• সম্পাদনায় পার্থ সেন

নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন


নীড়বাসনার সকল প্রিয় পাঠক -পাঠিকা,


নীড়বাসনা সাহিত্য-পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমরা নীড়বাসনা নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ শুরু করি যার সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় চারশোর কাছাকাছি। সেখানে আমাদের সদস্যরা তাদের লেখা আমাদের সাথে ভাগ করে নেন। উল্লিখিত ফেসবুক গ্রুপটি ছাড়াও আমরা 'নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন' নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সঞ্চালনা করে আসছি, আজ প্রায় বছর দেড়েক হয়ে গেল। নীড়বাসনার এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমরা আমাদের স্বরচিত লেখা, পছন্দের সাহিত্য, কবিতা, সাহিত্য ভাবনা ভাগ করে নেই এবং সে সম্বন্ধিত আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করে তুলি। কিন্তু দুর্ভাগ্য-চক্রে অনেক ক্ষেত্রেই সেইসব লেখা হারিয়ে যায়, রচনাকার গুনগত মানের দোহাই দিয়ে সে লেখাকে পরে বর্জন করেন। আর হারিয়ে যায় সেই লেখার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য সদস্যদের মূল্যবান মতামত গুলো। কিন্তু আমরা মনে করি, বিভিন্ন মুহূর্ত লেখকের মনে দাগ কাটলে সেই অনুভবকে তিনি সাহিত্যে রূপ দান করেন। আর সেটাই লেখকের সাহিত্য-যাপন। আর সেই সৃষ্টি পাঠক পাঠিকার মনে যে ভাবনা, যে অনুভব জাগিয়ে তোলে সেটাই পাঠকের সাহিত্য-যাপন। সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে সেই অদম্য প্রয়াসকে আগে এগিয়ে নিয়ে যেতেই, 'নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন' গ্রুপ থেকে কয়েকটি স্বরচিত লেখা এবং আলোচনা নির্বাচন করে একটি সংকলন আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম এই বিভাগে ।


পাঠক-পাঠিকাদের জানিয়ে রাখি, এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রচয়িতারা তাঁদের রচনা ভাগ করে থাকেন শুধুমাত্র সাহিত্য-আড্ডার আশায়। তাঁদের সেই লেখা এবং লেখা সংক্রান্ত আলোচনা নীড়বাসনার পাতায় প্রকাশ করা, একটা পরীক্ষামূলক প্রয়াস। আর একটা কথা, আমরা কিন্তু সে সব লেখায় কোনরকম ছুরি কাঁচি চালাই নি। কারণ নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন গ্রুপ হল আমাদের সাহিত্য সৃষ্টির আঁতুড় ঘর আর তার প্রাণ হল অকপট এবং অকৃত্রিম সাহিত্য-আড্ডা। সেখানে সংশোধনের কাঁচি চাললে তাঁর মুল সত্ত্বা নষ্ট হত। আমরা বিশ্বাস করি, আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় এত ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যপ্রেমী মানুষের অভাব নেই। আর তাঁদের সাহিত্য-চেতনা আর সাহিত্য-ভাবনাকে উৎসাহ দিতেই আমাদের এই বিভাগ। আশাকরি আপনাদের ভালো লাগবে।

দুইটি সাহিত্য আলোচনা এবারের সংখ্যায় আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।


প্রথমে বলব, সাহিত্য-আড্ডায় পাঠানো দীনেশের একটি কবিতা, নাম “রাজনৈতিক অন্তর্বাস” এবং সেই সংক্রান্ত আলোচনা। দীনেশের কবিতাটি নিচে পড়ুন,


রাজনৈতিক অন্তর্বাস তোমার বৃষ্টিপাত সঠিক আকার নেওয়ার আগে আমি আমার সমুদ্রগুলোকে ফেরত-যোগ্য করে তুলতে চাই


ফুল ফোটা মাত্র গন্ধরা রাগ করে উড়ে যাচ্ছে অথচ চাঁদ সদাগর সাতটা ডিঙি খুইয়েও বিরোধী বেঞ্চে

ধ্বনিভোট জারি রেখেছে


তোমাদের ধাতব মিছিল আমার আগ্নেয়াস্ত্র তোমার ব্যক্তিগত অন্তর্বাস সব গলিয়ে ফেলতে চাই ভালোবাসার সঠিক উষ্ণতায়


এসো তোমার আলিঙ্গনে আলিঙ্গনে

আমার ঝলসানো আত্মাদের কবরে শুইয়ে দিই

যতক্ষণ না বৃষ্টিপাত

তার প্রয়োজনীয় সংখ্যা গরিষ্ঠতায় ভেসে ওঠে।


সেই কবিতার পড়ে সদস্যদের মধ্যে নানান আলোচনা শুরু হয়। কয়েকটি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।


শুভাশিস লিখলেন - “অনেক অনেক ছবি। অনেক অনেক অনুভূতি। অন্তর্বাস মানে ভেতরে বাস করা। কার ভেতরে ? আমার তোমার সবার । মানব সভ্যতার ইতিহাস আসলে মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাস। চাঁদ সদাগর আর মনসার রাজনৈতিক লড়াই। কত ছবি। ফুল ফোটা মাত্র গন্ধরা রাগ করে উড়ে যাচ্ছে। কত ছবি। ফুলের সারাংশ হল গন্ধ। মরে যাচ্ছে শৈশব। এরকম অনেক ছবি প্রতিটি লাইনে। প্রতিটি শব্দে”


দীপ লিখলেন - “শেষটা অদ্ভুত ভালো! দারুণ ভাবে শৈশব হারানোর গল্প পেলাম। সেই প্রেক্ষিতে রাজনীতির প্রসঙ্গটা খুব বিষয়ীভাবে আনা। বাঁচানোর তাড়না পেলাম। মোট কথায় দারুণ”


রুপম লিখলেন - “আমার ভাবনাকে বামপন্থী মনে হতেই পারে! এই কবিতার মাঝে আমি উত্তরআধুনিকতা আন্দোলন আর এই প্রক্রিয়াকে আঘাত করার ছোঁয়া পেলাম ! সেই প্রাচীনকাল সময় থেকেই একশ্রেণীর মানুষ সমাজের সৌন্দর্যকে কলঙ্কিত করেছে, কেড়ে নিয়েছে অনুভূতি, বিশ্বাস, সরলতা ! এই প্রক্রিয়ার সাথে আপোষহীন একটা পন্থা খুঁজছে দীনেশ ! সুমনের গানে আমরা আধুনিকতার যন্ত্রণা ফুটে উঠতে দেখি, তবে সেখানে মানুষের জাগরণের কথা যতো নম্রভাবে বলা হয়েছে তাতে পরিবর্তনটা ঠিক চাইছে তা পরিষ্কার নয় ! অসাধারণ একটা ছবি তুলে ধরেছে দীনেশ ! ভাষার তারতম্যে আর প্রয়োগে বর্তমানের পরিস্থিতির চাপে হারিয়ে যাওয়া মন, অনুভূতি আর শৈশবকে খুঁজেছে দীনেশ ! যেটা দীপ উল্লেখ করেছে আগেই ! তবে অন্তর্বাসের ব্যবহারটা এই কবিতায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ নিঃসন্দেহে, তবু ব্যক্তিগত ভাবে এটা আমার কাছে একটু অন্যধারার শব্দ !”


এবারে দীনেশ উত্তর পাঠালেন - “ঠিক একদম ঠিক। "অন্তর্বাস" কথার ব্যবহার প্রসঙ্গে বলি, যে বিষয়ে একমাত্র ব্যক্তিগত প্রবেশ বাঞ্ছনীয়, সেখানে আজ রাষ্ট্র তার হাত রাখছে। ব্যস, এটুকুই। রাষ্ট্র কেন ব্যক্তিগত পরিসরে আমাদের বাঁচতে দেবে না, কেন আত্মা সুস্থ থাকবে না, কেন আমরা মৃতদেহের মত বেঁচে থাকব?”


এবারে দ্বিতীয় বিষয়ের আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।


সেখানে শুভাশিস লিখেছিলেন -

“কবিতা বিষয়ে কিছু ভাবনা - সব শিল্পেরই এক প্রকাশ মাধ্যম থাকে, যেমন সঙ্গীতের মাধ্যম হল শ্রুতি। গায়কের কণ্ঠস্বর ও বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে আমাদের কানে প্রবেশ করলে আমরা সঙ্গীত ও বাদ্য উপভোগ করি। তেমনি সাহিত্যের মাধ্যম হল লিখিত শব্দ। ভাষা, বিষয় এবং উপস্থাপনা-য় বিবর্তন এলেও, (যদিও ডিজিটাল-বুক এবং অডিও-ভিজুয়াল-এর প্রভাবে সাহিত্যে মিশ্র-মাধ্যমের ব্যাবহার শুরু হয়েছে, তবুও) এখনও পর্যন্ত সাহিত্যের মাধ্যম মূলত হল লিখিত শব্দ। যেমন আমাদের কানে প্রবেশ করা সব আওয়াজ-ই সঙ্গীত হয়ে ওঠে না। তেমনই সব লিখিত শব্দ-ই সাহিত্য হয়ে ওঠে না।

সঙ্গীতের যেমন রকম ভেদ আছে, হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল আর রক-সঙ্গীত এক নয় এবং তাদের আলাদা করে চেনার উপায় আছে। হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতে-ও আবার অনেক রকম ঘরানা, তাদের সবার আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। আমার মতো অনভিজ্ঞের কানে সেই বৈশিষ্ট্য তেমন চট করে ধরা না পড়লেও, অভিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞ ও সংগীতের ছাত্রদের, বহুদিনের অভ্যাসে তৈরি কানে, তা চট করে ধরা পড়ে।

সাহিত্যের বাগানেও তেমনি রকমারি ফুল - গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, পদ্য, ছড়া। সব-ই সেই লিখিত শব্দ দিয়েই তৈরি । তাহলে তাদের আলাদা করে চিনব কি করে ? ধরা যাক একটা কবিতা খুঁজতে গেলাম, সাহিত্যের বাগানে, অত ফুলের মাঝে তাকে চিনব কি করে ? আপাত দৃষ্টিতে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন লেখার বাইরের গঠনে কিছু পার্থক্য ধরা পড়ল – যেমন কিছু লেখা হয়, পয়ার, মাত্রা, ছন্দ মিলিয়ে আর কিছু লেখা হয় ছন্দ না মিলিয়ে। কিন্তু বাইরের এই পার্থক্য-ই কি সব ? শুধু ছন্দ মিল থাকলেই কি কবিতা হয়? আর ছন্দ মিল না থাকলে তা কবিতা হয় না ?"


এবারে সদস্যদের আলোচনা পড়া যাক।

রুপম লিখলেন – “সত্যিই পাঠকই বিচার করে অবশেষে ! কোনটা ভালো, আর কোনটা চলেনা ! আমারা আমাদের মত ভাবতে থাকি ভাবনাকে ভাবার সুযোগ না দিয়েই ! ছন্দ মিললেই যেমন কবিতা হয়না, তেমনিই কিছু দুর্বোধ্য বা সাধারণের বোঝার বাইরের ভাষা লিখলেও কবিতা হয়না!... একটা দুর্বোধ্য কবিতায় সাঁতার কেটে বলতে থাকি "বাহ্ বাহ্" ! 80% কিছুই বুঝিনা ! ক জনের মাঝে থাকে এই গভীরতা ? আর ছন্দ মেলানো কবিতা দেখলেই আজকালকার কবিরা বলে "ছড়া"!...”

এবারে দীনেশ লিখলেন - “পৃথিবীর সবাই, মানে গাছপালা, পশুপাখি,নদী পাহাড় মানুষ সব্বাই একদিন একভাবে ভাব প্রকাশ করত। মানুষ-মানুষের ভাবের আদান প্রদান সরে এলো মুখের ভাষা তে। তা ও ভেঙে গেল গোষ্ঠী তে। বিভিন্ন রকমের গোষ্ঠীর ভাষা বিভিন্ন। ... কবিতা এখানে। অন্য দেশের ভাষা বুঝতে না পারলেও সে দেশের ওই কবিতা ঠিক সেন্স করতে পারি/পারে।কবিতা এইখানে। এক মন থেকে আর এক মনে যাওয়ার রাস্তা মাত্র, সেই একজনের মত ভাবনায় সামিল হওয়া মাত্র। সবার মনে নাও যাওয়া হতে পারে। অক্ষর বর্ণ যথেষ্ট নয়, তা ব্যক্ত করতে কবিতায় আসতে হয়। কবিতা বোঝার জায়গা নয়। যখন ভাত খাই, তখন ভাত খাই, ভাত বুঝতে বসে পড়ি না। ভাতের খিদেটা পেতে হবে। রুটির জন্য আবার রুটির খিদে, pizzaর জন্য অন্য খিদে। রুটির বোঝা নিয়ে ভাতে খিদে মেটালেও হবে না, মন ভাত-ভাত করবে। কবিতা হয়ত এই রকম। কবিতা একটা এই ব্রহ্মাণ্ডের মাধ্যম মাত্র। কিছু মানুষ তার ইস্তেমাল করে। আমরা তার দিকে দূর থেকে চেয়ে আছি মাত্র, সেটাই অনেক মনে হয়। কবিতার জন্য আকুলি বিকুলি করতে হবে। ভগবান নেই ভগবান নেই বলে একজন রামকৃষ্ণের কাছে এসে খুব ঘ্যান ঘ্যান করছে। ঠাকুর তাকে সটান জলের কাছে নিয়ে গিয়ে মাথাটা জলের নিচে ডুবিয়ে রেখেছে আর সে ছটফট করছে। ঠাকুর ছেড়ে দিয়ে বলল, জল থেকে বেরনোর জন্য যেমন ছটফটানি, তেমন ভগবানের জন্যে ছটফটানি দরকার। আমার ও মনে হয় কবিতার জন্য এই ছটফটানি দরকার”



অরুণাভ লিখলেন - “A good poem is a thing of beauty .you cannot bottle it.. Or package it.. সেই জন্যই জোর করে ছন্দ মেলানো কোন হার্ড ফরম্যাটের কবিতা আমার মন কাড়ে না ..তেমনি জোর করে লেখা দুর্বোধ্য কবিতাও অভিপ্রেত না….. ভালো কবিতা জাস্ট মন ছুঁয়ে যায়। যদি অল্প সংখ্যক পাঠকের ও কবিতা ভালো লেগে থাকে সে কবিতা সার্থক”


এবারে দীপ লিখলেন - “আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যে কোন লেখা শুরু হয় নিজের প্রয়োজনে শেষ করতে করতে মনে হয় আমি কিছু দিয়ে যেতে পারলাম কি না। এই নিজের প্রয়োজনে প্রাপ্ত কিছু উপলব্ধি পাঠকের সাথে ভাগ করে নেওয়া গেলে একটা সেতু তৈরি হয়। এই সেতু তে দুই মূল ভাগ পদ্য এবং গদ্য। গদ্যের দুই ভাগ গল্প আর ছোটগল্প ( কেবল জনপ্রিয় অংশে মন দিচ্ছি)। গল্পের ছাদ থাকে দেওয়াল থাকে ঘর থাকে রাস্তা ঘাট গাড়ি ঘোরা সব থাকে। পাঠক সেই সব ছুঁয়ে দেখেন যতক্ষণ না সে গল্প শেষ হয় তার মধ্যে বাস করেন। এখানে পাঠকের শুধু মিশে যাওয়া ছাড়া বিশেষ কোনও দায়িত্ব থাকে না। এক কথায় আরামের.. এরপর ছোট গল্প ঘর আছে দরজা নেই পথ আছে ঠিকানা আছে গন্তব্য নেই মনে হয় ঐ ওখানেই পৌঁছবো নাও পৌঁছতে পারি। এই গন্তব্য বেছে নেওয়ার দায়িত্বের সাথে বাড়ে স্বাধীনতা, স্বাধীনতার সাথে বাড়ে দায়িত্ব। আর একটু এগোলেই কবিতা .. রাস্তা আছে দেওয়াল আছে ঘর গড়া পাঠকের কাজ শহর গড়া পাঠকের কাজ। আসলে কবিরা চিরকাল অলস আর স্বাধীনচেতা। নিজেরা স্বাধীনতা চায় .. চায় পাঠকের স্বাধীনতাও। আসলে দু'জনে মিলে গড়লে তবেই পৃথিবী দু'জনের..

তাহলে কবিতা বোঝা কি শক্ত? না কবিতায় কবির কথা বোঝা শক্ত! কবি যা লিখেছেন সেটা একেবারে বাদ দিয়ে ভাবতে বসলে কবিতা সবাই নিজের মত মানে করেই নেবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কবিতা সম্পূর্ণ হবে না”


অনন্যা লিখলেন - “ আমার মতে দুর্বোধ্য কবিতা কখনো সেই পাঠকের মনকে ছুঁয়ে যায় না। যদি শুধু পড়েই সৌন্দর্য উপভোগ করা যেত, তা হলে আমরা বাংলা বা ইংরেজি তে সীমাবদ্ধ কেন? চাইনিজ, ল্যাটিন, জার্মান কবিতা পড়ছি না কেন? Why we are looking for interpretations and interpreters? কবিতা বা যে কোন সাহিত্য মনের ভাবের প্রকাশ। সেই ভাব যদি পাঠকদের ছুঁয়েই না গেল, হাজার বার পড়ে ও তার আনন্দ কি সম্পূর্ণ পাওয়া সম্ভব? এ তো ছবি আঁকা বা গান নয়, যে শুধু দেখেই/শুনেই মন প্রাণ ভরে যাবে সকলের। ভাষা বা সমসাময়িক সময় কবিতায় অনেক সময়ই তাই এক বিশেষ ভূমিকা নেয়, যা না জেনে আমরা শুধু কবিতা পড়তে পারি, অনুভব করতে পারি না। আর সেখানেই কবির সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে”


প্রবন্ধ কাব্য : স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট তে কবিগুরু কি বলেছেন সেটা একটু শোনা যাক। “বুদ্ধিগম্য বিষয় বুঝিতে না পারিলে লোকে লজ্জিত হয়। হয় বুঝিয়াছি বলিয়া ভান করে, না-হয় বুঝিবার জন্য প্রাণপণ প্রয়াস পায় কিন্তু ভাব-গম্য সাহিত্য বুঝিতে না পারিলে অধিকাংশ লোক সাহিত্যকেই দোষী করে। কবিতা বুঝিতে না পারিলে কবির প্রতি লোকের অশ্রদ্ধা জন্মে, তাহাতে আত্মাভিমান কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। ইহা অধিকাংশ লোকে মনে করে না যে, যেমন গভীর তত্ত্ব আছে তেমনি গভীর ভাবও আছে। সকলে সকল তত্ত্ব বুঝিতে পারে না। সকলে সকল ভাবও বুঝিতে পারে না। ইহাতে প্রমাণ হয়, লোকের যেমন বুদ্ধির তারতম্য আছে তেমনি ভাবুকতারও তারতম্য আছে। মুশকিল এই যে, তত্ত্ব অনেক করিয়া বুঝাইলে কোনও ক্ষতি হয় না, কিন্তু সাহিত্যে যতটুকু নিতান্ত আবশ্যক তাহার বেশি বলিবার জো নাই। তত্ত্ব আপনাকে বুঝাইবার চেষ্টা করে, নহিলে সে বিফল; সাহিত্যকে বুঝিয়া লইতে হইবে, নিজের টীকা নিজে করিতে গেলে সে ব্যর্থ। তুমি যদি বুঝিতে না পার তো তুমি চলিয়া যাও, তোমার পরবর্তী পথিক আসিয়া হয়তো বুঝিতে পারিবে; দৈবাৎ যদি সমজদারের চক্ষে না পড়িল, তবে অজ্ঞাতসারে ফুলের মতো ফুটিয়া হয়তো ঝরিয়া যাইবে; কিন্তু তাই বলিয়া বড়ো অক্ষরের বিজ্ঞাপনের দ্বারা লোককে আহ্বান করিবে না এবং গায়ে পড়িয়া ভাষ্যদ্বারা আপনার ব্যাখ্যা করিবে না।“


আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে পরবর্তী মতামতে, যেখানে শুভাশিস অন্য একটি প্রসঙ্গে লিখলেন - “ পাঠকের বয়স সাহিত্যের মান নির্ণয় করে না। ঠাকুমার ঝুলি বা সুকুমার বা আ্যালিস কালজয়ী হয় কারণ সন্তানের সাথে সাথে তাদের বাবা বা মায়েরাও ডুবে যায় রূপকথার জগতে। পাঠক তো সবাই। যে ক্লাস ওয়ানে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ পড়ে সেও পাঠক । সব বয়সে পাঠকই বিচার করে সেই বয়সে কোনটা তার ভালো লাগে। আমার মেয়েকে নিজের পছন্দমত বই বাছতে বললে ও গোলাপি রঙের পরীর বইটাই নেয়। বয়স বাড়লে কিছু পাঠক বড় হয়, কিছু পাঠকের বয়স বাড়লেও মনটা আটকে থাকে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ তে”


সত্যিই তো, আমি কিন্তু একমত পাঠকের বয়স সাহিত্যের মান নির্ণয় করে না। ঠাকুমার ঝুলি বা সুকুমার বা আ্যালিস কালজয়ী হয় কারণ সন্তানের সাথে সাথে তাদের বাবা বা মায়েরাও ডুবে যায় রূপকথার জগতে। আপনি কি ভাবছেন? আর সবার মত এক হতে হবে তার কোনও মানে নেই। শিশুসাহিত্যিকও নোবেল পায়। ডিজনির ছবিও অস্কার পায়।


নীড়বাসনার সাহিত্য-যাপন যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে আমাদের জানান। আমরা আরও বিস্তৃত ভাবে আলোচনা গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব। আর 'নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন' এর উদ্দেশ্য এবং সাহিত্য আলোচনা যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তাহলে আপনারাও অংশ গ্রহণ করতে পারেন এবং আপনাদের সাহিত্য-চেতনা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে আমাদের সমৃদ্ধ করে তুলতে পারেন। আমাদের ই-মেল করে (আমাদের ই-মেল neer-basona@googlegroups.com) আপনার ফোন নম্বর জানান, আপনিও ‘নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন' এর দলভুক্ত হয়ে পড়বেন।


ধন্যবাদ, টিম নীড়বাসনা।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮