• পার্থ সেন

বড় গল্প - বিভীষণ বধ


[১]

মাস খানেক আগের কথা, আগস্টের শেষ দিক। আমার কিন্তু ছবির মতো সব মনে আছে, এই যেন কালকের কথা। “আজকের মতো দিন শেষ” – এই ভেবে উঠে পড়েছিলাম। সকাল থেকে আজ টানা বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে, এই আধ ঘন্টা হল বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, তাই ভেবেছিলাম এবারে বেরিয়ে পড়ব। আমার আবার বাইক, এই ফাঁকে বেরিয়ে পড়তে পারলে ভালো, আবার বৃষ্টি আসার আগে বাড়ি পৌঁছে যাব। নয়তো বৃষ্টির সময় আমাকে রীতিমত আলাদা সাজ পোশাক করতে হয়। যা হোক, সিগারেটটা শেষ করে শেষ অংশটা নিভিয়েছি, ঠিক এই সময়ে নিধান এসে ডাকল, “স্যার, ফোনে একজন রয়েছেন, থানার বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন”

“কি ব্যাপার?”

“সেতো জানি না, আমাকে কিছু বললেন না, খালি বললেন, একটু সমস্যায় পড়ে ফোন করছি, থানার বড়বাবু আছেন কি?”

ফোন টা ধরতেই হল, মানুষ বিপদে পড়েই পুলিশের কাছে আসে, এই সময়ে যদি তাঁদের পাশে না দাঁড়াই সেটা তো ঠিক নয়, “হ্যাঁ বলুন, আমি বেহালা থানার ওসি কথা বলছি”

এক ত্রস্ত, শঙ্কিত গলা শুনলাম, “স্যার, আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি, একটু সাহায্য চাই”

“কি রকম বিপদ?”

“অলক্ষ্যে আমাকে কেমন করে যেন হুমকি দেওয়া হচ্ছে! আমাকে প্রাণভয় দেখানো হচ্ছে স্যার! আমি গত চার পাঁচ দিন খুব ভয়ের মধ্যে রয়েছি”

“কে ভয় দেখাচ্ছে আপনাকে? আপনি চেনেনে তাঁকে?”

“না সেটাই তো বুঝতে পারছি না, তাই তো আরো ভয় লাগছে”

“কোথা থেকে কথা বলছেন আপনি?”

“আমি থাকি মাঝেরহাটের কাছে, কিন্তু এখন একটু বাড়ির বাইরে আছি, এই বেহালা ছাড়িয়ে একটু আগে, এখানে একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। আমাকে কেমন ভয় দেখানো হচ্ছে সবসময়ে! এখানেও সেই এক জিনিস! আচ্ছা স্যার, আপনার যদি আপত্তি না থাকে আমি কি একটু থানায় আসতে পারি?”

“থানায় আপনি যে কোন সময়ে আসতে পারেন, এতে আপত্তি কি আছে? তবে আমার একটু বেরোনোর প্ল্যান ছিল, আপনার আসতে কতক্ষন লাগবে?”

“ম্যাক্সিমাম মিনিট পনের”

“ঠিক আছে আপনি চলে আসুন, আমি ওয়েট করছি আপনার জন্য”

ফোনটা ছেড়ে দেওয়ার পর খেয়াল হল, নামটা তো জিজ্ঞাসা করা হয়নি। সাধারনত এই ভুল আমার হয়না, আসলে এতো আকস্মিক ভাবে কয়েক সেকেন্ডের এতো দ্রুত কথোপকথন হল তাতে কেমন যেন মিস হয়ে গেল। নিধান প্রথম ফোন ধরেছিল, তবে সে অবাঙ্গালী। সদ্য মজঃফরপুর থেকে কলকাতায় এসেছে চাকরীর জন্য, শক্ত কোন বাংলা নাম না মনে রাখাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে নিধানের উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা আমাকে করতেই হল, নিধান নামটা খাতায় লিখে রেখেছে, ‘এ ভট্টাচার্য’।

নিধানের নামাঙ্কিত ‘এ ভট্টাচার্য’ এর এসে পৌঁছতে প্রায় আধা ঘন্টা লাগল, ভদ্রলোকের নাম ‘অসিমাভ ভট্টাচার্য’, চেহারায় বিশেষত্ব বলতে একটু খুঁড়িয়ে হাটেন। মাঝারি হাইট, চাপা গায়ের রং, বয়স পঞ্চাশের আশে পাশে, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, তবে হ্যাঁ যেটার নজরে পড়ার সেটা তাঁর পরনের জামা কাপড়। নীল সাদা চেক শার্ট, তার সাথে ম্যাচিং করে কালো প্যান্ট। তবে জামা কাপড় যেটা পড়েছেন সেটা একটু ঢিলেঢালা। কেমন যেন গায়ে একটু বড় বড় লাগছে, সে যাই হোক, চেহারায় বেশ আভিজাত্যের ছাপ আছে।


রাত হয়ে গেছিল, আমি আর থানার সেকেন্ড অফিসার মানে চিন্ময়বাবু দুজনে ছিলাম, তবে চিন্ময়বাবু নিজের কাজের ব্যস্ত ছিলেন। প্রসঙ্গে আসতে আমার সময় লাগেনি। অসিমাভ ভট্টাচার্য পেশায় একটি ইন্সিওরেন্স কোম্পানীতে কোন উচ্চ পদে চাকুরিরত, মাঝেরহাটে ওঁর পৈতৃক বাড়িতেই থাকেন, দীর্ঘ প্রায় পনের বছর উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ের নানা জায়গায় কাজ করেছেন, গত মাসে কলকাতায় এক নতুন কোম্পানীতে জয়েন করেছেন। ভদ্রলোক অবিবাহিত, ছয় মাস হল ওনার মা গত হয়েছেন, তারপর থেকে কলকাতায় একাই থাকেন। নিকট আত্মীয় বলতে এক দিদি, তিনি নাগপুরে থাকেন।

এই নিপাট ভদ্র মানুষটির জীবনে হঠাৎ করে এক উদ্বেগ এসে আবির্ভূত হয় ঠিক পাঁচ দিন আগে, মানে গত শনিবার। নিজে একা মানুষ, তাই সাধারনত শনি আর রবিবারটা তিনি বাইরে গিয়ে ডিনার সেরে আসেন। পাড়ায় গোল্ডেন কিচেন বলে একটি রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে আগেও তিনি বহুবার গেছেন এবং সেই রেস্টুরেন্টের প্রায় সবাই তাকে খুব ভালো ভাবেই চেনে, তো সেদিন সেখান থেকে খাবার পিক আপ করে নিয়ে আসেন। খাওয়া শেষ করে বেরোনোর সময় তাদের প্রচলিত রীতি হল চাইনিজ কুকিস দেওয়া, তো সেদিন ও খাবারের পার্সেলে চাইনিজ কুকিও ছিল। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা দরকার, চাইনিজ কুকিসের মধ্যে একটি পাতলা কাগজ রাখা থাকে আর তাতে মানুষের ভাগ্য সম্পর্কিত কিছু লেখা ও থাকে। সেটা অসিমাভবাবুর পড়তে খুব ভালো লাগে, তিনি সেটা থেকে কাগজটা বার করে পড়েন, এবং যেটা লেখা ছিল সেটা আমি দেখলাম। খবরের কাগজ থেকে কেটে নানান প্রিন্টেড হরফ কাগজে সাঁটানো হয়েছে, আর যে লেখাটা ফুটে উঠছে সেটা ভালো ভাবেই পড়া যাচ্ছে, “তোমার জীবনে আর আট দিন বাকী, এই কটা দিন ভালো করে আনন্দ করে নাও”। বিস্ময়ে হতবাক অসিমাভ বাবু পরদিন সকালে গোল্ডেন কিচেনে পৌঁছে সেই কাগজ এবং সেই কুকি দেখান। আশ্চর্যের ব্যাপার, হোটেলে ম্যানেজার বলেন যে কুকি তাঁরা দেন এটা নাকি সেই কুকি নয়। প্যাকেটটাও আলাদা, এমনকি ব্র্যান্ডটাও আলাদা। সুতরাং প্রশ্নটা এসে যায় এবারে, অন্য ব্র্যান্ডের সেই চাইনিজ কুকি খাবারের পার্সেলে ঢোকাল কে?

খানিকটা শঙ্কা, ভয়ের মধ্যে পরের দিনটা শুরু হল, সেটা ছিল রবিবার। অসিমাভ বাবুর অফিসে কাজের খুব চাপ, তাই রবিবার টা তাঁর কাছে একটা অবসর। কিন্তু গতকাল রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা টা কেমন যেন কাঁটার মতো বিঁধে ছিল তাঁর মনে। সেই কারনে সারাদিন বাড়িতেই ছিলেন। বিকেলে একটু কাছাকাছি দোকানে গেছিলেন। ছোটখাটো কয়েকটা জিনিস কেনা কাটা ছিল। সেসব করে বাড়িতে ফিরেছেন, এবারে বিস্ময়ের পালা, পরনের সাদা পাঞ্জাবী যেটা পড়ে তিনি বেরিয়েছিলেন, তাঁর পিঠের দিকে সেই পাঞ্জাবীর ওপর লাল কালিতে কে যেন লিখে দিয়ে গেছে “আর সাত দিন, আনন্দ করো”। আগের বারের মতো এবারেও বক্তব্যটা ইংরাজিতে বলা হয়েছে, তবে এবারে হাতে লেখা, লাল স্কেচ পেনে।


পরপর দুই দিনের প্রাণভয় জনিত এই রকম দুটো হুমকি পাওয়ার পর তিনি পাড়ার এক সিনিয়র দাদার সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর উপদেশ মতো অসিমাভ বাবু আরো এক বা দুদিন অপেক্ষা করতে রাজী হন, এবং ঠিক করেন তারপর, পুলিশে কমপ্লেন করবেন। একটা আশঙ্কা ছিল, যদি কোন বন্ধু স্থানীয় কেউ রসিকতা করে এই রকম জিনিস করে থাকে। সোমবার সারাদিন অফিসে সব ঠিকঠাক ছিল, মেট্রোতে করে রবীন্দ্র সরোবরে আসেন তারপর সেখান অটো করে বাড়ি। অটো থেকে নেমে মিনিট তিনেকের হাঁটা পথ, সে রাস্তা খুব আলোকিত এবং অনেক দোকান পাট সে রাস্তায়। সহসা তাঁর গায়ে যেন কিসের আঘাত লাগে, ভালো করে তাকিয়ে দেখেন একটা ছোট মাটির ঢ্যালা কাগজে মুড়ে কে যেন তাঁর গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে গেছে, মিনিট খানেক পরে সম্বিত ফিরে পেলে কাগজ টা খুলে দেখেন – তাতে লেখা ‘আর ছয় দিন, আনন্দ করছো তো?” এবারেও সেই ইংরাজি খবরের কাগজের প্রিন্টেড হরফ সাঁটানো লেখা।


পরপর তিন দিন একই ধরনের ঘটনাতে যে কোন মানুষের ভয় পাওয়া টা স্বাভাবিক, আর সেটাই হয় অসিমাভ বাবুর সঙ্গে। গতকাল রাতে ঠিক করেন তিনি এবারে পুলিশের সাহায্য নেবেন। জীবনবীমার কাজের সূত্রে তিনি আজ গেছিলেন ঠাকুরপুকুরে ওঁদের কোন ব্র্যাঞ্চ অফিসে। অফিসের কাজ শেষ করে তিনি যখন বেরিয়েছেন তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রাস্তার মোড়ে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে চা শেষ করে সিগারেট ধরাবেন। পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বের করেছেন, এবারে বিস্ময়ের পালা শুরু। সিগারেটের প্যাকেটে সিগারেটের সঙ্গে সরু রোল করে আর একখানা কাগজের টুকরো রাখা, সেটাকে অসিমাভ বাবু জামার পকেট থেকে বের করে আমার সামনে রাখলেন, নিঃসন্দেহে এটাও হুমকি তবে একটু অন্য ভাবে লেখা, ইংরাজি হরফে লেখা তবে ভাষাটা এবারে হিন্দী “ওহ পাঁচ দিন, আনন্দের শেষ পাঁচ দিন”। বেশ খানিকটা এক নাগাড়ে কথা বলে অসিমাভ বাবু একটা বিরতি নিলেন। প্রথম প্রশ্নটা এবারে করতে হল – “আপনি কি সিগারেটের প্যাকেট কাউকে দিয়েছিলেন?”

“না আজ সকালেই কিনেছি নতুন প্যাকেট, তারপর অফিসে আমার ড্রয়ারের মধ্যে রেখেছিলাম। সাধারনত সেটা ওখানেই রাখি, আমার দরকার মতো সেটা থেকে বার করি”

“তাহলে এটা বোঝা যাচ্ছে আপনার অফিসেরও কেউ এই ব্যাপারটার মধ্যে আছে। আপনি কি কাউওকে সন্দেহ করেন”

অসিমাভবাবু মাথা নাড়লেন, যার অর্থ ‘না’ বোঝায়, আবার বললাম, “অন্য হুমকি দেওয়া কাগজ গুলো এনেছেন?”

অসিমাভবাবু সব কটাই বার করে আমাদের হাতে দিলেন, পাঞ্জাবীটা আনেননি, সেটা অবশ্য আমি আশাও করিনি। চিন্ময়বাবু সব কটাকেই এভিডেন্স হিসাবে জমা করে নিলেন, এক ঝলক দেখলাম হুমকির চিঠি গুলো, এই রকম জিনিস আগে দেখেছি, অপরাধীদের হাতের লেখা গোপন করার এটা একটা প্রচলিত পদ্ধতি। আমার তেমন নতুন কিছু লাগল না, তবে আমাকে বলতেই হল, “দেখুন আপনি যখন কাউকে সন্দেহ করেন না, এই হুমকি চিঠি গুলোর ভিত্তিতে আমাদের পক্ষে কোন স্টেপ নেওয়া তো সম্ভব নয়। আর একটা ব্যাপার আছে, ক্রাইম হলে তবেই পুলিশের পক্ষে কিছু করা সম্ভব। আমরা নিশ্চয়ই অনুসন্ধান করব, আর ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি এটা তেমন জটিল কিছু ব্যাপার নয়। আচ্ছা আমাকে সত্যি করে একটা কথা বলুন তো, আপনার জীবনে এমন কিছু গোপন তথ্য বা আপনার কাছে এমন কিছু টাকা পয়সা বা ধন সম্পত্তি আছে কি, যার জন্য আপনাকে কেউ প্রাণ ভয় দেখাতে পারে! আমাদের কাছে গোপন করবেন না!”

অসিমাভ বাবুর উত্তর পেলাম না, আবার বললাম, “দেখুন আপনার বিপদে আমাদের সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। আর আমি বুঝতেও পারছি আপনার মনে কি চলছে! কিন্তু আপনাকে ক্ষতি করার কারণটা না জানলে আমাদের পক্ষে অনুসন্ধান করাটা সম্ভব হবে না। আর কোন কারণ না থাকলে আপনাকে কেউ ক্ষতি করবে কেন?”

অসিমাভ বাবু এখনো চুপ করেই আছেন, আমি আবার বললাম, “আপনার কোন পুরোনো শত্রু আছে কি যিনি আপনার কোন ক্ষতি করতে পারেন অথবা আপনাকে এভাবে ভয় দেখাতে পারেন?”

এবারে অসিমাভ বাবু কথা বললেন, “আমার কি মনে হয় জানেন, ইন্দ্রজিত ফিরে এসেছে?”

“ইন্দ্রজিত?”

“আমার বন্ধু, কলেজে এক সাথে পড়তাম, হোস্টেলে এক সাথে থাকতাম, তারপর ও একটা ড্রাগস সার্কেলে জড়িয়ে পড়ে! তারপর পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করে, আমাদের নানান প্রশ্ন করা হয়, শেষ পর্যন্ত শুনেছি ওর জেল হয়ে যায়। এতো দিনে হয়তো সে জেল থেকে বেরিয়েছে, তারপর?”

“কবেকার ঘটনা এটা?”

“২০০০ এর শেষের দিক”

“সেতো প্রায় আঠারো বছর! এতদিন ধরে নিশ্চয়ই সে জেলে নেই! যাহোক, সে একটু খোঁজ খবর নিলেই বেরিয়ে যাবে, কিন্তু ড্রাগস কেসে সাত আট বছরের বেশী জেল হয় না! যদি আপনাকে টার্গেট করার থাকতো তাহলে তো সে অনেক আগেই করতে পারতো? এতো দিন বাদে হঠাৎ করে সে আবার আপনার পেছনে পড়বে সেটা ভাবার কোন কারণ আছে কি?”

অসিমাভ বাবু চুপ করে আছেন দেখে আমি আবার বললাম, “আচ্ছা আপনার কি মনে হয় আপনি তাঁর সঙ্গে কি কোন অপরাধ করেছিলেন? করেন নি তো! পুলিশ আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিল, আপনি তার উত্তর দিয়েছিলেন। তারজন্য এতোদিন বাদে সে আপনাকে বিপাকে ফেলবে কেন? ঠিক আছে, আপনার মনে যখন সন্দেহ হয়েছে আমরা খোঁজ খবর নিয়ে নেব। পুরো নাম টা একবার বলুন তো!”

“ইন্দ্রজিত মল্লিক”

“তা হঠাৎ তাঁর কথা মনে পড়ল কেন?”

“খুব ভালো আর্টিস্ট! ও খুব ভালো কোলাজের কাজ করতো, এই রকম কাগজ কেটে কেটে চিঠি লিখতো! এই সব খুব ভালো পারত”

মাঝপথে আমি থামিয়ে দিলাম, অনর্থক সন্দেহ ঠিক নয় “না না, এ জিনিস অনেকেই করে, এটা তেমন কিছু ইউনিক নয়! যাহোক, আর কেউ? আপনার পরিচিত, আপনার অফিসে অথবা আগের চাকরীতে? যিনি আপনার ক্ষতি করতে পারেন, একটু ভেবে দেখুন”

অসিমাভবাবু মাথা নেড়ে ‘না’ বললেন, কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর বললেন, “আচ্ছা এই রকম কেসে পুলিশ কি তাহলে কোন রকম হেল্প করে না?”

“আপনি আমাদের কাছ থেকে ঠিক কি রকম সাহায্য চাইছেন?”

অসিমাভ বাবুর উত্তর পেলাম না, আবার বললাম, “আপনি যদি ভাবেন পুলিশ আপনাকে বাড়িতে গিয়ে নিরাপত্তা দেবে তাহলে সেই আশা করাটা বোধহয় ঠিক নয়। আমরা নিশ্চয়ই ব্যাপার টা অনুসন্ধান করব, তবে আমার মনে হয় অনেক প্রাইভেট সিকিওরিটি কোম্পানি এখন কাজ করে, আপনি তাদের সঙ্গে একটা পরামর্শ করুন, অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা আপনাকে বাড়ি পারসোন্যাল সিকিওরিটিও দিয়ে থাকে। আমার চেনাশোনা একটি এজেন্সী আছে, আপনি সেখানে কথা বলতে পারেন। ওঁরা নিশ্চয়ই আপনাকে হেল্প করবে।“ এজেন্সীর নাম, ফোন নম্বর দিয়ে আমি আবার বললাম, “আর আপনি তো এখানে একটা রিপোর্ট লিখিয়ে গেলেনই, ওঁদের সাথে কথা বলে ওরা কি বলব সেটাও জানিয়ে দেবেন। আর সত্যি বলতে আমার এখনো মনে হয়, যদিও দিনকাল খারাপ, তবুও যথেষ্ট কোন কারণ ছাড়া এক আর একজনের ক্ষতি করে না। আর যেখানে আপনি বলছেন আপনাকে ক্ষতি করার সে রকম কোণ কারণ নেই”

অসিমাভ বাবু মাথা নেড়ে সায় দিলেন, তারপর বললেন, “আমার একটা ছোট হেল্প লাগবে”

“বলুন”

“আসলে আমার পরশু একটু শিলিগুড়ি যাওয়ার আছে, মানে কাল বেরোচ্ছি, ওখানে একটা নতুন ব্র্যাঞ্চ অফিস খুলছে। শিলিগুড়ি অফিস থেকে বেশ কিছু কাগজপত্র নিয়ে আমাকে নতুন অফিসে যেতে হবে। আমাদের ডিরেক্টার আমাকেই যেতে বলেছেন, আসলে আমার চাকরীটা নতুন তো, তাই ‘না’ বলা তো সম্ভব নয়। কিন্তু আবার এই উটকো হুমকি, এই গুলোতো সবাইকে ঠিক বলাও যায় না। সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ! নতুন একটা জায়গায় গিয়ে যদি কোন সমস্যায় পড়ি, আর কোন সাহায্যের যদি দরকার হয়! তাই যদি একটু শিলিগুড়ি থানায় খবর করে রাখেন – এই আর কি?”

আমি আর কথা বাড়াইনি, ঘটনাচক্রে শিলিগুড়ি থানার ওসি আমার খুব চেনা, আমরা একসাথে ট্রেনিং করেছিলাম, নির্ভীক ঘোষাল, “বেশ, আমি বলে রাখব, দরকার হলে আপনি থানায় যোগাযোগ করবেন, নম্বরটাও আছে আমার কাছে, আপনি নিয়ে যান”।

“আর একটা কথা, আমার অফিসে কাউকে আমি এই ব্যাপার টা জানাই নি, বুঝছেন তো নতুন চাকরী, কি ভাববে তাঁরা! আমার কি ওঁদের জানানো উচিত?”

“এক্ষুনি কিছু করতে হবে না, আপনার শিলিগুড়ির কাজটা আগে শেষ করুন, সে রকম হলে আমরাই জানাবো, চিন্তা করবেন না”



[২]


অপরাধ যতক্ষণ না হচ্ছে আমাদের ততক্ষন হাত পা বাঁধা থাকে। তবে সত্যি বলতে অসিমাভ ভট্টাচার্যের এই কেসটা আমার কাছে নতুন লেগেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে অনুসন্ধানও শুরু হল। চিন্ময়বাবুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। রহস্যের আনাগোনা শুরু হয়েছে। যেমন, চারটে চিঠি এসেছে, যেগুলোকে আমরা তথাকথিত হুমকির চিঠি বলে ধরে নিয়েছি, তার প্রথমটা থেকে বোঝা যায় রেস্টুরেন্টে কেউ কাজটায় সহায়তা করেছে, দ্বিতীয়টা যে কেউ করতে পারে, তৃতীয়টাও যে কেউ করতে পারে আবার চতুর্থ টা নিশ্চয়ই অফিসে কেউ সেই সিগারেটের প্যাকেটে কাগজ ঢোকানোর কাজটা করেছে। তাহলে এই সব কাজ কি একজনের করা? যিনি সেই ‘যত্র, তত্র, সর্বত্র’ বিরাজমান রয়েছেন এবং সকলের অলক্ষ্যে এই রকম কুকাজ করে চলেছেন? নাকি একটা দল জড়িয়ে আছে এর মধ্যে!

এদিকে অসিমাভ বাবুর কথায় এক দিদি ছাড়া তাঁর সেইরকম নিকট আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই। নতুন অফিস, সুতরাং শত্রু বা মিত্র কেউ না থাকার কথা। তাহলে কাজ টা করছে কে? তাঁর কোন পুরোনো বন্ধু যিনি এখন তাঁর শত্রু তে পরিনত হয়েছেন? নাকি পুরোনো অফিসের কেউ? কিন্তু তিনি নিজে স্বীকার করেছেন জ্ঞানত তিনি কারুর সঙ্গে কোন অবিচার বা অন্যায় করেন নি। এক পৈতৃক বাড়ি ছাড়া তাঁর কাছে তেমন ধন সম্পদ ও কিছু নেই। তাহলে কিসের আশায় এই রকম হুমকি চিঠি তাঁকে দেওয়া হল কেন? এদিকে ইন্দ্রজিত মল্লিক ছাড়া আর কাউকে তিনি সন্দেহ করেন না। ব্যক্তিগত ভাবে যদিও ইন্দ্রজিত মল্লিক কে সন্দেহ করার মতো কোন কারণ আমার লাগছে না। তাহলে কি অসিমাভ বাবু আমাদের কাছে কিছু গোপন করেছেন? কিন্তু কেন? পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে এসে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার কোন কারণ থাকে কি?


রিজওয়ান আর ভাস্কর – আমার থানার দুজন সাব ইনস্পেক্টর। আড়ালে অন্যরা এদেরকে আমার সাকরেদ বলে। সে বলে বলুক, সত্যি বলতে এরা দুজনে আমার ডান আর বাঁ হাত। নিজেদের কাজে দুজনেই খুব সক্ষম, বেহালা থানায় গত তিন বছরে যা কেস এসেছে, সব কাজে এরা দুজনে আমার পাশে থেকেছে। এঁদের মধ্যে রিজওয়ান গত ছয় বছরে আমার ‘তোপসে’ হয়ে গেছে। আমি কিন্তু ‘ফেলুদা’ নই, তবু আমার মনে হয় বাংলা আর বাঙালী যতদিন থাকবে সর্বশ্রেষ্ঠ সহকারীর নাম ‘তোপসে’ই হবে। কাল রাতেই কথা হয়ে গেছে, তার ভিত্তিতে রিজওয়ানকে পাঠিয়েছিলাম ইন্দ্রজিত মল্লিকের কেস ফাইল খুঁজতে আর ভাস্কর গেছিল মাঝেরহাটে বৈকুন্ঠপুরে অসিমাভবাবুর পাড়ায় একটা প্রাথমিক তদন্ত করতে। অবশ্যই গোল্ডেন কিচেনেও একবার যাবার কথা আছে। দুপুরে লাঞ্চের আগেই ভাস্কর ফিরলো। অসিমাভ ভট্টাচার্য মাঝেরহাটে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে গত এক বছর ধরে আছেন, এমনিতে শান্তিপ্রিয়, কোন সাতে পাঁচে থাকেন না। গোল্ডেন কিচেন থেকে শনিবার খাবারের পার্সেল নিয়েছিলেন, হোটেলের ম্যানেজার নিজে কনফার্ম করেছেন। দুটো নতুন তথ্য পেলাম, হোটেলের ম্যানেজার জানিয়েছেন খাবারের পার্সেল নেওয়ার সময় অসিমাভবাবুকে দেখে বেশ টেন্সড লাগছিল! কারণ জানতে চাওয়ায় বলেছিলেন “তেমন কিছু নয়, শরীর টা তেমন ভালো যাচ্ছে না”।


টেনশন অবশ্য যে কোন মানুষের যে কোন সময়ে হতে পারে! তাতে আশঙ্কিত হবার কোন কারণ আছে বলে আমার মনে হয়নি। আর অন্য কোন ব্র্যান্ডের চাইনিজ কুকিসের ব্যাপারটা, রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জানেন, যদিও রবিবার সকালে তিনি ডিউটিতে ছিলেন না। তবে এটা জানতেন না, সেটা অসিমাভ বাবুর সঙ্গেই হয়েছে। তবে পার্সেলের সঙ্গে চাইনিজ কুকিস দেওয়ার জন্য কাউকে ঠিক দায়ী করা যায় না। কারণ, কুকিস গুলো একসাথে একটা বড় বাক্সে রাখা থাকে। কাস্টমার সেখান থেকে পছন্দ মত তুলে নেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে, অসিমাভ বাবু নিজের হাতেই সেটা নিয়েছিলেন, আর সেটার মধ্যে হুমকি চিঠি পেলেন। আমাদের যেমন বলা হয়েছিল আর যেমন আমরা শুনলাম দুটো কিন্তু একেবারে হুবহু নয়। সেটা কি ইচ্ছে করে? নাকি আমাদের বুঝতে ভুল হয়েছিল?


বিকেল চারটের সময় রিজওয়ানের ফোন এল, আর সেটা রহস্যটা কেমন করে যেন আরো উসকে দিল, “স্যার, আমি গত তিন ঘন্টা ধরে ইন্দ্রজিত মল্লিকের কেস ফাইল খুঁজছি। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ এর মধ্যে যা ফাইল সেন্ট্রাল স্টোরে রাখা আছে প্রায় সব চেক করা হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কিছু পাইনি। এখানে যারা আছেন তাঁরাও খুঁজছেন আমার সঙ্গে, কিছু পাইনি এখনো। ইন্দ্রজিত নামে একটা এন্ট্রি আছে তবে সে ডাকাতির কেস, নাম ইন্দ্রজিত দাস, ২০০৪ সালের অক্টোবরে, বেকবাগানের কাছে কোন বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। এছাড়া কিছু পাইনি এখনো, পেলেই আপনাকে জানাচ্ছি!“

সাধারনত যেসব কেসে জেল হয় সে ফাইল আমাদের সেন্ট্রাল স্টোরে থাকবেই। অসিমাভ বাবু কাল বললেন, ইন্দ্রজিত মল্লিকের জেল হয়েছিল, কিন্তু তাঁর নামে কোন ফাইল নেই কেন? লালবাজারে একটা পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোন কারণ ছাড়া তাঁদের কে কিছু বলিই বা কি করে?

সন্ধ্যে সাতটার সময় রিজওয়ান ফিরল, কিছু পাওয়া যায়নি। কেস ফাইল ছাড়া জেলে খবর নেওয়া অসম্ভব, সুতরাং ইন্দ্রজিত মল্লিকের ব্যাপার টা কেমন যেন ঝুলে রইল। চিন্ময়বাবু বুদ্ধিটা দিলেন,আমিও সেই মত ফোন ঘোরালাম, আমাদের কিছু ইনফরমেশন নিতে হবে আর সেটা পাবার সবচেয়ে সহজ উপায় অসিমাভ বাবু। দুবার রিং হতেই ফোন ওঠালেন,

“হ্যাঁ স্যার, বলুন”

“সব ঠিকঠাক আছে তো?”

“হ্যাঁ স্যার, আপাতত। কাল সকালে পৌঁছচ্ছি, আর ঐ স্টার এজেন্সীর একজন সিকিওরিটি গার্ড ও আছেন আমার সঙ্গে, আপনার কথা মতো ওকে সঙ্গে নিয়ে নিলাম। কি দরকার, সামান্য কটা টাকার জন্য শুধুশুধু রিস্ক নেওয়া।“

“হ্যাঁ ভালো করেছেন, আচ্ছা একটা জিনিস জানার ছিল”

“বলুন”

“ইন্দ্রজিত মল্লিকের কেস ফাইলটা আমরা এখনো হাতে পাইনি, তাই ওর ব্যাপারে কিছু জানার ছিল”

“বলুন, কি জানতে চান?”

“আচ্ছা, আপনি কি সিওর ইন্দ্রজিত মল্লিকের জেল হয়েছিল”

“সেই রকমই তো জানতাম! কেন, হয়নি নাকি?”

“সেটাই আমরা জানার চেষ্টা করছি, অনেক দিন আগের কেস তো, একটু সময় লাগছে, আচ্ছা, উনি থাকতেন কোথায়?”

“নর্থ ক্যালকাটা, শ্যামপুকুর স্ট্রীট। কি ভবতারিণী নাকি ভুবনমোহিনী বলে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, রেস্টুরেন্ট ঠিক নয় একটা খাবারের দোকান মতো, সেই বাড়ির দোতলায় থাকতো, ওর মা ছিলেন আর এক বোন ও ছিল। পাশে একটা নার্সিংহোমও ছিল, নাম টা ঠিক মনে নেই”

“আপনি গেছেন সেই বাড়িতে?”

“হ্যাঁ অনেকবার, তবে ২০০০ সালের পরে আর নয়”

“আচ্ছা পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করেছিল তো?”

“সেইরকমই তো জানতাম”

“আচ্ছা, আর কাউকে কি আপনি জানেন যার সঙ্গে ইন্দ্রজিত মল্লিকের যোগাযোগ থাকা সম্ভব? আপনাদের কোন কমন ফ্রেন্ড বা ইন্দ্রজিতর কোন আত্মীয় যাকে আপনি চেনেন!”

“হ্যাঁ ছিল, কিন্তু তাঁদের সাথে আজ তো আর কোন কনট্যাক্ট নেই। ঠিক আছে স্যার, আমার মনে পড়লে আমি আপনাকে ফোন করে জানাচ্ছি”

আর বেশী কথা হয়নি, এটা ওটা কাজে আমরাও একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারমধ্যে প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি বেহালা কিন্তু খুব ব্যস্ত থানা, আমি আগে তিনটি আলাদা জায়গায় কাজ করেছি। নিঃসন্দেহে এখানে কাজের চাপ অনেক বেশী। আমাদের খালি সময় বলতে থাকেই না। তারমধ্যে আবার সামনে ইলেকশন! আমার অবশ্য কাজের চাপ ভালোই লাগে বরং কাজ না থাকলে কেমন যেন খালি খালি লাগে।


ইন্দ্রজিত এবং অসিমাভ দুটো মানুষের কথা আবার মনে পড়ল পরদিন সকালে, যখন আমার বন্ধু নির্ভীক শিলিগুড়ি থানার ওসি, তার ফোন এল। অসিমাভবাবু সেখানে পৌঁছেছেন এবং আমার সঙ্গে যেমন কথা হয়েছিল সেই মতো থানায় গেছেন। মিনিট দশেক কথা হল, অসিমাভবাবুর সাথেও কথা হল। কাজের কথা বলতে দুটো জিনিস জানলাম। এক, নির্ভীকের কাছে শুনলাম অসিমাভবাবু নাকি আরো ঘাবড়ে গেছেন। এবারে রাতে ট্রেনে আক্রমন হয়েছে, ইংরাজী খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া সেইরকম প্রিন্টেড হরফে আবার চিঠি এসেছে। আর সেই চিঠি নাকি অতি কৌশলে তাঁর এবং সেই স্টার এজেন্সীর সিকিওরিটির দৃষ্টি এড়িয়ে তাঁর শোবার জায়গায় রাখা হয়েছিল, গত কাল রাতে। অসিমাভ এসি থ্রীতে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে অন্য সহযাত্রীরা ছিলেন, তাঁদের ও কারুর চোখে কিছু পড়েনি। সুতরাং অন্য যাত্রীদের নজর এড়িয়ে কাজটা করা হয়েছে। অসিমাভ বাবু রাতেই আমাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু লাইন পাননি। আর দুই, নির্ভীক ঠিক করেছে একজন হোমগার্ড ও যাবে অসিমাভ বাবুর সঙ্গে তাঁর নতুন ব্র্যাঞ্চ অফিসে। শুনলাম টাকা পয়সাও নতুন অফিসে কিছু টাকা পয়সাও তাঁকে নিয়ে যেতে হবে, সুতরাং নিরাপত্তার একটা প্রয়োজন থেকেই যায়। আর, নির্ভীককে আমি ভালো করেই চিনি, অসিমাভ বাবুর এই অজানা বিপদে সে যে সাহায্য করবে সেটাই স্বাভাবিক।


অসিমাভর এই কেসটা সত্যি আমাকে নতুন করে ভাবাচ্ছিল। আগের ঘটনা গুলো নয় বুঝলাম, কিন্তু ট্রেনেও হানা হয় কি করে? তাও আবার সঙ্গে পেশাদার পাহারাদার। যদিও ইন্দ্রজিত মল্লিকের অস্তিত্ব প্রমান হয়নি কিন্তু তবুও একজন মানুষের একার পক্ষে এই এতগুলো ঘটনা ঘটানো কি সম্ভব? এদিকে রিজওয়ান আজও খবর নিয়েছে, ইন্দ্রজিত মল্লিকের নামে কোন কেস ফাইল পাওয়া যায় নি।

চিন্ময়বাবুর পরামর্শে এবং খানিকটা নিজস্ব তাগিদে ফোন ঘোরালাম, শ্যামবাজার থানা। ওসি কে আমি চিনতাম, দিব্যেন্দু রক্ষিত, আমার চেয়ে বেশ খানিকটা সিনিয়র, আমাদের লাইনে বেশ পরিচিত নাম। নাম থাকলে অবশ্য সুনাম ও হয় আবার দুর্নাম ও হয়, সুতরাং সে তর্কে গিয়ে খুব লাভ নেই। তবে যথেষ্ট দুঁদে পুলিশ অফিসার এবং বেশ ডিটেলে কাজ করেন শুনেছি। ইন্দ্রজিতের বাড়ির এলাকা খুব সম্ভব তার থানার এরিয়াতে আসে, তাই একটা চান্স তো নেওয়া যেতেই পারে। আর তাছাড়া কালকের রাতের হুমকির পর ব্যাপারটা তো বোধহয় আর রসিকতার স্টেজে নেই। আর সত্যি ভগবান না করুন, যদি অসিমাভ ভট্টাচার্যের ভালোমন্দ কিছু হয়, আমার ওপর মহল কিন্তু আমার এই চুপ করে বসে থাকার জন্য খুব খুশী হবে না। এদিকে আমার বস এখন স্পেশাল ডিউটিতে কলকাতার বাইরে, তাঁর নির্দেশের জন্য আমাকে আরো দুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন আমার এভাবে চুপ করে বসে থাকাটা ঠিক নয়। তাছাড়া আমার মনে হল আমি কিছু ভুল করছি না, তাই আর দেরী করিনি। দিব্যেন্দুবাবুকে একবারেই পেলাম, প্রায় মিনিট দশেক ধরে গত দুদিনের ঘটনা গুলো রিলে করলাম। চুপ করে শুনছিলেন দিব্যেন্দু বাবু, বুঝতে পারছিলাম এই রকম একটা প্রশ্ন আসবে এবারে,

“বেশ বুঝলাম আমাকে কি করতে হবে?”

“ইন্দ্রজিত মল্লিকের ব্যাপারে একটু খবর নেওয়ার ছিল।“

“এতো দিনের পুরোনো কেস, কি খবর আমি নেব? আর পুলিশের খাতায় যখন নাম নেই, আমি ও তো কিছু পাবো না!”

আমার কিছু বলার আগেই উনি আবার বললেন, “দেখুন আমার কাছে এটা খুব একটা কনভিন্সিং লাগছে না। ঐ ভট্টাচার্যকে ভয় দেখানো ব্যাপারটা বুঝলাম কিন্তু সেটাকে ইন্দ্রজিত মল্লিকের সঙ্গে রিলেট করাটা ঠিক লাগছে না। আর পুলিশের খাতায় যখন নাম নেই তখন বেনিফিট অফ ডাউট”

কথা শেষ হবার আগেই আমি বললাম, “কিন্তু অসিমাভ ভট্টাচার্য কনফার্ম করল, লোকটাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল তাহলে নিশ্চয়ই পুলিশ কেস হয়েছে, ইন দ্যাট কেস, কেস ফাইল গেল কোথায়?”

“দেখুন এসব প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, আজ থেকে সতের বছর আগে আমি এই থানায় ছিলাম না। এখন কেসটা এই থানার কি না সেটাও আমার জানা নেই! আমার পক্ষে খুঁজে বার করা নট পসিবিল!”

“একটা নাম পেয়েছি, যদিও কনফার্ম কি না জানি না, সেটা জেনুইন কি না চেক করা যাবে কি?”

“কি নাম?”

অসিমাভর কাছে যে রকম শুনেছিলাম সেই রকমই বললাম, পুরোটা বলতে হল না। তার আগেই দিব্যেন্দু বাবু বলে উঠলেন, “এই ভাবে খোঁজা সম্ভব নয়। আর এটা আমার কাজের মধ্যে সেগুলো আসে না। তাছাড়া সামনে এখন ইলেকশন, প্রচন্ড প্রেসার, একদম সময় নেই। তবে আপনি যদি ইনভেস্টিগেট করতে চান করুন, কোন হেল্প লাগলে জানাবেন।”

বুঝলাম শ্যামবাজার থানা নিজে থেকে করবে না, সুতরাং ইন্দ্রজিৎ মল্লিকের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে যদি কোন তদন্ত যদি করতে হয়, সেটা আমাকেই করতে হবে। আর দেরী করিনি, কারণ কাউন্টডাউনের হিসেব মতো আর দুদিন বাদেই সেই দিন, যেটা কিনা অসিমাভ ভট্টাচার্যের জীবনে আনন্দের শেষদিন। থানার দায়িত্ব চিন্ময় বাবু আর ইনস্পেক্টর অলোকের হাতে রেখে আমি রিজওয়ানকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। রিজওয়ান আগে শ্যামবাজার চত্বরে থাকতো, সুতরাং ওর সঙ্গে থাকাটা দরকার। যদিও প্রায় সতের আঠেরো বছরের পুরোনো কেস, তবু আমার মন বলছে ইন্দ্রজিৎ মল্লিকের কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যাবে। দুটো জিনিস আমাকে খুব ভাবাচ্ছে, এক অসিমাভ বাবুকে অলক্ষ্যে থেকে যে হুমকি চিঠি দিচ্ছে সে কে? সে কি তাঁর পরিচিত? আর দুই, যাকে ড্রাগসের ব্যবসা করার অপরাধে পুলিশ অ্যারেস্ট করে, আর বন্ধুকে সাক্ষী দিতে হয়, তার কেস ফাইল হারিয়ে যায় কি করে? সেটা কি ইচ্ছে করে? কোন উদ্দেশ্য আছে তার পেছনে? বেরিয়ে পড়লাম পরদিন সকালে।

আমরা দুজনে আলোচনা করে ঠিক করেছিলাম, আর সেইমত পুলিশের ইউনিফর্মে যাই নি, সাদা পোশাকে বেরোলাম, থানার জীপ নিই নি, অন্য গাড়িতেই গেলাম কিন্তু সার্ভিস রিভলবার নিতে ভুলিনি। আর হ্যাঁ, অসিমাভ ভট্টাচার্যের সাথে কথা হয়েছিল সকালে। এবারে হোটেলের ঘরে চিরকুট ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছে। লেখা আছে, “ভয় পেও না, আনন্দ করার জন্য আরো দুটো দিন তো আছে, আবার কাল কথা হবে”।



[৩]


হাতিবাগান, শ্যামবাজার সব নিয়ে এলাকাটা নেহাত কম বড় নয়। তার ওপর উত্তর কলকাতার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে, পুরোনো গলি গুলো এমন ভাবে কানেকটেড, না চেনা থাকলে খোঁজা একটু মুশকিল। তার মধ্যে ভবতারিণী অথবা ভুবনমোহিনী নামে খাবারের দোকান আবার তার পাশে একটা নার্সিং হোম, এই রকম একটা কম্বিনেশন খুঁজে বার করাটা খুব সহজ ছিল না। অবশ্য রিজওয়ান একটা ছক করে রেখেছিল, আর সেটা ধরেই আমরা খোঁজা শুরু করেছিলাম। তিনটে সম্ভাব্য জায়গা আমরা পেয়েছিলাম, তারপর আর খানিকটা খোঁজ খবর করে শেষ অবধি একটা জায়গা স্থির করা হল। খাবারের একটা দোকান আছে তবে নাম ‘বিন্ধ্যবাসিনী’। ধরে নেওয়া গেল অপভ্রংশে এটাকেই অসিমাভ ‘ভবতারিণী’ অথবা ‘ভুবনমোহিনী’ বলেছেন, আর সংলগ্ন একটা নার্সিং হোম আছে বটে, নাম ‘নর্থ পয়েন্ট’। মুশকিলটা হল অন্য জায়গায়, যেটা ইন্দ্রজিতের বাড়ি বলে আমাদের মনে হচ্ছিল সেটাতে ঢোকার রাস্তায় একটা মস্ত লোহার গেট, আর তাতে একটা তালা ঝুলছে। যেহেতু আমরা নিজেদের পুলিশ বলে পরিচয় দিইনি, জবরদস্তি করে ঢোকাটা ঠিক নয়। আমরা একটা দুটো দোকানে ইন্দ্রজিৎ মল্লিক বলতে সে রকম কাজের কোন ইনফরমেশন পেলাম না। ষোল সতের কি তারো আগেকার কথা, চট করে কিছু না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত এদিক ওদিক প্রশ্ন করে আমরা একটা ওষুধের দোকানে জানলাম, সেই দোকানের মালিক ত্রিদিব বাবু এ পাড়ার নাকি অনেক দিনের মানুষ, ওনার সঙ্গে কথা বললে হয়তো জানা যেতে পারে। সুতরাং আর দেরী করা নয়, ত্রিদিব বাবুর বাড়ি সেখান থেকে কয়েকশো মিটার দূরে। পুরোনো বাড়ি, তার পেছনের দিকে দোতলায় থাকেন ভদ্রলোক। আশির ওপর বয়স, তবে বেশ সবল, সুস্থ, ওনার দোতলার ঘরে বসেই কথা হচ্ছিল।

“চিনি বইকি! ইন্দ্র কে চিনবো না! ইন্দ্র খুব ভালো আর্টিস্ট ছিল, হাতের কাজ খুব সুন্দর, ওর মা আর বোন – এ পাড়াতেই তো থাকতো সব। ঐ তো মোড়ের মাথায়, নর্থ পয়েন্ট নার্সিং হোমের পাশে রাস্তার ওপর বারান্দা ঐ বাড়ির, পেছনের দিকটায় থাকতো। সব যে কি হয়ে গেল হঠাৎ করে?”

“কি হয়ে গেল?”

“ড্রাগসের কেসে জড়িয়ে গেল ছেলেটা, তারপর পলিটিক্যাল পার্টি, পুলিশ সবাই মিলে ওকে মারল”

“মারল মানে?”

“আচ্ছা, আপনারা কারা? এতো কেন জানতে চাইছেন বলুন তো?”

মিথ্যে আমাকে বলতেই হল, “আমি ইন্দ্রর দূরসম্পর্কের এক দাদা, অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম, ওদের কোন খবর পাইনি। তারপর আত্মীয়স্বজনরাও সে রকম কিছু বলতে পারছিল না। তাই খোঁজ নিতে নিতে শুনলাম ওরা এই এলাকায় থাকতো, তারপর চলে এলাম, আর কি!”

“সে কি? পুলিশ কিছু জানায়নি আপনাদের?”

“হয়তো জানিয়েছিল, কিন্তু আমি তো দেশের বাইরে থাকতাম, আমার কাছে তো কোন ইনফরমেশন আসেনি”

“পুলিশ তো বলেছিল ওকে নাকি বেল দেওয়া হয়। তারপর ও নাকি সুইসাইড করে! আপনারা ওর রিলেটিভ, আপনাদের ডেডবডি হ্যান্ড ওভার করেছিল?”

“মানে? কি বলছেন আপনি?”

“হ্যাঁ, লোক দেখিয়ে ইন্দ্রকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল, তারপরে কি আর কারুর বুঝতে বাকী থাকে? ওরাই লোক লাগিয়ে মেরে দিয়েছে আর বলে দিল ও সুইসাইড করেছে। কাজরী, ওর বোন, একদিন হঠাৎ কিডন্যাপড! সেও আর ফিরল না!”

“ফিরল না মানে? কোথায় গেল?”

“নিশ্চয়ই কোথাও তাকে রাজরানী করে রাখা হয়নি! আপনারা তো বুদ্ধিমান, শিক্ষিত মানুষ, বুঝতে পারছেন আশাকরি কি হয়েছিল তার সাথে। যাহোক, সে আর ফেরে নি! আমরাও স্বার্থপর, জানতে চাইনি কি হল তার। একটু আধটু ছোটাছুটি হল, তারপর পুলিশ হাত গুটিয়ে নিল। আর তারপর ওর মা, ঐ তো নর্থ পয়েন্টের পাশের বাড়িতে সুইসাইড করলেন। শাড়ী দিয়ে গলায় ফাঁস, তারপর ফ্যান থেকে লটকিয়ে। কি ভয়ংকর! তা, এতোদিন আপনারা কোথায় ছিলেন? আজ সতের আঠেরো বছর বাদে এসে খবর নিচ্ছেন ছেলেটার কি হল?”

“কারা করেছিল সে কাজ?”

“সে আমি কি করে জানব? তবে ছেলেটা ফেঁসে গেল, এতো ভালো একটা ছেলে। আর আমাদের পুলিশ ও হয়েছে, আল্টিমেট কোরাপ্টেড! পলিটিক্যাল পার্টির দালাল”

পুলিশকে দেওয়া গালাগাল গুলো আমাকে বেমালুম হজম করতে হল “আমাকে একটু পুরো ব্যাপারটা খুলে বলবেন প্লীজ, আসলে আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না!”

“দেখুন সে অনেক দিনের ব্যাপার! আর আমি এর বেশী কিছু জানি না! আপনি বরং থানায় একটা খবর নিতে পারেন। তবে মনে হয়, কিছু পাবেন না। আসামী সুইসাইড করলে তো পুলিশ বোধহয় সঙ্গে সঙ্গে কেস বন্ধ করে দেয়”

“আচ্ছা, আত্মীয় স্বজন কেউ আসেনি, খবর পেয়ে?”

“সে আমি কি করে জানব মশাই, আপনি হলেন গিয়ে সম্পর্কে দাদা, আপনার তো জানা উচিত কে এসেছিল কে আসেনি”

“আর বাড়িটার কি হল?”

“ওরা তো ভাড়া থাকতো, তারপর এখন তো ও বাড়ি পোরশন করে করে বিক্রী হয়ে গেছে”

“আচ্ছা আপনি বলছিলেন, ওকে ফাঁসানো হয়েছিল? আপনি কি করে এতোটা সিওর হলেন?”

“দেখুন আমার বয়সটা বিরাশী তো এমনি এমনি হয়নি, কে ড্রাগসের ব্যবসা করতে পারে আর কে পারে না সেটা বোঝবার বুদ্ধি আমার আছে। কাজেই কেউ না কেউ ওকে ফাঁসিয়েছে, তারপর পুলিশকে দিয়ে কেসটা সাজিয়েছে। না হলে বোনটা কোথায় হারিয়ে গেল? পুলিশই বা ওর সুইসাইডের পর আর অনুসন্ধান করল কেন?”

ত্রিদিববাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিজওয়ান প্রথম কথা বলল, “স্যার, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। খবর টা আগেই এসেছিল কিন্তু বলিনি, আপনি তখন কথা বলছিলেন তাই বলিনি, পাছে কোন সন্দেহ হয়”

“কি ব্যাপার?”

“একটা অদ্ভুত ব্যাপার, যে তিনটে হুমকি চিঠি আমাদের থানায় জমা হয়েছে তার সব কটায় অসিমাভ ছাড়া আর একটা কমন হাতের ছাপ রয়েছে যার ডান হাতে ছটা আঙ্গুল! কিন্তু পরশু রাতে যে চিঠি ট্রেনের বিছানায় ফেলা হয়েছে বা কাল রাতে তে চিঠি হোটেলের ঘরে ফেলা হয়েছে সেগুলোও জমা হয়েছে শিলিগুড়ি থানায়, সেই দুটোতে কিন্তু সেই ছয় আঙ্গুলের ছাপ নেই”

“তাহলে তো মনে হচ্ছে কাজটা একজনের করা নয়। তাহলে কি একটা দল জড়িয়ে আছে এই ঘটনাগুলো সঙ্গে? কিন্তু অসিমাভ ভট্টাচার্য কে এমন ইম্পরট্যান্ট ব্যক্তি যাকে একটা দল মিলে ভয় দেখাবে?”

মিনিট পাঁচেক দুজনের কেউ কোন কথা বলিনি, আমাদের গাড়িটা বিধান সরনীর ওপর ছিল। মিনিট পাঁচেকের পায়ে হাঁটা পথ, আমি নীরবতা ভাঙলাম, “কেসটা কি বলো তো?”

“বুঝতে পারছি না স্যার”

“আর ইন্দ্রজিৎ মল্লিক কি বুঝলে?”

“জানা গেল ব্যাপারটা, কেস ফাইল কেন নেই সেটা বোঝা যাচ্ছে! পুলিশই সরিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে কোন হাই প্রোফাইল কেসে জড়িয়ে গেছিল, তারপর পলিটিক্যাল মার্ডার! আর সেটাকে সুইসাইড করে সাজানো হয়েছে। স্যার একটু খোঁজ নিলে সব জানা যাবে। আমি কথা বলছি আজকে, এই এলাকায় একজন ইনফরমার আছে আমার”

“সে নয় জানা গেল, কিন্তু জেনে কি হবে? আমাদের এই কেসটাতে সতের বছরের সেই পুরোনো ঘটনা কি হেল্প করবে? আর ইন্দ্রজিৎ যদি সুইসাইডই করে থাকে তাহলে অসিমাভকে নিশ্চয়ই হুমকি গুলো সে দিচ্ছে না! তাহলে এই কেসটার সঙ্গে ওটাকে লিঙ্ক করার কোন সেন্স থাকছে না। তাই না? কিন্তু আমি ভাবছি একটা অন্য কথা, অসিমাভ ভট্টাচার্য তার এত বন্ধু, এতোটা জানল যে ড্রাগস কেসে ফেঁসে গেছে, আবার সাক্ষী ও দিল, আর এটা জানল না যে তার বন্ধু সুইসাইড করেছে। তার বোন কে লোপাট করে দিয়েছে বা তার মা গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করেছে! তা নাহলে তার কেন মনে হল ইন্দ্রজিৎ মল্লিক ফিরে এসেছে? হ্যাঁ হতে পারে, এই পুরো জিনিসটা হয়তো অনেক দিন ধরে চলছিল, তারপর অসিমাভ ইন্টারেস্ট হারিয়ে ডিটাচড হয়ে গেল, তারপর ইন্দ্রজিৎ সুইসাইড করল।”

“স্যার একবার অসিমাভকে জিজ্ঞেস করা যায় না?”

“নিশ্চয়ই যায়, চলো আজ রাতেই কথা বলব”

থানায় ফিরতে বিকেল হয়ে গেল, নির্ভীকের ফোন এসেছিল। ও দিকে সব কাজ এখনো পর্যন্ত ঠিকঠাক আছে। অসিমাভ আজ প্রায় সারাটা দিন ব্যাঙ্কে কাটিয়েছে, কি সব কাজ ছিল। স্টার এজেন্সীর সিকিওরিটি গার্ড এবং পুলিশের হোমগার্ড দুজনেই তার সঙ্গে ছিল, সব কাজ ঠিকঠাক সম্পন্ন হয়েছে। কাল সকালে নতুন অফিসে কিছু কাজ আছে, সেসব করে তার পরের দিন ফেরার কথা। আমাদের কাছে একটা দিন আছে, হুমকির চিঠি অনুসারে কালকের দিনটা খুব গুরত্বপূর্ণ। সেটা নিয়েই কথা হচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল কালকের দিনটা অসিমাভর শিলিগুড়িতে থেকে যাওয়াটাই ভালো হবে, নির্ভীক সেটাকে সমর্থন করল। বিকেলে ফিরলে নির্ভীক ওঁর সাথে কথা বলবে। আর একজন পুলিশ হোমগার্ড এবং একজন সাব ইন্সপেক্টর বিনা পুলিশের ড্রেসে আজ সন্ধ্যে থেকে অসিমাভর সঙ্গে ছায়াসঙ্গীর মতো লেগে থাকবে। দেখা যাক,অচেনা হুমকি চিঠির মালিককে আমরা ধরতে পারি কি না?

থানায় ফিরে আমি পড়ে থাকা কাজে মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। এখন ইলেকশনের সময়, ছোটখাট গন্ডগোল লেগেই আছে। তাছাড়া এমনিতে বেহালাতে সবসময় একটা চাঞ্চল্য থাকে। নতুন আসা একটা কেস নিয়ে কথা হচ্ছিল, ঠিক এই সময়ে এক ভদ্রলোককে থানায় ঢুকতে দেখলাম। সামনের ঘরটাতে অলোক আমাদের আর একজন সাব ইন্সপেক্টর, ওর সঙ্গে কথা বললেন। মিনিট তিন চারেকের মধ্যে অলোক আমাদের ঘরে এল, পেছনে সেই ভদ্রলোক আর তাঁর পেছনে রিজওয়ান। জিজ্ঞাসা করলাম “কি ব্যাপার অলোক?”

“স্যার, এই ভদ্রলোক একটা কাজে এসেছেন, রিজওয়ান বলল আপনার সাথে কথা বলতে”

আমি রিজওয়ানের দিকে তাকাতে সে হাল্কা মাথা নেড়ে আমার দিকে ইঙ্গিত করল, তার মানে আমার কথা বলা দরকার, ভদ্রলোক আমার সামনের চেয়ারটায় বসলেন, আর পাশের চেয়ারটায় রিজওয়ান। ভদ্রলোক মাঝবয়সী, বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে, পোশাক পরিচ্ছদ বেশ ভালো, কথা বলার ভঙ্গীটিও খুব সুন্দর।

“স্যার আমার নাম বিকাশ চৌধুরী, আমি ‘ভারত লাইফ’ বলে একটি ইন্সিওরেন্স কোম্পানীতে কাজ করি, আমি এই ইস্টার্ন জোনের এইচ আর ম্যানেজার, কলকাতায় আমাদের তিনটে অফিস আছে, তিনটেরই এইচ আরের দায়িত্বে আমিই আছি। আমাদের তারাতলা অফিসের যিনি ম্যানেজার, সেই ভদ্রলোক গত দশ দিন ধরে অফিসে আসছেন না! ভদ্রলোক আমাদের অফিসে নতুন, মাস খানেক হল জয়েন করেছেন, সে রকম ক্লোস বলতে অফিসে কাউকে পাইনি। আমরা ওনাকে ফোনে ধরারও অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাইনি। বাড়িতে লোক পাঠানোর রীতি আমাদের অফিসে নেই, তাই আমরা কাউকে পাঠাতে পারিনি বা বলা যায় পাঠাই নি। বাড়ির অ্যাড্রেস অবশ্য আছে। তা আজ আমাদের সিএমডি দিল্লী থেকে এসেছেন, ওনার সঙ্গে কথা হল, উনিও অনেকবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ফোনে ওনাকে পাননি। তাই উনিই বললেন একবার পুলিশে খবর করতে। আমরা লোকাল হসপিটালেও একটা খবর করে রেখেছি, জানিনা কোন অ্যাক্সিডেন্ট হলো কিনা? তো সে জন্যই এখানে আসা”

“দশ দিন ধরে আসছেন না, তা এতো দিন দেরী করলেন কেন? আপনাদের তো আগেই আশা উচিত ছিল”

“হ্যাঁ স্যার, ভুলটা আমাদের ই। দেরী আমাদেরই হয়েছে“

“এমারজেন্সী ফোন নম্বর বা কনট্যাক্ট বলতে কিছু নেই? সেখানে খবর নিয়েছেন?”

“হ্যাঁ, ওনার বোনের নম্বর দেওয়া ছিল, সে নম্বরও সুইচ অফ আসছিল। তারপর আজ সকালে শেষ পর্যন্ত আমরা যোগাযোগ করতে পেরেছি। ওঁরা এখন দেশের বাইরে, সিঙ্গাপুরে বেড়াতে গেছেন, কাল ফিরছেন, তারপর কনট্যাক্ট করবেন বলেছেন। আর একটা কথা স্যার, আপনাকে সত্যিটাই বলি, আমি এটা বলিনি যে দশ দিন ধরে ওনাকে আমরা যোগাযোগ করতে পারছি না। মানে, ওঁরা একে তো দেশের বাইরে তারপর ভাই নিখোঁজ শুনলে হয়তো টেনসড হয়ে যাবেন, তাই খালি বলেছি উনি ছুটিতে আছেন, কিন্তু আমাদের একটা বিশেষ দরকার তাই ওনার সঙ্গে কনট্যাক্ট করা দরকার, আর ওনাকে এখন ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই যদি অন্য কোন নম্বর থাকে যাতে আমরা যোগাযোগ করতে পারি ”

“তাহলে কাল ওনাদের ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা আমাদের করতেই হবে। তা ভদ্রলোকের বাড়ি কোথায়?”

“আমাদের কাছে ঠিকানা রয়েছে হেলেন কেলার সরনী, আলিপুর মিন্টের কাছে”

“ভদ্রলোকের নাম কি?”

বিকাশ চৌধুরীর উত্তরে অনেক দিন বাদে এই উনপঞ্চাশ বছর বয়সে আমার গায়ের রোম গুলো এক বারের জন্য খাড়া হয়ে উঠল, বেশ কাটা কাটা স্বরে তার নামটা বললেন “অসিমাভ ভট্টাচার্য”

“মানে যিনি উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ে চাকরী করতেন, মাঝেরহাটে থাকেন, গত মাসে আপনাদের কোম্পানী জয়েন করেছেন?”

“হ্যাঁ, স্যার, আপনি চেনেন ওঁকে?”

“কিন্তু ওনার তো শিলিগুড়ি যাওয়ার কথা, আপনাদের নাকি ব্র্যাঞ্চ অফিস শুরু হচ্ছে, কি সব কাগজপত্র নিয়ে তিনদিন আগে উনি শিলিগুড়ি গেলেন তো!”

“শিলিগুড়ি?” বিস্ময়ে হতবাক বিকাশবাবু আমার দিকে চেয়ে আছেন।

“কেন? যাওয়ার কথা ছিল না?”

“শিলিগুড়িতে তে আমাদের কোন ব্র্যাঞ্চ অফিস নেই, আর মিঃ ভট্টাচার্যকে তো কোথাও পাঠানো হয়নি। তিনি তো এই সবে জয়েন করলেন”



[৪]


রিজওয়ান, অলোক দুজনেই আমার সঙ্গে বেরোল। বিকাশ চৌধুরীকে সাথে নিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘ভারত লাইফ’ এর তারাতলা ব্র্যাঞ্চ অফিস মানে যেটা অসিমাভর অফিস, সেখানে গিয়ে আমাদের যাবতীয় ডিটেল নিতে হবে। তারপর সেখান থেকে ওঁর মাঝেরহাটের বাড়ী। নির্ভীককে আমি বলে রাখলাম, এটা যদিও বোঝা যাচ্ছিল কিছু একটা রহস্য আছে তবে অসিমাভকে আমরা এখন কাস্টডিতে নেব না। খালি চোখে চোখে রাখতে হবে, উদ্দেশ্যটা জানা দরকার। অপরাধ না করলে কেউ অপরাধী হয় না, কিন্তু আমাদের জানতে হবে তাঁর মোটিভ টা কি? অফিসে না জানিয়ে আমাদের কাছে মিথ্যে বলে লোকটা শিলিগুড়ি গেল কেন? তাহলে কি এই হুমকি চিঠির পেছনে আরো কিছু গোপন রহস্য আছে? যে গুলো আমরা এখনো জানি না!


ঘন্টা খানেকের তদন্তের পর আমরা যেটা বুঝলাম, জনৈক যে ভদ্রলোককে আমরা অসিমাভ ভট্টাচার্য বলে চিনেছি, নির্ভীক এবং শিলিগুড়ি থানার পুলিশেরা মিলে যে মানুষটিকে গত দুই দিন ধরে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে তিনি আসলে ‘অসিমাভ ভট্টাচার্য’ নন। প্রথমটায় বিশ্বাস করতে কঠিন হলেও এটা সত্যি, তিনি এক সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। কারন অসিমাভর ফটো এবং চেহারার আরো বিবরন যা জানলাম তাঁর সাথে সেই মানুষটির কোন মিল নেই। কিন্তু তিনি যা ইনফরমেশন আমাদের দিয়েছেন সেগুলো কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল নয়। যেমন অসিমাভ এর উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ে চাকরী করে এক বছর হল কলকাতায় এসেছেন। কিন্তু আরো কয়েকটা ইনফরমেশন জানানো দরকার, যেগুলোর জন্য রহস্যটা যেন আরো খানিকটা জালবিস্তার করল। এক, অফিসের অন্য লোকেদের কাছে শুনলাম অসিমাভ সিগারেট খাননা, সুতরাং সিগারেটের প্যাকেটের গপ্পটা নেহাত গ্যাঁজা, দুই অসিমাভ মোটেই খুঁড়িয়ে হাটেন না, আমাদের থানায় যে মানুষটি এসেছিলেন তিনি কিন্তু বেশ খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন, আর তিন যেটা সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট অসিমাভর ডান হাতে ছটা আঙ্গুল। সেটাই তিনি তাঁর শরীরে বিশেষ আইডেন্টিটি মার্ক বলে অফিসের ফাইলে উল্লেখ করেছেন। আমার ভালো করে মনে আছে, যে মানুষটি আমাদের কাছে তিনদিন আগে এসেছিলেন তাঁর দু হাতেই কিন্তু পাঁচটা করেই আঙ্গুল ছিল। রিজওয়ান বলল, অবশ্য আমার মাথায় ও এসেছিল, হুমকি চিঠিগুলোতে আমরা যে ছয় আঙ্গুলের ছাপ পেয়েছি সেটা কি তাহলে অরিজিন্যাল অসিমাভর?


আরো দেখলাম, অফিসের খাতায় অসিমাভর ফাইলে স্থায়ী ঠিকানা বলে যেটা লেখা আছে সেটা শিলিগুড়িতে ইংলিশবাজারের কাছে একটি ঠিকানা। বুঝতে পারছিলাম না, এটাকে পুরো ব্যাপারটার সাথে কোন ভাবে লিঙ্ক করা যায় কি না? সিচুয়েশনটা পালটে গেল, নির্ভীককে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখতে হবে। ওকে একটা ফোন করলাম, কিন্তু বেজে গেল, ধরল না। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে একটা কিছু ক্রাইম হতে চলেছে। শিলিগুড়ি থানায় ফোন করলাম, শুনলাম নির্ভীক বাইরে ডিউটি তে রয়েছে, ফিরলে ওরা জানাবে। আমার ওপরওয়ালাদের এই ব্যাপার টা জানাতে হল, আমাদের এই রকম সম্পূর্ণ বোকা বনে যাওয়ায় তাঁরা নিশ্চয়ই খুশী হননি। আমার অনেক রকম আদেশ এবং উপদেশ এল, কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারছি না, আমার কি করার ছিল। পুলিশে কমপ্লেন করতে এলে আমরা তো পরিচয় পত্র জানতে চাইনা!


ভাস্করকে ফোন করে ডেকে নিয়েছিলাম। প্রথমদিনে মাঝেরহাটে গিয়ে ঐ তদন্ত করেছিল, সুতরাং প্রাথমিক ব্যাপার গুলো ওর জানা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। ‘ভারত লাইফ’ এর অফিস থেকে বেরোতে প্রায় সন্ধ্যে সাতটা হয়ে গেল। সেখান থেকে আমরা পৌঁছলাম মাঝেরহাটে অসিমাভর বাড়ি। তখন প্রায় সাড়ে আটটা হয়ে গেছে। সত্যি বলতে আমরা একটু কনফিউসড হয়ে পড়েছিলাম, কি করা যায়? আমি একবার লালবাজার থেকে পারমিশন নিয়ে নিয়েছিলাম, সেই রকম ঠিক হলো। সত্যি বলতে আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। এদিকে অসিমাভর অফিসে খবর নেই, তাঁর ফোন সুইচড অফ, দশ দিন ধরে মানুষটা বেপাত্তা, হয়তো তিনি কোন বিপদে পড়েছেন। আবার তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্য একজন নানা কাজ করে চলেছে, যে কোন সময়ে সে একটা অপরাধও করতে পারে। সুতরাং আর দেরী না করে আমরা দরজাটা ভেঙে ফেললাম। অসিমাভর অফিসের দুই জন কলিগ ছিলেন আর দুজন প্রতিবেশীও এসে গেছিলেন। সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া আমরা বন্ধ দরজা সাধারনত খুলি না। অবশ্য দরজা খুলতে তেমন কষ্ট হয়নি। তেমন বাহুল্য বা প্রাচুর্য কোনটাই নেই, ঘর মোটামুটি গোছানো, দেখে মনে হচ্ছে না কোন অবাঞ্ছিত মানুষ রিসেন্টলি বাড়িতে ঢুকে কিছু তছনচ করেছে। অলোককে বললাম ঘর টা ভালো করে সার্চ করতে, যদি কিছু পাওয়া যায়। ভাস্কর জায়গাটা চেনে, সুতরাং সে বেরিয়ে পড়ল জানা জায়গায় তদন্ত করতে, আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, পাশে রিজওয়ান, এমন সময়ে ফোন বাজল, নির্ভীক ফোন করছে,

“হ্যাঁ বলো”

“আরে, এই অসিমাভ তো শিলিগুড়ি থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেছে?”

“কি বলছ? ভ্যানিশ মানে?”

“হ্যাঁ, ব্যাঙ্ক থেকে তো সে আর ফেরেইনি, সঙ্গে ঐ সিকিওরিটি গার্ড আর আমার পাঠানো হোমগার্ড ওরা দুজনে বাইরে বসেছিল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে তখনো অসিমাভ বাইরে আসে নি, এই সব দেখে ওরা দুজনে ভেতরে ঢুকে খবর নিতে। খোঁজ নিয়ে দেখে অসিমাভ টাকা পয়সা নিয়ে বিকেল তিনটের সময় চলে গেছে”

আমার মুখে কথা আসছিল না, “আর কি জানো, ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় তিরিশ লক্ষ টাকা তুলেছে আজ, সেই করতেই ও এসেছিল এখানে। আমার মনে হচ্ছে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি আসার পেছনে আর কোন কারন নেই। ঐ সব ব্র্যাঞ্চ অফিস টফিস যতো ফালতু কথা। তোমার মিসড কল দেখেছি, কিন্তু তখন এই সব নিয়ে এমন ব্যস্ত ছিলাম, ধরতে পারিনি। এখানে চারদিকে খোঁজ নিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছে এতক্ষণে মাল কেটে পড়েছে! আচ্ছা কি ব্যাপার বলো তো? কিছু ক্রাইম টাইম করে পালায়নি তো? ”

আমার মুখে কথা আসতে সময় লাগল, এর মধ্যে নির্ভীকের বার চার-পাঁচেক ‘হ্যালো’, ‘হ্যালো’, বার দুয়েক ‘কি হলো কোথায় গেলে’, শুনতে হয়েছে, একটু চেষ্টা করতে হল শকটা কাটাতে, “এটা একটা বড় চুরির কেস! আমাদের পুরো বোকা বানিয়ে পালিয়ে গেল লোকটা”

“মানে?”

“ও অসিমাভ নয়, ও বেসিক্যালি একটা চোর। অসিমাভর নাম ব্যবহার করেছে। বাই দ্য ওয়ে, আমরা অরিজিন্যাল অসিমাভর অফিসে এসেছি, সেখান থেকে তার বাড়ি, আমরা সব কিছু দেখলাম। এই লোকটা হুমকি চিঠির বোগাস কিছু গল্প শুনিয়ে আমাদের সহানুভূতি আদায় করল, তোমার কাছ থেকে প্রোটেকশন নিল, তারপর চুরিটা করে পালাল।“

“সেকি? নকল অসিমাভ? আসল অসিমাভকে পেয়েছ?”

“না এখন খোঁজাখুঁজি চলছে, এখনো পাইনি”

“তবে তিরিশ লক্ষ টাকা তো অসিমাভর অ্যাকাউন্ট থেকেই তুলেছে! আমি খবর নিয়েছি সই জাল টাল হয়নি। ”

“অরিজিন্যাল অসিমাভকে না পেলে সেগুলো বোঝা যাবে না! আচ্ছা একটা কথা, ও তোমার থানায় এসেছিল, ওর সাইন নেই তোমাদের কাছে, তাহলে মিলিয়ে দেখা যেত”

“না সাইন তো করতে পারলো না! ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলে প্লাস্টার করা ছিল, তাই সই করতে পারলো না, আমি ও আর জোর করিনি”

মনে পড়ল আমাদের বেহালা থানায় এসেও একই ব্যাপার। আমি খাতায় সাইন করতে বলেছিলাম কিন্তু সে মুহূর্তে ওর হাত থেকে জলের গ্লাস টা মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। আর আমরাও তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আর মাঝখান থেকে ওর সইটা আর নেওয়া হয়নি। এখন বুঝলাম, তাহলে সবটাই প্ল্যান করে করা।

“আচ্ছা শোন, অরিজিন্যাল অসিমাভর ঠিকানা তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি একটু খোঁজ নাও, কিছু পেলে জানিও। আমি এদিকে ইনভেস্টিগেশন কনটিনিউ করছি, তুমিও দেখো যদি টাকাটা ট্র্যাক করতে পারো। আমি তোমাকে পরে ফোন করব, তখন বরং ডিটেলে কথা হবে”, ফোনটা তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলাম। আসলে ফোনটা ছেড়ে দেওয়ার একটা কারন ছিল। অলোক অসিমাভর ঘর থেকে একটা মোবাইল ফোন পেয়েছে, টিভির নীচে ড্রয়ারে রাখা ছিল, স্বাভাবিক ভাবেই ফোনে চার্জ নেই। সে ফোন চার্জ করে যখন অন হল, দেখা গেল এটা অসিমাভর নম্বর, যে নম্বরে দত দশ দিন ধরে তাঁর অফিস থেকে চেষ্টা করা হচ্ছিল। ফোনের হিস্ট্রী চেক করে দেখা গেছে শেষ ফোনটা করা হয়েছে গত শনিবার, নম্বর সেই গোল্ডেন কিচেন, তার মানে সেই সেদিনের খাবার আনার ব্যাপারটা হয়েছিল। রিজওয়ান বলল, “তারমানে স্যার শনিবার গোল্ডেন কিচেন থেকে খাবার এনেছে অসিমাভ, তারপর রবিবার থেকে মনে হচ্ছে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না”

“কিন্তু অসিমাভ গেল কোথায়? অসিমাভর কেউ কোন ক্ষতি করল না তো! রিজওয়ান তুমি একবার থানায় খবর দাও, চিন্ময়বাবুকে বলো আমাদের আর্টিস্টকে ডেকে ঐ লোকটার একটা ছবি আঁকাতে। আমি লালবাজারে খবর করেছি, সমস্ত থানায় আমাদের সে ছবি পাঠাতে হবে, আর ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্ট এও কপি পাঠাতে হবে। আর অসিমাভর বোন কাল দেশে ফিরলে তাঁর কাছ থেকে অসিমাভর ব্যাপারে আমাদের আরো ইনফরমেশন নিতে হবে।“

“কিন্তু একটা সমস্যা আছে স্যার?”

“কেন?”

“ঐ ভদ্রোলোককে আপনি ছাড়া তো ভালো করে কেউ দেখেনি, আপনি ছাড়া তাঁর ছবি কি আঁকা যাবে?”

রিজওয়ান ঠিক বলেছে, আমাকেই ড্রয়িংটা করাতে হবে। আর একটা সিগারেট ধরালাম। গত দুঘন্টায় এই পাঁচ নম্বর, আমার খালি মনে হচ্ছিল একদিন আগে এই বিকাশ চৌধুরী আমার কাছে এলেন না কেন? তাহলে এতক্ষণে নকল অসিমাভকে আমরা চিফ গেস্ট করে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা নিয়ে আসতাম।

“স্যার আমার কিন্তু একটা কথা মনে হচ্ছে”

“বলো”

“আমি খালি ভাবছি লোকটা ইমপোস্টার বুঝলাম, এটাও বুঝলাম হুমকি চিঠির গপ্প ফেঁদে আমাদের খানিকটা সহানুভূতি আদায় করল, কিন্তু শুধু শুধু ইন্দ্রজিৎ মল্লিকের কথা আমাদের বলে গেল কেন? চুরি করাটাই যদি তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হবে তো সে তো কারুর নাম নাও বলতে পারতো! তাহলে সে কি চাইছিল আমরা ইন্দ্রজিতের খবর করি?”

“এটা তো তুমি ভুল বলো নি! ঠিক তো! ইন্দ্রজিতের নামটা না বললেও হতো! সেটা সে বলে গেল কেন?”

“স্যার, ইন্দ্রজিত মল্লিকের ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের জানতে হবে, নয়তো এই কেসটা কিন্তু সলভ হবে না!”

“কিন্তু সেটাই বা জানবে কি করে? এত বছরের একটা পুরোনো কেস, তারপর কোন কেস ফাইল নেই। তুমি একবার তোমার ইনফরমারদের সাথে কথা বলো। আমি বরং আর একবার শ্যামবাজার থানায় কথা বলি, আগে তো পুরো টা জানতাম না। এখন একবার কথা বলে দেখা যায়।”

“স্যার একবার সিআইডি র সঙ্গে কথা বললে হয় না?”

“আমার মনে হয়না ওরা কেসটা নেবে বলে? যে লোকটার নাম পুলিশ ফাইলেই নেই, একটা আইডেন্টিটি বিহীন চোর আর একটা আশি বছরের বুড়োর কথার বেসিসে তুমি কেস ফাইল বানাবেই বা কি করে? ঠিক আছে আমি বলব নিশ্চয়ই, দেখা যাক”

সত্যি আমার মাথায় কিছু আসছিল না, আমাদের পরবর্তী স্টেপ কি হতে পারে? অলোক আবার এল, এবারে হাতে একটা পাতলা খাম, “স্যার, লেটার বক্সে একটা ডেলিভারি কনফারমেশনের স্লিপ এসেছে, বুঝতে পারছি না, কোথা থেকে এসেছে। এটা একটু দেখুন তো!”


খামটা খুললাম, শর্মা মুভার বলে কোন কোম্পানী থেকে আসা সেই খাম, খামের ওপর ঠিকানা লেখা শেক্সপীয়র সরনী, ভেতর থেকে দুটো কাগজ বেরোল, প্রথমটা একটা স্লিপ, দেখে একটা অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ লাগল, সেটা ভারতীয় রেলের থেকে আসা। আর দ্বিতীয়টা একটা হাতে লেখা ক্যাশ মেমো, যেখানে বোঝা যাচ্ছে অসিমাভ কিছু পাঠিয়েছিলেন পার্সেল করে, এটা তার খরচার হিসেব। পড়ে যা বুঝলাম, যেটা পাঠানো হয়েছিল সেটার জন্য কোন বড় সাইজের প্যাকিং বক্সের প্রয়োজন হয়েছিল। আর খুব সম্ভব এটাকে পাঠানোর জন্য ট্রেনে ব্রেক ভ্যান বুকিং করতে হয়েছিল। নাহলে রেলের তরফ থেকে স্বীকৃতি পত্র থাকবেই বা কেন? আর সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট পার্সেলটা কিন্তু পাঠানো হয়েছে অসিমাভর স্থায়ী বাসস্থানে, শিলিগুড়ির সেই ইংলিশবাজারের ঠিকানায়। তারিখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই বিল তৈরি হয়েছে সোমবার, মানে আজ থেকে তিনদিন আগে। এটা তাহলে আর একটা রহস্য। তিনদিন আগে অসিমাভর মুভারের প্রয়োজন হল কেন? এইতো বছর খানেক হল তিনি কলকাতায় এসেছেন, তাও আবার নতুন চাকরী? তাহলে এই বড় সাইজের প্যাকিং বক্সে করে কি ই বা পাঠানো হল?


[৫]


আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল অসিমাভকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্ট এসে পড়েছে। তাঁরাও আমাদের সঙ্গে তদন্তে নেমেছেন। এদিকে নকল অসিমাভ মানে যে লোকটা আমাদের বোকা বানিয়ে শিলিগুড়ি থেকে তিরিশ লক্ষ টাকা নিয়ে কেটে পড়েছে তাকেও পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন থানায় খবর করা ছাড়াও আমাদের অনেক ইনফরমারদেরও জানানো হয়েছে, কিন্তু সেই মানুষটি কেমন যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। অসিমাভর দিদি কলকাতায় এসেছেন, তাঁর কাছ থেকেও আমরা এটা জেনেছি যে অসিমাভর শিলিগুড়ির বাড়ির অস্তিত্বটা সঠিক। অসিমাভর কাকা এখনো সে বাড়িতেই থাকেন। অসিমাভ শিলিগুড়িরই ছেলে, ওঁর বাবা আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে কলকাতায় আসেন চাকরী নিয়ে। তারপর মাঝেরহাটে বাড়ি তৈরি করেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরীর সূত্রে অসিমাভ কলকাতা ছেড়ে বাইরে চলে যায়, তারপর ওঁর বাবা হঠাৎ করে মারা যান। সে সময়ে কলকাতার বাড়ি বন্ধ করে ওঁর মা আবার শিলিগুড়ির বাড়িতে ফিরে আসেন। সুতরাং শিলিগুড়ির সঙ্গে তাঁর কানেকশন টা অনেকদিনের। তাই শিলিগুড়িতে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অসিমাভ পড়াশোনা কলকাতায়, তারপর চাকরী সূত্রে দীর্ঘ দিন কলকাতার বাইরে ছিলেন, তারপর শেষ এক বছর আবার কলকাতায়। কিন্তু তিরিশ লক্ষ টাকা শিলিগুড়ির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা ছিল কেন? তিনি তো শিলিগুড়িতে থাকতেনই না! দিদি ও কিছু বলতে পারলেন না!


আরো খবর আছে, শর্মা মুভার জানিয়েছে দশ বাই আট সাইজের একটা পার্সেল পাঠানো হয় গত সপ্তাহে। উল্লেখ্য সেই পার্সেলের ওজন ছিল একশো দশ কেজি, শর্মারা সাধারনত প্যাকিং করেন না, সুতরাং সে বাক্সে কি ছিল সেটা তাঁদের জানা কথা নয়। অবশ্য ইন্সিওরেন্সের প্রয়োজনে যখন জানতে চাওয়া হয় ‘ভেতরে কি আছে’ তখন তাঁদের বলা হয়েছিল তাতে আছে মূলত বই, ফাইল এবং অফিসের সামগ্রী। এদিকে অসিমাভর অফিসের কলিগ বা অসিমাভর দিদি এবং শিলিগুড়ির আত্মীয়দের সাথে কথা বলে আমরা যেটা জেনেছি, বই পড়ার আগ্রহ অসিমাভর কোনকালেই ছিল না! আর তাঁর বাড়ীতে একশো দশ কেজি ওজনের বই থাকাটা সকলেরই ধারনার অতীত। তাহলে প্রশ্ন হল, কি পাঠানো হয়েছিল? শর্মারা আরো জানিয়েছেন, তাঁরা সাধারনত ট্রাকে করে জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পাঠান। তবে এক্ষেত্রে অসিমাভ বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেন, ট্রেনের মাধ্যমে পার্সেলটিকে পাঠানোর জন্য। ঘটনাচক্রে সেই পার্সেল ট্রাকে চড়ানোর সময় যিনি মূলত দায়িত্বে ছিলেন তাঁর সাথেও আমার কথা হল। তিনি জানতে চাওয়ায় অসিমাভ এও বলেন, তাকে কলকাতার বাইরে যেতে হবে। নাহলে তিনি নিজেই এটা ট্রেনে চড়িয়ে দিয়ে আসতেন। সুতরাং এইক্ষেত্রে শর্মারা কেবল কুরিয়ার এজেন্টের কাজ করেছেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, শর্মাদের কাছে নিজের আইডেন্টিটি প্রমান স্বরুপ অসিমাভ নিজের প্যান কার্ড দেন। তার কপি ও আমরা অফিসে দেখলাম। ফ্রেইট ট্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, দিন দুই বা তিনের মধ্যে সেই জিনিস নিউ জলপাইগুড়িতে পৌঁছবে। আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি।


আর একটা খুব দরকারী কথা। যে মানুষটা অসিমাভ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আমাদের থানায় এসেছিল তারপর শিলিগুড়ি থানায় গিয়ে পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল তার একটা পোরট্রেট আমরা করেছিলাম আর একটা শিলিগুড়ি থানা বানিয়েছিল। আশ্চর্যের এই যে, দুটো ছবিতে দুটো ভিন্ন মানুষটির মুখ ফুটে ওঠে। তাই সেই লোকটার আসল চেহারা কেমন সেটাও আমাদের জানা হয়নি। আর এটাও পরিষ্কার সে নিশ্চয়ই মেকাপ অথবা ছদ্মবেশের সাহায্য নিয়েছিল। রিজওয়ান আবার বলল, “স্যার, কোনো দল এই কাজটা করল না তো? হয়তো যে আমাদের থানায় এসেছিল আর যে লোক টা শিলিগুড়ি গেল দুটো লোক হয়তো আলাদা!”


ওদিকে ইন্দ্রজিত মল্লিককে নিয়েও আমরা কিন্তু বেশী দূর এগোতে পারলাম না। প্রত্যাশিত ভাবেই ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টকে অবশ্য ইন্দ্রজিতের কেস নিয়ে তেমন চিন্তিত দেখলাম না। তাঁদের যাবতীয় চিন্তা অসিমাভকে খুঁজে পাওয়া এবং নকল অসিমাভকে ধরা। কিন্তু আমি জানি একটা সুত্র আছে, আর রিজওয়ানও ঠিক বলেছে। সুত্র না থাকলে নকল অসিমাভ এমনি এমনি ইন্দ্রজিতের নামটা আমাদের বলত না। কিছু ইনফরমেশন এসেছে, জানি না সেগুলো কতটা কাজের। গত তিনদিনের অক্লান্ত চেষ্টায় আমরা একটা জিনিস জেনেছি যে, অতি সুকৌশলে আমাদের পূর্বসূরিরা ইন্দ্রজিতের সমস্ত ইনফরমেশন লোপাট করে দিয়েছেন। শ্যামবাজার স্ট্রীট থানায় আমরা তন্নতন্ন করে পুরোনো নথি, ফাইল খুঁজেছি কিচ্ছু পাইনি। দিব্যেন্দুবাবুর আমাদের সাহায্যও করছেন, ওনার সঙ্গে কাল এই নিয়ে বেশ খানিকক্ষন কথা হয়েছে। আরো জেনেছি, ২০০০ সালে শ্যামবাজার স্ট্রীট থানার দায়িত্বে ছিলেন অসিত সরকার যিনি গত বছর মারা গেছেন, সেকেন্ড অফিসার ছিলেন শ্যামল সাহা, তিনিও বছর দুয়েক হল আর নেই। দিব্যেন্দুবাবু খবর নিচ্ছেন, সেই রকম পুরোনো কাউকে পেলে আমাদের জানাবেন।


পাঁচ দিন নানান চেষ্টার পর যখন তেমন কোন প্রোগ্রেস হল না, খানিকটা হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হল। রিজওয়ান তার ইনফরমারদের সূত্রে অনেক চেষ্টা করছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হল না এখনো। আমার উর্ধ্বতন এক অফিসারের সঙ্গে কথা শেষ করে থানা থেকে একটু বেরোলাম, সকাল থেকে লোডশেডিং, থানার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম। আমার ফোনটা বেজে উঠল, দেখি রিজওয়ান, “কি হল? কিছু পাওয়া গেল?”


“স্যার, কুমারটুলি এলাকায় এক কাঠের দোকানের মালিক বিনোদ গাঙ্গুলী, আমাদের এক ইনফরমারের মাধ্যমে কথা হল, একটু আগে। অফিসিয়ালি কিছু জানাতে চাননা, যেটা বুঝলাম ইন্দ্রজিতের কেসটা এখানেই ধামাচাপা দেওয়া হয়, খানিকটা লালবাজারের চাপে। ওষুধের একটা কোম্পানী, জাল ওষুধ বানাতো, ইন্দ্রজিত সেটা জেনে ফেলে, এমএলএ এবং কাউন্সিলারের ছেলেও ইনভল্ভড ছিল। আমরা সেই ত্রিদিব বাবুর কাছে যেটা শুনেছি সেটা ঠিক, ইন্দ্রজিত খুব ভালো, সরল, সাদাসিধে ছেলে, পুলিশ ফাঁসিয়ে দেয়। প্রথমে ড্রাগসের ব্যবসার চক্করে, তারপর জাল ওষুধ বিক্রী করার অপরাধে ফাঁসিয়ে ওকে জেলে ঢোকায়, তারপর হঠাৎ একদিন বেলে ছেড়ে দেয়। শুনলাম যারা ছাড়িয়েছিল তারাই ওকে মার্ডার করে, তারপর আত্মহত্যা বলে চালায়। দু চার দিন বাদে বেলগাছিয়া ব্রিজের কাছে বডি পাওয়া যায়, মাথার পেছনে একটা গভীর ক্ষত। সুইসাইড ই যদি হবে তাহলে ক্ষতটা হল কেন? যা হোক, কিছু কাছের বন্ধুও নাকি জড়িয়ে ছিল, তাদেরকে পয়সা খাইয়ে চুপ করিয়ে দেয়। আর একজন দুজন যারা সিস্টেমে থেকে ব্যাপারটায় থাকতে চাননি, তাদেরকে প্রানভয় দেখানো হয়। গাঙ্গুলীবাবু কোন নাম নেন নি, আঠেরো বছর আগে যারা ঐ কাজ টা করেছিল তাদের বেশীর ভাগ আজ কোথায় তিনি জানেন না! তাছাড়া এই সত্তর বছর বয়সে এসে আর নতুন করে দুশমনি করতে চান না”

“ইন্দ্রজিতের ডেথ সার্টিফিকেট পেয়েছ?”

“হ্যাঁ পেয়েছি। সুইসাইডাল ডেথ সেই রকম লেখা আছে, আর এও লেখা আছে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে। তবে গাঙ্গুলীবাবুর কথায় যে ট্র্যাকে ওর মৃতদেহ পড়েছিল সেই ট্র্যাক দিয়ে সাধারনত ট্রেন চলতই না। আর চললেও খালি মাল গাড়ী। তারপর শুনলাম মুখটা একেবারে থেঁতলে গেছিল, মনে হয় বেলগাছিয়া ব্রিজের ওপর থেকেই বডিটা তিরিশ মিটার নীচে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল“

“তাহলে অফিসিয়ালি আর আমাদের কিছু করার নেই!”

“ঠিক স্যার, ইন্দ্রজিতের ব্যাপারে আমাদের আর কিছু করার নেই”

“ঠিক আছে, তুমি চলে এসো”

“স্যার আর একটা কথা, এই ঘটনা ঘটে ২০০০ সালের শেষের দিকে। তার বছর খানেক বাদে একজন অ্যাডভোকেট নাম সঞ্জয় গোমস যিনি পুরো ঘটনাটা আবার শুরু থেকে ইনভেস্টিগেট করছিলেন, হয়তো কেসটাকে লড়বেন বলে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁকে কে লাগিয়েছিলেন বা কোথা থেকে তিনি এলেন বা তাঁর বাড়ি কোথায় এসব কিছুই জানা যায়নি। তবে তিনিও কয়েক মাস হঠাৎ করে কেমন উধাও হয়ে যান।”

আমার কিছু বলার আগেই আমার দ্বিতীয় নম্বরটা বেজে উঠল, এটা আমার থানার নম্বর, নির্ভীকের ফোন। হয়তো কিছু জানতে পেরেছে, রিজওয়ানকে লাইনটা ধরতে বলে নির্ভীকের ফোনটা আমি নিলাম।

“কি ব্যাপার?”

“নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে বলছি, ফ্রেইট ট্রেন এসে গেছে, অসিমাভর পার্সেল বক্স এসে গেছে, কি আছে জানো?”

“কি?”

“গলা টিপে খুন করা একটা ডেডবডি, মাথার পেছনে একটা গভীর ক্ষত, যতটা বুঝছি সেটা অসিমাভর বডি”

আমার সারা শরীর টা কেমন ঝনঝন করে উঠল, জানিনা মুখে কিছু কথা এলো কি না, নির্ভীক আবার বলল – “এমন করে প্যাকিং করেছে, দেখে মনে হচ্ছে একটা প্যাকিং বাক্স, কিন্তু ভেতরে কফিনের শেপে রাখা বডি, আর একফোঁটা ব্লাড বাইরে আসেনি, মনে হচ্ছে কেমিক্যাল অ্যাবসরবেন্ট কিছু দিয়েছিল, তাতে পুরো ব্লাড শুষে নিয়েছে। মনে হচ্ছে ধারালো কিছু নিয়ে মাথায় মেরেছে তারপর গলা টিপে খুন, বই বা অন্য অফিস মেটিরিয়াল কিচ্ছু নেই, খালি প্যাকিং মেটিরিয়াল, ঐ জন্য অতো ওয়েট হয়েছিল। আর একদম এয়ার টাইট করে প্যাকিং করেছে, বডিটার এখনো সম্পূর্ণ পচন হয়নি, তবে টোটাল ব্যাপার টা খুব বিশ্রী। আর হ্যাঁ, হাতের ছাপ পাইনি, আমি বাকী ডিটেল পাঠাচ্ছি”

নির্ভীক আরো কিছু বলছিল, আমার মাথায় কিছু আসছিল না, আর একটা ফোন থেকে রিজওয়ানের ‘হ্যালো’ ‘হ্যালো’ ও শুনছিলাম, উত্তর করা হয়নি।



***


আমার গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে গেছিল। এক সম্পূর্ণ ভাবে বোকা বনে যাওয়ার গল্প, আর ধাঁধাঁর জালে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। শেষ হয়ে গেলে বরং ভালোই হত। জানতাম না আরো কিছু বাকী আছে। এর মধ্যে এক মাস কেটে গেছে, পুজো আসব আসব করছে। সকাল থেকে খুব টায়ার্ড লাগছিল আজ, ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাব। চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম, সাধারনত সিগারেট টা শেষ করে বাইকে স্টার্ট দিই। সিগারেট টা ধরিয়েছি, ঠিক এমন সময়ে আমার ফোনটা বেজে উঠল, অজানা নম্বর। বলতে যাচ্ছিলাম “বেহালা থানা থেকে,”

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে ওপাশ থেকে এল অপরিচিত গলা ভেসে এল, “জানি, আপনি বেহালা থানার ওসি তো! আপনার সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে”

‘আবার দরকার’ স্বগতোক্তি শুনে মনে মনে হাসি পেল, “কে আপনি?”

“আমি এক সময় চাকরী করতাম, কিন্তু এখন আর করি না, এখন খালি কবিতা আব গান এই নিয়ে আছি”

একে আমার মাথা গরম ছিল, তারপর এই রকম কথা ঠিক সহ্য হলো না,“হেঁয়ালি ছাড়ুন, কি বলছেন পরিষ্কার করে বলুন তো!”

“না না হেঁয়ালি নয়, খালি ভাবছি আপনার সঙ্গে কি করে দেখা করা যায়”

“কেন? আপনি চলে আসুন আমাদের থানায়।”

“আসতে তো আমি পারবো না! তবে আপনারা আসতে পারেন, আসুন চলে আসুন। আমি বোধহয় আপনাদের সাহায্য করতে পারবো”

“আপনার নাম কি?”

“আমি কবি”

“বেশ বুঝলাম, কিন্তু একটা নাম তো থাকবে!”

“আমার নাম? সেটা না তো জানাতে পারবো না!”

“কেন?”

“তাহলে তো কেউ আমার কবিতা পড়বে না!”

আমার রাগের পারদ টা ক্রমে বাড়ছিল, “কি যাতা বলছেন? আপনি কোন ব্যাপারে কথা বলতে চাইছেন?”

আমার কথার উত্তর না দিয়ে এক সম্পূর্ণ অচেনা ভঙ্গীতে ওপাশের ভদ্রলোক একটি গান গাইতে শুরু করলেন, পুরোনো বাংলা গান ‘কখনো বা ডার্লিং কভু তুমি জননী কখনো না স্নেহময়ী সিস্টার’, কয়েক সেকেন্ডের বিরতি তারপর গলার স্বর নামিয়ে বললেন, “আনন্দআশ্রম, ডায়মন্ড হারবার রোড, মানসিক চিকিৎসালয়, পুলিশের বেশে আসবেন না” আবার গান শুরু হল ‘হয়তো কখন যদি দেবদাস হয়ে কেউ বুকটাতে অকারনে চোট পায়, পার্বতী নামে কেউ তার ছিল জীবনে’। আবার গলা নামিয়ে এবারে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “চলে আসুন এখানে এসে বলবেন পাগলা কবির সঙ্গে দেখা করবেন, আমি অপেক্ষায় থাকবো। আবার গান ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’ তারপর আবার শুনলাম, “বলবেন না যেন আমি ফোন করেছিলাম”

মানসিক হাসপাতাল! তাহলে কি কোন মানসিক ভারসাম্যহীন কারুর সাথে কথা বলছিলাম? অথচ আমি অযথা রাগ করছিলাম, “আপনি কাকে সাহায্য করতে চাইছেন?”

পরের কথাটা সম্পূর্ণ হেঁয়ালি লাগল আমার, “মাইকেল লিখেছিলেন মেঘনাদবধ কাব্য, আর আমি লিখেছি বিভীষণবধ! চলে আসুন, কপিরাইট দিয়ে দেব”

আরো কিছু বলছিলাম কিন্তু খেয়াল হতে বুঝলাম ফোনটা কেটে গেছে। তারপর তিনবার চেষ্টা করলাম, ফোনটা কিন্তু আর লাগল না। মানসিক চিকিৎসালয় থেকে ফোন করেছে হয়তো মানসিক রোগী! কেমন ছন্নছাড়া, অসংলগ্ন কথাবার্তা, তবে খবর নিয়ে দেখলাম আনন্দআশ্রম বলে একটা মানসিক চিকিৎসালয় কিন্তু আছে। কৌতূহলের দুটো কারন ছিল, এক আমার নম্বর জানলো কি করে? আর দুই, কি ব্যাপারে সাহায্য করতে চায়? তাছাড়া পুলিশদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ কি কখনো থাকতে নেই?


আরো দুদিন বাদে সেটা ছিল শুক্রবার, বিকেল বেলা থানা থেকেই বেরিয়ে পড়লাম, যেমনটা বলা হয়েছিল তেমনই গেলাম, সাদা পোশাকে, একাই গেলাম। আধ ঘন্টা লাগল পৌঁছতে, ডাঃ চক্রবর্তী এখানকার প্রধান ডাক্তার, যারা আসেন প্রথম ওনার সঙ্গে দেখা করতে হয়। উনি পারমিশান দিলেই তবে কোন পেশেন্টের সঙ্গে দেখা করা যায়। আসলে পেশেন্টের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা বুঝে তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও পুলিশের পোশাকে যাইনি, তবে আমি কিন্তু পরিচয় গোপন করিনি, ডাঃ চক্রবর্তী কে বললাম,”আচ্ছা আপনাদের এখানে কেউ আছেন যিনি নিজের পরিচয় দিলেন দেন কবি বলে”

“ও হ্যাঁ, অনিরুদ্ধ! কি দরকার তার সাথে?”

“আসলে একটা কেসের ব্যাপারে ওর নামটা জানলাম, শুনলাম এই রকম মানসিক হাসপাতালে আছে, তাই একটু দেখা করতে এলাম।”

“কিন্তু কবি তো কারুর সাথে দেখা করে না! আর তাছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গে সব যোগাযোগ তার বিচ্ছিন্ন। ঠিক আছে যখন দেখা করতে চাইছেন, দেখা করেই যান। আপনি একটু বসুন, আমি ওর সাথে একবার কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি”


মিনিট পনের বাদে ডাঃ চক্রবর্তী ফিরলেন, “দেখুন কবির তো আপনাকে চিনতে পারার কোন কারন নেই। তবে ও রাজী হয়েছে দেখা করতে, দশ মিনিট কথা বলেই যান, হ্যাঁ ও আবার মুখোমুখি কারুর সাথে কথা বলে না, মাঝে একটা পর্দা থাকে। আসলে এরা তো অসহায়, এদের সাথে কথা বলার কেউ নেই, এদের কথা শোনার ও কেউ নেই, ভাবা তো ছেড়েই দিলাম। যাকগে, আপনারা পাশের ঘরটায় আসুন, একপাশের বেডটায় ও বসবে, আর একটাতে আপনারা, মাঝখানে অবশ্যই একটা আনব্রেকেবেল গ্লাস ডোর থাকবে। যদিও কবির দিক থেকে সে রকম কোন ভয় নেই তবে আমাদের একটা মিনিমাম প্রোটেকশন নিতেই হয়। তবে কথা আপনি শুনতে পাবেন আর আপনার কথাও ও শুনতে পাবে। আমি ও থাকবো, চিন্তা নেই। আসুন”

বাকী অ্যারেঞ্জমেন্ট শেষ হতে আরো দশ মিনিট লাগল, কথামতো অনিরুদ্ধকে অন্য বেডে বসানো হল, এটা একটা ঘর যেটাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে একটা কাঁচের দরজা দিয়ে। ঘরের দুটো দরজা, অনিরুদ্ধকে পেছনের দিকের দরজা দিয়ে ভেতরে নিয়ে আসা হল। আমি কারুর মানসিকতাকে ছোট বা অবহেলা করতে চাইনা কিন্তু যেটা দেখলাম সেটা আগে কখনো দেখিনি। অনিরুদ্ধ ঘরে এলেন তার মুখ খানা কালো কাপড়ে বাঁধা। স্বাভাবিক ভাবেই আমি কোন কারন জানতে চাইনি। ডাঃ চক্রবর্তী আমার পাশেই ছিলেন, প্রথম কথা বললেন – “অনিরুদ্ধ শোনো, তোমার এক বন্ধু তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তুমি একটু কথা বলবে বন্ধুর সঙ্গে?”

প্রায় কুড়ি সেকেন্ডের বিরতি, তার জবাবটা আমাদের কানে এল, এক কলি গানে “সে আমার গোপন কথা শুনে যা ও সখী, ভেবে না পাই, বলব কি সে আমার গোপন কথা”

ডাঃ চক্রবর্তী সস্নেহে বললেন, “বেশ বলো তোমার গোপন কথা”

দশ সেকেন্ডের বিরতির পর আবার শুনলাম, সেই গলা “গোপন কথা সবার সামনে বলে নাকি?”

“ঠিক আছে আমি ঘরের বাইরে যাচ্ছি, তুমি কথা বলো”

ডঃ চক্রবর্তী আমার কাঁধে হাত রাখলেন, ওঁর মৃদু স্পর্শতে বুঝলাম তিনি বলতে চাইছেন, ‘চিন্তা নেই, আমি ঘরের বাইরে আছি’। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে তিনি বাইরে চলে গেলেন।

কয়েক সেকেন্ড কোন কথা নেই, এবারে আমাকে কথা বলতে হল, “বলুন কি বলতে চান?”


আমার চোখের পলক সরানোর আগেই অনিরুদ্ধের চোখ থেকে কালো কাপড়টা সরে গেল, বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমাদের সামনে যে মানুষটি বসে আছে মাসখানেক আগে তিনি আমাদের থানায় এসেছিলেন আর নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘অসিমাভ ভট্টাচার্য’ নামে। অজান্তে আমার মুখ দিয়ে কি কথা বেরোল জানিনা, সেই স্বর শুনলাম যেটা আমার কানে আর মনে বিঁধে আছে, “ইন্দ্রজিত মানে মেঘনাদ। ঠিক লেখেন নি মাইকেল, মেঘনাদেরা মরে না, তাদের মারা যায় না, সমাজের বিভীষণদের বধ করতে তারা যুগে যুগে ফিরে আসে। নিজেরা না পারলে সঞ্জয় গোমসের মত মানুষেরা সতের বছর অপেক্ষা করে সুযোগের জন্য। দরকারে পাগলা গারদে আর দশটা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সামনে। পাঁচ লক্ষ টাকার বিনিময়ে একটা প্রাণ বিক্রি হয়েছিল, আর একটা মেয়েকে পুরো পাগল করে দেওয়া হয়েছিল। চুরি করা তিরিশ লাখ টাকা এখন সেই রকম মানসিক রোগীদের জন্য খরচা হবে। পুলিশ খালি একাই মারতে পারে না? পুলিশকে মারতে নেই, এই রকম উলঙ্গ করে রাস্তায় ছেড়ে দিতে হয়। দেখি কি করতে পারেন এবার?”

চোখের পলকে আবার কালো কাপড় আবার আগের জায়গায় ফিরে এল, ও পাশ থেকে, এবারে একটা গান শুরু হল “শুধু তোমার বাণী নয়গো, হে বন্ধু, হে প্রিয়। মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিয়ো ”

যতটা সম্ভব নিজের রাগ আর ইমোশন কে নিয়ন্ত্রন করে বললাম, “দেখতে চাইছেন তো আমি কি করতে পারি? উঠে পড়ুন, এবারে বেহালা থানায় যেতে হবে”

এবারে গলার স্বরটা অন্য, “ডাক্তারবাবু কোথায়?”

“কাউকে ডেকে কোন লাভ হবে না, উঠুন এবারে, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট”

হয়তো কথা বার্তার আওয়াজ বাইরে পৌঁছে থাকবে, ডাঃ চক্রবর্তী ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকলেন, “কি হল চেঁচামেচি কেন?”

“আপনি জানেন দিস গাই ইজ আ কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে এখন আমায় ডেকেছিল কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে”

ডাঃ চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়ায় জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, “পুলিশরা শুনেছি মানুষ আর জানোয়ারের মধ্যে বিচরন করে, তা করতে করতে আপনি সে রকম হয়ে জাননি তো?”

“ডাঃ চক্রবর্তী, আপনি কিন্তু বিরাট ভুল করছেন। এই লোকটা অসিমাভ ভট্টাচার্য কে একজন কে এক মাস আগে মার্ডার করেছে। ওকে বাঁচাতে গেলে আপনি ও ফেঁসে যাবেন”

“অনিরুদ্ধ মানসিক ভারসাম্যহীন একটি মানুষ, ওকে বাঁচাতে গিয়ে আমি নয় ফেঁসে যাব, কিন্তু ওকে নিয়ে টানাটানি করতে গেলে আপনার কি হবে সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন?”

“ঠিক আছে, দু মিনিট আপনার সাথে একটু পারসোন্যাল কথা, সেটা শুনুন”

ডাঃ চক্রবর্তী আমাকে নিয়ে ঘরের বাইরে এলেন, “ডাঃ চক্রবর্তী এই লোকটা সতের বছর ধরে ড্রামা করছে, নাম সঞ্জয় গোমস, উকিল, সতের বছর আগে একটা মার্ডার কেসে ফাইট করেছিল, সেখানে পারেনি, তাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঘাপটি মেরে বসেছিল এতোদিন, এখানে”

“এত কিছু জানলেন কি করে?”

“ও নিজে আমাকে বলেছে”

“ইমপসিবিল, প্রথমত ওর বাড়ির লোক কে আমি চিনি, ওরা ক্রিশচান নন, তাই ও কখনোই গোমস হতে পারে না! আর দ্বিতীয়ত, এতো গুছিয়ে কথা ও বলতেই পারবে না। ‘কনস্ট্রাকশন অফ থটস’ এটাই তো ওর নেই, এটাই তো ওর প্রবলেম”

“আপনি বিশ্বাস করছেন না, এই কথা গুলো ও নিজে বলেছে?”

“না করছি না, অনিরুদ্ধ যদি মার্ডারার হতো তাহলে সবচেয়ে খুশী আমিই হতাম, কারন জানেন? কারন, এখান থেকে সে বাইরে বেরোতে পারত! এই মানসিক হাসপাতালের মানুষগুলোর জীবন সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা আছে? যাহোক, অনেক দেরী হয়ে গেল, আপনি এবারে বাড়ি যান”

“তাহলে ডক্টর, ও আমাকে দুদিন আগে ফোন করল কেন?”

“ও আপনাকে ফোন করেছিল?”

“হ্যাঁ, ওর ফোন পেয়েই তো আমি”

আমাকে শেষ করতে দিলেন না, “কই আগে তো অন্য কিছু বলেছিলেন। এখন আবার মিথ্যে কথা বলছেন হ্যাঁ? শুনুন, অনিরুদ্ধর কাছে কোন ফোন নেই, ইনফ্যাক্ট, এখানে আমাদের কোন পেশেন্টের কাছেই ফোন নেই।”

“আমার কাছে কিন্তু ফোনের রেকর্ড আছে”

“ঐ ফোনটা যে অনিরুদ্ধ করেছিল তার প্রমান কি? যে মানুষটি এক থেকে নয় সংখ্যা গুলোই ভুলে গেছে সে আপনাকে ফোন করল?”

“বেহালা থানায় কিন্তু আরো দুজন আছেন যারা ওকে দেখেছেন এবং চিনতেও পারবেন”

“তার মানে আপনি বলতে চান অনিরুদ্ধ বেহালা থানায় গেছিল আপনাদের সাথে গপ্প করতে? আর কত মিথ্যে বলবেন? মিথ্যে গল্প মিথ্য সাক্ষী! একজন মানসিক রোগী এখান থেকে কাউকে না জানিয়ে বেহালা থানায় গিয়ে আপনার সঙ্গে গল্প করল তারপর আবার ভালো ছেলের মতো এখানে ফিরে এল। আপনি কি বায়োস্কোপের গল্প শোনাচ্ছেন আমাকে?”

“ডাঃ চক্রবর্তী আমি লাস্ট টাইম বলছি, আপনি কিন্তু ভুল করছেন। আমি কিন্তু লালবাজারে জানাতে বাধ্য হব”

“জানান, আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন, তবে পরেরবার এখানে এসে বিব্রত করলে দিল্লীর সাউথ ব্লকে ফরম্যাল কমপ্লেন যাবে আপনার নামে। তখন আপনি তার ঠ্যালা সামলাতে পারবেন তো? জানেন তো, আমাদের সংবিধানে বলা আছে, হাসপাতালে অকারনে কোন পুলিশি তান্ডব হলে সে পুলিশকে আর আইনের রক্ষক বলা হয় না। অনেক সময় নষ্ট করেছেন, এবারে আসুন। লোকে কেন পুলিশ কে গালাগাল দেয় সেটা আশাকরি বুঝতে পারছেন এবারে? আর হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় খাতায় সই করে যাবেন”

দুই নার্স আর একজন সহকারী ডাক্তারের সঙ্গে অনিরুদ্ধ ওরফে সঞ্জয় গোমসকে ডঃ চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বেশ শুনতে পারছি, ডাক্তার আর নার্সরা বলাবলি করছেন আমার সঙ্গে চেঁচামেচিতে অনিরুদ্ধর শরীর নাকি খারাপ হয়ে গেছে, ওকে ইমিডিয়েটলী কি সব ওষুধ দিতে হবে। আমি এখনো তাকিয়ে আছি, সেই মানুষটার দিকে। এখন কালো কাপড়টা তার মুখ থেকে সরে গেছে। এবারে আমার সঙ্গে সোজা চোখাচুখি হল, পলকহীন চক্ষে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার দুচোখে একটি মিটমিটে হাসি। আর আমার কানে যেন শব্দের অনুরনন হচ্ছে “মেঘনাদেরা মরে না, তাদের মারা যায় না, সমাজের বিভীষণদের বধ করতে তারা যুগে যুগে ফিরে আসে”।




বিন্ধ্যবাসিনী হোটেল, মহাকবি মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ আর কবিগুরুর গানের কয়েক পঙ্কতি ছাড়া বাকীটা পুরোটাই কাল্পনিক। গল্পের প্রয়োজনে যে সমস্ত স্থানের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো সব কাল্পনিক।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮