• পার্থ সেন

সম্পাদকের কলমে

আমাদের নীড়বাসনার সমস্ত প্রিয় বন্ধুরা,

আপনাদের সকলকে জানাই শারদীয়া এবং দীপাবলির প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আশা করি উৎসবের দিনগুলো আপনাদের খুব ভালো কেটেছে, আর আপনারা সবাই খুব ভালো আছেন। আপনাদের সবার জন্য এই পাতা ঝরার মরশুমের শুরুতে আমরা আবার এসে গেলাম, আমাদের নবম সংখ্যা নিয়ে। আমাদের সমস্ত লেখক, লেখিকা, পাঠক, পাঠিকা, সহযোগী এবং শুভানুধ্যায়ী সকল বন্ধুকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা, আর ধন্যবাদ আমাদের সমস্ত পাঠক বন্ধুদের। আজ থেকে তিন বছর আগে, এই ‘নীড়বাসনা’ কে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষা নিয়ে সাহিত্যচর্চার যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তার শরিক তো আপনারাও ছিলেন। আর আমরা এও বিশ্বাস করি, দু’চারজন মানুষ একসঙ্গে যা দেখেন সেটা স্বপ্ন। কিন্তু আপনাদের সবার সাথে যা দেখতে চাই, তা কেবল স্বপ্ন নয়, একদিন বিপ্লব হয়ে উঠবে। আপনারা সবাই আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনাদের সাহিত্য-চেতনা, ভাবনা, লেখনী আর যথাযথ মতামত আমাদের সাথে ভাগ করে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করে তুলুন।


তৃতীয় বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় আমরা ‘থিম’ বেছে নিয়েছি চিরস্মরণীয় বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে ‘শরদিন্দু স্মরণে’। ১৯৫২ থেকে ১৯৭০ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাই তে চলে যাবার আগে পর্যন্ত প্রায় উনিশ বছর শরদিন্দু ছিলেন পুনের বাসিন্দা। বেশ মনে পড়ে আজ থেকে সাড়ে সাত বছর আগে যখন চাকরী-সূত্রে পুনেতে পাকাপাকি ভাবে বাস করতে এলাম সিনহগড় রোডের ওপর তাঁর নির্মিত বাসস্থান ‘মিথিলা’র উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু অবাক লেগেছিল সেই অমর সাহিত্যিক যিনি অসংখ্য গোয়েন্দা কাহিনী, ঐতিহাসিক কাহিনী, ভূতের গল্প, কিশোর সাহিত্য, তথাকথিত সামাজিক গল্প, উপন্যাসের ভাণ্ডারে বাংলা সাহিত্যকে ভরিয়ে রেখেছেন, তাঁর বাসস্থানটি কিন্তু একেবারেই অযত্নে অসংরক্ষিত হয়ে আছে। তাই তিন বছর আগে, পুনেতে বসে বাংলা ওয়েব ম্যাগাজিন সম্পাদনার কথা যখন প্রথম ভেবেছিলাম শরদিন্দুর কথা সেদিনই মনে এসেছিল। এবারের সংখ্যা তাঁর স্মৃতিতে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।


বাংলা সাহিত্য যখন পড়ে হৃদয়ঙ্গম করতে শিখেছিলাম তখন বুঝেছিলাম শরদিন্দু কিন্তু ‘কনভেনশনাল’ সাহিত্যিক নন। অপরাধ জগত, মানুষের জটিল মনস্তত্ব, জন্মান্তর, অলৌকিক ভূতের গল্প, সামাজিক, রোম্যান্টিক যে কোন বিষয়ে যেমন অসামান্য সৃষ্টি করেছেন তেমন ছিল তাঁর অক্লান্ত হাস্যরস আর বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্রের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্যে অসামান্য দক্ষতা। এমন দুটি বিষয় কে তিনি নিজের রচনার স্পেশাল পেপার করেছিলেন যে দুটোই ছিল তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে অপাংক্তেয়। একদিকে গোয়েন্দা গল্প অন্যদিকে ঐতিহাসিক রোমান্স, শরদিন্দুর লেখায় সব কিছুই হয়ে উঠেছিল নিটোল, সম্পূর্ণ, বহুমাত্রিক। আজও যখন তাঁর লেখা পড়ি, এক-একটা লাইন ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটির থেকেও বেশি কিছু সৃষ্টি করে। সত্যি বলছি, ছোটবেলায় যখন ব্যোমকেশ পড়তাম, তখন ব্যোমকেশ সিগারেট ধরালে তার গন্ধ পেতাম। এমন নিখুঁত অথচ সহজ, সরল তাঁর উপস্থাপনা। শরদিন্দু একবার বলেছিলেন, “বাঙ্গালী আমার লেখা পড়ে তাহাতে সন্দেহ নাই। হয়তো সব কথা বুঝিয়া পড়ে না, তবু পড়ে”। মনে কৌতূহল ছিল, আরও পঞ্চাশ বছর পর কি কেউ মনে রাখবে তাঁকে? তা সত্ত্বেও কিন্তু ছিল বিশ্বাস, “আমার চিন্তা ও স্বপ্নের বীজ যদি বাঙ্গালীর সারবান মনের ক্ষেত্রে পড়িয়া থাকে, তবে আমার নাম সকলে ভুলিয়া গেলেও আমার বাঁচিয়া থাকা নিরর্থক নয়”। তাই নীড়বাসনার সকল পাঠক পাঠিকাদের সঙ্গে সেই অমর সাহিত্যিককে আর একবার স্মরণ করতে চাই।


শরদিন্দুর স্মৃতিচারণ মূলক লেখা ছাড়াও এবারে সংখ্যায় থাকছে বেশ কয়েকটি গল্প, কবিতা। নীড়বাসনার পাঠকদের জন্য আগের সংখ্যায় আমরা নিয়ে এসেছিলাম এক আলাদা বিভাগ “এ মন জানলা”। পৃথিবীর নানান ভাষায় লেখা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার জন্য আমরা শুরু করেছিলাম এই নতুন বিভাগ, উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মনের জানলা খুলে দিয়ে আমাদের চেতনাকে উন্মুক্ত করে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া। এই বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলি নিয়ে আমরা অনেক পাঠক পাঠিকাদের মতামত পেয়েছি, যা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। তাই এবারে নীড়বাসনার পাঠকদের নিয়ে আমরা এক নতুন চেষ্টা করলাম, নাম ‘অনুস্বর্গ’। 'মনের জানলা' দিয়ে হাত বাড়ালেই একটুকরো স্বর্গ - অনুস্বর্গ। এই বিভাগ অনুবাদ সাহিত্যের গল্প কবিতা প্রবন্ধে একটা ছোট্টঘর। পাশের ঘরটা অণু-পরমাণু কবিতা আর গল্পের। মাঝে এক চওড়া জমিন - সময়ের ইতিহাসে বয়ে আসা ভাষা জাতি ‘আমার’ ‘আপনার’ কথা। বন্ধুরা, আপনারা হাত না লাগালে এই স্বর্গ তো গড়া যাবে না! সেই আশায় এবারের নতুন বিভাগ ছোটখাটো ‘টু বি-এইচ-কে’ ‘অনুস্বর্গ’।


পাঠক পাঠিকাদের আর একটি কথা জানানোর ছিল। নীড়বাসনা সাহিত্য-পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমরা নীড়বাসনা নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ শুরু করি যার সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় চারশোর কাছাকাছি। সেখানে আমাদের সদস্যরা তাদের লেখা আমাদের সাথে ভাগ করে নেন। উল্লিখিত ফেসবুক গ্রুপটি ছাড়াও আমরা 'নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন' নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সঞ্চালনা করে আসছি, আজ প্রায় বছর দেড়েক হয়ে গেল। নীড়বাসনার এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমরা আমাদের স্বরচিত লেখা, পছন্দের সাহিত্য, কবিতা, সাহিত্য ভাবনা ভাগ করে নেই এবং সে সম্বন্ধিত আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করে তুলি। সেখানে থেকে কয়েকটি স্বরচিত লেখা এবং আলোচনা নির্বাচন করে একটি সংকলন আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম ‘নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন’ বিভাগে। পাঠক-পাঠিকাদের জানিয়ে রাখি, এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রচয়িতারা তাঁদের রচনা ভাগ করে থাকেন শুধুমাত্র সাহিত্য-আড্ডার আশায়। তাঁদের সেই লেখা এবং লেখা সংক্রান্ত আলোচনা নীড়বাসনার পাতায় প্রকাশ করা, একটা পরীক্ষামূলক প্রয়াস। আর একটা কথা, আমরা কিন্তু সে সব লেখায় কোনরকম ছুরি কাঁচি চালাই নি। কারণ নীড়বাসনা সাহিত্য-যাপন গ্রুপ হল আমাদের সাহিত্য সৃষ্টির আঁতুড় ঘর আর তার প্রাণ হল অকপট এবং অকৃত্রিম সাহিত্য-আড্ডা। সেখানে সংশোধনের কাঁচি চাললে তাঁর মুল সত্ত্বা নষ্ট হত। আমরা বিশ্বাস করি, আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় এত ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যপ্রেমী মানুষের অভাব নেই। আর তাঁদের সাহিত্য-চেতনা আর সাহিত্য-ভাবনাকে উৎসাহ দিতেই আমাদের এই বিভাগ। আশাকরি আপনাদের ভালো লাগবে।


সামনের দিন গুলো আপনাদের খুব ভালো কাটুক। আপনারা সবাই খুব ভালো থাকবেন, আপনাদের মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮