।

সুতো থেকে সাপ হল অজগর।

রাজপুরী যেন কাঁপে থর থর

হাঁটু গেড়ে বসে ডালিমকুমার তলোয়ার ধরে বেঁকে।

#

তরোয়াল হাতে ডালিম তখন নির্ভীকভাবে হাঁকে /

জানি না কে তুমি যক্ষ,দানব

রক্ষ,দেবতা,মানুষ—সে সব।

যদি হয় আমার নিষ্পাপ দেহ,

তোমাকে বাঁচাতে পারবে না কেহ।

বলেই চালায় অসি ও টুকরো টুকরো করল তাকে।

#

ধ-ধ্বড়্‌-ধ্বড়্‌ শব্দে সিঁড়ির ধাপগুলো পড়ে ধ্বসে/

ডালিমের আয়ু বাড়ে শতগুন

ভয়ে রানী হল আধখানা খুন।

খুশি হল রাজা আর প্রজারাও

সাপ দেখে বলে, ‘সাপকে পোড়াও’।

সাপের পেটেতে দেখাগেল আছে—লিখন দিব্যি বসে।

#

ডালিম বলল, ‘ হে রাজকন্যা, চলি—ভাইদের খোঁজে।/

পক্ষিরাজ পেল একটি পাহাড়ে

ছুঁয়ে জীবন্ত করে দিল তারে।

বলে পক্ষিরাজ,এইবার চল।‘

ভায়েরা আমার বাঁচল না ম’ল—

ভায়ের জন্য কতটা ব্যাকুল,তুমি ছাড়া কে বা বোঝে।’

#

তীর বজ্রের মতো পক্ষীরাজ চলল সামনে ছুটে/

‘যমযমুনার দেশ

অন্ধকার গায়ে ঠেক’,

বাতাসে পাথর উড়ে’

বহু প্রান্তর ঘুরে—

রাজপুত্র ও পক্ষিরাজ কড়ির পাহাড়ে উঠে।

#

কড়ির পাহাড়ে পক্সিরাজের পা যে চলে না আর।/

ছট ফট ফট শব্দ

হয় বুঝি পক্ষি জব্দ।

‘পক্ষি’ বলে রাজার কুমার,

ভেবোনা কিন্তু কথাটি থামার।

সারাটা রাত্রি পায়ের নীচে চূর্ণ হল পাহাড়।

#

যাচ্ছে যত ডালিম ততই চিন্তা বাড়ছে মনে

‘ঝড়ের গতি কোন ছার,

পক্ষিরাজে আসন যার।’

জীবন-মরণ তুচ্ছ করে

উড়ছে জোরে আরো জোরে

‘তারপরেই হাড়ের পাহাড়’ পৌঁছালো দুইজনে।

#

হাড়ের পাহাড়! মড়ার মুন্ড খট খটা খট সুর

নীচেতে বয় কলক্কল

রক্ত-নদীর রক্তজল

রাজপুত্র বলেন, ‘পক্ষি,

ভয় নাই চোখ বুজে চল।’

রাত্রিশেষে দেখল ডালিম—পাশাবতীর পুর।

#

পাশাবতীর পুর ফটকে নিশানে আছে লেখা

‘পাশা খেলিয়া যে হারাইবে

সাত বোনে মালা দিব।’

ডালিমকুমার তাতে হল রাজি;

বলল, ‘পাশা খেলিব’।

পাশা হাতে পাশাবতী ক্রুড় হেসে দিল দেখা।

#

শুরুহল খেলা পণ বাজি রেখে;ডালিমের মনে আশা—/

জিতবে সহজে,কিন্তু খেলায়

রাজকন্যার কাছে হেরে যায়।

পণ দেয় ঘোড়া, আছে রহস্য

ডালিম দেখেছে গোপন দৃশ্য।

একটি ইদুর চুপি চুপি এসে উল্টিয়ে দেয় পাশা।

#

ডালিম মনেতে ভাবে এক মতলব

ঠিক এঁটে নেব সাচ্চা।

রাখব বিড়াল বাচ্চা।

খেলা হবে শুরু যখন আবার

ইদুর ভয়েতে আসবে না আর।

মনে মনে করে নিল ঠাকুরের স্তব।

#

ঘোড়া পেয়ে ওরা খেয়ে ফেলে।আর ডালিম মনেতে ভাবে-/

কৌশল এক আঁটব সাচ্চা

ধরে এনে এক বিড়ালবাচ্চা।

খেলা হবে শুরু যখন আবার

ইঁদুর ভয়েতে আসবে না আর।

যোগ্যতা অনুযায়ী ঠিক পাশাখেলায় সে জিতে যাবে।

#

ডালিমকুমার দান ফেললেন,জানেন জিতবে আজ।/

‘এই হাতে ছিল পাশা,

পুনু এলো হাতে,-

এতদিন ছিলে পাশা—

কার দুধে ভাতে?’

পাশাবতী হারে। ডালিম বলল, ‘দাও সে পক্ষিরাজ’।

#

খেলারনিয়ম অনুযায়ী পরাজিত,পণ দিতে থাকে বাধ্য।/

ফেরাল ঘোড়াকে তাই পাশাবতী

স্বীকার করল বারবার নতি।

একে একে ফিরে পেল সাত ভাই

রাজ-রাজত্ব;আর কিছু নাই

এবার পাশা ও ইঁদুরটি চাই,ঠেকাও থাকেতো সাধ্য।

#

বলেই ছাড়ল ডালিমকুমার বিড়ালের সেই ছানা/

বিড়াল অমনি দৌড়িয়ে যায়,

ইঁদুরটা ধরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়।

ঘরের প্রদীপখানি নিবে গেল

রাজ-রাজত্ব কোথায় হারালো

মরে পড়েআছে সাত পাশাবতী কেঁচোহয়ে সাতখানা।

#

এভাবেই হল রাক্ষসহীণ রাক্ষসপুরী আজ যে।

পাশা বলে,চল যাই ফিরে ঘরে

রাজপুত্রেরা ঘোড়ার উপরে

চাপল,রানীমা উঠে ঘুম থেকে

‘কুমার,কোথায়,আয়’ ওঠে ডেকে।

তখনই রাজার কুমার আটজন পা রাখলেন রাজ্যে।

#

রাজপুত্রেরা নেমেই বলল,’মা আমার কোনখানে?’/

প্রণাম করল রানীমাকে তারা,

দুঃখের দিন হল বুঝি সারা।

ফিরেছে রাজার কুমারেরা আট,

বসেছে পুরীতে আনন্দ-হাট;

রাজাহীন সেই প্রজারা সেখানে কীভাবেএল,কে জানে!

#

রাজাকে দেখেই উল্লাসে তারা জুড়ে দেয় হাঁকডাক।/

এতো আমাদের সেই প্রিয় রাজা

সূতাশঙ্খকে দিয়েছিল সাজা,

কী সৌভাগ্য!রাজা মিলে গেল।

কন্যা রাজ্য তুলে নিয়ে এল।

এমন আজব কারখানা দেখে সব্বাই হতবাক।

#

পরদিন ফেটে চৌচির হল তালগাছ সহ মূল।

রাজপুরী হল রক্ষশূন্য,

সবাই বলল,’কুমার ধন্য’।

পুরীবাসী দেখে সে ডালিমগাছে

থোকা থোকা হাসি-খুশি ধরে আছে।

পুণ্য প্রভাতে,সোনার আলোতে ফুটেছে হাজার ফুল।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮