• মমতা দাস

নাটক নিয়ে আলোচনা

নাটক-- আন্টিল দি ফ্লাড(Until the flood)

নাট্যকার---ডেল অর্ল্যান্ডারস্মিথ(Dael Orlandersmith)

অভিনেতা-অভিনেত্রী-----স্বয়ং নাট্যকার(মোট ৮ টি চরিত্রে)


নাটকের নাম আন্টিল দি ফ্লাড(Until the flood) !

লেখিকা ডেল ওরল্যান্ডারস্মিথ(Dael Orlandersmith),তিনি-ই অভিনেত্রী ! একা সব চরিত্রে অভিনয় করেন !


সত্যঘটনা নিয়ে নাটক----২০১৪ সালে, নিউ ইয়র্ক-এর ফার্গুসন-এ এক সাদা পুলিশ অফিসার আঠারো বছর বয়সী মাইকেল ব্রাউন (Michael Brown) নামের এক ব্ল্যাক আমেরিকান যুবককে গুলি করে মেরে ফেলে, এই ঘটনায় তোলপাড় পড়ে যায় আমেরিকার সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ! জানা যায় নূতন নয়, এসব বরাবরের ঘটনা ! উঠে আসে নানা তথ্য, এক-ই রকম অনেক সত্য ঘটনা !ডেল বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেছেন কারণ এবং পরিস্থিতি ! তারপর সেটাই নাটকে লেখা এবং স্টেজ-এ অভিনয় করা ! তিনি ছেলেটির বাবা এবং অন্যান্য অনেকের সঙ্গে কথা বলে বোঝেন জাতিবিদ্বেষ আমেরিকায় নূতন কিছু নয়,চিরকাল ছিল এবং আছে ! তবে তফাতটা হল, বর্তমানে অন্য পক্ষ-ও জবাব দিতে শুরু করেছে ! ওই শহরের আটজন অধিবাসীর চরিত্রে ডেল ওরল্যান্ডারস্মিথ-এর একার অভিনয় দেখার এবং মনে রাখার মত ! আলাদা চরিত্র, তাদের ভাব-ভঙ্গি,কথা সব, স-ব ! তার কৃতিত্ব অনেকটাই অবশ্য পরিচালকের, তাঁর নাম নীল কেলার(Neel keller), দুজনের মিলিত ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টায় নাটকটি-র এক অতীন্দ্রিয় উত্তরণ ঘটে ! আমরা মুগ্ধ হই,স্তব্ধ হই,মর্মান্তিক সত্য অনুভব করে ব্যথিত হই ! অর্থবান-সর্বহারা, শাসক-শোষিতের, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীনদের এই কাহিনীতো কোনো বিশেষ দেশ-জাত-সময়ে আবদ্ধ নয় ! সারা বিশ্বে, সব দেশে, সব কালেই এরকম ঘটনা ঘটে ! যে ঘটনা ঘটায়,এবং যাদের বিরুদ্ধে ঘটে, তারা সকলেই অসহায়,একধরনের ক্ষমতা লোভী রাজনৈতিকদের হাতের পুতুল ! কাহিনী তো বটেই, তার সঙ্গে এই মহিলার একক অভিনয় যেন সরাসরি দর্শকের সঙ্গে কথা বলে,কখন যে নাটক-অভিজ্ঞতা-জীবন দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের মনে চারিয়ে যায় ! কখন এক সর্বব্যাপী প্রতিবাদের,মর্মান্তিক দুঃখের অনুভূতি মনের ভিতর একাকার হয়ে যায় আমরা বুঝতেও পারি না ! জল বাড়ছে, অসহিষ্ণুতার,অত্যাচারের, প্রতিবাদের.......বন্যার জল যেমন লোকচক্ষুর অগোচরে বাড়ে তেমনি ! বন্যার আগেই বাঁধ দিতে হবে, নইলে.....'Until the flood'......বন্যাধারা আসা শুরু হলে আর হয়ত কিছুই করার থাকবে না ! বেদনার,আবেগের,অনুভবের প্রাবল্য আমাদের বাক্যহারা করে দেয় ! নাটকের শেষে দর্শকদের সামনে এসে অভিবাদন গ্রহণ করেন লেখিকা-অভিনেত্রী, মনে করিয়ে দেন,সময় বয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তনটা এখনই আনা প্রয়োজন, নইলে বন্যা এসেগেলে........


এখানে হলগুলো,তার যন্ত্রপাতি দেখে বিস্মিত আমি বুঝি স্টেজ-ব্যবস্থায় আমরা অনেক পিছিয়ে, নইলে গল্প-অভিনেতা-অভিনেত্রী-কলাকুশলী আর তাদের ক্ষমতার অভাব নেই, অভাব শুধু অর্থের, নাটক মনস্ক মানুষ আর তাদের শুভবুদ্ধির ! গুডম্যান থিয়েটার যে ব্রোশার দেয়, তাতে দেখি কত অর্থ দাতার নামের তালিকা,কর্পোরেট কোম্পানি,বিজনেস ম্যান,সরকার কতরকম অর্থ সাহায্য এরা পায় ! অবাক হই, তুলনা করে ব্যথিত হই ! আমার দেশে, বিষয়,অভিনয় কোনকিছুর-ই তো অভাব নেই, কেবল অর্থের অভাব, কর্পোরেটরাও কি একটু ভেবে দেখবে? নাটক মানুষ-ই দ্যাখে, যদি ঠিকমত উন্নতি এবং প্রচার করা যায়, মানুষ হয়ত আবার TV ছেড়ে নাটকে ফিরবে .......


নাটকটা দেখতে দেখতে একটা কবিতা এসে গেল,হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না, তাই -----------------------------


বন্যার আগে ....... মমতা দাস (ভট্টাচার্য)


জল বাড়ছে

ধীর কিন্তু নিশ্চিত তার গতি

রক্ত স্রোতের মত

আমরা এখন-ও ঘুমঘোরে বোধ হয় জাগার সময় এল এবার ধনী-গরিব, শাসক-শোষিত,পাওয়া-নাপাওয়া অভাবী পেট কারো, না-খাওয়া কখনো স্ফুলিঙ্গ,ছোট ছোট দেওয়াল লিখন ভাবনার সময় এখন,বাঁধ দেওয়া চাই, জল উঁচু,জল নিচু বিভেদটা অসহ,বন্যায় সব জল মিলে-মিশে যাবে ছোট-বড়, ক্ষুদ্র-বৃহৎ এক হবে সব বন্যার আগে জীবনের বৃত সংবেদে নীরব,ঘুমিয়ে থাকা মন একাকার দৃপ্ত প্রতিবাদে------!!!

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮