• অরুণাভ দত্ত

ব্যোমকেশের বিদ্যুৎচমক – বাংলা ডিটেকটিভ সাহিত্যে শরদিন্দুর অবদান

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সীর সাথে পরিচিতি নেই এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। তাই এ ব্যাপারে লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হল বিষয় পরিধিটা একটু বাড়িয়ে নিলে দুপক্ষেরই সুবিধা।আশাকরি সহৃদয় পাঠক একে ধান ভাঙতে শিবের গীত মনে না করে,আমাদের দেওয়া তথ্যগুলিতে রস খুঁজে পাবেন।


শুরুতে উঁকি দেওয়া যাক গোয়েন্দা কাহিনীর উৎস সন্ধানে।সাহিত্য গবেষকদের এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে।কেউ বলেন বাইবেল (ক্যাথলিক কাহিনী সূত্রে, সুসানা নাম্নী এক মহিলার স্নান এর দৃশ্য দেখে দুই বয়স্ক লোক লালসা-বশত তাকে মিথ্যে অভিযোগে দোষী প্রমাণ করতে চাইলে ড্যানিয়েল নামক এক যুবক তাদেরকে আলাদা আলাদা ভাবে জেরা করে সাব্যস্ত করে যে তারা মিথ্যে বলছে কারণ তাদের বর্ণনা র মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।)- আবার কারো মতে ভলতেয়ার এর যাদিগ (zadig) তাঁর যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ (deduction)এর দ্বারা প্রথম গোয়েন্দা কাহিনীর সূত্রপাত করেন। Christopher Pittard এর মতে ১৭৭৩ এ প্রকাশিত Newgate Calendar এই প্রথম ক্রাইম ও গোয়েন্দা গল্পের শুরু। আবার শোভন তরফদার বলেছেন ১৫০০ থেকে ৫০০ খ্রীঃ পূঃ তে লেখা আর্য সাহিত্যে এর আরম্ভ। এব্যাপারে উল্লেখ্য, ঋকবেদের ১০ম মণ্ডল এ সরমা নামের এক কুকুর দ্বারা দেবকুলগন কিছু দস্যুকে ধরতে সক্ষম হন যা ১৫০০ খ্রীঃ পূঃ তে লেখা। এরপর ষোড়শ শতাব্দীর কিছু ইতালিয়ান সাহিত্য ও পরবর্তীতে অ্যালেক্সান্ডার দুমার লেখাগুলিতে ক্রাইম ডিটেকশন এর নজির আছে।


এত গেল বিশ্বসাহিত্যের কথা।আমাগো বাংলাদেশে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় ,পাঁচকড়ি দে,নীহার রঞ্জন গুপ্ত,দিনেন্দ্র কুমার রায়,হেমেন্দ্র কুমার রায় এর হাত ধরে ‘ওভারকোট ও হ্যাট পরিহিত’ রবার্ট ব্লেক,কিরিটী রায় ও অন্যান্যদের সাথে আমাদের পরিচয়।অনেকে হয়ত জানেন না সরলাবালা দাসী সরকার (১৮৭৫-১৯৬১) কে ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা গোয়েন্দা গল্পের লেখিকা ধরা হয়।শৈলবালা ঘোষজায়া এবং প্রভাবতী দেবী সরস্বতীও এ ধারার কিছু গল্প লিখেছিলেন।হেমেন্দ্র কুমার রায় আমার ব্যক্তিগত পছন্দের লেখক এবং উপরিউক্ত সকল লেখকেরই কাহিনী অত্যন্ত সুস্বাদু এবং আমাদের ছোটবেলাকে রঙ্গিন করেছিল। বাংলা গোয়েন্দা গল্পের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এনাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা সত্ত্বেও এখানে বলা বোধহয় অসমীচীন হবে না যে ভারতবর্ষে ডিটেকটিভ সাহিত্যে বাংলা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় তা কিন্ত অপরিণত বলেই বিশেষজ্ঞরা বিচার করেছেন। ইউরোপিয়ান সাহিত্যের উচ্চকিত প্রভাব তো বটেই,কাহিনীর ভাষা ও বিন্যাসও যেন শৈশব থেকে যৌবনে পা দিচ্ছে।শুধু গোয়েন্দা গল্পই কেন, থ্রিলার,কল্পবিজ্ঞান,Dystopian mystery – সব ধারাতেই এই পরিণতি কিন্ত অপেক্ষা রাখে ।


এইখানে,ঠিক এইখানে ১৯৩২ সালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সীর আত্মপ্রকাশ। মোটামুটি ভাবে সাহেবি প্রভাবমুক্ত(এ প্রসঙ্গে পরে আসছি),ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত,আপাদমস্তক এক সংসারী গোয়েন্দার নিদর্শন কিন্ত বিশ্ব সাহিত্যেও খুব বেশি নেই। অনেকে হয়তো বলবেন কাকাবাবু -সন্তু, ফেলুদা, অর্জুন,কর্নেল নীলাদ্রি সরকার,গোগোল,পাণ্ডব গোয়েন্দা আর শবর দাশগুপ্তের কথা। কিন্ত মনে রাখতে হবে কিছুটা কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আর শবর দাশগুপ্তের(এর মধ্যে শেষোক্তজনের কাহিনী সংখ্যা খুবই সীমিত)কথা বাদ দিলে বাকিরা কিন্ত কিশোর সাহিত্যের জন্য লেখা – তাই অপরাধের মাত্রা আর বিষয় বৈচিত্র্যে রত্ন বা মূল্যবান দ্রব্য চুরি,ভুলবশত খুন বা জালিয়াতির আধিক্য দেখা যায়। সেখানে শরদিন্দুর প্রথম কাহিনীতেই রক্তাক্ত সিরিয়াল খুন আর কোকেন কারবারির সূত্রপাত।দেহব্যবসা,পরকীয়া,জারজ সন্তান ইত্যাদি সব বিষয়ই শরদিন্দু বাবুর অবাধ ও স্বচ্ছন্দ আনাগোনা।নারায়ণ সান্যাল এর কাঁটা সিরিজ ও ব্যারিস্টার পি কে বাসু কে নিয়ে তর্ক চলতে পারে কিন্ত নারায়ণ বাবু নিজেই তার উপন্যাসগুলিতে বিদেশী সাহিত্য (বিশেষত আগাথা ক্রিস্টি এবং স্ট্যানলি গার্ডেনারের প্যারি ম্যাসন) এবং খোদ শরদিন্দু বাবুর প্রভাব স্বীকার করে নিয়েছেন।হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় আবার পারিজাত বক্সী নামে এক গোয়েন্দার কথা লিখেছেন যে ব্যোমকেশ এর কাল্পনিক আত্মীয়, সম্ভবত ভাগ্নে। এ প্রসঙ্গে অদ্রীশ বর্ধনের ইন্দ্রনাথ রুদ্র আর বিমল কর এর আপাদমস্তক বাঙালি কিকিরাকে উল্লেখ না করা অপরাধ।আমার মতে কোন বঙ্গ গোয়েন্দা যদি ব্যোমকেশ এর সাথে তুলনীয় হতে পারেন তবে তা ইন্দ্রনাথ।কিন্ত ধারাবাহিকতা আর জনপ্রিয়তাতে ব্যোমকেশ অবশ্যই এগিয়ে।তবে কে সেরা গোয়েন্দা বা সত্যান্বেষী সে তর্কে না গিয়ে বলা যায় যে ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে সবচেয়ে বেশিবার আবির্ভূত গোয়েন্দা চরিত্র নিঃসন্দেহে ব্যোমকেশ। শরদিন্দুবাবুর চলচ্চিত্রের গল্প ও স্ক্রিপ্ট লেখায় সাবলীলতা,যা কিনা তার ব্যোমকেশ কাহিনীতেও পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান, এর একটা প্রধান কারণ হতে পারে।


এবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক কিছু দরকারি সন তারিখ। শরদিন্দু বাবু ১৯৩২-৩৩ থেকে ১৯৩৬ অব্ধি টানা ব্যোমকেশ এর গল্প-উপন্যাসগুলি লিখেছেন।সত্যান্বেষী দিয়ে শুরু আর ব্যোমকেশ বরদা দিয়ে শেষ। রচনাকাল অনুসারে ব্যোমকেশ সিরিজের প্রথম গল্প পথের কাঁটা (৭ই আষাঢ়, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) এবং দ্বিতীয় গল্প সীমন্ত-হীরা (৩রা অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)। এই দুইটি গল্প লেখার পর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশ বক্সী চরিত্র নিয়ে সিরিজ লেখার কথা চিন্তা করে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২৪শে মাঘ সত্যান্বেষী গল্প রচনা শেষ করে ব্যোমকেশ চরিত্রকে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেন। সেই কারণে সত্যান্বেষী গল্পটিকে ব্যোমকেশ সিরিজের প্রথম গল্প হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এরপর,১৯৩৮ এ তিনি পাড়ি জমান বোম্বাই তে সিনেমার গল্প ও স্ক্রিপ্ট লেখার কাজে।এর প্রায় ১৪ বছর পর আবার তিনি ১৯৫১ সালে চিত্রচোরে ব্যোমকেশ কে ফিরিয়ে আনেন এবং ১৯৭০ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ব্যোমকেশ রচনা চালিয়ে যান। বিশুপাল বধ তার শেষ অসম্পূর্ণ ব্যোমকেশ রচনা।এর মধ্যেই তার লেখনী থেকে বেরিয়েছে দাদার কীর্তি, ঝিন্দের বন্দী ও গৌর মল্লার এর মত ভিন্ন স্বাদের কাহিনী। ঝিন্দের বন্দী গোয়েন্দা গল্প না হলেও একটি সার্থক থ্রিলার হিসেবে গণ্য। দাদার কীর্তি একটি সামাজিক রোমান্টিক কমেডি আর গৌর মল্লার একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস।


শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের গল্পগুলিতে লেখক হিসেবে ব্যোমকেশের বন্ধু অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে উপস্থাপিত করেছেন। ব্যোমকেশের প্রতিটি রহস্যভেদের সঙ্গী অজিতের লেখনীতে ব্যোমকেশের অধিকাংশ গল্পগুলি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু রুম নম্বর দুই, শজারুর কাঁটা, বেণীসংহার, লোহার বিস্কুট, বিশুপাল বধ এই গল্পগুলিতে অজিতকে গল্পলেখক হিসেবে উপস্থিত করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বলেছেন, ‘অজিতকে দিয়ে ব্যোমকেশের গল্প লেখানো আর চলছে না। একে তো ভাষা সেকেলে হয়ে গেছে, এখনো চলতি ভাষা আয়ত্ত করতে পারেনি, এই আধুনিক যুগেও 'করিতেছি', 'খাইতেছি' লেখে। উপরন্তু তাঁর সময়ও নেই। পুস্তক প্রকাশের কাজে যে লেখকেরা মাথা গলিয়েছেন তাঁরা জানেন, একবার মা-লক্ষ্মীর প্রসাদ পেলে মা-সরস্বতীর দিকে আর নজর থাকে না। তাছাড়া সম্প্রতি অজিত আর ব্যোমকেশ মিলে দক্ষিণ কলকাতায় জমি কিনেছে, নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে; শীগগিরই তারা পুরনো বাসা ছেড়ে কেয়াতলায় চলে যাবে। অজিত একদিকে বইয়ের দোকান চালাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ি তদারক করছে; গল্প লেখার সময় কোথায়? ...... দেখেশুনে অজিতকে নিষ্কৃতি দিলাম, এখন থেকে আমিই যা পারি লিখব’।[বেণীসংহার, [ভূমিকা], শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম সংস্করণ, ১৭ই ডিসেম্বর, ১৯৬৮, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড]


উপরে ব্যোমকেশের সাহেবিয়ানার অভাব বা বর্জন নিয়ে বলা হয়েছে।শরদিন্দুবাবু নিজে সাহেবদের কোর্টে ওকালতি করতেন বলে হয়ত সরাসরি পাশ্চাত্য বিরোধিতায় যান নি এবং তার কাহিনীগুলিতে প্রচুর মিশ্র চরিত্র দেখা যায় যারা স্বদেশীআনা বজায় রেখেও বিদেশের কিছু উপাদান এড়িয়ে যেতে পারেন নি। যেমন অজিত বা ব্যোমকেশ এর চুরুট পান,অমলেট,কাটলেট ভক্ষণ বা বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার যা সেই সময় খুব প্রচলিত ছিল না। তাসত্ত্বেও ব্যোমকেশ এর গল্পে কোথায় যেন একটা চাপা পাশ্চাত্য বিদ্বেষ লুকিয়ে আছে। তা অনুকূল বাবুর বিদেশী হোমিওপ্যাথি ওষুধই হোক বা কোকেন(যা কিনা পাশ্চাত্যেই জনপ্রিয়) [সত্যান্বেষী], অপরাধীর সাথে পাশ্চাত্যের যোগাযোগ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।তর্কযোগ্য ভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা চরিত্র,অর্থাৎ বিলেতি সৃষ্টি শার্লক হোমসের সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার হবে। ব্যোমকেশ ও শার্লক দুজনেরই নামটি ধ্বনি ঝংকারে সাধারণ এর চেয়ে একটু আলাদা।দুজনেরই মূল কর্মভূমি ব্রিটিশ শাসিত দুই মহানগর, যথাক্রমে কলকাতা ও লন্ডন, যদিও উপকণ্ঠ বা অন্য শহরের কিছু কাহিনী আছে। দুজনেরই বসবাস শুরু ভাড়া বাড়িতে, যেখানে তাঁদের বাকি জীবনের শাগরেদ তথা অনুলেখকদের সাথে পরিচয়।দুজনেরই প্রথম জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।প্রথম দিকের কিছু কাহিনীতেও মিল খুঁজে পেতে পারেন কেউ।অমিল কিন্ত অনেক বেশী। ব্যোমকেশ যেমন হোমসের মত বৈজ্ঞানিক,বেহালা বাজিয়ে বা কোকেন সেবক নন। হোমসের আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত।যথাসময়ে তাঁর বিবাহ,পুত্র সন্তান,কেয়াতলায় নিজের বাড়ি এমনকি ব্যবসার পর্যন্ত উল্লেখ আছে।সমাধান পদ্ধতিও হোমসের প্রায় গাণিতিক অনুশীলনের থেকে অনেক বেশী মনস্তত্ব ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর।এখানে উল্লেখ্য শার্লক হোমসের গল্পে প্রাচ্যের খলনায়কদের কথা ,যেমন টঙ্গা বা দোস্ত আকবর যা কিনা ব্যোমকেশ কাহিনী র বিপরীতমুখী।আর ব্যোমকেশ কিছু রাজা রাজড়ার সমস্যা সমাধান করলেও তা বেশীর ভাগই সাধারণ মানুষ কে নিয়ে লেখা – হোমস কাহিনীগুলির এলিট আর বুর্জোয়া কেন্দ্রিকতা তথা বেশ কিছু দেশ বা সরকার ভিত্তিক সমস্যার থেকে তা অনেক দূরে। অন্যান্য চরিত্র চিত্রণেও পার্থক্য রয়েছে।যেমন ডঃ ওয়াটসন একসময়ে সেনা বাহিনী তে কাজ করার সুবাদে অনেক ডাকাবুকো,সেখানে অজিত এক শান্তশিষ্ট বাঙালি সুলভ কলমচি।শরদিন্দুর গল্পে বিভিন্ন বয়সী ছাপোষা বাঙালি চরিত্রের ছড়াছড়ি, যেমন রাখালবাবু,অশ্বিনীবাবু,গঙ্গাপদ,হাবুল বা নেংটি দত্ত। চোখ ফেরানো যাক দুই লেখকের সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলির দিকে।দুদিকেই ব্যাক্তিত্বশালীনি,রহস্যময়ী,বুদ্ধিমতী নারী চরিত্রের অবতারণা হয়েছে,শরদিন্দুর গল্পে অপেক্ষাকৃত বেশী। তাঁরা অপরাধী বা নিরপরাধ দুরকমই আছেন।সত্যবতী,শকুন্তলা বা শান্তা সেন, যে কোন সময় আইরিন এডলার এর সাথে পাল্লা দিতে পারেন। তফাত হচ্ছে অজিত,থুড়ী শরদিন্দুর বর্ণনায় নারী শরীর এর একটা সুন্দর রূপ যেন সহজেই ফুটে ওঠে(উদাহরণ মগ্ন মৈনাক এর সুকুমারী দেবী)– ডয়েল কিন্তু এব্যাপারে পিছিয়ে আছেন।বেণীসংহার গল্পের খলনায়িকা মেদিনীর চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে ব্যোমকেশ তথা শরদিন্দু দ্রৌপদী ও ইলিয়ডের হেলেন এর উল্লেখ করেছেন – এথেকে স্পষ্ট যে তিনি নারীদের অসম্ভব চৌম্বকশক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। শুধু তাই নয় ,বিভিন্ন গল্পে সত্যবতী ছাড়াও অন্য কিছু নারী চরিত্রের প্রতি ব্যোমকেশ এর একটা চাপা আর স্বাভাবিক আকর্ষণ টের পাওয়া যায়, সেখানে হোমস যেন বড়ই যান্ত্রিক,অনুভূতিহীন।এটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোন কোন বিশ্লেষক বলেছেন,শরদিন্দু যেমন একটা সুষ্ঠু পরিবার আর বিবাহিত জীবন পেয়েছিলেন,ডয়েল সেটা পান নি।ডয়েলের মায়ের জীবন এবং তার নিজের জীবনে একাধিক বেদনাদায়ক প্রেম ও বিচ্ছেদ কোথাও হয়ত তাঁকে নারীদের সম্পর্কে তিক্ত করে দিয়েছিল।


জনপ্রিয়তায় আর লেখার সপ্রতিভতায় ব্যোমকেশ কে পাল্লা দিতে পারে ফেলুদা – এই অত্যন্ত সুলিখিত,টানটান লেখাগুলির অপেক্ষাকৃত সরলতা,নারী চরিত্রের প্রায় অনুপস্থিতি আর কিশোরপাঠ্যতা নিয়ে আগেই বলা হয়েছে।এছাড়া মনে রাখতে হবে ফেলুদা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের নব্য যুবক – তাই সাহেবি পোশাক,পাশ্চাত্যের প্রমাণ নির্ভর অনুসন্ধান পদ্ধতি বা কোল্ট রিভলভার এর প্রয়োগে ফেলুদার কোন সঙ্কোচ নেই।বরং অনেক জায়গাতেই পাশ্চাত্যের প্রতি তাঁর সম্মান বা অনুরাগের চিহ্ন মেলে - যার কারণ, এর স্রষ্টা, পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এর জীবনীতে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।ফেলুদা শারীরিক ভাবেও বলশালী এবং মুখোমুখি physical সংঘাতে সুপটু।ব্যোমকেশ কাহিনীগুলিতে এই ধরণের combat এর দৃষ্টান্ত কম। ব্যক্তিগত মিলের মধ্যে ফেলুদা আর ব্যোমকেশ দুজনেই পিতৃহারা হন অল্পবয়সে,দুজনের পিতাই অঙ্কের স্কুলমাস্টার ছিলেন আর দুজনেই নিজেদের মেধা ও বুদ্ধির জোরে নামযশ লাভ করেন। ফেলুদার তবু কিছু আত্মীয়ের খোঁজ পাওয়া যায়(অর্থাৎ তোপসে ও তার বৃহত্তর পরিবার),ব্যোমকেশের তাও নেই।মজার ব্যাপার এই যে চলচ্চিত্রে ব্যোমকেশ এর প্রথম আত্মপ্রকাশ কিন্তু এই ফেলুদার জনক সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই – ১৯৬৭ সালের চিড়িয়াখানা ছবিটির মাধ্যমে।অবশ্য এই ছবিটি সত্যজিৎ বা শরদিন্দু কারোই প্রিয় ছবি নয়।কথিত আছে সত্যজিৎ তখন গুপী গায়েন বাঘা বায়েন বানাবেন বলে মূলধন জোগাড়ে ব্যস্ত আর তার সহকারীদের পীড়াপীড়িতে এই ছবিটি নির্দেশনার দায়িত্ব নেন। তাঁর মতে ডিটেকটিভ গল্প থেকে সিনেমা বানানোর একটা প্রধান সমস্যা হল এই গল্পগুলির শেষে অবধারিত ভাবে যে রহস্য উন্মোচনকারী এক সুদীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় সেটা চলচ্চিত্রের গতিকে ব্যাহত করে। তিনি এই গল্পের প্রতিও খুব বেশি মনোযোগী থাকতে পারেন নি- যেমন এখানে অজিতকে বিবাহিত এবং ব্যোমকেশকে ব্যাচেলর দেখানো হয়েছে, অজিত এর পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় হয়ে গেছে চক্রবর্তী। সম্ভবত: এই ধরনের চ্যুতিই শরদিন্দুর উষ্মার কারণ।(সূত্র: The curious case of Byomkesh Bakshi – Sandipan Deb)আরও মজার ব্যাপার হল, এই ছবিটির জন্য সেই বছর সত্যজিৎ রায় শ্রেষ্ঠ নির্দেশকের জাতীয় পুরস্কার পান। উত্তমকুমার এর বৈচিত্র্যময় অভিনয়ও যথেষ্ট প্রশংসা পায়। এখানে বলা হয়ত খুব বেশি অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে সত্যজিৎ রায় যে দুটি ফেলুদার ছবি করেছেন তাতে কিন্তু ক্রাইম ডিটেকশন এর থেকেও অ্যাকশন অ্যাডভেঞ্চারের প্রাধান্য বেশি – সোনার কেল্লা আর জয় বাবা ফেলুনাথ এর মুল অপরাধীদের আমরা তাড়াতাড়িই চিহ্নিত করতে পারি - তাদের কুকীর্তি ও শাস্তি প্রদান ছবিগুলির অন্যতম মুখ্য উপজীব্য হয়ে ওঠে।

যাইহোক,এই সব তুলনা ছেড়ে এবার ব্যোমকেশ কাহিনীগুলির স্বকীয়তার বিশ্লেষণ এ ফেরা যাক। সত্যান্বেষী গল্পে ব্যোমকেশের বিবরণ দিতে গিয়ে অজিত বলেছেন, ...’তাহার বয়স বোধকরি তেইশ-চব্বিশ হইবে, দেখিলে শিক্ষিত ভদ্রলোক বলিয়া মনে হয়। গায়ের রঙ ফরসা, বেশ সুশ্রী সুগঠিত চেহারা-মুখে চোখে বুদ্ধির একটা ছাপ আছে।‘ এই গল্পের শেষে জানা যায়, হ্যারিসন রোডের একটি বাড়ীর তিনতলা ভাড়া নিয়ে ব্যোমকেশ বসবাস করেন। এই বাড়িতে ব্যোমকেশ ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি তাঁর পরিচারক পুঁটিরাম। ব্যোমকেশের অনুরোধে অজিত এই বাড়ীতে বসবাস শুরু করেন। বাড়ীর দরজায় পেতলের ফলকে লেখা ছিল শ্রীব্যোমকেশ বক্সী, সত্যান্বেষী। সত্যান্বেষীর অর্থ জিজ্ঞাসা করায় অজিতকে ব্যোমকেশ বলেন, ‘ওটা আমার পরিচয়। ডিটেকটিভ কথা শুনতে ভালো নয়, গোয়েন্দা শব্দটা আরও খারাপ, তাই নিজের খেতাব দিয়েছি সত্যান্বেষী’[ব্যোমকেশের ডায়েরী]। ব্যোমকেশ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সত্যান্বেষী যিনি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের এবং সরকারী চাকুরে নন।গোয়েন্দা বা রহস্য গল্পে আমরা সবসময়ই খুনির পরিচয় জানতে বেশী ইচ্ছুক থাকি, অপরাধের উদ্দেশ্য বা মোটিভকে অনেকক্ষেএেই পাঠক অতটা প্রাধান্য দেয়না। কিন্তু মোটিভ যদি ‍আমরা বুঝি , সেক্ষেত্রে সমাজের কিছু কালো দিক বা মানুষের মনস্তত্ত্বের কিছু অন্ধকার এলাকা বুঝতে পারবো। শরদিন্দু বাবুর গল্প-উপন্যাস এখানেই আলাদা, উদাহরণ হিসেবে একটা উপন্যাসের কথা বলতে পারি 'শজারুর কাটা'। এতে আগাথা ক্রিস্টির এ বি সি মার্ডার এর ছায়া আছে কিনা সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ কিন্তু এখানে কিছু এমন লোকের মৃত্যু দেখানো হয়েছে, যাদের নিজেদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। গল্পটি পড়ে প্রথমে মনে হবে একজন সিরিয়াল কিলারের কাজ, গল্পের শেষে জানা যায় খুনি একটি বিবাহিতা মেয়েকে ভালোবাসতো আর তার মোটিভ ছিল মেয়েটির স্বামীকে খুন করা। কিন্তু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সে কিছু সাধারণ লোকের প্রাণ কোনো কারণ ছাড়াই নিতে থাকে যাতে পুলিশ তদন্তে নেমে হয়রান হয়ে যায়। মানুষ কতটা স্বার্থপর হলে এরকম কিছু করতে পারে তা এই গল্পের থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি।


ব্যোমকেশ এর গল্পে সমাজ ও তার অন্ধকার দিকগুলি বার বার উঠে এসেছে।বিশ্বযুদ্ধ,কালোবাজারি,কয়লার মাফিয়া,দাঙ্গা এসব তার অনেক গল্পেই ছায়া ফেলে যায়।উদাহরণ হিসেবে আদিম রিপু, কহেন কবি কালিদাস,সত্যান্বেষী গল্পগুলি লক্ষণীয়। আগেই বলা হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রগুলির মধ্যে জটিল আন্তঃসম্পর্কও তাঁর গল্পগুলির একটি বৈশিষ্ট্য,উদাহরণ - চিড়িয়াখানা, বহ্নিপতঙ্গ, খুঁজি খুঁজি নারী,বেণীসংহার। আর শরদিন্দুবাবুর অতিপ্রাকৃতের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও তাঁর ব্যোমকেশ কিন্তু চরম বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী। ব্যোমকেশ ও বরদা গল্পে যখন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের সাথে ‘ভুতান্বেষী’ বরদার দেখা হয়,ঘটনার যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যার সাথে আমরা কিন্তু বরদার প্রতি শরদিন্দুর কিছু কটাক্ষও হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।শরদিন্দু নিজের যুক্তিশীলতা হারান না এক মুহূর্তের জন্যও।ব্যোমকেশের গল্পগুলির আরেকটা উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হচ্ছে বহু অপরাধীই কিন্তু পুলিশের কাছে ধরা দেওয়ার থেকে নিজে মৃত্যুকে বেছে নেওয়াই শ্রেয় মনে করেন – যেমন অর্থমনর্থম্‌ এর ফণীভূষণ বা পথের কাঁটার প্রফুল্ল রায়।ব্যোমকেশ যেন বুদ্ধিমান প্রতিদ্বন্দ্বীর এই আত্মসম্মান বা স্বাধিকারটুকু কে কুর্ণিশ জানান। আর বিপদে, অপরাধী বা পুলিশের তির্যক মন্তব্য ও চ্যালেঞ্জ এর সামনে পড়লে আপাত শান্ত,সংযত এই বঙ্গসন্তান এর দৃঢ় অবিচল মানসিকতা আর শাণিত বুদ্ধির চমক বারে বারে ঝিলিক দিয়ে যায়, এর পরিচয়ও আমরা বহুবার পেয়েছি।আপাত কোমলতার আড়ালে এই নির্ভীক কাঠিন্য ও চারিত্রিক বলিষ্ঠতা দেখে বাঙালি হিসেবে আমরা গর্ব বোধ করি।


এভাবেই শরদিন্দু বাংলা সাহিত্যকে উপহার দিয়েছেন একেবারে তাঁদের নিজস্ব এক সত্যান্বেষী।এখানেই ব্যোমকেশের সার্থকতা, বাঙালি রহস্যপ্রেমী পাঠকের কাছে তাদের খুবই নিকট একজন আমাদের ব্যোমকেশ – যিনি বারংবার কঠিন থেকে কঠিনতর রহস্যের সমাধান অবলীলাক্রমে করার পর বলতে পারেন,’এবার তাহলে উঠলুম,নমস্কার...এস অজিত।‘


তথ্যসূত্র ও ঋণস্বীকার: এ রচনার বেশির ভাগ তথ্যই ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়াতে পূর্ব প্রকাশিত।তাই তথ্যের কৃতিত্ব সম্পূর্ণরূপে মুল রচয়িতাদের(সবার নাম পাওয়া যায় নি বা স্থানাভাবে প্রকাশ করা গেল না কিন্তু প্রধানত সুকুমার সেনের নাম উল্লেখ্য)। বর্তমান লেখক সেটা সাধারণ পাঠকের কাছে পরিবেশন করতে পেরে আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। তবুও তথ্যের কোন ভ্রান্তি জানিয়ে দিলে বাধিত থাকব।এই লেখার চিন্তাভাবনায় কিছু বিশিষ্ট বন্ধু বিশেষ করে শোভন কাপূরিয়ার সাহায্য পেয়েছি তাই অনেক ধন্যবাদ সবাইকে।কিছু মতামত লেখকের নিজস্ব।আর কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য বাংলা তর্জমার থেকে মুল ইংরাজি শব্দের ব্যবহার যথাযথ মনে হয়েছে।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮